Friday, 23 February 2024

স্বামীজির পৈতৃক ভিটে

 



স্বামীজির আদি পৈতৃক ভিটে ***  দত্ত দ্বারিয়াটোন গ্রাম,অম্বিকা কালনা





গ্রামের নাম দত্ত দ্বারিয়াটোন।  পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার এক প্রান্তিয় গ্রাম।অনেকের কাছে এই গ্রামের নাম অজানা। তবে এর পরিচয় জানতে পারলে অবশ্যই আপনার মন আনন্দে ভরে উঠবে। এই গ্রামেই বাস করতেন স্বামী বিবেকানন্দের পূর্ব পুরুষেরা।




নথি ঘাটলে জানা যায় যে দত্ত পরিবারের বংশধর হিসাবে সেখানে শেষ বসবাস করেছিলেন সুধাংশ শেখর ঘোষ। তিনি সম্পর্কে ছিলেন স্বামীজীর ভাগ্নে। তিনি চলে যাওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পরে তাঁদের ঐতিহাসিক বাড়ি। অবশ্য স্বামীজী নিজে কখনও আসেননি এই পৈতৃক ভিটায়। তবে স্বামীজির ভাই শ্রী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর  " প্রফেট  অ্যান্ড প্যাট্রিয়ট " গ্রন্থে তাঁদের আদি বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন।  এই গ্রামে এসে তাঁদের পৈতৃক ভিটের সীমানা চিহ্নিত করে যান। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ীই ভিটে সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠে দত্ত দ্বারিয়াটোন স্বামী বিবেকানন্দ  উচ্চ বিদ্যালয়।





আরও জানা যায় যে রাজা বল্লাল সেন দক্ষিণ রাঢ়ীয় নয়টি কায়স্থ বংশকে সম্মানিত করেছিলেন।  দত্ত বংশ এদের মধ্যে একটি। মোগল সম্রাটের সময় থেকে দীর্ঘকাল ধরে দত্তরা এই গ্রামে সুখে সাচ্ছন্দে বসবাস করতেন।  তারই ছিলেন গ্রামের জমিদার। দত্ত পরিবারের কর্তা ছিলেন নবাব বাহাদুরের দেওয়ান। দত্ত মহাশয়ের মানুষের প্রতি উদারতা ও ভালোবাসায় প্রীত নবাব এই গ্রামের নাম রাখেন "দত্ত দ্বারিয়াটোন"। দত্ত মহাশয় তাঁর নয় পুত্রের নামে নয়টি পুকুর কাটান। "তালপুকুর " ছাড়া আর সবকটিই এখন ভরাট হয়ে গেছে। আর ইনাদের বাড়ীর পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে "বেহুলা" নদী। ব্রিটিশ শাসনের শুরুতেই বিবেকানন্দের পূর্বপুরুষ রামনীধি দত্ত  গ্রাম ছেড়ে তাঁর পুত্র রামজীবন দত্ত ও পৌত্র রামসুন্দর দত্ত সহ সকলে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে বসতি স্থাপন করেন। তখন কলকাতা ছিল এক গন্ড গ্রাম।  পরে ব্রিটিশরা ফোর্ট উইলিয়াম তৈরি করলে তাঁরা সেখান থেকে উঠে এসে কলকাতার সিমলায়  নতুন বাড়ী তৈরী করেন। রামনিধি ও রামজীবন উচ্চ পদে চাকরি করতেন। তারপর রামসুন্দর দত্ত ছিলেন স্থানীয় জমিদারের দেওয়ান ।তাঁর পাঁচ পুত্রের মধ্যে জোষ্ঠপুত্র রামমোহন দত্ত সুপ্রীম কোর্টের এক ইংরেজ অ্যাটর্নির ম্যানেজিং  ক্লার্কের কাজ করতেন।  ফলে তাঁর  মাসিক উপার্জন প্রচুর ছিল। তিনি কলকাতার গৌরমোহন ষ্ট্রীটে বিরাট বাড়ী তৈরী করেন। রামমোহন দত্তের দুই পুত্র ও সাত কন্যা। পুত্ররা হলেন দুর্গাপ্রসাদ ও কালীপ্রসাদ।  দুর্গাপ্রসাদের এক পুত্র ও এক কন্যা। পুত্র হলেন বিশ্বনাথ দত্ত যিনি কিনা বিবেকানন্দের পিতা। দত্ত দ্বারিয়াটোন গ্রামে তাদের ঘর দালান কিছু না থাকলেও বাস্তুভিটার ৪৪ শতক জমি পরেছিল।  বর্তমান বেলুড়ের বাসিন্দা গৌতম ঘোষ ও সুকান্ত ঘোষ দত্ত পরিবারের আত্মীয ও ঐ জমির মালিক।২০২৩ সালে স্বামী বিবেকানন্দের ১৬১ তম জন্মদিনে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর পৈতৃক বাসভূমির জমি হস্তান্তর করা হয় বেলুড় মঠকে। এখানে রয়েছে স্বামীজির একটি অবয়ব মূর্তি। বর্তমানে সেই ভিটের রক্ষনাবেক্ষন করে মঠ কর্তৃপক্ষ। 





গত ৪০-৪৫ বছর আগেও সেখানে একটি দোতলা বাড়ীর  ভগ্নাবশেষ ছিল।  সেই বাড়ীর একটি প্রাচীরও ছিল।  শোনা যায় পরবর্তী সময়ে নটী বিনোদিনী যাত্রা পালার জন্য দত্ত পরিবারের বাড়ীর ঐ অংশের পাঁচিল ভেঙ্গে সমতল করা হয়েছিল।  তারপর থেকে বিবেকানন্দের পৈতৃক ভিটে একবারেই ফাকা। বর্তমানে ওখানে একটি ঘর তৈরি করা হয়েছে। আর সেখানেই রাখা হয়েছে  স্বামীজির মূর্তি। 












কালনা রেল স্টেশন থেকে এই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৪ কি মি।টোটো বা অটো পাওয়া যায়। এছাড়া যদি কেউ  সড়ক পথে যেতে চান, তবে কালনা-বৈঞ্চী রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে হবে। ঝাড়ুবাটি গ্রাম পেরিয়ে একটু এগোলেই রাস্তার বাঁ পাশে দেখতে পাবেন স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি। তার পাশ দিয়ে যে রাস্তা বাঁ দিকে চলে গিয়েছে তা সোজা দত্ত দ্বারিয়াটোন গ্রামে গিয়েছে। কিছুদূর এগিয়েই বাঁ পাশে দেখতে পাবেন স্বামীজির আদি পৈতৃক ভিটে।





গ্রামের বাসিন্দাদের দাবী স্বামীজির স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানকে সুন্দরভাবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচিত করা হউক।  সেজন্য সেখানে গ্রন্থাগার,  সংগ্রহশালা তৈরী করা যেতে পারে। পর্যটন মানচিত্রে এই ঐতিহাসিক স্থানকে  পাকাপাকিভাবে স্থান দিতে প্রশাসনকে বারবার অনুরোধ করছেন।  এখানে আসার জন্য প্রাধান রাস্তার বাসস্টপেজের নাম স্বামীজির নামে নামকরন করা হউক। কালনা শহর থেকে সহজেই যাতে এখানে আসা যায় তার ব্যবস্থা করা উচিত।  স্বামীজির এই ভিটে সংরক্ষণের দাবিতে সরব হয়েছেন কালনা মহকুমা ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বচর্চা কেন্দ্রও। তবে আশার কথা এই যে এ ব্যাপারে মহকুমা প্রশাসন উদ্যোগী হয়েছেন।  স্বামী বিবেকানন্দের আদি পৈতৃক ভিটের যথাযথ মর্যাদা পাবার আশায় দিন গুনছে দ্বারিয়াটোনের গ্রামবাসীরা। এহেনো বীরকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই এই গ্রামের বাসিন্দাদের।