Friday, 19 July 2024

পুতুন্ডা শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম

 

সম্ভবত: সময়টা ছিল ১৯০১ সালের শেষ বা ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাস। ফরেস্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন শ্রীহরিপদ মিত্র।  তিনি তখন থাকতেন মহারাষ্ট্রের বেলগাও শহরে। কিন্ত তাঁর পৈতৃক বাড়ী ছিল শক্তিগড় ষ্টেশন থেকে ৩-৪ কিমি দূরে ভৈটা গ্রামে। এর পাশের গ্রামটিই হল পুতূন্ডা গ্রাম। মিত্র মহাশয় বেলগাওতে থাকাকালীন পরিব্রাজক  স্বামী বিবেকানন্দ বেশ কয়েকদিন তাঁর বাড়িতে কাটিয়েছিলেন।  এবং এই সময় থেকে হরিপদবাবুর সাথে স্বামীজির ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। হরিপদ মিত্র এবং তার স্ত্রী ইন্দুমতী মিত্র ছিলেন স্বামীজির প্রথম গৃহী ভক্ত। বেলগাওতেই স্বামীজি এই দম্পতিকে দীক্ষা দেন।  পরবর্তীকালে এই পরিব্রাজক যখন বিশ্ববরেণ্য হয়ে দেশে ফিরে আসেন তখনও হরিপদবাবু বেলুড়ে গিয়ে কয়েকবার তার সাথে দেখা করে আসেন এবং তার পৈতৃক ভিটা ভৈটা গ্রামে আসার আমন্ত্রণ জানান। এসব কথা মিত্র মহাশয়ের স্মৃতিকথা এবং স্বামীজির অন্য এক গৃহী ভক্ত শ্রী নরেন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের স্মৃতিকথা থেকে যানা যায়। কিন্ত বেলগাও-এর পর  স্বামীজি অনেকবার সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও নানা ঘটনাক্রমে তাদের সাক্ষাৎকার হয়ে উঠেনি। তাই একবার মিত্র মহাশয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষায় স্বামীজি এখানে এসেছিলেন ।  কিন্ত তখন ভৈটা গ্রামের নিকটবর্তী ষ্টেশন ছিল শক্তিগড়। যদিও এখনকার নিকটবর্তী ষ্টেশন হল পালশিট। তাই  তখন রেল ষ্টেশন থেকে প্রথমে পুতুন্ডা গ্ৰাম হয়ে ভৈটা গ্ৰামে এসেছিলেন।  পুতুন্ডায় সেই সময় সম্ভ্রান্ত চৌধুরীদের বাস ছিল। চৌধুরীর ঠাকুরদালানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন স্বামীজি। ঐ পরিবারের ছোটরা  তখন উঠানে খেলাধূলা করছিলেন।  বৈঠকখানার সিড়ির কাছে এসে তাদের কাছে ভৈটা গ্রামে যাওয়ার রাস্তার খোজ করেন।ছোটোরা অচেনা মানুষ দেখে বাড়ি থেকে বড়দের ডেকে আনেন । তৎকালীন চৌধুরী পরিবারের কর্তা স্বামীজির পরিচয় জানতে পেরে চৌধুরী বাড়িতেই বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন এবং পরে পাল্কিতে ভৈটা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। এই চৌধুরী বাড়িটিই বর্তমানে পুতুন্ডা রামকৃষ্ণ মিশনে পরিনত হয়েছে। ভৈটা থাকাকালীন স্বামীজি মাঝে মাঝে প্রাতভ্রমনে বেড়িয়ে এই চৌধুরী বাড়ীতে চলে আসতেন এবং কিছুটা সময় থেকে ফিরে যেতেন । ভৈটাই স্বামীজির স্মৃতি বিজরিত হরিপদবাবুর বাড়িটির নাম মিত্র মহাশয় গুরুর স্মৃতিতে রেখেছিলেন  " বিবেক কুটির  " । এই  গ্রামেই রয়েছে শ্যামাদাস আচার্য প্রতিষ্ঠিত  মদনমোহন জীউ এর এতদ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মন্দির। শোনাযায় এই সময় স্বামীজি মদনগোপাল মন্দির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন  এবং মন্দিরে বসেই একদিন বিভোর হয়ে গানও গেয়েছিলেন। এই গ্রামের প্রান্তে একটি অশ্বথ্থ  গাছে নাকি তিনি রোপন করেছিলেন বলে শোনা যায়। এছাড়াও গ্রামের এক পুকুরের সাথে এই মহামানবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ভৈটাতে কয়েকদিন অবস্থানের পর স্বামীজি একই পথে শক্তিগড় ষ্টেশন থেকে রেলে করে বেলুড় মঠের ফিরে যান।




পুতুন্ডা শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে। এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি তীর্থস্থান।  শ্রীরামকৃষ্ণের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া মুখ্য উদ্দেশ্য হলেও, গ্ৰামের ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অভাবী দ্রারিদ্র লোকেদের কল্যাণ সাধন করা ইনাদের উদ্দেশ্য।  কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে............. 




সারদা কোচিং সেন্টার  --  এই কোচিং সেন্টারটি পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে কোচিং প্রদান করে। রয়েছে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য কোচিংও। 

সারদা বিদ্যামন্দির ---  স্থানীয় বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি কিন্ডারগার্ডেন স্কুল।  রয়েছে সারদা আর্ট  স্কুল।  আর আছে বিবেকানন্দ কম্পিউটার সেন্টার ও ক্যারাটে সেন্টার। 



চিকিৎসা ক্ষেত্রে রয়েছে ...... বিবেকানন্দ চ্যারিটেবল ক্লিনিক।  এখানে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ বিতরন, বিনামূল্যে করা হয়। গ্রামের মহিলাদের জন্য স্ত্রীরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র ও  ইসিজি করা হয় সম্পূর্ন বিনামূল্য। 

বছরে দুবার  চক্ষু শিবির হয় যেখানে চক্ষু চিকিৎসা ও মাইক্রো আপারেশন করা হয়  এবং পরে রোগীদের দরকার অনুযায়ী গগল্স্  ও চশমা দেওয়ার হয় বিনামূল্যে।  আবার এসব সেবা ক্লিনিকে রয়েছে  সব ধরনের প্যাথলজিকাল টেস্টের ব্যবস্থা, এক্স রে ও ইসিজি- র ব্যবস্থা। 

গদাধর অভ্যুদয় প্রকল্প........  স্বামী বিবেকানন্দের ১৫০ তম জন্মবার্ষিকিতে বেলুড়মঠের আর্থিক সহায়তায় এই প্রকল্পের সূচনা হয়।  স্বামীজির আদর্শে শিব ঞ্জানে জীব সেবার যে আদর্শ পাথেয় করে পুতুন্ডা শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের উদ্যোগে এবং বেলুড় মঠের সহযোগিতায় বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে স্থানীয় তিনটি গ্রামের পিছিয়ে  পড়া ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সামগ্রিক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে এই  প্রকল্পের মাধ্যমে। বর্তমানে ৮২ জন ছোট  বাচ্চাকে মানুষ করা চলছে। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক উন্নতির চেষ্টার পাশাপাশি তাদের পুষ্টিকর খাদ্যও দেওয়া হয়। এছাড়া যোগ ব্যায়াম , ব্রতচারী,  লাঠি নাচ  অঙ্কন, নৃত্য,  গান বাজনা, নাটক ইত্যাদি শেখানো হয়। বর্তমানে বেলুড় মঠ এই প্রকল্পের আর্থিক ব্যায়ভার বহন করতে আর সমর্থ নয়। তাই এখন এই প্রকল্পের অর্থের যোগান জনসাধারণের দানের উপর সম্পূর্ন   নির্ভরশীল হয়ে পরেছে।



আশ্রমের  সারদা মিল্ক ফিল্ডিং সেন্টার ডায়েরি থেকে দরিদ্র শিশু ও মায়েদের বিনামূল্য দুধ দেওয়া হয়ে থাকে।  

ছাড়া আশ্রমে নিত্য পূজা, স্বামীজির জন্মদিন পালন,    বাৎসরিক উৎসব, সরস্বতী পুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পূজো ও বস্ত্র বিতরণ হয়ে থাকে। 




এখন সেই বিবেক কুটির  জীর্ণ  দশায় পরিণত হয়েছে।  শুধু স্বামীজি যে আরামকেদারা ব্যবহার করতেন সেটি সংরক্ষিত হয়েছে পুতুন্ডা রামকৃষ্ণ মিশনে কিন্ত তাঁর ব্যবহৃত খাটটি  অবহেলায় রয়ে রয়েছে ঐ ভগ্নপ্রায়  বাড়িতেই। এলাকার বাসিন্দাদের ইচ্ছা এই বাড়ি সংস্কার করুক রাজ্য সরকার এবং এই ঘরেই সংরক্ষণ করা হউক স্বামীজির ব্যবহৃত খাট। আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে যে কোনও রামকৃষ্ণ মিশন সংরক্ষণ করুক এই খাট....... বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। কেননা মিত্ররা ছিলেন  নিঃসন্তান। তাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তাদের এক জ্ঞাতি পুত্র নির্মল চন্দ্র সরকার।  তার পুত্র দেব রঞ্জন সরকার বর্তমানে জীবিত। কিন্ত তারা ভৈটা গ্রামে বসবাস করেন না। তাই এখন বিবেক কুটিরের দেখভাল করেন স্থানীয় ঘোষ বংশীয়রা। সঠিক পরিচর্যার অভাবে আজ বিবেক কুটিরের বেহাল দশা। বাড়িটির পরিচর্যার ব্যাপারে ঘোষ পরিবারের লোকজন খুবই উদাসীন এবং তীর্থে পরিনত হওয়া এই  বাড়িকে জনসাধারণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিপ্রায়ও তাদের মধ্যে  দেখা যায়। কেননা বাড়ির ব্যাপারে জানতে চাওয়া মানুষের প্রতি  তাদের ব্যবহার  সেই কথাই প্রমান হয়। হরিপদ মিত্র ফরেস্ট অফিসার ছিলেন।  তাই তিনি অনেক বিচিত্র আবার অনেক সাধারণের  অপরিচিত গাছ দিয়ে নিজের বাড়ির বাগান সাজিয়েছিলেন।  কিন্ত আজ সেসব কিছু জঙ্গলে পরিনত হয়েছে। আজ বিবেক কুটির সত্যিই অবহেলিত তবুও তা বিবেকতীর্থে পরিনত হয়েছে।