(€€) মা শ্যামাসুন্দরী দেবী , কন্যা মা সারদা দেবী (€€)
জয়রামবাটির কাছেই শিহড় গ্রাম । হরিপ্রসাদ মজুমদার ও রাসমণি দেবীর বাস সেই গ্রামে। তাঁদের সংসারে প্রথম সন্তান রূপে ভূমিষ্ঠ হন শ্যামাসুন্দরী দেবী। তাদের সংসারে আরও পাঁচ পুত্র ও এক কন্যা ছিল। হরিপ্রসাদের পূর্ব পুরুষরা ছিলেন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাদেরই কেউ বর্ধমান মহারাজের সুনজরে পরে তাঁর কাছ থেকে " মজুমদার " উপাধি পেয়েছিলেন। শ্যামাসুন্দরী শ্যামবর্না হলেও , ছিলেন অসাধারণ সুন্দরী। তাই অল্প বয়সে জয়রামবাটির রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে শ্যামাসুন্দরীর বিয়ে হয়। রামচন্দ্র দরিদ্র হলেও ছিলেন নিষ্ঠাবান ও উদারচেতা মানুষ। পিতামাতার প্রকৃতি সম্পর্কে কন্যা এই রকম অভিমত প্রকাশ করতেন------" বাবা পরম রামভক্ত এবং পরোপকারী ছিল। মায়ের কত দয়া ছিল। তাই এ ঘরে জন্মেছি। "
শ্রীমায়ের জন্ম___ সে এক ইতিহাস। এক রাতে শিহড় থেকে জয়রামবাটি ফেরার পথে শ্যামাসুন্দরী অসুস্থ বোধ করেন। তিনি এক বেলগাছের তলায় বসে পড়েন। সেই সময় তিনি দেখেন লক্ষ্মীসদৃশ দেবী এক শিশুকন্যা বেলগাছ থেকে নেমে এসে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরেছে। আবার অন্য দিকে রামচন্দ্র স্বপ্নে দেখেন এক অপরুপা বালিকা তাকে বলছে ' তোমার কাছে এলাম '। তাদের এই অলৌকিক অভিঞ্জতার পর ১২৬০ বঙ্গাব্দের ৮ই পৌষ, ইং ১৮৫৩ সালের ২২শে ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার কৃষ্নাসপ্তমির সন্ধ্যায় রামচন্দ্রের গৃহে ভূমিষ্ঠ হলেন তাদের প্রথম সন্তান। নাম রাখা হল "ক্ষেমঙ্করী"। কিন্ত পরে শ্যামাসুন্দরীর এক বোনের অকালমৃতা কন্যার স্মৃতিতে নাম রাখা হল " সারদা "। যদিও শ্যামাসুন্দরী দেবী দুই মেয়ে ও পাচ ছেলের জননী ছিলেন, কিন্ত সারদামণি ও তিন ছেলে প্রসন্নকুমার, কালীকূমার এবং বরদাপ্রসাদই দীর্ঘকাল জীবিত ছিলেন। তাঁর দ্বিতীয় কন্যা কাদম্বিনী ও দ্বিতীয় পুত্র উমেশের অল্প বয়সে মৃত্যু হয়। কনিষ্ঠ পুত্র অভয়চরণ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। কলকাতার ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুলে ভাক্তারি পড়তেন। ছাত্রাবস্থায় কলেরায় মৃত্যু হয় তাঁর।
স্বামী রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ১৮৭৪ সাল মারা যাবার পর শ্যামাসুন্দরী দেবী অথচ জলে পরলেন। প্রচন্ড অভাবের সংসার। কেননা সব ছেলেরা তখন নাবালক। সেই সময় নি:সম্বল শ্যামাসুন্দরী দেবী অন্নসংস্থানের জন্য এক সঙ্গতি সম্পন্ন প্রতিবেশীর বাড়ী থেকে ধান এনে ঢেঁকিতে কাটতে, মজুরি হিসেবে পেতেন এক চতুর্থাংশ চাল। তখনকার অবস্থার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন........ ঘরে ভাত বসিয়ে দিয়ে শিহড়ে গিয়ে তরকারি নিয়ে এসেছি। ষোলো পাকা ( সারি সারি ষোলোটা) উনুন জ্বলছে, তাতে রান্না করছি, ----- এক হাড়ে ভাত আর এক ধুনুচি চালের জন্য।" এই দুর্দিনে শ্রীমাকে কাছে পেতেন যদিও মা সারদা তখন দক্ষিণেশ্বরে থাকতেন। শ্রীমা জয়রামবাটিতে এলে সংসারের সমস্ত কাজ সামলাতেন আবার ভাইদেরকেও সামলাতেন। উপার্জনের জন্য ক্ষেত থেকে তুলো তুলে তিনি পাকিয়ে পৈতে তৈরী করতেন। তাই শ্যামাসুন্দরী মেয়েকে বলেছিলেন " প্রকৃতপক্ষে তুই-ই আমার বড় ছেলে। " ওদিকে ছেলেদেরকেও উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন " তোদের বড়দি আমাদের লক্ষ্মী। আমাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য সে কিনা করে। " আর আদর্শ কন্যার কাছেও তিনি আবদার করে বলেছিলেন " সারদা, জন্মান্তরে তোকেই যেন আবার আমি পাই, মা। "
পাঁচ বছরের কন্যা সারদাকে চব্বিশ বছরের গদাধরের হাতে তুলে দেন রামচন্দ্র। কিন্ত জামাই আর পাঁচটা মানুষের মতন নয়। তিনি ঈশ্বরপ্রেমে ব্যাকুল হয়ে কাঁদেন, হাসেন নৃত্য করেন। শ্বশুরবাড়ির কারো চোখে পড়ে-- বাড়ির জামাই কীর্তন শুনে অচৈতন্য ও উলঙ্গ অবস্থায় ঘরের এক কোণে পরে আছেন। তাঁর ভাব না বুঝে গ্রামশুদ্ধ লোক তাঁকে " মুখুজ্জেদের খেপা জামাই " বলে উপহাস করে। স্বামীর নিন্দা শুনে লুকিয়ে কাঁদেন সারদা। এসব শুনে আর দেখে শ্যামাসুন্দরীর বুক ফেটে যায় । আক্ষেপ করে তিনি বলতে থাকেন " এমন পাগল জামাই-এর সাথে সারদার বিয়ে দিলুম!! ঘর সংসারও করল না, ছেলেপিলেও হল না, আর মা বলাও শুনলে না।" সে কথা শুনে শ্রীরামকৃৃষ্ণ আশ্বাস তাকে দেন " শাশুড়ি ঠাকরুন, সে জন্য আপনি দু:খ করবেন না। আপনার মেয়ের এত ছেলে মেয়ে হবে, শেষে দেখবেন, "মা" ডাকের জ্বালায় অস্থির হয়ে উঠবে। " শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগের কিছুকাল পরেই সেই ভবিষ্যদ্বানী বর্ণে বর্ণে সত্যি হয়ে উঠে। শ্যামাসুন্দরীও জামাইকে খুব ভালোবাসতেন। শেষের দিকে তাদের সম্পর্ক ছিল ঠিক যেন ভক্ত ভগবানের সম্পর্ক। এ সম্বন্ধে পরবর্তীকালে মা সারদা বলেছেন " মা একসময় জামাই এর সমালোচনা করলেও শেষমেশ তাকে পূজো করছেন। "
জয়রামবাটিতে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন সারদা দেবীর মাতা শ্যামাসুন্দরী দেবীর হাত ধরে। এই পুজো শুরুর পিছনে ও রয়েছে একটি স্বপ্নাদেশ। প্রতিবছর শ্যামাসুন্দরী দেবী প্রতিবেশীর বাড়িতে কালীপুজো উপলক্ষে নৈবেদ্যের চাল পাঠাতেন। এক বছরের উভয়ের মধ্যে বিবাদ লাগে। তখন প্রতিবেশী নব মুখুজ্জে নৈবেদ্যের চাল নিতে অস্বীকার করেন। এতে অত্যন্ত কষ্ট পান শ্যামা সুন্দরী দেবী। সেই রাতেই শ্যামাসুন্দরী দেবীকে স্বপ্নাদেশ দেন দেবী জগদ্ধাত্রী। স্বপ্নে দেবী শ্যামাসুন্দরীকে আদেশ দেন যে ওই চালেই যেন জগদ্ধাত্রী পুজোর আয়োজন করা হয়। শ্যামা সুন্দরী দেবী তেমনটাই করেছিলেন।
এখানে জগদ্ধাত্রী প্রতিমার পাশে জয়া-বিজয়া ও নারদ মুনির মূর্তি থাকে। নবমীতে ষোড়শোপচারে পুজো, তিন বার চণ্ডীপাঠ, মাতৃমন্দিরে দরিদ্রনারায়ণ সেবা। দশমীর দিন দশোপচারে পুজো। এদিন সন্ধ্যারতির পর যাত্রাগানের আসর বসে। একাদশীর দিনেও দশোপচারে পুজো। পরে বিসর্জনকৃত্য সম্পন্ন হয়। ধুনুচিনৃত্য, কর্পূরারতি, কনকাঞ্জলি প্রভৃতি অনুষ্ঠিত হয়। শেষে বাদ্যঘণ্টা ও শোভাযাত্রা-সহকারে মায়ের দিঘিতেই প্রতিমা নিরঞ্জন। পুজো উপলক্ষে আশ্রমপ্রাঙ্গণে মেলা বসে।
এর পরের বছর সারদা দেবী জগদ্ধাত্রী পুজো বন্ধ করে দিতে চাইলে দেবী জগদ্ধাত্রী তাকে স্বপ্নাদেশে পুজো বন্ধ করতে বাধা দেন। প্রথম চার বছর এই পুজো হয়েছিল শ্যামাসুন্দরী দেবীর নামে, দ্বিতীয় চার বছর এই পুজো হয়েছিল সারদা দেবীর নামে এবং তৃতীয় চার বছর তার কাকার নীলমাধব মুখোপাধ্যায়ের নামে এই পুজো হয়েছিল। বারো বছর পর সারদা দেবী এই পুজো বন্ধ করার জন্য মনস্থ করেন। কিন্তু সেই বারও তিনি পুনরায় জগদ্ধাত্রী দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী এইবারও স্বপ্নাদেশ দিয়ে সারদা দেবীকে পুজো বন্ধ করা থেকে নিরস্ত করেন।
জীবিত কালে প্রতিবছরই এখানকার জগদ্ধাত্রী পুজোয় স্বয়ং সারদা দেবী উপস্থিত থাকতেন। ১৯১৯ সালে সারদা দেবী শেষবার এই উপস্থিত পুজোয় ছিলেন। এর পরের বছর তিনি দেহ রাখেন। বর্তমানে সারদা দেবীর এই জন্মভিটেই রামকৃষ্ণ মিশনের তরফে পুজোর আয়োজন করা হয় ।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য,পুজোর পরিচালনার জন্য সারদা দেবী দশ বিঘার কিছু জমি দান করেছিলেন দেবোত্তর সম্পত্তি রূপে।
মা সারদা প্রকৃত অর্থেই ছিলেন তাঁর গর্ভধারিনীর ছায়া। শ্যামাসুন্দরীর শেষ বয়সের অলোকচিত্রটি মাতা-কন্যার চেহারার সাদৃশ্যের প্রত্যক্ষ প্রমাণ। শ্রীমার স্বচ্ছ বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি, কষ্টসাধ্য মনোভাব এবং সরল, করুনাময়ী প্রকৃতির দিকে তাকালে বোঝা যায় গর্ভধারিনীর সমস্ত গুলি কন্যার মধ্যে ছিল। শ্যামাসুন্দরীর সম্বন্ধে, শ্রীমায়ের এক জীবনীকারের লেখা থেকে পায় ______ " দিদিমা বড়ই সরল ও অনলস--- দিবারাত্র তাঁর কাজের বিরাম ছিল না। গুরুসেবা, মজুরদের খাওয়ানো, ধানভাঙ্গা প্রভৃতি কার্য একটার পর একটা চলিয়া ; অথচ মুখে সর্বদা হাসি লাগিয়াই আছে। বিরক্তি বা ক্রোধের লেশমাত্র নাই।"
এদিকে শ্রীমাও জননীকে খুব ভালবাসতেন। মেয়ের আগ্রহেই শ্যামাসুন্দরী পুরী, কাশী, বৃন্দাবন দর্শন করেন। জীবনের শেষ পর্বে শ্যামাসুন্দরীকে দেখা যায় অন্য ভূমিকায়। তখন তিনি বিশ্বব্যাপী কন্যার লক্ষাধিক ভক্ত-সন্তানের আদরের দিদিমা। তাঁর সংসার ভক্ত ও ভগবানের। বর্তমান জয়রামবাটির মায়ের পুরোনো বাড়ী ছিল তাঁর আবাস।



No comments:
Post a Comment