অন্নপূর্ণা মন্দির, তালপুকুর, ব্যারাকপুর।
অন্ন দিয়ে যিনি দারিদ্র্য, দুঃখ মেটান তিনিই অন্নপূর্ণা। অন্নদামঙগল কাব্যের প্রভাবেই বাংলায় এই পূজোর প্রাভাব ঘটেছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত অন্নপূর্ণার কোনোও প্রাচীন মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়নি। কথিত আছে নাদিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ভবানন্দ মজুমদার বাংলায় এই পূজোর প্রচলন করেন। পরবর্তী কালে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে এই পূজো শুরু হয়। তবে এই দেবীর প্রতিষ্ঠিত মন্দির বিরল। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ীতেও এই পূজো হত। এ ছাড়া কাশীর অন্নপূর্ণা মন্দির সারা দেশে প্রসিদ্ধ।
পার্বতীর অন্য এক রূপ হল অন্নপূর্ণা। অন্নদা নামেও পরিচিত। অন্ন কথার অর্থ ধান। আর পূর্না-র অর্থ হল পূর্ন। অর্থাৎ যিনি অন্নদাত্রী। শক্তির অপর রূপ হিসাবে হিন্দুদের মধ্যে বিরাজমান এই দেবী। দ্বিগুণ অন্নপূর্ণার এক হাতে অন্নপাত্র ও অন্য হাতে হাতা থাকে। দেবীর একপাশে থাকেন ভূমি ও অন্যপাশে থাকেন শ্রী। বাসন্তী পূজোর অষ্টমী তিথিতে অন্নপূর্ণার পূজা করা হয়। কালী ও জগদ্ধাত্রী পুজোর মতোই তান্ত্রিক মতে এই পূজো হয়ে থাকে।
পুরানমতে বিয়ের পর কৈলাশ পর্বতে শিব ও পার্বতী বেশ সুখেই দাম্পত্যজীবন কাট্টাছিলেন। কিন্ত আর্থিক অনটনের জেরে কিছুদিন পর শুরু হয় দাম্পত্যকলহ। দারিদ্রের কারনে দেবীর সঙ্গে দেবাদিদেবের মতবিরোধে পার্বতী কৈলাশ ত্যাগ করলে মহামারী ও খাদ্যশস্য ঘটে। ভক্তগনকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ কাধে তুলে নেন। কিন্ত দেবীর মায়ায় কোথাও ভিক্ষা পান না তিনি। তখন দেবাদিদেব শোনেন যে কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবীকে চিনতে মহাদেবের একটুও দেরি হয় না। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহন করে ভক্তদের মহামারী ও খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন। এরপর দেবীর মহিমা বৃদ্ধির জন্য কাশীতে একটি মন্দির স্থাপন করেন শিব। চৈত্র মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথিতে সেই মন্দিরে দেবী অবতীর্ণ হলেন। সেই থেকেই দেবীর পূজার প্রচলন বাড়ে।
কলকাতার কাছেই ব্যারাকপুরের তালপুকুর অঞ্চলে রয়েছে একটি অন্নপূর্ণা মন্দির, যা দেখতে অবিকল দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের মতো এবং এজন্য এটি দ্বিতীয় দক্ষিণেশ্বর নমে পরিচিত। ব্যারাকপুর-টিটাগড় অঞ্চলের প্রাচীন নাম চানক। সেই সূত্র ধরেই এই মন্দিরটিকে চানক অন্নপূর্ণা মন্দিরও বলে। মন্দিরটি বঙ্গীয় স্থাপত্য শৈলীর নবরত্ন মন্দির ধারায় নির্মিত। দখ্য শিল্পী না থাকায় দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের মতো এখানেও টেরাকোটার কাজ ব্যবহার করা যায়নি। তবে এই মন্দিরের কার্নিসগুলোতে শঙ্খের অত্যন্ত সুনিপুণ কাজ রয়েছে।
এই মন্দিরটি মা ভবতারিণীর মন্দিরটির স্থপতির পরিকল্পনাতেই নির্মিত। তবে দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের তুলনায় উচ্চতায় সামান্য বেশি। কিন্ত দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে কিছুটা কম। এটি একটি নিয়মিত চূড়া বিশিষ্ট নবরত্ন মন্দির। সঙ্গে বড় একটি নাট মন্দির, দুটি নহবতখানা, ছয়টি আটচালার শিবমন্দির ( কল্যানেশ্বর, কাম্বেশ্বর, কিন্নরেশ্বর, কেদারেশ্বর, কৈলাসেশ্বর ও কপিলেশ্বর) এবং ভোগের ঘর ও গঙ্গার ঘাট। প্রতিটি শিবলিঙ্গই কষ্টি পাথরের তৈরী ও তিন ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট। এই শিবমন্দিরের মাঝ বরাবর একটা সোজা রাস্তা গিয়ে পরেছে গঙ্গার ঘাটে। গঙ্গার ঘাটে উপর চাঁদনীতে পাকা ছাদ আর সেখান দিয়েই সোজা সিড়ি নেমে গিয়েছে নদী পর্যন্ত। এটি তৈরী করতে ব্যায় হয়েছিল তৎকালীন যুগে প্রায় ৩ লক্ষ টাকা। মন্দিরের গর্ভ গৃহে অবস্থান করছেন অষ্টধাতু নির্মিত শিব ও অন্নপূর্ণার বিগ্রহ। দেবী অলঙ্কার ভূষিতা। অন্নদানরতা মাতৃ মূর্তি, যাঁর ডান হাতে আছে অন্নদান করার হাতা আর বাঁ হাতে অন্নপাত্র। দেবীর ডান পাশে রয়েছেন দেবাদিদেব যাঁর এক হাতে ত্রিশূল আর অন্য হাতে ভিক্ষাপাত্র। প্রতিমাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বিশেষ পূজা হ্য়। মন্দিরে দেবীকে প্রতিদিন নিবেদন করা হয় অন্ন ভোগ। সেই ভোগে মাছ থাকা আবশ্যিক। অন্নপূর্ণা পূজোর দিন অন্নকূট উৎসব হয়। এছাড়া কালীপুজোর পরের দিন অন্নকূটের আয়োজন করা হয়। আগে পাঁঠা বলি হত। অনেকদিন তা বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে অন্নপূর্ণা পূজা ছাড়াও মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবসে ( চৈত্র সংক্রান্তি ) উৎসবের আয়োজন করা হয়। এছাড়া মঙ্গলচন্ভী পূজো, বিপত্তারিনী পূজা, অম্ববাচী, জন্মাষ্টমী, দূর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা, কালীপূজা ও জগদ্ধাত্রী পুজোতেও বিষেশ পূজো ও অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
১৮৪৭ সালে রানী রাসমনি তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস, আত্মীয় স্বজন ও অসংখ্য দাসদাসীকে সঙ্গে নিয়ে কাশীযাত্রা করেছিলেন। রাতে নৌকায় দেবীর স্বপ্নাদেশ পান, কাশী না গিয়ে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে দেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করে নিত্যপূজার ব্যবস্থা করতে। এরপর রানী কাশী যাত্রা স্থগিত রেখে দখিনেশ্বরে ভবতারিণী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন ১৮৫৫ সালে।
এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জগদম্বা দেবী, রানী রাসমনির কনিষ্ঠ কন্যা। রানী রাসমনির জামাই মথুর বিশ্বাস তাঁর প্রথমা স্ত্রী করুনাময়ীর ( রানী রাসমনির সেজ মেয়ে ) মৃত্যুর পর জগদম্বা দেবীকে বিবাহ করেন। শোন যায়, কাশীর অন্নপূর্ণা দর্শনে বিঘ্ন ঘটায় সেই থেকে মথুরবাবুর মনে ইচ্ছা ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার।মথুরবাবু তৎকালীন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর জমি থেকে বর্তমান মন্দিরের ভূখণ্ডটি তাঁর চার পুত্রের নামে ক্রয় করেন। মথুরবাবুর মৃত্যুর পর জগদম্বা দেবী পুত্রদের কাছ থেকে দানপত্রের মাধ্যমে এই জমির উত্তরাধিকারীনী হন। এই জমিতে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব তাঁর ইচ্ছায় সন্মতি প্রকাশ করেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যবস্থা করেছিলেন তাঁদের পুত্র দ্বারিকানাথ বিশ্বাস। তারপর অক্লান্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও অর্থ ব্যয়ে নির্মিত এই মন্দিরে দেবী প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৭৫ সালের ১২ই এপ্রিল চৈত্র সংক্রান্তির দিন। জমি নির্বাচন, ভিত্তি স্থাপন, মন্দির প্রতিষ্ঠা ও পরে ১৮৮২ সালে উল্টোরথ উপলক্ষে মোট চার বার শ্রী রামকৃষ্ণ এই মন্দিরে আসেন। মন্দিরের নিত্যসেবা ও পূজো পার্বনের জন্য জগদম্বা দেবী সেই সময়ে উপযুক্ত সম্পত্তি দিয়ে " অর্পণনামা " করেছিলেন। সেই অর্পণনামা অনুসারে বঙ্গশের বয়োজ্যেষ্ঠ মন্দিরের সেবায়িত হতে হয়। মন্দির প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছিলেন " আমি চানকে অন্নপূর্ণা প্রতিষ্ঠার সময় দ্বারিকবাবুকে বলেছিলাম বড়দীঘিতে মাছ আছে গভীর জলে। চার ফেল, সেই চারের গন্ধে বড় মাছ আসবে।এক একবার ঘাই দেবে। প্রেমে ভক্তিরূপ চার।"
মন্দির চত্বর পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। পূর্ব দিকে প্রধান প্রবেশ দ্বারের উপর একটি সিংহের মূর্তি আছে। সেই সময় স্থানীয় ইংরেজ সরকার এই সিংহের মূর্তিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়েছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল যে এটা বৃটিশ সম্রারাজ্যের প্রতীক। তাই মন্দির কর্তৃপক্ষের কোনো এক্তিয়ার নেই এটা ব্যবহার করার। এ ব্যাপারে মামলাও হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর আদালত রায় দিয়েছিলেন, সিংহ বিক্রমের প্রতীক রূপে যে কেউ তা গ্রহণ করতে পারে। মন্দিরের কাছেই গঙ্গার ঘাট, যা রানী রাসমনি ঘাট নামে পরিচিত। শোন যায় এখানেই
রামকৃষ্ণদেব স্নান করেছিলেন শিখ সৈন্যদের সাথে।
অন্নপূর্ণার পূজো প্রতিদিন সকালে মঙ্গলারতি, দূপুরে অন্নভোগ এবং সন্ধ্যায় আরতি ও দুধ-লুচি সহযোগে শীতল পূজো হয়। আর অন্নপূর্ণা পূজোয় এখানে জাঁকজমক সহকারে পূজো হয়।
মন্দির দর্শনের সময় ---
গ্রীষ্মকালে -- সকাল ৫টা৩০মি থেকে দুপুর ১২টা৩০মি। বিকেল ৪টা থেকে রাত্রি ৮টা।
শীতকালে -- সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা। বিকেল ৩টা৩০মি থেকে রাত্রি ৮টা।
আগে থেকে জানালে দুপুরে ভোগপ্রসাদ পাওয়া যায়। মথুরবাবুর পরে পঞ্চম বংশধরের বড় ছেলে শ্রী অশোক কুমার বিশ্বাস বর্তমানে মন্দিরের সেবাইত। ভোগপ্রসাদ পাওয়ার জন্য ওনাকে আগের দিন জানতে হয়। ফোন নং: 7044642244। চার্জ - 100 টাকা প্রতিজন। প্রসাদ বিতরণ করা হয় দুপুর 1টা থেকে 1-30টা র মধ্যে। এছাড়া ওনার ভাই শ্রী অজয় কুমার বিশ্বাসও ঐ মন্দিরেই থাকেন। ওনার মোবাইল নং : 7980987731 , 9073483989।
জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের পরে মন্দিরের আয় কমতে থাকে। দেবোত্তর এষ্টটের উদ্যোগে মন্দিরের নিত্যপূজা ও সেবা হলেও আর্থিক সমস্যা তৈরি হয়েছে রক্ষানাবেখ্নে ও সংস্কার নিয়ে। ঐতিহাসিক এই মন্দির রক্ষানাবেখ্নে আজও মেলেনি কোনো সরকারি সহায়তা। পূজো পার্বনে ভক্তদের সমাবেশ হলেও অন্যান্য দিনে খুব কম সংখ্যক মানুষের আনাগোনা এই মন্দিরে।
অন্নপূর্ণা মন্দির যেতে হলে শ্যামবাজার থেকে ব্যারাকপুরগামী যেকোনো বাসে তালপুকুর সষ্টপেজে নামুন। ট্রেনে যেতে হলে শিয়ালদহ থেকে ব্যারাকপুরগামী যেকোনো লোকাল ট্রেনে উঠে ব্যারাকপুরে নামুন। সেখান থেকে বিটি রোডে এসে টিটাগড়গামী যেকোনো বাসে বা অটোতে তালপুকুর নামুন। সেখান থেকে রিকশায়, টোটো বা পায়ে হেঁটে ৫ মিনিটে মন্দিরে পৌঁছান।