Tuesday, 14 May 2019

রামকৃষ্ণ মঠ, শ্যামপুকুর বাটী, শোভাবাজার, কলকাতা- ৪।

রামকৃষ্ণ মঠ, শ্যামপুকু্র বাটী, শ্যামপুকুর ষ্টীট, শোভাবাজার, কলকাতা - ৪।

সেকালের প্রাচীন সুতানটির প্রাণকেন্দ্র ছিল শ্যামপুকুর। বাঙালি সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের প্রাণকেন্দ্র। হুগলি নদীর কতগুলি ঐতিহ্যবাহী ঘাট এই অঞ্চলেই অবস্থিত। শ্যামপুকুর বাটী উত্তর কলকাতার এই শ্যামপুকুর অঞ্চলে অবস্থিত। এটি হল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একটি শাখা কেন্দ্র। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর কলকাতায় চিকিৎসা করানোর জন্য ১৮৮৫ সালের ২রা অক্টোবর ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে দখিনেশর থেকে ৫৫ নং শ্যামপুকুর ষ্টীটের এই বাড়িতে এনে রাখা হয়। ঠাকুরের সাথে সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যান্য শিষ্যরাও এই বাড়িতে থাকতেন। প্রায় দুই মাস থাকার পর, ১১ই ডিসেম্বর তিনি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যান কাশীপুর উদ্যান বাটীতে।

১৮৮৫ সালের ৬ই নভেম্বর ছিল কালীপুজো। ঠাকুর সেই দিন রাতে কালীপুজোর আয়োজন করতে বলেছিলেন। সমস্ত উপাচার জোগাড়ের পরেও তিনি কালীপুজো করছেন না দেখে গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ শিষ্যরা তাঁর শরীরেই কালীর পূজো করেন। এই সময় তিনি উঠে দাঁড়িয়ে কালীর মত বর ও অভয় মুদ্রা প্রদর্শন করেন। রামকৃষ্ণ ভক্ত মন্ডলীতে এই ঘটনা "বরাভয় লীলা" নামে পরিচিত।

বর্তমানে শ্যামপুকুর বাটী বেলুড় মঠের অধীনস্থ একটি মঠ কেন্দ্র ও রামকৃষ্ণ মন্দির। যে ঘরে রামকৃষ্ণদেব থাকতেন, সেই ঘরটি এখন ঠাকুর ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যে ঘরে সারদা মা থাকতেন, সেই ঘরটিকেও ঠাকুর ঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই বাড়িতে ঠাকুরের ব্যবহৃত কিছু জিনিস ও কয়েকটি ছবি রাখা আছে। অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে রয়েছে সেই ক্যামেরার কয়েকটি অংশ, যেটি দিয়ে প্রথম রামকৃষ্ণদেবের ছবি তোলা হয়েছিল।








Sunday, 12 May 2019

রামকৃষ্ণ মঠ, ময়ালবন্দি পুর, ইছাপুর, হুগলি।

রামকৃষ্ণ মঠ, ইছাপুর,  ময়াল বন্দিপুর, হুগলি।১৯৯৪ সালের ২১ আগষ্ট হুগলি জেলার প্রত্যন্ত ইছাপুর গ্রামে স্থানীয় অধিবাসীদের চেষ্টায় এই মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পাষ'দ শ্রী রামকৃষ্ণাননদের জন্মস্থান। যিনি শশী মহারাজ নামে পরিচিত। শ্রী রামকৃষ্ণাননদ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের সরাসরি শিষ‍্য। তার গুরুভক্তির জন্য তিনি বিশেষ পরিচিত। টানা ১২ বৎসর বরাহনগর মঠে সেবা করেন।
মঠের প্রথম প্রেসিডেন্ট স্বামী নি'লিপতাননদজী মহারাজের প্রচেষ্টায় এই মঠ আস্তে আস্তে উন্নতি সাধন করে। দৈনিক পূজা ও প্রার্থনা ছাড়াও শ্রী রামকৃষ্ণদেব, সারদা মা, স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রী রামকৃষ্ণাননদের জন্ম তিথি পালন করা হয়। ফলহারিনী কালী পূজা ও অন্নপূর্ণা পূজা প্রবল ‌উৎসাহে উদযাপিত হয়। আশ্রমের ডাক্তারি পরিসেবা, শিক্ষা বি‌ষয়ক পরিসেবা ও জনসেবামূলক পরিসেবা উল্লেখযোগ্য।
এটি আরামবাগ থেকে প্রায় ২০.৪ কি মি  ও  তারকেশ্বর থেকে ৪১ কি মি দূরে।







আলমবাজার মঠ, আলমবাজার, অশোকগড়, কলকাতা-৩৫।

আলমবাজার মঠ, আলমবাজার, অশোকগড়, কলকাতা - ৩৫.

শ্রী রামকৃষ্ণ ভাবধারায় অনুপ্রাণিত মঠগুলির মধ্যে এটি দ্বিতীয় মঠ। ১৮৯২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত এটিই প্রধান কার্যালয় ছিল। এরপর প্রধান কার্যালয় বেলুড়ে স্থানান্তরিত হয়।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের অসুস্থতার কারণে কাশীপুরের একটি উদ্যান সহ বাড়ি মাসিক ৮০ টাকায় নেওয়া হয়েছিল। এই বাড়িতে থাকাকালীন ১৮৮৬ সালের ১ লা জানুয়ারি অসুস্থ শ্রী রামকৃষ্ণ তাঁর গৃহী ভক্তদের জন্য ভক্তদের সামনে কল্পতরু হন। আর এই বাড়িতে ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট মৃত্যু হয় শ্রী রামকৃষ্ণদেবের। তার অল্প কিছু দিন পরেই শ্রী রামকৃষ্ণদেবের " পূতাসথি" নিয়ে শিষ্যরা চলে আসেন বরানগরের একটি বাড়িতে যা পরে বরানগর মঠ নামে পরিচিত হয়। এই বাড়ি থেকে বিবেকানন্দ ভারত ভ্রমনে বেরোন, পরে চলে যান শিকাগো।

এরই কিছুকাল পরে কলকাতায় থাকা শ্রী রামকৃষ্ণদেবের অন্যান্য শিষ্যরা বরাহনগরের ঐ বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলমবাজার অঞ্চলে রামচন্দ্র বাগচি লেনে একটি " ভূতুড়ে বাড়ি"-তে উঠে আসেন সাধন ভজনের জন্য। আমেরিকা ও ইউরোপ ভ্রমণ শেষে ১৮৯৭-এর ১৯ শে ফেব্রুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতায় ফিরে আলমবাজারের ঐ বাড়িতে ওঠেন। সে বাড়িই আজ আলমবাজার মঠ নামে পরিচিত।পরে এই মঠ বিস্মিতির আড়ালে চলে যায়। ১৯৬৮তে স্বামী অভেদানন্দের শিষ্য স্বামী সত্যানন্দ বাড়িটির খানিকটা অংশ উদ্ধার করে শ্রী রামকৃষ্ণদেবের নিত্যসেবা, পূজা ও জনকল্যাণমূলক কাজ আরম্ভ করেন। বর্তমানে ভারত সরকার এটিকে জাতীয় স্মারক হিসেবে ঘোষণা করেছেন ও বাড়িটি সম্পূর্ণ ভাবে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এখানে সরকারি সাহায্যের মাধ্যমে VIVEKANANDA CENTER FOR SPIRITUAL CULTURE স্থাপন করা হবে বলে স্থির করা হয়েছে।














কাশীপুর উদ্যান বাটী, কাশীপুর রোড, কাশীপুর, কলকাতা - ২.

কাশীপুর উদ্যান বাটী, কাশীপুর রোড, কাশীপুর, কলকাতা - ২.

রামকৃষ্ণ মঠের কাশীপুর শাখাটি কাশীপুর উদ্যান বাটী নামে পরিচিত। ১৯৪৬ সালে এটি রামকৃষ্ণ মঠের শাখাকেন্দে পরিনত হয়। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ১৮৮৫ সালের ১১ই ডিসেম্বর থেকে ১৮৮৬ সালের ১৬ই আগষ্ট,  তাঁর প্রয়ান পর্যন্ত কাশীপুর উদ্যান বাটীতে বাস করেছিলেন।

কাশীপুর উদ্যান বাটী ছিল বিশিষ্ট জমিদার রানী কাত্যায়নীর জামাই গোপাললাল ঘোষের সম্পত্তি। শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসের ভক্তগন তাঁর কাছ থেকে মাসিক ৮০ টাকা ভাড়ায় প্রথমে ছয় মাস ও পরে আরও তিন মাসের জন্য বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন। উদ্যান বাটীর মোট এলাকার আয়তন ছিল ১১ বিঘার কিছু বেশি।

উদ্যানবাটির দোতলায় ঠাকুর যে ঘরে বাস করতেন বর্তমানে সেই ঘরটি মন্দির রূপে বিবেচিত হয়। এরই পাশে আছে ঠাকুরের ভাড়ারঘর। ঠাকুর বসবাসকালীন যা তার স্নানঘর হিসেবে ব্যবহার হতো। একতলার হলঘরটিতেও সুন্দর করে ঠাকুরের ছবি বসান। আর এক তলাতেই আছে শ্রী শ্রী মা সারদার ঘর। দোতলায় উঠার সিঁড়িটিও আখুন্ন আছে। আছে স্বামীজির ঘর এবং সংরক্ষিত আছে ঐতিহাসিক খেজুর গাছটি। ( যে গাছের গোড়ায় বাস করত এক বিষধর সাপ। ঠাকুরের যুবক ভক্তদের খেজুর রসপানের ইচ্ছা জাগে। তখন জানতে পেরে ঠাকুর নিজে গিয়ে সাপটিকে তাড়িয়ে দিয়ে আসেন। যার প্রত্যখ্যদর্শী ছিলেন মা স্বয়ঙ। ) 






রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে কাশীপুর উদ্যান বাটী বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি মঠ। কারন, এই বাড়িতে শ্রী রামকৃষ্ণ তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যদের সন্ন্যাস গ্রহণ ও সংঘ বদ্ধ ভাবে জনসেবার কাজে উদ্বুদ্ধ করে ছিলেন। যা বাস্তবায়িত করতে পরবর্তী কালে স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এই উদ্যান বাটী একটি তীর্থস্থানের মর্যাদা পায়।

ঠাকুর অসুস্থ থাকাকালীনই কাশীপুর উদ্যান বাটী এক মহা তীর্থখেত্র হয়ে উঠেছিল। এই স্থানের বিশেষ গুরুত্ব হল এখানেই শ্রীরামকৃষ্ন তাঁর ভক্তদের সন্ন্যাসের জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। এমনকি এই ভক্তদের তিনি মাঝেমধ্যে কাছাকাছি গ্রামে ভিখ্যে করতে পাঠাতেন। তিনি নিজেও ওই ভিখান্ন থেকে কখনও কখনও দুই এক কনা গ্রহন করতেন। এবং এখানেই তিনি তাঁর চিহ্নিত সন্তানদের গেরুয়া বসন ও রুদ্রাখ্য মালা প্রদান করেন। বাস্তবিক অর্থে এই স্থানেই শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সংঘ গড়ার সূচনাখেত্র বলা যেতে পারে।

আর এই মঠের বাগানে একটি আমগাছের তলায় দাঁড়িয়ে শ্রী রামকৃষ্ণ কল্পতরু হয়েছিলেন।

কল্পতরু হল স্বর্গের বৃক্ষ। ওই বৃক্ষের কাছে যে যা চাইবে তাই পাবে। চতুর্থবর্গ ফল অর্থাৎ ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোখ্য --- যে যা চাইবে তাই প্রাপ্ত হবে। তাই তাকে কল্পতরু আখ্যা দেওয়া হয়েছে। শ্রী রামকৃষ্ণ ওই দিন ভগবান ভাবেই ভক্তের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বলে মনে করেছিলেন উপস্থিতজনরা। 

ধ্য


কল্পতরু কথার অর্থ হলো ইন্দ্রলোকের সর্বকামনা পূরনকারী দেবতরু। অর্থাৎ অত্যন্ত উদার ও বদান্য ব্যক্তি, যিনি অন্যের ইচ্ছা সহজেই পূরন করেন। ১৮৮৬ সালে ১লা জানুয়ারি কল্পতরু রূপেই ভক্তদের আশীর্বাদ করেছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। সেদিন জাগতিক আর অতি জাগতিক খেত্রকে একীভূত করে অভিনব ভাবে নিজেকে প্রকাশ করেছিলেন। তীব্র রোগ যন্ত্রণার মধ্যেও ভক্তদের শুনিয়েছিলেন " তোমাদের চৈতন্য হউক "। সেদিন যে যা কামনা করেছিলেন তাই তিনি দান করেছিলেন অকাতরে। এই স্বার্থ গন্ধহীন আশীর্বাদে সকলের মনের আনন্দ উথলিয়ে উঠেছিল। আর সেই থেকে বছরের প্রথম দিনটি কল্পতরু উৎসব নামে পরিচিত। এই উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছর উদ্যান বাটীতে প্রচুর ভক্ত সমাগম হয়।

এই উদ্যানবাটিতেই নরেন্দ্রনাথ তাঁর কয়েকজন গুরুভাইকে সঙ্গে নিয়ে একদিন মধ্যরাতে ধুনি জ্বালিয়ে ছিলেন। তিনি তাকে ব্যাখ্যা করেছিলেন " সাধুরা এই সময়ে বৃক্ষ তলে ধুনি  জ্বালাইয়া
 থাকে, আর আমরাও ওইরুপ শুনি জ্বালাইয়া অন্তরের নিভৃত বাসনা সকল দগ্ধ করি ।"


মন্দির খোলা থাকার সময় ::

শীতকালে - সকাল ৬টা থেকে বেলা ১১-৩০ মি
                  বিকেল ৩-৩০মি থেকে রাত ৮টা
গ্রীষ্মকালে - সকাল ৫-৩০মি থেকে ১১-৩০মি
                  বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।
এখানে প্রতিদিন প্রসাদ পাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তবে উৎসবে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ করা হয়।






 

গৌরহাটি রামকৃষ্ণ মঠ, হুগলি।

গৌরহাটি রামকৃষ্ণ মঠ, হুগলী। আশ্রমটি ১৯৭১ সালে আরামবাগ থানার অন্তর্গত এই গ্রামে স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা স্থাপিত হয়। ২০০৯ সালে বেলুড় মঠ এটি অধিগ্রহণ করে এবং ২০১২ সাল পর্যন্ত এটি ময়াল-ইছাপুর রামকৃষ্ণ মিশনের অধীনে সাবসেনটার হিসাবে থাকে।২০১২ সাল থেকে এটি স্বাধীন রামকৃষ্ণ মিশনের শাখা হিসাবে কাজ করে চলেছে।





হুগলি জেলার আরামবাগ থানার অন্তর্গত গৌরহাটি গ্রামে ছিল শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ভগিনী সর্বমঙ্গলাদেবীর শ্বশুরালয়। কোনো এক চৈত্র মাসে আমবারুণীর সময় শ্রীরামকৃষ্ণ আরামবাগের ডিহিবয়রা, কানপুরে অনুষ্ঠিত রঞ্জিত রায়ের দিঘির মেলা দেখতে আসেন। সেসময় তিনি ভগিনীর গৃহে আগমন করেন। গৌরহাটি গ্রাম তখন থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণের পাদস্পর্শে ধন্য। গত শতাব্দীর সাতের দশকে দুলাল দত্ত নিজ বাড়িতে ঠাকুর, মা ও স্বামীজীর পট স্থাপন করে নিয়মিত জন্মতিথি পালন শুরু করেছিলেন। কয়েক বছর পর স্বামী গদাধরানন্দের অনুপ্রেরণায় বর্তমান মন্দিরের স্থানে একটি মাটির চালাঘর নির্মাণ করে ঠাকুর, মা ও স্বামীজীর প্রতিকৃতি স্থাপন করে জন্মতিথি পালন এবং ঠাকুরের নিত্যপূজা, ভজন ও পাঠচক্র শুরু হয়। গোপালচন্দ্র মালের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে আশ্রমের যাবতীয় কর্ম চলতে থাকে। ১৯৭১ সালে শি‌ক্ষক অন্নদাচরণ ভট্টাচার্য বর্তমান পাকা মন্দিরের ভিিত্তপ্রস্তর স্থাপন করেন। প্রসঙ্গত, মন্দিরটি শ্রীরামকৃষ্ণের পদার্পণধন্য সর্বমঙ্গলাদেবীর শ্বশুরগৃহের কাছে। ১৯৭৮ সালে দ্বারকেশ্বর নদের প্রবল বন্যার পর বালি-দীঘরা গ্রামে রিলিফের কাজ দর্শন করতে আসেন স্বামী গম্ভীরানন্দ এবং স্বামী আত্মস্থানন্দ। কমিটির সদস্যবৃন্দের আমন্ত্রণে তাঁরা এই আশ্রমে আগমন করেন। শ্রীশ্রীঠাকুরের শ্রীচরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে স্বামী গম্ভীরানন্দ বলে ওঠেন : “সত্যকৃষ্ণ, ঠাকুর প্রকট হয়ে এখানে বসে আছেন।” উপস্থিত এক ভক্তকে তিনি এই আশ্রমের জন্য কিছু করার নির্দেশ দেন। ল‌খনৌ-নিবাসী সেই ব্যবসায়ী ভক্ত পরবর্তিকালে আশ্রমের অধিকাংশ ব্যয়ভার বহন করেন। এছাড়া গ্রামের বর্ধিষ্ণু ও সম্ভ্রান্ত সিংহ রায় পরিবার বেশ কিছু জমি ও পুকুর দান করেন। এছাড়াও অন্যদের দান করা এবং পরবর্তী সময়ে ক্রয় করা এই আশ্রমের মোট জমির পরিমাণ বর্তমানে ৫.২৫ একর। ১৯৮৬ সালের ১২ মে অ‌ক্ষয়তৃতীয়ার দিন এই আশ্রমের দ্বারোদ্ঘাটন করেন স্বামী গম্ভীরানন্দ এবং ১৯৮৭ সালের ১১ জুন স্নানযাত্রার দিন ঠাকুরের মর্মর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন স্বামী ভূতেশানন্দ। 

Saturday, 11 May 2019

অন্নপূর্ণা মন্দির, তালপুকুর, ব্যারাকপুর

অন্নপূর্ণা মন্দির, তালপুকুর, ব্যারাকপুর।





অন্ন দিয়ে যিনি দারিদ্র্য, দুঃখ মেটান তিনিই অন্নপূর্ণা। অন্নদামঙগল কাব্যের প্রভাবেই বাংলায় এই পূজোর প্রাভাব ঘটেছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অন্নপূর্ণার কোনোও প্রাচীন মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। কথিত আছে নাদিয়া রাজবংশের  প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় এই পূজোর প্রচলন করেন। পরবর্তী কালে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এই পূজো শুরু হয়। তবে এই দেবীর প্রতিষ্ঠিত মন্দির বিরল। কৃষ্ণনগর  রাজবাড়ীতেও এই পূজো হত। এ ছাড়া কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দির সারা দেশে প্রসিদ্ধ।

পার্বতীর অন্য এক রূপ হল অন্নপূর্ণা। অন্নদা নামেও পরিচিত।  অন্ন কথার অর্থ ধান। আর পূর্না-র অর্থ হল পূর্ন। অর্থাৎ যিনি অন্নদাত্রী।  শক্তির অপর রূপ হিসাবে হিন্দুদের মধ্যে বিরাজমান এই দেবী। দ্বিগুণ অন্নপূর্ণার এক হাতে অন্নপাত্র  ও অন্য হাতে হাতা থাকে। দেবীর একপাশে থাকেন ভূমি ও অন্যপাশে থাকেন শ্রী। বাসন্তী পূজোর অষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণার পূজা করা হয়। কালী ও জগদ্ধাত্রী  পুজোর মতোই তান্ত্রিক মতে এই পূজো হয়ে থাকে।

পুরানমতে বিয়ের পর কৈলাশ পর্বতে শিব ও পার্বতী বেশ সুখেই দাম্পত্যজীবন কাট্টাছিলেন। কিন্ত আর্থিক অনটনের জেরে কিছুদিন পর শুরু হয় দাম্পত্যকলহ।  দারিদ্রের কারনে দেবীর সঙ্গে দেবাদিদেবের মতবিরোধে পার্বতী কৈলাশ ত্যাগ করলে মহামারী ও খাদ্যশস্য ঘটে।  ভক্তগনকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ  কাধে তুলে নেন। কিন্ত দেবীর মায়ায় কোথাও ভিক্ষা পান না তিনি। তখন দেবাদিদেব শোনেন যে কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবীকে চিনতে মহাদেবের একটুও দেরি হয় না। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহন করে ভক্তদের মহামারী ও খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন। এরপর দেবীর মহিমা বৃদ্ধির জন্য কাশীতে একটি মন্দির স্থাপন করেন শিব। চৈত্র মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথিতে সেই মন্দিরে দেবী অবতীর্ণ হলেন। সেই থেকেই দেবীর পূজার প্রচলন বাড়ে।

কলকাতার কাছেই ব্যারাকপুরের তালপুকুর অঞ্চলে রয়েছে একটি অন্নপূর্ণা মন্দির, যা দেখতে অবিকল দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের মতো এবং এজন্য এটি দ্বিতীয় দক্ষিণেশ্বর নমে পরিচিত। ব্যারাকপুর-টিটাগড় অঞ্চলের প্রাচীন নাম চানক। সেই সূত্র ধরেই এই মন্দিরটিকে চানক অন্নপূর্ণা মন্দিরও বলে। মন্দিরটি বঙ্গীয় স্থাপত্য শৈলীর নবরত্ন মন্দির ধারায় নির্মিত। দখ্য শিল্পী না থাকায় দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের মতো এখানেও টেরাকোটার কাজ ব্যবহার করা যায়নি। তবে এই মন্দিরের কার্নিসগুলোতে শঙ্খের অত্যন্ত সুনিপুণ কাজ রয়েছে।

এই মন্দিরটি মা ভবতারিণীর মন্দিরটির  স্থপতির পরিকল্পনাতেই নির্মিত।  তবে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের তুলনায় উচ্চতায় সামান্য বেশি। কিন্ত দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে কিছুটা কম। এটি একটি নিয়মিত চূড়া বিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির।  সঙ্গে বড় একটি নাট মন্দির,  দুটি নহবতখানা, ছয়টি আটচালার শিবমন্দির  ( কল্যানেশ্বর,  কাম্বেশ্বর, কিন্নরেশ্বর,  কেদারেশ্বর, কৈলাসেশ্বর ও কপিলেশ্বর) এবং ভোগের ঘর ও গঙ্গার ঘাট। প্রতিটি শিবলিঙ্গই কষ্টি পাথরের তৈরী ও তিন ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট। এই শিবমন্দিরের মাঝ বরাবর একটা সোজা রাস্তা গিয়ে পরেছে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ঘাটে উপর চাঁদনীতে পাকা ছাদ আর সেখান দিয়েই সোজা সিড়ি নেমে গিয়েছে নদী পর্যন্ত।  এটি তৈরী করতে ব্যায়  হয়েছিল তৎকালীন যুগে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা। মন্দিরের গর্ভ গৃহে অবস্থান করছেন অষ্টধাতু নির্মিত শিব ও অন্নপূর্ণার বিগ্রহ। দেবী অলঙ্কার ভূষিতা। অন্নদানরতা মাতৃ মূর্তি, যাঁর ডান হাতে আছে অন্নদান করার হাতা আর বাঁ  হাতে অন্নপাত্র।  দেবীর ডান পাশে রয়েছেন দেবাদিদেব যাঁর এক হাতে ত্রিশূল আর অন্য হাতে ভিক্ষাপাত্র। প্রতিমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বিশেষ পূজা হ্য়। মন্দিরে দেবীকে প্রতিদিন নিবেদন করা হয় অন্ন ভোগ। সেই ভোগে মাছ থাকা আবশ্যিক।  অন্নপূর্ণা পূজোর দিন অন্নকূট উৎসব হয়। এছাড়া কালীপুজোর পরের দিন অন্নকূটের আয়োজন করা হয়। আগে পাঁঠা বলি হত। অনেকদিন তা বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে অন্নপূর্ণা পূজা ছাড়াও মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসে ( চৈত্র সংক্রান্তি ) উৎসবের আয়োজন করা হয়। এছাড়া মঙ্গলচন্ভী পূজো, বিপত্তারিনী পূজা, অম্ববাচী,  জন্মাষ্টমী,  দূর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা ও জগদ্ধাত্রী পুজোতেও বিষেশ পূজো ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। 

১৮৪৭ সালে রানী রাসমনি তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস, আত্মীয় স্বজন ও অসংখ্য দাসদাসীকে সঙ্গে নিয়ে কাশীযাত্রা করেছিলেন। রাতে নৌকায় দেবীর স্বপ্নাদেশ পান, কাশী না গিয়ে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপূজার ব্যবস্থা করতে। এরপর রানী কাশী যাত্রা স্থগিত রেখে দখিনেশ্বরে ভবতারিণী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৫৫ সালে।


এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জগদম্বা দেবী, রানী রাসমনির কনিষ্ঠ কন্যা। রানী রাসমনির জামাই মথুর বিশ্বাস তাঁর প্রথমা স্ত্রী করুনাময়ীর ( রানী রাসমনির সেজ মেয়ে ) মৃত্যুর পর জগদম্বা দেবীকে বিবাহ করেন। শোন যায়, কাশীর অন্নপূর্ণা দর্শনে বিঘ্ন ঘটায় সেই থেকে মথুরবাবুর মনে ইচ্ছা ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার।মথুরবাবু তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর জমি থেকে বর্তমান মন্দিরের ভূখণ্ডটি তাঁর চার পুত্রের নামে ক্রয় করেন। মথুরবাবুর মৃত্যুর পর জগদম্বা দেবী পুত্রদের কাছ থেকে দানপত্রের মাধ্যমে এই জমির উত্তরাধিকারীনী হন। এই জমিতে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব তাঁর ইচ্ছায় সন্মতি প্রকাশ করেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁদের পুত্র দ্বারিকানাথ বিশ্বাস। তারপর অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই মন্দিরে দেবী প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৭৫ সালের ১২ই এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তির দিন। জমি নির্বাচন, ভিত্তি স্থাপন, মন্দির প্রতিষ্ঠা ও পরে ১৮৮২ সালে উল্টোরথ উপলক্ষে মোট চার বার শ্রী রামকৃষ্ণ এই মন্দিরে আসেন। মন্দিরের নিত্যসেবা ও পূজো পার্বনের জন্য জগদম্বা দেবী সেই সময়ে উপযুক্ত সম্পত্তি দিয়ে " অর্পণনামা " করেছিলেন। সেই অর্পণনামা অনুসারে বঙ্গশের বয়োজ্যেষ্ঠ মন্দিরের সেবায়িত হতে হয়। মন্দির প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছিলেন " আমি চানকে অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠার সময় দ্বারিকবাবুকে বলেছিলাম বড়দীঘিতে মাছ আছে গভীর জলে। চার ফেল, সেই চারের গন্ধে বড় মাছ আসবে।এক একবার ঘাই দেবে। প্রেমে ভক্তিরূপ চার।"


মন্দির চত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পূর্ব দিকে প্রধান প্রবেশ দ্বারের উপর একটি সিংহের মূর্তি আছে। সেই সময় স্থানীয় ইংরেজ সরকার এই সিংহের মূর্তিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল যে এটা বৃটিশ সম্রারাজ্যের প্রতীক। তাই মন্দির কর্তৃপক্ষের কোনো এক্তিয়ার নেই এটা ব্যবহার করার। এ ব্যাপারে মামলাও হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত রায় দিয়েছিলেন, সিংহ বিক্রমের প্রতীক রূপে যে কেউ তা গ্রহণ করতে পারে। মন্দিরের কাছেই গঙ্গার ঘাট, যা রানী রাসমনি ঘাট নামে পরিচিত। শোন যায় এখানেই
 রামকৃষ্ণদেব  স্নান করেছিলেন শিখ সৈন্যদের সাথে।

অন্নপূর্ণার পূজো প্রতিদিন সকালে মঙ্গলারতি, দূপুরে অন্নভোগ এবং সন্ধ্যায় আরতি ও দুধ-লুচি সহযোগে শীতল পূজো হয়। আর অন্নপূর্ণা পূজোয় এখানে জাঁকজমক সহকারে পূজো হয়।

মন্দির দর্শনের সময় ---
গ্রীষ্মকালে  -- সকাল ৫টা৩০মি থেকে দুপুর ১২টা৩০মি।  বিকেল ৪টা থেকে রাত্রি ৮টা।
শীতকালে  -- সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা। বিকেল ৩টা৩০মি থেকে রাত্রি ৮টা।

আগে থেকে জানালে দুপুরে ভোগপ্রসাদ পাওয়া যায়।  মথুরবাবুর পরে পঞ্চম বংশধরের বড় ছেলে  শ্রী অশোক কুমার বিশ্বাস বর্তমানে মন্দিরের সেবাইত। ভোগপ্রসাদ পাওয়ার জন্য ওনাকে আগের দিন জানতে হয়।  ফোন নং: 7044642244। চার্জ - 100 টাকা প্রতিজন। প্রসাদ বিতরণ করা হয় দুপুর  1টা থেকে 1-30টা র মধ্যে।  এছাড়া ওনার ভাই  শ্রী অজয় কুমার বিশ্বাসও ঐ মন্দিরেই থাকেন।  ওনার  মোবাইল নং : 7980987731 ,  9073483989।

জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পরে মন্দিরের আয় কমতে থাকে। দেবোত্তর এষ্টটের উদ্যোগে মন্দিরের নিত্যপূজা ও সেবা হলেও আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়েছে রক্ষানাবেখ্নে ও সংস্কার নিয়ে। ঐতিহাসিক এই মন্দির রক্ষানাবেখ্নে আজও মেলেনি কোনো সরকারি সহায়তা। পূজো পার্বনে ভক্তদের সমাবেশ হলেও অন্যান্য দিনে খুব কম সংখ্যক মানুষের আনাগোনা এই মন্দিরে।

অন্নপূর্ণা মন্দির যেতে হলে শ্যামবাজার থেকে ব্যারাকপুরগামী যেকোনো বাসে তালপুকুর সষ্টপেজে নামুন। ট্রেনে যেতে হলে শিয়ালদহ থেকে ব্যারাকপুরগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে উঠে ব্যারাকপুরে নামুন। সেখান থেকে বিটি রোডে এসে টিটাগড়গামী যেকোনো বাসে বা অটোতে তালপুকুর নামুন। সেখান থেকে রিকশায়, টোটো বা পায়ে হেঁটে ৫ মিনিটে মন্দিরে পৌঁছান।