Sunday, 8 August 2021

ষোড়শী (ফলহারিনী) মায়ের পূজোয় শ্রীরামকৃষ্ণদেব

 




কালকে যিনি হরণ করেন তিনি কালী। কালের কবলে পড়ে বিনাশ হয়নি ,এমন বস্তু এই জগতে নেই। তাই কালের সঙ্গে কালীর সম্পর্ক চিরন্তন  এবং চির মাধুর্যময়। এই কালকে যিনি শাসন ও নিয়ন্ত্রণ করেন যিনি সেই কালিকা , দেখতে ভয়ংকর হলেও তিনি আমাদের কাছে অত্যন্ত কাছের,  অতি আপন, আমাদের ভালবাসার ও শ্রদ্ধার জগতের মঙ্গলময়ী মা। দশমহাবিদ্যার প্রথম রুপ কালী স্বয়ং ব্রহ্মশক্তি । স্বয়ং মহাকাল শিব মায়ের পদতলে বিরাজ করছেন।  তিনি সবরূপে নির্গুন। পরমসত্ত্বা তাঁর উপর দন্ডয়মান। জগতের সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্তী। চৈতন্য রূপী কালী। এই কালী আবার জীবের কর্মফল দানকারী। কর্মফল অনুযায়ী ভাল-মন্দ ফল দান করেন।  মহাকালী একাধারে ভয়ংকরী , অন্যদিকে অপার করুনাময়ী। 



হিন্দুধর্মে বিভিন্ন তিথিতে মা কালীর বিভিন্ন রূপের পূজো করা হয়। দেবীর আরধনা সর্বজনবিধিত। জৈষ্ঠ মাসের আমাবস্যা তিথিতে ফলহারিনী কালীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। মা কালী জীবের কর্মফল অনুসারে ফলপ্রদান করেন।  এই মাতৃরূপা মহাশক্তি প্রসন্না হলে জীবের দু:খ ও দুর্দশা থেকে মুক্তি মেলে। সেই সঙ্গে শারীরিক,  মানসিক,  নৈতিক  ও আধ্যাত্মিক  শক্তি লাভ  হয়।



মায়ের কাছে শ্রদ্ধা, ভক্তি, প্রেম, বিবেক, বৈরাগ্য প্রর্থনা করতে হয়। দেবী কালিকার বিভিন্ন নাম।  কোথাও নিত্যকালী, কোথাও মহাকালী , কোথাও ভদ্রকালী, কোথাও শ্যামাকালী, কোথাও শ্মশানকালী, কোথাও রটন্তীকালী, আবার কোথাও ফলহারিনী কালী -------- এইসব বিভিন্ন নামে পূজিত হন।  জৈষ্ঠ্য মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীতে ফলহারিনী কালী পূজো অনুষ্ঠিত হয়। এই ব্রহ্মময়ী কালী একদিকে যেমন সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশ করছেন,  আবার তিনিই তেমন সমস্ত কিছু  শক্তি, ঞ্জান,  ইচ্ছা ও কর্ম শক্তিরুপে বিরাজিতা। শাস্স্ত্রে আছে "জীবনেয সর্বস্ব " অর্থাৎ  একদিকে তিনি মা ফলহারিনী, সাধকের ফল হরন করেন,  আর অন্যদিকে কর্মফল হরণ করে ভক্তদের,  তাদের অভিষ্ঠফল, মোক্ষফল প্রদান করেন।  ফলহারিনী কালীপুজোর দিন মা কালী স্বয়ং তাঁর সন্তানদের শুভ ফল প্রদান করেন  এবং সেইসঙ্গে তাদের অশুভ ফলও হরণ করে থাকেন। 



দশমহাবিদ্যার যে দশটি রূপ ------- কালী, তারা, ষোড়শী, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, বগলা, ধূমাবতী, মাতঙ্গী , কমলা ______ ষোড়শীর রুপটি সেই আদ্যাশক্তি মহামায়ার রূপ। কথিত আছে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ফলহারিনী কালীপুজোর দিনই স্ত্রী সারদা দেবীকে পুজো করেছিলেন জগত কল্যাণের জন্য।  এদিন শ্রীমা সারদাকে ষোড়শী রূপে পুজো করেছিলেন বলে আজও রামকৃষ্ণ মঠ ও আশ্রমে এই পুজো "ষোড়শী" পুজো নামে পরিচিত।  ১৮২০ বঙ্গাব্দে জৈষ্ঠ্য মাসের আমাবস্যা তিথিতে তিনি দক্ষিণেশ্বরে আদ্যাশক্তি সগুনরূপের পুজো করেছিলেন।  সেজন্য এই দিনটি অত্যন্ত শুভ ও তাৎপর্যপূর্ন। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য বিশেষ নিয়মে পুজো করলেও এই দিনটিতে হিন্দু ধর্মালম্বীরা নানাবিধ মরসুমি ফল দিয়ে কালীপুজো করে থাকেন। 



শ্রীরামকৃষ্ণের মনে জাগ্রত হয়েছে শ্রীজগদম্বাকে ষোড়শী মূর্তিতে আরাধনা করবার।  তন্ত্রসাধনকালে শ্রীজগদম্বার যেসব মূর্তি তিনি দর্শন করেছিলেন------ তাঁর মধ্যে মায়ের ষোড়শী মূর্তিই তাঁর মনের মধ্যে চির জাগরুক হয়েছিল।  ষোড়শীর অপর নাম শ্রীবিদ্যা বা ত্রিপুরাসুন্দরী। দশমহাবিদ্যার সকল রূপই অপূর্ব সরুপা। কিন্ত ষোড়শী মূর্তির সৌন্দর্যের সঙ্গে তাঁদের  তুলনা হয় না। শ্রীরামকৃষ্ণের নিজের কথায়:: "ষোড়শী বা ত্রিপুরামূর্তির অঙ্গ হতে রূপ-সৌন্দর্য গলিত হয়ে চতুর্দিকে পতিত বিচ্ছুরিত হতে দেখেছিলাম। " শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমা সারদা দেবীকেই ষোড়শীমূর্তি রূপে পুজো করবার ব্রতী হয়েছেন।  শ্রীশ্রীমা সারদা দেবী শ্রীরামকৃষ্ণের স্বয়ং মা জগদম্বা। শ্রীশ্রীমাও তাই দেখেন শ্রীরামকৃষ্ণকে। ইতিমধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমাকে লৌকিক ও দেবজীবনোচিত সম্পদরাশিতে ভূষিত করেছিলেন।  শ্রীরামকৃষ্ণ জানতেন ধরাধামে তিনি থাকবেন না বেশিদিন, কিন্ত তার লীলা জগৎময় ছড়িয়ে দেবার জন্য শ্রীশ্রীমার প্রয়োজন এবং শ্রীশ্রীমা জগতে থাকবেন সুদীর্ঘ বছর। তাই নিজের লীলা সম্পূরনের জন্য, জনসমাজে সন্মানিত ও মহিমামন্ডিত করার জন্য,  শ্রীশ্রীমাকে নিজের শক্তি বিষয়ে অবহিত করার জন্য,  নারীর দেবত্বের উদ্বোধনের জন্যই শ্রীরামকৃষ্ণের ষোড়শী পূজোর আয়োজন। 



১২৮০ সালের জৈষ্ঠ্য মাস (১৮৭৩ _ ৭৪)। অমাবস্যার রাত। সেদিন ফলহারিনী কালীপুজো। বাইরে চারদিকে নিকষ কালো। ঝিঝি পোকার ডাক।  জোনাকি পোকার মিটিমিটি আলো। গঙ্গার পাড়ে ঢেউ-এর ঠুস ঠাস শব্দ। অন্ধকারে রঙ্গন ও কৃষ্ণেচূড়ার ফুল যেন আগুনরাঙা। রজনীগন্ধার সুবাস। বেলফুলের মিষ্টি গন্ধ।  মল্লিকা করবী ফুলের চাপা সুঘ্রান। পঞ্চবটির পাতার শির শির আওয়াজ । প্রকৃতি নিস্তব্ধ। শ্রীরামকৃষ্ণের ইচ্ছায় তাঁর ঘরে কালিকাদেবীর বিশেষ পূজার আয়োজন।  হৃদয় ও দীনু পুজারী পূজার সব আয়োজন করেছেন  শ্রীরামকৃষ্ণের নির্দেশে। মন্দিরে মা ভবতারিণীর পূজো ------ আর  শ্রীরামকৃষ্ণের ঘরে চিন্ময়ীর পূজো। কোনও মাটির  বা ধাতব মূর্তি নেই।



শ্রীশ্রীমাকে আগেই তাঁর ঘরে আসার জন্য বলে রেখেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। ঠিক রাত ন-টায় এলেন শ্রীশ্রীমা। শ্রীরামকৃষ্ণের ইঙ্গিতে আলপনা দেওয়া পিড়িতে বসলেন। শ্রীশ্রীমার মুখ উত্তর দিকে। দিব্যভাবে ভাবিত তিনি। ঘটের জল মন্ত্রপুত রেখেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।  পূজার উপকরণ শুদ্ধি করে শ্রীরামকৃষ্ণ জগদম্ভার পূজো আরম্ভ করলেন।  পূজো দেখতে দেখতে শ্রীশ্রীমার ভাব হল, বাহ্যজগৎ প্রায় লুপ্ত হল। মন্ত্রপুত ঘটের জল দিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বারবার অভিযেক করলেন মাকে। মন্ত্র শোনালেন তাকে। প্রার্থনা করলেন___" হে সর্বশক্তির অধীশ্বরী মাত: ত্রিপুরাসুন্দরী, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, শ্রীশ্রীমায়ের শরীর মনকে পবিত্র করে এতে আবির্ভূতা হয়ে সর্বকল্যান কর।" পরে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমায়ের অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধি ন্যাস করে সাক্ষাৎ দেবীঞ্জানে তাকে ষোড়শোপাচারে পুজা করলেন।  শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীশ্রীমায়ের পদযুগলে অলতা আর কপালে সিদুঁর দিলেন। 



পরিয়ে দিলেন নতুন শাড়ি। নিবেদিত হল ভোগ, ফল, মিষ্টি, জল, পান। মিষ্টি শ্রীরামকৃষ্ণ নিজহাতে খাইয়ে দিলেন মাকে  শ্রীশ্রীমা ভাব রাজ্যে অরূঢ় হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের পূজা গ্রহন করলেন। শ্রীশ্রীমা ভাবে আরও ভরপুর হয়ে গেলেন।  সমাধিস্থ---- স্থির---- বাহ্যজগতে আর মন নেই।  শ্রীরামকৃষ্ণও সমাধিস্থ।পূজ্য ও পূজক উভয়েই হলেন আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে একীভূত। ঘর প্রদীপের আলোয় ময়াময়। মধ্যরাত্রির পর শ্রীরামকৃষ্ণ সমাধি থেকে এলেন অর্ধবাহ্যদশায়। আত্ম নিবেদন করলেন শ্রীশ্রীমাকে। বারো বছরের নিজ সাধনার ফল,  জপের মালা, বৈষ্ণব সাধনকালের তুলসির মালা ও মালার ঝুলি, ওন্ত্রমতে সাধনসময়ের রক্তবসন ও রুদ্রাক্ষমালা, সখীভাব সাধনের সিল্কের কাচুলি, ওড়না প্রভৃতি সব দিয়ে দিলেন শ্রীশ্রীমাকে। দেওয়ার সময় তিনি শ্রীশ্রীমাকে প্রনাম করে প্রার্থনা করলেন " হে সর্বমঙ্গলে মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্নকারিনী, হে শরণদায়িনী, ত্রিনয়নী, শিবগেহেনি গৌরি, হে নারায়নী____ তোমাকে প্রনাম করি।" পূজা শেষ হল। মূর্তিমতী বিদ্যারুপিনী মানবীর দেহাবল্মবনে ঈশ্বরীয় উপাসনাপূর্ন সাধনার পরিসমাপ্তি হল। তার দেব-মানবত্ব সর্বতোভাবে সম্পূর্ণতা লাভ করল। পরবর্তী কালে শ্রীশ্রীমা স্বয়ং বলেছেন " আমি তখন যেন কী রকম হয়ে গেছলুম।"



এইদিন "আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায়" উৎসর্গিকৃত ভাবী শ্রীরামকৃষ্ণ সঙ্গের অধিষ্ঠাত্রী দেবীরূপে শ্রীশ্রীমাকে অধিষ্ঠিত করলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।  এবার থেকে শ্রীশ্রীমা সতত সর্বকল্যান করবেন -------- এই ষোড়শী পূজোর দিন থেকে সূচনা হয়েছিল।  শ্রীশ্রীমায়ের ওপর "ভার" অর্পিত করে শ্রীরামকৃষ্ণ পরম নিশ্চিত হলেন।  শ্রীরামকৃষ্ণের ' সে ভার' আজও পালন করে যাচ্ছেন শ্রীশ্রীমা। 



শ্রীরামকৃষ্ণের ষোড়শী পূজোর আর একটি ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গি আছে। এক ::: শ্রীশ্রীমা রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের অধিষ্ঠিত্রী দেবী। তাই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে দেবদেবীর বৈদিক  ও তান্ত্রিক পূজায় শ্রীশ্রীমায়ের নামে সঙ্কল্প হয়। আমরা জানি প্রতি পূজোয় বিধি আছে পূজারম্ভের আগে সংকল্প করা। তাই রামকৃষ্ণ সংঘাধক্ষ বা আশ্রম অধ্যক্ষের নামে কোনও পূজায় সংকল্প হয় না ----- সংকল্প হয় শ্রীশ্রীমায়ের নামে। সংকল্প মন্ত্রে পূজা করার প্রর্থনা ছাড়া যেটি তাৎপর্যপূর্ন,  তা হল জগতের মঙ্গলের জন্য  পূজা করা। আর রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সন্ন্যাসীদের জন্য ঞ্জান,  বৈরাগ্য,  ভক্তি-বিশ্বাসের জন্য প্রার্থনা করা। রামকৃষ্ণ সংঘে শ্রীশ্রীমা জীবন্ত অধিষ্ঠাত্রী দেবী----- তিনি সংঘজননী, সংঘপালনকর্তী , সংঘরক্ষাকর্তী, সংঘঅভয়দাত্রী। দক্ষিণেশ্বরে ষোড়শীপুজোর দিন শ্রীরামকৃষ্ণ এই অভিনব আধ্যাত্মিক ইতিহাস সৃষ্টি করে গেলেন।  দুই ::: অষ্টম শতকে আচার্য শঙ্কর ভারতের সন্ন্যাসী সপ্রদায়কে দশটি নামে ভাগ করেন।  ভারতের চার প্রান্তে চারটি মঠ তৈরি করেন ______ পুবে গোবর্ধন মঠ, পশ্চিমে দ্বারকা মঠ (শারদামঠ), উত্তরে বদরিকাশ্রম (জ্যোতির্মঠ) এবং দক্ষিনে শৃঙ্গেরী মঠ। চার মঠের পরিচালনার ভার পড়ে তার চার প্রধান শিষ্যের উপর। প্রত্যেক  মঠের অধীনে কোন সন্ন্যাসী সম্প্রদায় থাকবে ------ তার বিভাগ করে ভারতের  সন্ন্যাসী সংঘকে  স্থায়ী ভিত্তির উপর স্থাপন করেন। শৃঙ্গারী মঠের অধীন  পুরী সম্প্রদায়।



শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাস গুরু তোতাপুরী। তোতাপুরী পরম্পরায় রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের সন্ন্যাসীবৃন্দ । পুরী সম্প্রদায় শৃঙ্গারী মঠের অন্তর্ভুক্ত।  শৃঙ্গারী মঠের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কমাক্ষী। কামাক্ষী মন্দির রয়েছে  কাঞ্চিপুরমে। কামাক্ষীর অপর নাম  ষোড়শী। তাঁর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত সেখানে। কাঞ্চিপুরমে আচার্য শঙ্কর ওই দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শ্রীবিদ্যা রূপে। শ্রীবিদ্যাও ষোড়শীর অপর নাম।  সেই শ্রীবিদ্যাকে আচার্য শঙ্কর শ্রীযত্নে প্রতিষ্ঠা করলেন শৃঙ্গারী মঠে। আর বর্তমান যুগে শ্রীরামকৃষ্ণ শ্রীবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠা করলেন শ্রীশ্রীমা সারদাদেবীর জীবন্ত মূর্তিতে ভাবী রামকৃষ্ণ সংঘকে সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালিত করার জন্য। এই জন্য  রামকৃষ্ণ সংঘে ফলহারিনী কালীপুজোর দিন ষোড়শী পূজো এক  আধ্যাত্মিকতামন্ডিত ঐতিহাসিক দিন। 




ঐ দিন  ১৮টি কলা ও ৫টি ফল, ফুল,  ক্ষিরের মিষ্টি , বস্ত্র ও দক্ষিনা সহ কোনও কালী মন্দিরে পূজো দেওয়া উচিত।  মনের যে কোনও একটি ইচ্ছা পূরণ করতে মা কালীর চরণে একটি ফল দিয়ে আর সারা বছর ঐ ফল আর খাবেন না। এ ছাড়াও মা কালীর মন্দিরে পাঁচটি ফল দিন।  মাতৃস্থানীয়া কোনও মহিলাকে পাঁচটি ফল দিন আর  প্রনাম করে আশীর্বাদ নিন। আর্থিক সঙ্কট দূর করার জন্য মা কালীর মন্দিরে ক্ষীর দিয়ে পূজো দিন।  ক্ষীরের অভাবে ক্ষীরের প্যারা দিয়েও পূজো দিতে পারেন।  পাশাপাশি একটি সর্ষের তেলের প্রদীপ জ্বেলে দিতে ভুলবেন না কিন্ত।  

Sunday, 20 June 2021

শ্রীরামকৃষ্ঞের সাথে বিদ্যাসাগরের সাক্ষাৎকার

 

শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনী থেকে নেওয়া ::

বিদ্যাসাগর ও ঠাকুরের প্রথম সাক্ষাত্‍কার ::


শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভূমি হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রাম আর ঈশ্বরচন্দ্রের বীরসিংহ গ্রাম। কামারপুকুর থেকে বীরসিংহ খুব দূরের পথ না। সেই জন্য বোধ হয় শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কাছের মানুষ বলে মনে করতেন। তবে সেই মনে হওয়া শুধুই মনে মনে । ঠাকুরের ইচ্ছা বীরসিংহ গ্রামের সিংহটির সাথে একবার অন্তত দেখা করার। তো সেই সুযোগও এলো। যখন ঠাকুরের পরম ভক্ত শ্রীম ওরফে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বিদ্যাসাগরের স্কুলে মাস্টারি করা শুরু করলেন। ঠাকুরই একদিন মাস্টারকে বললেন, "আমাকে বিদ্যাসাগর এর কাছে নিয়ে যাবে? আহা! দক্ষিণেশ্বর কালিবাড়িতে থাকতে থাকতে বিদ্যে আর দয়ার কত কথা শুনেছি! তিনি বিদ্যারও সাগর আবার দয়ারও সাগর।"

মহেন্দ্রগুপ্ত বিদ্যাসাগর কে বললেন," দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ আপনার সাথে দেখা করতে চান।ভারি ইচ্ছা তার আপনার সাথে আলাপ করার।"

ঈশ্বরচন্দ্র হেসে বললেন, "তুমি তো জানো মাস্টার, আমি নাস্তিক মানুষ। ঈশ্বর সত্যি আছেন কিনা সেই বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ। সত্যি বলতে কি ভগবানের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহই নেই। সুতরাং সাধু সন্ন্যাসী দের কাছ থেকেও আমি দূরে থাকি।"

মাস্টার বিদ্যাসাগরের কথা শুনে নীরব রইলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বুঝলেন তিনি মহেন্দ্রকে আঘাত করেছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, "বলত মাস্টার, তিনি কি রকম পরমহংস? তিনি কি গেরুয়া পড়া সন্ন্যাসী?"

মাস্টার এবার ঈশ্বরচন্দ্রর চোখে চোখ রেখে কিঞ্চিৎ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আজ্ঞে না! লাল পেরে কাপড় পড়েন,জামা পড়েন, বার্নিশ করা চটি জুতো পড়েন। রাসমনির কালিবাড়িতে একটি ঘরের ভিতরে বাস করেন। সেই ঘরে তক্তাপোষ পাতা আছে, বিছানা, মশারিও আছে।সেই বিছানায় তিনি শয়ন করেন। তিনি যে সন্ন্যাসী তার কোনো বাহ্যিক চিহ্ন নেই। তবে ঈশ্বর বৈ আর কিছু জানেন না, অহর্নিশি তারই চিন্তা করেন।"

বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রনাথ এর কথায় হেসে ফেললেন, বললেন,"বেশ বেশ তাকে নিয়ে এসো একদিন।"

মহেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণকে বললেন,"বিদ্যাসাগর আপনার সাথে দেখা করতে চান।"

শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের মধ্যে ডুব দিলেন। চোখে মুখে ফুটে উঠলো দৈব উদ্ভাস। শ্রী ঠাকুর মধুর কণ্ঠে বললেন,"এই শনি বার ,সেদিন শ্রাবনের কৃষ্ণাষষ্ঠী, সাগর দর্শনের লগ্ন বিকাল ৪টে। "

(তখন বিদ্যাসাগরের বয়স ঠিক ৬২, রামকৃষ্ণ তার থেকে ১৬ বছরের ছোট, তার বয়স ৪৬। বিদ্যাসাগর এর প্রতি তার ভাব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ভরা। )

বিকাল ঠিক ৪ টা। ঠিকা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ঠাকুর ভাবে তন্ময় হয়ে আছেন। মহেন্দ্র বললেন,"এবার নামতে হবে, আমরা এসে গেছি।" ঠাকুর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন। মাস্টার পথ দেখিয়ে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। উঠোনে ফুল গাছ, ঠাকুর মুগ্ধ হয়ে বাড়ি টি দেখছেন, কি সুন্দর বাড়ি! শান্তির নীড়। সমস্ত বাড়িটি যেন ধ্যানের মন্দির- মনে হল ঠাকুরের। তিনি শুনেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র নাকি ভগবান-টগবানে বিশ্বাস করেন না। মৃদু হাসছেন ঠাকুর।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাক্ষাত্‍কার

ঈশ্বর-অবিশ্বাসী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাত্‍ হয়েছিল ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের । কেমন ছিল দুই কিংবদন্তির সাক্ষাত্‍ ? জানতে ফিরে যেতে হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ।

বিদ্যাসাগর মহাপণ্ডিত।
তিনি ষড়দর্শন পাঠ করেছেন ।
জানতে চেয়েছেন ঈশ্বরকে। আর এইটুকু বুঝতে পেরেছেন যে, ঈশ্বরের বিষয়ে কিছুই জানা যায় না ।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাকালেন বিদ্যাসাগরের দিকে ।যেন বুঝতে পারলেন বিদ্যাসাগরের মনের কথা । বললেন, ব্রহ্মবিদ্যা ও অবিদ্যার পার | তিনি মায়াতীত।
মহাপণ্ডিত বিদ্যাসাগর শুনছেন মুগ্ধ বিস্ময়ে ।

বলে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ -

এই জগতে বিদ্যামায়া-অবিদ্যামায়া দুই আছে ।জ্ঞান-ভক্তি আছে ।আবার কামিনীকাঞ্চনও আছে ।সত্‍-ও আছে ,আবার অসত্‍-ও আছে । ভাল আছে ,আবার মন্দও আছে । কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত ।ভাল-মন্দ জীবের পক্ষে । সত্‍-অসত্‍ জীবের পক্ষে । ব্রহ্মের ওতে কিছু হয় না ।

বিদ্যাসাগর বললেন, একটু ব্যাখ্যা করে, আরও সহজ করে বুঝিয়ে দিন ।

শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ সরল হাসি হেসে বললেন, প্রদীপ যেমন নির্লিপ্ত, ব্রহ্মও সেইরকম । প্রদীপের সামনে কেউ ভাগবত পড়ছে আর কেউ বা জাল করছে । প্রদীপের তাতে কিছু যায় আসে না । কোনও কাজটির সঙ্গেই প্রদীপ যুক্ত হচ্ছে না ।সে নির্লিপ্তভাবে শুধু জ্বলছে ।যদি বলো দুঃখ, পাপ, অশান্তি এ সকল তবে কী ?

তার উত্তর এই যে ওসব জীবের পক্ষে ।ব্রহ্ম নির্লিপ্ত ।যেমন ধরো সাপের মধ্যে বিষ আছে ।অন্যকে কামড়ালে মরে যায় ।সাপের কিন্তু কিছু হয় না ।

বিদ্যাসাগরের মুখে রা নেই । তিনি ক্রমে বুঝতে পারছেন, এক নিরক্ষর ব্রাহ্মণের মুখে বেদান্ত কী সহজ সরল ভাষায় উচ্চারিত হচ্ছে !
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ব্রহ্ম যে কী মুখে বলা যায় না |
সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে।
বেদ,পুরাণ, তন্ত্র, ষড়দর্শন, সব এঁটো |
(থামলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তাকালেন বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে।)

বিস্মিত বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন, এঁটো কেন ?
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে উত্তর দিলেন, মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে, তাই এঁটো হয়ে গেছে ।
কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয়নি গো !
সেই জিনিসটি ব্রহ্ম ।ব্রহ্ম যে কী, আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারেনি ।বিদ্যাসাগরের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল।আবেগে কাঁপছে তাঁর শরীর ।শ্রীরামকৃষ্ণ বয়েসে অনেক ছোট, তবু বিদ্যাসাগরের ইচ্ছে হল তাঁর কাছে নতজানু হওয়ার ।তিনি শুধু কম্পিত কণ্ঠে বললেন, আজ একটি নতুন কথা শিখলাম। ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হননি !

ঘরে তখন অনেক মানুষের ভিড় হয়ে গেছে।সবাই শুনছে ঠাকুরের কথা ।কী সহজ, কী প্রাণস্পর্শী, কী গভীর।ঠাকুর কী অনায়াসে আড়াল সরিয়ে দিচ্ছেন!
ফুটে উঠছে নতুন আলো।জাগ্রত হচ্ছে নব চেতনা ।
উদ্ঘাটিত হচ্ছে সত্যের মুখ।শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, এবার একটা গল্প বলছি, শোনো…

"এক বাপের দুটি ছেলে।ব্রহ্মবিদ্যা শেখবার জন্যে ছেলে দুটোকে বাপ আচার্যের হাতে দিলেন ।কয়েক বছর পরে তারা গুরুগৃহ থেকে ফিরে এলো। এসে বাপকে প্রণাম করলে।বাপের এবার ইচ্ছে হল, এদের ব্রহ্মজ্ঞান কেমন হয়েছে একটু বাজিয়ে দেখবার।বড় ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, বাপ ! তুমি তো সব পড়েছো | ব্রহ্ম কীরূপ বলো দেখি ।
বড় ছেলেটি বেদ থেকে নানা শ্লোক বলে বলে ব্রহ্মের স্বরূপ বোঝাতে লাগল।বাপ শুনলেন | কোনও কথা বললেন না | বড় ছেলে বাপের মনের ভাব বুঝতে পারল না।এবার ছোট ছেলেকে বললেন, তুমি বলো দেখি ব্রহ্মের কী রূপ ?
ছোট ছেলের মুখে কোনও কথা নেই ।
সে হেঁট মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল ।বাপ প্রসন্ন হয়ে ছোট ছেলেকে বললেন, বাপু, তুমি একটু বুঝেছো। ব্রহ্ম যে কী তা মুখে বলা যায় না ।"

শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ থামলেন। তিনি জানেন, সাধারণ মানুষকে তাঁর কথার মর্ম বুঝতে একটু সময় দিতে হয় ।তারপর তাঁর গল্পের সূত্রটি ধরেই বললেন, মানুষ মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি ।কিন্তু সত্যি কি জানা যায় ?জানা গেলেও কতটুকুই বা জানা যায় তাঁকে ?বিদ্যাসাগর নিবিষ্ট হয়ে শুনছেন। আর অপলক তাকিয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে । আর কারও কথা শুনে কখনও এমন ঘোর লাগেনি তাঁর।শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে তাকিয়েই বললেন, আর একটা গল্প বলছি শোনো…

"একটা পিঁপড়ে চিনির পাহাড়ে গিছলো।
এক দানা খেয়ে পেট ভরে গেল | আর এক দানা মুখে করে সে বাসার পথে চলেছে।যাবার সময় ভাবল, এবার এসে সব পাহাড়টা নিয়ে যাব।
ক্ষুদ্র জীবেরা এইসব মনে করে ।জানে না ব্রহ্ম বাক্যমনের অতীত !যে যতই বড় হোক না কেন, তাঁকে জানা যায় না।বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ বলে ফেললেন, কেন শুকদেব ? তিনি তো .শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বললেন, শুকদেবাদি না হয় ডেঁও পিঁপড়ে।চিনির আট-নটা দানা না হয় মুখে করেছে । তার বেশি নয়।

ঘরে এত মানুষ | তবু পিন পড়লে শব্দ পাওয়া যাবে।রোজ কত পণ্ডিত মানুষের আসা-যাওয়া বিদ্যাসাগরের বাড়িতে ।কিন্তু এমন জীবন্ত বেদান্ত কখনও দেখিনি ! শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনছেন আর ভাবছেন বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, তবে বেদে পুরাণে যা বলেছে, সে কী রকম বলা জানো ?বিদ্যাসাগর বুঝলেন, ঘরের মধ্যে আর কেউ না বুঝুক তিনি অন্তত ধারণা করতে পারলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে নতুনভাবে ব্যাখ্যাত হতে চলেছে বেদ ও পুরাণ !তিনি উদগ্রীব হয়ে শুনছেন।ঠাকুর বললেন, একজন সাগর দেখে এলে কেউ যদি জিগ্যেস করে, কেমন দেখলে, সে লোক মুখ হাঁ করে বলে, - ওহ ! কী দেখলুম ! কী হিল্লোল, কল্লোল।ব্রহ্মের কথাও সেই রকম । বেদে আছে তিনি আনন্দস্বরূপ।সচ্চিদানন্দ।বিস্মিত বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বেদ পড়েছেন!তিনি তো নিরক্ষর।বিদ্যাসাগর কী ভাবছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যেন বুঝতে পারলেন।বললেন, শুকদেবাদি এই ব্রহ্মসাগর-তটে দাঁড়িয়ে দর্শন স্পর্শন করেছিলেন মাত্র।তাঁরা কিন্তু ব্রহ্মসাগরে নামেননি । এ সাগরে নামলে আর ফেরবার জো নেই গো ।ঠাকুরের কথায় চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর । এতো একেবারে নতুন কথা।অথচ কী অবলীলায় কথাটি বললেন পরমহংস !বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন তাহলে ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান হওয়ার উপায় ? ঠাকুর উত্তর দিলেন, সমাধিস্থ হলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় ।সেই অবস্থায় বিচার একেবারে বন্ধ হয়ে যায় ।মানুষ চুপ হয়ে যায় ।ব্রহ্ম কী বস্তু, মুখে বলবার শক্তি থাকে না ।

শ্রীরামকৃষ্ণ আর একটা গল্প বললেন--


নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছলো। কত গভীর জল সেই খবরটা সে দিয়ে চেয়েছিল। কিন্তু খবর দেওয়া আর হল না। যেই নামল জলে অমনি গেল গলে ।কে আর খবর দেবে ? একজন প্রশ্ন করলেন, সমাধিস্থ ব্যক্তি যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে তিনি কী আর কথা কন না ?
বিদ্যাসাগরকে চমকে দিল ঠাকুরের বিদ্যুতের মতো উত্তরশঙ্করাচার্য লোকশিক্ষার জন্য বিদ্যার 'আমি' রেখেছিলেন ।বিদ্যাসাগর এই কথার গভীর অর্থটুকু বুঝতে পারলেন। আপাত অশিক্ষিত একটি মানুষের জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা দেখে তিনি স্তম্ভিত !শ্রীরামকৃষ্ণ এবার আরও সহজ করে তাঁর বক্তব্যের সারাত্‍সার তুলে ধরলেন--ব্রহ্মদর্শন হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় ।যতক্ষণ দর্শন না হয়, ততক্ষণই বিচার তেমনি সমাধিত পুরুষ--লোকশিক্ষা দেবার জন্য আবার নেমে আসে আবার কথা কয় ।বিদ্যাসাগরের চোখে একইসঙ্গে ফুটে ওঠে মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা ।তাঁর মন বলে ওঠে , শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস সেই পুরুষ তো তুমি নিজে । সমাধিস্থ হয়েও লোকশিক্ষার জন্য নেমে এসেছো, কথা বলছো !শ্রীরামকৃষ্ণ এবার ব্রহ্মজ্ঞানীর স্বরূপ অন্যভাবে ফুটিয়ে তোলেন্-যতক্ষণ মৌমাছি ফুলে না বসে ততক্ষণ ভনভন করে, ফুলে বসে মধুপান করতে আরম্ভ করলে চুপ হয়ে যায়। মধুপান করে মাতাল হবার পরে আবার কখনও-কখনও গুনগুন করে।পুকুরে কলসিতে জল ভরার সময় ভকভক শব্দ হয়। পূর্ণ হয়ে গেলে আর শব্দ নেই | তবে আর এক কলসিতে যদি ঢালাঢালি হয় তাহলে আবার শব্দ হয়।


একজন হঠাত্‍ বললেন,
ঋষিদের কি ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল ?
শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ হয়েছিল ।বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে এই ব্রহ্মজ্ঞান হয় না ।ঋষিরা দেখা-শোনা-ছোঁয়া এসবের বিষয় থেকে মনকে আলাদা রাখত । সমস্ত দিন ধ্যান করে কাটত । তবে ব্রহ্মকে বোধে বোধ করত ।এবার সরাসরি বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন ঠাকুর । বললেন, "কলিতে অন্নগত প্রাণ ।দেহ বৃদ্ধি যায় না।যারা বিষয় ত্যাগ করতে পারে না, তাদের 'আমি' কোনওভাবে যায় না।
তাদের বরং 'আমি ব্রহ্ম' না বলে বলা উচিত আমি ভক্ত, আমি দাস।
এ অভিমান ভাল।
ভক্তিপথে থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়।" বিদ্যাসাগরকে যেন সরাসরি বলছেন ঠাকুর--জ্ঞানীর পথও পথ ।আবার জ্ঞান-ভক্তির পথও পথ ।আবার ভক্তির পথও পথ।
জ্ঞানযোগও সত্য। ভক্তির পথও সত্য । সব পথ দিয়েই তাঁর কাছে যাওয়া যায়।
কিন্তু যতক্ষণ তিনি 'আমি' রেখেছেন আমাদের মধ্যে ততক্ষণ ভক্তিপথই সোজা।

শ্রীরামকৃষ্ণ এবার যেন শুধু বিদ্যাসাগরকেই দেখছেন ।তিনি এই মহাপণ্ডিতকে বললেন, বিজ্ঞানী কী বলে ? বিজ্ঞানী বলে, যিনি ব্রহ্ম, তিনিই ভগবান।
অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ব্রহ্ম নির্গুণ ।তিনি গুণাতীত ।ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
এই জীবজগত্‍, মন বুদ্ধি, বৈরাগ্য, জ্ঞান, এসব তাঁর ঐশ্বর্য ।
দেখো না এই জগত্‍ কী চমত্‍কার । কত রকম জিনিস, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ।কত রকম জীব ।বড় ছোট ভালমন্দ কারু বেশি শক্তি, কারু কম শক্তি । ব্রহ্মই ভগবান হয়েছেন । যিনি নিরাকার, তিনিই সাকার।যিনি নির্গুণ তিনিই ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।

বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ প্রশ্ন করলেন তিনিই কি কাউকে বেশি শক্তি, কাউকে কম শক্তি দিয়েছেন ?
উত্তর দিলেন পরমহংস-তিনি বিভুরূপে সর্ব ভূতে আছেন ।বিভু মানেই তো পরমেশ্বর। আবার বিভু মানে সর্বব্যাপী ।
পিঁপড়ের মধ্যেও তিনি আছেন। আবার বিরাট পাহাড়ও তারই প্রকাশ ।সর্বত্র তিনি ।কিন্তু শক্তির তারতম্য তো আছেই ।ঠাকুর এবার বিদ্যাসাগরকেই বললেন--এই যেমন তুমি।
তোমাকেই বা সবাই মানে কেন ?
তোমার কি শিং বেরিয়েছে দুটো ?
তোমাকে মানে তার কারণ তোমার দয়া, তোমার বিদ্যে আছে অন্যের চেয়ে অনেক বেশি।
তুমি একথা মানো কি না ?
বিদ্যাসাগর লজ্জা পেলেন ।তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে বললেন--একঘর লোকের সামনে বিদ্যাসাগরকে একথা বলার সাহস কারও হত না-- ঠাকুর বললেন শুধু পাণ্ডিত্যে কিছু হয় না ।মনে রেখো, তাঁকে জানবার জন্যেই বই পড়া ।তাঁকে জানাই একমাত্র জানা ।তাঁকে জানাই সব জানা আর সব অবিদ্যা।


এবার প্রশ্ন করলেন বিদ্যাসাগরকে, গীতার অর্থ কী ?
কী বলবেন বিদ্যাসাগর ? গীতার অর্থ এককথায় বলা যায়? চুপ করে থাকলেন বিদ্যাসাগর ।
বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, গীতার অর্থ দশবার 'গীতা' বলতে যা হয় তাই। দশবার 'গীতা' বলতে গেলে ত্যাগী হয়ে যায়।
গীতার শিক্ষা হল, হে জীব সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করার চেষ্টা করো।
সাধুই হও, আর সংসারী হও, মন থেকে সব আসক্তি ত্যাগ করতে হবে।
এবার বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।ঘরে যেন আর কেউ নেই ।বললেন, অনেক পড়লেই কিছু হয় না গো ।অন্তরের কথাটি বুঝতে হবে ।শুধু পাণ্ডিত্য নয় ।ভক্তি চাই ।তাঁকে ভালবাসতে হবে ।তোমাকে একটা গপ্পো বলছি ।গল্পটা বুঝতে পারলে সব হবে।

চৈতন্যদেব তখন দক্ষিণে তীর্থভ্রমণ করছিলেন । দেখলেন একজন গীতা পড়ছে আর একজন একটু দূরে বসে শুনছে আর কাঁদছে। কেঁদে চোখ ভেসে যাচ্ছে । চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন, তুমি এসব বুঝতে পারছো ? সে বললে, ঠাকুর, আমি এসব শ্লোক কিছুই বুঝতে পারছি না।
চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন তবে কাঁদছো কেন ?

ভক্তটি তখন বললে, আমি দেখেছি অর্জুনের রথ । আর তাঁর সামনে কৃষ্ণ ।আর অর্জুন কথা কচ্চেন।
তাই দেখে আমি কাঁদছি ।বিদ্যাসাগরের বুকের শিরায় টান ধরল ।তাঁর চোখ ভরে এল জলে ।মন ভরে গেল গভীর কৃতজ্ঞতায় ।নতুন চেতনায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি !

বিদ্যাসাগরকে বলতে লাগলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।মনে মনে বিদ্যাসাগর নতজানু, করজোড় । শুনছেন তিনি ।নিষ্কম্প শিখার মতো ।ঠাকুর বলতে লাগলেন- তাঁকে কি শুকনো পাণ্ডিত্য দিয়ে বিচার করে জানা যায় গো ? তাঁর দাস হয়ে তাঁর শরণাগত হয়ে তাঁকে ডাকো |
মনে রেখো, 'আমি' ও 'আমার',এই দুটি অজ্ঞান ।
আমার বাড়ি, আমার টাকা,আমার বিদ্যা,আমার এইসব ঐশ্বর্য,এই যে ভাব, এটি অজ্ঞান থেকে হয় ।আর যদি ভাবো,হে ঈশ্বর,তুমিই কর্তা,এসব জিনিস তোমার,টাকাকড়ি, আমার বিদ্যা,আমার ঐশ্বর্য,আমার পরিবার,সব কিছুই তোমার,আমার বলতে কিছুই নেই--এই ভাব জ্ঞান থেকে হয় ।
বিদ্যাসাগর,তোমার কোন ভাব গো ? হঠাত্‍ জানতে চাইলেন ঠাকুর ।বিদ্যাসাগর কিছুটা অপ্রস্তুত ।খুব মৃদু স্বরে বললেন, আপনাকে সেকথা একলা একদিন বলব ।ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে এবার তাঁর অন্তরকথা,তাঁর নিজস্ব ভাবটি বলার জন্য গান ধরলেন--

কে জানে কালী কেমন?
ষড়দর্শনে না পায় দরশন ।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।
কালী পদ্মবনে হংস সনে,হংসী রূপে করে রমণ ।।
আত্মরাগের আত্মাকালী প্রমাণ প্রণবের মতন ।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন ।।
মায়ের উদরে ব্রক্ষাণ্ডভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জান কেমন ।
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম অন্য কে বা জানে তেমন ।
প্রসাদ ভাসে লোকে হাসে,সন্তরণে সিন্ধু তরন ।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না ধরবে শশী হয়ে বামন ।

গান শেষ করে শুধু একটি কথা বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ,ষড়দর্শনে না পায় দর্শন,পাণ্ডিত্যে তাঁকে পাওয়া যায় না গো । এরপর ঠাকুর কিছুক্ষণ সমাধিস্থ ।চেতনায় ফিরে এসে জিগ্যেস করলেন,কটা বাজে গো ? বিদ্যাসাগর বললেন, রাত ৯টা। এবার যে উঠতে হবে ।ফিরতে হবে সেই দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীরামকৃষ্ণকে বিদায় দিতে মন চাইছে না বিদ্যাসাগরের ।কেন তাঁর এমন হল ? ঠাকুর লাবণ্যময় কণ্ঠে বিদ্যাসাগরকে বললেন,একবার বাগান দেখতে যেও ।রাসমণির বাগান । ভারী চমত্‍কার জায়গা ।

বিদ্যাসাগর-যাবো বৈ কি ! আপনি এলেন আর আমি যাব না ?
শ্রীরামকৃষ্ণ -আমার কাছে ! ছি.ছি !
বিদ্যাসাগর- সে কী ! এমন কথা বললেন কেন ? আমার বুঝিয়ে দিন।
শ্রীরামকৃষ্ণ(সহাস্যে)-আমরা জেলেডিঙ্গি ।খালবিল, আবার বড় নদীতেও যেতে পারি ।কিন্তু তুমি তো জাহাজ গো ।কী জানি যেতে গিয়ে চড়ায় পাছে লেগে যায় । বিদ্যাসাগর চুপ ।উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না । শ্রীরামকৃষ্ণই এগিয়ে এলেন বিদ্যাসাগরকে উদ্ধার করতে ।বললেন,তবে এই সময়ে জাহাজও যেতে পারে । বিদ্যাসাগর ইঙ্গিতটি ধরতে পারলেন ।হেসে বললেন,হ্যাঁ,এটা বর্ষাকাল বটে ।মহেন্দ্রগুপ্ত টিপ্পনি কাটলেন,এতো নবানুরাগের বর্ষা । নবানুরাগের সময় মান-অপমান বোধ থাকে না বটে ।

শ্রীরামকৃষ্ণ ইতিমধ্যে উঠে পড়েছেন ।তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছেন ।একজন ভক্তের হাত ধরে আছেন ।বিদ্যাসাগর আগে আগে চলেছেন ।বাতি হাতে পথ দেখাচ্ছেন তিনি ।
শ্রাবণকৃষ্ণাষষ্ঠী । এখনও চাঁদ ওঠেনি ।দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। বাতাস ভিজে ভিজে,মিঠে। বাতাসে ভেজা ঘাস-পাতা-মাটির সুবাস ।তমসাবৃত উদ্যানভূমির মধ্যে দিয়ে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।বাতির ক্ষীণালোক বহন করে ফটকের সামনে বিদ্যাসাগর | শ্রীরামকৃষ্ণ ফটকে পৌঁছতেই সামনে এসে দাঁড়াল এক গৌরবর্ণ,শ্মশ্রুধারী,বাঙালি পোশাক-পরা যুবক । যুবক শ্রীরামকৃষ্ণের পায়ে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করল ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,বলরাম ! তুমি এখানে এত রাতে ?
বলরাম-আমি অনেক্ষণ এসেছি । এখানেই দাঁড়িয়েছিলাম ।
শ্রীরামকৃষ্ণ- ভেতরে যাওনি কেন ?
বলরাম-আজ্ঞে,সকলে আপনার কথাবার্তা শুনছেন,সেখানে গিয়ে বিরক্ত করিনি ।



শ্রীরামকৃষ্ণ এবার তার ভাড়া করা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়লেন ।বিদ্যাসাগর প্রায় চুপি চুপি মহেন্দ্রকে জিগ্যেস করলেন,ভাড়া কি দেব ?
মহেন্দ্র বললেন ,আজ্ঞে না ।ও হয়ে গেছে । বিদ্যাসাগর ঘোড়ার গাড়ির দরজায় এগিয়ে গেলেন ।তাঁর হাতে বাতিটি ধরা ।বাতির ক্ষীণালোকে ঠাকুরের মুখটি দেখলেন ।তাঁর সমস্ত অন্তর লুটিয়ে পড়ল শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীচরণে এক দীর্ঘায়িত প্রণামে ।
শ্রীরামকৃষ্ণের গাড়ি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি থেকে ।তিনি একা ঠাকুরের প্রস্থানের পথের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন।
তাঁর মনে হল, ভগবান এসেছিলেন ।এক ঝলক দেখা দিয়ে চলে গেলেন ।তারই আশীর্বাদ হয়ে যেন স্বর্গ থেকে নেমে এল ঝিরঝিরে বৃষ্টি ! বৃষ্টির জলে নিভে গেল বিদ্যাসাগরের হাতের বাতিটি।অন্ধকারে একা বিদ্যাসাগর ।
রামকৃষ্ণ-ধারায় কতদিন পরে এমনভাবে প্রাণ জুড়াচ্ছে তাঁর।


শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্বৈত বেদান্ত

 




 আধ্যাত্মিক পুরুষেরা সাধারণত জগৎকে ঘৃণা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সকলকে মায়ের নামে ডাকছেন।  আর নবদর্শন প্রতিষ্ঠা করছেন::" শিবঞ্জানে জীব সেবা"। জীব মাত্রই শিব---- এই ঞ্জানে নূতন পথের উদয়   হলো ---- যার লখ্য সকলকে ঈশ্বর ঞ্জানে সেবা করা,যাতে ঈশ্বরতত্ব প্রতিষ্ঠিত  হয় জীবনে। এই পথের দিশারী শ্রীরামকৃষ্ণ।   প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ সেই পথটির উদ্বোধন করেছিলেন    ১৮৯৭ সালের  ১ লা মে, কলকাতার বলরাম   মন্দিরে।

সেবাযোগ ___ জীবের সেবা___ শিবত্বের সাথে যুক্ত হবার জন্য। এটিই  "রামকৃষ্ণ ছাঁচ" বা ' Ramkrishna Mould' । এর  পিছনে যে তত্ত্ববটিট আছে সেটি অদৈত্বববেদান্ত জাাত  কিন্ত  দ্বৈতভাব সমন্বিত। স্বামীজিও কট্টর অদ্বৈতী ছিলেন কিন্ত তাার অদ্বৈতবেদান্তের মধ্যে একমাত্র দ্ববৈত সংস্কার হলো শিবঞ্জানে জীব সেবা। এ ভাবটির সরল ব্যাখ্যা স্বামী তুুরিয়ানন্দজী তার শরীর ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে করছিলেন " ব্রহ্ম সত্য, জগত সত্য, সত্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত "।

এই  সন্মিলিত  দর্শনই সবরকম বাক-বিতন্ডার অবসান ঘটিয়ে  ' রামকৃষ্ণ ছাঁচ ' কে জনজীবনে উপস্থিত করেছে। "তিনি নি:সন্দেহে অদ্বৈত" মা ঠাকরুনের কথা। কিন্ত অপূর্ব মহিমায় , মেধায়,  প্রঞ্জায় তিনি অদ্বৈতকে ধরেই সব মত পথকে সত্য বলে শ্্র্রদ্ধা   করেন এবং প্রকাশ করেন।  এত Freedom  বা স্বাধীনতা তিনি ছাাড়া আর কোনো অবতার বা ধর্মগুরু দেননি।  গ্রহনশীলতা , সহনশীলতা এভাবেই আসে। তিিিনন যথার্থই Universal, সবার জন্য এসেছেেন। তিনি না এলে অদৈত্বববেদান্ত জনজীবন শুধু নয়, পঠন পাাাঠনঠও বন্ধ হয়ে যেত। বিদ্যাসাগর মশায়   এবশ্রং ব্রাহ্মরা এ বিষয়ে অগ্রনী ভূূূূূমিকা নিয়েছিলেন।  সবার আধ্যাত্মিক জীবন গতিশীল হয়েছে তারই জন্য।  অথচ তিনি তো মা-কে নিয়ে সুখেই  ছিলেন।  সেই মা তাকে পাঠালেন অদৈত্ব সাধনের জন্য।  তার ফলও আমরা পেলাম।  তাঁর তিনটি প্রধান উপদেশই তো অদৈত্ব   নির্ভর।

প্রথম  :: ভাবমুখে থাক :: নির্দেশ পেলে অদৈত্ব সাধনের পর ভাবমুখে থাকার।  সমস্ত ভাবের উৎসমুখে থাকতে। সব ভাব জানা হবে শুধু নয়, তাঁর উৎসমুখ তিনিই।  প্রকাশ এবং অপ্রকাশের, ব্যক্ত এবং অব্যক্তের প্রান্তসীমায় (border) দাড়িয়ে সব জায়গার খবর নিচ্ছেন তিনি। বাইরে প্রকাশ নেই; প্রয়োজন হলে হবে। ভাবমুখে থাকার কথা আগে শোনা যায়নি। নূতন অবতার,  নূতন ভাবনা। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ------ Spiritual plane -এ ভাবমুখে থাকা।

দ্বিতীয় :: ধর্মক্ষেত্রে " যত মত তত পথ " অনুসরন করতে হবে। এ যুগের সাধন তাই। সব মতকে সন্মান জানানো , সব মতের প্রচারের ব্যবস্থা করা। নিন্দা কারও নয়। এটি আজকাল সর্বত্র সম্মানিত এবং অনুসৃত ধর্মনীতি। 

তৃতীয়া  ::  ' শিবঞ্জানে জীবসেবা ' শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যবহারিক ভূমিতে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এটিই আজকের সব ধর্মসম্প্রাদায়ের কাছে বহুমান্য নির্দেশিকা। 

স্বামীজির কাছে এই তিনটি উপদেশই মহার্ঘ্য। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের  এই সাধনুই তো স্বামীজির বানী। আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব অদৈত্ব সাধনা না করলে ঐ তিন ভাবনা থাকত না এবং স্বামীজির কাছে বিশ্ববাসীর জন্য আর কোনও বাণীও থাকত না। 



যৌবনকালে স্বামীজিও ব্রাহ্মসমাজের দলে ভিড়ে বেদান্তকে, মায়াবাদকে নিয়ে উপহাস করতেন।  সেই স্বামীজিকে বেদান্ত বুঝালন শ্রীরামকৃষ্ণদেবই। সে যুগে রামমোহন বলেছিলেন --- বেদান্ত জীবনবিমুখ (Life Negative)। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন --- বেদান্ত ভ্রান্তিদর্শন (Vedanta us a false Philosophy)। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচী থেকে অদ্বৈতসিদ্ধি পাঠ নিষিদ্ধ করেছিলেন । জগৎ মিথ্যা বলে যে দর্শন,  সে দর্শনকে নিয়ে আমরা কি করব? ____ এই ভাব ছিল তখন। এবার দেখাযাক শ্রীরামকৃষ্ণদেব কি বলেলেন। সব সাধনা শেষ করে তিনি গুরু তোতাপুরীজির অধীনে বেদান্ত সাধন করে নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যানে তিনদিন তিনরাত্রি মগ্ন  ছিলেন।  সত্যিই এ এক অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে এক বলিষ্ঠ ব্যাখ্যা দিলেন তিনি কলকাতার পন্ডিত এবং শিক্ষিত সমাজের কাছে। 

সেদিন অর্থাৎ ২৮শে নভেম্বর ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭টার পর,ভক্তদের নিয়ে মাথাঘষা গলিতে শ্রী জয়গোপাল সেনের বাড়িতে গেলেন। জয়গোপাল প্রাচীন ব্রাহ্ম এবং ঠাকুরের একজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মভক্ত। সেখানে শিক্ষিত ভক্তদের মেলা। জয়গোপালের ভাই  বৈকুণ্ঠ আরম্ভ করলেন --- আমরা সংসারী লোক, আমাদের কিছু বলুন।  শ্রীরামকৃষ্ণদেব বললেন --- তাকে জেনে, একহাত ঈশ্বরের পাদপদ্মে রেখে আর এক হাতে সংসারের কাজকর্ম কর। ব্রাহ্মসংস্কারে আঘাত লেগেছে বৈকুণ্ঠের। তিনি প্রতিপ্রশ্ন করলেন --- মাহাশয়, সংসার কি মিথ্যা ? এ প্রশ্নটাই তো বেদান্ত তত্ত্বে প্রবেশের ছাড়পত্র।  শ্রীরামকৃষ্ণদেব মাত্র একটি ছোট কথায় এর এক অপূর্ব উত্তর দিলেন --- যতক্ষণ তাকে না জানা যায়, ততক্ষণ মিথ্যা।  এমন উত্তর শুনে পন্ডিতরাও হতভম্ব হয়ে যাবেন।  " সংসার মিথ্যা " ____ একথা প্রমাণের জন্যই তো এসেছে মায়াবাদ। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বোঝালেন এইভাবে--- যতক্ষণ ঈশ্বর কে জানা হয়নি ততক্ষণ এই সংসার মিথ্যা ; জানা হলে এ সংসারও সত্য।  আরও বললেন __ 'তাকে ভূলে মানুষ  "আমার আমার করে"। এটাই তো মায়া।  আমার তো কোনটাই নয়। বাড়ি বাবা করে দিয়ে গেছেন , এই শরীরটাও তাঁর দেওয়া। "আমি" চলে গেলে দেহটাও পড়ে থাকে। এরপর আরও সহজ ভাবে বোঝালেন।  "তোমরা তো নিজে নিজে দেখছ সংসার অনিত্য   এই দেখ না কেন? কত লোক এল কত লোক গেল। কত জন্মালো, কত দেহত্যাগ করলে ! সংসার এই আছে, এই নেই।  অনিত্য! যাদের এত "আমার আমার " করছ, চোখ বুজলেই নাই।  কেউ নাই।  তবু নাতির জন্য কাশী যাওয়া  হয় না। আমার হারুর কি হবে? এরূপ সংসার মিথ্যা , অনিত্য।  "  মায়াতত্ত্ব এভাবেই কি সহজ হয়ে গেল।


স্বামীজি যে বৈদান্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন যথা বৈদান্তিক স্বাধীনতা (Freedom) , বৈদান্তিক সাম্য (Equity) এবং বৈদান্তিক সৌভ্রাতৃত্ব (Frternity)  তা তো এই  অদৈত্বভাবনার কবিত্বময় উপস্থাপনা। সর্বভূতে তিনি আছেন জেনে সবাইকে ভালবাসা এবং সবার সুখের দু:খের ভাগী হওয়া।  স্বার্থ ত্যাগের মাধ্যমে শিব সেবা -- ভালোবেসে সেবা। কর্মফলের কথা পরে ভাবা যাবে। এখন নিষ্কারন সেবা।  শুধু কারন একটাই------ মানুষ সেবা পেতে চায়। কারণ তার প্রয়োজন আছে। সুতরাং শ্রীরামকৃষ্ণদেবর অদৈত্ব সাধনার ফল আমাদের সমাজে নানাভাবে চর্চিত, অর্পিত, ফলিত হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবর  নির্মিত আচ্ছাদন তলে আমরা আজ নিশ্চিন্তে বসবাস করছি। তাঁকে সহস্রকোটি প্রনাম। 

 "সংসার অসার বলে বোধ হবে না। যে তাকে জেনেছে , সে দেখে যে জীবজগৎ সে তিনিই হয়েছে। ছেলেদের খাওয়াবে , যেন গোপালকে খাওয়াচ্ছ। পিতামাতাকে ঈশ্বর ঈশ্বরী রূপে দেখবে ও সেবা করবে। তাকে জেনে সংসার করলে বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ঐহিক সম্পর্ক থাকে না। দুজনেই ভক্ত,  ঈশ্বরের কথা কয়, ভক্তের সেবা করে। সর্বভূতে তিনি আছেন,  তার সেবা দুজনে করে।" সর্বভূতে তিনি আছেন  ----- এ অদ্বৈতের কথা। সেজন্য সবকিছুই নিতে হবে, কিছু ছাড়া চলবে না। অন্যত্র বলছেন ____ বেল ওজন করার কথা। বেলের খোসা, বিচি, শাঁস সব নিয়ে বেলের ওজন হয়। শুধু শাস নিলে বেলের ওজন কম পরে। দেখে মনে হবে এটি বৈশিষ্টাদ্বৈতবাদের মত। কিন্ত আসলে তা নয়। অদৈত্বের একাত্ব ঞ্জান উপলব্ধির পর জগৎকে যেমন দেখা যায় ---- অর্থাৎ যেন চৈতন্যে জরে রয়েছে ---- সেই ঞ্জান।  এর নাম তিনি দিয়েছেন  ___ বিঞ্জান।  ঞ্জানী আর  বিঞ্জানী , ঞ্জানী একত্ব অনুভব করছেন; বিঞ্জানী আবার নেমে এসে জগৎকে চৈতন্যময় দেখছেন।  অবঞ্জা করে অনিত্য অসার বলছেন না। সর্বোপরি , এই জগতের ক্ষুধা, তৃষ্ণা,  ভালোমন্দের , সুখ দুঃখের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করছেন।  উদ্দেশ্য -- জগতের কল্যাণ করা। 


সাধক আত্মঞ্জান লাভ করার পর জগৎটাকে মিথ্যা বলে ঘোষনা করে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব শোনালেন নতুন বেদ ---- আত্মঞ্জান লাভ করলেই সংসারকেও সত্য বলে বোধ হবে। ভক্তদের কারনটিও বোঝালেন। 


শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে কে " পরমহংস "বলা হয় কেন এবং নামটি কে দিয়েছিলো  ??

পরমহংস হচ্ছে বৈদিক বা বৈদান্তিক অভিধা। চারপাশে যে চরটি মহাকাব্য আছে তা হল [১] প্রঞ্জানং ব্রহ্ম  (ঋকবেদ) [২] তত্বমসি (সামবেদ) [৩] অহংকার ব্রহ্মাস্মি (যজুর্বেদ) [৪] অ্যালার্ম ব্রহ্ম  (অথর্ব বেদ)। ঞ্জান মার্গে যাঁরা  সাধনা করেন , তারা এই  মন্ত্র গুলির যেকোনো একটি নিয়ে অনুশীলন করেন। এবার সাধনার স্তর অনুযায়ী সাধকদের চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমে বহুদক -- যিনি তীর্থ তীর্থ ঘুরে বেড়িয়েছেন বা বহু জায়গায় উদক বা জল পান করেছেন।দ্বিতীয় কুটিচক  -- যিনি সাধনকুটিরে একাকী সাধনা করছেন। তৃতীয় হংস -- যিনি "সোহহং" মন্ত্রের অর্থ সবিকল্প সমাধানের বোধ করছেন। আর চতুর্থ পরমহংস ---- যিনি নির্বিকল্প সমাধিতে ব্রহ্ম সাক্ষাৎ করেছেন এবং সেখান থেকে ফিরে এসে লোকশিক্ষার জন্য  আচার্যের ভূমিকা পালন করে চলেছেন।রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব  ছাড়াও আরও তিনজন পরমহংসের সঙ্গে বাঙালী হিন্দুর পরিচয় আছে। এনারা হলেন শ্রীমৎ  দুর্গাপ্রসন্ন  পরমহংস, শ্রীমৎ নিগমানন্দ পরমহংস ও শ্রীমৎ  পরমহংস যোগানন্দ।

গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের রামকৃষ্ণ নাম দেন বা জনপ্রিয় করেন মথুরনাথ বিশ্বাস বা রাণী রাসমণির মেজ জামাই। আর পরমহংস উপাধি কে দিয়েছিলেন সঠিক তা জানা যায় না। তবে খুব সম্ভবত শ্রীমৎ তোতাপুরীর কইছে বৈদান্তিক মতে সাধনা করেই তিনি এই উপাধি লাভ করেন।  মায়ের আড়ালে পঞ্চবটি বনে সাধনকুটিরে শাস্ত্রমতে সন্ন্যাস নিয়ে তিনি এই সাধনা করেছিলেন। আর সন্ন্যাস গ্রহনকালে নূতন নামকরন হয় ই। যেমন শ্রীমৎ কেশব ভারতী সন্ন্যাস দেওয়ার সময় শ্রী বিশ্বম্ভর মিশ্র ওরফে নিমাই এর নামকরন করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য।  সুতরাং তোতাপুরীর ই এই  নাম দেওয়ার সম্ভবনা বেশি।

Sunday, 23 May 2021

অদ্বৈত বেদান্ত

 


অদ্বৈত অর্থ দুই না অর্থাৎ ব্রহ্ম ও জগৎ বা পরমাত্মা ও জীবাত্মা দুই নয়, এক ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে স্বজাতীয়, বিজাতীয় এবং স্বগত ভেদের কোন প্রকার ভেদই নেই।

জীবের সাথে ব্রহ্মের এবং জগতের সাথে ব্রহ্মের যদি কোন পার্থক্য বা ভেদ না থাকে তবে জীব-জগৎকে ব্রহ্ম হতে পৃথক মনে হচ্ছে কেন? প্রকৃতপক্ষে এই ভেদজ্ঞান অজ্ঞানতাবশত সৃষ্টি হয়। প্রকৃত জ্ঞানের উদয় হলে রাতের অন্ধকার যেমন দিনের আলোর সাথে মিলিয়ে যায় তেমন করে এই অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়। জগৎই ব্রহ্ম অর্থাৎ জগৎ ও ব্রহ্মে কোন ভেদ নেই, এরকম চিমত্মাই হল জ্ঞান আর জগৎ ও ব্রহ্মে ভেদ কল্পনা করাই হল অজ্ঞান বা অবিদ্যা।

অদ্বৈত বেদান্ত বা অদ্বৈতবাদ হল বৈদিক দর্শনের সর্বেশ্বরবাদী ধর্মচর্চার সাধন-পদ্ধতিগত একটি ধারা । সর্বেশ্বরবাদী এ মতে, মানুষের সত্যিকারের সত্ত্বা আত্মা হল শুদ্ধ চৈতন্য এবং পরম সত্য ব্রহ্মও শুদ্ধ চৈতন্য। ...

 অদ্বৈত বেদান্তের প্রধান ব্যাখ্যাকর্তা হলেন আদি শঙ্কর। তবে তিনি এই মতের প্রবর্তক নন।


হিন্দু বেদান্তশাস্ত্রকে কেন্দ্র করে তিনটি মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে, যথা- দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ বা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ এবং অদ্বৈতবাদ। দ্বৈতবাদের প্রবর্তক মাধবাচার্য, দ্বৈতাদ্বৈতবাদের প্রবর্তক শ্রীরামানুজ  এবং অদ্বৈতবাদের প্রবর্তক জগদ্গুরু শংকর। নিচে এই তিন মতবাদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

দ্বৈতবাদ

দ্বৈত অর্থ দুই। ঈশ্বর ও জগত দুই অর্থাৎ এক নয়, এটাই দ্বৈতবাদের মুল কথা। মাধবাচার্যকে দ্বৈতবাদের জনক বলা হয়, তবে দ্বৈতজ্ঞান মূলত স্বভাবজাত বা জন্মগত জ্ঞান। দ্বৈতবাদীরা মনে করেন ঈশ্বর নিরাকার নয় অর্থাৎ ঈশ্বরের নির্দিষ্ট রূপ আছে। ঈশ্বরের কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, এজন্য তিনি স্বয়ম্ভু। দ্বৈতবাদীরা মনে করে ঈশ্বর কোন নির্দিষ্ট লোকে বাস করেন। তাই তাঁরা বিষ্ণুলোক বা বৈকুণ্ঠলোক, শিবলোক, ব্রহ্মলোক প্রভৃতি লোকের অস্তিত্ব স্বীকার করেন। তারা মনে করেন ঈশ্বর ঐসব লোকে বাস করেন আবার সূক্ষ্ম-আত্মা রূপে জীবের হৃদয়াকাশেও বাস করেন। কুমার যেমন নিজ হাতে মাটি দিয়ে কলস, ঘট প্রভৃতি তৈরি করেন, ঈশ্বরও তেমনি পঞ্চভূত দ্বারা এই জড়-জগৎ ও জীবকুলকে সৃষ্টি করেন। ঈশ্বর একাধারে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও ধ্বংসকর্তা।

ভক্তিযোগই দ্বৈতবাদীদের প্রধান অবলম্বন। ঈশ্বরকে ভক্তি করলে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে মুক্তি দেবেন-এটাই দ্বৈতবাদীদের সাধনার মূলকথা। দ্বৈতবাদীদের ঈশ্বর সচ্চিদানন্দময়। ঈশ্বর সৎ অর্থাৎ তাঁর সত্ত্বা আছে, চিৎ অর্থাৎ তিনি চৈতন্যময় আবার তিনি আনন্দময়ও বটে। ঈশ্বর-ভক্তির মাধ্যমে ভক্তের দুঃখ দূর হয় এবং ভক্ত আনন্দ লাভ করেন।দ্বৈতবাদীরা ঈশ্বরের অবতারে বিশ্বাসী। তাঁরা মনে করেন যখন ধর্মের পরিমান কমে যায় এবং অধর্ম বেড়ে যায়, তখন ঈশ্বর বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে এসে ধর্মকে রক্ষা করেন এবং অধর্মকে বিনাশ করেন।

দ্বৈতবাদীরা স্বর্গ-নরকে বিশ্বাসী। তাঁরা মনে করেন পাপকার্য করলে নরকে যেতে হবে এবং পুণ্যকর্ম করলে স্বর্গে যাওয়া যাবে। তবে স্বর্গে গেলেও পুণ্যফল ক্ষয় হওয়ার পর আবার নতুন দেহ ধারণ করে মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু উপাস্য-দেবতার লোকে (যেমন- ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক, শিবলোক প্রভৃতি স্থানে) গেলে আর মর্ত্যে ফিরে আসতে হয় না। এটাই দ্বৈতবাদীদের নিকট মুক্তি নামে কথিত। জগতে যা কিছু হচ্ছে, সব ঈশ্বরের ইচ্ছায় হচ্ছে। ঈশ্বর যাকে সংসার-বন্ধন হতে মুক্তি দেবে একমাত্র তিনিই মুক্তি পাবেন। বস্তুত দ্বৈতবাদ স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞান হলেও এ জ্ঞান চিরস্থায়ী নয়। জ্ঞানের পূর্ণতা আসলে দৈতজ্ঞান দূর হয়ে যায় তখন ঈশ্বরকে আর দূরে মনে হয় না।

বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ

বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বা দ্বৈতাদ্বৈতবাদের প্রবক্তা হলেন শ্রী রামানুজ। রামানুজের পূর্বে যারা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী ছিলেন তাঁরা হলেন- নাথমুনি ও যমুনাচার্য। কিন্তু একমাত্র রামনুজই সুন্দরভাবে যুক্তি স্থাপন করে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদকে প্রচার করেছেন এবং এই মতাদর্শী সম্প্রদায়ও তৈরী করে গেছেন বলে রামানুজকেই বৈশিষ্টাদ্বৈতবাদের জনক বলা হয়। রামানুজের দ্বৈতাদ্বৈতাবাদের ভিত্তি মূলত উপনিষদ, গীতা, মহাভারতের নারায়ণী অধ্যায় ও বিষ্ণু পুরাণ। দ্বৈতবাদ অনুসারে জগৎ ও ব্রহ্ম এক নয়, ভিন্ন। কিন্তু দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অনুসারে জগত ব্রহ্ম থেকে পৃথক নয় আবার জগৎ মিথ্যা বা অস্তিত্বহীন নয়। কারণ ব্রহ্মই জগতে পরিণত হয়েছে। তবে ব্রহ্ম জগতে পরিণত হলেও তা ব্রহ্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্রহ্মের অপরিণামী ও পরিণামী এই দুইটি অংশ রয়েছে। পরিণাম অর্থ অবস্থান্তর বা বিকার। তাই যার অবস্থান্তর বা পরিবর্তন ঘটে অর্থাৎ যা বিকৃত হয়ে অন্য বস্তুতে পরিণত হয় তাই পরিণামী। ব্রহ্মের এই পরিণামী অংশের বিকার ঘটার কারণে জগতের উৎপত্তি হয়েছে। সোজা কথায় ব্রহ্ম রূপান্তরিত হয়ে জগতে পরিণত হয়েছে। তাই এই প্রাণিকুল ও উদ্ভিদকুলসহ দৃশ্যমান যা কিছু আছে তা ব্রহ্মের পরিবর্তিত রূপ।

দ্বৈতাদ্বৈতবাদীদের নিকট জগৎ ব্রহ্ম হতে অভিন্ন কিন্তু জগৎ ব্রহ্ম নয়, কারণ ব্রহ্মের অচিৎ অংশ জগতে পরিণত হয়েছে। ব্রহ্ম বলতে শুধু চিৎ বা নিত্য ও অপরিণামী অংশকেই বুঝতে হবে। 
                                                                                                                                    
মাকড়সা তার দেহে থেকে সুতা নির্গত করে জাল তৈরী করে। ঐ জাল মাকড়সার দেহ থেকে অভিন্ন নয়। জাল মূলত মাকড়সার দেহেরই একটি রূপান্তরিত অংশ। তাই জালকে মাকড়সা বলা যাবে না। তেমনি এই জীব-জগতও ব্রহ্মের একটি পরিবর্তিত রূপ। সেজন্য জীব-জগৎ ব্রহ্ম নয়। মাকড়সার জাল যেমন তার দেহ থেকে অভিন্ন তেমনি এই জীব-জগৎও ব্রহ্ম থেকে অভিন্ন।

দ্বৈতাদ্বৈতবাদীরা মনে করেন ঈশ্বর জগৎ সৃষ্টি করেননি, তিনি নিজেই জগৎ হয়েছেন। যেহেতু জগৎ হল তার পরিণাম সেহেতু তিনি জগৎ নন।  এরকম আপত্তি ওঠে, তার উত্তরে আমরা বলব, দুগ্ধ যেমন দধিতে পরিণত হয় ব্রহ্মও সে রকম জগতে পরিণত হয়ে থাকে’’। উপকরণ বা উপাদান ছাড়া কোন কিছু সৃষ্টি সম্ভব নয়। তবে ব্রহ্ম জগৎ সৃষ্টি করলেন কি উপাদান দিয়ে? সৃষ্টির আদিতে ব্রহ্ম ছাড়া কিছুই ছিল না তবে ব্রহ্ম জগৎ তৈরীর উপাদান কোথায় পেলেন? এর উত্তর ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে এক কার্য-কারণ ভাব আছে। প্রত্যেক কার্যের মূলে একটা কারণ থাকে অর্থাৎ কারণ বিনা কার্য হয় না। যেমন কুমার মাটি দিয়ে কলস তৈরি করল। এখানে মাটি কারণ আর কলস কার্য। কার্য-কারণ একে অন্যের পরিপূরক। কারণ না থাকলে কার্য হয় না আবার কার্য ছাড়া কারণের অস্তিত্ব কি? জগৎ কার্য হলে তার কারণ হবে ব্রহ্ম। ব্রহ্ম যেহেতু এক ও অদ্বিতীয় সেহেতু তিনি অন্য কোন উপাদান থেকে জগৎ সৃষ্টি করেননি। ব্রহ্ম নিজেই উপাদান কারণ অর্থাৎ ব্রহ্মের পরিণামী বা অচিৎ (জড়) অংশই জগতের উপাদান কারণ। দুধ দধিতে পরিণত হতে অন্য কোন উপাদানের প্রয়োজন হয় না। দুধের মধ্যেই যে উপাদান আছে তা দধিতে পরিণত হয়। তদ্রূপ ব্রহ্মের অচিৎ অংশে জগৎ সৃষ্টির উপাদান রয়েছে যা হতে জগৎ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ব্রহ্মের চিৎ অংশ অপরিণামী অর্থাৎ তার বিকার নেই।

রামানুজের মতে জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ নাই কিন্তু স্বগত ভেদ আছে। স্বজাতীয় ভেদ বলতে একই জাতীয় দুটি জীবের মধ্যে ভেদ বা পার্থক্য বোঝায়। যেমন- দুইটি গরুর মধ্যে যে ভেদ। দুইটি ভিন্ন জাতীয় জীবের মধ্যে যে ভেদ, তাকে বিজাতীয় ভেদ বলে। যেমন- একটি ঘোড়া ও একটি সিংহের মধ্যে যে ভেদ। একই জীবের শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে ভেদ, তাকে স্বগত ভেদ হল । যেমন- মানুষের হাত ও পায়ের মধ্যে যে ভেদ। ও ব্রহ্মে কোন স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ নেই। কিন্তু ব্রহ্মের অচিৎ অংশ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে জড়-জগতে পরিণত হয়েছে। তাই জগতের পরিণাম বা বিকার আছে কিন্তু ব্রহ্মের চিৎ অংশের কোন পরিণাম বা বিকার নেই। জগৎ ও ব্রহ্ম একই দেহের দুটি অঙ্গ সরূপ। একই দেহের দুইটি অঙ্গের মধ্যে যেরকম ভেদ থাকে, সেরকম জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে স্বগত ভেদ রয়েছে। তাই জগৎকে ব্রহ্মের দেহ বলা চলে।

এই জগৎ পরিবর্তনশীল এবং জগতের জীব-জড় সকল বস্তু পরিবর্তনশীল। এক জড় পদার্থ অন্য জড় পদার্থে রূপান্তরিত হয়। জীবের জন্ম হয়, বৃদ্ধি ঘটে আবার মৃত্যু হয়। জগৎ যদি ব্রহ্মের দেহ হয়ে থাকে এবং জগতের সব কিছু যদি নশ্বর ও পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে তবে ব্রহ্মের কি পরিবর্তন হবে না? জগতের পরিবতর্নের সাথে ব্রহ্মেরও পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু রামানুজ বলছেন, ব্রহ্ম বিকারশূন্য, অবিনশ্বর ও অপরিণামী। তিনি আরও বলেছেন যে, জগৎ যদি দেহ হয় তবে ব্রহ্ম হবে আত্মা। দেহের জন্ম-মৃত্যু আছে কিন্তু আত্মার জন্ম-মৃত্যু নেই। যেহেতু দেহের পরিবর্তনে আত্মার পরিবর্তন হয় না সেহেতু জগতের পরিবর্তনে ব্রহ্মেরও পরিবর্তন হবে না।

দ্বৈতাদ্বৈতবাদ মতে ব্রহ্মের স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অনুসারে ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু তাঁর দুইটি ভাব, একটি ব্যক্ত এবং অপরটি অব্যক্ত ভাব। অব্যক্ত ভাবে তিনি নিরাকার, অনন্ত, অসীম ও নির্গুণ। ব্রহ্মের এ অব্যক্ত ভাবকে পরমাত্মা বলা হয়। জীবাত্মা হল পরমাত্মার অংশ। যেমন অগ্নির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ অগ্নির অংশ এবং ঐ স্ফুলিঙ্গের মধ্যে অগ্নির গুণ বিদ্যমান তেমনি জীবাত্মার মধ্যেও পরমাত্মার গুণ বিদ্যমান। পরমাত্মার মত জীবাত্মাও অবিনশ্বর অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুরহিত। যেহেতু জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ সেহেতু জীবাত্মা অসীম নয়, সসীম। জীবাত্মার আকার অতি সূক্ষ্ম বলেই তা জীবের সমস্ত শরীরব্যাপী রয়েছে। আত্মার আকৃতি অতি সূক্ষ্ম বলে তাঁকে নিরাকারই বলা চলে। জীবাত্মা সমীম কিন্তু পরমাত্মা বা ব্রহ্ম অসীম তাই জীবাত্মা ও ব্রহ্ম অভেদ হতে পারে না। আবার জীবাত্মা ব্রহ্মের চিৎ-সত্ত্বার ক্ষুদ্র অংশ, তাই জীবাত্মার সাথে ব্রহ্মের ভেদও থাকতে পারে না কারণ অংশকে অংশী হতে পৃথক করা যায় না। তাই রামানুজের মতে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে ভেদ ও অভেদের সম্পর্ক বিদ্যমান অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক আবার দুই। এজন্য রামানুজের মতবাদকে দ্বৈতাদ্বৈত মতবাদ বলে।

 রামানুজের মতে অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার জন্য আত্মার বন্ধন হয়। দেহে আত্মা বন্ধনপ্রাপ্ত হলে পুনর্জন্ম লাভ হয় এবং কর্মফল ভোগ করতে হয়। দেহ ও আত্মা ভিন্ন। দেহকে আত্মা মনে করাই হল অজ্ঞানতা। তাই আত্মাকে দেহ থেকে ভিন্ন মনে করে আত্মার মুক্তির জন্য সাধনা করাই দ্বৈতাদ্বৈতবাদেও মূল লক্ষ্য

আত্মার মুক্তির জন্য বেদ নির্দেশিত কর্ম যেমন- আশ্রমধর্ম পালন, যাগযজ্ঞ পভৃতি করতে হবে। এবং তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে হবে। তবে ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া মুক্তি লাভ সম্ভব নয়। ঈশ্বরকে সাধনার দ্বারা তুষ্ট করলে ঈশ্বর মুক্তি দেবেন। তাই রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ দর্শনে জ্ঞান ও ভক্তিযোগের অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।

অদ্বৈতবাদ


উপনিষদে অদ্বৈতবাদের বীজ থাকলেও জগদ্গুরু শঙ্করকেই অদ্বৈতবাদের জনক বলা হয়। অদ্বৈত অর্থ দুই না অর্থাৎ ব্রহ্ম ও জগৎ বা পরমাত্মা ও জীবাত্মা দুই নয়, এক। ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে স্বজাতীয়, বিজাতীয় এবং স্বগত ভেদের কোন প্রকার ভেদই নেই। ব্রহ্ম সংক্রান্ত এই বিদ্যাকে শাণ্ডিল্য বিদ্যা বলা হয়। অতএব একথা স্পষ্ট যে উপনিষদ বা বেদান্তই অদ্বৈতবাদ দর্শনের ভিত্তি।

জীবের সাথে ব্রহ্মের এবং জগতের সাথে ব্রহ্মের যদি কোন পার্থক্য বা ভেদ না থাকে তবে জীব-জগৎকে ব্রহ্ম হতে পৃথক মনে হচ্ছে কেন? প্রকৃতপক্ষে এই ভেদজ্ঞান অজ্ঞানতাবশত সৃষ্টি হয়। প্রকৃত জ্ঞানের উদয় হলে রাতের অন্ধকার যেমন দিনের আলোর সাথে মিলিয়ে যায় তেমন করে এই অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়। জগৎই ব্রহ্ম অর্থাৎ জগৎ ও ব্রহ্মে কোন ভেদ নেই, এরকম চিমত্মাই হল জ্ঞান আর জগৎ ও ব্রহ্মে ভেদ কল্পনা করাই হল অজ্ঞান বা অবিদ্যা।

প্রকৃতপক্ষে এই দৃশ্যমান জগৎ মিথ্যা এর অর্থ জগৎ অস্তিত্বহীন নয়। জগৎ মিথ্যা বলতে বোঝায় জগৎ আপেক্ষিক, পরিবর্তনশীল ও পরিণামী। স্থান-কাল-পাত্রভেদে জগতের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এক এক স্থানে জগৎ এক এক রকম, এক এক সময়ে জগৎ এক এক রকম এবং এক এক জনের কাছে জগৎ এক এক রকম। অর্থাৎ জগৎ সব সময়, সব স্থানে এবং সবার কাছে এক রকম মনে হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে প্রাচ্য দেশে ও পাশ্চত্য দেশে জগতের রূপ এক রকম নয়। বসমত্ম ঋতুতে জগৎকে যেমন দেখা যায় বর্ষা ঋতুতে তেমন দেখা যায় না। একজন মানুষ জগৎকে যেমন দেখে একটি গরু বা অন্য প্রাণী কিন্তু তেমন দেখে না। তাই জগৎকে সৎ মনে হলেও অর্থাৎ স্থান-কাল-পাত্রভেদে পরিবর্তনশীল হওয়ায় জগৎকে মিথ্যা বলা হয়েছে। 

-‘ব্রহ্ম সত্য ও জগৎ মিথ্যা’ এই ধারণায় দৃঢ় প্রত্যয় হওয়াকেই নিত্য-অনিত্য-বস্তু-বিবেক বলে। জগৎকে সত্য বলে মনে করা মূলত ভ্রম ছাড়া অন্য কিছু নয়। রজ্জুতে যেমন সর্প ভ্রম হয় ব্রহ্মতে তেমনি জগৎ ভ্রম হয়। 
অর্থাৎ অজ্ঞানের জন্যে ভ্রান্তিবশত রজ্জুতে মহাসর্পের মিথ্যাজ্ঞান থেকে ভয়, হৃদকম্প ইত্যাদি যে সব দুঃখের উদ্ভব হয় সেসবের নাশ হয় রজ্জুকে রজ্জু বলে জানলে। ঠিক-ঠিক বিচারের দ্বারা জ্ঞানের উন্মেষ হলে সর্পের মিথ্যাজ্ঞান চলে গিয়ে রজ্জুর পরিচয়ই সত্য হয়। দড়িকে অনেক সময় সাপ বলে মনে হয়। অজ্ঞানতা বা ভ্রমের কারণে এমন মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে দড়ি দড়িই, সাপ নয়। তেমনি ব্রহ্মকেও অজ্ঞানতাবশত জগত মনে হয়। যখন অজ্ঞানতা দূর হয় তখন কিন্তু দড়িকে সাপ মনে হয় না। ভ্রম যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী হবে ঠিক ততক্ষণ পর্যমত্ম দড়িকে সাপ মনে হবে এবং ভ্রমের ক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে সাপের আর অস্তিত্ব থাকবে না। সাপ যেমন মিথ্যা এবং দড়িই সত্য তেমনি এই জগৎ মিথ্যা এবং একমাত্র ব্রহ্মই সত্য। 

ব্রহ্ম অনাদি, অসীম, অনন্ত, নিরাকার ও অপরিণামী। ব্রহ্মের সৃষ্টি ও ধ্বংস নেই। ব্রহ্ম থেকে জগৎ সৃষ্টি হয়নি। ব্রহ্ম আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমন আছে এবং ভবিষ্যতেও তেমন থাকবে। বস্ত্তত জগৎ সৃষ্টির ধারণা ভ্রম মাত্র। কোন কিছু সৃষ্টি করতে হলে উপাদান বা উপকরণ প্রয়োজন। ব্রহ্ম যদি এক ও অদ্বিতীয় হয় তবে উপকরণ সৃষ্টি হবে কিভাবে? যদি উপকরণের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয় তখন ব্রহ্ম দুই হয়ে যাবে। ব্রহ্ম থেকেও উপকরণের সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ ব্রহ্ম চৈতন্যয় ও অপরিণামী। কিন্তু উপকরণ হল জড় ও পরিণামী। একই বস্ত্তর মধ্যে পরিণামী ও অপরিণামী এই দ্বৈত-সত্ত্বা থাকা অসম্ভব। তাই ব্রহ্মের কোন উপাদান বা উপকরণ নেই। যেহেতু উপাদান নেই সেহেতু সৃষ্টি অসম্ভব। সুতরাং কোন কিছুই সৃষ্টি হয়নি। যা কিছু  সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হয় তা আসলে মায়া। মায়ার কারণেই ব্রহ্ম ও জীবে এবং ব্রহ্ম জগতে ভেদজ্ঞান হয়। মায়া কেটে গেলে দৃশ্যমান জগৎ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। তাই যতক্ষণ মায়া থাকবে ঠিক ততক্ষণ জগৎকে সত্য বলে মনে হবে। এই মায়াকে ত্রিগুণাত্বিকা প্রকৃতিও বলা হয়।

কোন হ্রদের জলে সূর্যের যে প্রতিবিম্ব পড়ে সে প্রতিবিম্ব মিথ্যা। দর্পণে যে প্রতিবিম্ব দেখা যায় তাকে সত্য বলে মনে হলেও তা আসলে সত্য নয়। ঐ প্রতিবিম্ব যেমন মিথ্যা, জগৎও তেমনি মিথ্যা। জলে যে বুদবুদের সৃষ্টি হয় সে বুদবুদ জল থেকে পৃথক নয় অর্থাৎ জল ভিন্ন অন্য কিছু নয়। তদ্রূপ জগৎও ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কিছু নয়। অদ্বৈতবাদ দর্শনে জীবাত্মা ও পরমাত্মার পৃথক অস্তিত্ব নেই।

অদ্বৈতবাদ কি শূণ্যবাদকে সমর্থন করে? শঙ্কর বলেছেন দড়িতে সর্প-ভ্রমের কথা কিন্তু তিনি শূন্যে অর্থাৎ যেখানে কোন কিছু নেই এমন স্থানে সর্প-ভ্রমের কথা বলেননি। দড়ি ছিল বলে সর্প-ভ্রম হয়েছে কিন্তু দড়ি না থাকলে সর্প-ভ্রম হত না। অজ্ঞানতাবশত শূন্যস্থানে জগৎ কল্পিত হয় না ব্রহ্মকেই জগত বলে মনে হয়। সুতরাং অদ্বেতবাদ শূণ্যবাদকে সমর্থন করে না। তাই অদ্বৈতবাদের মুলকথা হল মায়ার কারণেই ব্রহ্মকে জগৎ বলে মনে হয়। মায়াই মরুভূমিতে মরীচিকা সৃষ্টি করে। মরুভূমিতে মরীচিকার কারণে তপ্ত বালিকে জল বলে মনে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কাছে না যাওয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত জলের অসিত্মত্ব থাকে কাছে গেলে জলের অস্তিত্ব থাকে না তখন শুধু বালিই দেখা যায়। তাই মায়া দূর হলে অথাৎ জ্ঞানের উদয় হলে জগতের অস্তিত্বও দূর হয়ে যায়।

রামানুজের দ্বৈতাদ্বৈত দর্শন মতে জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ। কিন্তু পরমাত্মা অখণ্ড ও পূর্ণ এবং তাঁকে কর্তন ও ছেদন করা যায় না। সুতরাং পরমাত্মার কোন অংশ হতে পারে না। জীবাত্মা ও পরমাত্মার ভেদজ্ঞান মূলত ভ্রম বা মায়া। এখন মায়া প্রসঙ্গে বিশেষ কিছু কথা বলা প্রয়োজন। মায়া আসলে কি? কোথা থেকে এর উৎপত্তি? মায়া কি ব্রহ্ম ? এসব প্রশ্নের উত্তরে শঙ্কর বলেছেন,‘‘মায়া ব্রহ্মের শক্তি। মায়াকে অব্যক্তও বলা হয়। এই মায়া অনাদি, সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ এই তিন গুণবিশিষ্ট, কারণসরূপা। বিজ্ঞ ব্যক্তি জগতের সৃষ্টিকার্য থেকে এর অস্তিত্ব অনুমান করেন। এই মায়া যে আছে তাও নয় আবার নেই এরকমও নয়। আছেও আবার নেইও এ দুই এর মিশ্রণও নয়। মায়া পরমাত্মা থেকে ভিন্ন নয় অভিন্নও নয় আবার ভিন্ন ও অভিন্ন উভয়রূপাও নয়। মায়া অঙ্গযুক্ত বা অঙ্গহীন নয় অথবা অঙ্গ আছে আবার নেই এই দুয়ের একত্র অবস্থাও নয়। মায়া অতি অদ্ভুতরূপা ও বাক্যের দ্বারা অবর্ণনীয়’’।

প্রকৃতপক্ষে মায়া অজ্ঞেয়। মানুষের চোখ তার নিজের বদনমণ্ডলকে দেখতে পায় না কিন্তু অন্য মানুষ তার বদন-মণ্ডল দেখতে পায়। চোখ বদনমণ্ডলে অবস্থিত, তাই চোখ নিজের বদনমণ্ডলকে দেখতে পায় না কিন্তু অন্যের বদনমণ্ডলকে দেখতে পায়। জীব মায়ার মধ্যে বাস করে তাই সে মায়া উপলব্ধি করতে পারে না। কারণ মায়াকে উপলব্ধি করতে হলে মায়া-সমুদ্রের ওপারে যেতে হবে যা জীবের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব মায়া অজ্ঞেয়। মায়া অজ্ঞেয় বলেই সৃষ্টিপ্রবাহ বেঁচে আছে। মায়াকে জানলে সৃষ্টির অস্তিত্ব থাকে না।

প্রকৃতপক্ষে এই জগৎ-প্রপঞ্চ মনের ভ্রম ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু মন কি? মন কি দেহ থেকে পৃথক? আসলে মন-দেহ সবই মায়া। পঞ্চ-জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা কোন বস্তুর অস্তিত্ব উপলদ্ধি করা হয়। যতক্ষণ পঞ্চ-ইন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল থাকে ততক্ষণ পর্যমত্ম জগতের অসিত্মত্ব থাকে। ঘুমের সময় পঞ্চ-ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও ত্বক) মনে লুপ্ত হয়। তাই স্বপ্ন দেখার সময় মনই জগৎকে বিভিন্ন রূপে দর্শন করায়। কিন্তু স্বপ্নহীন নিদ্রা বা সুসুপ্তির সময় পঞ্চ ইন্দ্রিয় মনে এবং মন আত্মাতে লীন হয়। তখন জগৎকে আর উপলব্ধি করা যায় না। তখন মনই জগৎকে উপলব্ধি করায়। এই মন আছে কি নেই তা বোঝা কষ্ট, তাই এই মনও মায়া। যদি জগৎ সত্য হত তবে সুসুপ্তির সময়ও জগৎকে উপলব্ধি করা যেত। যেহেতু সুসপ্তিতে জগৎকে উপলব্ধি করা যায় না সেহেতু জগৎ মিথ্যা।

এখন অদ্বৈতবাদ দর্শনের মুক্তি প্রসঙ্গে আসা যাক। যেহেতু আত্মা মুক্ত অর্থাৎ আত্মার কোন বন্ধন নেই সেহেতু মুক্তির প্রশ্নই আসে না। যদি জীবাত্মা ও পরমাত্মা একই হয় তাহলে আবার মুক্তি কিসের? অদ্বৈত দর্শনে মুক্তি অর্থ অজ্ঞানতা বা মায়া থেকে মুক্তি। কারণ মায়ার কারণেই আত্মার বন্ধন হয়েছে এমন মনে হয়। এ প্রসঙ্গে ভগবান শঙ্কর বলেছেন-

-ব্রহ্মের থেকে আমি অভিন্ন এই জ্ঞানই সংসার-বন্ধন থেকে মুক্তির কারণ স্বরূপ। আর এই জ্ঞানের দ্বারাই বিবেকী ব্যক্তিরা অদ্বিতীয় আনন্দরূপ ব্রহ্ম লাভ করেন ও ব্রহ্মই হয়ে যান। আবার তিনি বলেছেন- সকাম কার্য নাশ হলে বিষয়-চিন্তার নাশ হয় আর তার থেকে বাসনা ক্ষয় হয়ে যায়। বাসনার পুরোপুরি ক্ষয় হওয়াই হল মোক্ষ। এই অবস্থাকেই জীবন্মুক্তি বলে। মায়া দূর হলেই বিষয় চিমত্মা দূর হবে। তাই মায়া থেকে মুক্তি পেতে গেলে নিজেকে ব্রহ্ম থেকে অভেদ ভাবতে হবে এবং বেদবিহিত কর্ম করতে হবে। ভেতরের আমি-আমি ভাব বা অহংকার দূর করতে হবে কারণ এই অহং ভাবই ভেদজ্ঞান সৃষ্টি করে। শঙ্কারচার্যের মতে কর্ম হতে হবে নিষ্কাম। মুমুক্ষু জীব যখন বিষয়-তৃষ্ণা ত্যাগ করে, নিজেকে ব্রহ্ম থেকে অভিন্ন মনে করে উপাসনা করবে, তখন মায়া দূর হবে এবং মোক্ষ লাভ হবে।



দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও অদ্বৈতবাদ এই তিন মতবাদের সমন্বয়

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, দ্বৈতজ্ঞান স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞান। একজন মানুষ দ্বৈতবাদী হয়েই জন্মগ্রহণ করে। দ্বৈতবাদে ঈশ্বরকে সব থেকে সহজে কল্পনা করা যায়। তাই অধিকাংশ মানুষই দ্বৈতবাদী। তবে দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও অদ্বৈতবাদ সাংঘর্ষিক নয়। এই তিন মতবাদ মূলত জ্ঞানের তিনটি স্তর বা সোপান। মানুষ প্রথমে ঈশ্বরকে দ্বৈত জ্ঞানেই পূজা করে। তারপর আর একটু জ্ঞানের বিকাশ ঘটলে তাঁর মনের দ্বৈতভাব কিছুটা দূর হয়। তখন সে মনে করে ঈশ্বর ও জগতে ভেদ নেই। অর্থাৎ ঈশ্বরই জগতে পরিণত হয়েছে এবং জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। তারপর যখন জ্ঞানের পূর্ণতা আসে তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে জগৎ ও ঈশ্বর অভিন্ন এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মার পৃথক অস্তিত্ব নেই। এভাবে একজন মানুষ জ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে দ্বৈতবাদ থেকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদ এবং দ্বৈতাদ্বৈতবাদ থেকে অদ্বৈতবাদ স্তরে উপনীত হন।