Tuesday, 29 March 2022

ভবতারিণী মা- এর কথা

 

          মা      ভবতারিণী           



দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের মা ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করেছিল কাটোয়ার দাঁইহাটের ভূমিপুত্র  নবীন ভাস্কর। ১৮৫৫ সালে রানী  রাসমণির ইচ্ছায় দাঁইহাটের বিখ্যাত ভাস্কর নবীন  মা  ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করেছিলেন। মাসাধিকাল ধরে কলকাতায়  রাণি রাসমণির আশ্রয়ে  হবিষ্যান্ন খেয়ে আচার মেনে মা ভবতারিণীর মূর্তির নির্মাণের কাজ  নবীন  ভাস্কর যখন সাঙ্গ করেছিলেন তখন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের মাপে 'মা'এর মূর্তি  বেমানান হচ্ছিল। রাণি রাসমণি ফের নবীন ভাস্করকে  মা ভবতারিণীর দ্বিতীয় মূর্তির  নির্মাণের  বরাত দেন। তবে এবার আগের  মূর্তির থেকে সামান্য  বড় আকারের  তৈরি করতে বলেন।   নবীন ভাস্কর মা ভবতারিণীর   মূর্তি  তৈরি করতে গিয়ে মোট তিনটি (আকারে ছোট বড়)  মূর্তি নির্মাণ  করেছিলেন। একটা দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আছে অন্যটি উত্তর কলকাতার হাতি বাগানের  শিবচরণ  গুহের বসত ভিটের  মন্দিরে "মা নিস্তারিণী" নামে   ১২৫৭ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অপর মূর্তিটি  বরানগরের  দে প্রামাণিকদের বাড়িতে ১২৫৯ বঙ্গাব্দে  "মা ব্রহ্মময়ী" নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ-ছয়  বছর ধরে তরুণ  শিল্পী নবীন ভাস্কর রাণি রাসমণির নির্দেশে  দক্ষিনেশ্বরের মা কালীর মূর্তি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনটি অনন্য মূর্তি সৃষ্টি করেছিলেন।  বড় মূর্তিটি রাণি রাসমণির মনোমত হওয়ায় দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরে   ১২৬২ বঙ্গাব্দে ( ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে)  ১৮ জ্যৈষ্ঠ "মা ভবতারিণী"নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবীন ভাস্করের নিজস্ব শিল্প কর্মের  দলিল থেকে জানা যায় দক্ষিনেশ্বরের মূর্তির নামকরণ  নবীন নিজেই করেছিলেন।যদিও  দক্ষিনেশ্বরের মূর্তির নাম নিয়ে ভিন্নমত পাওয়া যায়।শোনা যায় ঠাকুর রামকৃষ্ণ  দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিণীকে তাঁর "মা" বলতেন আর বরানগরের ব্রহ্মময়ী দেবীকে তাঁর "মাসিমা" বলে সম্বোধন করতেন।  ভাস্কর পরিবারের সদস্যদের দাবি  রানি রাসমণি নাকি দ্বিতীয়  মূর্তিটি  তাঁর নিকটজনকে  দান করেছিলেন। নবীন ভাস্করের ভাস্কর্যে সে সময় বাংলা তথা অখণ্ড ভারতের বিভিন্ন  অঞ্চলের  রাজারাও আকৃষ্ট হয়ে দাঁইহাট এসেছিলেন । জানা যায় নবীন ভাস্কর কাঁচামাল  বিহার থেকে নিয়ে আসতো । কষ্টি পাথর সংগ্রহের জন্য বিহারের জামালপুরে কাছে পারশ নগরের একটা আস্ত পাহাড় কিনেছিলেন নবীন ভাস্কর। নবীনের সুখ্যাতির জন্য বর্ধমান রাজবংশ ছাড়াও কাশিমবাজার, নাটোর,  পুঁটিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, জেমো, মুক্তগাছা, ময়মনসিং, মণিপুর, লালগড়, রাজপরিবারের কাছ থেকে তিনি গৃহদেবতা  নির্মানের বরাত পেয়েছিলেন। অজস্র নান্দনিক শিল্পকর্মের সৃষ্টি করে ভারতের মধ্যে অন্যতম ভাস্কর শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। কথিত আছে দিনাজপুরের মহারানী নবীনের শিল্পনৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে 'সোনার বাটালি' উপহার দিয়েছিলেন। দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের মূর্তির রূপকার হয়ে নবীন ভাস্কর্য শিল্পকে এক উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন।নবীনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি  ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মূর্তি।দেবী যোগাদ্যার মূর্তি নির্মাণের সময় যুবক নবীন দীর্ঘ কয়েকমাস হবিষ্যান্ন খাওয়া ছাড়াও শুদ্ধ ছালের  কাপড় পরতেন। নবীন রাজপরিবারের প্রতিনিধিদের রাত বাসের  জন্য অতিথিনিবাস তৈরি করেছিলেন। বাড়ির  একপাশে নাচমহল ছিল।  বাংলার বিভিন্ন রাজপরিবারের মন্দিরের গর্ভগৃহে বা মন্দিরে   নবীনের শিল্পকর্ম শোভা পাচ্ছে। নবীনের অনন্য সৃষ্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বীরভূম জেলার সিউড়ির  কালীবাড়ির 'মা ভবতারিণী, 'বক্রেশ্বরের কালী মূর্তি, বাজিতপুর গ্রামের 'মা ভবতারিণী' মূর্তি,  শেওড়াফুলির দেবী  নিস্তারিণীর মূর্তি, উদ্ধারণপুরের কাথাগ্নি রুদ্র মূর্তি,বাঁশবেড়িয়ার বাসুদেব মন্দিরের "বিষ্ণুমূর্তি' ও কাটোয়ার হর-গৌরির মূর্তি।   এখনও নবীনের ঘরে কয়েকটা ভাঙা মূর্তি  দেখা গেল । যেগুলো চরম অবহেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে। তবে অনন্য সুন্দর একটি ১০ ইঞ্চির কষ্টি পাথরের মাকালীর মূর্তি নবীন ভাস্করের উত্তরসূরী নিমাই ভাস্কর বুকে আগলে রেখেছে। কালী মূর্তির সঙ্গে শ্বেত পাথরের নজর কাড়া  মূর্তিটিকে বাক্সে রেখে দিয়েছেন । এটাই নবীনের শেষ সৃষ্টি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। বর্তমানে নবীনের শিল্প কর্মের ঘর ভেঙে আগাছায় ভর্তি হয়ে গিয়েছে, নাচমহল ভেঙে পড়েছে। আছে বসতবাড়ির একটা ঘর তাও আবার শরিকি দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে আছে নবীনের ঘর। এত বড় ভাস্করকে এই প্রজন্ম মনে রাখে নি।  দক্ষিণেশ্বরের  মা ভবতারিণীর মূর্তির স্রষ্টা নবীন ভাস্করের বাড়ি কালের  গ্রাসে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। ভাস্কর্যে যাদের জুড়ি মেলা ভার ছিল সেই বংশের আর কেউ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে  নেই। স্রষ্টা নেই তাঁর পড়ে থাকা সৃষ্টিগুলোও নষ্ট হচ্ছে সম্পূর্ণ অযত্নে ।দেখবার কেউ না থাকায় নবীন ভাস্করের সৃষ্টি এখন দাঁইহাটের বাগটিকরায় ভাস্কর পরিবারের ঘরের আবর্জনার মধ্যে স্থান পেয়েছে। প্রায় সাড়ে তিনশ  বছর আগে বর্ধমান দেওয়ান পরিবারের (রাজপরিবার)  পৃষ্ঠপোষকতায়  দাঁইহাটের সূত্রধর পরিবারের কর্তা কৃপারাম  ভাস্কর শিল্পের চর্চা শুরু করেছিলেন।অনেকে গবেষক দাবি তোলেন  বর্ধমানের রাজারা কৃপারাম সূত্রধরদের  নিজেদের কাজের জন্য পাঞ্জাব থেকে এই রাজ্যে এনেছিলেন। এই মতের কোন প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়না। পরবর্তী সময়ে  পরিবারের সকল সদস্যই এই অনন্য সৃজন শিল্পে   নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছিলেন। সভারাম ভাস্কর, খেলারাম ভাস্কর,গোলকরাম ভাস্কর, কেনারাম ভাস্কর, রামধন ভাস্কর, সুনন্দ  ভাস্কর , পঞ্চানন ভাস্কর। ভাস্কর পরিবারদের ইতিহাস থেকে জানা যায় শুরুতে পাথরের তৈজসপত্রের ফেরি করতেন পরিবারের প্রধান কৃপারাম সূত্রধর। নিজের শিল্পকর্মের গুণে রাজার দেওয়া "ভাস্কর" উপাধি পাওয়ার পর  শিল্পকর্মের চর্চা শুরু করেন।  কেনারামের ছেলে রামধন রাজানুগ্রহের অর্থে কলকাতায় ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ  নাগাদ কলকাতার আপার চিৎপুর রোডে ওরিয়েন্টাল স্টোন ওয়ার্কস নামে একটি পাথর খোদাইয়ের দোকান  পত্তন করেছিলেন। দোকান লাগোয়া পিছন দিকের ঘরে ছিল কারখানা।রামধনের ভাস্করের  পুত্র নবীন ভাস্কর  কিশোর বেলায় চিৎপুরের দোকানে গিয়ে উৎকৃষ্ট মানের শিল্পকর্ম তৈরি শুরু করেন।   ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে দাঁইহাটের বাগটিকরা এলাকায় নবীন ভাস্করের জন্ম হয়। কুড়ি বছর বয়সেই   শিল্পী হিসেবে কলকাতায় খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল।  ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে অখণ্ড ভারতের  যশস্বী শিল্পী  নবীন ভাস্করের মৃত্যুর পর তাঁর তিন পুত্র যোগেন্দ্রনাথ, আনন্দগোপাল ও বিজয়গোপাল ভাস্কর  দাঁইহাটের বাগটিকরার ভাস্কর পরিবারের শিল্পের ধারা বজায় রেখেছিলেন।  যোগেন্দ্রনাথের পৌত্র শৈলেন্দ্র ভাস্কর পর্যন্ত দাঁইহাটের ভাস্কর শিল্পটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে এই শিল্পের ধারা  অস্তমিত হয়েছে। দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মূর্তির  স্রষ্টার বাড়ি বেহাল, অবহেলায় পড়ে আছে অনেক দামি শিল্পকর্ম।তবে দাঁইহাট পুরসভা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে  বাগটিকরায়   ভাস্কর্যের অনন্য শিল্পী নবীন ভাস্করের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করে শিল্পীকে বিশেষ  সম্মান জানিয়েছেন। 



রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন

 


রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ইতিবৃত্ত 

রামকৃষ্ণ একটি হিন্দু ধর্মীয় সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সংগঠন। এই মঠ স্বামী বিবেকানন্দ কতৃক রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের শিক্ষা ও আদর্শের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। রামকৃষ্ণ মঠের প্রধান কার্যালয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বেলুড় মঠে। এটি রামকৃষ্ণ মিশনের জমজ সংগঠন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন একসঙ্গে রামকৃষ্ণ সংঘ নামে পরিচিত। 



Shortly after the passing away of Sri Ramakrishna (1886) a few of his young disciples , under the leadership of Swami Vivekananda (1863-1902) laid the foundation of monastic  order at Baranagore , Kolkata  in 1886. This was called the " Ramkrishna Math " in the memory of their beloved master,  and later, in 1899 was moved to Belur on the west bank of the Ganges near Kolkata,  where it stands to this day. The Ramakrishna Math was registered on February  7 , 1991 vide Registration No: 348 of 1991, Howrah, West Bengal.  The Ramakrishna Mission was founded in  1897 and registered on May 4, 1909 under Act XXI of 1860 , Registration No: 1917/3 for 1909-10;  revised according to West Bengal Act XXVI of 1961.

Of the twin organizations, the Ramakrishna Math is meant for the training of monastic workers and for disseminating  ( introduce, publish ) spiritual trainings.  The Ramakrishna Mission is meant for social welfare activities.  Though they are in different channels,  the same stream of spiritual energy as directed by Swami Vivekananda flows through them. Man is to be served not because he is a fellow man, but because he is the manifestion of  Divinity. This is the outlook which imbues ( inspire, implant ) all activities of the organization,  secular or spiritual. 

Monastic training of young men who have decided to join the Ramakrishna Order and dedicate themselves to self-realization  and propagation of the universal principles of Vedanta.

Service to mankind according to the needs of the society  in conjunction with lay disciples and workers. The service activities include religious preaching,  worship,  cultural activities,  running if educational institutions  & Hostels, Publications,  Libraries,  Hospitals,  Despensarires, Mobile Medical Units, Old Age Homes, and Orphanages, Mass contract, Rural Development,  Relief & Rehabilitation. 

Though Ramakrishna Mission and The Ramakrishna Math are independent organizations but they are closely related in as much as the Trustees of the Math also serve on the Governing Body of the Mission.  Both organizations have their Headquarters at Belur Math. 

The Ramakrishna Math and The  Ramakrishna Mission possess independent accounts. Funds of both organizations comprise of donations from friends,  devotees, the general public,  and in some cases grants from local bodies and other sources.


রামকৃষ্ণ মঠ শুধুমাত্র সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীদের নিয়ে গঠিত।  এটি পুরুষদের সংগঠন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রয়ানের পর ১৮৮৬ সালে তাঁর সন্ন্যাসী শিষ্যেরা স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে এই মঠ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমে মঠ ছিল  কলকাতার উপকন্ঠে বরানগরে। সেই সময় মঠের নাম ছিল বরানগর মঠ। ১৮৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে হাওড়ার বেলুড় মঠ স্থানান্তরিত হয়। পরে বেলুড় মঠের মধ্যেই রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। বেলুড় মঠের রামকৃষ্ণ মন্দির রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের প্রানকেন্দ্র। এই মন্দিরটি হিন্দু, ইসলামী, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান  স্থাপত্যের মিশ্রনে  নির্মিত  একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন।  রামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনের বিশ্বাস অনুসারে বিশ্বধর্মের আদর্শকে তুলে ধরার জন্য একাধিক ধর্মের  স্থাপত্য ও প্রতীকতত্ত্ব থেকে মন্দিরের এই স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সংকলিত হয়েছে। রামকৃষ্ণ মিশন এই মন্দিরের বর্ননা দেন "  স্থাপত্যের ঐক্যতান" রুপে।




রামকৃষ্ণ মিশন হলো একটি ভারতীয় ধর্মীয় সংগঠন । এই সংগঠন রামকৃষ্ণ আন্দোলন বা বেদান্ত আন্দোলন নামক বিশ্বব্যাপী আধ্যাত্মিক আন্দোলনের প্রধান প্রবক্তা। এটি একটি জনকল্যান মূলক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ১৮৯৭ সালের ১লা মে  স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। মিশন স্বাস্থ্য পরিষেবা , প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রানকার্য,  গ্রামোন্নয়, আদিবাসীদের কল্যাণ,  বুনিয়াদি ও উচ্চশিক্ষা এবং সংস্কৃতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। এটি একটি সন্ন্যাসী ও গৃহস্থ শিষ্যের একটি যৌথ উদ্যোগ। 

রামকৃষ্ণ মিশন কর্মযোগের ভিত্তিতে কাজকর্ম চালায়।  ১৯০৯ সালে রামকৃষ্ণ মিশন ১৮৬০ সালের একুশ সংখ্যক আইন অনুসারে বৈধ স্বীকৃতি লাভ করে। একটি পরিচালনা পরিষদ রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালনা করে। রামকৃষ্ণ মিশন  ও তার শাখাকেন্দ্রগুলির পৃথক আইনি সত্ত্বা থাকলেও এগুলি রামকৃষ্ণ মঠের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত।  মঠের নির্বাচিত অছি  পরিষদ মিশনের পরিচালন পরিষদ হিসাবে কাজ করে। বেদান্ত সোসাইটি সংঘের আমেরিকান শাখার অঙ্গ।  এগুলি সামাজিক কল্যাণর পরিবর্তে কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে এই কাজ করে।


১৮৯৭ সালের পয়লা মে। স্বামী বিবেকানন্দ বাগবাজারের শ্রী বলরাম বসুর বাড়িতে আনুষ্ঠানিকভাবে রামকৃষ্ণ মিশন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। মিশনের যে ওই জলের মধ্যে ভেসে বেড়ানো রাজহংসের প্রতীক, তার একটি পৃথক অর্থ রয়েছে।

অনেকের কাছেই অজানা যে, মিশনের প্রতীক এঁকেছিলেন স্বামীজি স্বয়ং। কিন্তু ইচ্ছা হল প্রতীক গড়লাম। বিষয়টা এমন নয়। এর আলাদা অর্থ রয়েছে। উদীয়মান সূর্য জ্ঞানের প্রতীক,পদ্মফুল ভক্তির প্রতীক, ছবিটিকে ঘিরে থাকা সাপ যোগ ও কুন্ডলিনি শক্তি জাগরনের প্রতীক, ছবির তরঙ্গায়িত জল কর্মের প্রতীক, ছবির রাজহাঁস পরমাত্মার প্রতীক।মিশনের মূল উদ্দেশ্য ‘আত্মনো মোক্ষার্থম জগদ্ধিতায় চ’ অর্থাত্‍ মোক্ষলাভ ও জগতের কল্যাণের জন্য আত্মত্যাগ করা।

সারা বিশ্বে রামকৃষ্ণ মঠ ও  মিশনের শাখাকেন্দ্র ২৬৯ টিরও বেশি। ভারতেই আছে ২০২ টি শাখা , বাংলাদেশে ২৬টি, আমেরিকায় তে ১৪টি , ব্রাজিলের ৩টি, ২টি করে রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও কানাডাতে, আর ১টি করে নিউজিল্যান্ড,  ফিলিপাইনস,  সিঙ্গাপুর,  সুইজারল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, মরিসাস, জাম্বিয়া,  ইউ কে, অষ্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, ফিজি, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, জাপান,   নেদারল্যান্ডস,  নেপাল, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি বিভিন্ন দেশে রামকৃষ্ণ মিশনের শাখা প্রশাখা রয়েছে।




সাধনা এবং কর্ম দু'টো সম্পূর্ণ আলাদা ক্ষেত্র।  কিন্ত স্বামীজি মঠ ও মিশন প্রতিষ্ঠা করে সাধনা এবং কর্মকে একটি বিন্দুতে একীভূত করেছেন। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নীতিবাক্য হল "আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্বিতায় চ "। জগতের  হিতসাধনের মাধ্যমেই আপন 
মোক্ষলাভ। সাধারণত আমরা দেখে থাকি , আত্মঞ্জান বা মোক্ষলাভের জন্য সাধনা করতে হলে জগৎ ত্যাগ করে সাধনা করতে হয়। আর জগৎ বা সংসার ত্যাগ করলে কর্ম করার কোনো প্রশ্নই থাকে না। কর্ম না করলে কর্মফলও যুক্ত হয় না।  প্রথম ক্ষেত্রে কর্ম বলতে বোঝায় কেবল সাধনা, বাহ্যিক কোনো কর্ম নেই।  আত্মঞ্জান অর্থাৎ আমার মধ্যে ভগবানকে উপলব্ধি করা, এখানে আমি আর আমার ইষ্ট সমার্থক। আমি তখন সর্বভূতে নিজেকেই দর্শন করছি অর্থাৎ সর্বভূতে ঈশ্বরকেই দর্শন করছি। 

অন্যদিকে মিশন অর্থাৎ জগতের হিত, সেখানে কিন্ত জগতের কাজটাই মুখ্য।জগতের কাজ অর্থাৎ জগতের সেবা, সেটাই সাধনা। সেটা কখন সাধনা হবে? যখন সেটা সেবা হবে, পূজা হবে। আমি যখন জগতের দাস হয়ে সেবা করতে পারব, যখন সর্বভূতে আমি আমার ইষ্ট  ও ভগবানকে দেখব। অর্থাৎ আমার সামনে দাড়ানো প্রতিটি নর যখন নারায়ণ হয়ে ধরা দেবে। দু'টোই ভগবান লাভের উপায়। কিন্ত দু'টোর ভাব আলাদা। একটিতে শুধু আমার উদ্দেশ্য সাধন, আমার মোক্ষপ্রাপ্তি।  অপরটিতে সকলের হিত,  সকলের সেবার মাধ্যমে আমার মোক্ষপ্রাপ্তি।  





কোনোও কর্ম তখনই মহান হয়, যখন সেই কর্মের পিছনে উদ্দেশ্য বা ভাব মহৎ থাকে। দ্বিতীয় পথে ঠিক সেটাই হয়েছে। ওই মহৎ ভাবই কাজ করেছে প্রেরণা হিসেবে।এই মহৎ ভাব, এই প্রেরণা এক হৃদয় থেকে আর এক হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়েছিল সেই দিন..... যে দিন গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর শিষ্য নরনের কেবলমাত্র আত্মমোক্ষ লাভের ইচ্ছাকে  ধিক্কার জানিয়েছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল এই রকম যা কিনা একটা ইতিহাসও বলা যেতে পারে.........নির্বিকল্প সমাধিলাভের জন্য জন্য ব্যগ্র  নরেন্দ্রনাথ গুরু রামকৃষ্ণকে বলেছিলেন  , তাঁর একান্ত ইচ্ছা ক্রমাগত পাঁচ-ছয় দিন সমাধিতে ডুবে থাকা , কেবল শরীর রক্ষার জন্য খানিকটা নীচে নেমে আবার সমাধিলোকে প্রবেশ করা। অন্য গুরু হলে হয়ত খুশি হতেন।  কিন্ত রামকৃষ্ণ ছিলেন অনন্য। তিনি সহজেই  নরেনকে বললেন...... ছি ছি তুই এত বড় আধার, তোর মুখে এই কথা !! আমি ভাবছিলাম কোথায় তুই একটা বিশাল বটগাছের মত হবি,তোর ছায়ায় হাজার হাজার লোক আশ্রয় পাবে, তা না হয়ে তুই  কি না নিজের মুক্তি চাস। এ অতি তুচ্ছ হীন কথা। ....... অর্থাৎ দু:খের যাতনার বোঝা নরেনের উপর ন্যাস্ত করতে চান। কিন্ত সেটি আমরন বওয়ার শক্তিসম্পন্ন হৃদয় তখনও নরেনের তৈরি হয়নি।  ঠাকুর চাইতেন সেটি তৈরি হোক। হয়ত সেইজন্যই পিতার মৃত্যুর পর নরেন যখন নিষ্ঠুর দারিদ্রের মধ্যে পড়েছিল, তখন ঠাকুর ভারী খুশি হয়েছিলেন।  কারন সান্নিধ্যে বিলাসে  লালিত নরেন্দ্র বড়জোর উকিল বা ভালো বক্তা হতে পারত। কিন্ত এবার সে হবে গরীবের বন্ধু, সে বুঝবে পেটের জ্বালা  কাকে বলে। তাই ভালো না লাগলেও আত্মোৎসর্গের যে পথ ঠাকুর স্থির  করেছিলেন,  সেই পথেই  চলতে হয়েছে বরাবর। সেবার মাধ্যমেই  মোক্ষপ্রাপ্তি। তাই সহজ কথায় বলা যায় ------ রামকৃষ্ণ মঠ হ'ল একটি সাধন ক্ষেত্র আর রামকৃষ্ণ মিশন হ'ল একটি কর্মপ্রধান প্রতিষ্ঠান।  

একথা বলা যেতে পারে যে ভবিষ্যতের মঠ ও মিশন,  আর তাদের কর্মধারা ইট, কাঠ, পাথরে পরে  তৈরি হলেও, তা তৈরি হয়েছিল স্বামীজির প্রানে  আতি সংগোপনে।  কাশীপুর ঠাকুরের মহাসমাধির আগে আগে ,  ঠাকুরের ত্যাগী তরুণ শিষ্যেরা মিলিত হয়েছিলেন গুরুর পদপ্রান্তে এবং সেই মেলবন্ধন গুরুর দেহত্যাগের পরেও বজায় ছিল।  তাঁদের সকলকে একসাথে ধরে রেখেছিল একটি মহৎ ভাব আর পারস্পরিক ভালবাসা। এর থেকেই মঠের সূত্রপাত।  প্রথমে বরানগরে এবং তারপরে আলমবাজারে। তাই আমরা বরানগর মঠকে পরবর্তীকালের  "রামকৃষ্ণ মঠের সূচনা " বলতে পারি। এবার এই কাশীপুর স্বামীজি যখন নিজের হৃদয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কন্ঠে ভাবাবস্থায় মানবতার মহত্তম বানী -----" জীবের দয়া নয়, শিব ঞ্জানে জীব সেবা "------ উচ্চারিত হতে শুনেছিলেন, তখনই মঠের ভিতর মিশন  জন্ম নিয়েছিল। 

বিবেকানন্দের সাধনা ছিল নিজ আত্মমুক্তির জন্য নয়, সমষ্ঠির জন্য।  বিবেকানন্দ পারেননি জগৎকে বাদ দিতে বা পারেননি জগতের সমস্যাকে বাদ দিতে। আবার অস্বীকার করতে পারেননি মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসাকে। স্বামীজির হৃদয়ে ঈশ্বর প্রেমের সঙ্গে মানবপ্রেমের একাত্মতা সেদিন অনুভব করতে পারেননি অনেকেই। 

প্রকৃতপক্ষে স্বামীজির সমস্ত উৎকন্ঠা এবং ব্যাকুলতার মূলে ছিল একটা তাগিদ  -----  শ্রীরামকৃষ্ণ ধরাধামে আবির্ভূত হয়ে লোক কল্যাণের জন্য নিজের জীবন দিয়ে গিয়েছেন,  অতএব নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে তাঁর ওই মহাজীবনের বার্তা বহন করে নিয়ে যেতে হবে। মঠের স্থাপন সেইজন্যই। ভারতে ফেরার পর তিনি তাঁর পরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার জন্য বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে ১৮৯৭ সালের ১লা মে বিকেল তিনটে সময় শ্রীরামকৃষ্ণের সন্ন্যাসী, গৃহীভক্ত এবং অন্যান্য শিষ্যদর
 সম্মেলন ডাকলেন। সেখানে তাঁর পরিকল্পনা সকলকে সবিস্তারে জানালেন_______ আমরা যাঁর নামে সন্ন্যাসী হয়েছি, আপনারা যাঁকে আদর্শ করে সংসার আশ্রমে রয়েছেন,  যাঁর দেহবাসানের ২০ বছরের মধ্যে প্রাচ্য  ও পাশ্চাত্য জগতে তাঁর পূণ্যনাম ও অদ্ভুত জীবনের আশ্চর্য প্রসার হয়েছে, এই সংঘ তারই নামে প্রতিষ্ঠিত হবে। আলোচনায় সংঘের নাম ঠিক হয়েছিল  " রামকৃষ্ণ প্রচার বা রামকৃষ্ণ মিশন "। 

'রামকৃষ্ণ মিশন ' সন্ন্যাসী ও গৃহীদের মিলিত প্রতিষ্ঠান। কিন্ত রামকৃষ্ণ মঠ সন্ন্যাসীদের নিজস্ব সংঘ। স্বামীজী যখন ভারতে ফিরে এলেন, মঠ তখন বরানগর থেকে উঠে এসেছে আলমবাজারে। ১৮৯৮, ফেব্রুয়ারিতে আলমবাজার থেকে মঠ স্থানান্তরিত  করা হল বেলুড়ে নীলাম্বর  মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়িতে। স্বামীজী বললেন ....... শ্রীভগবান রামকৃষ্ণ প্রণালী অবলম্বন করিয়া নিজের মুক্তিসাধন করা ও জগতের সর্বপ্রকার কল্যাণ সাধনে শিক্ষিত হওয়ার প্রয়োজনে এই মঠ প্রতিষ্ঠিত হইল।

স্বামীজির স্বপ্ন আস্তে আস্তে রূপ পেতে লাগলো। মঠের জমির জন্য দুটি জায়গার চেষ্টা করে অবশেষে বেলুড় গ্রামে একটি জমি পাওয়া গেল। যিনি এই জমির মালিক ছিলেন,  তাঁর নাম বাবু ভগবান নারায়ণ সিংহ। নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগান বাড়ির কাছেই এই জমি। মাপে প্রায় ২২ বিঘা। অবশেষে ১৮৮৯ সালের ৯ই ডিসেম্বর,  স্বামীজি নতুন কেনা জমিতে ঠাকুরকে প্রতিষ্ঠা করলেন। মঠভূমিতে শ্রীরামকৃষ্ণকে প্রতিষ্ঠা করে স্বামীজি নতুন তীর্থের স্থাপন করে তীর্থ মাহাত্ম্য সম্পর্কে এক অপূর্ব বর্ননা দিয়েছিলেন।

সাদরে সমাগত সকলকে আহ্বান ও সম্বোধন করে বললেন  ........ আপনারা আজ কায়মনোবাক্যে  ঠাকুরের পাদপদ্মে প্রার্থনা করুন যেন মহাযুগাবতার ঠাকুর আজ থেকে বহুকাল  " বহুজাতিক বহুজনসুখায়" এই  পুন্যক্ষেত্রে অবস্থান করে একে সর্বধর্মের অপূর্ব  সমন্বয়-কেন্দ্র করে রাখেন।

I D E A L  ::

Atmano mokshartham jagad hitaya cha

( For one's own salvation ( rescue /escape / relief) and for the welfare of the world )

A I M   :×:

Practice and preaching of SANATAN DHARMA , the eternal religion, as embodied ( মূর্ত ) in the lives  and teaching of  Sri Ramakrishna,  Sri Sarada  Devi and Swami Vivekananda. 

M O T T O  $:$

Renunciation  ( self-denial / ত্যাগ ) and services; harmony of  religion. 

M E T H O D   #*#  

Work is worship. 

Wednesday, 16 March 2022

শ্রীরামকৃষ্ণের আদি নিবাস ও জন্মভিটে

 

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আদি নিবাস ও জন্মভিটে  :$:



দেড়েপুর যা লোকমুখে দেড়ে গ্রাম বলেই পরিচিত। কামারপুকুর গ্রামের থেকে দেড় ক্রোশ পশ্চিমে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের  আদিপুরুষ মানিকরাম চট্টোপাধ্যায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই গ্রামেই ছিল শ্রীরামকৃষ্ণের আদি নিবাস।  যদিও বৌদ্ধ প্রভাবসম্পন্ন ধর্মীয় বাতাবরন এই  অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য ছিল,  তবু চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আরাধ্য দেবতা ছিলেন রঘুবীর অর্থাৎ যুবক রাম। এই চট্টোপাধ্যায় পরিবারের আধ্যাত্মনিষ্ঠা ও শাস্ত্রঞ্জান সকলের কাছে তাঁদের সন্মানীয় করে তুলেছিল। এর মধ্যে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের সত্যনিষ্ঠা ও চরিত্রবল বিশেষভাবে গ্রামবাসীদের টানতো।দেড়ে গ্রামটিও তিনটি গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত ছিল... এগুলি  হল নারায়ণপুর, সাতবেড়ে আর দেড়ে। সাতবেড়ের জমিদার রামচন্দ্র রায় প্রজাপীড়ক ছিলেন।  তিনি ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়কে প্রজার জমি অন্যায়ভাবে গ্রহনের জন্য মিথ্যাসাক্ষী দেওয়াতে চাইলেন। কিন্ত সত্য যার জীবনে ধ্রুবতারা,  তিনি কিভাবে এই সাক্ষী দিতে পারেন। সভাবত: এই মিথ্যাসাক্ষী দিতে অস্বীকার করার ফলে ওই জমিদার চক্রান্ত করে তাঁকে অন্য একটি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে নি:স্ব করে দেড়েপুর গ্রামের ভিটামাটি থেকে উচ্ছেদ করেন। ক্ষুদিরামের বন্ধু সুখলাল গোস্বামী ছিলেন তখন কামারপুকুরের জমিদার। সুখলালের আমন্ত্রণে বাস্তুহারা নিরুপায় ক্ষুদিরাম সপরিবারে কামারপুকুরে এলেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলেন।  সপরিবার তার নিজের বাড়ির উত্তরে ক্ষুদিরামকে বসবাস করার জন্য জমি দান করেন  এবং লক্ষ্মীজলা নামক স্থানে কিছু ধোনি জমিও দিয়েছিলেন।  কামারপুকুরের এই বাসভূমিতেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব জন্ম গ্রহণ করেন। সেই পূন্যভূমি আজ "শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ" নামে সারা বিশ্বে পরিচিত। 







গ্রামবাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণের গৃহে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ।  গ্রামের নাম কামারপুকুর।  সেকালে কামারপুকুর বর্ধমান মহারা দিনজের গুরুবংশীয়দের লাখোরাজ জমিদারিভুক্ত ছিল। এঁরা ছিলেন গোস্বামী বংশ। শ্রীরামকৃষ্ণের  সমকালে কামারপুকুরে সুখলাল গোস্বামী জমিদার রুপে মান্যতা পেতেন। এই গোস্বামীদের কাছ থেকে লাহাবাবুরা গ্রামের অধিকাংশ জমি কিনে নিয়ে জমিদারি পত্তন করেন।  কামারপুকুর অঞ্চলের অধিবাসীরা অন্য গ্রামাঞ্চলের মতোই কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল ছিল।  আর ছিল চারদিকে বড় বড় দীঘি। সুখসায়র,  হাতিসায়র প্রভৃতি এদের নাম ছিল।  এর সঙ্গে ছিল হালদার পুকুর, কিছু দূরে বুধুই মোড়ল, ভূতের খাল শ্মশান। তারই পাশে ছিল  মাণিকরাজার আম্রকানন।  এই বুধুই মোড়ল শ্মশানের নির্জনতায় মগ্ন হতেন শ্রীরামকৃষ্ণ।  মানিকরাজার আম্রকানন ছিল  তাঁর ও  সখাদের খেলার জায়গা। সেখানে তিনি যাত্রাপালার রির্হাসাল দিতেন। তিনি ঠিকই করেছিলেন একটা যাত্রাদল তৈরি করবেন।




সেই বিপদের দিনে সুখলাল গোস্বামী নিজ বস্তুর একাংশের কয়েকটি চালাঘর চিরকালের জন্য ক্ষুদিরামকে দান করেছিলেন।  সেখানেই নতুন সংসার শুরু করলেন  ক্ষুদিরাম।  ঢুকেই বৈঠকখানা ঘর, তারই একপাশে ঢেঁকিশাল, সেখানে সন্তানসম্ভবা  মেয়েদের প্রসবস্থল। এই ঢেঁকিশালেই জন্ম গ্রহন করেছিলেন গদাধর চট্টোপাধ্যায়। 



বৈঠকখানার পাশে একটা ঘর। তার পাশে আরেকটি। বড় ঘরটি শোবার ঘর। তারই সামনে গৃহদেবতা রঘুবীরের 


 মন্দির।  এক রঘুবীরকে ছেড়ে এসে অলৌকিক সপ্নাদেশে ধানক্ষেতের  মধ্যে আর এক রঘুবীরকে লাভ করেছিলেন ক্ষুদিরাম। এছাড়াও মা শীতলার প্রতিষ্ঠিত ঘট নিত্য পূজো হত। বাড়ির সামনেই ছিল এক ছোট উঠান। সেই উঠানে ক্ষুদিরাম পত্নী চন্দ্রমণি দেবী স্বয়ং লালমুখো হাঁসে চড়া ঠাকুর ব্রহ্মাকে দেখেছিলেন।  তপ্ত রোদে দেবতার মুখমন্ডল  রক্তবর্ন হয়েছে ভেবে অতি সরল নারী আপ্যায়ন করেছিলেন  " ও হাঁসে চড়া ঠাকুর,  ঘরে দু খানি পান্তাভাত রয়েছে, খেয়ে যাও।" গৃহের পিছনেই ছিল যুগীদের শিবমন্দির।  শোনা যায় এক কোজাগরী 


লক্ষ্মীপূজোর দিন স্বয়ং দেবী লক্ষ্মী এই পথ দিয়েই  লাহাবাবুদের ধানের গোলা দিকে অগ্রসর হয়েছিলেন।  যাওয়ার আগে চন্দ্রমণিকে জানিয়েছিলেন পাশের গ্রামে লক্ষ্মীপূজো সম্পন্ন করে বড়ছেলে রামকুমার চট্টোপাধ্যায় গৃহমুখী হয়েছেন। কিছুক্ষনের মধ্যেই ঘরে ফিরে আসবেন।এই কন্যাকে একাকী দেখে অবাক হয়েছিলেন চন্দ্রা। কানে ও কি গহনা, বড় অদ্ভুত তো? মেয়েটি উত্তর দিয়েছিলেন  " এ হল কুন্ডল"। সেই রাতটা আতিথ্যের প্রস্তাব দিয়েছিলেন চন্দ্রা। মেয়েটি হেসে বলেছিলেন  " এখন বড় তাড়া" । আর সঙ্গে সঙ্গেই লাহাবাবুদের ধানের গোলা দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন।



 

এই গৃহের উত্তর পূর্ব কোনে মধুযুগীদের শিবমন্দির।  মধুযুগী ক্ষুদিরামের প্রতিবেশী তথা বন্ধুসম। মধুযুগীর পিতা রামানন্দ  যুগী তীর্থ ভ্রমন করে এসে এই শান্তিনাথ শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।  এই মন্দিরটিই যুগীদের শিবমন্দির নামে খ্যাত।  চন্দ্রমণি দেবী একদিন এই শিবমন্দিরের সামনে দাড়িয়ে ধাত্রীমাতা ধনিকামরানীর সাথে কথা বলছিলেন।  হঠাৎই তখন তাঁর এক অলৌকিক জ্যোতি দর্শন ঘটে। ভয়ে বিস্ময়ে তিনি অঞ্জান হয়ে পড়েন। এবং পড়ে অনুভব করলেন যে তার গর্ভসঞ্চার হয়েছে। তারপরই পরম পুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবের  জন্ম হয়। 




কামারপুকুরের এই গৃহ এক ইতিহাস , ঊনবিংশ শতাব্দীতে গড়ে ওঠা এক নতুন তীর্থ। 

( আশ্রমে দু এক রাত কাটাতে হলে আগে থেকে ফোনে বুক করুন এই নাম্বারে ....

Khudiram Ramkrishna Sevasram, Dwariapur ( Deregram), Hooghly.

Incharge's Name: Mahadev Roy. 

Contact number: 9933069036

Distance from::

Kamarpukur -- 4 km

Joyrambati -- 6 km.)


কামারপুকুরের শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নিবাস ও শিবমন্দিরের কিছু পুরানো ফটো :::