Friday, 13 November 2020

কুমারী পূজা ও বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ

 

কুমারী পুজো ও বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দ  ^*^*^*^*^*^




সেকালের মুনিৠষিরা কুমারী পুজোর মাধ্যমে প্রকৃতিকে পুজো করতেন।  প্রকৃতি মানে নারী।সেই প্রকৃতিরই আরেক রূপ , কুমারীদের মধ্যে দেখতে পেতেন তারা। তারা বিশ্বাস করতেন মানুষের মধ্যেই রয়েছে ঈশ্বরের অযুত প্রভাব। কারন মানুষ চৈতন্য যুক্ত।  আর যাদের সত্ মন কলুযতামুক্ত , তাদের মধ্যে আবার ঈশ্বরের প্রকাশ বেশি। কুমারীদের মধ্যে এই গুনগুলি থাকে মনে করেই তাদের বেছে নেওয়া হ্য় এই পুজোর দেবী হিসেবে।

কুমারী পুজোর প্রচলন মহাভারতীয় যুগ থেকে শুরু করে আজও ভারতের নানা প্রান্তের মঠমণ্দিরে   এমণকি কামাখ্যা ও নেপালেও এই পুজো হয়ে আসছে মহাসমারোহে।  মহাভারতে অর্জুনের ভদ্রকালীর বন্দনার কথা যেমন আছে , তেমনই উল্লেখ আছে কুমারী পুজোর কথা। এদেশে মন্দির নির্মাণ করে দেবী পার্বতীকে কুমারী মূর্তিতে পুজোর প্রচলন সম্ভবত দক্ষিণ ভারতের কন্যাকুমারীতে। আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে সাগরতীরে এখানে বসেই দেবীদর্শনে ভাবাবেশে চোখের জলে বুক ভাসিয়েছিলেন শচীনন্দন মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য। তান্ত্রিক মতবাদের প্রতিফলন বলে সমস্ত শক্তিপীঠেই কুমারী পুজো করা হুয়। তবে দেবীতীর্থ কামাখ্যাতে তীর্থযাত্রীরা প্রতিদিনই  কুমারী পুজো করে থাকেন।  বৃহদ্ধর্ম পুরাণের কথায় , দেবী অম্বিকা কুমারী কন্যারুপে আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবতাদের সামনে, নির্দেশ দিয়েছিলেন বেলগাছে দেবীর বোধন করতে। দেবীকে কুমারী নামে অভিহিত করা হ্য়েছে তৈত্তিরীয় আরণ্যকে। একমাত্র কন্যাকুমারীর মন্দিরে দেবীনামের ঐতিহ্য বহন করছে কুমারী প্রতিমার পুজো করে। 




 কুমারী পূজা হলো তন্ত্রশাস্ত্রমতে অনধিক ষোলো বছরের অরজঃস্বলা কুমারী মেয়ের পূজা। বিশেষত দুর্গাপূজার অঙ্গরূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কালীপূজাজগদ্ধাত্রীপূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে।


পৌরাণিক উপাখ্যান

শাস্ত্রমতে কুমারী পূজার উদ্ভব হয় কোলাসুরকে বধ করার মধ্য দিয়ে থেকে। গল্পে বর্ণিত রয়েছে, কোলাসুর এক সময় স্বর্গ-মর্ত্য অধিকার করায় বাকি বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর শরণাপন্ন হন। সে সকল দেবগণের আবেদনে সাড়া দিযে় দেবী পুনর্জন্মে কুমারীরূপে কোলাসুরকে বধ করেন। এরপর থেকেই মর্ত্যে কুমারী পূজার প্রচলন শুরু হয়।



বর্ণনানুসারে কুমারী পূজায় কোন জাতি, ধর্ম বা বর্ণভেদ নেই। দেবীজ্ঞানে যে-কোন কুমারীই পূজনীয়, এমনকি বেশ্যাকুলজাত কুমারীও। তবে সাধারণত ব্রাহ্মণ কুমারী কন্যার পূজাই সর্বত্র প্রচলিত। এক্ষেত্রে এক থেকে ষোলো বছর বয়সী যে কোনো কুমারী মেযে়র পূজা করা যায়। বয়সের ক্রমানুসারে পূজাকালে এই সকল কুমারীদের বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়।

  • এক বছরের কন্যা — সন্ধ্যা
  • দুই বছরের কন্যা — সরস্বতী
  • তিন বছরের কন্যা — ত্রিধামূর্তি
  • চার বছরের কন্যা — কালিকা
  • পাঁচ বছরের কন্যা — সুভগা
  • ছয় বছরের কন্যা — উমা
  • সাত বছরের কন্যা — মালিনী
  • আট বছরের কন্যা — কুষ্ঠিকা
  • নয় বছরের কন্যা — কালসন্দর্ভা
  • দশ বছরের কন্যা — অপরাজিতা
  • এগারো বছরের কন্যা — রূদ্রাণী
  • বারো বছরের কন্যা — ভৈরবী
  • তেরো বছরের কন্যা — মহালপ্তী
  • চৌদ্দ বছরের কন্যা — পীঠনাযি়কা
  • পনেরো বছরের কন্যা — ক্ষেত্রজ্ঞা
  • ষোলো বছরের কন্যা — অন্নদা বা অম্বিকা

দার্শনিক তত্ত্বম্পাদনা

কুমারী পূজার দার্শনিক তত্ত্ব হলো নারীতে পরমার্থ দর্শন ও পরমার্থ অর্জন। বিশব ব্রহ্মাণ্ডে যে ত্রিশক্তির বলে প্রতিনিয়ত সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় ক্রিয়া সাধিত হচ্ছে, সেই ত্রিবিধ শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী জাতির প্রতীক ও বীজাবস্থা। তাই কুমারী বা নারীতে দেবীভাব আরোপ করে তার সাধনা করা হয়। এ সাধনপদ্ধতিতে সাধকের নিকট বিশ্বজননী কুমারী নারীমূর্তির রূপ ধারণ করে; তাই তার নিকট নারী ভোগ্যা নয়, পূজ্যা। পৌরাণিক কল্পকাহিনিতে বর্ণিত আছে, এ ভাবনায় ভাবিত হওয়ার মাধ্যমে রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব নিজের স্ত্রীকে ষোড়শীজ্ঞানে পূজা করেছিলেন।

শিশুকন্যাকে কুমারী রূপে পুজো করার এক সূক্ষ্ম নিদর্শন রয়েছে ‘বৃহদ্ধর্ম পুরাণ’-এ। সেখানে রয়েছে, রাম কর্তৃক রাবণবধের জন্য দেবতারা ব্রহ্মার কাছে যজ্ঞ করার অনুমতি চাইলে ব্রহ্মা দেবীকে জাগরিত করার কথা উল্লেখ করেন। দেবতারা তখন আদ্যাশক্তির স্তব করলেন। সেই স্তবে সন্তুষ্টা হয়ে এক কুমারী দেবী আবির্ভূত হয়ে দেবীর বোধন করে পুজো করতে নির্দেশ দিলেন।

সেই নির্দেশ মতো ব্রহ্মা দেবতাদের সঙ্গে পৃথিবীতে এসে ঘুরতে ঘুরতে এক নির্জন স্থানে বেলগাছের একটি পাতায় সোনার বরণ এক শিশুকন্যাকে নিদ্রিতা দেখে তাঁকে‘বিশ্বপ্রসবিনী জগজ্জননী মহামায়া’ বলে স্তব করেছিলেন। ব্রহ্মার সেই স্তবেই শিশুকন্যা জাগরিতা হয়ে দেবীরূপে আবির্ভূতা হয়েছিলেন এবং দেবতাদের অভীষ্ট পূরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।


আমাদের আরাধ্যা মৃন্ময়ী নয়, সেযে চিন্ময়ী আরাধনা। রমণীর মাঝে জননীর দর্শন। এক প্রকৃতির মাঝে বিশ্বপ্রকৃতির অবলোকন— তা সহজ সরল ভাষায় বোঝাতেই কুমারী পুজোর নির্দেশ। মহামায়ার মহাপুজোয় তাই কুমারী পুজোর এত গুরুত্ব।

কুমারী পুজো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে তন্ত্রশাস্ত্রে। দুর্গার রূপ ধরে নিয়েই পুজো করা হয় কুমারীকে। কুমারীকে স্নান করিয়ে পরানো হয় নতুন বস্ত্র, নানা আভরণ। সাজানো হয় ফুলের মালা ও মুকুট দিয়ে। পায়ে আলতা পরিয়ে কপালে দেয়া হয় কুমকুমের টিপ। কুমারীকে রাখা হয় অভুক্ত অবস্থায়। আসনে এমনভাবে বসানো হয় যাতে তার কোনও কষ্ট না হয়ে আনন্দলাভ করে। এবার অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সামনে বসিয়ে কুমারীকে পুজো করা হয় দেবীজ্ঞানে। এ পুজো হয় নিজ অধিকার ও সামর্থ্য অনুসারে বিধি ও রীতি মেনে।


স্বামী বিবেকানন্দ  প্রথম কুমারী পূজা করেন  1898 সালে , তাঁর  কাশ্মীর ভ্রমণকালে। তিনি যখন 1898 সালে কাশ্মীর ভ্রমণে গেছিলেন,  তখন তিনি এক মুসলমান মেয়েকে কুমারীপূজা করেছিলেন।  তিনি জাতপাতের উর্ধ্বে দেবী দর্শন করেন।  দেবীত্ব ও মাতৃত্ব কারোর একচাটিয়া সম্পদ নয়। মাতৃত্ব ও দেবীত্ব প্রতিটি নারীর আজন্ম সম্পদ। স্বামীজির ধ্যানে ও দর্শনে তা প্রমাণিত।  তাই তিনি মুসলমান কন্যার মধ্যে দেবীত্বের সন্ধান পেরেছিলেন।   1899 সালে তিনি কন্যাকুমারী সহরে ডেপুটি একাউন্ট্যণ্ট জেনারেল  মণ্মথ ডট্টাচার্যের কন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করেছিলেন।  1901 সালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে দূর্গা পূজা ও কুমারী পূজা শুরু করেন। এই পুজোয় তিনি নয় জন কুমারীকে পূজা করেন।  এখন বেলুড়মঠে একজনকে করা হয়ে থাকে। এটাই নাকি শাস্ত্রীয় নীতি। স্বামীজির দিব্যদৃষ্টিতে সকল কুমারীই দেবীর এক একটি রূপ। সেই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তিনি পুজা করেছিলেন  9 জন কুমারীকে এবং এই পুজোর দ্বারা যেন একটা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। 



মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী দেবী মন্দিরে ও কন্যাকুমারীতেও মহা ধুমধামের সঙ্গে কুমারী পুজো হয়।কথিত আছে, কুমারীপুজো ছাড়া হোম-যজ্ঞ করেও দুর্গাপুজোর সম্পূর্ণ ফল পাওয়া যায় না। 

1901 সালে বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজা হয় আর তা স্বামীজির ইচ্ছে ও তত্ত্বাবধানেই। প্রথম সেই দুর্গাপূজোয় জগজ্জননী মা সারদা উপস্থিত ছিলেন  এবং ওই  পুজো মায়ের নামেই সঙ্কল্পিত হয়। মায়ের নামে সেই সঙ্কল্পের ধারা অজও চলে আসছে। ঐ বছরে স্বামীজি তাঁর শিষ্য  শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে রঘুনন্দনের অষ্টবিংশতি-তত্ত্ব নিয়ে আসতে বললেন।  শিষ্য স্বামীজির কাছে জানতে চাইলেন ___ এ রকম একটি কুসংস্কারে ভরা বই নিয়ে তিনি কি করবেন  ? স্বামীজি তার উত্তরে জানিয়েছিলেন  যে ---- তিনি এ বার মঠে দুর্গাপূজা করতে চান।  তাই  দুর্গাপূজার বিধি পড়বেন তিনি।শিষ্য সেই বই আনেন এবং স্বামীজি দ্বিগুণ উত্সাহে পুজোর জন্য ঝাপিয়ে  পড়েন।  ঠিক করেন মঠে মাটির প্রতিমার পুজোর আগে তিনি চিন্ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করবেন।  এবং সেই জ্যান্ত দুর্গা মা সারদা । কারণ মা সারদা স্বামীজির কাছে সকল শক্তির উৎস।  সেই  মহাশক্তির  পূজোই  তিনি চেয়েছিলেন। 

 


বেলুড়  মঠে দুর্গাপূজো হবে তার  অনুমতি পাওয়া গেল মায়ের কাছ থেকে আর খুব কম সময়ের মধ্যে এই দুর্গাপুজোর আয়োজন হয়।  কুমারটুলি থেকে প্রতিমা এসেছিল। স্বামী ব্রহ্মানন্দ সমস্ত জিনিস তথা সামগ্রীর ব্যবস্থা করেছিলেন।  পূজকের আসনে বসেন  কৃষ্ণলাল নামে ব্রহ্মচারী । তন্ত্রধারক স্বামী রামকৃষ্ণানন্দের পিতা ঈশ্বর চন্দ্র ভট্টাচার্য।  বোধনের আগের দিন মা সারদা তথা জ্যান্ত দুর্গা বেলুড় মঠের পাশে একটি বাড়িতে অবস্থান  করছিলেন।  পূজোয় মায়ের আদেশ অনুসারে পশু বলি নিষিদ্ধ হয়। 

স্বামীজির  গৃহী শিষ্য  শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীর  লেখা থেকে পাই  ----' মহা সমারোহে দিনত্রয়ব্যাপী মহোৎসব কল্লোলে মঠ মুখোরিত হইল। নহবতের সুললিত তানতরঙ্গ গঙ্গার পরপারে প্রতিধ্বনিত হইতে লাগিল।  ঢাক ঢোলের রুদ্র তালে কলনাদিনী ভাগীরথী নৃত্য  করিতে লাগিল।  যে পূজায় শ্রী শ্রী মাতাঠাকুরানী স্বয়ং উপস্থিত,  যাহা স্বামীজির সঙ্কল্পিত,  দেহধারী দেব সদৃশ  মহাপুরুষগন যাহার কার্যসম্পাদক , সে পূজা যে অছিদ্র হইবে তাহাতে আর বৈচিত্র্য  কি ?? দিনত্রয়ব্যাপী পূজো নির্বিঘ্নে কাটিল। গরীব দু:খীর ভোজন-তৃপ্তি সূচক কলরবে মঠ তিন দিন  পরিপূর্ণ  হইল।'


প্রত্যক্ষদর্শী কুমুদবন্ধু সেন তাঁর বিবরনীতে লিখেছেন  ::: "  31শে আশ্বিন, ই: 17ই অক্টোবর,  বৃহস্পতিবার   সাধু ব্রহ্মচারী শ্রীশ্রীদূর্গাপ্রতিমা নৌকায় করিয়া মঠের ঘাটে তুলিলেন ---- ধীরে ধীরে যত্ন সহকারে ঠাকুর ঘরের নীচের দালানে প্রতিমা রাখা হইল। কিছুক্ষন পর প্রবল বৃষ্টি ___ আকাশ যেন ভাঙ্গিয়া পড়িল।  মঠের জমিতে উত্তর দিকে যেখানে শ্রীরামকৃষ্ণের জন্ম মহোৎসবে এখন বৃহত মন্ডপ নির্মিত হয় -- সেখানে সেবার শ্রীশ্রীদুর্গাপ্রতিমার প্রকান্ড মন্ডপ তৈরি হইয়াছিল।  জলঝড় হইলেও যাহাতে কোনও প্রতিবন্ধক তৈরি না হয়, সেরূপ সাবধানতার সাথে মন্ডপটি তৈরি হইয়াছিল। "

অন্য এক প্রত্যক্ষদর্শীর ডায়েরী থেকে যানা যায় ***** কলকাতা থেকে প্রচুর  ভক্ত এসেছিলেন পূজো দেখতে। শ্রীশ্রীমায়ের নামে সঙ্কল্প হয়েছিল।  স্বামীজি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।  ওই দিন মানুষের ভিড় উপচে পড়েছিলো। চারদিকে যেন আনন্দের হাট। সন্ধিপুজোয় স্বামীজি পুষ্পাঞ্জলি দেন। কুমারী পূজাও অনুষ্ঠিত হয়। স্বামীজি নিজে একাধিক কুমারীর পূজো করেছেন  এই প্রথম দুর্গাপূজায়। কুমারী পুজোর ব্যবস্থা করেন ঠাকুরের শিষ্যা গৌরিমা। ন'জন কুমারীর পুজা করা হয় । সকল কুমারীর তথা জীবন্ত প্রতিমার পায়ে ফুল ও অঞ্জলী দেন স্বামীজি , হাতে দেন মিষ্টি। তিনি এমনই ভাবাবিষ্ট হয়ে পড়েন যে একজন অল্পব্য়স্ক কুমারীর কপালে রক্তচন্দন পড়ানোর সময় শিউরে ওঠেন  এবং বলেন়ঃ আহা, দেবীর তৃতীয় নয়নে লাগেনি তো।



পাঁচ  থেকে সাত বছরের কুমারী বালিকাকে এখন প্রতিমার পাশে বসিয়ে দেবী ঞ্জানে পূজো করা হয়। দুর্গাপুজোর সাথে কুমারী পুজোর এই চল সম্ভবত তান্ত্রিক মতে। দেবী দুর্গা কারও গর্ভজাত নয়। দেবগণের পঞ্জীভূত শক্তি তিনি, সয়ংসিদ্ধা। আর বৃহদ্ধর্ম পুরাণের মতে দেবী   চন্ডিকা কুুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে আবির্ভূতা হন। অন্য   দিকে , ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কুমারী কে   ভগবতীর অংশ বলেছেন।  কুমারীর মধ্যে দেবী ভাবের প্রকাশ দেখা বা তাকে জননী রুপে পূজো , শুদ্ধ   ভাবেের প্রকাশ।  

বেলুড় মঠের এই প্রথম দুর্গাপুজোয় দশমীতে প্রতিমার বিসর্জন অনুষ্ঠানও  হয় খুব জাক করে। নৌকায় প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গায়। ঢাক, ঢোলে,বাজনা নাচের  মহানন্দে প্রতিমার বিসর্জন হয়। পূজো শেষ হলে পরের দিন  মা ফিরে যান  বাগবাজারে। আজও দুর্গাপুজোয় বেলুড় মঠের সেই আনন্দধারা বয়ে চলেছে ভাগীরথীকে সামনে রেখে। তবে স্বামীজির এটি প্রথম দুর্গাপুজো যেমন , তেমনই শেষ দুর্গাপুজোও। কারন পরের বছর 1902 - এ স্বামীজি রামকৃষ্ণালোকে পাড়ি দেন। 

( সংগৃহীত  )

 

Thursday, 1 October 2020

শ্রীরামকৃষ্ঞের অন্ত্যলীলা বৃত্তান্ত

শ্রাব শেষ দিন..... পরম পুরুষ শ্রী রাম কৃষ্ণদেবের বিদায়ের দিন :

শ্রাব শেষ দিন, রবিবার ১৫ই আগষ্ট। পরমহদেবের মহাপ্রয়ান ১৫ আগষ্ট, তা নিয়ে ১৬ ধন্দ আছে। স্বামী প্রভানন্দ লিখেছেন, ১৬ই আগষ্ট। কিন্তু কার্ড ডেথ রেজিস্ট্রে উল্লেখ ১৫ইষ্ট। এর কারণ মধ্যরাত্রে ঘট, রাত একটার আগে পরিষ্কার নয়। ভক্তরা তখনও ভাবছেন সমাধি এবং সকাল পর্যন্ত তাঁর সমাধিভরের বুকে পিঠ ঘি মালিশ করা হচ্ছে। 

শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম ছবি

কাশীপুরের অন্ত্যলিলা পর্বে সেবকের অভাব হয়নি। মধ্যে নরেন্দ্রনাথও সারাভাগে। অনেক কাজ_____এর সাথে যোগাযোগ যোগাযোগ করা, রোগীর পথ সংগ্রহ করা, হাটবাজার করা। পরবর্তী কালে স্বামী অভেদানন্দ, তখনকার কালীপ্রসাদ, কিছু বিবরণ বর্ণনা---- প্রথম আমরা তিনজন সেবা-শুশ্রুষা করি। শ্রীমা শ্রী শ্রী ঠাকুর পথ্য রন্ধন করিতেন। পরে সেবগনের সংখ্যা বাড়ায় একজন পাচক ব্রাহ্মন
সামাজিক করতে হয়। সেবক লাটু মহারাজের বর্ণনা :: লরেন ভাই, রাখাল ভাই, শরোট ভাই, শশী ভাই, বুড়ো গোপাল দাদা, ছোট গোপাল ভাই, কালী ভাই, নির্জন ভাই, বাবুরাম ভাই ---- এরা সব বাড়ি ছেড়ে রয়ে গেল। দেন যোগীন্দ্র ও তারকা। সকলের জানাই যে তা নরেন্দ্রনাথের, বিশ্বসুত্রে যায়।

ভক্ত পরিবৃত হওয়াও মূল্য নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা ছিল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের। কেরা ছাপোষা বার এত টাকা পৌঁছানোর সুবিধা কেন? ঠাকুরের কথায় বলরাম বসু পথের খরচ দিতে রাজি।  "যতদিনে দক্ষিনেশ্বরে থাকতে বোতল, আমার খাবারের খরচটা তুমি দিও।" রামবাবু আমাদের সব খরচা দিতেন। 'শ্রীম' এই চীফ বলেছেন-^-^-^- টাকাপয়সা নেই যত ভক্ত নড়েভোলা আসতে পারেন ঠাকুর হাসসাহাসি। বলতে বলতে ' ক'খানা গাড়ি আসা।' তখন ঠাকুরের রসিকতা ' মোটে এই"। খরচের বারাবারি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে যে মনকষাকষি হয়েছিল, তা পুথিকার দৃষ্টি এড়ায়নি। 

করিতেছে অপব্যয় শোভা নাহি পায়, 
সমান রাখতে হবে তুলিয়া খাদার। 

এই হিসেব এত কথায় নরেন চটে বলো" হিসেব রাখা কেন? ঠাকুর নিজেও বলতে বলতে "গেরস্তের রক্ত ​​জল করা অর্থ খরচ না করা। সেবকেরা যে ব্যায় কমের প্রস্তাবে খুশি হননি, তা বরুণ মহারাজ বিস্তৃত লিখেছেন। কেউ কেউ চেয়েছিলেন-তিন জনই যথেষ্ট সেবকেরা বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন। সৃষ্টি নরেন্দ্রনাথের ইচ্ছায় সায় দিয়ে ঠাকুর বলেছিলেন "আমি তোরাবি যেথায়।"

নরেন্দ্রনাথ স্থিরপথ, ভিক্ষা করেই খরচপত্র চালাবেন। সেই মতো নরেন্দ্রনাথ-সহ ক্ষমতার অবাধ মহিলা শ্রীমায়ের আশিবাদ নিয়ে ভিক্ষায় বার হয়েছিলেন এবং সেই বিশ্বাসী ভিক্ষান্ন থেকে শ্রীমা তরল মন্ড তৈরি করে ঠাকুরকে পথ দেন। মনে হয়, এই মাড়োয়ারিদের সহায্য দলের কথা বলা ছিল। আপনি টাকাকড়ি নিয়ে তৈরি করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার প্রয়োজন হতে হবে। এ অবস্থার অর্থসাহায্য নরেন্দ্রনাথকে আরও একজনের কাছে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন, সেখানে আরও _________________________________ পিকপাড়ার জমিদার ইন্দ্রনারণ সিংহ ও গিরিশচন্দ্র ঘোষ, সমস্ত মূল্যবোধের দায়িত্ব রাজি হয়ে উঠেছেন "আমিই সব খরচা দেবো যখন বলতে পারব না, তখন চেষ্টা করব। । 

এর মধ্যে নমো নমো পালন করে ঠাকুরের জন্মোৎসব হয়েছিল কাশীপুরে এবং বড় খবর, উপহার পাওয়া একজোড়া চটিজুতো চুড়ি। তার সাথে যে চটিজুতো আনা হয়, তা এখনও বেলুড় মেঠে পুজো হয়, তাও বরুণ মহারাজতে ভোলেননি। তিনি আরও একটি বান সংবাদদাতা:: তখন 'ঠাকুর' নামটাও বলা হয়নি, শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে "পরমহংসমশায়" বা "পরমহংসদব" বলতে। 

 সেবকদের দিবারাত্র সেবাকার্য সম্বন্ধে স্বামী শিবানন্দ লেখক।....... রান্না করার পাচক অনুরোধ সর্বোচ্চ হলে সেবকরাই পালা করে রাঁধত ---- ডাল ভাত চড়ি ঝোল। স্থায়ী চড়িতে ফোর্ন দেবার সময়ে গন্ধ পাওয়া ঠাকুর জিঞ্জাসা বলেন, "কি রান্না হচ্ছে তোরা? যা আমার জন্য নিয়ে আয়। সেই চড়ির শক্তি তিনি ঠিক করতে পারেন। সেবদের শরীর সম্বন্ধে শ্রীরামকৃষ্ঞের উদ্বেগ কম নয়। , তোমরা বাপূ অসময়ে-দাওয়া করো না।' 

ঠাকুরের গঠন উলের কোট




সংখ্যাটা গোড়া কথামৃতকার শ্রীম খবর পান, ঠাকুরের অসুখ খুব বড়ছে এবং তিনি রক্তবমি করছেন। "ডাবরে যায় রক্তে। অসহ্য যন্ত্রাংশে তিনি জঞ্জায়। স্বামী গম্ভীরন্দ লিখেছেন ' নরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পথের পথের পর তাঁহার নিষ্ঠীবন মিশ্রিত পথের পাত্রি হস্তে লইয়া অম্লানবদনে পান করি। ' তাঁকে করে নির্জন, শশী ( পরে রামকৃষ্ন্নন্দ) ও শরৎ (ভবিষ্যতে স্বামী সারদানন্দ) রক্ত ​​পান করেন। 

ঠাকুরের পেটের রোগের কথাও উঠতে পারে, এই রোগের দিন তাঁকে। ফাস্ট হোমিওপ্যাথি ডক্টর রাজেন্দ্রলাল দত্ত (ডাক মহেন্দ্রলাল মানুষ গুরু) শুধু ঠাকুরের চিকিৎসাই করেন, রোগীর শান্তিপূর্ণ কথা বলা কোমল চটি নিজের হাতে রামকৃষ্ণদেবকে পরিয়ে দেন। তাঁর শান্তি শ্রীরামকৃষ্ন মাসাধিক কাল ভালো ছিলেন। এক সময়ে পাশ যেমন কাশির সামনের ডক্টররাঁঠার, সুরুয়া নির্দেশে নির্দেশ। ঠাকুর বললেন " যে দোকানে কালী মূর্তি আছে, বাগান থেকে মুসলিম আনবি। কখনো তেজপাতা ও আলু মশলা দিতুম, তূলোর মতো সিদ্ধ হলে নামিয়ে নিতুম।' এই সময় শ্রীরামপুর থেকে দৈব গঠনও আনা হয়, যা সঙ করে দিয়েছিলেন  "শ্রীশ্রীরাম কৃষ্ণ কথামৃত" অমৃত কথাকার মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত। হরিতার সঙ্গে জনৈক কবিরাজ যে হরিতাল স্মরন দিয়েছিলেন তাও যন্ত্র তারিত ঠাকুুর বিনা প্রতিবাদে বাধ্যতামূলক।


 


স্বামী প্রভানন্দ___ বরুণ মহারাজ নামে পাঠকমহলে যিনি সুপরিচিত,  সমস্ত টুকিটাকি সংগ্রহ করে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অন্ত্যলীলার বিবরণ দিয়েছেন।  তিনি লিখেছেন জানুয়ারির গোড়ার দিকে নরেন্দ্রনাথ একবার বাড়ি যান এবং তাঁর মা সেই সময়ে হরিণের মাংস খাওয়ান। একই সময়ে ডাক্তারা পরমহংসেদবকে গুগলির ঝোল খেতে বলায় শ্রীমা একটু ইতস্তত করায় ঠাকুর তাঁর সহধর্মিণীকে বলেন  "ছেলেরা পুকুর থেকে গুগলি এনে তৈরি করে দেবে , তুমি রান্না করে দেবে।  " এক সময় খাওয়ার খুব কষ্ট ছিল।  শ্রীমা বলছেন  ' এক একদিন নাক দিয়ে গলা দিয়ে সুজি বেড়িয়ে পরতো, অসহ্য কষ্ট হতো।  ' রোগ নিরাময়েরজন্য রামকৃষ্ণদেবের প্রায়শ্চিত্তের কথাও উঠেছিল।  এক সময় তিনি বলেছিলেন  " ও রামলাল,  তুই দশ টাকা নিয়ে দক্ষিনেশ্বর যা, মা কালীকে নিবেদন করে বামুন টামুনদের বিলিয়ে দে।"


বরূণ মহারাজ পরমহংসেদবের অসুখ সম্বন্ধে আরও লিখেছেন *^*^^^ রোগা হয়ে দক্ষিনেশ্বর মন্দির থেকে সুচিকিত্সার জন্য ডক্টর মহেন্দ্রলাল আক্রান্ত পরামর্শে পরে, কাশীবাড়িতে 11ই ডিসেম্বর 1885 তে এসে শ্রীপুর কৃষ্ণ সেখানে 247 দিন অতিবাহিত। গত বছর জুলাই মাসে পরামর্শ পড়ে তাঁর গলরোগের উপসর্গ এবং ডক্টর বাগবাজার বলরাম বসুর বা সাতদিন এবং শ্যাপুকুর সত্তর দিন কাতর ছিলেন। দক্ষিনেশ্বর লিভ ফাইভিং কারণ শ্রীরামকৃষ্ণ দেব বিকাশ বলেছেন  "ওখানকার ঘর স্যাতস্যতে। বাহ্য করবার সুবিধা নেই।"

দক্ষিনেশ্বর ছাড়ার তিন দিন আগে তিনি তাললায় ডক্টর দুর্গাচরণ বন্দোপাধ্যায়ের চেম্বারে গিয়েছিলেন। ডক্টর সম্বন্ধে ঠাকুরের নেতাদের মন্তব্য " দুর্গাচরণ ডক্টর, এ তো মাতাল, চব্বিশ ঘন্টা মদকে থাকতে, কিন্তু বেলায়, পরীক্ষা করবার সময় ভূল হবে না।"

শ্যামপুকুরে স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতি নরেন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন, ঠাকুর দক্ষিনেশ্বরে ফিরে চলুন, সেখানে কালী আছেন। ঠাকুরের ইচ্ছা তাই, কিন্তু রানি রাসমনির পৌত্র ত্রৈলোক্যের অসহযোগিতা তা সম্ভব হয়নি। তাই কাশিপুর। এই উদ্যাণবতী ভক্ত ডক্টর মহিমচন্দ্র দত্ত খুঁজে পেতে মহিমাচরণ চক্রবর্তী সাহায্যে, মাসিক ভাড়া আশি টাকায়। এত টাকা ভাড়া চিন্তিত ঠাকুর প্রিয় শিষ্য সুরেন্দ্রনাথ মিত্রকে বলেছিলেন  "বাড়িভাড়াটা তুমি দিও।" সুরেন্দ্রনাথ ন'মাস এই ভাড়ার জবাবদিহিতা।

মার্চ মাস মাঝামাঝি আট মাস হোমিওপ্যাথিক নির্বাচনে জয় ফল না পাওয়ার ভক্ত ডক্টর দত্ত মেড অংশগ্রহণের অধ্যক্ষ ডক্টর এম কোটসকে নিয়ে চন্দ্রা। পাল ঠাকুরের ভালনি, দেখতে যাবার পর ঠাকুরের নির্দেশে বিছানাপত্রে গঙ্গাজল আমি দিতে হবে। এক ভক্ত ( ভাই ভূপতি ) ডক্টরের বত্রিশ টাকা ভিজিট দেন। কেউ কেউ বলেন, কোটস টাকানি। 

এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে পরিস্থিতি মোটেই ভালো নয়। ডাঃ রাজেন্দ্র দত্ত এক সময়ে ডাঃ মহেন্দ্র লোভের সাথে পরামর্শ করেন এবং ডাক্তার সরকার তার দিনলিপিতে লেখেন "আগামীকাল অপরাহ্নে তাঁকে দেখতে যান । কাঞ্চন চাই, আবার কামিনীও চাই। ডক্টর রাজেন্দ্র দত্তের পরিবার রেঁধে উল্টন। " আর শ্রীমকে ঠাকুর বলেন" ওরা কামিনী কাঞ্চন না হলে আমাকে আলোচনা না করা, আমার কি অবস্থা অবস্থা না। " 23শে মে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত কাশীপুরে এসেছিলেন ঠাকুরকে দেখতে। ডা মহেন্দ্রলাল সরকার অনেক দিন না, ডা রাজেন্দ্র দত্তও রোজ না। 

ঠাকুরের নরকেলের মা দিয়ে তৈরি হুকা



১৫ই আগষ্ট আর এগিয়ে নয়। স্বামীভানন্দ লিখেছেন, মহাপ্রস্থানের দুদিন আগে তিনি বলেন , " নরেন আমার কাছে, আমাকে আমার মনে হয়, কারণ, সবচেয়ে বড় জ্ঞানও আমার মনে হয়। " 

শনিবার, ৩০শে শ্রাবন, রাখিপূর্ণিমা। দিন দিন থেকে পরিস্থিতি ভালো নয়। ঠাকুরের ক্ষত পরিস্কার করতে গিয়ে প্রবল কষ্ট মুসলিম সেবক বুড়োগোপাল তাঁর কাজ বন্ধ করায় ঠাকুর বললেন " না আপনি ধুইয়েন।" প্রকৃত আশা সকলেরদীপ স্তিমিত। 

সমধির প্রত্যক্ষদর্শী স্বামী অভেদানন্দর বনধি " রবিবার , পূর্ণিমা 31শে শের মহাসমাধি লাভ করেন। সকাল 6টার সময় আমরা সকাল 6 তারিখে বসিয়া সকাল, যেমন সমাধি ভ্রমই তাঁহাঁর, তাঁহার দৃষ্টি নাসাগ্রন্থের উপর এবং স্থির করিতে করি আমরা উচ্চারণ করিম উচ্চারণে। সমবেত স্মরে ওঁকার ধ্বংস করিতে লাগালাম। সকলের মনে আশা যে, পরেই তাঁর সমধি ছিল ভঙ্গ হবে এবং শিঘ্রই তিনি চৈতনলাভ করব।


 
স্বামী প্রভান 15ই আগস্টের সকাল আট-টা থেকে বিস্তারিত বর্ণনা শুরু করেছেন, যখন ঠাকুর আপনি পাঞ্জি থেকে পড়তে পারেন।  

"আজও বাগের বাজারের রাখাল মুখার্জি দেখাতে হবে৷ " এই ভক্তি সাহেব মানুষ, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জির্ন শরীর ডাক্তার ডাক্তারের পরামর্শ এবং নির্দেশ দিয়েছেন, মুরগির ইউস কমান্ড ঠাকুরের শরীরে বলবেন৷ তিনি ঠাকুরকে মুরগির জুসর আচরণের জন্য পীড়িকে ঠাকুর বললেন "আপনাদের আপত্তি নেই, তবে লোকচার। ভাল কাল দেখা যাবে।"

দৃশ্যে তিনি সারদামিকে বললেন  , "আসেছি? দ্যাখো আমি নীচের উত্তর দিয়েছি। জলের ভীতর অ- নেক  হাঁকান।

দেখতে আরও অলুনে ভাব। শ্রীমা যে খিচুড়ি রেধেছিল তা ধরেছিল, একটা জলের কুঁজো চুরমার হয়ে গেল। বরূণ মহারাজ লিখেছেন --- উপস্থিতির সবটাই মুখের পথের পরে যায় এবং ঠাকুরের খুদা নিবৃত্তি না করেন তিনি বলেন, " পেটে হাড়ি হাতি খিচুড়ি খুদা, কিন্তু মহামায়া আপনি নিজে না৷" 

ঠাকুরের পিতলের কমন্ডল

লাটু মহারাজের স্মৃতিকথা --- পাখার বাতাস করছিলেন, রাত প্রায় 11টা, শ্রীরামকৃষ্ণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তার পরেই মনে হল, কারণ তাঁর সমাধি হয়েছে। শশী মহারাজ (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন--- মহাপ্রস্থানের পূর্বে তিনি এক গ্লাস পায়সম করে তৃপ্তি পেয়েছিলেন। পথ্যবনের পর নরেন্দ্রনাথ যখন তাঁর হাতে বুলিয়ে দিতে থাকে, তখন তিনি বারংবার নরেন কে বলেন,  "অমল ছেলেদের পরীক্ষার্থী।"

বৈকুন্ঠনাথ সান্যাল তাঁর লিখিত বইয়ের শেষ বিষয়গুলি অনেক খবরাখবর ব্লাস্ট। দুঃসহ বেদনায় যখন কিছু গলাধঃকরণ প্রায়, তখন তিনি বলেছেন--- "কিন্তু এত ক্ষিদেন না, হাড়ি হাড়ি চুড়ি খাই মহামায়াকে আমার বৈশাখ আপনি। , যাহা ভারতে কেন, পরিষেবার কোনো প্রদেশ দেখা যায় না। 

স্বামী অভেদানের স্মৃতির কথা " সমস্ত রাত্রি বলিয়া গেল , শ্রীশ্রী গুরুর বাহ্যঞ্জান আর ফিরিয়া আসিল না। তথন আমরা পড়লাম প্রাতকালে কিঠাকুরানিকে  সংবাদ । ______ভয়পক্ষে শ্রীশ্রী ঠাকুর সহধর্মিণী শ্রীমাকে শ্রীশ্রী ভবিতারিণীর জীবন্ত মূর্তি বলিয়া মনে করি এবং শ্রীমাও শ্রীশ্রী ঠাকুরকে মা কালী বলিয়া সম্বোধন করিতেন৷

ঠাকুরের সুতি টুপি


বরু মহারাজ লিখেছেন ------ ঠাকুরের অপেক্ষায় হরণ করার জন্য পরের ভোটে ডক্টর যান এবং আমার রাস্তার শনাক্ত করেন, কয়েক ডাক্তার নবীন পাল অন্যত্র রোগী দেখতে শুরু করেন। পরিচিতি শশী আবার ছুটতে থাকেন, পথ ডাক্তারের দেখা পান এবং তাকে নিয়ে ফিরলেন উদ্যাণবাতিতে। ঠাকুর তখনও বলেছিলেন " আজ আমার বড্ড ক্লাসে আছে। দুইটি পাশের পাশে জ্বলিয়া উঠছে। তিনি ঠিক কোন 15 ই আগস্ট শ্রীরামে কৃষ্ণদেবেরে এসেছিলেন , তা স্পষ্ট ধোঁয়াশায় ভরা৷ বরুণ মহারাজের , চন্দ্রলোকিত রাত ছিল। পাইকপাড়া রাজাদের কাঙ্গালি বিদায় স্বাভাবিকতারাত ধরে ধরে যাতায়াত ছিল। 

ডক্টর মহেন্দ্রলাল সরকার।


ডক্টর মহেন্দ্রলাল সরকারকে সকালবেলাতে খবর দেওয়া হয়েছিল। তিনি এলেন প্রায় একটার সময়, ডাফ স্ট্রিটের এক রোগিনীকে অবস্থা। তাঁর দিনলিপিতে পাওয়া যায় _____ আমি তাকে মৃত দেখলাম। রাত একটায় তাঁর দেহাবসান হয়েছে। তিনি বাম পাশ ফিরে শুকিয়ে আছেন। পদদ্বয় গোটানো, চক্ষুদ্বয় উন্মীলিত, মুখ কিঞ্চিত উন্মুক্ত।  যাঁরা তখনও সমধি ভঙ্গের চেস্টা করছিলেন, তাদের ভূল ব্যবহার করার চেষ্টা করে ডক্টর সরকার- একটা ছবি নেওয়ার ব্যবস্থা করা। এবং সেই জন্য নিজের ব্যাগ থেকে টাকা বার করে। পাওয়া দুবেঙ্গল ফোটোগ্রাফি ছবি ঐতিহাসিক মূল অনেক। সেখানে উপস্থিত এবং উপস্থিত নন, সে বিষয়ে যথেষ্ট অনুসন্ধান করা হয়েছে। 


বিদেশি সন্ন্যসী স্বামী স্বামী বিদ্যামানন্দের টিকা -=-=-=-
শ্রীরাম কৃষ্ণদেবের পার্থিব শরীর একটি সুসজ্জিত খাতের উপর শয়ান। কিঞ্চিত বাম দিকে কাত হওয়া। মুখমণ্ডল অতীব শীর্ণ।চ্যুনদ্বয় আর্ধনিলিত এবং বাহুদ্বয় দেহের উপর স্থাপিত। দক্ষিনপদ বামপদের উপর ন্যাস্ত। লটার উপর চন্দনের প্রলেপ এবং কনঠে মাল্যরাজি। খাটি ফুল ও মালা দিয়ে ঢাকা। খাটের চারকোণে মশারি টাঙানোর চারটি ছাতারি। পশ্চাতে কাশীপুর উদ্যাণটির কিয়দং দৃশ্যমান। বাঁ দিকে বিছনার একটা স্তূপ দেখা ঌ। সম্ভবত ঠাকুরের, রৌদ্রে দেওয়া হয়েছে। প্রায় পঞ্চাশ ভক্ত ও সুহৃদ খাটের বেশি বার আছেন। 

স্বামী প্রভানন্দ অন্য চিকিত বরুণ মহারাজ আরও লিখেছেন ***** মহাশ্মানে দিন বৃষ্টিপাত কিছু বিশৃঙ্খলা পর্যায়ক্রম ছিল এবং লুট হয়েছিল, যার কারণে আজও গোপনে রয়েছে অজানা ভক্ত গৃহে। যার অর্থ মঠের "আত্মারামের কৌটা" উল্টো পাশে আজও গঠন করতে পারে শতকের পর পুরুষের চিতাভস্ম। 

ঠাকুরের গ্রহণ উলের মোজা


স্বামী বিদ্যামানন্দের লেখা থেকে আরও জানা যায় ^*^*^*
প্রায় পাঁচটার সময় তাঁর পূতদেহ থেকে আসা হয়েছিল এবং সেই সময় ফোটোগ্রাফ নেওয়া হয়েছিল। একঘন্টা পরে শ্মমানযাত্রা। চিতার উপর দেহ স্থাপন হল। ত্রলক্য সান্যাল সুন্দরৈ ভজন গাইলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল।  এই ত্রৈলোক্যনাথ (1840-1916) খ্যাতনামা গীতিকার ও গায়ক। ঠাকুরের প্রিয় গান "বোর্ড দেব মা পাগল করে" , "গভীর সমধিসিন্ধু অনন্ত অপার " এর রচনা। ছদ্মনামে রচিত এর 'নববৃৃন্দাবন' নাটকে নরেন্দ্রনাথ কয়েকবার করেন। 

"শ্মশানযাত্রার সময়ে একখন্ড মেঘ থেকে বড় দানার বৃষ্টি ঝরে পড়লো।" দাহকার্য কতক্ষণে শেষ হয়েছিল তা নিয়েও মতভেদ আছে। কেউ বলে দু ঘন্টা, কেউ এক ঘন্টা। কাশীপুর পুলিশ তার রেজিরে খবর লিখতে গিয়েস্টার স্বামী অদ্বৈতানন্দ 19শে আগস্ট 1886। সেখানে মৃতের নাম ---- রামকৃষ্ট পরমহংস। পুরানো 52। খেলা 'প্রিচার'। কারণ--- গলায় আলসার। খবর কার্ডে --- গোপালচন্দ্র ঘোষিত, বন্ধু। ইনি পরবর্তী কাল স্বামী অদ্বৈতানন্দ। 

শ্রী শ্রী রাম কৃষ্ণ মহাশ্মশান, কাশীপুর


শ্মশানে সাধকের দেহদাহ যে বন্দী ভক্তদের ইচ্ছা করি, তার ইঙ্গিত পরবর্তী কালেজির চিঠি পাওয়া যায়। চার বছর (26শে মে 1890) তিনি প্রেমদাস মিত্রকেলেছেন  "ভগবান কৃষ্ণদেবের শারীরিক অবস্থার কারণে অগ্নি সমর্পন করা হয়েছিল। মহাপাপ হতে কথঞ্চিতবোধহয় মুক্ত হতে হবে"। 

এই দুঃখটা যে গঙ্গাতীরে বেলুড় মঠের পথে ও 'আত্মারামের কৌটা' 

(সংগৃহীত)







কাশীপুরের বাগানবাড়িতে ঠাকুর তখন জল পারছেন না, কশ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছেন। ছেলেরা উদ্বগ্ন, উদ্বিগ্ন নরেন্দ্রনাথও। ছুটে গেল ডাক্তারের কাছে। তাঁকে ভালো ডাক্তারবাবুও ভাবে বিহ্বল----দেখো নরেন, তুমি তো জ্ঞানী। তুমি জানো এখন আর কিছু করার নেই। নতুনভাবে কোন ধ্যানধারী এসেছেন কিছু করতে না। 
নরেন ডক্টর ডাক্তারবাবু, গিরিশদার দৃঢ় বিশ্বাস এই পূর্ণিমাটা ভালোই ঠাকুর উপরে উঠবেন। কতই বা পুরানো হয়েছে ঠাকুরের! মাত্র তোপাশ বছর।  

ডাক্তার সরকার বললেন, তুমিও সেই বিশ্বাসে এখানে এসেছ! সত্যি নরেন, ঠাকুরের সাথে আমার রক্তের কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাঁকে সমর্থন করে বন্ধু কি আকুলতা আমরা! বাপ ছেলের মধ্যেও এমনটা দেখা যায় না। কিন্তু বলো তো, কি নিয়ে বাঁচবে বুড়োটা? সব যে উজাড় করে মুসলিম। মন্দিরে পূজার পরে প্রসাদ হতে পারে যখন আর কিচ্ছটি পড়ে না, একটি পুষ্প, বা্বপত্রও নয়, কখনও কখনও সেই দেবালয়ের অবস্থা কি হয়?
হ্যাঁ ডক্টর বাবু, গুন্দির দোর বন্ধ করে দেওয়া হয়----শান্তির কন্ঠে উত্তর ডক্টরবাবু বললেন, বুড়োটার দোর বন্ধ করার সময় আসতে হবে। অনুগ্রহ করে তাঁর স্বরও রুদ্ধ এল। 
নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলতে শুরু করতে, সব শেষ। একটা বিল্বপত্রও পড়ে নেই। নিঃশব্দে টুকু বিলিয়ে ব্লাস।আর যেটুকু বাকি ছিল, জানো তো, আমাকে দেওয়ান। 
আপনি কি সম্প্রদায় আপনাকে? বলুন না ডর বাবু, ঠাকুর আপনাকে কিক্ট রাজনৈতিক? নরেন্দ্রনাথ জানার জন্য ব্যাকুল হয়ে যাত্রা।
ডাক্তারবাবু বললেন, আমার নম্বর! দেখো, নেত মজা করে বুড়োহা কথা বলে, শোন হে ধরিবাজ, ভেবো না আমি ঠিক বিনা পয়সা দেখছি! আমার পাওনা-গণ্ডা সব কিন্তু উশুল করে নেব তোমার ট্যাঁক থেকে।আমি হলাম করতে গিয়ে বাপাকুপুর। 
আপনি কি বলেন, আমি কিছু চিন্তাবিদ ডক্টর বাবু---বিস্মিত নরেন্দ্রনাথ। 
তিনি আবার শুরু করেছেন, আমিও কি কিছু বলতে চাই? তুমি তোরকে ঠাকুর আমার পাল্টা অংশ। কিন্তু তারপরে আমি যা দেখলাম, তা তো তুমি তোমার না? কৌতুহলী নরেণ তৎক্ষণাৎ জানতে চান, কি বিষয়ন আপনি?বলুন না ডক্টর বাবু কিন।
গদগদ স্বরে ডক্টর সরকার বললেন, দেখলাম এক নিরাকার ব্রহ্মজ্যোতি ব্রমলোকে বিলীনের জন্য অপেক্ষা করছে। তারপর দু'টি ঝরে পড়ে অশ্রুধারা। আর কিছু বলতে না। সদা জ্যোতির্ময় সেই পরম পুরুষ ও ব্রহ্মময়ী মাভিতারিণীর শ্রীপদপদ্মে জানাই শতকোটি চরণে। প্রণাম ডর বাবু।(শঙ্কর)




আজ ২১শে সেপ্টেম্বর। আজ সেই দিন ঠাকুরের বিশেষ, প্রথম দিন উপস্থিত হয়েছিল৷ আজও সেই ছবি অনেকের বাড়িতেই পুজো হয়। এমনিতে ঠাকুর নিজের ছবি পছন্দ করতে না। ঠাকুরের ভক্ত ব্রাহ্মনেতা কেশব সেনের গৃহ "কমল কুটির" (বর্তমান ভিক্টোরিয়া ইন্সটিউশন, ৭২, আপার সারকুলার রোড, কলকাতা)–এ কীর্ত আসরে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হন। ঠাকুর উত্তরাধিকার সূত্রে পড়লে তাঁকে পেছন থেকে ধরে চললে ভাগ্নে মুখোপাধ্যায়, তিনি আলোচনায় পড়ে না যান। এরূপ ব্রাহ্মভক্ত বেষ্টিত সমাধি ঠাকুরের এই ফটোটি উপস্থিত হয়। দি বেঙ্গল ফটোগ্রাফারস, ১৯/৮, বৌ বাজার স্ট্রিট, কলকাতা— এই ফটো সংস্থাই ঠাকুরের প্রতিনিধি আপনাকে তোলে। বাস্তবে ঠাকুর ঠাকুর মৃগ করতে। দেখা যায় ঠাকুরের দুই হাতের অনন্য ভঙ্গী। পরে তাঁর শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দ এর লেখা থেকে জানা যায়, ঠাকুর এর উর্ধমুখীদান হাতের প্রকৃতপক্ষে পরমাত্মাকে এবং বাম হাত টিয় এ বিশ্ব বিশ্বের কে। এর অর্থ এগারো সবলক্ষণ স্থায়ী, পরের শেষ মিলতে হবে পরমাত্মা তে, কেউ এ ব্রহ্মান্ডের পেতে যেতে পারে।

জয় ঠাকুর জয় মা জয় স্বামীজী জয় গুরুদেব।

Sunday, 16 August 2020

ভারতবাসীর ভগিনী-সিস্টার নিবেদিতা

 

" মরন সাগর পাড়ে তোমরা অমর, তোমাদের নিখিলেশ রচিয়া গেলে আপনারি ঘর, তোমাদের স্মরি "।

মরনশীল এই পৃথিবীর চরম  সত্য হল মৃত্যু। মৃত্যু মানে জীবনের যবনিকা, অস্তিত্বের অবলুপ্তি। কিছুদিন এর অস্তিত্ব স্মৃতির পাতায়। ক্রমে সে স্মৃতিও হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম ঘটে। আপন কীর্তিতে কিছু কিছু মানুষ এই মরনশীল জগতেও অমরত্বের জয়গান গেয়ে যান। মৃত্যু কখনই তাঁদের পরাজিত করতে পারে না। উল্টে মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে তাঁরা স্মরনীয় হয়ে থাকেন ইতিহাসের পাতায়। ভারতবর্ষের নারী জাগরণের পথিকৃৎ তথা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানী ভগিনী নিবেদিতা সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের একজন। 


ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই অসঙখ্য ভারতমাতার বীর সন্তানের কথা, তবে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা এই দেশের সন্তান না হয়েও এই দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সেইসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম হলেন ভগিনী নিবেদিতা, যিনি নিজের দেশ ছেড়ে এসে শুধু এই দেশের জন্য কাজ করেননি, এই দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনিই সম্ভবত প্রথম খ্রীষ্টান মহিলা তিনি হিন্দু ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে ২৮ শে অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের টাইরন প্রদেশের ডনগ্যানন শহরের এক বিপ্লবী পরিবারে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ওরফে ভগিনী নিবেদিতার জন্ম। 

মা, বাবা, ভাই ও ভগিনী নিবেদিতা



ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অন্য ধরনের মানুষ। মানুষের কাজ করার জন্য তিনি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর মধ্যেকার সম্ভবনার কথা বুঝতে পেরে ছিলেন তাঁর বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি স্ত্রীকে ঠেকে বলেছিলেন ..." When the call come from Heaven, Let Margaret go. The little will reveal her talents and do great things." 



পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি শিশুদের শিক্ষাদানের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বেশ কয়েক বছর এই পেশায় থাকেন তিনি। কিন্তু এই কাজে তিনি এক সময় আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আসলে তাঁর মন সবসময় চাইত বড়ো কিছু করার জন্য। ঈশ্বর যেন তাঁর প্রাথনা শুনতে পান। ঠিক এই সময়, ১৮৯৫ এর নভেম্বরে লন্ডনে সাখ্যাৎ হয় স্বামী বিবেকানন্দের সাথে।এক পারিবারিক আসরে মার্গারেট স্বামী বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা শোনেন। 

লন্ডনে বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা


বিবেকানন্দের ধর্মব্যাখ্যা ও ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ এবং অভিভূত হন। স্বামী বিবেকানন্দের সাথে এই সাক্ষাৎ তাঁর জীবনধারাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়। স্বামীজিকে তিনি গুরু বলে মেনে নেন। স্বামীজির মুখে ভারতবর্ষের মহিলাদের দুর্দশার কথা শুনে তিনি স্থির করেন ভারতে এসে কাজ করবেন। 



নিবেদিতার  গহন  সত্তায় ছিল ঘুমন্ত এক অগ্নিশিখা। ঋষি অরবিন্দ সেই শিখাকে দেখেই  নিবেদিতার নাম দিয়েছিলেন  " শিখাময়ী"। ভিতরের ঘুমন্ত শিখার জ্্বলে ওঠার তৃষ্ঞা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল সুদূর আয়ারল্যান্ডে, কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়ার মুখে। তখন তিনি মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। 

আসলে ভারতবর্ষ যে তার কর্মভূমি হবে সেরকম ইঙ্গিত তিনি ছোটবেলায় পেয়েছিলেন। একবার তাঁর বাবার এক যাজক বন্ধু ভারত থেকে ফিরে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। বিদায় নেবার সময় তিনি তাঁকে বললেন ------ " India, my little one, is seeking her destiny. She called me once and will perhaps call you too someday. Always be ready for her call. "



ভারতবর্ষে কাজ করার এক সুপ্ত বাসনা সেদিন থেকেই বোধহয় তাঁর মনের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিবেকানন্দের সাথে সাক্ষাৎ, তাঁর সেই সুপ্ত বাসনায় যেন অগ্নিসংযোগ ঘটালো। তিনি ব্যাকুল হয়ে পরেন ভারতে আসার জন্য। এদিকে বিবেকানন্দেরও মার্গারেটকে‌ চিনতে ভুল হয়নি। তিনি বুঝেছিলেন মার্গারেটের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে ভারতবর্ষের নারী প্রগতি সম্ভব। প্রাথমিক দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি মার্গারেটকে আহ্বান জানালেন ভারতে। বহু প্রতীক্ষিত সেই ডাক পেয়ে নিজের সব কিছু ছেড়ে ১৮৯৮ এর ২৮শে জানুয়ারি তিনি কলকাতায় এলেন। এই সময় বিবেকানন্দের কাছে ভারতের ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, জনজীবন, সমাজতত্ব, প্রাচীন ও আধুনিক মহাপুরুষ দের জীবন কথা শুনে, মার্গারেট ভারতকে চিনে নেন। ভারতে আসার কয়েকদিন পর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্ত্রী সারদা দেবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।

মা সারদার সাথে ভগিনী নিবেদিতার সাক্ষাৎকার




ঐ বছরের ২৫শে মার্চ বিবেকানন্দ তাঁকে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত   করলেন এবং তাঁর নাম দিলেন "নিবেদিতা"। বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে সন্ন্যাসীনীর  দীক্ষা দেননি, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নিবেদিতার মধ্যে যে আগুন রয়েছে তাতে তাঁকে সন্ন্যাসীনীর মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব নয়। তাই কেবল ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করছিলেন তাঁকে।


দন্দ্বে দীর্ন মার্গারেটের অন্তরের ঘুমন্ত শিখায় অগ্নিসংযোগ করলেন  সূর্যের মত দীপ্তমান ও তেজোদীপ্ত সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ।  নিবেদিতার অন্তরে সৃষ্টি হল মহা আলোড়ন। তিনি এই দহনদানে নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদন করলেন।  _____ তার নবজন্ম ঘটল।  গুরুর ডাকে পুরোনো জীবন ত্যাগ করে হয়ে উঠলেন  ভারতসেবিকা।

গুরুর সে ডাক ছিল আত্মার ডাক।  পাশ্চাত্যের আরাম নিলয় ছেড়ে তিনি বাস করতে লাগলেন উত্তর কলকাতার সরু গলির দারুণ গরম আবহাওয়ায়। পাশ্চাত্যে তখন তাঁর বেশ সন্মান ও প্রতিষ্ঠা ______ সবই  তিনি জীর্ণ বস্ত্রের মতো ত্যাগ করলেন। জীবন অনন্তের বেদিতে প্রতিষ্ঠিত  -------- এই নতুন বার্তা নিবেদিতা এমন একজনের কাছ থেকে পেলেন,  যার   চিন্তা-চেতনায়  সেই অনন্তের  আলোক বিচ্্ছুরন। এর পর আগের মতো থেকে যাওয়া  অসম্ভব। 

এই প্রসঙ্গে   1904 সালে নিবেদিতা লিখেছেন  " ভিতরে আমার আগুন জ্বলতো, কিন্ত প্রকাশের ভাষা ছিল না। এমন কতদিন হয়েছে কলম হাতে নিয়ে বসেছি অন্তরের দাহকে রুপ দেব বলে ---- কিন্ত কথা জোটেনি। আর আজ আমার কথা বলে শেষ করতে পারি না। দুনিয়ায় আমি যেন আমার ঠিক জায়গাটি খুজে পেয়েছি। ---এবার তীর এসে লেগেছে ধনুকের ছিলায়। "  নিবেদিতা ধীরে ধীরে রুপান্তরিত হলেন।  ভারত-সেবা রূপ অভিযানে ছুটে বেরালেন এদেশের সর্বত্র।  স্বামীজি 
এই ঘুমন্ত জাতিকে চাবুক মেরে জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।  বীর সন্ন্যাসীর সেই অগ্নিকে অন্তরে বহন করে নিবেদিতা ভারতকল্যানে ঝাপ দিলেন।  অপূর্ব সেই অত্মসমার্পন, অপূর্ব সেই সেবা। স্বামীজির মহাপ্রয়ানের পর সারা ভারতে গুরুর আবির্ভাব দেখতে পেয়েছিলেন নিবেদিতা। তাই তো কর্মের মধ্যে নিজেকে  বিলিয়ে দিয়েছিলেন । গুরু ও তাঁর আদর্শের প্রতি নিবেদিতা ছিলেন এতোটাই খাটি যে , কোনো বাধাই তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাড়াইনি ।  এই আত্মনিবেদনে তাঁর শরীর পর্যন্ত তুচ্ছ হয়েছিল।  ধূপ যেমন নিজেকে পুড়ে চারদিক সুগন্ধে পূর্ণ করে, তেমন করে তিলে তিলে নিজেকে দান করলেন ভারতের মাটিতে। নীরবে আড়াল থেকে ভারতীয় মানবসম্পদকে তিনি প্রেরনা দিয়েছেন।  সান্ত্বনা দিয়েছেন,  উজ্জীবিত করেছেন।  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর,  জগদীশ চন্দ্র বসু, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত এই ব্যতিক্রমী নারীর কাছে ঋণী। তিনি বাইরের জয়ঢাক বাজাননি। কেবল গোপনে গভীর সেবা করে গিয়েছেন। 

 

দীক্ষা লাভের পরে , মহিলাদের শিক্ষা দানের জন্য নিবেদিতা ১৮৯৮ এর ১৩ই নভেম্বর কলকাতার ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেনে স্থাপন করেন " নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয় "। 




শিখ্যাদানের পাশাপাশি তিনি নানান সমাজসেবা মূলক কাজেও জড়িয়ে পড়েন। স্বামীজির মৃত্যুর পর নিবেদিতা পুরোপুরি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পরার কারণে, রাজনীতির অজুহাতে রামকৃষ্ণ    তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেননা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিয়মানুসারে, ধর্ম ও রাজনৈতির সংস্রব ঠেকাতে, সংঘের কেউ রাজনৈতিতে জড়াতে পারত না। কোনো মতে , তাঁর জন্য যাতে রামকৃষ্ণ মিশনের গায়ে কোনো আঁচর না লাগে, তাই তিনি নিজে থেকে সেখান থেকে সরে গিয়েছিলেন। যদিও সারদাদেবী ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর অমৃত্যু সুসম্পর্ক বজায় ছিল। 

1899 সাল। কলকাতায় প্লেগ মহামারি রূপে দেখা দিল।  শয়ে শয়ে মানুষ মৃত্যুমুখে। আতঙ্কে মানুষ শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। স্বামীজির নেতৃত্বে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে প্লেগ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কমিটি গঠিত হল। নিবেদিতা হলেন তাঁর সম্পাদক।  সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে ও বক্তৃতার মাধ্যমে জনচেতনা জানানোর চেষ্টার সঙ্গে পরিবেশকে শুদ্ধ ও পরিষ্কার রাখতে নিজে কাজে হাত লাগাতেন। বাগবাজারের গলিতে ঝাটা হাতে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে দেখা গেল এই  আইরিশ দুহিতাকে। লজ্জায় পাড়ার যুবকেরা সে কাজে এগিয়ে এলেন।  এই ভাবে নিবেদিতা সাধারণের মধ্যে সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ জাগিয়ে তুললেন। ডাক্তার রাধাগোবিন্দ করের ( আর  জি কর ) পরামর্শে রোগাক্রান্ত 
মানুষের চিকিৎসা হত। তিনি নিবেদিতাকে সাবধান করেছিলেন,  শরীর দুর্বল।  তাই তিনি যেন মরণব্যাধির ছোয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলেন। একদিন  ডাক্তার কর বস্তিতে রোগ পরিদর্শন করতে গিয়ে অবাক !! স্যাতসেতে কুড়েঘরে প্লেগ রোগাক্রান্ত মা-হারা শিশুকে কোলে করে নিবেদিতা বসে আছেন।  ঘরটি শুদ্ধ করতে হবে বুঝে মহীয়সী নিজেই তা চুনকাম করলেন।  এত সেবা সত্ত্বেও শিশুটি বাচল না।  "মা" "মা" বলে শেষ সময়ে নিবেদিতাকেই নিজের মা ভেবে জড়িয়ে ধরল সেই মৃত্যুপথযাত্রী মানবসন্তান।  একেই তো বলে  শ্রীমদ্ভভগবত গীতায়  বর্ণিত  নিষ্কাম সেবা।

নিবেদিতা ভারতবর্ষেকেই মনে করতেন তাঁর নিজের দেশ। তিনি বুঝেছিলেন পরাধিনতা থেকে মুক্ত না হলে ভারতবর্ষের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই স্বামীজির মৃত্যুর পর তিনি আধ্যাত্মিক ধারণা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন বিদ্রহীনি রুপে। ব্রহ্মচারী থেকে হয়ে উঠলেন বিপ্লবী। নিজেকে তিনি স্বামীজির " মানস কন্যা " বলে ভাবতেন। স্বামীজির আদর্শ ছিল তাঁর আদর্শ। নিবেদিতা বুঝেছিলেন ----- স্বদেশপ্রেমী ও মানবপ্রেমী এই মানুষটি, যিনি তার গুরুদেব, তিনি সর্বত্যাগী সন্নাসী নন । তাঁর গৈরিক বহনের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক বিপ্লবী সত্ত্বা, যার লখ্য ছিল কর্মযোগ ও অখন্ড ভারত। গুরুর সেই কাজে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন নিবেদিতা।


এছাড়া তাঁর রক্তে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ। ছোট বেলা থেকে তিনি বড়ো হয়ে উঠেছেন বিপ্লবী পরিমন্ডলের মধ্যে দিয়ে। তাঁর দুই দাদু, বাবার বাবা, রেভারেন্ড নোবেল এবং মায়ের বাবা, হ্যামিলটন, আইরিশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরাধিন ভারতবর্ষের দূর্দশা দেখার পর তাঁর মধ্যেকার সেই বিপ্লবী সত্ত্বা জাগরিত হয়ে উঠে। ভারতবর্ষ ছিল তাঁর দেশ। ভারতের স্বাধীনতা ছিল তাঁর স্বপ্ন। ভারতবাসীর হিতসাধন ছিল তাঁর সাধনা। " ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে " ______ এই চাইতেন মনে প্রানে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতে শুরু করেন নিবেদিতা। এই সময় অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমুখ বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।এদের মধ্যে বিঞ্জানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। তিনি দেখলেন পরাধীন ভারতে বিঞ্জান সাধনায় অনেক বাধা। 




সে বাঁধার সন্মুখীন হতে হয় জগদীশচন্দ্রকেও। তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন নিবেদিতা। ঠিক হয়েছিল জগদীশ চন্দ্র বসু সর্বপ্রথম প্রদশর্ন করবেন তার আবিষ্কার প্যারিসে। যা এতদিন সবার কাছে ছিল অচেতন পদার্থ, সে যে আসলে অতিশয় সংবেদনশীল এক চেতন সত্তা, তা যন্ত্রের সাহায্যে দেখাবেন বিঞ্জান মহলে। উচ্ছ্বাসিত বিবেকানন্দ লিখলেন নিবেদিতাকে। আজ পরাধীন দেশের এক নাগরিক বিশ্ববাসীর সামনে সগর্বে প্রমান করবেন তাঁর কৃতিত্ব।

প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থ বিদ্যার জগৎ বিখ্যাত অধ্যাপক তিনি। কিন্তু তা হলে কি হবে ?? কালো চামড়ার অধিকারী বলে সমকখ্য ইউরোপীয়ান অধ্যাপকদের থেকে তাঁর বেতন কম। অপমানিত জগদীশ চন্দ্র একটি পয়সাও নিতেন না কলেজ থেকে। ভগিনী নিবেদিতা বিভিন্ন সংবাদ পত্রে লিখে যে আয় করতেন তার অংশবিশেষ দিতেন এই ঞ্জান তপস্বী সাধকে।



নিবেদিতা তখন শরীরে মনে রীতিমতো ভেঙ্গে পড়েছেন। ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েই ছুটে গিয়েছিলেন আমেরিকার মিসেস সারা বুলের কাছে। স্বয়ঙ স্বামীজি তাঁকে "ধীরমাতা" বলে উল্লেখ করেছেন। দিনটা ছিল ১৫ই নভেম্বর ১৯১০। সেখানে ছিলেন দু মাসের উপর। ১৮ই জানুয়ারি শ্রীমতী বুল প্রয়াত হলেন। তিনি মৃত্যুর আগে সম্পাদিত দলিলে নিবেদিতার স্কুলকে এবং জগদীশ চন্দ্রকে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বিঞ্জান সাধনা চালিয়ে যাবার জন্য। ঠিক তখনই তিনি ভারতে আসার জন্য প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করেছেন তখনই এলো বজ্রাঘাতের মত সেই খবরটা। সারার মানুষিক বিকারগ্রস্ত মেয়ে ওলিয়া আদালতে নিবেদিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তাঁর মা'কে শেষ সময়ে ঠকিয়ে নিবেদিতা তাঁর অর্থ আত্মসাত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভারত থেকে বিষফল এনে খাইয়ে তাঁর মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছেন। মানসিক চাপে বিধ্বস্ত নিবেদিতা ভারতে ফিরে এসে চারমাস পরে সারা ফুলের চিঠি পেলেন। মামলায় ওলিয়ার হার হয়েছে এবং সে আত্মহত্যা করেছে।

রবীন্দ্রনাথও নিবেদিতার খোঁজখবর নিতেন। নিবেদিতা যে তারও অত্যন্ত আপনজন। রবীন্দ্রনাথ একবার সদলবলে নিবেদিতার দলে সামিল হয়েছিলেন। উদ্দেশ্যে বুদ্ধগয়া ভ্রমণ। স্বামীজির কঠোর ব্রহ্মচারী ব্রতের জন্য কত তর্ক বিতর্ক করেছেন কবি। আবার ভারতবর্ষের জন্য নিবেদিতার সুগভীর টান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই নিবেদিতার স্মৃতি সভায় সখেদে বলেছেন _______ আমরা দেশকে কেউ কেউ অর্থ দি, সময় দি, কিন্তু তথা সর্বস্ব উজাড় করে নিবেদিতার মত কাউকেই দিতে দেখি না।


নিবেদিতার অকালপ্রয়াণের (১৩ অক্টোবর,  ১৯১১) মাসখানেক পর প্রবাসী প্রত্রিকায় তাঁকে নিয়ে একটি শোকনিবন্ধ লেখেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  কিছুপ্রসঙ্গে তিনি তিনি উপমার আশ্রয় নিয়েছেন,  কোথাও  একটি শব্দের মাধ্যমে অনেক তথ্য,  তত্ত্ব ও ভাবের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এই  প্রত্রিকার " ভগিনী নিবেদিতা " প্রবন্ধেই  রবীন্দ্রনাথ "  লোকমান " অভিধাটি ব্যবহার করেন। উপাধিটি তার পর থেকে  নিবেদিতার সাথে জুড়ে গিয়েছে। উপসংহারে তাঁকে এক দুর্লভ সন্মান দিয়ে বিশ্বকবি লিখেছেন " এই সতী নিবেদিতাও দিনের পর দিন যে তপস্যা করেছিলেন,  তাহার কঠোরতা অসহ্য ছিল। "  নিবেদিতাকে কেন সতী রুপে দেখেছেন  সে কথা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন  " মানুষের মধ্যে যে শিব আছেন, সেই শিবকেই এই সতী সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। 

তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান। শুধু স্কুল নয়, তাঁর বাড়িও ছিল বিপ্লবীদের মিলিত হওয়া এবং আলাপ আলোচনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তিনি তরুণ বিপ্লবীদের দেশের কাজে উৎসাহিত করতেন। তরূন বিপ্লবীদের ওপর তাঁর প্রভাব ও অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে ডা: রাসবিহারী ঘোষ বলেছেন " If the dry bones are beginning to stir, it is because Sister Nivedita breathed the breath of life into them."  তাঁর অনুপ্ররনার রুপ ফুুুটে উঠেছে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের গলাতেও ______ " বাংলায় আমার রাজনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টায় যিনি সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সুযোগ্য শিষ্যা---- মহিয়সী নিবেদিতা। "





ভারতবর্ষই তাঁর স্বদেশ, ভারতের লখ্যই তাঁর লখ্য। তাঁর মধ্যকার ভারতপ্রেম অনেক ভারতীয়কেও লজ্জা দেওয়ার মতো। একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯০২ সালে দশেরার ঠিক আগের দিন নাগপুর মরিস কলেজে একটি খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন তিনি। খেলাটি ক্রিকেট জেনে, পুরষ্কার দেবার পর তিনি মরিস কলেজের ছাত্রদের তিরষ্কার করেন বিদেশি খেলার প্রতি গর্ববোধ দেখে। এমনও বলেন যে ..... আগে জানলে তিনি অনুষ্ঠানে আসতেন না।

আমাদের হৃদয়কে গভীরে স্পর্শ করে মানুষী দেবতার আবেগ ও সংগ্রাম।  তাঁকে সেবিকা,  বান্ধবী , মাতা হওয়ার আশীর্বাদ দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।  কিন্ত তিনি গুরুর প্রত্যাশার পাত্র  উপচে হয়ে উঠলেন পৃথিবী বিখ্যাত লেখিকা, বাদামী, শিক্ষাতাত্ত্বিক,  ইতিহাসবিদ, ব্রাদার রাজনীতিক, ভারতীয় সংস্কৃতির এক ধারক। তাই আজ দশভূজা বলতে আমরা এমনই কোন সর্বতোমুখী প্রতিভাকে বুঝব। কেননা তার অসামান্য শ্রেষ্ঠ পরিচয়  পেয়েছি তাঁর ত্যাগধর্মে। তিনি খালি পায়ে তুষারনদী পেরিয়ে গিয়েছেন মনের বলে, চোখের জলে উত্তীর্ণ হয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দের তাঁকে যাচাই করার অগ্নি পরীক্ষায়। উদারন্নের অংশে তাঁর গড়া বিদ্যালয়ের প্রতিপালন করেছেন, অনাহারে থেকেও রাত জেগে বই লিখেছেন,  ভগ্ন স্বাস্থ্যে ভারত ঘুরেছেন বক্তৃতা সফরে। বীরুপ জলবায়ুর কারনে ভুগছেন ব্রেন ফেডারেল, আর্তের ত্রানে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ম্যালেরিয়ায় ।  বুঝতে পেরেছেন সময় কমছে দ্রুত।  কাজ মিটিয়ে যেতে আরও অস্থির হয়েছেন।  স্বদেশবাসীর লাঞ্ছনা, ভারতীয়দের রুঢ়তা, অবহেলা সয়ে ,  বিরুদ্ধে পরিবেশর সাথে প্রান বাজি রেখে লড়ে তিনি নিজেকে যে ভাবে " নিবেদিত " করেছেন ভারত কল্যাণে, তাতে এক মৃত্যুশীল মানবশরীর ও মননের আশ্চর্য ক্ষমতার জয় দেখতে পাই আমরা।

তিনি তো মানবীই,  তিনি তো দেবী নন। কিন্ত এক রক্তমাংসের মানবী যদি এত অসাধ্য সাধন করেন তবে কোনও দেবীর ডাক পরে কেন ??  তিনিই তো তার প্রমাণ,  মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই,  সেবা করার জন্যও যেমন সবার উপরে মানুষ সত্য,  সেবক হিসেবেও তা-ই। মানুষ যদি নিজের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার উপাসনায় আত্মসমর্পণ করে, অন্যের জন্য নিজের সর্বশক্তি উৎসর্গ করতে চায়, তবে তার পক্ষে কত কিছু করা সম্ভব,  নিজেকে কতখানি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব---------  স্বপ্ন জীবনের কঠোর সাধনায় সেই সহজ সত্য টুকু শিখিয়ে গিয়েছেন  ভগিনী নিবেদিতা। 


 ১৯০৪ সালে। ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা তৈরি করেছিলেন নিবেদিতা। এই পতাকাটি " ভগিনী নিবেদিতার পতাকা " নামে পরিচিত ছিল। লাল-হলুদ রঙের পতাকার মাঝে বাংলায় লেখা ছিল " বন্দেমাতরম্" । পতাকার মাঝে ছিল ইন্দদ্রের অস্ত্র "বর্্জ" এর ছবি আর‌‌‌‌ সাদা পদ্ম।লাল রং  স্বাধীনতার লড়াই এর প্রতীক। আর হলুুুুদ সাফল্যের প্রতীক।ব্রজ শক্তির আর সাদা ছিল পবিত্রতার প্রতীক। এই পতাকার গঠন ভাবনাই ভারত সম্পর্কে তার মনোভাব স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। 


ভগিনী নিবেদিতার পতাকা


জগদীশ চন্দ্রের ওপর নিবেদিতার অবদান প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন " In the day of his success , Jagadish Chandra gained an invaluable engineer and helper in Sister Nivedita and any records of his life's work her name must be given a place of honour." ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে জগদীশ চন্দ্র তখন " বসু মন্দির" প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার দ্বার প্রান্তে নিবেদিতার মূর্তি স্থাপন করেন।





শুধু বিঞ্জান নয়, ভারতের চিত্র কলা প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, ও সি গাঙ্গুলী, আনন্দকুমারস্বামী প্রমুখ চিত্রশিল্পীদের তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন ভারতবর্ষের চিত্রকলার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অজন্তা ইলোরার সমস্ত ছবিগুলোর স্কেচ আনতে , নিজেই যাবতীয় খরচ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন নন্দলাল বসুর দলকে। ছয় মাস ব্যাপী তাদের থাকার বিপুল ব্যায়ভার নিজেই একা নির্বাহ করেছিলেন।

কলকাতায় তিনটি বক্তৃতার সূত্রে নিবেদিতা হয়ে উঠেন আলোচনার কেন্দ্র।  আলবার্ট হলে ও কালীঘাট মন্দিরে কালী নিয়ে,  আর ১১ই মার্চ স্টার থিয়েটারে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বললেন " ইংল্যান্ডে ভারতীয় আধ্যাত্মচিন্তার প্রভাব " নিয়ে। পরিচয় হল রবীন্দ্রনাথ,  অবনীন্দ্রনাথ,  সরলা দেবী,  জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমুখের সঙ্গে। 

কাজের জায়গা হিসেবে সাহেবপাড়া বেছে নেননি তিনি।  তাঁর গড়া স্কুলের ঠিকানা বাগবাজারের ১৬নং বোস পাড়া লেন। গলীর মধ্যে একটা বাড়ী।  সেটি কাছ থেকে দেখে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন  " তাহার এই কাছটিকে তিনি বাহিরে কোনোদিন ঘোষনা করেন নাই।  তিনি যে ইহার ব্যায় বহন করিয়াছেন তাহা চাদার টাকা হইতে নহে,  বা উদ্বৃত্ত অর্থ হইতে নহে, একেবারেই উদারন্নের অংশ হইতে।" পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে, অবঞ্জা পরিহাস উপেক্ষা করে নিবেদিতা তাঁর স্কুলের ছাত্রী জোগার করেছিলেন।  আস্তে আস্তে এই স্কুল হয়ে উঠেছিল বাগবাজার অঞ্চলের বালিকা, কিশোরী,  তরুণী, সধবা বিধবাদের শিক্ষালয়।

নিবেদিতার মধ্যে বৈপ্লবিক সত্ত্বা আগে থেকে ছিল। ১৯০২ সালের অক্টোবরে তিনি বড়োদায় অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের পন্থা ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তী কালে অরবিন্দ কলকাতায় এসে তখন পাঁচ সদস্যের বিপ্লবী কমিটি গঠন করেন, তার মধ্যে নিবেদিতা অন্যতম একজন সদশ্যই ছিলেন না, ছিলেন এই কমিটির সম্পাদক।





অরবিন্দের সান্নিধ্যে আসার পর তিনি জড়িয়ে পরলেন চরমপন্থী আন্দোলনের সাথে। যোগ দিলেন গুপ্ত সমিতির সাথে। গান্ধীজীর অহিংস নীতি নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন চরমপন্থায়। তিনি মনে করতেন ভিখ্যা করে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। তাকে ছিনিয়ে নিতে হবে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেন, তিনি দার্জিলিং থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং ইংরেজদের এই বর্বর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। ভারতীয়দের বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার করতে আর্জি জানিয়েও তিনি প্রচার করেন। এমনকি স্বদেশী দ্রব্য হাতে তিনি কলকাতার রাজপথে ফেরিও করেন। চরমপন্থী বিপ্লবীদের অস্ত্র শিক্ষা দেওয়া কিংবা বোমা তৈরির কাজেও তিনি প্রত্যখ্য ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছেন। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে______ উল্লাসকর দত্তের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী তখন বোম তৈরির চেষ্টায় রত। বোম তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁচ্ছে গেছে। কিন্তু কাজ করার জন্য একটা ভালো ল্যবোরেটারির দরকার। কোনো পথ না পেয়ে তাঁরা গেলেন নিবেদিতার কাছে। নিবেদিতা জগদীশ চন্দ্র বসু ও পি সি ঘোষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে প্রসিডেন্সি কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যবোরেটারি তাদের জন্য ব্যবস্থা করে দেন এক রাতের জন্য।


আবার যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত গ্রেপ্তার হলে তিনি হাজির হয়েছিলেন জামানতের টাকা নিয়ে। এই ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের নাম যখন আলিপুর বোমার মামলায় উঠে আসে, তিনি তাঁকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। বিপ্লবীদের পাশে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণাদাত্রী ও স্নহময়ী জননীর মতো। যাইহোক এই সব কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকারের নজর এরাইনি। ইঙলিশম্যান পত্রিকায় তাঁকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষনা করা হয়। ইঙরেজ সরকারও তাঁকে কারাদণ্ড কিঙবা নির্বাসনে পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কোনো কিছুই দমন করে রাখতে পারেনি এই অকুতোভয় "সিংহী" কে।

১৯০২ সালের ৪ জুলাই বিবেকানন্দ প্রয়াত হলেন। গুরুপ্রয়ানের পর স্বামীজির সাধনধন ভারতবর্ষ,  তারও সাধনধন হল। সে সময় দেশে এমন কোনও বিপ্লবী ছিলেন না, যিনি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হননি।  অরবিন্দ ঘোষ,  হেমচন্দ্র ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ, বাঘা যতীন,  সকলেই তাঁর দ্বারা প্রণীত হয়েছিলেন।  রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন " ভগিনী নিবেদিতা একান্ত ভালবাসিয়া সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে ভারতবর্ষে দান করিয়াছিলেন।  তিনি নিজেকে বিন্দুমাত্র হাতে রাখেন নাই। " ভারতবর্ষের শিক্ষা,  রাজনীতি, শিল্প, সমাজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ছাপ রয়েছে। দার্জিলিং-এ তাঁর স্মৃতি স্তম্ভে লেখা রয়েছে  " এখানে শান্তিতে শায়িত ভগিনী নিবেদিতা,  যিনি ভারতবর্ষকে দান করছিলেন তাঁর সর্বস্ব। "

নিবেদিতা বুঝতে পারছিলেন তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে। তিনি ৭ই অক্টোবর, মৃত্যুর মাত্র সাত দিন আগে উকিল ঠেকে তাঁর উইল প্রস্তুত করালেন। সারা বুলের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ সমেত মোট তিনশো পাউন্ড দিয়ে একটি স্থায়ী ফান্ড তৈরি করালেন। জগদীশ চন্দ্র হলেন যার অন্যতম এগজিকিউটিভ। শুধু একটি মাত্র শর্ত আরোপ করলেন দাতা। ব্রিটিশদের সাথে এই বিদ্যালয়ের কোন সম্পর্ক রাখা যাবে না। এমনকি তাদের কাছ থেকে কোন অর্থ সাহায্যও নেওয়া যাবে না। 

কাজের চাপে তাঁর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ১৯১১ সালে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। জগদীশ চন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী তাঁকে দার্জিলিং-এ নিয়ে আসেন। আশঙ্কিত বসু দম্পতিকে নিবেদিতা বললেন ---- তোমরা আমাকে আটকে রেখে আমার যাওয়ার সময় পিছিয়ে দিও না। তাঁরা নিবেদিতার প্রিয় লেখা তাঁর শষ্যার পাশে বসে ভগিনীকে শোনাতে লাগলেন। একটি বৌদ্ধ প্রার্থনা নিবেদিতার খুব প্রিয় ছিল। যা তিনি ইঙরাজীতে অনুবাদ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। _____ পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে, দখিনে যাহারা রয়েছেন তাঁরা যেন সবাই শত্রুহীন, শোকহীন, বাঁধাহীন হয়ে, আনন্দ চিত্তে নিজ নিজ পথে অগ্রসর হতে পারেন। নিবেদিতাকে শোনানো হল উপনিষদের সেই বানী-------- অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মামৃতঙ গময়, অবিরাবির্ম এধি রুদ্রর যত্তে দখিনাঙ মুখঙ তেন পাড়ি নিত্যম। ১৯১১ সালে ১৩ই অক্টোবর তিনি এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে অস্ফুষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলেন ------ The boat is sinking, But I shall see the sunrise. না। তারপর আর কোন শব্দ উচ্চারণ করলেন না। ঔষধ নিলেন না। অক্সিজেনের নলটাও খুলে দিলেন। সেদিন বেলা দুটোর সময় আরম্ভ হয়েছিল শেষ যাত্রা। ক্রমে ক্রমে বিশাল, এত বড় বিশাল শবযাত্রা দার্জিলিং আগে কখনো দেখেনি। তাঁর পূত পবিত্র দেহ অগ্নিতে সমর্পিত করা হল ৪টে পনেরো মিনিটে। রাত  ৮টার সময়ে ফিরে এলো একমুঠো ছাই।স্বামীজির  অগ্নিসত্তার তেজ নিজের মধ্যে ধারণ করে নিজেকে ভারতের সেবায় সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়ে অকালে অনন্তে মিশে গেলেন  নিবেদিতা । শিখাময়ী হয়ে উঠলেন  সূর্যতনয়া। 

মৃত্যু হয়ত তাঁকে নিয়ে চলে গেছে পার্থিব জগত থেকে কিন্তু তাঁর তরী ডুবে যায়নি এখনও। মরন সাগরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর আজও তিনি ভাসমান রয়েছেন জীবনের স্রোতধারায়। প্রতিটি সূর্যোদয় মনে করিয়ে দেয় মরনশীল জগতেও অমরত্বের পদচারণা। জন্ম-মৃত্যু এখানে এসেই হয়তো একাকার হয়ে যায় জীবনের সার্থকতায়।

আজ শুধু স্মৃতি রয়ে গেছে ------ বিভিন্ন স্থানে তাঁর ছোট ছোট কতগুলি মূর্তি ----- গলায় রুদ্রাখ্যের মালা ----- এক সর্বস্বত্যাগিনী সন্নাসিনী।  এ এক বিদেশের মাটি থেকে তুলে আনা শ্রেষ্ঠতম নৈবেদ্য, যা বিবেকানন্দ উৎসর্গ করেছিলেন দেশমাতৃকার চরণে।