Saturday, 1 January 2022

গন্ডিভাঙা মা ----- মা সারদা

 

একবিংশ শতাব্দীর দাড়িয়ে জগৎ আজ দিশেহারা। একদিকে বিজ্ঞান প্রযুক্তির অগ্রগতি এনেছে চোখ ঝলসানো ভোগের উপকরন ও অত্যন্ত আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য বিশ্বায়ন। কিন্ত ভিতরের চরিত্র বড়ই করুন। সেখানে বেড়েছে হিংসা, হানাহানি। বেড়েছে মানুষে মানুষে দূরত্ব। মানুষ আজ জাগতিক বিষয়ে অনেক কিছু জানে। বেড়েছে " ইন্টেলিজেন্ট কোশেন্ট" বা "বুদ্ধিমত্তা"। কমেছে হৃদয়বত্তা;কমেছে মহতের প্রতি টান, অনুরাগ।  আজকের সমাজে এতটাই ফাঁকা আড়ম্বর যে মানুষ ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে গেলেও বাইরের চাকচিক্য দিয়ে সেই দৈন্য ঢাকতে চায়। তীব্র গতিময় জীবনের ভীষন বেগে মানুষ যতই ঘুরছে ততই সে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে ভিতরে ভতরে। তাই অন্তরে সে খুঁজছে শান্তির খোজ।মানুষ আজ বড় দুঃখী। নীড়হারা মানুষ আজ খুজছে নিশ্চিত শান্তির আশ্রয়----- মায়ের কোল। দেশকালের দ্বন্দ্বের ঊর্ধ্বে বিরাজমান মাতৃশক্তি ------ মা সারদা। মানুষ আজ তার মধ্যে খুজে পাচ্ছে নিশ্চিত মানস-আশ্রয়। মায়ের অপার স্নেহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-দোষ-গুনের সীমা অতিক্রম করে গিয়েছে----- স্পর্শ করছে মানবধর্মের সেই উচ্চ শিখর যেখানে _____ " সবার উপরে মানুষ সত্য "। তাই তো তিনি অনায়াসে বলতে পারেন  "......... কেউ পর নয়, মা, জগৎ তোমার  "।




হ্যাঁ, সত্যিই তিনি " গন্ডিভাঙা" মা ছিলেন।  জাতি-ধর্ম-বর্ণ-আশ্রম _____ কোনও গন্ডিই মা মানেননি। আপন সর্বগ্রাসী মাতৃত্বের অধিকারে সকলেরই মা হয়ে বসেছিলেন।  এই পদবীটি দিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের অষ্টম অধ্যক্ষ স্বামী বিশুদ্ধানন্দ মহারাজ।  ইনি মায়েরই এক অতি সুযোগ্য সন্তান ছিলেন।  



নিজের সম্পর্কে তিনি বলতেন- আমি সতেরও মা, অসতেরও মা। আবার ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর মাহাত্ম্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভক্তদের কাছে বলেছিলেন- ও সারদা, সাক্ষাৎ সরস্বতী! সারদামণি চট্টোপাধ্যায়ের স্বরূপটি তাহলে কী? তিনি দেবী না মা?

দেবী শব্দটির দিকে এক্ষেত্রে একটু না তাকালেই নয়। আমরাই তো বলছি- সারদা দেবী। কিন্তু তা কি আগেকার দিনের প্রথা মেনে শ্রদ্ধেয়া নারীর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া একটা উপাধি মাত্র?
মনে হয় না! কেন না, যতবার জীবদ্দশায়, আধ্যাত্মিক মতে স্থূল শরীরে জন্মতিথি পালিত হয়েছে মায়ের, ততবারই আমরা দেখতে পেয়েছি মাতৃত্ব আর দৈবী মহিমার এক অপূর্ব সমন্বয়। এই দুই সত্তাই অত্যন্ত সাবলীল ভাবে মিশে গিয়েছিল মায়ের চরিত্রে। জন্মলগ্ন থেকেই।
ইতিহাস বলছে, ১৮৫৩ সালের ২২ ডিসেম্বর, বাংলা হিসেবে ১২৬০ সালের ৮ পৌষ, বৃহস্পতিবারে রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং শ্যামাসুন্দরী দেবীর সংসারে জন্মগ্রহণ করেন সারদামণি। মা নিজের মুখেই তাঁর যে জন্মবৃত্তান্তটি বলেছেন ভক্তদের, সেই দিকে একবার তাকানো যেতে পারে। তাহলেই চোখে পড়বে যে দৈবী মহিমা কী ভাবে ঘিরে ছিল তাঁকে আজীবন।



“আমার মা শিওড়ে ঠাকুর দেখতে গিয়েছিলেন। ফেরবার সময় হঠাৎ শৌচে যাবার ইচ্ছা হওয়ায় দেবালয়ের কাছে এক গাছতলায় যান। শৌচের কিছুই হলো না, কিন্তু বোধ করলেন, একটা বায়ু যেন তাঁর উদরমধ্যে ঢোকায় উদর ভয়ানক ভারী হয়ে উঠল। বসেই আছেন। তখন মা দেখেন লাল চেলি পরা একটি পাঁচ-ছ বছরের অতি সুন্দরী মেয়ে গাছ থেকে নেমে তাঁর কাছে এসে কোমল বাহু দুটি পিঠের দিক থেকে তাঁর গলায় জড়িয়ে ধরে বলল, আমি তোমার ঘরে এলাম মা। তখন মা অচৈতন্য হয়ে পড়েন। সকলে গিয়ে তাঁকে ধরাধরি করে নিয়ে এল। সেই মেয়েই মায়ের উদরে প্রবেশ করে; তা থেকেই আমার জন্ম।“


সেই শুরু! এর পর বার বার দেখা যাবে, মায়ের থেকে কিছুতেই আলাদা করা যাচ্ছে দৈবী মহিমার ব্যাপার-স্যাপার। এমনকী এই যে তাঁর নাম সারদা, যার সূত্রে পরবর্তীকালে ঠাকুর তাঁকে বলবেন সরস্বতী, তার পিছনেও কাজ করছে ঐশ্বরিক অভিপ্রায়। কেন না, রামচন্দ্র বা শ্যামাসুন্দরী- কেউই মেয়েকে সারদা নামে চেনেননি। তাঁরা রেখেছিলেন অন্য নাম- ক্ষেমঙ্করী। কী ভাবে ক্ষেমঙ্করী থেকে সারদায় পৌঁছল জীবন, সে কথাও নিজেই বলেছেন মা। “আমার মা আমার নাম রেখেছিলেন ক্ষেমঙ্করী। আমি হবার আগে, আমার যে মাসিমা এখানে (জয়রামবাটীতে) সেদিন এসেছিলেন, তাঁর একটি মেয়ে হয়। মাসিমা তার নাম রেখেছিলেন সারদা। সেই মেয়ে মারা যাবার পরেই আমি হই। মাসিমা আমার মাকে বলেন, দিদি, তোর মেয়ের নামটি বদলে সারদা রাখ; তাহলে আমি মনে করব আমার সারদাই তোর কাছে এসেছে এবং আমি ওকে দেখে ভুলে থাকব। তাইতে আমার মা আমার নাম সারদা রাখলেন।“ সেই রূপেই তাঁকে চিনেছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। আর পরে ভক্তরা চিনলেন শক্তির বিশুদ্ধ প্রকাশ হিসেবে। যার ইঙ্গিত দিয়ে গিয়েছিলেন স্বয়ং ঠাকুরই! জানিয়ে গিয়েছিলেন- তাঁর অবর্তমানে ছেলেদের সহায় হবেন এই মা!

শিশির যেমন নীরবে গোলাপকুড়িকে ফুটিয়ে তোলে, তেমনই শ্রীশ্রীমা তাঁর নিজের অপার্থিব চরিত্র দিয়ে সাধারনের চিত্ত জয় করেছেন।  যারা তাঁর কাছে এসেছে , তারঁ অপূর্ব ভালবাসা পেয়েছে, তাদের মনপ্রাণ সমর্পিত হয়ে গিয়েছে এই " ভালবাসায় ভরা " মায়ের কাছে।তারা বারবার,  বহুবার,  কেউ বা অহোরাত্র ভেবেছে মায়ের কথা। জগতের মালিন্যের লেশমাত্র নেই------- সেই পবিত্রতাস্বরূপিনীর চিন্তা করে মানুষগুলোর অন্তরও হয়ে উঠেছিল পবিত্র,  নির্মল  অন্তরে লুকিয়ে থাকা রাগ-দ্বেষ-লোভ-হিংসার অসুর আপনিই হীনবল হয়ে নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল।  দেবী দুর্গার মতো শ্রীশ্রীমাকে ত্রিশুল ধরে অসুরবধ করতে হয়নি। তাঁর পূত সান্নিধ্যেই --- ওই এসো, বসো, খাও মন্ত্রেই ---- মানুষের দৈবী সত্তা প্রবুদ্ধ হয়ে যেত।  এই কারণেই স্বামীজি মাকে "সংহারমূর্তি" বলেছেন। এই সংহার নেতিবাচক নয় ---- ইতিবাচক।  মানুষের সমস্ত কু ধ্বংস করে সু  কে জাগিয়ে তোলে এই পরম পাবনী সংহারমূর্তি। 

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

মায়ের জীবন আলোচনা করলে দেখা যায় যে তাঁর জীবন ক্ষুদ্র নদীর মত নয়। দিগন্ত বিস্তৃত এক সমুদ্রের মতো। ভালোমতন বিশ্লেষন করলে তাঁর জীবনে তিনটি পর্যায় দেখা যায়। 

মায়ের জীবনের প্রথম পর্যায়টি হল মায়ের জন্ম,  বাল্যজীবন ও বিবাহের পর দক্ষিণেশ্বরে শ্রীরামকৃষ্ণ সমীপে উপস্থিত হয়ে তাঁর পবিত্র সান্নিধ্য লাভ। 

দ্বিতীয় পর্যায়টি শুরু হয় শ্রীরামকৃষ্ণদেবের  কণ্ঠরোগর সূত্রপাতকে কেন্দ্র করে।  যুগাবতার স্বামীর অন্তিম রোগের সেবাসাগরে নিজেকে নিমজ্জিত করে তিনি তখন ধীরে ধীরে নহবতের আড়াল থেকে জগতের সামনাসামনি হচ্ছেন।  শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে লোকশিক্ষার ভার অর্পন করছেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের দেহত্যাগের পর দারিদ্র্য,  লাঞ্ছনা, সমাজের কঠোর আচার বিচারের আগুনে দগ্ধ হয়ে ভবিষ্যত কর্মের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন। 

তৃতীয় পর্যায়টি শুরু হয় যখন শ্রীরামকৃষ্ণের পাঠানো অগুনিত ত্যাগী ও গৃহস্থ ভক্ত শিষ্যরা দলবদ্ধ পিপড়ের মতো তাঁর স্নেহছায়ায় আসতে শুরু করছে। তখন আর তিনি শিক্ষার্থী নন, গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ।  পৃথিবীর মতো সর্বংসহা হয়ে পাপী তাপী সবাই কে মাতৃসুধায় ভরিয়ে তুলছেন। তখন সন্তানরা মাকে চিনছে এবং মা-ও প্রত্যেককে কোলে টেনে নিচ্ছেন। 

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

আমরা মায়ের এক ভক্ত আমজাদের কথা স্মরণ করতে পারি। নিজের হাতে তাকে খেতে দিয়েছিলেন, এমনকী খাওয়া শেষে এঁটো থালা পরিষ্কার করতেও তাঁর কোনও দ্বিধা ছিল না। আমজাদের পরিচয় সম্পর্কে মাকে মনে করিয়ে দেওয়ায় তিনি বলেছিলেন, ‘আমার শরৎ যেমন ছেলে, ওই আমজাদও তেমন ছেলে’। শরৎ, অর্থাৎ পরবর্তী কালে স্বামী সারদানন্দ মহারাজ। এই সামান্য ঘটনাটির তাৎপর্য মোটেও সাধারণ নয়। আজকের এই জটিল আর্থ-সামাজিক দুনিয়ায়, যেখানে অসহিষ্ণুতার একটা বিষময় বাতাবরণ, সেখানে মা সারদার এই সহজ অভিব্যক্তিটা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি। আজও আমরা সর্বস্তরে জাতপাতের সীমানা লঙ্ঘন করতে পারছি না। আমরা সবাই এক এবং অভিন্ন, এই শাশ্বত বোধ আমাদের সবার মধ্যে আসছে না। অথচ কত বছর আগে প্রকৃত সমাজসেবী হিসেবে শ্রীশ্রীমা এক বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দিয়েছিলেন, ভেঙে দিতে চেয়েছিলেন, ‘আমরা ওরা’র বন্ধন।

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

মার কী এমন শক্তি ছিল, যার জন্য তাঁর এই প্রভাব প্রতিপত্তি? এর উত্তর একটাই: অপার মাতৃস্নেহ। এ এক শাশ্বত মাতৃপ্রেম। তিনি সকলেরই মা। এক বার জয়রামবাটিতে দুর্ভিক্ষের সময় ক্ষুধার্তদের গরম খিচুড়ি বিতরণ করার সময় (তখন মা সারদার অল্প বয়স) তাঁর মধ্যে প্রকৃত জনসেবা করার রূপটি ফুটে উঠেছিল। ওই গরিব মানুষদের পাশে বসে হাতপাখায় তাদের বাতাস করে দিয়েছেন। ওই মানুষগুলো তখন মায়ের পরম স্নেহ পেয়ে আনন্দে মত্ত হয়ে উঠেছিল। অভাব, জ্বালা, যন্ত্রণা ভুলে সকলেই একাত্ম হয়েছিল সে দিন। আর মা সারদার এমন আচরণের নজির নানা উপলক্ষে রয়েছে একাধিক।

 ~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

একবার ঘাটাল থেকে একদল লোক পদব্রজে বাগবাজারে এসে উদ্বোধনের সদর দরজা বন্ধ দেখে সামনের মাঠে জড়ো হয়ে বসে থাকে। তাদের দৃষ্টি ছিল  মায়ের  বাড়ির দিকেই। সৌভাগ্যক্রমে মা সেই সময় বাড়ির বারান্দায় বেরিয়ে আসায় সমবেত ভিড়টি মাকে প্রনাম জানয়ে বলল " আঞ্জে মা, আমরা বহু দূর দেশ থেকে এসেছি। জগজ্জননীর দর্শন কি মিলবে??" মা তাদের আকুলতা দেখে জনৈক সেবককে বলল " ওদের নিয়ে এসো। আহা কতদূর থেকে এসে বসে আছে।" সেবকটি উত্তর দিল " মা ওরা যে একদল পঙ্গপাল, আর ভারি নোংরা। আপনি ভিতরে নিয়ে আসতে বলছেন।" সেবকের কথায় মা আঘাত পেলেন, বললেন  " পৃথিবীর সবাইকে আমি দেখা দিচ্ছি, আর কত কষ্ট করে ওরা এসেছে, ওদের দেখা দেব না !! নিয়ে এসো ওদের । বাইরেটা নোংরা হলে কী হবে বাবা, ওদের ভেতরটা পরিষ্কার। " মায়ের আন্তরিক প্রচেষ্টায় মাঠে বসে থাকা ভক্তেরা বাড়িতে এলো।উভয়েই পরস্পরের প্রতি আন্তরিকতা অনুভব করলেন। সেইদিন শ্রীশ্রীঠাকুরের ভোগের জন্য জনৈক ভক্ত প্রচুর শিঙাড়া ও পান্তুয়া পাঠিয়েছিলেন,  সেই সব ঠাকুরকে নিবেদন করে তাদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়া হল।

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

সারা জীবন ঠাকুর ঈশ্বরকে মাতৃরূপে আরাধনা করেছেন। সেই মাতৃরূপিণী শক্তিকে তিনি সারদাতে আরোপিত করলেন, তারপর তাঁর পদপ্রান্তে নিজের সব সাধনা উৎসর্গ করে দিলেন। ফলহারিণী কালীপূজার পুণ্যদিনে ঠাকুর এই ষোড়শী পূজা করেছিলেন। সারদা তখন ষোড়শী নন, অষ্টাদশী।

শক্তিরূপিণী মায়ের এক নাম ষোড়শী। ষোড়শী অবশ্য রাজরাজেশ্বরী এবং ত্রিপুরসুন্দরী নামেও পরিচিত। ঠাকুরের এই ষোড়শী পূজা, নিজের স্ত্রীকে জগজ্জননী রূপে আরাধনা অধ্যাত্মজগতে এক ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। চেতনানন্দ বলছেন, কোনও কোনও অবতার বিবাহ করেছেন, যেমন— রামচন্দ্র, রামকৃষ্ণ। কোনও কোনও অবতার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেছেন, যেমন— বুদ্ধ, চৈতন্য। রামকৃষ্ণ স্ত্রীকে পরিত্যাগ করলেন না, তাঁকে শক্তি রূপে আরাধনা করলেন। এ এক বিরল, ব্যতিক্রমী ঘটনা।

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

বিবেকানন্দের মতো ঠাকুর-অন্ত প্রাণ ভক্ত বার বার বলেছেন, মায়ের স্থান ঠাকুরেরও উপরে। হঠাৎ একটু খটকা লাগতে পারে। রামকৃষ্ণের আদর্শ সারা পৃথিবীতে প্রচার করার ভার যে বিবেকানন্দের উপর ঠাকুর দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর মুখে এ কী কথা? কিন্তু বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছেন, মায়ের মাধ্যমে ঠাকুর স্বয়ং নির্দেশ দিচ্ছেন। বিবেকানন্দ তাই গুরুভাইদের ডেকে ডেকে বলছেন, ওরে, তোরা এখনও মাকে চিনলি না।



☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

বিবেকানন্দ বিশ্বজয় করে ফিরে এলেন দেশে। পার্লামেন্ট অব রিলিজিয়নে তাঁর বক্তৃতা সকল শ্রোতাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে ফেলল। ফিরে আসার পর মায়ের সঙ্গে তাঁর একটি সুন্দর সাক্ষাৎকারের বিবরণ আছে। স্বামীজি সাষ্টাঙ্গ প্রণাম করলেন মায়ের পায়ে। কত দিন পরে তাঁকে দেখে মায়ের চোখে পুত্রস্নেহ। উপস্থিত সকলে এক অপূর্ব স্বর্গীয় পরিবেশ উপলব্ধি করলেন।

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

পাশ্চাত্যের রমণীদের সঙ্গে মায়ের সখ্যের উপর আছে কৌতূহলজনক আলোচনা। গ্রামের মেয়ে সারদা, এক বর্ণ ইংরেজি জানেন না। কিন্তু চমৎকার আলাপচারিতা চালিয়ে যান সারা বুল, মিস ম্যাকলয়েড বা সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে। রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, কিন্তু আহার করেন এঁদের সকলের সঙ্গে। 

সিস্টার নিবেদিতা বলেন, মা, তুমি আমাদের কালী। মা বলেন, না না, তবে তো আমাকে জিভ বার করে রাখতে হবে। নিবেদিতা বলেন, তার কোনও দরকার নেই। তবু তুমি আমাদের কালী, আর ঠাকুর হলেন স্বয়ং শিব। মা মেনে নেন। নিজ হাতে রঙিন উলের ঝালর দেওয়া হাতপাখা বানিয়ে দেন নিবেদিতাকে। নিবেদিতার সে কী আনন্দ এমন উপহার পেয়ে, সকলের মাথায় হাতপাখা ছোঁয়াতে থাকেন। মা বলেন, মেয়েটা বড় সরল। আর বিবেকানন্দের প্রতি আনুগত্য দেখবার মতো। নিজের দেশ ছেড়ে এসেছে গুরুর দেশের কাজে লাগবে বলে। নিবেদিতার ভারতপ্রেম অতুলনীয়।

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

শ্রীমা সারদা শ্রীরামকৃষ্ণ-মুদ্রার অপর পিঠ। শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে বীজাকারে স্থিত মাতৃত্বের পূর্ণ প্রকাশ ঘটাতেই তাঁর আবির্ভাব।  তাঁর নিজের কথায় :: " ঠাকুরের জগতের প্রত্যেকের উপর মাতৃভাব ছিল,  সেই মাতৃভাব বিকাশের জন্য আমাকে এবার রেখে গেছেন। " শ্রীরামকৃষ্ণ তাই তাঁর  জীবদ্দশাতেই শ্রীমার স্বরূপ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন,  কিন্ত বিশেষ কৃতকার্য হয়েছিলেন বলে মনে হয় না। বলেছিলেন  " ও আমার শক্তি"। তাঁর অন্তরালে থাকার অদ্ভুত ক্ষমতাকে লক্ষ করে বলেছিলেন " ও ছাইড়া বেড়াল"। এবং সব শেষে বলেছিলেন  " ও সারদা, সরস্বতী, ঞ্জান দিতে এসেছে।" কিন্ত  যুক্তিবাদী, ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত ভক্তসমাজ, এক নিরক্ষর অন্তরালবর্তনী সম্পর্কে এতটা বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিলেন না।  " শ্রীরামকৃষ্ণের স্ত্রী যখন তখন কিছু বিশেষত্ব নিশ্চয় আছে" ------- এই  ভাবনার বেশি তখন কেউ ধারণা করেছিলেন বলে জানা যায় না। একমাত্র স্বামীজির তাঁর সম্বন্ধে ধারনা পরিস্কার ছিল  এবং তা কিভাবে হয়েছিল তা জানা নেই।  আর তা হয়েছিল স্বামীজী হয়ে উঠার বহু আগে থেকেই।  মায়ের প্রতি ছিল তার  এক বিরাট শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রম। এই  শ্রদ্ধার বশেই ঠাকুরের নির্দেশ পেয়েও মায়ের অনুমতি চাইলেন বিদেশ যাত্রার প্রাককালে। স্বামীজীই প্রথম তাঁর গুরুভাইদের কাছে মায়ের জগজ্জননীত্ব খ্যাতি করেন ও সঙ্ঘ গঠনের পর তার শীর্ষে সঙ্ঘজননী হিসেবে মাকে বসিয়ে যান।

+×÷=+×÷=+×÷=+×÷=+×÷=+×÷=+×÷=+×÷=+×÷=

শ্রীরামকৃষ্ণদেবের  দেহাবসানের পর শ্রীমা সারদা দেবীর জীবনে তিনটি বিভিন্ন খাতে সমান ক্রিয়া ক্রিয়াশীলতা দেখা যায়। এক, নিজ ধর্ম জীবনে ঐশ্বরিক গুন বা আত্মাগুন প্রকাশ।  সত্য, সরলতা,  সন্তোষ, দয়া ও ক্ষমা 





€$€$€$€$€$€$€$€$€$€$€$€$€$€$

 ঠাকুর ও শ্রীমায়ের বিবাহ এক আধ্যাত্মিক বন্ধন। রামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর থেকে কামারপুকুরে যখন আসেন, মা-কে তাঁর পিতৃগৃহ জয়রামবাটী থেকে আনানো হয়। ঠাকুর তাঁকে নিজের হাতে একটু একটু করে তাঁর আধ্যাত্মিক সঙ্গিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। তিনি জানেন, রামকৃষ্ণ মিশনের দায়িত্ব একদিন নিতে হবে সারদাকে। ঠাকুর নিজেকেও পরীক্ষা করেন। সারদা অন্তরে অতি পবিত্র। সারদার সঙ্গ কখনও তাঁর মনে সাধারণ মানুষের কাম-ভাব জাগ্রত করে না।

রামকৃষ্ণ ঈশ্বরকে সাধনা করেছেন শক্তিরূপিণী মাতৃমূর্তিতে। সারদা তাঁর কাছে জীবন্ত ভগবতী। সাত বছর বয়সে, নয় বছর বয়সে, চোদ্দো বছর বয়সে সারদা বার বার রামকৃষ্ণের সান্নিধ্যে এসেছেন। রামকৃষ্ণের হাতে তাঁর আধ্যাত্মিক শিক্ষা চলেছে অনুক্ষণ।

সারদার বয়স যখন আঠারো, তখন তিনি পদব্রজে জয়রামবাটী থেকে দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের কাছে পৌঁছলেন। পথকষ্টে শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ল। অসুস্থ অবস্থায় এসে পৌঁছলেন। রামকৃষ্ণ প্রাণ দিয়ে স্ত্রীর শুশ্রূষা করলেন, পথ্য দিয়ে ধীরে ধীরে ভাল করে তুললেন। সেই সময় ঘটল তাঁদের যুগ্ম আধ্যাত্মিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ঠাকুর রামকৃষ্ণ তাঁর স্ত্রীকে জগজ্জননী রূপে পূজা করলেন। এর অন্তর্নিহিত মাহাত্ম্য উপলব্ধি করা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। 

~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

কত বরাহূত ভক্ত শঙ্কিত হৃদয়ে মায়ের কাছে যেতেন ----- মা অপরিচয়ের গন্ডি ভেঙে তাদের গ্রহন করবেন তো ?? মাতৃসকাশে গিয়ে তাদের সংশয় কেটে যেত, অনুভূতি হতো______ ইনি যেন তাদের গর্ভধারিনী, দু হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলেন।  বরিশালের এক ভক্ত স্বপ্ন দেখেন,  এক মাতৃমূর্তি তাকে দর্শন দিয়ে বলছেন " তুই এখনো বসে আছিস? তোর যে বয়স হয়েছে!! এখন শুভ সময়। আয়, আমার সঙ্গে চলে আয়। "সেই ভক্ত ইতিপূর্বে শ্রীশ্রীমাকে দেখা তো দূর, তাঁর ছবিও দেখেননি। তবু তিনি মনপ্রাণে বুঝলেন,  শ্রীশ্রীমাই তাকে ডাকছেন।  মা তখন জয়রামবাটিতে। খোঁজ খবর করে ভক্ত সেখানে উপস্থিত। মাকে প্রথম দেখলেন।  স্বপ্নদৃষ্ট সেই মূর্তি। ভক্ত বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হলেও মা কিন্ত চিরপরিচিতের মতো সহজভাবে স্নহমাখা সুরে বললেন  " বাবা এসেছ?? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। " 

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

সত্যিই মায়ের ভালোবাসা ছিল গন্ডিভাঙা। সব সময়ই তাঁর ভালোবাসা সমাজের কুসংস্কার ও সংকীর্ণ আচার বিচারের গন্ডিও অনায়াসে ভেঙে ফেলত। নিজে একজন ব্রাহ্মণ ঘরের মেয়ে ও বধু হয়েও জাতপাতের ঊর্দ্ধে উঠে সকলের ছোঁয়া খাবার সানন্দে গ্রহন করতেন।  আচারনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ পিতৃকুলের ভিটেতে বাগদি , ডোম, মুসলমানের অবাধ যাতায়াত ছিল। 

জয়রামবাটিতে খাওয়ার পর মা সন্তানদের এঁটো পাতাশ্ তুলতে দিতেন না। বাড়ির অপর কাউকে দিয়ে করাতেন কিংবা নিজেই তুলতেন। কোনোও শিষ্যের উচ্ছিষ্ট মা পরিস্কার করছেন দেখে কেউ বাধা দিত----- "তুমি বামুনের মেয়ে-- গুরু, ওরা তোমার শিষ্য। তুমি ওদের এঁটো নাও কেন?? ব্রাহ্মণত্বের অহংকার ধুলোয় মিশিয়ে মা জবাব দিতেন,  " আমি যে মা গো, মায়ে ছেলে করবে না তো কে করবে??  এক মুসলমান মজুরের এঁটো তোলার পর মায়ের ভাইঝি নলিনী যখন " পিসিমা, ছত্রিশ জাতের এঁটো কুড়াচ্ছ!" বলে চিৎকার করতেন, তখন মা সংক্ষেপে বলতেন  " সবই যে আমার,  ছত্রিশ কোথায় ??"



☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

শ্রী অক্ষয়কুমার সেন, শ্রীশ্রীরামকৃষ্নপুথি রচয়িতা, একবার ময়নাপুর গ্রাম থেকে সমাজের চোখে নিম্নশ্রেনীর একটি মেয়ের হাত দিয়ে জয়রামবাটিতে মায়ের জন্য ভালো ঘি পাঠালেন।  মেয়েটি ঘি নিয়ে এলে মা তাকে সেই রাত্রে বিশ্রামের জন্য জয়রামবাটিতেই রেখে দিলেন।  মেয়েটি ছিল ম্যালেরিয়া রুগি এবং দুর্ভাগ্যক্রমে সেই রাত্রেই তার প্রচন্ড জ্বর এল। পরদিন ভোর রাতে অভ্যাসবশত মা উঠে দেখলেন মেয়েটির ধুম জ্বর। জ্বরের ঘোরে সে অসাড়ে বিছানায় মলত্যাগ করে ফেলেছে। অথচ তখনও মেয়েটির ঘুম ভাঙেনি। মা সস্নেহে মেয়েটিকে জাগালেন। কারণ মা জানতেন,  সকাল হলে বাড়ির সবার সামনে মেয়েটি অপ্রস্তুতিতে পড়ে গিয়ে হয়রানির শিকার হবে। কেউ হয়ত না বুঝে তিরস্কার করে বসবে। মেয়েটি উঠে পরিষ্কার হয়ে নিল এবং মা মুড়ি গুর বেধে তার হাতে দিয়ে নরম সুরে বললেন----- " মা, তুমি সকাল সকাল বেরিয়ে গেলে রোদে কষ্ট হবে না।" মেয়েটি বিদায় নিলে মা দ্রুত বিছানা তুলে নিজের হাতে সব পরিষ্কার করে ফেললেন।  সকালবেলা কেউ কিচ্ছুটি টের পেল না।

~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

বড় ঘরের এক মেয়ের কুপ্রবৃত্তি সমাজে ফাঁস হয়ে যাওয়ায় মেয়েটি এক সাধুর উপদেশে নিজের ভূল বুঝতে পেরে উদ্বোধনে ছুটে আসে। অনুতপ্ত হয়ে মায়ের ঘরের দোড়গোড়ায় দাঁড়িয়ে অঝড়ে কাঁদতে থাকে। মায়ের পবিত্র ঘরে পা রাখতে লজ্জা পায়। শেষে মা নিজেই মেয়েটির সঙ্গে আলাপ করে তার সমস্ত দু:খের কথা জেনে নেন। মেয়েটি চোখের জলে বুক ভাসিয়ে প্রশ্ন করে " মা, আমার কী উপায় হবে? আমি আপনার এই  পবিত্র মন্দিরে প্রবেশ করবার যোগ্য নয়।" শ্রীমা পরম স্নেহে মেয়ের গলা জড়িয়ে উত্তর দেন "এসো, মা, ঘরে এসো। পাপ কি তা বুঝতে পেরেছ, অনুতপ্ত হয়েছ। এসো, আমি তোমাকে মন্ত্র দেব।  ঠাকুরের পায়ে সব অর্পন করে দাও, ভয় কি ??"

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

একবার জনৈক ভক্ত শ্রীশ্রীমাকে বলেছিলেন  "ঠাকুর  (শ্রীরামকৃষ্ণ) অপ্রকট হওয়ার পর আপনি সংসারে থেকে লোককে শিক্ষাদীক্ষা দিচ্ছেন।  আর কোনো অবতারে শক্তিরা এরূপ কাজ করেছেন বলে শোনা যায় না, পার্ষদ ভক্তেরাই লোকশিক্ষা দিয়েছেন।  এই নতুনত্বের কারণ কি? " শ্রীশ্রীমা উত্তর দিয়েছিলেন " বাবা , জান তো, ঠাকুর সকলের মধ্যে মাকে দেখতেন; সেই মাতৃভাব জগতকে শেখাবার জন্যে এবার আমাকে রেখে গেছেন। " 

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

একবার সুরেন্দ্রনাথ সেন নামে এক ভক্ত স্বামী বিবেকানন্দের কাছে দীক্ষাপ্রার্থী হয়ে আসেন। স্বামীজি সন্মত হয়ে তাকে দিন স্থির করে বেলুড় মঠে যেতে বলেন। সুরেন্দ্র নির্দিষ্ট দিনে মঠে গেলেও স্বামীজি তাকে নিরাশ করে জানালেন " ঠাকুর  ( শ্রীরামকৃষ্ণ ) বললেন , আমি তোর গুরু নই; ঠাকুর দেখিয়ে দিলেন,  যিনি তোকে দীক্ষা দেবেন তিনি আমার চেয়েও বড়; ........ সময়ে সব হবে। " সুরেন্দ্র মর্মাহত হয়ে ভাবলেন,  অনুপযুক্ত বলে স্বামীজি তাঁক  এভাবে বিদায় করলেন।  কয়েকদিন পর তিনি স্বপ্ন দেখেন, এক উজ্জ্বল দেবীমূর্তী তাকেঁ দীক্ষা দিচ্ছেন।  সুরেন্দ্রর প্রশ্নের উত্তরে সেই দেবীর স্বীকৃতি " আমি সরস্বতী"। পরে স্বামীজি এই স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনে বললেন " ওই মন্ত্র জপ করতে থাক। পরে সশরীরে সেই মন্ত্র দাত্রী দেখতে পাবি। তিনি বগলার অবতার। সরস্বতী মূর্তিতে বর্তমানে আবির্ভূতা। যখন দেখতে পাবি, দেখবি উপরে মহা শান্ত ভাব, কিন্ত ভিতরে সংহার মূর্তি। সরস্বতী অতি শান্ত কিনা!!" সুরেন্দ্র কিন্ত স্বপ্নে বিশ্বাস করেননি, জপও করেননি। প্রায় সাত বছর পর জয়রামবাটি গেলে শ্রীশ্রীমা তাঁক দীক্ষা দিতে চান। দীক্ষার আসনে বসে মাতৃমুখ থেকে মন্ত্র শোনামাত্র সুরেন্দ্রর সেই  মন্ত্রের কথা মনে পড়ে যায়। পরে তিনি বলেছিলেন  " ক্ষনেকের জন্য যেন বাহ্যসংঞ্জা হারাইয়া ফেলিলাম। কিন্ত আনন্দানুভূতি লুপ্ত হইল না। প্রকৃতিস্থ হইয়া দেখিলাম,  স্বপ্নদৃষ্ট দেবীমৃর্তী ও মায়ের মূর্তি এক "। বলা বাহুল্য স্বপ্নে পাওয়া সেই মন্ত্রটিই এতদিন পর মা আবার  সুরেন্দ্রকে দিয়েছিলেন। 

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

শ্রীরামকৃষ্ণ ও শ্রীশ্রীমায়ের কথা শুনে মাতৃদর্শেনর জন্য  ব্যাকুল হয়েছিলেন শ্রীমতি বিনয়বালা সেন। ইনি থাকতেন ঢাকায়। কোনওরকমে কলকাতার বাপের বাড়িতে এসে তিনি একদিন ট্রামে উঠে পড়লেন।  শুধু জানতেন মা থাকেন উদ্বোধন অফিস বাড়িতে। জিঞ্জাসা করে করে বিকেলবেলা বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে পৌঁছালেন বিনয়বালা। কিন্ত সেখানে পালা করে সেবকেরা পাহাড়া দিতেন,  যাতে ভক্তদের অবারিত দর্শন দিয়ে অসুস্থ মায়ের বিশ্রামের ব্যাঘাত না ঘটে। অশ্চর্যের ব্যাপার হল , বিনয়বালা যখন পৌঁছালেন তখন কাছাকাছি কোনোও সেবক ছিলেন না। অবাধে তিনি সিড়ি দিয়ে দোতলায় চলে গেলেন।  শ্রীশ্রীমা সঙ্গে সঙ্গে ঘর থেকে বেড়িয়ে এসে বললেন  " তুমি মা আমার কাছে মন্ত্র নিতে এসেছ, হাত-পা ধুয়ে এসো। তোমাকে মন্ত্র দেব।" বিনয়বালা জানালেন--- দীক্ষার জিনিসপত্র কিছুই আনেননি। মা স্নেহঢালা কন্ঠে বললেন--- " ওসব কিছুই লাগবে না। " বস্তুত সারাজীবন মা এমনটাই করে এসেছেন।  অচেনা অজানা শত শত মানুষ এসে "মা" বলে দাঁড়িছয়েছে, আর মা কোল পেতে গ্রহন করেছেন। এ ঘটনায় বিনয়বালা অভিভূত হয়েছিলেন।  অযাচিত কৃপা তাঁকে সারাজীবন আনন্দে বিভোর করে রেখেছিল। 

~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

এই অপূর্ব জননী শুধু স্নেহবিবশা মা-ই নন, তিনি গুরু। একাধারে গুরুশক্তি ও মাতৃশক্তির অদৃষ্টপূর্ব সমন্বয়। গুরু কে ??? ____ যিনি শিষ্যের অঞ্জান অন্ধকার দূর করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ একবার বলেছিলেন  " ও সারদা সরস্বতী। ঞ্জান দিতে এসেছে। রূপ থাকলে পাছে অশুদ্ধ মনে দেখে লোকের অমঙ্গল হয়, তাই এবার রূপ ঢেকে এসেছে।" অসংখ্য মানুষ যারা ভাগ্যবান,  এই একাধারে মা ও গুরুর কৃপা লাভ করে ধন্য হয়েছেন। সমাগত সকলে আশ্চর্য হয়ে দেখত, দীক্ষা দিয়েই মা ব্যস্ত হয়ে ছুটছেন শিষ্যসন্তানের জন্য রান্না করতে। নিজে বসে তাদের উচ্ছিষ্ট পর্যন্ত নিজে পরিষ্কার করতেন মা। তাদের নিরস্ত করার জন্য বলতেন  "ওসব করার লোক আছে।"পরে তারা চলে গেলে স্বহস্তে এটোঁ পাতা তুলতেন। কেউ দেখে ফেলে নিজেদের অকল্যাণের আশঙ্কা প্রকাশ করলে স্নহময়ী জননী বলতেন  " মায়ে ছেলের কত কী করে ! আমি তোমাদের জন্য কী করতে পেরেছি বাছা ??"  চিরন্তনী মাতৃসত্তা এইভাবেই তাঁর গুরুসত্তাকে আরাল করে রাখত।

~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

এক অশ্রুতপূর্ব মাতৃশক্তি , শিষ্যের চেষ্টার অপেক্ষা না রেখেই,  শিষ্যের হৃদয়কে কতখানি ঊদ্ধর্গামী করতেন----- তার দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে। সঙ্ঘে যোগদান করে এক ব্রহ্মচারী শ্রীশ্রীমায়ের কাছে দীক্ষালাভ করেছিলেন।  কিন্ত জীবনে কোনো উন্নতি বোধ না করতে পেরে অভিমানে মায়ের কাছে যেতেন না। একবার দীর্ঘ এক পত্র লিখে মাকে অন্তরের ব্যাথা জানান।  এও লেখেন,  মন্ত্র নিয়ে তিনি যখন কিছুই করতে পারছেন না তখন মা যেন মন্ত্র ফেরত নিয়ে নেন। চিঠি পড়ে মা তাকে ডেকে পাঠান  এবং বলেন  " দেখো বাবা, সূর্য থাকে আকাশে আর জল থাকে নীচে। জলকে কি ডেকে বলতে হয়, ওগো সূর্য,  তুমি আমাকে উপরে তুলে নাও ? তোমাকে কিছুই করতে হবে না। "অনুরূপ ক্ষেত্রে মা এক সন্তানকে অভয়বাণী শুনিয়েছিলেন, " যারা আমার ছেলে , তাদের মুক্তি হয়ে আছে। বিধির সাধ্য নেই যে, আমার ছেলেদের রসাতলে ফেলে। আমার উপর ভার দিয়ে নিশ্চিত হয়ে থাকো।"

~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

শ্রীশ্রী মায়ের দূরদৃষ্টি এবং সন্তানকে রক্ষা করার আগ্রহ দেখলে বিস্মিত হতে হয়।

ভক্ত সন্তানেরা বিভিন্ন সমস্যায় সমাধানের আশা করে মায়ের কাছে চিঠি লিখত।মা সব চিঠিরই উত্তর দিতেন।

তেমনই এক ভক্ত লিখছেন,তিনি যে চাকরী করেন, তাতে তাকে সময় সময় মিথ্যা কথা বলতে হয়।তাই তিনি চাকরী ছেড়ে দিতে চান।কিন্তু তার উপর সংসারের ভরণ পোষণ নির্ভর।তাই কি করবেন,মা যদি কোনো উপদেশ দেন।মা এই চিঠি শুনে খুব চিন্তিত হলেন।একটু পরে বললেন ,"লিখে দাও,সে যেন চাকরি না ছাড়ে।"যিনি চিঠির উত্তর লিখছিলেন,তিনি ইতঃস্তত করছেন।ভাবছেন,মা কেন এমন আদেশ করছেন?সে তো সৎ পথেই চলতে চাইছে।মা এর মনের ভাব বুঝে বললেন,"আজ একটু সামান্য মিথ্যা বলতে ভয় পাচ্ছে, কিন্তু চাকরী ছেড়ে অভাবে পড়লে, তখন চুরি,ডাকাতি করতেও ভয় পাবে না।" 

এই আমাদের মা।সত্যিকারের মা।জন্ম জন্মান্তরের মা।

জয় জয় গুরু মাতা জগৎ জননী।।

☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

এক ভক্তমহিলা মাকে দেখতে এসে প্রনাম করে কেঁদে বললেন " মা আমাদের কি হবে?" মাতৃকন্ঠে প্রথমেই ঝরল অভয় " ভয় কি ?"  তারপর ক্ষীনস্বরে থেমে থেমে উচ্চারণ করে গেলেন অন্তিম বাণী :: " যদি শান্তি চাও মা, কারও দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে আপনার করে নিতে শেখো।কেউ পর নয়, মা, জগৎ তোমার।" সেদিন ছিল  ১৫ই জুলাই,  মৃত্যুর ঠিক  পাঁচ দিন আগের কথা।

~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~○●□■♤♡◇♧☆~~~

শ্রীশ্রীমায়ের কথা বলতে বসলে শেষ করা কঠিন। সাধারণত সবসময়ই তাঁর এই মহান জীবনসমুদ্রের কয়েক বিন্দুই আলোচিত হয়। তিনি সর্ব অর্থেই ছিলেন একজন যোগ্য মায়ের স্বরূপ। শ্রীরামকৃষ্ণের শক্তি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের ভাবধারার অদ্ভুত মিশেল। তিনি শুধুই মানুষ,  জীব-জন্তুর মা ছিলেন না ______ গোরু, বিড়াল, পাখি, পিপড়ে ইত্যাদি জগতের প্রতিটি চেতন প্রানীকে তিনি আপন স্নেহডোরে বেধে ফেলেছিলেন।  আজ তিনি যখন সূক্ষ্ম দেহে রয়েছেন , তখনও প্রতিটি জীবের প্রতি প্রকাশিত হয়ে চলেছে মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা। এই পৃথিবীতে যারা আসবেন  বা আসছেন তাদের প্রতিও বইবে মায়ের  ভালোবাসা, স্নেহধারা। তিনি ভালোবাসতেও জানেন,  আবার ক্ষমা করতেও জানেন।  তাঁর স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া খুব শক্ত।  তাই  গিরিশচন্দ্র যখন প্রশ্ন করেছিলেন  " তুমি কি  রকম মা ??" , তখন শ্রীশ্রীমা মর্মস্পর্শী ভাষায়  এক অসামান্য  উত্তর দিয়েছিলেন  --- "  আমি সত্যিকারের মা, গুরূপত্নী নয়, কথার কথা মা নয় ___ সত্য জননী। "


☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡☆♡

এই যুগ সর্বসাধরনের যুগ। একই শক্তি ভালো-মন্দ   পাপ- পূণ্য সকল দ্বন্দ্বের জন্মদাত্রী  , পালয়িত্রী। এই শক্তিরই এক রূপ মা সারদা। তাই মায়ের মধ্যে মানবতাবোধ পূর্ণ রূপে বিকশিত।  তাঁর কাছে জাতি, ধর্ম,  বর্ণ কোনও বাধাই সৃষ্টি করতে পারেনি। মুসলমান ডাকাত ' আমজাদ ' এবং ঠাকুরের ত্যাগী সন্তান  'শরৎ' তাঁর কাছে সমান। আবার ভারতকে পদানত করে রেখেছে যে ইংরেজ  তারাও তাঁর সন্তান, তাঁদেরও  কল্যাণ কামনা করেন তিনি। এই তো প্রকৃত মানবধর্ম। সমাজের তৈরি, মানুষের তৈরি সব রকম ক্ষুদ্র গন্ডি ভেঙে "মা" হয়ে উঠেছিলেন  "গন্ডিভাঙা  মা"। নিজের অধিকার,  নিজের প্রাপ্য অনায়াসে সকল মানুষের জন্য ছেড়ে দিয়ে ঠাকুরকে পর্যন্ত বলেছিলেন  " ........ তুমি তো শুধু আমার ঠাকুর নও ---- তুমি সকলের। "  এই যে নিজেকে ছাপিয়ে মানুষের জন্য ছড়িয়ে পড়া ---- এই বিরাট ভাবের কাছে ঠাকুর পরাজয় স্বীকার করেছেন সানন্দে এবং স্বেচ্ছায়।

£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£$£

যেমন শিশুর পথ্য অপথ্য,  খাদ্য অখাদ্য  বিচার নেই; কোনটি তার শরীরের উপযুক্ত,  কোনটি শরীরের ক্ষতি করবে এ ঞ্জান নেই, তেমনই আমরাও এ জগতে শিশুর মত সেই পথেই চলেছি, তাৎখনিক তৃপ্তিলাভের উদ্দেশ্যে। আমাদের সঠিক পথ দেখাতেই তো মা-এর আসা। মায়ের অসীম করুন, বিনিন্দ্র রাজনীতি আমাদের জন্য  জপ, মানবীভাবে আমাদের জন্য ঠাকুরের কাছে আকুল প্রার্থনা_____ সবই তো আমরা যাতে বিচারের না চলি, বেতালে পা না পড়ে তার জন্য।  তাঁর করুনাসিক্ত দৃষ্টি যদি আমাদের দিকে পড়ে, তাহলে হয়ত আমাদের করণীয় কি তা মনে হয়ে উঠবে। আমাদের করণীয়  শুধু এটুকুই ---- তিনি আমাদের জন্যই এসেছেন এই বিশ্বাসে আপনবোধে তাঁর উপর ভার দিয়ে নিশ্চিত থাকা। এই ভারটুকু ঠিকভাবে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত। ভোগ, দুর্ভোগ,  গ্রহন, ত্যাগ, সাধনভজন কিছুই শিশুর মনে ওঠে না, সে জানে তার মা আছে। মাও বলেছেন ----- " ভয় কি বাবা! আমি মা থাকতে ভয় কি? সবসময় ভাববে আমার একজন মা আছেন। "


@-@-@-@-@-@-@-@-@-@-@-@-@-@-@-@

■  গণিতজ্ঞ কেশবচন্দ্র নাগের মতিভ্রম !
_________________________________ 
পরলোক থেকে নাকি মৃত প্রায় কেশব নাগকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন শ্রীশ্রীমা সারদা। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া গণিতজ্ঞকে বাঁচাতে এসেছিলেন শ্রীশ্রী মা সারদামনি। তাও তাঁর নিজের দেহই যখন ইহলোকে নেই, তখন।  আজগুবি এই ঘঠনার কথা আপনাদের শোনাবো। তিনি গণিতজ্ঞ কিন্তু অসম্ভব বিশ্বাস ছিল সারদা দেবীর উপর। ছিলেন তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত। সারদা দেবীর দেহ ইহলোক ত্যাগ করেন ১৯২০ সালে। ১৯১৯ সালে জানুয়ারি মাসে মায়ের থেকে দীক্ষা নেন কেশবচন্দ্র নাগ। গণিতজ্ঞ তাঁরই একটি বইতে লিখেছেন, ‘তখন বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলে মাস্টারি করছি। মায়ের দর্শন হতেই তাঁকে বললাম দীক্ষা নেবার আকাঙ্ক্ষার কথা। মা মহামন্ত্র দিলেন। একটি রুদ্রাক্ষের জপমালাও দিলেন। মা সেটি জপ করে দিয়েছিলেন।’
এর মাঝে কেটেছে ২৩টি বছর। ঘটনা ১৯৪২ সালের। গণিতজ্ঞ লিখেছেন, ‘প্রচণ্ড অসুখে পড়লাম। দেশের বাড়ি গুড়াপে এলাম। বাড়িতে সবাই খুব চিন্তিত। গুড়াপে তখন একজন ভালো ডাক্তার এসেছিলেন। তিনি দেখছিলেন। কিন্তু কিছুতেই কিছুই হচ্ছিলো না। রোগ ক্রমশ বাড়তে লাগলো। পরিজনেরা ভয় পেলো। বাঁচার আসা ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এলো। তবে চিকিৎসার কোনও ত্রুটি ছিল না। ক্রমে ভীষণ শ্বাস কষ্ট শুরু হল। ডাক্তার বললেন ‘অক্সিজেন সিলিন্ডার লাগবে’। বাড়ি থেকে কে যেন গেলো বর্ধমানে সিলিন্ডার আনতে। সেই রাত আমার স্পষ্ট মনে আছে। কষ্টটা যেন দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে। বুঝিবা শেষ রাত।’ সেদিন গনিতজ্ঞের বাড়িতে কারও চোখে ঘুম নেই। গনিতজ্ঞ লিখছেন, ‘হঠাৎ মায়ের কথা মনে পড়ল। মা’কে অসুস্থ অবস্থায় সেবা করেছিলেন স্বয়ং মা কালী। আর আমার এই দুঃসময়ে মা কি আমায় বাঁচাবেন না? বারবার শুধু তাঁর কথাই ভাবছি। তাঁকে ডাকছি। হাত -পা নাড়ানোর ক্ষমতা নেই। শুধু কাঁদছি আর কাঁদছি। এমন সময় একটা ঘটনা ঘটলো। স্পষ্ট দেখলাম মায়ের মতো কে একজন আস্তে আস্তে আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, মা-ই তো! সেই মুখ, সেই চোখ, সেই সরু লাল পাড় শাড়ি। দু চোখে করুণা ঝরে পড়ছে। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।’ আরাম অনুভব করলেন কেশব নাগ।
তাঁর কথায় , ‘মনে হচ্ছিল, আমি সেরে যাচ্ছি। আমি হাত-পা নাড়তে পারছি। হয়তোবা কথাও বলতে পারবো। মা আমাকে সাদা একটা গুলি খাইয়ে দিলেন, যা দেখতে অনেকটা ন্যাপথালিনের মতো। গুলিটা যতই গলা দিয়ে নামছে মনে হচ্ছে আমার সমস্ত রোগযন্ত্রণা নিয়ে সেই গুলি যেন শরীরে মিশে যাচ্ছে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি কোনও খেয়াল নেই। ভোরবেলা ঘুম ভাঙলো মনে হল আমার শরীরে কোনও কষ্ট নেই। কোনও যন্ত্রণা নেই , কোনও রোগ নেই। আমি সুস্থ। সম্পূর্ণ সুস্থ!’ পরের দিন সকালে নিজেই বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান গণিতজ্ঞ। সবাইকে অবাক করে হাঁটতেও শুরু করেন। এক রাতে কি এমন ম্যাজিক হল! এটা ভেবেই সবাই অবাক। সকালে চিকিৎসক আসেন। তাঁকে কেশবচন্দ্র নাগ বলেন , ‘ডাক্তারবাবু আমি সেরে গিয়েছি। আমি ভালো হয়ে গেছি।’ ডাক্তার অবাক। চিকিৎসক নিজেই তাঁকে বলেন , ‘ভগবানই তোমাকে বাঁচিয়েছেন’। ধীরে ধীরে বাড়ি থেকে অক্সিজেন সিলিন্ডার ফেরত গেলো! ক্রমেই সুস্থ হয়ে হয়ে ওঠেন গণিতজ্ঞ। সুস্থ হয়ে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলে বলেছিলেন , ‘আমার জীবনদাত্রী মা! কেমনে ভুলি করুণা তাঁর?’

!@#$%^&*()₩₹£€_/=÷×+!@#$%^&*()₩₹£€_/=÷

শুধুমাত্র ভক্তের নয়, বিপ্লবীদেরও মা

১৯০৯ সাল। আলিপুর বোমা মামলার রায় প্রকাশের পরে বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে নেমেছিল বিপ্লবীদের ঢল।সবাই মায়ের আশীর্বাদ চান। এ বিষয়ে ভগিনী নিবেদিতার লেখা থেকে পায়_____ সকল মহান জাতীয়তাবাদীই তাঁর চরণ ষ্পর্শ করে যেতেন।  স্বামী সারদানন্দ---- মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব যার ---- কাউকে ফিরিয়ে দিতেন না, যদিও তিনি জানতেন এ খুব ঝুঁকির কাজ । সারদা দেবীও বিপ্লবীদের সাহস নিয়ে গর্ব করতেন। আর বলতেন___ দোষ যদি কারও হয়, সে তো ওদের, ব্রিটিশের! অন্যায়ের প্রতিবাদি তিনি চিরদিনই,  ব্রিটিশের পরোয়া করতেন না। ১৯১৬ সালে বেলুড় মঠ রাজরোষে পরলে তিনি স্বামী সারদানন্দকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন-‐--- ঠাকুরের আশ্রয় পাওয়া সন্ন্যাসীদের তিনি কোনও ভাবেই ত্যাগ করতে পারবেন না। তারা মঠ থেকে বিতাড়িত হলে গাছতলায় থাকবে কিন্ত সত্যভঙ্গ করবে না। সারদা দেবী বড়লাটকে সব কথা বুঝিয়ে বলতে লোক পাঠালে বড়লাটের আদেশ উঠে যায়। 




উনিশ শতকের নারী, সব সময়ই অকালে থাকা মেয়ে। কিন্ত তাঁর সামাজিক সচেতনতা ছিল পূর্ণমাত্রয়। মেয়েরা প্রকৃত শিক্ষা পেয়ে নিজ আয়ে স্বাবলম্বী হয়ে বাচুক, এই ছিল দেবীর অন্তরের কামনা। এই বৈপ্লবিক আন্দোলনের পুরোধা হয়ে যিনি এসেছিলেন,  সেই নিবেদিতাকে প্রথম দর্শনে কন্যারুপে গ্রহন করেছিলেন আর "খুকি" বলে কাছে টেনেছিলেন। ঠিক রাজনৈতিক সচেতনতাও ছিল পূর্নমাত্রায়। তাঁর আশীর্বাদপ্রার্থী হয়েছেন সেকালের অনেক বিপ্লবী যারা কিনা পরবর্তীকালে তাঁর দীক্ষিত হয়েছেন। মানিকতলা বোমা মামলায় জড়িত দুই বিপ্লবী মঠে যোগ দেবেন _______ এই খবরে শ্রীরামকৃষ্ণের শিষ্যদের মধ্যেই অনেকে অমত করলেন।  সারদা দেবীর আদেশে সেই বাধা দূর হল। পরবর্তীকালে সেই দুজনেই হলেন  ------- স্বামী প্রঞ্জানন্দ ও স্বামী চিন্মায়ানন্দ।

১৯১৫ সাল। একবার পলাতক অবস্থায় বাগনান থেকে যাত্রাকালে যতীন্দ্রনাথ সেই ট্রেনে মায়ের উপস্থিতি জানতে পেরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেখা করেন তাঁর সাথে। একান্তে তাদের কথা হয়। পরে কেউ মাকে " কি কথা হল" জিজ্ঞাসা করলে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দেন " আগুন দেখলাম  "। এছাড়া বাঘা যতীনকে একান্ত প্রিয় সন্তানঞ্জানে তিনি একাধিক বার প্রাণ খুলে আশীর্বাদ করেছেন।

সশস্ত্র বিপ্লবে তিনি ছিলেন শঙ্কিতা। বিদেশী দ্রব্য পোড়ানো বা যে কোনো হিংসাত্মক ঘটনার বিরোধী ছিলেন তিনি। ক্ষুদিরামের ফাঁসিতে অন্তরে আহত হয়েছিলেন তিনি। তাই তিনি তার ছেলেদের জীবননাশের আশঙ্কায় আতঙ্কিত থাকতেন।  কোয়েলপাড়ার ছেলেদের  ও  অন্যদের চরকায় সুতো কাটা , তাঁত বোনার পরামর্শ দিতেন। মায়ের সমর্থনেই মুর্শিদাবাদের সারগাছি আশ্রম তরুন দেশসেবক ও রাজনৈতিক কর্মীদের তীর্থস্থান হয়ে উঠেছিল। 

মাতৃরুপই তাঁর সব পরিচয়। তাই তিনি বলেছিলেন  " আমি মা হয়ে কাউকে উচ্ছন্নে যেতে কি করে বলব, ইংরেজ কি আমার সন্তান নয়? আমি বলি, সকলের কল্যাণ হোক।"




<>[]<>[]<>[]<>[]<>[]<>[]<>[]<>[]<>[]<>[]<


মা  আমাদের  গর্ব   <:>

শ্রীমায়ের  জন্ম  হয়েছিল  ১৮৫৩ সালে ২২ ডিসেম্বর। 

 কি এমন করে গেলেন তিনি?  যাঁর জন্য আজও তাঁকে নিয়ে  আমরা  সবাই    গর্বিত  ।


আজ থেকে  প্রায়  পৌনে  দুশো  বছর  আগে জয়রামবাটিতে একজন হিন্দু ঘরের বিধবা  মুসলমান ছেলে আমজাদ আর শরৎকে (পরবর্তী কালে স্বামী সারদানন্দ, বেলুড় রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রথম সম্পাদক) পাশাপাশি মাটির বারান্দায় বসিয়ে নিজ হাতে খাবার পরিবেশন করছেন। খাওয়ার পর আমজাদের খাবারের উচ্ছিষ্ট নিজ হাতে পরিষ্কার করেছেন ।

ভাবা যায় এরকম  কথা   ?

বাড়ির একজন আপত্তি করলে বলেছেন  "সে কি বলছো? শরৎও  আমার ছেলে আমজাদও আমার ছেলে" ।

আজকালকার অতি আধুনিকা ক'জন মহিলা এ কাজ করতে পারবেন? ক'জন পুরুষই বা পারবেন এ কাজ করতে? 

বিদেশিনী খৃষ্টান সিস্টার নিবেদিতাকে নিজের পাশে বসিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিচ্ছেন। 
আদর করে চুমু খাচ্ছেন।  নাম দিয়েছেন" খুকু"।

স্বামীজিকে  আমেরিকা যাওয়ার অনুমতি তিনিই দিয়েছিলেন। সেই সময় যখন হিন্দু ধর্মে  কালাপানি পার হওয়া ধর্মবিরোধী ছিল।
 
ক' জন  এমন  আছেন   ?

নারী শিক্ষা  নিয়ে  ও  তিনি  অনেক  করেছেন  ।

নিবেদিতার বিখ্যাত বাগবাজার গার্লস হাইস্কুলের তিনি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করছেন।

মেয়ের বাবাদের বলেছেন  মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না তো কি হয়েছে? নিবেদিতার স্কুলে মেয়েদের ভর্তি করে দাও। লেখাপড়া শিখুক।  এত অল্পবয়েসে বিয়ে দিও না।

সেই আমলে এসব কাজ করছেন এক মহিলা! 
ভাবা যায়! 

ক' জন আছেন  রাজনীতি   দেশসেবা  নিয়ে   চিন্তা  ভাবনা  করতে   ।

বেলুড় মঠে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন। গোপনে আসতেন সেখানে স্বদেশী বিপ্লবী, অনুশীলন সমিতির সদস্যরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতেন।

ক'জনের নাম শুধু বলছি।

অরবিন্দ ঘোষ, বিপ্লবী বাঘা যতীন, অনুশীলন সমিতির প্রিয়নাথ, দাশগুপ্ত, বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ডক্টর প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ আরো কত স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রায়ই বেলুড় মঠে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসতেন।

মানিকতলা বোমা মামলার দুই মুক্তিপ্রাপ্ত আসামী দেবব্রত বসু ও শচীন্দ্রনাথ সেনকে তিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন।  তখন তিনি সংঘ জননী।  প্রধান ।

ইংরেজ আমলে কতটা  সাহস  দেশকে কত ভালবাসলে  এ কাজ করতে পারেন একজন মহিলা?

ইংরেজ সরকারের পুলিশ বেশ কয়েকবার বেলুড় মঠে রেড করেছে। সব ইতিহাস হয়ে আছে।
ক'জন আছেন?   সংস্কৃতি   ভাবনা  নিয়ে  চিন্তা  করতে  ?
সমাজের অবহেলিত মানুষদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন। ভালবাসতেন থিয়েটারের অভিনেতা  অভিনেত্রীদের।

তাঁর কাছে আসতেন  বিনোদিনী, তারাসুন্দরী প্রমুখ সেকালের সব বিখ্যাত অভিনেত্রীরা।

পতিতালয় থেকে ওরা থিয়েটারের জগতে এসেছিলেন কিন্তু তিনি তাঁদের বুকে টেনে নিয়েছিলেন।

আর  গিরিশ ঘোষকে তো খুবই ভালবাসতেন।  গিরিশের বাড়ি গেছেন।

ক'জন পারবেন সেই আমলে এসব কাজ করতে?

তাইতো তাঁর ছবির সামনে দাঁড়ালে শুধু মনে পড়ে  

" আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার চরণধূলার  তলে।"

VvvvvvvvvvvvvvvvvvvvvvvV


ঠাকুর বলতেন," ও সারদা --সরস্বতী -"
কিন্তু কে সারদা? ২২ ডিসেম্বর ১৮৫৩ - র রাত্রে রামচন্দ্র আর শ্যামাসুন্দরীর ঘর আলো করে যে কন্যা সন্তান জন্মাল তার নাম রাখা হল ক্ষেমঙ্করী। রাশ্যাশ্রিত নাম ঠাকুরমণি। সেখান থেকে ' সারদা ' হয়ে ওঠার পেছনে আছে অন্য এক দুঃখী মাকে শান্ত করার আকুতি। শ্যামা সুন্দরীর আগে তাঁর এক বোনের এক কন্যাসন্তান জন্মায় এবং অল্পদিন পরেই তার মৃত্যু হয়। সেই শিশুটির নাম দেওয়া হয়েছিল সারদা। শোকসন্তপা সেই মা শ্যামাসুন্দরীকে বললেন, " দিদি, তোর মেয়ের নামটি বদলে সারদা রাখ; তাহলে আমি মনে করবো আমার সারদা ই তোর কাছে এসেছে ....।" সেই থেকে ক্ষেমঙ্করীর নাম বদলে হল সারদা মণি।" বাবা মায়ের আদরের  সারু , সারি, সারদা।
 
                         ***