বাঁকুড়া জেলার দামোদর নদীর তীরে অবস্থিত শান্ত, শান্তিপূর্ণ ও মার্জিত এক গ্রাম , নাম তার সোমসার। গ্রামের দেবতা সোমেশ্বর শিব। তাঁরই নাম অনুসারে গ্রামের নাম সোমসার। স্বামী ভূতেশানন্দজী মহারাজ এই সোমসার গ্রামেই ৮ই সেপ্টেম্বর ১৯০১ সালে (২৩শে ভাদ্র ১৩০৮) রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় জন্ম গ্রহণ করেন। সেদিন ছিল কৃষ্ণা একাদশী তিথি। জ্যোতিষীরা এই শিশুর নিয়তি নির্ধারণে বললেন ......... ইনি একজন মহান আধ্যাত্মিক নেতা হবেন। পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষা, বিশাল হৃদয় এবং মহান আধ্যাত্মিক সম্পদের মাধ্যমেই লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় ও আত্মাকে জয় করে জ্যোতিষীর ভবিষ্যত বাণী সঠিক প্রমানিত করে ছিলেন।
ঐ দূরে রামকৃষ্ণ মিশন, সোমসার
আশ্রম মন্দিরের সামনের দিক
ভূতেশানন্দজী মহারাজের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের সঙগ্রহশালা
ভূতেশানন্দ মহারাজের পূর্ব নাম ছিল বিজয় চন্দ্র রায়। তাঁর পিতা ছিলেন পূর্ণ চন্দ্র রায় ও মাতা ছিলেন চারুবালা দেবী। যদিও এই রায় পরিবারের জন্ম এই গ্রামে বলা হয়, কিন্ত তা ঠিক নয়। উত্তরবঙ্গের গৌড়ের "গৌতম" বংশের একটি সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের বংশধর " রায় পরিবার "। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রামবাসীদের বিশেষ অনুরোধে ও আমন্ত্রণে এই রায় পরিবার সোমসার গ্রামে আসেন। সেইসময় গ্রামে কোনো ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল না। তাই গ্রামবাসীরা চেয়েছিলেন একটি ব্রাহ্মণ পরিবার সেখানে বসতি স্থাপন করুক তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদা মেটানোর জন্য। প্রথম আসেন গদাধর রায়। পূর্ণ চন্দ্র রায় ছিলেন গদাধর রায়ের পঞ্চম প্রজন্ম। পূর্ণ চন্দ্র ছিলেন একজন ধার্মিক ও সৎ মানুষ। আর চারুবালা দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক।
মহারাজদের পারিবারিক " বুড়ো শিব "
বুড়ো শিবের মন্দির
দামোদর নদী
দামোদর নদীর ওপর দিক
সংগ্রহশালার ভিতরে
সংগ্রহশালার ভিতরে ভূতেশানন্দজীর ফটৌ
১৯৯৮ সালে স্বামী ভূতেশানন্দজীর উদ্যোগে কয়েকজন ভক্ত তাদের গুরুর জন্মস্থান সোমসারে যেতে শুরু করেন। তখন গ্রামে যাওয়ার একটি মাত্র কর্দমাক্ত রাস্তা ছিল। সত্যিই তখন গ্রামের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর ছিল। মহারাজদের পারিবারিক " বুড়ো শিবের " মন্দিরটি জরাজীর্ন অবস্থায় ছিল। তাঁরা এসে গ্রামের উন্নয়নের কাজে হাত দেন। তখন রায় পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এসে মন্দির ও আশ্রমের জন্য তাদের জমি দান করেন। গ্রামে ভক্তদের ঢল নামতে থাকে। কিন্ত যাতায়াতের ভালো রাস্তা বা পূজো করবার কোনো মন্দির বা ভক্তদের কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। এই রকম পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য গ্রামের লোকেরা বা ভক্তরা একটি মন্দির গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। সেই চাহিদার ফল স্বরূপ ১৯৯৮ সালে স্নান যাত্রার শুভদিনে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ঐ বছরের ৪ই ডিসেম্বর মন্দিরের উদ্বোধন করেন তৎকালীন সহাধক্ষ্য শ্রীমৎ স্বামী গহনানন্দ মহারাজ। পরবর্তীকালে আশ্রমের বর্তমান মন্দিরের ভিত্তিস্থাপন হয় এবং ২০১৫ সালে ১৫ই ডিসেম্বর সেই মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন করেন তৎকালীন সহাধক্ষ্য শ্রীমৎ স্বামী স্মরনানন্দজী মহারাজ। ২০২১ সালের ১৮ই নভেম্বর এই কেন্দ্রটি বেলুড় মঠের শাখাকেন্দ্ররুপে স্বীকৃতি লাভ করে এবং তার নাম হয় " রামকৃষ্ণ মিশন, সোমসার "।
সোমেশ্বর শিব
সোমেশ্বর শিব মন্দির
সমগ্র রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনের এটি ছিল একটি অতুলনীয় ঘটনা। এত ভিক্ষু, সন্ন্যাসী এবং ভক্তদের সমাবেশ---- সবকিছুই যেন এক নতুন উদাহরণ স্থাপন করেছিল। শুধুমাত্র ভূতেশানন্দজী মহারাজের আকর্ষণে এই সমস্ত জিনিসগুলো সফলভাবে সম্পাদিত হয়েছিল। এই শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা মন্দিরের উদ্বোধনের মাধ্যমে সোমসার গ্রাম আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে ------ গ্রামের শুরুতেই স্বাগত তোরন স্থাপন, নতুন স্কুল ভবন, গেস্ট হাউস আর গ্রামে আসার নতুন বাধানো পথ দিয়ে। গ্রামের যুবক যুবতীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির এবং আত্ম-কর্মসংস্থান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয় যাতে অনেকে তাদের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। এই আশ্রমের পরিচালনায় রয়েছে একটি হোমিওপ্যাথি ডিসপেনসারি। এছাড়াও এখানে মাঝে মাঝে মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধি চিকিৎসা করা হয়। রয়েছে একটি ফ্রী কোচিং সেন্টার। প্রতিবছর দরিদ্রদের শাড়ি ও কম্বল বিতরণের মাধ্যমে কল্যাণ মূলক কাজ করা হয়। এছাড়া ধর্মীয় কার্যকলাপ সারা বছর ধরে লেগেই রয়েছে।
আশ্রমের ভিতরে বাগান
সোমসার শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা মন্দিরকে কেন্দ্র করে গ্রামে এক নির্মল ও অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ তৈরী হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দেওয়া প্রতিদিনের পূজো ছাড়াও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম তিথিপূজা, হোম ও ভোগ দেওয়া পালিত হয় বেলুড় দ্বারা নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসারে। এছাড়াও দোলযাত্রা, দূর্গাপুজা, জন্মাষ্টমী, বাংলা নববর্ষ ইত্যাদি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভক্তদের বিশাল সমাবেশ হয় এবং প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থাও থাকে। ৪ই ডিসেম্বর সেবা মন্দিরের উদ্বোধন দিবস হওয়ায় সকালের শোভাযাত্রা, নৃত্যনাট্য এবং ধর্মীয় সমাবেশের সাথে বিশেষ পূজা এবং আনুষ্ঠানিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
আশ্রমের ভিতরে ফলক
আজ সোমসার শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা মন্দির হ'ল একটি আশ্রম কেন্দ্র _____ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন_____ বেলুড় পরিচালিত ভাব প্রচার পরিষদের সদস্য প্রতিষ্ঠান যা কিনা রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের আদর্শের পথ অনুসরণ করে চলেছে।
আশ্রমে যাওয়ার পথ নির্দেশিকা
দূরে দেখা যায় মন্দির
ভক্তদের জন্য আশ্রম প্রাঙ্গণে একটি গেস্ট হাউস তৈরী করা হয়েছে। যাঁরা আধ্যাত্মিক বিশ্রাম উপভোগ করতে চান বা শান্ত পরিবেশে দু এক দিন কাটাতে চান, তাঁরা এখানে এসে থাকতে পারেন। তবে আগে থেকে চিঠি দিয়ে ঘর বুক করতে হবে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা শীতকালে দু-তিন মাস আগে থেকে চিঠি লিখতে হবে। যোগাযোগের E-MAIL ADDRESS :: somsar@rkmm.org. এছাড়া দৈনিক দুপুরে ভোগ প্রসাদ পেতে পারেন। তবে অন্তত আসার একদিন আগে এই নাম্বার টেলিফোনে জানাতে হবে----- 7044536630 বা 9732077647 । এখানে আসতে হলে ----- (i) যদি ট্রেনে আসেন তবে বর্ধমানে আসুন। সেখান থেকে বাঁকুড়া যাবার বাসে চেপে খন্ডঘোষ চেকপোষ্ট বাস ষ্টপেজে নামুন। সেখানে আশ্রমের একটি তোড়ন আছে। সেই রাস্তায় দেড় কিলোমিটার এগোলেই রামকৃষ্ণ মিশন পেয়ে যাবেন। টোটো বা অটো আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য দাড়িয়ে আছে। এছাড়া বর্ধমান ষ্টেশন থেকে গাড়ী ভাড়া করে সোজাসুজি এখানে আসতে পারেন। আর যারা ---- (ii) গাড়ি নিয়ে আসবেন, তারা দুর্গাপুর রোড দিয়ে এসে বর্ধমানে না ঢুকে বাঁ দিকের বাঁকুড়া-বর্ধমান রোড ধরুন। সেই রাস্তা ধরে বাঁকুড়ার দিকে খন্ডঘোষ চেকপোষ্টে এসে তোড়নের দিকের রাস্তা অর্থাৎ সোমসার রোড ধরে আশ্রমে চলে আসুন।
উনিশশতকেহিন্দুসমাজ যখন ধর্মীয়কুসংস্কারেরবেড়াজালেআবদ্ধতখনবাংলারসমাজেউদিত হন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব(১৮৩৬-১৮৮৬ খ্রীঃ) নামে এক যুগাবাতার মহাপুরুষ।তার সহজ,সরল ও মানবতাবাদী মতবাদ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল।দক্ষিণেশ্বরের কালী সাধক এই পুরোহিত বিভিন্ন ধর্ম ও সাধন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে সর্বধর্ম সমন্বয়ের মহান আদর্শ তুলে ধরেন।
সর্বধর্ম অনুশীলন :শ্রীশ্রীরামকৃয় কালীসাধনা ছেড়ে বিভিন্ন সাধনপদ্ধতি অনুশীলন করেন।এই সাধনপদ্ধতি বিভিন্ন ধর্মমতের ছিল।যেমন—
তান্ত্রিক :তিনি এক ভৈরবীর কাছে তন্ত্রসাধনা করেন।
বৈষ্ণবঃতিনি জটাধারী নামে রামাইত সাধুর কাছে বৈষ্ণবধর্ম চর্চা করেন।
বৈদিক মার্গ :তিনি আচার্য তোতাপুরির কাছে বৈদিক মার্গ অনুশীলন করেন এবং সমাধিলাভের পথ খুঁজে পান।
ইসলাম:তিনি ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত গোবিন্দ রায়-এর কাছ থেকে ইসলাম ধর্মসাধনা শেখেন।সন্ধ্যায় নামাজ পড়েন এবং আল্লামন্ত্র জপ করেন।
রামকৃষ্ণ (গদাধর) মুসলমান ধর্ম সাধনার সময়,
"গোমাংস ভক্ষণ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে, মুসলমানের হাতে খেয়েছেন"
নিকটবর্তী গড় মান্দারনের ইদগায় ইদের নমাজে এক বার উপস্থিত হন শ্রীরামকৃষ্ণ। সেখানকার পিরের আস্তানায় তিনি অনেক সময়ই যেতেন।
শৈশব থেকেই ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগ ঘটেছিল শ্রীরামকৃষ্ণের। তাঁর মামাবাড়ি ছিল আরামবাগের কাছে সারাটি-মায়াপুরে, মায়ের সঙ্গে মাঝেমাঝেই যেতেন সেখানে। সারাটির পিরের আস্তানায় তিনি এক বার ভাবাপ্লুত হয়ে গড়াগড়ি দিয়েছিলেন। কামারপুকুরের কাছেই আনুড় গ্রামের নাজিরপাড়ার মসজিদ ও ইদগায় পরমহংসদেব বহু বার গিয়েছেন, সেখানকার মতোয়ালি কাজি আবদুল গনির সঙ্গে তাঁর বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল। নিকটবর্তী গড় মান্দারনের ইদগায় ইদের নমাজে এক বার উপস্থিত হন শ্রীরামকৃষ্ণ। সেখানকার পিরের আস্তানায় তিনি অনেক সময়ই যেতেন। আর দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের কাছেই ছিল গাজিপিরের স্থান, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতি দিন সকালে আবার কখনও বিকেলে গাজিবাবার স্থানে সেলাম জানিয়ে আসতেন বলে লিখেছেন প্রত্যক্ষদর্শী শশিভূষণ সামন্ত। কাছেই ত্রৈলোক্যনাথ বিশ্বাস রোডের মসজিদের সঙ্গে তাঁর বহু স্মৃতি জড়িত— সেখানে তিনি নমাজও পড়েছেন। আজ অনাদরে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের প্রতীক এই মসজিদ বিলুপ্তপ্রায়। আর সুফিসাধক সৈয়দ ওয়াজ়েদ আলি খান ১৮৬৬ সালে দক্ষিণেশ্বরে এলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর কাছে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন, তিন দিন এই সাধনা করেন।
চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের গ্যাঁড়াতলার মসজিদে তাঁর পরিচয় হয় মৌলানা মির মোশারফ হোসেনের সঙ্গে, পরে সেই ফকির নিয়মিত দক্ষিণেশ্বরে আসতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘‘বাউল সিদ্ধ হলে সাঁই হয়, তখন সব অভেদ’’ (কথামৃত)। ধর্মীয় অভেদতত্ত্বই তাঁর সাধনার মূল সুর। এ সব প্রসঙ্গ বহু আলোচিত, কিন্তু তড়িৎকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শ্রীরামকৃষ্ণ ও ইসলাম বইয়ে বিষয়টিকে সমগ্রতায় উপস্থাপন করেছেন। পরে শ্রীমা সারদা ও স্বামী বিবেকানন্দও কী ভাবে এই আদর্শকে পুষ্ট করেছেন, মুসলমানরাই বা কী চোখে শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখেছেন, আলোচিত হয়েছে সে সব প্রসঙ্গও।
" The best of alms ( aid , contribution) is that which the right hand gives , and the left hand knows not of. " ..... PROPHET MUHAMMAD.
খ্রিস্ট:তিনি শম্ভুচরণ মল্লিকের কাছ থেকে জিশুখ্রিস্টের জীবনী ও ধর্মমত সম্বন্ধে শিক্ষালাভ করেন।
" All things, whatsoever you ask in prayer, believing, you will receive. " ..... LORD JESUS CHRIST.
বৌদ্ধ :তিনি বুদ্ধদেবকে ঈশ্বরের অবতার বলে শ্রদ্ধা ও পূজা করতেন।তিনি বলেন, বৌদ্ধ মতে ও বৈদিক জ্ঞানমার্গে কোনো পার্থক্য নেই।
" Let men overcome anger by love, evil by good, greed by liberality ( greatness) , the lie by truth." ....... SRI BUDDHA.
: যত মত তত পথ। সব ধর্মের সার কথাটি এমন সহজ করে আর কেউ বলে যেতে পারেননি। যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ যেন ধর্ম-সমুদ্র মন্থন করেই তুলে দিয়েছিলেন এ অমৃতবাণী। তবে এ শুধুই তাঁর কথার কথা নয়। জীবন দিয়ে উপলব্ধি করা সত্য। সেই সত্যের কাছে পৌঁছাতে বিভিন্ন ধর্মমতে সাধনা করে সিদ্ধিলাভ করেছিলেন ঠাকুর। এমনকী গ্রহণ করেছিলেন ইসলাম ধর্মও।
শ্রীরামকৃষ্ণের বিপুল কর্মকাণ্ডের মধ্যে ইসলাম গ্রহণের দিকটি তুলনায় স্বল্পালোচিত। তবে সাধনমার্গের এ পথেও হেঁটেছিলেন ঠাকুর। জানা যায়, ১৮৮৬-৮৭ সাল নাগাদ ইসলাম সাধনায় মনোনিবেশ করেন ঠাকুর। গুরু হিসেবে বেছে নেন গোবিন্দ রায়কে। নাম শুনে হিন্দু মনে হলেও তিনি ছিলেন ইসলামে দীক্ষীত। তাঁর পূর্বজীবন সম্বন্ধে যা জানা যায়, তাতে তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয় সন্তান। পরে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সে ধর্ম গ্রহণ করেন। নাম হয় ওয়াজেদ আলি খান। এই গোবিন্দ রায়ের কাছেই ইসলাম মতে দীক্ষা নেন ঠাকুর। মন্দির চত্বরে তাঁকে দেখেই ঠাকুর মুগ্ধ হন। পরে তাঁর কাছেই দীক্ষা নেন। শিয়া, সুন্নি ও সুফি- মুসলমানদের এই তিন ভাগের মধ্যে গোবিন্দ রায় ছিলেন সুফি মতের সাধক। সুফি মত অনেকটাই হিন্দু বেদান্তের আদর্শের কাছাকাছি। এই মতেই দীক্ষা নেন ঠাকুর, কলমা বা আল্লা ব্যতীত কেউই উপাস্য নেই-এই মন্ত্র গ্রহণ করেন। সেই সময় মন্দিরে পুজার্চনা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এমনকী হিন্দু দেবদেবীর মূর্তি বা ছবির দিকেও তাকাতেন না। সাধারণ অহিন্দু দর্শনার্থীর মতো মন্দিরের বাইরেই বসবাস করতেন। প্রসঙ্গত, দক্ষিণেশ্বর কালীমন্দিরের বাইরেই আছে গাজীপীরের স্থান। কথিত আছে এই গাজিপীর স্বপ্নে দর্শন দিয়েছিলেন স্বয়ং রাসমণিকে। পরে রানিমা তাঁর স্থানে বাতি দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
তিনদিন ইসলাম ধর্মে গভীর সাধনা করেন ঠাকুর। সে সময় ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনও চিন্তা তিনি মাথায় রাখেননি। এবং অচিরেই এ পথে সিদ্ধিলাভ করেন। ঠাকুরের ইসলাম ধর্ম গ্রহণ নিয়ে সাল তারিখের মতভেদ আছে। বিভিন্ন গ্রন্থে আলাদা আলাদা সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিভিন্ন ঘটনাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা স্মৃতিচারণায়। স্বামী প্রভানন্দের ‘শ্রীরামকৃষ্ণজীবনে ইসলাম’ বইটিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হয়েছে। ঠাকুরের ইসলাম গ্রহণের কথা লিখেছেন স্বামী নির্বেদানন্দও। কথিত আছে, তিনদিনের সাধনার পর, এক সৌম্যদর্শন ফকিরের সঙ্গে দেখা হয় ঠাকুরের। দু’জনেই দু’জনকে দেখে বিভোর হয়ে যান। ঠাকুরের মনে হয় তিনি মহম্মদের দর্শন পেয়েছেন। যাই হোক, এর আগে অদ্বৈতসাধনমার্গে সিদ্ধিলাভ করে যে অনুভূতিতে পৌঁছেছিলেন, ইসলাম গ্রহণ করেও সেই একই অনুভবে পৌঁছান ঠাকুর। এরপর খ্রিস্ট ও বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেও তিনি সিদ্ধিলাভ করেন। সব ধর্মের পথ পরিক্রমায় মেতেছেন বলেই তিনি এক সহজে বলতে পেরেছেন সর্বধর্ম সমন্বয়ের কথাটি যা সনাতন ভারতের ঐতিহ্য। ঠাকুরের ভারতবর্ষ তাই সেই উদার ও ঐতিহ্যের ভারতবর্ষ। আজ দীবাপলির প্রাক্কালে সেই সমন্বয়ের সাধনাই বোধহয় আমাদের প্রকৃত আলোর সন্ধান দিতে পারবে।
ইসলাম গ্রহণ প্রসঙ্গে কথামৃতে ঠাকুর নিজে জানিয়েছেন, ইসলাম সাধনায় তিনি এতটাই তন্ময় ছিলেন যে, হিন্দু দেবদেবীর দিকে দেখতে মনও চাইত না। সে সময় গোমাংস ভক্ষণেরও সাধ জেগেছিল ঠাকুরের। যদিও রানি রাসমনির জামাই মথুরমোহনের অনুরোধে সে কাজ তিনি করেননি। কিন্তু নিয়মিত নমাজ পড়তেন। মসজিদে যেতেন। কথামৃতকার ঠাকুরের মুখের কথা তুলে ধরেছেন এইভাবে, ‘গোবিন্দ রায়ের কাছে আল্লা মন্ত্র নিলাম। কুঠিতে প্যাঁজ দিয়ে রান্না ভাত হলো। খানিক খেলুম।’ অন্যত্র বলছেন, ‘…বটতলায় ধ্যান করছি, দেখালে একজন দেড়ে মুসলমান সানকি করে ভাত নিয়ে সামনে এলো। সানকি থেকে ম্লেচ্ছদের খাইয়ে আমাকে দুটি দিয়ে গেল। মা দেখালেন, এক বই দুই নাই। সচ্চিদানন্দই নানা রূপ ধরে রয়েছেন। তিনিই জীবজগৎ সমস্তই হয়েছেন। তিনিই অন্ন হয়েছেশ্রীরামকৃষ্ণদেবের কলকাতায় আগমন। তাঁর কর্মধারা ও জীবনযাপনকে অনেকেই গ্রাম্য ব্যক্তির পাগলামি ধরে নিলেও শ্রীরামকৃষ্ণ শুধুমাত্র রাসমণি দেবী প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণেশ্বরের কালী মন্দিরের উপাসক হয়েই থাকলেন না। তিনি নিজের জীবন দিয়ে অন্য ধর্মগুলিকেও বোঝার চেষ্টা করলেন। জীবনের প্রথম পর্যায়ে ভৈরবী যোগেশ্বরীকে গুরু করেন। চলে তন্ত্রসাধনা।
ভৈরবী ব্রাহ্মণীর নির্দেশে শাস্ত্র অনুসারে গোকুলব্রত ও চৌষট্টি প্রকার ব্রত পালন করেন। এরপর জটাধারী নামে এক রামায়েত সাধুর কাছে রামমন্ত্র গ্রহণ করেন। এমনকি, ছ’মাস স্ত্রীবেশ ও স্ত্রীভাব ধারণ করেছিলেন কেবল ব্রজের গোপীদের ন্যায় মধুর ভাবে সাধনা করার জন্য। আচার্য তোতাপুরীর কাছে অদ্বৈত বেদান্তের নিয়ম মেনে নির্বিকল্প সমাধির সাধনায় রত হন।
পরবর্তীকালে সুফি সাধক গোবিন্দ রায়ের কাছে ইসলাম ধর্মে উপদেশ গ্রহণ করেন। খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কেও তিনি ওয়াকিবহাল ছিলেন। কলকাতার সিঁদুরিয়াপটির শম্ভুচরণ মল্লিকের কাছে তিনি বাইবেলের কথা শুনতেন। পানিহাটি মহোৎসব বা বিভিন্ন বৈষ্ণবীয় উৎসবেও তাঁর যাতায়াত ছিল। জীবনে শ্রীরামকৃষ্ণের এই সাধনা তাঁকে প্রায় সকল প্রধান ও বহুল প্রচলিত ধর্মীয় পন্থার সঙ্গে পরিচয় করিয়েছিল। আর তার পরিণতিতেই শ্রীরামকৃষ্ণদেবের অন্যতম প্রধান বক্তব্য, ‘যত মত, তত পথ’। নিজের জীবনকে বিভিন্ন ধারার ধর্মপথে অতিক্রান্ত করে তবেই এই সিদ্ধান্তে তিনি এসেছিলেন। অবশ্য এই কথা বৈদিক ঋষিদের ‘একং সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি’ অর্থাৎ সত্য একটাই, ঋষিরা তাকে বহু নামে বলে থাকেন—এই ভাবনা বহু প্রাচীনকালেই প্রচলিত ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণদেব সেই প্রাচীন সত্যকে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পুনরায় সমাজে প্রতিষ্ঠা করলেন। তাঁর বক্তব্য, “আমি যার যা ভাব তার সেই ভাব রক্ষা করি। বৈষ্ণবকে বৈষ্ণবের ভাবটি রাখ্তে বলি, শাক্তকে শাক্তের ভাব। ...আমি সব ভাবই কিছু কিছু করেছি—সব পথই মানি।” বলা চলে, শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এই ভাবের ওপর ভিত্তি করেই পরবর্তীকালে শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সে অর্থে শ্রীরামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেননি। কিন্তু তিনিও শ্রীরামকৃষ্ণের এই ভাবের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ‘প্রবুদ্ধ ভারত’ পত্রিকায় লিখেছিলেন ‘To The Paramhansa Ramkrishna Deva’ নামক একটি কবিতা। সেটিই ‘প্রবাসী’তে বাংলায় লেখেন—“বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা/ ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা।/ তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে/ নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;/ দেশ বিদেশের প্রণাম আনিল টানি/ সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।” ছয় পঙ্ক্তির এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের সমন্বয়ী আদর্শকেই চিত্রিত করেছেন। এমনকি, জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “ধর্মীয় ধ্বংসাত্মক এমন ঊষর একটি যুগেও তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদের সারসত্য উপলব্ধি করেছেন, বহু সাধনার আপাত পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বমুখর ধারাগুলি মিলিত হয়েছে তাঁর হৃদয়ের প্রশস্ততায়, তাঁর আত্মার সারল্য চিরকাল ধিক্কার জানায় পণ্ডিত আর ধর্মবেত্তাদের সমস্ত আড়ম্বর আর আত্মম্ভরিতাকে।” অন্য দিকে, শিবরাম চক্রবর্তী তাঁর ‘দেশের মধ্যে নিরুদ্দেশ’ গল্পে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এই সমন্বয়ী ভাবনাকেই অস্বীকারে যেন স্বীকার করে নিয়েছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এই ভাব প্রচারের প্রায় দেড় শতক অতিক্রান্ত। বর্তমানে তাঁর এই ভাবনা নতুন করে জানা ও বোঝার সময় এসেছে। ধর্মীয় জগতের পুরোধা হিসেবে তাঁকে সরিয়ে রেখে তাঁর এই অমূল্য মতবাদকে গুরুত্ব না দিলে সময় এক দিন তার পরিণাম দেখাবে। আসলে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এই ভাবনায় নিহিত আছে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও উদার মানসিকতা। বর্তমান সমাজে যার অভাব অনেক বেশি সেই শ্রদ্ধা ও ভালবাসা এবং উদারচেতনাই পারে
সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে প্রগতির পথে চালনা করতে। ফলে আড়ম্বর বা আত্মম্ভরিতাকে বিসর্জন দিয়ে প্রত্যেকের জীবনকে অধ্যাত্ম আবহ এগিয়ে নিয়ে যাওয়াতেই ধর্মের প্রবাহ। শ্রীরামকৃষ্ণ তাই নতুন কোনও ধর্মের বা অনুশাসনের প্রবর্তন করেননি, কেবল নিজের জীবনের প্রত্যেক মুহূর্তকে ভরে রেখেছিলেন একটি সুন্দরতম অধ্যাত্ম ভাবনায়। ‘ধর্ম’ বুঝতে চাইলে এই অর্থেই বোঝা উচিত। সংসারী ও সন্ন্যাসী শিষ্যদের তিনি আলাদা আলাদা করে এই অধ্যাত্মচেতনার কথাই বলে এসেছেন বিভিন্ন সময়ে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এই ভাব সঠিক অর্থে জীবনে গ্রহণ করলেই সমাজের উন্নতি।
শ্রী শ্রী ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ও গৌতম বুদ্ধ
রামকৃষ্ণ ও গৌতম বুদ্ধের মধ্যে অনেক মিল ছিল। এখানে একটা বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। সেটা হল দুজনেই প্রচার বিমুখ ছিলেন।
১৮৭৩ সালের শেষভাগ নাগাদ শম্ভুচরণ মল্লিক তাকে বাইবেল পাঠ করে শোনালে তিনি খ্রিস্টীয় মতে সাধনা শুরু করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন, এই সময় তার চিত্ত খ্রিস্টীয় ভাবে পূর্ণ হয়েছিল এবং তিনি কালীঘরে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন। একদিন মেরিমাতার কোলে যিশু খ্রিস্টের চিত্রে তিনি জীবন্ত যিশুর দিব্যদর্শন লাভ করেছিলেন। তার ঘরে হিন্দু দেবদেবীদের সঙ্গে পিতরকে ত্রাণরত যিশুর একটি চিত্র ছিল, সেটিতে তিনি প্রত্যহ সকাল ও সন্ধ্যায় ধূপারতি করতেন।