~~ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের স্নেহধন্যা ****রানী রাসমণি~~
দক্ষিণেশ্বর হ'ল অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের লীলাভূমি। সেই ভবতারিণী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রানি রাসমণি যে সাধারণ আর সব "রানী " দের চেয়ে স্বতন্ত্র ছিলেন, সে কথা আমরা সকলেই জানি। " ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মানুষ " ______ এ কথা উপলব্ধি করে রানী নিজেকে নরনারায়ন পূজায় নিয়োজিত করেছিলেন। নিজের অন্তরমহল থেকেই শুরু হয়েছিল এই সেবাব্রত। শশুর, শাশুড়ি, স্বামীকে দিয়ে অন্দরমহল থেকে এই সেবারথ যাত্রা আরম্ভ করে এগিয়ে গিয়েছিল সকল প্রজা বা সাধারণ মানুষের কাছে। আপন করে নিলেন দাস দাসীদের। গুরুজনদের যথাযোগ্য আদার আপ্যায়ন করলেন। অতিথি সেবায় চরম আসক্তি দেখা দিল। দীনদু:খীদের অভাবমোচনই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাড়ালো। এসব কিছুই তিনি করে নিলেন প্রাত্যহিক পূজার মতো। কর্মকে করে নিয়েছিলেন ধর্ম হিসেবে। আর ধর্মকে করে নিয়েছিলেন কর্ম হিসেবে। এ ছিল এক আসক্তিহীন কর্ম। ফলের প্রত্যাশা তিনি কখনই করতেন না। তাই হয়ত অন্দরমহলের গুরুজনরা বুঝতে পেরেছিলেন------ "এ৺র হাত ধরেই আসবে বংশের খ্যাতি। ধন্যি ধন্যি করবে লোকে। রানীর নামে দেওয়া হবে জয়ধ্বনি।"
কলকাতার উত্তরে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে হালিশহর। তার কাছেই কোনাগ্রাম। সেখানে এক দারিদ্র মাহিষ্য পরিবারের কর্তা হরেকৃষ্ন দাস, তাঁর স্ত্রী রামপ্রিয়া দেবী। তাদের দুই ছেলে। রামচন্দ্র এবং গোবিন্দ। ১২০০ বঙ্গাব্দের ১১ই আশ্বিন ( ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ) হরেকৃষ্ন - রামপ্রিয়ার এক কন্যা সন্তান হয়। মেয়ের মুখ দেখে বাবা মায়ের আনন্দের সীমা নেই। তারা প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েদের ডেকে নবজাতিকার কল্যাণ কামনায় হরির লুট দিলেন। এ৺রা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত সেবাপরায়ন ও ধর্মনিষ্ঠ। বাইরের আরম্বরে সাজানোর সঙ্গতি তাদের ছিল না, কিন্ত অন্তরের ঐশ্বর্য কন্যার মধ্যে পূর্ণ করে দিতে তারা কার্পন্য করেননি। মেয়ের নাম রাখা হল রানী।
একদিন এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল রামপ্রিয়াদেবীর______ দেখলেন পূর্ণ চাঁদের জ্যোতস্নায় বৃন্দাবনে রাসলীলা চলছে। গোপীরা কৃষ্ণকে ঘিরে নৃত্যরতা। চিকনশ্যামের কালো রূপে দশ দিক আলোকিত। এমন সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে এক ছোট্ট মেয়ে নাচতে নাচতে এসে মূরলীধারী কৃষ্ণের কোলে ঝাপিয়ে পড়ল। চমকে উঠে বসলেন তিনি। স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন তিনি। তাঁর চোখে পড়ল দেড় বছরের শিশুকন্যা রানীর দিকে। ঠিক যেন সেই স্বপ্নে দেখা সেই ছোট্ট মেয়েটিই। রাসলীলার সেই স্বপ্নটি দেখার পর 'রানী' নামের সঙ্গে "রাসমণি" শব্দটি যুক্ত করা হয়। বৈভবের অধিকারিনী হিসাবে নয় , তবে তাঁর জীবন পরিক্রমা করলে বলা যায়, তিনি সত্যিই সার্থকনামা।
তখন মেয়েরা স্কুলে যেত না। পিতা হরেকৃষ্ন দাস বাড়িতেই তাকে কিছু বাঙলা লেখাপড়া শিখিয়ে ছিলেন। শৈশব থেকে ভক্তির সঙ্গে তীক্ষ্ণ মেধাও ছিল রানীর। কোথাও শাস্ত্র পাঠ কিংবা ভগব্ৎ প্রসঙ্গ আলোচনা হলে রানী নিবিষ্ট মনে শুনত। শুনে বড়ো আনন্দ পেত ছোট্ট মেয়েটি। কখনও কখনও তার ডাগর চোখ দুটো জলে ডেসে যেত। মা-বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই রানী সন্ধ্যাবন্দনা করত, তুলসীতলায় দীপ দিত, গলবস্ত্রে প্রণাম করত। মা রামপ্রিয়া চোখ সরাতে পারতেন না গৌরবর্না, আয়তনয়না মেয়ের দিক থেকে। স্বামীকে বলতেন " এ আমাদের মেয়ে নয়, যেন স্বয়ং ভগবতী;তুমি দেখো এ মেয়ে একদিন রাজরানী হবে।"
মাতৃস্নেহ রানীর ভাগ্যে বেশিদিন ছিল না। রানীর মাত্র সাত বছর বয়সে , আট দিনের জ্বরে রামপ্রিয়া দেবী মারা গেলেন। কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়েছিলেন রানী। যাকে একদিন বৃহৎ লোকসংসারের মা হতে হবে, শৈশবেই তাঁর মাথার উপর থেকে মাতৃচ্ছায়া সরিয়ে নিলেন বিধাতা পুরুষ।
"রানীমা" অভিধায় রানী এবং মা এই দুটি শব্দই মিশে আছে। এবং এই দুটি শব্দই রানী রাসমণির জন্য সপ্রযুক্ত। জীবন এবং চরিত্র------- সব দিক দিয়েই এই শব্দ দুটির মর্যদা রক্ষা করেছেন তিনি। প্রজাদের সন্তানের মতো দেখেছেন তিনি এবং তাদের প্রতি কোনও অন্যায় অবিচারই বরদাস্ত করেননি, তা সে অন্যায়কারী যতই পরাক্রান্ত হোক না কেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে ১৮৩৩ সালে আইন করে শ্বেতাঙ্গ ইংরেজেদর এদেশে জমিদারি কিনে নেওয়ার অধিকার হয়। রানীর জমিদারীর মধ্যে অন্যতম পরগনা ছিল মকিমপুর। সেখানে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার চরমে ওঠে। তারা জোর করে রানীর প্রজাদের জমি নীলচাষের জন্য কেড়ে নেয়। তাদের নীলচায করতে বাধ্য করে। অতিষ্ট প্রজারা রানীর শরণাপন্ন হন। রানী নীলকরদের দমনের জন্য ৫০ জন লাঠিয়াল পাঠিয়ে দেন। নীলকরেরা অত্যাচার করলেই যেন তাদের শায়েস্তা করা হয় ------- এই ছিল রানীর হুকুম। রানীর ভয়ে নীলকরদের অত্যাচার বন্ধ হয়। মকিমপুর পরগনার কুখ্যাত নীলকর ডোনাল্ড সাহেব মামলা করেন। কিন্ত মামলা ডিসমিস হয়ে যায়। রানী নীলকর সাহেবদের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য এই ঘটনা বাংলায় নীল বিদ্রোহ শুরু হওয়ার অনেক আগের কথা।
এবার তাঁর সাংসারিক জীবন সম্বন্ধে কিছু আলোকপাত করা যাক। হাওড়ার খোশালপুর থেকে অনাথ প্রীতিরাম দাস তাঁর দুই ভাইয়ের হাত ধরে এসে পৌচ্ছালেন কলকাতায়। সময়টা ছিল আঠেরো শতকের বর্গি হামলা। উঠলেন জানবাজারের বিশিষ্ট মান্নাবাবুদের বাড়িতে। সেখানে প্রীতিরাম, পিসি ইন্দুবালার কাছে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। প্রথমে বেলেঘাটার ডানকিন সাহেবের নুনের কারখানার মুহুরীর চাকরিতে ঢোকেন প্রীতিরাম। নিজস্ব ক্ষমতায় আরও ব্যবসাবাণিজ্য চালিয়ে বিরাট সম্পত্তির মালিক হন। তিনি এই মান্না পরিবারেই বিবাহ করেন। বিয়েতে পাওয়া ১১বিঘা জমিতে আলাদা বাড়ি করে দুই ভাই এবং স্ত্রীকে নিয়ে তিনি আলাদা ভাবে থাকতে শুরু করেন। প্রীতিরামের দুই পুত্র ___ হরচন্দ্র এবং রাজচন্দ্র। হরচন্দ্র অল্পায়ু এবং অপুত্রক ছিলেন। ছোটছেলে রাজচন্দের দুই পত্নী খুব অল্প বয়সে পর পর মারা যান। রামচন্দ্রের আর বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্ত অদৃষ্টপুরুষের ইচ্ছা ছিল অন্য রকম।
রাজচন্দ্র দাস মাঝে মাঝে পূণ্য তিথি উপলক্ষ্যে নৌকা করে ত্রিবেণীতে স্নান করতে যেতেন। এমনই একদিন তাঁর সঙ্গীরা দেখতে পান, কোনাগ্রামের ঘাটে এক ভারী সুলক্ষণা মেয়ে জল তুলতে এসেছে।সকলে মিলে রাজচন্দ্রের জন্য মেয়েটিকে পছন্দ করেন। সেই ঘাটে নৌকা বেধে তারা পরিচয় নেন। তারপর রাজচন্দ্রকে বিবাহে রাজি করান। সেই মেয়েই রানী।১২১১ বঙ্গাব্দের ৮ই বৈশাখ রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে রানীর শুভ পরিনয় সুসম্পন্ন হয়। তখন রাজচন্দ্র বাবুর বয়স ২১ আর রানীর বয়স ১১।
| রাজচন্দ্রবাবুর সমস্ত দিকে উত্তরোত্তর শ্রী বৃদ্ধি শুরু হয়। রানী রাসমণি বরাবরই স্বামীকে দানধ্যানে ও পুন্যকর্মে অনুপ্রাণিত করতেন। স্নানার্থীদের সুবিধার জন্য বাবুঘাট এবং আহেরীটোলায় গঙ্গায় বাধানো ঘাট, নিমতলায় মুমূর্ষু গঙ্গাযাত্রীদের জন্য পাকা বাড়ি তৈরী করিয়ে সেখানে মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবার জন্য চিকিৎসক এবং পরিচারক নিয়োগ রাজচন্দ্রবাবুর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। |
রানি রাসমণি রোড ও সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত রানি রাসমণির বাসভবনটির আদি ঠিকানা ছিল ৭০ ও ৭১ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। রাসমণির শ্বশুর প্রীতিরাম দাস ১৮০৫ সালে এই বাড়িটি নির্মাণকাজ শুরু করেন। বাড়িটি সম্পূর্ণ হতে ৭-৮ বছর সময় লেগেছিল।
মোকদ্দমা এড়ানো গেল না, রানীর পঞ্চাশ টাকা জরিমানা হল। তিনি সেই টাকা কোর্টে জমা দিলেন বটে, কিন্ত হার মানলেন না। বললেন ' আমার রাস্তা, আমি যা ইচ্ছা করব। সরকার বাহাদুর বাধা দিলে আমি রাস্তা রাখবই না।' বলে কর্মচারীদের হুকুম দিলেন রাস্তা বন্ধ করে দেবার জন্য। বড় বড় গরান কাঠ দিয়ে জানবাজারের বাড়ি থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তার দু'ধারে বেড়া দিয়ে তিনি যাতায়াতের পথ বন্ধ করে জানিয়ে দিলেন " আমার রাস্তা, সরকারের প্রয়োজন হলে তারা আমার থেকে জায়গাটা কিনে নিন। না হলে আমি রাস্তা খুলব না।"
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন " রানী রাসমণি শ্রীশ্রীজগদম্বার অষ্টনায়িকার একজন ____ ধরাধামে তাহার পূজাপ্রচারের জন্য আসিয়াছিলেন। " সেই দেবী কি চলে যেতে পারেন ? যিনি গৃহকর্মে লক্ষ্মী , গরীব দু:খীর সেবায় অন্নপূর্না, শরণাগতের দুর্গতি হরণে দুর্গা , পতিপ্রেমে সাবিত্রি, দৈতদলনে চন্ডী এবং সর্বজনের জনণী, তিনি লোকমাতা রুপে সর্বকালে চিরস্মরণীয়া , প্রণম্যা। দক্ষিণেশ্বর তীর্থভূমি যেমন চিরকালীন, মানুষের ইতিহাসে এই মহীয়সী নারীও অম্লান থেকে যাবেন অনন্তকাল।





















