Wednesday, 14 December 2022

শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথা

 




ঠাকুরের জন্ম,  অজ ( অর্থ:- ঈশ্বর/ ব্রহ্মা/শিব/বিষ্ণু ) হলেও,  মাতৃগর্ভে চন্দ্রমণির পুত্ররুপে ১৮৩৬ সালে ১৮ই ফেব্রুয়ারি। আর পিতা ক্ষুদিরাম।  সকলের নয়নের মণি। ১৮৫৩ সালে দাদা রামকুমারের সঙ্গে (তখন বয়স  ১৭ বছর ) কলকাতায় এলেন।  ১৮৫৫ সালে দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়ীর প্রতিষ্ঠা।  প্রথম পূজক রামকুমার,  পরে গদাধর।  ১৮৫৫ -- ১৮৮৫  আগষ্ট পর্যন্ত,  অর্থাৎ ৩০ বছর দক্ষিণেশ্বরে  থাকা।  ১৮৮৫ এর সেপ্টেম্বরে শ্যামপুকুরে , ১৮৮৫ এর ডিসেম্বরে কাশীপুরে  আর ১৮৮৬ এর ১৬ই আগষ্ট মহাপ্রয়ান।

নরেন্দ্রের সাথে প্রথম দেখা ১৮৮১ নভেম্বর,  তখন তার বয়স ১৮ বছর। একসঙ্গে থাকা ১৬ই আগষ্ট,  ১৮৮৬ পর্যন্ত.... মাত্র  ৪ বছর ৯ মাস। গুরু শিষ্যের সম্মিলিত জীবনধারার ব্যাপ্তি মাত্র ২৩ বছর, অর্থাৎ এঁরা পৃথিবীতে একসময়ে ছিলেন  ১৮৮৬ পর্যন্ত  [১৮৬৩ -- ১৮৮৬]। নরেন্দ্রনাথ একা ছিলেন ১৮৮৬ থেকে ১৯০২, মাত্র  ১৬ বছর। এই ১৬ বছরই ঠাকুরের দেওয়া কাজে নিজেকে নিযুক্ত রেখেছিলেন। 

দেহত্যাগের কয়েকদিন আগে থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতি সন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথকে নিজের কাছে ডেকে দরজা বন্ধ করে দুই-তিন ঘন্টা ধরে ভবিষ্যতে  তাঁকে কী কী করতে হবে, সে সম্বন্ধে  নানা উপদেশ দিতেন। তারপর মহাসমাধির আর মাত্র তিন-চার দিন বাকি আছে, তখন তিনি  নরেন্দ্রনাথকে ডেকে তাঁর মধ্যে শক্তিসঞ্চার করলেন।  নরেন্দ্রনাথ বাহ্যসংঞ্জা হারালেন।  বোধহয় সমাধিস্হ হয়ে পরেছিলেন।  তারপর যখন বাহ্যসংঞ্জা ফিরল, তখন ঠাকুর তাঁকে বললেন  :: " আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম। তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি। কাজ শেষ হলে ফিরে যাবি।" দেহত্যাগের যখন দুদিন মাত্র বাকি, ঠাকুর আবার ডাকলেন নরেন্দ্রনাথকে। তাঁর ভাবী সন্ন্যাসী শিষ্যদের সামনেই ঠাকুর স্পষ্টভাবে নরেন্দ্রনাথকে বললেন,  তাঁর অবর্তমানে তাঁদের দায়িত্ব নিতে। বললেন  : " দেখ নরেন,  তোর হাতে এদের সকলকে দিয়ে যাচ্ছি। কারণ তুই সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী।  এদের খুব ভালবেসে , যাতে আর ঘরে ফিরে না গিয়ে একস্থানে থেকে খুব সাধনভজনে মন দেয়, তার ব্যবস্থা করবি। " এইভাবে ষ্পষ্টভাবে ঠাকুর সঙ্ঘ গড়ে দিয়ে গেলেন, সঙ্ঘনেতাকেও  নির্দিষ্ট করে দিয়ে গেলেন এবং তা তিনি করলেন সঙ্ঘনেতা ও তাঁর রত্ন-সদৃশ সহকারীদের সামনে।  তাই বলা যেতে পারে স্বামী বিবেকানন্দকে তিনি স্বয়ং আমাদের দিয়েছেন।  এতবড় দানের তুলনা নেই।  এ দান না পেলে সব নিয়েও আমরা নি:স্ব থাকতাম।  আর বিবেকানন্দ দিলেন আমাদের এক নতুন পৃথিবী -- যা কিনা রামকৃষ্ণের ছাঁচে গড়া পৃথিবী। 

ঠাকুরের সাধন পর্বগুলো ছিল  এইরকম ::

প্রথম পর্ব   $$ ১৮৫৫ - ১৮৫৯ :: দক্ষিণেশ্বরে  ১২ বছর : ১৮৫৫ থেকে ১৮৬৭______ সাধনার প্রকৃতি ছিল--- রাগানুরাগভক্তি এবং দিব্যোন্মাদভাব। এই সাধনা শাস্ত্রনির্দেশ মেনে হয়নি। মনই ছিল তাঁর গুরু ; অষ্টপাশ ক্রম --- ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, মান, কুল, শীল, জাতি, অভিমান ---- এসব থেকে মুক্ত হওয়া। এভাবে একমাত্র ব্যাকুলতা সহায়ক সব দর্শনার্থীদের হয় এবং তাঁর বাহ্যপূজাও ত্যাগ হয়।

দ্বিতীয় পর্ব   $$  ১৮৫৯  -- ১৮৬২ :  এই সময়ে  শেষ দু-বছরে গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণীর নির্দেশে গোকুলব্রত থেকে আরম্ভ করে ৬৪ প্রকার তন্ত্র সাধনার অনুষ্ঠান। 

ভৈরবী ব্রাহ্মণী যখন এলেন তখন দিব্যোন্মাদ অবস্থা। তিনি বুঝলেন , এসব মহাভাবের লক্ষণ, রাধারানী বা চৈতন্যদেবের হয়েছিল।  গুরু তাকে পরম্পরা শাস্ত্রনির্দিষ্ট পথে গেলেন। তন্ত্রসাধানার স্থান হয়েছিল বেলতলায়। পঞ্চমুন্ডির আসন হলো।  বিষ্ঞুক্রান্তায় প্রচলিত ৬৪টি কলা তন্ত্রে যত সাধন আছে সব কটি করেছেন। কী কঠিন এবং রোমাঞ্চকর সে সব আচার। সুন্দরী যুবতীর পূজা, তার কোলে বসে সমাধিস্হ,  মড়ার খুলিতে মাছ রেঁধে ভোগ দিয়ে তা খাওয়া, কাচা নরমাংস চন্ডিকামূর্তি ধরে খাওয়া, আনন্দাসনে নর-নারীর সম্ভ্রান্ত দর্শন করে সমাধিস্হ হওয়া।  শিব-শক্তির বিলাস দেখা এবং সিদ্ধ হওয়া। বীরভাবের পূজা, সবেতেই সিদ্ধি, সর্বত্র মাতৃভাবের উদয় এবং সমাধিস্হ হওয়া।

 তৃতীয়  পর্ব   $$ ১৮৬৩ --১৮৬৬ ( চার বছর ) : [১] রামায়েত সাধুর থেকে রামমন্ত্র  নিয়ে ভারতে বৈষ্নসন্মত তন্ত্রোক্ত সাধনার ( ৬৪ প্রকার  ) সিদ্ধ হন। [২] আচার্য তোতাপুরীর কাছ থেকে সন্ন্যাস নিয়ে তিনদিন নির্বিকল্প সমাধিমগ্ন হন। [৩] সুফি গোবিন্দ রায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে ইসলাম ধর্মের সাধনা করেন। হজরত মোহম্মদজীর দর্শন লাভ করেন।  [৪] শ্রীশ্রী মাকে ফলহারিনী কালীপুজোর দিন দেবীঞ্জানে ষোড়শী পূজা করেন। এখানেই সাধন-যঞ্জ পূর্ণ হয়।

এমনটি যে একজনক কারুর জীবনে হতে পারে তা অবিশ্বাস্য।  তিনি হাজার হাজার বছরের বহু সাধকের,  সিদ্ধের এবং অবতারের সাধনা এই  ১২ বছরে শেষ  করেন।  

@ বাৎসল্য, মধুরভাবের সাধনা @  জটাধারীর (১৮৬৩-৬৪) রামলালা রয়ে গেলেন তাঁর কাছে, দাস্যভাব -- -- হনুমানজীর সাধনা। দিনরাত 'রঘুবীর ' বলে হাঁক দিবেন। পিছনে কাপড়ের জড়িয়ে বাঁশ ঘাড়ে করে বেড়াচ্ছেন লম্বা লম্বা পা ফেলে। কারোর দিকে দৃষ্টি নেই । মেরুদণ্ডের শেষ ভাগ বেড়ে গেল। ঠিক ল্যাজের মতন। দু:খানি সীতারাম দর্শন পেলেন। পায়ের কাছে হনুমান এসে বসল এবং জানিয়ে দিল। বলছেন, প্রথমেই সীতাকে দেখেছিলাম।  তাই দু:খের জীবন কাটল।

@ মধুরভাব সাধনের  সময় মেয়ের বেশ পরে থাকতেন, ঘেরা, কাকল, বারাণসী শাড়ি। কৃষ্ণবিরহে শরীরের লোমকূপ দিয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত বের হতো। শ্রীমতী রাধারানী কৃপা করে দেখা দিয়ে দেহে বিলীন হন। সব আশ্চর্য সাধনা, সিদ্ধি তাঁর। 

@ ইসলাম সাধন :: গোবিন্দ রায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে আল্লা মন্ত্র জপ করতেন ত্রিসন্ধ্যা। নামাজ পড়তেন। তিনদিনই মোহাম্মদের দেখা পান। হিন্দু সংস্কার মুছে গিয়েছিলো মন থেকে। 

@ খ্রিষ্টধর্ম সাধন :: দক্ষিণেশ্বর কাছেই যদি মল্লিকের বাগানবাড়িতে বৈঠকখানায় মা মেরীর কোলে যিশুকে দেখে অভিভূত হন। খ্রিস্টের অঙ্গ থেকে জ্যোতি এসে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে। তিনদিন এভাবেই মুগ্ধ ছিলেন। মাকে মন্দিরে দেখতে যাননি। তিনদিন পর পঞ্চবটীতে বেড়াতে গিয়ে দেখলেন এক সুন্দর দেবমানব তাঁর কাছে এসে আলিঙ্গন করে শরীরে লীন হয়ে গেলেন। ঠাকুর বুঝলেন,  ইনিই ঈশামসি যিশু।

@ বেদান্ত সাধন :: মন্দিরে মায়ের আদেশ নিয়ে এসে গুরু তোতাপুরীজীর নির্দেশে সাধন হলো। সন্ন্যাস নিতে হবে। গুরুপদে তোতাপুরীজিকে বরণ করলেন। বিরাজ হোম হলো। আহুতি শেষ হলো। কৌপিন পরিধান।  সম্ভবত নাম হয় এসমই শ্রীরামকৃষ্ণ। মায়ের রূপ এল মনে। বারংবার তাই হচ্ছে, ঞ্জানখড়্গ দিয়ে কেটে দিলেন মাকে, গুরুর নির্দেশ।  সমাধিস্হ হলেন______ তিনদিন তালাবন্ধ হয়ে থাকলেন। শেষে ওঁকার ধ্বনিতে জাগ্রত হন। এবার ষোড়শীপূজাতে নিজ স্ত্রীকে শাস্ত্রমতে ফলহারিণী কালীরূপে পূজো এবং জপমালাসহ ফল সমার্থক করলেন।  এরপর থেকে আর সাধনা নেই। 

জগৎ সমস্যার সমাধানের একমাত্র দিশারী তিনি। তাঁকে যত জানা যাবে ততই মঙ্গল।  শিবঞ্জানে জীব সেবা প্রচলন করলেন তিনি।  ভবিষ্যতের মানুষের জন্য দেশকালোত্তীর্ণ ধর্মীয় তত্ত্বের আলোক বিকিরণ করলেন। সব ধর্মের সাধন করে তাদের ধর্মের বৈধতা সম্পাদনও করলেন। উপদেশ দিলেন যে সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। সবাইকে সন্মান দিতে হবে। কেউ বড় নয়, কেউ আবার ছোট নয়।

যত মত তত পথ প্রচারে তিনি সবাইকে বললেন......... {১} যে ধর্মীয় পরিবেশে যে জন্মেছে, সেই পরিবেশের সে অনায়াসে ঈশ্বর লাভ করবে। শুধু দরকার ব্যাকুলতা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা। তাহলেই নিজ নিজ ধর্ম ঠিক ধর্ম। {২} দ্বৈত-বিশিষ্টাদ্বৈত-অদ্বৈত পরস্পর বিরোধী নয়। {৩} অদ্বৈতই শেষ কথা। {৪} মন-বুদ্ধি সহায়ে বিশিষ্টদৈত পর্যন্ত বলা যায়। তখন নিত্য আর লীলা দুই-ই সত্য। {৫} বিষয়বস্তু মানুষের জন্য দ্বৈতভাব।....... তাই আজ রামকৃষ্ণ মিশনই যত মত ততপথ প্রচারের জন্য একটি সম্প্রদায়-বর্জিত সম্প্রদায় হয়ে উঠেছে। যেটা কিনা খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। অসংখ্য মানুষ এই দলে আসবে ধর্ম লাভ করতে। ঠাকুরের যোগাবস্থার মূর্তি সবাই পূজা করবেন------- ঘরে ঘরে , প্রতি ঘরেই তিনি পূজ্য হবেন। সে ব্যবস্থাও তিনি করে গেছেন, আমরা সবাই উপলক্ষ্য মাত্র।

ধর্মরাজ্যে সব মতকে সন্মান দেওয়া প্রয়োজন।  কেননা সব ধর্মের সত্যান্বেষনে রত। চরম সত্যেরই বিভিন্ন প্রকাশ।তাই  তাদের সকলেরই মূল্য অপরিসীম।  আর ব্যবহারিক ক্ষেত্রে , দৈনন্দিন জীবনে শিবঞ্জানে জীব সেবার মাধ্যমে সর্বজনীন ধর্মের রূপটি পরিষ্কার হয়। সব ধর্মকে সত্য বলা হলো , আবার প্রতিটি ধর্মের অনুগামীদের শিবরূপে সেবা করলে বিশ্বে শান্তি, কল্যাণ,  সৌন্দর্য সহজেই প্রতিষ্ঠিত হয়।

স্বামী বিবেকানন্দ পূর্বাভাস করে গিয়েছিলেন যে, অচিরেই ভারতবর্ষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবর হয়ে উঠছে। এদেশ জেগে উঠছে। পৃথিবীর কোনো শক্তিই একে থামাতে পারবে না। ভারতবর্ষ থেকে শ্রীরামকৃষ্ণরূপ যে শক্তি বেলুড় মঠকে কেন্দ্র করে উত্থিত -------- তা সমগ্র পৃথিবী প্লাবিত করে সকল মানুষের জীবনে শান্তি ও ঐক্যসাধন করবে। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রদর্শিত মানুষের মাঝে ভগবানের সেবা করার যে শিক্ষা  ____ তার প্রতি নিজেদের সঁপে দিতে বহু শত যুবমানুষ ...... কী মহিলা, কী পুরুষ, কী গৃহী, কী সংসারত্যাগী ....... সবাইকেই ভারতবর্ষে দেখা যায়। বেশ প্রতিভাশীল, অবস্থাসম্পন্ন,  যুব, নারী  ও পুরুষ  ঈশ্বরঞ্জানে মানুষকে  সেবা করতেও দেখা যায়।



২১শে সেপ্টেম্বর।  সেই বিশেষ দিন, যেদিন ঠাকুরের প্রথম ছবিটি তোলা হয়েছিল। আজও যে ছবি অনেকের বাড়িতেই পুজো হয়।এমনিতে ঠাকুর নিজের ছবি তোলা একদমই পছন্দ করতেন না। সেই দিনটা ছিল ২১শে সেপ্টেম্বর, ১৮৭৯। ঠাকুরের অন্যতম ভক্ত ব্রাহ্মনেতা কেশব সেনের গৃহ "কমল কুটির" (বর্তমান ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশন, ৭২, আপার সারকুলার রোড, কলকাতা)-এ কীর্তনের আসরে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হন। ঠাকুর সমাধিস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে তাঁকে পেছন থেকে ধরে রাখেন ভাগ্নে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়, যেন তিনি পড়ে না যান। এরূপ অবস্থায় ব্রাহ্মভক্ত বেষ্টিত সমাধিস্থ ঠাকুরের এই ফটোটি তোলা হয়। দি বেঙ্গল ফটোগ্রাফারস্, ১৯/৮, বৌ বাজার স্ট্রিট, কলকাতা— এই ফটো সংস্থাই ঠাকুরের উক্ত ছবিটি তোলেন।কিন্তু এই ছবির রহস্য কি! আসলে ঠাকুর দাঁড়িয়ে রয়েছেন মৃগ মুদ্রা তে। ছবিটিতে দেখাযায় ঠাকুরের দুই হাতের এক অনন্য ভঙ্গী। পরে তাঁর শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দ এরপর লেখা থেকে জানা যায়, ঠাকুর এর উর্ধমুখী ডান হাত আসলে বোঝাই পরমাত্মা কে এবং বাম হাত টি বোঝাই এ বিশ্ব সংসার কে। এর অর্থ  এ জগতের সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী, সবাই পর, সবাইকেই অবশেষে মিলতে হবে পরমাত্মা তে, কেউ এ ব্রহ্মান্ডের কিছুই নিয়ে যেতে পারবেনা ।  


শ্রী রামকৃষ্ণ ও বামাক্ষ্যাপার মহামিলন -‐-------‐--------------------------------------


বামাক্ষ্যাপা একবার কলকাতায় এসেছিলেন। সেবার তিনি কালীঘাটে যান মা কালীকে দর্শন করতে। মন্দিরে যাওয়ার আগে শ্মশানঘাটে পাশের আখড়ায় গাঁজা খেয়ে বামাক্ষ্যাপা আদিগঙ্গায় স্নান করতে গেলেন৷

আদিগঙ্গায় স্নান করে তিনি এসে দাঁড়ালেন মায়ের মূর্তির সামনে। বললেন, 'চল মা, তোকে আমি তারামার কাছে নিয়ে যাব।' একথা বলে যেই তিনি মূর্তি স্পর্শ করতে যাবেন, তখনই উপস্থিত ব্রাহ্মণরা বাধা দিয়ে উঠলেন। বললেন, বাইরের কাউকে তাঁরা দেবীমূর্তি স্পর্শ করতে দেবেন না। এতে বামাক্ষ্যাপার খুব কষ্ট হল। শিশুর মতো অভিমান করে বলে উঠলেন, চাই না আমি মা কালীকে। অমন রাক্ষুসে রূপ। এর থেকে আমার তারামা ভালো। আহা, আমার তারা মায়ের রূপের কী বাহার। একথা বলে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে গেলেন।

এর পরে অন্যান্যরা যখন ভুল বুঝতে পেরে তাঁর কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে বললে, ঠাকুর আপনি ফিরে চলুন। আমাদের ভুল হয়েছে। আপনি মূর্তি স্পর্শ করতে পারবেন। কিন্তু তিনি আর স্পর্শ করলেন না মায়ের পাষাণ বিগ্রহ। ধীর স্থির শান্ত অচঞ্চল পদক্ষেপে বেরিয়ে এলেন মন্দির থেকে।

ক্ষোভে দুঃখে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসার সময় দেখা হয় যুগাবতার ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সঙ্গে। তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছেন এদিকে রামকৃষ্ণ দেব মন্দিরে ঢুকছেন৷ দুই মহামানবের আলিঙ্গন হয়৷

রামকৃষ্ণ দেব বামাক্ষ্যাপার অমন ক্রুদ্ধ মুখ দেখে বললেন, 'চলো শ্যাম নগরে আমার আরেক মা আছে তার সঙ্গে দেখা করে আসি।' বামাক্ষ্যাপা কোন আপত্তি না করে চললেন রামকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে শ্যামনগরে মা কালীকে দেখতে। রামকৃষ্ণ দেব বামাক্ষ্যাপাকে নিয়ে আদিগঙ্গা দিয়ে নৌকায় চাপিয়ে বামাক্ষ্যাপাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শ্যামনগর ''মূলিজোড় কালী মা '' দর্শন করতে৷


যে মা একসময় গঙ্গায় নৌকায় বেয়ে যাওয়া রামপ্রসাদ সেনের গান শুনতে চেয়েছিলেন৷ রামপ্রসাদ মাকে বলেছিলেন, "তোর যদি গান শুনবার ইচ্ছা হয় তো তুই ঘুরে শোন — আমার আজ কাজ আছে, দাঁড়িয়ে (থেমে) তোকে গান শোনাতে পারব না৷" ভক্তের গান শোনার জন্য মা — মন্দির সমেত দক্ষিন থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে গিয়েছিলেন৷ আজও সেই মন্দির বর্তমান৷ মন্দিরে কৃষ্ণকালী মূর্তি আছে৷ পৌষ মাসে জোড়া মূলা দিয়ে পূজা দিতে হয় সেই জন্য "মূলাজোড় কালী বাড়ী" নামে খ্যাত৷


মাকে দেখে বামাক্ষ্যাপা পরম শান্তি লাভ করেছিলেন৷ মায়ের অমন দিব্য সৌম্য রূপ দেখে বামাক্ষ্যাপা শান্ত হয়ে গেলেন। শ্যামনগরে গঙ্গায় স্নান করে বামাক্ষ্যাপা ওই রাত্রে নিজে মায়ের পূজাও করেছিলেন৷

শ্যামনগরের কালীবাড়িতে পূজা করে তারপর সেখান থেকে আবার রামকৃষ্ণ দেব ও বামাক্ষ্যাপা নৌকায় করে এসে বামাক্ষ্যাপাকে হাওড়া ষ্টেশনে ছেড়ে যান এবং নৌকায় রামকৃষ্ণদেব দক্ষিণেশ্বরে চলে যান৷ বামাক্ষ্যাপা ফিরে যান তার তারা মায়ের কোলে তারাপীঠে।

*ইতিহাসের ছাত্রের চোখে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব*

----------------------------------------‐----------------------

ধার্মিকের চোখে শ্রীরামকৃষ্ণ অবতার। তিনি মুক্তির পথ। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্রের কাছে তিনি বহুরূপে অবস্থান করবেন। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর এক আশ্চর্য মানুষ। হ্যাঁ, মানুষ। এমন একজন মানুষ, যাঁকে অনুসরণ করলে মানব সভ্যতার উত্তরণ হয়। বিদ্যাসাগর ছিলেন চরম নাস্তিক। তাই তিনি সে যুগে দাঁড়িয়েও বলতে পেরেছিলেন, "আমি লোকাচারের দাস নই"। বিদ্যাসাগর কোনোদিন মন্দির মসজিদ গীর্জায় যাননি। ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর মনের ভাব জিজ্ঞেস করায় বিদ্যাসাগর স্পষ্ট বলেছিলেন, তাঁকে জানার মতন সময় আমার হাতে নেই।বিদ্যাসাগর প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, মানুষের সেবা করে, মানুষকে ভালোবেসেই স্বয়ং 'ঈশ্বর' হয়ে ওঠা যায়। 

শ্রীরামকৃষ্ণ আবার প্রবল ধার্মিক। জমিদার বাড়ির পুরোহিত তিনি। নিয়মিত মায়ের পুজো করেন। এমন একজন মানুষ কিনা ইতিহাসের ছাত্রের চোখে এক মহান বিপ্লবী, সমাজ সংস্কারক রূপে ধরা দেন। তাঁর কাছে ধর্ম তো কোনোদিন আচারসর্বস্ব ছিল না। মন্দিরে বসেই কিনা তিনি পরম মমতায় ভেঙে দিয়েছিলেন ধর্মে ধর্মে বিভেদের খড়ির গণ্ডি। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাই তিনিই বলতে পেরেছিলেন ‘যত মত তত পথ’। সেই যুগে এর মতন অত্যাশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে! শুধু তাই নয়, প্রচলিত হিন্দু ধর্মের ভেতরে থেকেই তিনি তাঁর মতন করে মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছেন। পাঁচওয়াক্ত নমাজ রাখছেন। শুধু মুসলিম ধর্ম নয়, খ্রীস্ট ধর্ম সহ আরো অনেক ধর্মেই উপাসনা করছেন। অতএব, সে অর্থে তিনি বিপ্লবী। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই এ এক ভয়ঙ্কর নিঃশব্দ বিপ্লব। শুধু তাই নয়, অন্য ধর্মে উপাসনা করতে গিয়ে তিনি আরো যেসব কান্ড করছেন, তাতে সমকালীন সমাজ শিউরে উঠছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে তিনি হয়ে উঠছেন সংস্কারক। 

যাঁর হৃদয়ে অফুরান মানবপ্রেম, তিনি মানুষের হিতে নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করতেও তৈরি ছিলেন।

ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে একটি ঘটনার কথা শুনিয়ে এই 'সর্বস্ব ত্যাগ'এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চাই। 

সেটা ছিলো ১৮৬৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। জমিদার মথুরামোহনের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণও চলেছেন রাণাঘাটের কলাইঘাটায়। নদী পথে চলেছে তাঁদের বজরা। মথুরামোহন শুনেছেন, কলাইঘাটায় তাঁর জমিদারি'র প্রজারা খাজনা দিচ্ছে না। প্রজাদের বক্তব্য, দুর্ভিক্ষের কারণে তাঁদের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে, খাজনা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রজারা খাজনা মকুব করার জন্য জমিদারের কাছে এসেছেন দরবার করতে। মথুরবাবু দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জমিদার। তিনি তো খাজনা মকুব করবেনই না। উপরন্তু প্রজাদের উপর বেশ হম্বিতম্বিও শুরু করেছেন।

ঠাকুর আপনজগতেই ছিলেন। গুনগুন করে গান গাইছেন। প্রকৃতির শোভা দেখছেন। হঠাৎ তাঁর কানে এলো মথুরামোহনের সঙ্গে প্রজাদের কথোপকথন। এবার ভালো করে প্রজাদের দেখলেন তিনি। ওদের কঙ্কালসার চেহারা জানান দিচ্ছে বড় অসহায় ওরা। তিনি মথুরবাবু কে প্রশ্ন করলেন- "ওরা কারা?"

মথুরবাবু উত্তর দিলেন," ওরাই আমার প্রজা।" 

ঠাকুরের ঘোর যেন কেটে গেল। মথুরবাবুকে বেশ জোরের সঙ্গে বললেন," যারা নিজেরা খেতে পারেনা, তাদের কাছ থেকে তুমি এভাবে খাজনা আদায় করবে!" 

মথুরবাবু যথারীতি কঠোর," এসব তুমি বুঝবে না ঠাকুর। অবস্থা যেমনই হোক, জমিদারকে খাজনা তো দিতেই হবে।"

এরপর ঠাকুর যা বললেন, তার জন্য মথুরামোহন প্রস্তুত ছিলেন না। ঠাকুর বললেন," এই ক্ষুধার্ত মানুষের পয়সা দিয়ে তুমি মা ভবতারিণী'র পুজো করবে! সে পুজোয় আমি থাকবো না। আমি আর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাবোনা।"

এ এক অদ্ভুত সত্যাগ্রহ। অচেনা অজানা মানুষের জন্য দক্ষিণেশ্বরের প্রধান পুরোহিত বলছেন, মন্দিরে  আর মায়ের পুজো করবেনই না! 

সেদিন মথুরামোহন অনেক অনুনয় বিনয় করে ঠাকুর কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে প্রজাদের খাজনা মকুব করা যায় না। ঠাকুর গোঁ ধরলেন, শুধু খাজনা মকুব করা নয়, এই দুর্দিনে প্রজাদের অর্থ সাহায্যও করতে হবে। এর অন্যথা হলে, তিনি আর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাবেন না। সেদিন, শ্রীরামকৃষ্ণ'র জেদের কাছে হার মেনেছিলেন জমিদার মথুরামোহন। কলাইঘাটার প্রজাদের খাজনা মকুব তো করলেনই, উপরন্তু তাদের জন্য অর্থ সাহায্যও করলেন।

ইতিহাস জানে, এমন ঘটনা একবার নয়, একাধিকবার ঘটেছে। বারবার ঘটেছে। মথুরামোহনের সঙ্গে কাশী বৃন্দাবন দর্শন করতে গিয়ে সেবার দেওঘরে দরিদ্র সাঁওতাল পল্লীতে গিয়ে ঠাকুর দেখলেন অন্নাভাবে দিন কাটছে তাদের। এই মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে ঠাকুর বলেছিলেন, ও সব তীর্থযাত্রা আমার জন্য নয়। আমি কোনো মন্দিরেই যাবো না। আমি রইলাম এখানে বসে। 

মথুরবাবু বোঝান, এদের অন্নকষ্ট দূর করার মতন অর্থ তো তাঁর কাছে নেই। ঠাকুর বলেন, তাহলে তিনিও আর তীর্থে যাবেন না। অতঃপর মথুরামোহন কলকাতায় লোক পাঠিয়ে দেওঘরের সেই অঞ্চলের মানুষের জন্য ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। ওরা যখন পাত পেড়ে খাচ্ছে, ঠাকুর তখন আনন্দে নৃত্য করছেন আর বলছেন, এই হল আমার আসল তীর্থ। 

ইতিহাসের ছাত্রের কাছে এই মানুষ তাই সাধারণ ধর্ম প্রচারক নন, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত নন।  মানব সভ্যতার উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। যাঁর সাধনক্ষেত্রের মূলেই ছিলো মানুষ। মানবপ্রেমেই মানুষের উত্তরণ ঘটে। 

তাই তিনি মহামানব। 

আধুনিক মানব সভ্যতার মুক্তির দূত, শ্রীরামকৃষ্ণ।

&****&****&****&****&****&****&****


“চৈতন্যদেবের কৃষ্ণনামে অশ্রু পড়ত। ঈশ্বরই বস্তু, আর সব অবস্তু। মানুষ মনে করলে ঈশ্বরলাভ করতে পারে। কিন্তু কামিনী-কাঞ্চন ভোগ করতেই মত্ত। মাথায় মাণিক রয়েছে তবু সাপ ব্যাঙ খেয়ে মরে।

“ভক্তিই সার। ঈশ্বরকে বিচার করে কে জানতে পারবে। আমার দরকার ভক্তি। তাঁর অনন্ত ঐশ্বর্য অত জানবার আমার কি দরকার? এক বোতল মদে যদি মাতাল হই শুঁড়ির দোকানে কত মন মদ আছে, সে খবরে আমার কি দরকার? একঘটি জলে আমার তৃষ্ণার শান্তি হতে পারে; পৃথিবীতে কত জল আছে, সে খবরে আমার প্রয়োজন নাই।” 



 

 



Saturday, 10 December 2022

সন্ন্যাসী ও রাজা

 

$$ সন্ন্যাসী ও রাজার  অপ্রকাশিত বন্ধন ##


পরিব্রাজক বেশে স্বামীজির প্রথম ছবি

মহারাজ অজিত সিংহ 


বর্হিবঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের কর্মকান্ডের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল রাজস্থানর খেত্রী। তাঁর জীবনের এক অমোঘ শীর্ষ বিন্দুর সূচনা হয়েছিল এখানে। এই ক্ষুদ্র এলাকাটিতে পরিব্রাজক জীবনের সব থেকে বেশি সময় কাটিয়েছিলেন। শিকাগো ধর্মসভায় যোগদানের উদ্যোগ, রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপনের ভাবনার অঙ্কুরোদ্গম, মায়ের প্রতি গুরু দায়িত্ব পালন,  সবকিছুতেই স্বামীজি পাশে পেয়েছিলেন খেতরির মহারাজাকে। মহারাজের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকারে তাঁর বক্তব্য এই সত্যকে সমর্থন করে ........ " আমি ভারতের জন্য সামান্যতম যা কিছু করেছি তা সম্ভব হত না , যদি মহারাজ অজিত সিংহের সাথে দেখা না হত।  অজিত সিংহ ও আমি ------- আমরা দুই আত্মা পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করে মানব কল্যাণের মতো মহৎ কাজ করবার জন্যই  জন্মগ্রহণ করেছি। আমি তাকে ভাল না বেসে পারি না ___ তিনিও তাই। এ পূর্বজন্মের সুকৃতি। আমরা একজন আরেকজনের পরিপূরক। ওই মানুষটির মধ্যে যে শক্তি লুকিয়ে আছে তা এখনও সম্পূর্ণ উপলব্ধি করতে পারিনি। প্রভু তা আমাকে দেখিয়েছেন। " তাঁর মৃত্যুর পর স্বামীজি লিখেছিলেন  " আমি কখনও তাঁর অনুগ্রহের ঋণ শোধ করতে পারব না। আমার বিচার ধারার প্রতিটি শব্দ তিনি নি:স্বার্থ পরিশ্রমে লিখে রেখেছেন। " তাই মনে হয় বিবেকানন্দ চর্চার পরিধি মধ্যে মহান পুরুষ খেতরির মহারাজ অজিত সিংহের  আলোচনা বাদ দিলে স্বামীজি চর্চায় কিছুটা ফাক থেকে যায়।

শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির 

দূর থেকে গোটা রাজপ্রসাদ 

রামকৃষ্ণ মিশনের সন্মুখভাগ 


প্রদীপের আলো পেতে হলে প্রয়োজন প্রদীপের আগুন আর তেল। স্বামীজির নিজের মধ্যেই ছিল আগুন ----- আর প্রদীপ হলেন মহারাজ অজিত সিংহ।  যাঁর সান্নিধ্য , যাঁর জীবনের প্ররণা স্বামীজির জীবনকে এক আশ্চর্য উদভাসন দিয়েছিল।  স্বামীজিও শেষ পর্যন্ত নির্ভর করেছিলেন মহারাজের বিস্তৃত পরিসরে। 

পাহাড়ের কোলে সূর্য্যাস্ত

প্রাচীরের দেওয়ালে বিভিন্ন ফলক

বাগান ও কৃত্রিম ঝর্না


১৮৮৮ সালে পরিব্রাজক রুপে স্বামীজি বেরিয়ে পড়েছিলেন ভারত ভ্রমণের জন্য।  লক্ষ্য..... মানুষের ঈশ্বরকে দেখার জন্য,  চেনার জন্য।  দীর্ঘ আড়াই বছর বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমনের পর দিল্লীর ঐতিহাসিক স্থানগুলি দেখে তিনি চলে যান ঐতিহাসিক আলোয়ারে। সেখান থেকে যান জয়পুরে।  সেখানে এক সংস্কৃত পণ্ডিতের কাছে অধ্যায়ন করেন পানিনির অষ্টাধ্যায়ী।  তারপরের গন্তব্য ছিল আজমীর। সেখানকার বিখ্যাত দরগা  ও আকবরের প্রাসাদ দেখে তিনি চলে যান মাউন্ট আবুতে। সেখানেই মুখোমুখি হয়েছিলেন বিশ্ববরেণ্য এই  সন্ন্যাসী এক মহারাজের সাথে। সেদিন সেই মহারাজ মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন সেই তরুণ সন্ন্যাসীর পবিত্র তেজদীপ্ত রুপে, সম্যক ত্যাগ , অনন্ত ঞ্জানের গভীরতায় এবং অন্তলীন দার্শনিকতার অসীমতায়। সেই  মহারাজা হলেন রাজস্থানের একটি রাজ্য খেতরীর মহারাজা অজিতেন্দ্রিয় সিংহ।  তাঁর আমন্ত্রণে বিবেকানন্দ খেতরিতে আসেন।  খেতরিতেই পন্ডিত নারায়ণদাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় এবং পানিনির সূত্রের মহাকাব্য অধ্যায়ন করেন। খেতড়িতে আড়াই মাস কাটানোর পর আবার রাজস্থানের অন্য শহরে এবং মহারাষ্ট্রের উদ্দেশ্য রওনা হন।


অজিত-বিবেক মিউজিয়াম

মিশনের বর্তমান প্রবেশ পথ

ছাদ থেকে পাহাড়ের বিস্তীর্ণ পরিসীমা

বিবেকানন্দ তিনবার খেতড়ি গিয়েছিলেন।  শিকাগো যাবার আগে ১৮৯১ ও ১৮৯৩ সালে। শিকাগো থেকে ফেরার পর ১৮৯৭ সালে রাজার উদ্যোগে খেতরীতে তাঁর সম্বর্ধনায়। তিন দফায় মোট ছিলেন ১২১ দিন। আর তার প্রতিষ্ঠিত বেলুড় মঠে ছিলেন  ১৭৮ দিন। বেলুড়ের পর খেতরীতেই বেশি সময় কাটিয়েছেন বিবেকানন্দ।  মহারাজা স্বামীজিকে বিশ্বধর্ম সম্মেলনে যাবার জন্য অর্থ সাহায্য করেছিলেন।  যাবার আগে স্বামীজির জন্য বিশেষ পোশাক,  পাগরী ও জাহাজের টিকিটের বন্দোবস্ত তিনিই করেছিলেন।  একাধারে বন্ধু ও শিষ্য , রাজা অজিত সিংহের অনুপ্ররনায় স্বামীজি চিকাগো ধর্মসভায় কালজয়ী বক্তৃতা দিয়ে সারা পৃথিবীকে সনাতন হিন্দুধর্ম সম্পর্কে অবগত করেছিলেন। 

স্বামীজি ও মহারাজের আলোচনা কক্ষ


রামকৃষ্ণ মিশনের অতিথি নিবাস

বিভিন্ন লেখা থেকে জানা যায় যে বরানগর মঠে " বিরাজ-হোম " করে শ্রীরামকৃষ্ণের চিত্রের সামনে তিনি ও অনেকেই সন্ন্যাস গ্রহন করেছিলেন।  হোমের পর সকলেরই কিছু না কিছু নামকরন হয়েছিল।  কিন্ত স্বামীজির কোন নামকরন হয়নি।সেই জন্যই পরিভ্রমনের সময় তিনি নাম পরিবর্তন করে নিতে পারতেন। ইতিহাসের পাতা উল্টে দেখলে দেখা যায় যে এক একক অস্তিত্বের   সন্ধান পৃথক পৃথক নামে________  বিলে - বিরেশ্বর - নরেন - লরেন - নরেন্দ্রনাথ  - বিবিদিষানন্দ  - সচ্চিদানন্দ - বিবেকানন্দ। এর মধ্যে  বিবেকানন্দ নামটিই দেশে-বিদেশে বন্দিত হয়ে থেকে  গেল।  কিন্ত এই নামটি নরেনের সন্ন্যাস নাম নয়।  শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন বা লরেনকে কখনও কখনও আদর করে " কমলাক্ষ  " বলে ডাকতেন। কিন্ত এ নাম নরেন কিছুদিনের মধ্যেই দূরে সরিয়ে দেন। বেড়িয়ে পড়েন পরিভ্রমনে। পরিচয় গোপন করে কেটে যায় দিনের পর দিন।  খেতরিতে যাবার পর খেতরির রাজার অনুরোধে  তিনি বিবেকানন্দ নাম গ্রহন করেন। খেতরিতে একদিন মহারাজা হাসতে হাসতে বলেছিলেন  " স্বামীজি আপনার বিবিদিষানন্দ  বড় কঠিন।  নামের অর্থ বোঝানোর জন্য টীকাকার প্রয়োজন।  উচ্চারণ খুব সহজ নয়। এছাড়া আপনার বিবিদিষা  কাল অনেকদিন সমাপ্ত হয়েছে।" তখন স্বামীজি হেসে জিজ্ঞাসা করেন ___ " আমার জন্য কোন নামটি পচ্ছন্দ  করেন আপনি ?" মহারাজ উত্তরে বলেন " আমার মনে হয় আপনার যোগ্য নাম বিবেকানন্দ। "   স্বামীজির " বিবেকশক্তি" বা বিচারশক্তির কথা ভেবেই রাজা এই নামটি নির্বাচিত করেছিলেন।  আবার "বিবেকানন্দ " শব্দটি বিশ্লেষণ করলে অর্থ দাঁড়ায়,  বিশেষ ভাবে বিচার করে মনের যে সত্তায় আনন্দ হয়, তিনিই বিবেকানন্দ।   রাজার ইচ্ছানুসারে বিবেকানন্দ নামটি এর পর  থেকে ব্যবহার শুরু করে দেন।এই ঘটনাই প্রমাণ করে তাদের দুজনের একের প্রতি অন্যের শ্রদ্ধা, সন্মান ও অনুরাগ কতখানি ছিল। স্বামীজি হয়তো সাময়িক ভাবেই এই নামটি নিয়েছিলেন।  কিন্ত এই নাম পরে, তাঁর ইচ্ছা থাকলেও ছাড়তে পারেননি কারণ নামটি বিশ্বে সুপরিচিত হয়ে গিয়েছিল।


রাতের অতিথি নিবাস 


এই খেতরিতে একদিন ঞ্জানের জ্যোতির্ময় আলোক স্বামীজির জীবনে বিচ্ছুরিত হয়েছিল।  ভগবান বুদ্ধের ন্যায় তিনি উপলব্ধি করেছিলেন ঈশ্বর এক এবং সম্ভাব্য বিরাজমান।  এক্ষেত্রে স্বামীজির ঞ্জানচক্ষু উন্নয়নের গুরু হলেন সামান্য এক নটী......... যে সম্প্রদায়ের উপর তীব্র ঘৃণা ছিল স্বামীজির।  একদিন সন্ধ্যাবেলায় খেতরির রাজা সঙ্গীতের আয়োজন করেছেন।  একজন বাইজি গান গাইবেন তাঁর নাম ময়নাবাঈ। যেহেতু স্বামীজি রাজার অতিথি, রাজা তাঁকে গান শুনতে আমন্ত্রণ জানিয়ে লোক পাঠালেন।  স্বামীজি এলেন না বরং বলে পাঠালেন......একজন সন্ন্যাসীর পক্ষে এরকম আসরে উপস্থিত থাকা অনুচিত।  গায়িকা জানতে পেরে খুবই মর্মাহত হলেন এবং সুরদাসের সেই মহান গীত ধরলেন -------- " হামারে প্রভু অবগুন  চিত না  ধরো , সমদরশী হ্যায় নাম তিহারো অব  মোহি  পার করো "। _______ প্রভু, আমার  দোষ দেখো না। তোমার নাম সুদর্শন ----- আমাকে উদ্ধার করো। স্বামীজির কাণে গানটি পৌচ্ছালো । গানটির ছত্রে ছত্রে এই সত্যটি প্রকাশিত যে ভগবান সর্ব বস্তুতে বিরাজ করছেন। 

পতিতার এই গীত তো কন্ঠ নি:সৃত নয় , আত্মনি:সৃত। অভাগিনী দূর্ভাগক্রমে পতিতার জীবন কাটিয়েছেন কিন্ত দীনতম ভক্তের মহত্তম উপলব্ধি তার মধুকন্ঠে ঝরে পরেছে। অপার বিস্ময়ে স্বামীজি উপলব্ধি করলেন,  নারীর এই সংগীতসুধা এই সত্যই জগৎকে শোনাতে চাইছে যে , সর্বভূতে ব্রহ্ম বিরাজিত। গানটি শুনে স্বামীজি মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিলেন।  " এই কি আমার সন্ন্যাস ? আমি সন্ন্যাসী!! অথচ আমার  মনে সন্ন্যাসী ও পতিতার  ভেদবুদ্ধি ! "  তাঁর চোখ খুলে গেল।  তিনি বুঝলেন ____ সবার মধ্যে ঐ একই সত্তা ----- কাউকে তিনি ঘৃনা করতে পারেন না। স্বামীজির মুখে এক দেখা দিল এক স্বর্গীয় আভা ......... যেন দিব্যঞ্জান লাভ করেছেন তিনি। তুচ্ছ নারী পুরুষের, শুদ্ধ অশুদ্ধে ভেদাভেদ লুপ্ত হলো।শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন দীনাতিদীনের মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতেন স্বামীজিরও তেমনই অনুভূতি হল। শোনা যায় , গান হয়ে যাবার পর বাইজীকে মাতৃ সম্বোধন করে তার কাছে স্বামীজি ক্ষমা প্রর্থনা করেছিলেন। 



রাত্রিতে অতিথি নিবাস আলোকসজ্জা

তারপর সেই বাঈজীর কি হলো সেই খবর তো কেউ আর নেয়নি। বহুবছর পর মিশনের একজন সন্ন্যাসী খুঁজে খুঁজে বের করলেন সেই বাঈজীকে। তাঁর নাম ময়নাবাঈ, রাজপুতানার এককালের বিখ্যাত বাঈজী, যাঁর গান শুনে রাজপুতানার রাজা-মহারাজারা মুগ্ধ হতেন। কিন্তু সেই রাতের পর বাঈজীকে কেউ আর গান গাইতে দেখেননি। কোথায় গেলেন সেই বাঈজী? কেউ তার খোঁজ রাখেনি। সেই সন্ন্যাসী নিছক কৌতূহলের বশে খুঁজতে খুঁজতে রাজস্থানের একটি ছোট্ট গ্রামে সেই বাঈজীর সন্ধান পেলেন। তিনি তখন খুবই বৃদ্ধা। সন্ন্যাসী দেখলেন একটি ছোট্ট কুটীরের ঠাকুরঘরে গোপালের বিগ্রহের সাথে স্বামী বিবেকানন্দের ছবি নিত্য পূজো করেন ও সেই ছবির সামনে বসে তন্ময় হয়ে গান করেন । সন্ন্যাসী বললেন " সেই রাত্রির পরে আপনাকে কেন আর কোন আসরে দেখা যায়নি?" বাঈজী বললেন, " বাবা, সেদিন দেবতাকে গান শুনিয়ে আমার জীবন ধন্য হয়েছিল। সেদিন আমি অঙ্গীকার করেছিলাম, আর কখনো মানুষের বিনোদনের জন্য গান গাইব না। আমি শুধুই গাইব আমার দেবতার জন্য। আমার বাকি জীবন কাটবে আমার দেবতার সেবায়, দেবতাকে গান শুনিয়ে ।" তাঁর 'দেবতা' হলেন স্বামী বিবেকানন্দ আর ঐ গিরিধর গোপাল। এই হয়। আগুন যাকে ছোঁয়, তাকে পুড়িয়ে মারে--সে আজ হোক অথবা কাল। এই ধর্মরূপী আগুন তোমাকে অগ্নিশুদ্ধ করে এক নতুন মানুষে রূপান্তরিত করবে।



১৯০১ সালের ১৮ই জানুয়ারি রাজা অজিত সিংহ মারা যান এবং স্বামীজি সমাধি লাভ করেন ৪ঠা জুলাই ১৯০২ সালে। কিন্ত খেতরির রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠিত হয় এর অনেকদিন পরে। রাজার নাতি , রাজা বাহাদুর সর্দার সিংহ- জি  সেই জায়গাটা দান করেছিলেন যেখানে স্বামী বিবেকানন্দ খেতরিতে থাকাকালীন অবস্থান করতেন। এর পর বিভিন্ন প্রচেষ্টায় রাজস্থানে মিশনের প্রথম শাখা সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বামীজির স্মৃতিতে সমৃদ্ধ এই প্রসাদ ভবনটি নামকরন করা হয়েছে  " বিবেকানন্দ স্মৃতি মন্দির  " । আর যে ঘরে তিনি থাকতেন  সেটিকে একটি প্রার্থনা কক্ষে রূপান্তরিত করা হয়েছে।  এক কথায় বলা যেতে পারে আজকের ক্ষেত্রী হল স্বামীজির তিনটি সফর দ্বারা একটি তীর্থস্থান। 



অতিথি নিবাসের ভিতরের বারান্দা 




মিশনের ছাদ থেকে

অতিথি নিবাসের ঘর

দিল্লী থেকে দূরত্ব প্রায় ১৯০ কিমি আর জয়পুর থেকে ১৬০ কিমি। নিকটতম রেল স্টেশন  লোহারু যা কিনা ৫৫ কিমি ক্ষেত্রী থেকে। কলকাতার লোকেরা শিয়ালদহ-বিকানীর দূরন্তে এই লোহারু স্টেশনে নামতে পারেন বা ঐ ষ্টেশন থেকে  কলকাতায় আসতে পারেন।  এছাড়া বিমানে গেলে  জয়পুর বা দিল্লীতে নেমে , সেখান থেকে বাসে বা গাড়িতে সহজেই ক্ষেত্রী যাওয়া যায়। 



প্রবেশ পথের মুখে বাগান 


বাগানের গাছে টিয়া পাখির আনাগোনা

খেতরিতে প্রচুর ময়ূরের আনাগোনা
খেতরি রাজপ্রসাদের আশেপাশে ময়ূরের অবাধ ঘোরাফেরা


🌸২২ শে নভেম্বর ১৮৯৮ বেলুড় থেকে স্বামীজি খেতড়ির মহারাজ কে একটি দুঃখময় গোপন চিঠি লিখেন যা পড়লে শতবর্ষ পরেও হৃদয়বান পাঠকের চোখ সজল হয়ে ওঠে।🌸

"মাননীয় মহারাজা,

আপনি জানেন বিদেশ থেকে ফেরার পর থেকেই আমি ভুগছি। এই অসুস্থতা সারবার নয়। এই দু'বছর বিভিন্ন জায়গায় বায়ু পরিবর্তন করেও প্রতিদিন অবস্থা খারাপ হচ্ছে। আমি এখন প্রায় মৃত্যুর দ্বারে।আজ আমি মহারাজের প্রদত্ত আশ্বাস, মহানুভবতা ও বন্ধুত্বের কাছে একটা আবেদন জানাচ্ছি।আমার বুকের মধ্যে একটা পাপ সারাক্ষণ পীড়া দেয়।আমার মায়ের প্রতি বড় অবিচার করেছি। আমার মধ্যম ভাতা মহেন্দ্রনাথ বাইরে চলে যাওয়ায় মা শোকে একেবারে মুহ্যমান।এখন আমার শেষ ইচ্ছা, অন্তত কিছুকালের জন্য মায়ের সেবা করি। এখন আমি মায়ের কাছে থাকতে চাই। আমাদের বংশটি যাতে লোপ না পায় সেজন্য ছোট ভাইয়ের বিয়ে দিতে চাই। এতে আমার ও আমার মায়ের শেষ কটা দিন যে শান্তিতে কাটবে তাতে সন্দেহ নেই। আমার মা এখন একটি জঘন্য বাসায় থাকেন।তার জন্য ছোট একটা ভালো বাড়ি করে দিতে চাই। ছোট ভাইটির উপার্জন ক্ষমতা সম্পর্কে আশা কম। তার জন্যও কিছু করে যাওয়া দরকার। আপনি রামচন্দ্রের বংশোদ্ভব। যাকে ভালোবাসেন, যাকে বন্ধু মনে করেন, তার জন্য এই সাহায্য আপনার পক্ষে কি খুব কষ্টকর হবে? আমি জানিনা আর কার কাছে এই আবেদন পেশ করতে পারি। ইউরোপ থেকে যে টাকা পেয়েছি তার সবই 'কাজের' জন্য এবং তার শেষ পাই পয়সা পর্যন্ত দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পুনশ্চ - এই চিঠি নিতান্ত ব্যক্তিগত ও গোপনীয়।"

এই চিঠির প্রথম উত্তর আসে টেলিগ্রামে।১ লা ডিসেম্বর ১৮৯৮, বেলুড়ে বসে মহানুভব খেতড়ির মহারাজকে উত্তর দিতে বসেন রোগাক্রান্ত বিবেকানন্দ।

"আমি কি চাই তা বিশদভাবে লিখলাম।কলকাতায় একটা ছোট বাড়ি তৈরীর খরচ ১০০০০ টাকা। ওই টাকায় চার পাঁচ জনের বাসযোগ্য একটা ছোট বাড়ি কোনমতে কেনা বা তৈরি করা যায়। সংসার খরচের জন্য যে মাসিক ১০০ টাকা আপনি আমার মাকে পাঠিয়ে থাকেন তা তার পক্ষে যথেষ্ট। যদি আমার জীবদ্দশা পর্যন্ত আমার খরচ নির্বাহের জন্য আরো মাসিক ১০০ টাকা পাঠাতে পারেন তাহলে বড়ই খুশি হব। অসুস্থতার জন্য আমার খরচ ভয়ানক বেড়েছে।কিন্তু এই বাড়তি বোঝা আপনাকে খুব বেশিদিন বইতে হবে বলে মনে হয় না , কেননা আমি বড়জোর আর দু এক বছর বাঁচবো। আর একটি ভিক্ষা চাইবো। আমার মায়ের জন্য একশত টাকার সাহায্য সম্ভব হলে আপনি স্থায়ী রাখবেন। আমার মৃত্যুর পরেও যেন সে সাহায্য নিয়মিত পৌঁছয়। যদি কোনো কারণে আমার প্রতি ভালোবাসায় ও দাক্ষিণ্যে ছেদ টানতে হয়, এক তুচ্ছ সাধুর প্রতি একদা যে প্রেম ভালোবাসা ছিল, তারই কথা স্মরণ করে মহারাজ যেন সাধুর দুঃখীমাতার প্রতি এই করুণা বর্ষণ করেন।


 


Saturday, 24 September 2022

স্বামীজির কথা

 


#ব্রজেশ্বরীর_লীলা_ধন্য_স্বামীজী_


১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দ ১২ ই আগস্ট স্বামী আসেন বৃন্দাবনে। বৃন্দাবনের দর্শনীয় স্থান দর্শন করার পরে গিরিগোবর্ধন পরিক্রমা  করে  স্বামী উপস্থিত হোন  রাধাকুন্ডের তীরে। রাধারানীর জন্য চিকন করা কুন্ড তন্ময়ত্ত দর্শন করেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর কুন্ডকে প্রণাম শুধুমাত্র কৌপিন পড়ে কুন্ডে নামেন।  বহির্বাস কুন্ডের তীরে রাখা উচিত। কুন্ডের জলে স্নান সেরে যখন বহির্বাস পরিধান  হবে সেই সময়ে স্বামীজী বুঝলেন এ বান্দরের কাজ, তিনি যখন স্নান করছিলেন সেই সুযোগে বান্দরের দল তাঁর বহির্বাস নিয়ে গেছে। শুধুমাত্র কৌপিন পড়ে কুন্ডেরে আছেন। এই বন্ধ কুন্ডের তীরের হাতে তুলে ধরেছেন, সহসা তাঁর কাছে এসেছেন এক ব্রজবধু।    ব্রজবধুর হাতে থালা, পাত্রটিতে    আছে কিছু ফল আর গৈরিক বস্ত্র।আশেপাশে কেউ নেই, নির্জন স্থান। স্বামীজীর খুব অভিমান হল রাধারানীর উপর। স্বামীজী মনে মনে ঠিক আছে, বাঁদরে যখন বহির্বাস নিয়ে গেছে তখন এই কৌপিন পড়ে তিনি এগোবেন।ব্রজবধু ঘোমটার আড়াল থেকে খুব মিস্টিভাবে বললেন, "সাধু,  বাড়িতে আজ সাধু সেবা ।  বাবা , আমরা অনেক সাধুকে বস্ত্র, ফলদান করেছি, তাই বেচে ছিল ।  রাস্তায়  যদি কোনো সাধুকে পাই সব দিয়ে দেবো । এই জিনিসটা আমরা ব্যবহার করতে পারি না,তাই আপনি নিন"। এই ব্রজবধু স্বামীজীকে ফল বস্ত্র দিয়েছিল । স্বামীজীর    উত্তর কুন্ডে মোহাবিষ্টের ন্যায়। । জনমানবহীন এই জায়গায় কোথা থেকে এলেন এই ব্রজবধু ?কিছুক্ষণ পর চাক ভাঙ্গলে তিনি দেখতে যেতে চান চারিদিক জনমানবহীন এই স্থানে  কোথা থেকে  এলেন এই ব্রজবধু? 

কৃপাময় কৃপার কথা তাঁর দুই ভাবীর মনে জলে ভরে এল, গড়াগড়ি দিতে লাগলেন কুন্ডের ধারে।

জয় রাধা রাধা 🙏🙏


*"স্বামীজীর বাঘা"*


     বাঘাজী স্বামীর পোষা। একবার বেলুড়মঠে স্বামীজীর পোষা একটি হরিণকে কামড়ে তাড়া করে। সেই অপরাধে বাঘা তার মনিবের নির্দেশে মঠের সাধু গণের দ্বারা গঙ্গার পরপারে বরাহনগরে নির্বাসিত হয়। কিন্তু সেই দিনই রাত্রিতে সে গঙ্গা  দিয়ে ফিরে আসে এবং আরও পরে প্রত্যূষে স্বামীজী শয্যা উল্টা করে আসা মাত্রই তাঁর মাথা ঘষে । মনে হয়, স্বামীজী তার অপরাধ ক্ষমা করে বললেন --- "যা বেটা, তোর সাত খুন মাপ।"

      বাঘার কর্মকলাপ,  মঠের অনুমান, পূর্ব জন্মদান করতে সে সতর্কতা ঠাকুরের ভক্ত ছিল এবং বিশেষভাবে অপরাধে এই জন্মে সে সন্ত্রাস জন্মেছে। বেলুড়  এর উপর মিউনিসিপ্যাল ​​ট্যাক্সট মাঠে মূল আলোচনার সূত্রপাত হয়, সেই সময়েই  স্বয়ং ইনস্পেক্টার  সক্রিয়তা সত্যবাঘা তার মাঠ থেকে পথ দেখিয়ে স্বামীজীর কাছে আসে। ম্যাজিস্ট্রেট নোট দেন "কুকুরটি আমাকে পথ দেখিয়েছে তাই এটি একটি মঠ হতে হবে।" বলাবাহুল্য এর ফলে টেক্সটা মুকুব যায়।

     স্বামীজীর দেহ রাখার  পর বাঘা প্রায় পাগল হয়ে যায় এবং ফলে অসুখে মারা যায়।  তাকে গঙ্গায় দেওয়া হয়। পরের দিন স্বামী সারদানন্দজী কলকাতা থেকে নৌকোয় মঠে আসবার সময়  বাঘার মৃতদেহ ভাঁসতে দেখেন। ভেসে আসা মঠের ঘাটে আটকে আছে। তখন তাঁর ওকে মঠের প্রাঙ্গণে কথার নির্দেশে , বর্তমান চন্দন গাছের সমাহিত করা হয়।

 এই স্বামী   সারদানন্দজী  সাধুদের বললেন, "স্বামীজী   বলেছেন,    বাঘা চিরকালই মঠে থাকবে। ওকে গঙ্গায় কে দিয়েছ?"

     

***********************


খ্রীস্টানদের_চার্চে_বিবেকনন্দ


শিরোনাম বই মনে হচ্ছে খুব তাই না। হ্যাঁ, শ্রদ্ধা তোমাই কথা। খ্রীষ্টানদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে হিন্দুধর্মের বীর সন্ন্যসী স্বামী বিবেকান্দের ছবি!!! 

আমেরিকার অ্যানিসকুয়াম চার্চ, ওয়াশিংটন এ গত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ এ স্বামীরজী জীবনদর্শনের উপরে আলোকপাত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেদান্ত সোসাইটি অফ প্রভিডেন্স, অ্যাঞ্জেল সেন্ট ইউএসএ এর পুজনীয় মহারাজজি। 
















$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$


জয়তু স্বামী। 

       "ভগবদ্গীতাকার বলিয়াছেন, "অযত মনই আমাদের দল। যে মন - সংযত, তা আমাদের বন্ধুর মতো কাজ করে থাকে"।

    তাই , সে সম্পর্কে , আমাদের আবিস্কৃত অবস্থা চাই। আমরা কি মনকে করে গড়িয়া তুলিতে পারি, যাহাতে সে আমাদের বশে থাকে এবং আমাদের সহিত এমন করে?  

আমাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সহিত মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সম্পর্ক কি?  


   মানবমনের চারটি প্রধান কর্ম- 

১] স্মৃতি   

২ ] বিচার ও ভাবনা 

৩] মান ও সিদ্ধান্ত - এবং গ্রহণ 

 ৪ ] "আমি" -র চেতনা। 


                 ১]ঃ স্মৃতি যেখানে আমাদের চিন্তিত অভিজ্ঞতাগুলি সুক্ষ্ম উচ্চারণে সঞ্চয় হয় সেই স্মৃতি ভান্ডারে "উত্তর" বলা হয়। ভাল, মন্দ চিন্তা বা কাজ আমরা দৃশ্য, সেসব কিছুরই ছাপ (ইমপ্রেশন) সেখানে মজুত থাকে। এই ইম্প্রেশনগুলি সমষ্টিই আমাদের চরিত্রের চরিত্রের হয়। এই যে "চিত্ত উল্টো", তাকে আবার অবচেতন মনও বলা হয়।      

              

                  ২ ] বিচার ও ভাবনাঃ অনিশ্চিত মনে পছন্দে পছন্দ- অপছন্দের বিকল্প উপস্থিতি এবং মন বিচারের বিচারের বিচার। মনের এই যে বিচার ক্ষমতা ,তাহাকে "মনস্"বলা হয়। কল্পনা ও গান শক্তি - সেও এই "মনস্"-এর কাজ।  

               

       ৩ ) মান ও সিদ্ধান্ত - গ্রহণঃ - জ্ঞান নিশ্চয়তা । বুদ্ধি করলে মনের সেই শক্তি যাহার দ্বারা করা হয়। মানসিক বিষয়ের খুঁটিনাটি বিচার করিবার পর " বুদ্ধি " বলিয়া দেয় কোনটি আরও কাম্য । বুদ্ধি হইল সেই শক্তি, যাহার দ্বারা সে সত্যও মনে করে, নিত্য ও অনিত্য, কোণ্টি করণীয় এবং কোন বর্জনীয়, কোনটি নৈতিক বিচার দূরিয়া ঠিক এবং কোন টি ভূল ,তা করিবার শক্তি দেয়। এইটি আমাদের ইচ্ছাশক্তিরও আধার, যে-ইচ্ছাশক্তি ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য একান্ত প্রয়োজন। সেই কারণেই আমাদের মনে হয়

"আমি" - আমরা বলিয়া   চেচায়। 

" আমি খাচ্ছি " , " আমি দেখছি " , " আমি দু'জন " , 

"আমি শুনছি", "আমি ভাবছি", "আমি বিভ্রান্ত" ;

এই যে দিনরাত "আমি" "আমি" , বাধা সবই ।

দৈহিক ও মানবিক কর্ম  নিজের উপর আরোপ করা , এইটির নাম "অহংকার" অথবা "আমিত্ববোধ"। যতক্ষণ এই "আমি" নিজেকে  অসংযত দেহর সহিত অভিন্ন মনে হয় এবং মনে হয়, অবিলম্বে জাগতিকও পরিস্থিতির দাস; তাদের দ্বারাই সে নিয়ন্ত্রিত হয়।


আনন্দদায়ক ঘটিলে তখন আমরা সুখী, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি আসিলেই    দুঃখে সুখিয়া পড়ি। মন যতই সুক্ষ্ম ও সংযত হয়, কাছেই আমরা করতে পারি আমি বুঝতে পারি উৎসটি কি। সেই অনুপাতে আমরা আমাদের সৌন্দর্য আরও বেশি সুরুংখল ও নিরুদ্বিগ্ন হতে পারি। এমন একজন ব্যক্তি হন না এবং অবস্থার দ্বারা না হন৷ 

               মনস্, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার, মনের এই যে চারিটি পাশে বা পর্যায় ,এগুলি কিন্তু পৃথক পৃথক নয় ; একই মন, শুধু আলাদা আলাদা আলাদা আলাদা প্রকাশক ডাকা হয় , এই যা" । 

%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%


স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যতক্ষণ না তুমি ঈশ্বরকে অনুভব করছ, ততক্ষণ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করো না। অর্থাৎ, ঈশ্বর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব যদি থাকে, তবে আমাকে তাঁকে অনুভব করতে হবে। শুধুমাত্র অপরের কথায় চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা অনুচিত। বিজ্ঞান যেমন প্রমাণ সাপেক্ষ, আধ‍্যাত্মিকতাও তেমনই প্রমাণ সাপেক্ষ। স্বামী বিবেকানন্দ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন? ঠাকুরও তৎক্ষণাৎ তাকে উত্তর দিয়েছিলেন, দেখেছি কি রে? তোকেও দেখাতে পারি।' নানক, কবীর, তুকারাম, মীরা, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এরা সকলেই ভগবানের দর্শন লাভ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি তো ঈশ্বরকে দেখি নি। তাহলে আমি কিভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করবো? বেদান্ত এর উত্তর দিয়েছে, বলেছে, তুমি নিজেকে খোঁজ। আমি কে? এর উত্তর যেদিন তুমি পাবে, তুমি বুঝবে, তৎত্বমসি। তুমিই সে।' বুঝবে, অহম্ ব্রহ্মাস্মি। আমিই সেই পরাৎপর ব্রহ্ম। উত্তরাখণ্ডের এক সাধু আমায় বলেছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ খুব সহজ। আমার অস্তিত্বই ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ।

■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤

ভারতবাসীর উন্নতিসাধনে স্বামীজীর আধ্যাত্মিক চিন্তা   :☆☆☆☆

" আত্মানো মোখ্যার্থং জগদ্ধাত্রী চ " --- ভোগবাদী জীবন নয়, হাজারো ওঠাপড়ার মাঝে এই  আলোকময় অমৃতবানীই হবে ভারতের শিরদাঁড়া আর বৈদান্তিক অদ্বৈতঞ্জান হবে তার সুষূম্না ----------- স্বামী বিবেকানন্দের এই ছিল অনুভব। এ কথা আজ সর্বজনবিদিত যে ভারতবাসীদের তিনি উদ্বুদ্ধও করেছিলেন আত্মশ্রদ্ধার এই মন্ত্রেই। কিন্ত আত্মশ্রদ্ধার পাশাপাশি আর একটি স্তম্ভ রয়েছে____ সেটি হল বিবেকান্দের ডারতচেতনার সার " আত্মসমীক্ষা "। সময় ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির বিচারের নিজের নিয়মিত মূল্যায়ন করে ঔচিত্যবোধে কর্মক্ষম হওয়ার শিক্ষা এই দেশকে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি।

তাঁর শাশ্বত ধর্মদর্শন ও আধ্যাত্মিকতার কথা যখন দেশবাসীর কাছে প্রচার করলেন,  তখন ভারতবাসী পরাভূত,  হীনম্মন্যতাগ্রস্ত। তাদের কাছে আধ্যাত্মিকতায় বলিয়ান হয়ে জগতের হিতসাধন ছিল দূর অস্ত। ভারত তখন দূর্বল,  পরমূখাপেক্ষী, নিজের উন্নতি থেকেই লক্ষ কোটি যোজন দূরে। কিন্ত বিবেকানন্দ নিজে তখন " হিন্দুধর্ম " এর স্বীকৃত প্রতিনিধি।এককথায় বলা যায় ভারতের সবেধন   নীলমণি " যুগ পুরুষ  "। সেইসময়ে চাইলে, আত্মশ্রদ্ধার মোড়োকে,  আচারসর্বস্ব ধর্মের নামে জনগনকে তাকিয়ে, আবেগ জর্জরিত এই দেশে সনাতন ঐতিহ্যের  ধ্বজাধারি  " গুরু " হয়ে থাকার সহজ পথেই বেছে নিতে পারত।




♦কর্মযোগের চরম গতি, উদ্দেশ্য, পূর্ণতা বা সিদ্ধ▼ 

যে ব্যক্তি নিজেকে বশীভূত করিয়াছে, বাহিরের কোন বস্তু তহার উপর ক্রিয়া করিতে পারে না, তাহাকে আর কাহারও দাসত্ব করিতে হয় না। তাহার মন মুক্ত। এরূপ ব্যক্তিই জগতে সুখে-স্বচ্ছন্দে বাস করিবার যোগ্য। আমরা সচরাচর দুই মতের মানুষ দেখিতে পাই। কেহ কেহ দুঃখবাদী-তাঁহারা বলেন, এ পৃথিবী কি ভয়ানক, কি অসৎ! অপর কতগুলি ব্যক্তি সুখবাদী-তাঁহারা বলেন, এই জগৎ কি সুন্দর, কি অপূর্ব! যাঁহারা নিজেদের মন জয় করেন নাই, তাঁহাদের পক্ষে এই জগৎ দুঃখে পূর্ণ, অথবা সুখদুঃখমিশ্রিত বলিয়া প্রতিভাত হয়। আমরা যখন আমাদের মনকে বশীভূত করিতে পারিব, তখন এই সংসার আবার সুখের বলিয়া মনে হইবে। তখন কোন কিছুই আমাদের মনে ভাল বা মন্দ ভাব উৎপন্ন করিতে পারিবে না। আমরা সবই বেশ যথাস্থানে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখিতে পাইব। যাহারা প্রথমে সংসারকে নরককুন্ড বলিয়া মনে করে, তাহারাই আত্মসংযমে সমর্থ হইলে এই জগৎকে স্বর্গ বলিবে। আমরা যদি প্রকৃত কর্মযোগী হই এবং নিজদিগকে এই অবস্থায় লইয়া যাইবার জন্য শিক্ষিত করিতে ইচ্ছা করি, তবে আমরা যেখানেই আরম্ভ করি না কেন, পরিশেষে পূর্ণ আত্মত্যাগের অবস্থায় উপনীত হইবই; যখনই এই কল্পিত ‘অহং’ চলিয়া যায়, তখনই যে-জগৎ প্রথমে অমঙ্গলপূর্ণ বলিয়া মনে হয়, তাহা পরমানন্দে পূর্ণ এবং স্বর্গ বলিয়া বোধ হইবে। ইহার হাওয়া পর্যন্ত শান্তিতে পূর্ণ হইয়া যাইবে, প্রত্যেক মানুষের মুখচ্ছবি ভাল বলিয়া বোধ হইবে। ইহাই কর্মযোগের চরম গতি ও উদ্দেশ্য, এবং ইহাই কর্মজীবনে পূর্ণতা বা সিদ্ধ।


●□■♤♡◇♧●□■♤♡◇♧●□■♤♡◇♧●□■♤♡◇♧●□■♤♡


  #খাদ্যরসিক_বিবেকানন্দ#

তখন তিনি স্বামী বিবেকানন্দ হননি, শুধুই নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পড়াশোনা করছেন। পেটুক এবং খাদ্যরসিক বন্ধুদের নিয়ে পাড়ায় তৈরি করেছিলেন ‘পেটুক সঙ্ঘ’। বন্ধুদের কাছে স্বামীজি বলতেন, দেখবি একটা সময় আসবে যখন কলকাতার প্রত্যেক গলির মোড়ে মোড়ে পানের দোকানের মতো চপ-কাটলেটের দোকান হবে। স্বামীজির এই ভবিষ্যৎবাণী যে কতটা সত্যি হয়েছে, তা এখন আমাদের চারপাশ দেখলেই বোঝা যায়। চপ-কাটলেট-সিঙাড়া তাঁর খুব পছন্দের ছিল।


খাবার পাশাপাশি রান্না করতেও বেশ ভালোবাসতেন তিনি। মাংসের নানা পদ তিনি রান্না করতে পারতেন। শিকাগো যাত্রার আগে তৎকালীন বোম্বাইতে স্বামীজি ১৪ টাকা খরচ করে এক হাঁড়ি পোলাও রান্না করে শিষ্যদের খাইয়েছিলেন। নিজে হাতে রেঁধে নিবেদিতাকেও খাইয়েছিলেন। কলকাতার বিভিন্ন দোকানের চপ ও ফুলুরি তাঁর বিকেলের খাবার ছিল। স্বামীজি চপ ও কাটলেট খুব সুন্দর বানাতে পারতেন এবং তা বানিয়ে একাধিকবার তাঁর শিষ্যদেরও খাইয়েছেন। বেলুড় মঠে একবার স্বামীজি নাকি পেশাদার চপওয়ালাদের মতো চপ ও ফুলুরি বিক্রিও করেছিলেন। বিকেলবেলায় আলুর চপ, ফুলুরি আর মুড়ি না হলে স্বামীজির বিকেলের ভোজনটাই হত না। কড়া ঝালের চানাচুর তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল। তাঁর কাছে বেশিরভাগ সময়ই চানাচুরের প্যাকেট থাকত। তিনি যখনই একা থাকতেন শালপাতার ঠোঙা থেকে চানাচুর বার করে খেতেন এবং বালকের মতো আনন্দ পেতেন।


কাঁচালঙ্কা ছিল স্বামীজির পরম প্রিয়। একবার এক অবাঙালি সাধুর কাছে স্বামীজি সেই কথা স্বীকারও করে নিয়েছিলেন। সেই সাধুর সঙ্গে তিনি লঙ্কা খাওয়ার কম্পিটিশন করেছিলেন। স্বামীজি কম্পিটিশনে টপাটপ করে বেশ কয়েকটি লঙ্কা খেয়ে ফেললেন, অপর দিকে সেই সাধু মাত্র দু’টি লঙ্কা খেয়েই কাঁদো কাঁদো। বিদেশি সাহেবদের লঙ্কা খাওয়া শেখাতেন স্বামীজি। একবার লন্ডনে থাকাকালীন স্বামীজির লঙ্কা খেতে ইচ্ছা হয়। তখন বিলেতে লঙ্কা পাওয়া খুবই কঠিন। স্বামীজি অনেক খুঁজে এক দোকানদারের কাছ থেকে তিন শিলিংয়ের বিনিময়ে তিনটি কাঁচালঙ্কা কিনেছিলেন। ঝাল খাওয়া প্রসঙ্গে তাঁর ছোট ভাই মহেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, স্বামীজির অত্যন্ত প্রিয় ছিল তীব্র ঝাল। রামকৃষ্ণর মৃত্যুর পরে বরানগরে সাধনভজনের সময় প্রবল অনটন। দারিদ্র্য এমনই যে মুষ্টিভিক্ষা করে এনে তাই ফুটিয়ে একটা কাপড়ের ওপর ঢেলে দেওয়া হত। একটা বাটিতে থাকত নুন আর লঙ্কার জল। একটু ঝালজল মুখে দিয়ে এক এক গ্রাস ভাত উদরস্থ করা হত।

বিদেশে তিনি যেখানেই যেতেন নিজের কাছে রাখতেন ভারতীয় গুঁড়ো মশলা। একাধিকবার তিনি নানা বিদেশি অনুরাগীদের রান্না করে ভারতীয় খাবার খাওয়াতেন। বলাই বাহুল্য, তাঁর রান্নায় ঝালের আধিক্য ছিল খুবই বেশি। তাঁর রান্না খেয়ে ঝালের চোটে চোখে জল এসে যেত। স্বামীজির আমেরিকায় থাকাকালীন প্রাতঃরাশের তালিকা ছিল বেশ লম্বা। প্রথমেই খেতেন কমলালেবু এবং আঙুর। তার পর ডবল ডিমের পোচ সহযোগে দু’পিস টোস্ট। সব শেষে ক্রিম ও চিনি দিয়ে দু’কাপ কফি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে স্যুপ এবং মাংস বা মাছের সঙ্গে রাতের আহার সারতেন। ডেসার্ট হিসেবে মিষ্টি আর আইসক্রিম তো আবশ্যিক ছিল। খাওয়ার পর আবার জমিয়ে ধূমপানও করতেন।


স্বামীজির আমেরিকান শিষ্য এলিজাবেথ ডাচার তাঁকে একবার তাঁদের কটেজে আমন্ত্রণ জানান। নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় ৫৩০ কিলোমিটার দূরে সেন্ট লরেন্স নদীর তীরে ওয়েলেসলি দ্বীপে ছিল সেই কটেজ। ১৮৯৫ সালের ১৮ জুন দশজন শিষ্যকে নিয়ে কটেজে আসেন স্বামীজি। সেখানে প্রথমে দেন বক্তৃতা। তার পর শিষ্যদের জন্য রান্না করলেন বাঙালি খাবার। নিজেও খেলেন, খাওয়ালেন সকলকে।