Sunday, 23 June 2019

শ্রী রামকৃষ্ণদেবের জীবনের শেষ দিন।

আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে সঙগৃহিত
লেখক :: শঙকর



বিশ্বসঙসারের মৃত্যুহীন প্রাণেরা তো দেহাবসানের পরেই নতুন ভাবে বেঁচে ওঠেন। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের বেলাতেও একই আইন,‌ তবুও কাশীপুর উদ্যানবাটীতে বহু যুগ আগে শ্রাবণের শেষ কয়েকটি দিনে ভক্তজনদের বিনিদ্র রজনীর বৃত্তান্ত জানবার জন্য নতুন যুগের মানুষদের আগ্রহ বেড়েই চলেছে। আগ্রহ বাড়ায় আরেকটি কারন হল কলকাতা কর্পোরেশন কতৃপক্ষ তাঁদের শ্মাশানঘাটের একটি ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রার থেকে রামকৃষ্ণ দেহাবসানের নথিপত্রের ছবি বেলুড়ের সঙগ্রহশালায় দান করতে চলেছেন।

১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের দেহাবসান হলেও কোনো ডেথ সার্টিফিকেট নেই। এই কারনে অন্তত ঠাকুরের ইতিহাসটা আরও একটু জোরদার হল। যে দিনটি এত বছর পরে আবার মানুষের কৌতূহল পূর্ণ হয়ে উঠতে চাইছে, শ্রী রামকৃষ্ণ মিশনের অনন্তলোক যাত্রার সেই তারিখটি কবে?  ১৫ ই আগষ্ট ? না পরের দিন? পরবর্তী সময়ে ১৫ই আগষ্ট মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে দুটি কারণে। এক, সাতচল্লিশের মধ্যরাতে " ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট " এবং দুই, তারও বেশি কিছু দিন আগে আজকের থিয়েটার রোড বা শেক্সপিয়ার সরণিতে শ্রী অরবিন্দের আবির্ভাব দিবস ( ১৫ই আগষ্ট, ১৮৭২ )।

শ্রী রামকৃষ্ণদেবের তিরোধানও ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাতে, এ কথা প্রায় সকলেরই জানা আছে। যার থেকে "শ্রাবণের শেষ দিনে কাশীপুরে" এই কথাটা ভক্তদের মুখে মুখে ঘুরত। কিন্তু শশ্মানের খাতা তো ভুল করে না। সেখানে ৯৫০ এন্ট্রিতে লেখা ------ ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৬। এখন সবাই বোঝে, মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর পেরোলেই তারিখ পাল্টে যায়। যদিও বাংলা হিসাবে সূর্যোদয়ের আগে পর্যন্ত পুরোনো তারিখটাই থেকে যায়। এই গোলমাল কাশীপুরে সরকারি ভাবে সংরক্ষিত প্রায়ান নথিতে রয়ে গিয়েছে। স্বামী প্রভানন্দ তাঁর " শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা " বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে  সরকারি নথি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন -------------

রাম কিষ্টো প্রমোহঙশ
৪৯ কাশিপুর রোড, বয়স ৫২
মৃত্যু তারিখ - ১৫ আগষ্ট ১৮৮৬
সেক্স - পুরুষ, গতি ব্রাহ্মন
পেশা - " প্রিচার "
মৃত্যুর কারণ - গলায় আলসার
কে রিপোর্ট করেছেন -
জি সি ঘোষ, বন্ধু।


এই জি সি ঘোষের পূর্ব নাম ছিল গোপালচন্দ্র ঘোষ (সুর)। জন্ম ১৮২৮। যৌবন কালে চিনা বাজারে বিখ্যাত বেনীমাধব পালের দোকানে সামান্য চাকরি করতেন। শ্রী রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৭৫। বয়সে বড় বলে ঠাকুর এই ভক্তকে " বুড়োগোপাল " বলে ডাকতেন। ইনিই নরেন্দ্রনাথ প্রমুখকে ১২ খানি গেরুয়া ও রুদ্রাখের মালা বিতরণ করেন ---- এর মধ্যে শেষ উপহারটি রাখা হয়েছিল গিরিশ ঘোষের জন্য। গোপাল পরবর্তী কালে বরাহনগরে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন আর নাম হয় স্বামী অদ্বৈতানন্দ। মঠ মিশনের প্রথম মিটিংয়ে (১৯০১) তিনিই সভাপতিত্ব করেন এবং পরবর্তী কালে দুবার মঠের অস্থায়ী সভাপতি হন। ২৮শে ডিসেম্বর ১৯০৯ সালে বেলুড় মঠে তাঁর দেহাবসান হয়।



ঠাকুরের শেষ দিনগুলির কাশীপুর বৃত্তান্ত দুই ভুবনবিদিত জীবনীকার--- মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ও স্বামী সারদানন্দ কেউই বিস্তারিত ভাবে লিখে যাননি। মহেন্দ্রনাথ শুধু লিখেছেন ---- ঠাকুর দশমাস ধরে ভুগেছিলেন, গলায় ঘা হয়েছিল, ভক্তরা সেবা করে পরিশ্রান্ত, " ডাক্তারের হাত ধরে কাঁদতেন, ভাল করে দাও বলে " এবং শেষকালে বলতেন " মা আমার শরীর রাখবেন না "। কথামৃত-য় শেষ বিবরণ ২৪শে এপ্রিল ১৮৮৬। লীলাপ্রসঙ্গ রচয়িতা স্বামী সারদানন্দও কাশীপুরের শেষ অসুখের দিনগুলির বিবরণ লেখেননি। এ বিষয়ে চেতনানন্দ খোঁজখবর করেও বিশেষ কোনও বিবরণ দেখেননি।

শ্রীম ও স্বামী সারদানন্দ যে ঠাকুরের দেহাবসানের পরে কাশীপুরে উপস্থিত ছিলেন, তার প্রমাণ বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্স - এর ১৬ই আগষ্ট ১৮৮৬ তারিখের তোলা ছবিতে রয়েছে। ছড়ানো ছিটানো  স্মৃতিকথা থেকে স্বামী প্রভানন্দ তাঁর "শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা" বইতে অনেক খবর পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। অন্য একটি বইয়ে বর্নিত হয়েছে কথামৃত রচয়িতা শ্রীম-র জীবনের পরবর্তী কালের একটি ঘটনা। বহু বছর পরে (৩০শে মার্চ ১৯২৪) তিনি একবার কাশীপুর উদ্যানবাটী দর্শনে গিয়েছিলেন। তখন এক আর্মেনিয়ান খৃষ্টান ওই বাড়িতে বাস করতেন। ঘরের একটি অংশ দেখিয়ে শ্রীম বললেন " এই খানে ঠাকুরের বিছানা ছিল। দখিন দেওয়ালের দিকে ছিল ঠাকুরের শিয়রে"। সেদিন ডাঃ বকশি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন " ঠাকুর কেন খাটে শুতেন না?" শ্রীম বললেন " মেঝেতে শোয়া সুবিধে ছিল। দুর্বল শরীর, মাদুরের উপর শতরঞ্চি। তার উপর বিছানা।"

আবার " শ্রাবণের শেষ দিনে কাশীপুর উদ্যানে " নামক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় ---- দখিনেশ্বরে অনেক দিন শ্রীরামকৃষ্ণের শরীর-স্বাস্থ বেশ ভালই ছিল। সুস্থ অবস্থায় তিনি আধসের থেকে দশছটাক চালের ভাত খেতেন। ব্যাধি বলতে আমাশয়। আর ছিল বায়ু বৃদ্ধি রোগ। কবিরাজের পরামর্শ মতো ছিলিমের ভিতর ধানের চাল ও মৌরি দিয়ে তামাক খেতেন। তাঁর গলা থেকে প্রথম রক্তক্ষরণ হয় আগষ্ট ১৮৮৫ তে। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম " ক্লাজরিম্যানস থ্রোট " । প্রখ্যাত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার তাঁকে দেখেন ২রা সেপ্টেম্বর ১৮৮৫তে এবং পরের মাসে ( ১২ অক্টোবর ) নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করেন। তাঁরই সিদ্ধান্ত, রোগটা ক্যান্সার, কবিরাজি ভাষায় রোগটা রোহিনী রোগ। বাড়িওয়ালার চাপে শ্যামপুকুর আশ্রম ছেড়ে ৯০ কাশীপুর রোডে মাসিক ৮০ টাকায়, ছ মাসের জন্য চুক্তি। এখান থেকেই নরেন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধুদের নিয়ে মিনার্ভা থিয়েটারের কাছে পীরুর রোস্তোরায় ফাউল কালীর অর্ডার দিয়েছিলেন। সে রিপোর্ট ঠাকুরের কাছেও গিয়েছিল। খরচাপাতির টানাটানি ও সেবকের সংখ্যা কমানোর বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে বিরক্ত ঠাকুর প্রিয়জনদের বলেছিলেন " তোরা আমাকে অন্যত্র নিয়ে চল ...... তোরা আমার জন্য ভিখ্যা করতে পারবি? তোরা আমাকে যেখানে নিয়ে যাবি, সেখানেই যাব।"

২৫শে মার্চ ১৮৮৬ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ জে এম কোটস এসেছিলেন তাঁকে দেখতে। শোনা যায় , ভূপতিনাথ মুখোপাধ্যায় ডাক্তার কোটসকে বত্তিস টাকা দিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন , ডাঃ কোটস ভিজিট নেননি।

বিখ্যাত ডাক্তার রাজেন্দ্র নাথ দত্ত এলেন ৬ই এপ্রিল ১৮৮৬। এঁকে ঠাকুর জানিয়েছিলেন , ছোটবেলায় তাঁর পিলের চিকিৎসা হয়েছিল। কাশীপুরে মাঝে মাঝে রাঁধুনির অনুপস্থিতিতে রাঁধতেন ভক্ত তারক  ( পরবর্তী কালে স্বামী শিবানন্দ ) । একদিন খাবারের গন্ধ পেয়ে ঠাকুর বললেন " আমার জন্য একটু চচ্চড়ি নিয়ে আয়।"

" শ্রীরামকৃষ্ণ লীলামৃত " বইতে ভক্ত বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন " আগষ্ট মাসে ঠাকুর বললেন , ইচ্ছে হয় ইজের পরে ডিসবাটিতে খাই। সেই মত ব্যবস্থা হওয়ায় প্রভু খুব আনন্দ করলেন। "

এই সময়েই আসন্ন দেহত্যাগের আশঙ্কা বুঝতে পেরে ঠাকুর তাঁর সহধর্মিণীকে বলেছিলেন " তুমি কামারপুকুরে থাকবে, শাক বুনবে। শাক ভাত খাবে আর হরিনাম করবে।...... কারো কাছে একটি পয়সার জন্য চিৎহাত কোরো না, তোমার মোটা ভাতকাপড়ের অভাব হবে না। "

শেষের সেই দিনে খিচুড়ি নিয়েও বিশেষ গোলযোগ। সেবকদের জন্য শ্রীমা যে খিচুড়ি রাধছিলেন তার নীচের অংশ ধরে গেল।

বিকেলের দিকে পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ায় ভক্ত শশী ( স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ ) কয়েক মাইল দৌড়ে গিয়ে ডাঃ নবীন পালকে ধরে নিয়ে এলেন। ঠাকুর বললেন " আজ আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে।" ডাক্তারকে জিঞ্জাসা করলেন " সারবে?" । ডাক্তার নিরুত্তর। এক সময় ঠাকুর ভক্তদের বললেন, " একেই নাভিশ্বাস বলে " । ভক্তরা বিশ্বাস করল না।তারা ভাতের মন্ড নিয়ে এলো।

তখন প্রায় রাত ন'টা। হঠাৎ ঠাকুরের সমাধি। নরেন সবাই কে ' হড়ি ওঁ তৎসৎ ' কীর্তন করতে বললেন। সমাধি ভঙ্গ হল রাত প্রায় এগারোটায়। সেবক শশীর ইঙরাজীতে রাখা নোট অনুযায়ী, "পুরো এক গ্লাস পায়েস পান করেন"। তার পর ঠাকুর নাকি বলেন " আ: শান্তি হল। এখন আর কোনোও রোগ নেই।"


স্বামী অভেদানন্দ ও স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ ঠাকুরের শেষ মুহূর্তের বিস্তারিত বিবরণ রেখে গিয়েছেন। --------- " একটা বাজিলে অকস্মাৎ তিনি একপাশে গড়াইয়া পড়েন। তাঁহার গলায় ঘড় ঘড় শব্দ হইতে থাকে। নরেন তাড়াতাড়ি তাঁহার পা লেপে ঢাকিয়া ছুটিয়া সিঁড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়ে যান। এ দৃশ্য তিনি সহ্য করিতে পালিয়েছিলেন না। নাড়ি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আমরা সকলে ভাবিলাম, উহা সমাধি।"

সেই রাত্রেই দখিনেশ্বরে ঠাকুরের ভাইপো রামলালকে খবর দেওয়া হল। রামলাল এসে বলল " ব্রহ্মতালু গরম আছে, তোমরা একবার কাপ্তেন উপাধ্যায় কে খবর দাও।" তিনি তাড়াতাড়ি এসে বললেন .... মেরুদণ্ডে গব্যঘৃত মালিশ করলে চৌতন্যোদয় হবে। তিন ঘন্টার বেশি মালিশ করেও কোনো ফল হল না।

বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন ... পরদিন সকালে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার সর্বপ্রথম উদ্যানে উপস্থিত হন। অভেদানন্দের বর্ণনা অনুযায়ী , ডাঃ সরকার বেলা দশ ঘটিকায় এসে নাড়ি দেখে বলেন, " ঠাকুরের প্রান বায়ু নির্গত হয়েছে।" অনেক বিচার বিবেচনার পর স্বামী প্রভানন্দের মতামত .... ' ডাক্তার সরকার কাশীপুর পৌচ্ছান বেলা একটায়। ডাক্তার সরকারের দিনলিপি ...... " খাওয়া দাওয়ার পর প্রথমে ডাফ স্ট্রিটে যাই এক রোগী কে দেখতে, তার পর পরমহংসের কাছে। তিনি মৃত। গত রাত্রে একটার সময় তাঁর দেহাবসান হয়েছে । He was lying on the left side legs drawn up, eyes open, mouth partly open ....... এর পর লেখা ডাক্তার মহেন্দ্রলাল ছবি তোলার নির্দেশ দিলেন এবং নিজের চাঁদা হিসেবে দশ টাকা রেখে গেলেন।

বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্সের ছবি তোলা সম্বন্ধে অভেদানন্দের বর্ণনা ----- " রামবাবু নিজে খাটের সন্মুখে দাঁড়াইয়া নরেন্দ্রনাথ কে তাঁহার পার্শ্বে দাঁড়াইতে বলিলেন। আমরা সকলে নির্বাক হইয়া সিঁড়ির ওপরে দাঁড়াইলাম।  বেঙ্গল ফটোগ্রাফার দুইখানা গ্রুপ ফটো তুলিয়া লইলেন।" কাশীপুর মহাশ্মশানের উদ্দেশ্য তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল বিকেল ছ'টার পর।

১৬ই আগষ্ট ১৮৮৬ তারিখে তোলা বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্সের দুটি গ্রুপ ফোটোগ্রাফের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। মঠ মিশনের কতৃপক্ষ স্বাভাবিক কারণেই এই ছবি প্রচারে কোনোও দিন উৎসাহিত হননি। বৈকুণ্ঠনাথের মন্তব্য :: " পরিতাপের বিষয় , অত্যধিক লম্বা বশত প্রাতকালের সে জ্যোতির্ময় ভাবটি তখন অস্তমিত হইয়াছিল।"

সহজলভ্য না হওয়ায় এক সময় গ্রুপ ছবিটি সাইক্লোস্টাইল অবস্থায় বিক্রি হত। এক সময়ে চিরনিদ্রায় শায়িত রামকৃষ্ণের দেহ বাদ দিয়ে এই ছবি প্রচারিত হত। পরবর্তী সময়ে মার্কিন গবেষকেরা এই ছবিটি নিয়ে নানা ভাবে গবেষণা করেছেন এবং সেইমতো বিস্তারিত ক্যাপশন লিখেছেন। ঐতিহাসিক এই ছবিটির সব নায়কে শনাক্ত করা যায়নি। কারা সেদিন উপস্থিত ছিলেন এবং কারা ছবিতে স্থান পাননি , তা বোঝা এতদিন পরে খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। খুঁটিয়ে দেখলে কয়েকটি বালকের মুখও নজরে আসে। মার্কিন সম্পাদকরা ছবির বাঁ দিকে কিছু তোশক বালিশের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। তাঁদের ধারণা, এগুলি ঠাকুরের ব্যবহৃত।

আরও নানা খবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। স্বয়ং নরেন্দ্রনাথ নাকি ঠাকুরের মহাসমাধির পরে একবার গঙ্গায় ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন---- শোক সামলাতে পারছিলেন না। আরও অনেক কিছু ঘটেছিল সেদিন কাশীপুরে এবং মহাশ্মশানে। শিষ্যেরা দাসের পখ্যে ছিলেন না, তাঁরা চেয়েছিলেন সমাধি। বিবেকানন্দের এক চিঠিতে------ "ভগবান রামকৃষ্ণের শরীরে নানা কারণে অগ্নি সমর্পণ করা হয়েছিল। এই কার্য যে অতি গর্হিত তার আর সন্দেহ নাই। এখ্নে তাঁহার ভস্মাবশেষ অস্থি সঞ্চিত আছে। উহা গঙ্গা তীরে কোনো স্থানে সমাহিত করিয়া দিতে পারিলে উক্ত মহাপাপ হইতে কথাঞ্চিৎ বোধ হয় মুক্ত হইব।"

স্বামী অভেদানন্দ লিখছেন " নরেন্দ্রনাথ বলিল ' দ্যাখো , আমাদের শরীরই শ্রী শ্রী ঠাকুরের জীবন্ত সমাধিস্থল। এসো, আমরা সকলে তাঁহার পবিত্র দেহের ভস্ম একটু করে খাই আর প্রবিত্র হই।' নরেন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম কলসি হইতে অস্থির গুঁড়া ও ভস্ম গ্রহণ করিয়া ' জয় রামকৃষ্ণ' বলিয়া ভখ্ন করিল।"

১৬ই আগষ্টের বিকেল বেলার আরও অনেক বিবরণ পাওয়া যায় --------- সেদিন আকাশে "বর্ষা  মেঘের হাল্কা আবরন।….. মহাসমাধিস্ত মহাপুরুষের শরীর বাহিরে আনয়নপূর্বক এক বিস্তীর্ণ শয্যায় শয়ন করাইয়া আদ্র বস্ত্রে অঙ্গ পরিস্কার করিয়া দেওয়া হইল। অদ্য মনের সাধে জন্মের মত চন্দন পরা হইল।..... প্রভু আমার যেন ফুলশয্যায় শয়ন করিয়াছেন।" আর একজন রামকৃষ্ণ অনুরাগী " ট্রিবিউন " প্রত্রিকার সম্পাদক নগেন্দ্র নাথ গুপ্তের বিবরণ " তাঁর মাথার নীচে একখানি আর পা-দুখানির মাঝখানে আর একটি বালিশ ...... এক খন্ড মেঘ থেকে বড় বড় থানার বৃষ্টি ঝরে পড়ল। উপস্থিত সকলকে বলতে থাকলো এই ছচ্ছে পুরানকথিত স্বর্গ হতে ঝরে পড়া পুষ্প বৃষ্টি। সংবাদ প্রত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী , কলকাতা হইতে একশত , দেড়শত লোক যাইয়া আন্তোষ্টিকৃয়ায় যোগদান করিয়াছিল।"

স্বামী প্রভানন্দ লিখেছেন " এক ঘন্টার মধ্যে চিতা স্বকার্য সাধন করিয়া করিল । যখন চিতানল পূর্ন প্রভাবে জ্বালিতেছিল, ঠিক সেই সময় চিতার উপর গুলি গুলি বৃষ্টি হইয়াছিল।"  ঠিক কখন মহাসমাধি লাভ হইয়াছিল, তা নিয়ে সামান্য মতভেদের উল্লেখ করেছেন স্বামী প্রভানন্দ। ১৬ই আগষ্ট প্রাত: ১টা ২০ মিনিট। অন্য মতে ১টা ৬ মিনিট। সরকারের কাছে রিপোর্ট সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয়নি, বুড়োগোপাল এই রিপোর্ট দাখিল করেন তিনি দিন পর।

শ্মাশানে আরও অনেক কিছু ঘটেছিল। বিশেষ ভক্ত 'বসুমতী' পত্রিকার সতীশ মুখোপাধ্যায় কে শ্মাশানে সাপে কামরেছিল। আরও শোনা যায় , কেউ কেউ শ্মাশান থেকে অস্থি সঙগ্রহ করেছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন বুটে। সেগুলো নাকি এক সময় পূজো করা হত। নরেন্দ্রনাথের খুড়তুতো ভাই হাবু দত্ত (অমৃতলাল) পরবর্তী কালে একটা মালা পরতেন, যা নাকি শ্রীরামকৃষ্ণের পূতাস্থাতিতে তৈরি। এসব থেকেই আশঙ্কা হয় যে ঠাকুরের কিছু অস্থি আজও কোথাও কোথাও লুকিয়ে আছে।


রামকৃষ্ণদেবের শেষ শয্যা




**************************************+++++++++++++++++++++++++++++++++




১৬ অগস্ট  শ্রীরামকৃষ্ণ  বিদায় নিয়েছিলেন। 
রাত একটার কয়েক মিনিট পর শ্রীরামকৃষ্ণদেব চলে গেলেন। সেদিন ১৬ অগাস্ট সোমবার।

সকাল হল। খবর ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে।অনেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না শ্রীরামকৃষ্ণ দেব মারা গেছেন।অনেকে ভাবছিল সমাধি হয়েছে।

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের কাছে লোক গেল।
মহেন্দ্র ডাক্তার  এলেন বেলা একটা নাগাদ। 
শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে কিছুক্ষণ   অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, শবদাহের ব্যবস্থা কর।

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার  চলে গেলেন।
 দুমুর্খ ডাক্তার আর কার সঙ্গে ঝগড়া করবেন?
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল!পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করে বললেন, এই নাও। একটা ফটো তোলার ব্যবস্থা কর।বুকের কোথায় যেন একটা যন্ত্রনা হচ্ছে।জীবনে কাউকে তো কোনদিন  ভালবাসেননি।
সবাই বাইরেটাই দেখল।শুধু একজন চিনেছিল।

ডাক্তার সরকার ভাবলেন,আজ আর চেম্বারে  যাবেন না। আজ মহেন্দ্র ডাক্তারের  ঘরবন্ধ করে প্রাণভরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

আজ  আকাশ মেঘলা। তখন বিকেল পাঁচটা। 
দোতলা থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের দেহ নামিয়ে রাখা হল একটি পালংকে।অজস্র সাদা ফুলে দিয়ে সাজান সেই পালংকে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকে  শায়িত করা হল।
ভক্তরা শ্বেত চন্দন  মাখিয়ে দিল সেই শরীরে।
চারিদিকে সুগন্ধি ভেসে বেড়াতে লাগল।

শবযাত্রা এগিয়ে  চলল কাশীপুর মহাশ্মশানের দিকে।
বিবেকানন্দ ও তাঁর  গুরুভাইরা বিষাদমুখে এগিয়ে চলেছেন। আজ বিবেকানন্দ যেন রিক্ত হয়ে গেলেন।চোখ দিয়ে অশ্রু নামছে।সন্ন্যাসী বলে কি কাঁদতে নেই? ভক্ত ভৈরব গিরিশের চোখ কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে গেছে।তাঁর বকলমা নেওয়ার মানুষটি চলে গেলেন।

অনেক মানুষ সেই শবযাত্রায় হেঁটে চলেছেন।
এমন সময় আকাশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল। তবে কি আজ আকাশও কাঁদছে? 
কোন কোন ভক্ত বলতে লাগল,আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে।তারা সেই বৃষ্টির জল সারা শরীরে মাখতে লাগল পরম ভালবাসায়।

স্টার থিয়েটারের সমস্ত নট-নটী কলাকুশলী সবাই হাঁটছেন।তাঁদের মনের মানুষ আজ চলে গেলেন। 
 কলকাতার কোন বড় মানুষ তো তাদের  থিয়েটার দেখতে এলেন না। একমাত্র তিনিই তো আমাদের বুকে টেনে নিলেন। দূর থেকে কি বিনোদিনীর গান ভেসে আসছে,
" আমি ভবে একা/ দাও হে দেখা/
প্রাণসখা রাখো পায়। "
পরম সম্পদ আজ  হারিয়ে গেল  বিনোদিনীর!
বিনোদিনীর গান কি তখন দূর থেকে ভেসে আসছিল? 
" হরি মন মজায়ে  লুকালে কোথায়।"

সেদিন সেই শবযাত্রার মিছিলে একটি আশ্চর্য জিনিস দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল!
মিছিলে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই সর্বস্ব ত্যাগী  যুবক শিষ্যদের  এক একজনের হাতে রয়েছে হিন্দু ধর্মের ত্রিশূল ও ওঁকার, বৌদ্ধ ধর্মের খুন্তি, মোহম্মদীয় ধর্মের  অর্ধচন্দ্র এবং খ্রিষ্ট ধর্মের ক্রুশবাহিত পতাকা।
মৃত্যুর পরও তাঁরা ভোলেননি  
"যত মত তত পথ" -এর সেই কথা।

সর্বধর্মের প্রতীক নিয়ে  শবদেহের   এরকম মিছিল পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হয়ে রইল।

এই শ্রীরামকৃষ্ণ - বিবেকানন্দ কি  কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আদর্শ হতে পারেন? 
এটা কি আমরা ভাববো না?

শেষে, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর   রবীন্দ্রনাথ যে কবিতা স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত  " উদ্বোধন " পত্রিকায় লিখেছিলেন,  সেই কবিতা  দিয়ে আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা জানালাম,
" বহু  সাধকের 
বহু সাধনার ধারা
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তাঁরা।"
...
দেশবিদেশের 
প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার 
প্রণতি দিলাম আনি।"

Saturday, 15 June 2019

বেলুড় মঠের অজানা কথা।

বেলুড় মঠের অজানা কথা





বোধহয় একেই বলে ঠাকুরের ইচ্ছে। এমনই তাঁর মাহাত্ম্য। আজ যে বিস্তৃত ভূখণ্ডে বিশ্ববিখ্যাত বেলুড় মঠ, তারই অন্তত একাংশে একসময় চরণচিহ্ন এঁকে দিয়ে গিয়েছিলেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ স্বয়ং।
স্বামী বিবেকানন্দ মঠের জন্য ওই জমি কিনেছিলেন বিহারী ভদ্রলোক বাবু ভাগবৎনারায়ণ সিংয়ের কাছ থেকে। ছোট দুটি বাড়িসমেত ২২ বিঘা। ১৮৯৮ সালের ৪ মার্চ। তবে স্বামীজির জানা ছিল না যে, তারও আগে ওই জমিতেই ছিল ঠাকুরের গৃহী ভক্ত ‘কাপ্তেন’ বিশ্বনাথ উপাধ্যায়ের কাঠগোলা। সেখানেই একদা পদধূলি দিয়েছিলেন ঠাকুর। আমরা জানি, ঠাকুর মর্তলীলা সংরবণ করেন ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট। অর্থাৎ বেলুড়ে ওই জমি কেনার অনেক আগেই ঠাকুর সেখানে গিয়েছিলেন। যেন স্থায়ী মঠ স্থাপনের উদ্দেশ্যেই সেখানে ‘কুটোবাঁধা’ হয়ে গিয়েছিল। স্থায়ী মঠের জন্য অন্যত্র জমি সংগ্রহের সকল চেষ্টাই শেষাবধি ব্যর্থ হয়েছিল। এই ঘটনাকে দৈবনির্ধারিত ছাড়া কীইবা বলা যায়।

বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ছিলেন নেপালের রাজার ভারতে নিযুক্ত উকিল। রাজপ্রতিনিধিরূপেই তিনি কলকাতায় বাস করতেন। বেলুড়ে নেপালরাজের একটি কাঠগোলা ছিল। প্রথম দিকে বিশ্বনাথ উপাধ্যায় ওই কাঠগোলাতেই কর্মচারী নিযুক্ত হন। তখন শ্রীরামকৃষ্ণের সান্নিধ্যলাভমাত্রই তিনি ঠাকুরের পরম ভক্ত হয়ে ওঠেন। ঠাকুর তাঁকে আদর করে ‘কাপ্তেন’ ডাকতেন। কাপ্তেনের অনুরোধেই ঠাকুর বেলুড়ের ওই কাঠগোলা ঘুরতে যান।
ওই স্থান মাহাত্ম্য সম্পর্কে স্বামী গম্ভীরানন্দ এক স্থানে সারদা দেবীর মুখে বলেছিলেন,

‘‘আমি কিন্তু বরাবরই দেখতুম, ঠাকুর যেন গঙ্গার ওপরে এই জায়গাটিতে—যেখানে এখন (বেলুড়) মঠ, কলাবাগান-টাগান—তার মধ্যে ঘর, সেখানে বাস করছেন।’’

জমিটি সংগ্রহের পর শ্রীমা আরও বলেছিলেন, জমিটা ঠাকুরের ইচ্ছাতেই হল। মঠের জন্য জমিটা তিনিই নির্বাচন করে গিয়েছিলেন!

বেলুড়ে জমি তো কেনা হল। কিন্তু তা অসমতল। অতএব সেখানে মঠ নির্মাণ করতে একটু সময় লাগবে, তার তদারকিও দরকার। অতএব বেলুড়েই কাছাকাছি নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের বাগানবাড়ি ভাড়া নেওয়া হল। মঠ অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হল সেখানেই। বারাণসীর সমতুল গঙ্গার পশ্চিম তীরের এই বাড়িতেই শ্রীমা বসবাস করার সময় ছোট ছাদে পঞ্চতপা ব্রত করেছিলেন। সদ্য-কেনা কাপ্তেনের কাঠগোলার মঠভূমিতে ঠাকুরকে স্বামীজি প্রতিষ্ঠা করেন এই বাড়ি থেকেই। ১৮৯৮ সালের ৯ ডিসেম্বর স্বামীজি নতুন মঠের জমিতে শ্রীরামকৃষ্ণের ‘আত্মারাম’কে পুজো করে পায়েস নিবেদন করেন। আর সকাতরে প্রার্থনা করেন, ঠাকুর তুমি ‘বহুজনহিতায়’ এখানে স্থির হয়ে থেকো।
বেলুড় মঠে দাঁড়িয়ে গুরুভাইদের বিবেকানন্দ সেদিনই বলেছিলেন,

"কাশীপুরে ঠাকুর আমায় বলেছিলেন, ‘তুই কাঁধে করে আমায় যেখানে নিয়ে যাবি, আমি সেখানেই যাব ও থাকব। তা গাছতলায় কি, আর কুটিরই কি।’ সেজন্যই আমি স্বয়ং তাঁকে কাঁধে করে নতুন মঠভূমিতে নিয়ে যাচ্ছি। নিশ্চয় জানবি, বহুকাল পর্যন্ত ‘বহুজনহিতায়’ ঠাকুর ওই স্থানে স্থির হয়ে থাকবেন।

প্রত্যেক ভক্ত ঠাকুরকে আপন বুদ্ধির রঙে রাঙিয়ে এক-এক জনে এক-এক রকম দেখে ও বোঝে। তিনি যেন মহাসূর্য, আর আমরা যেন প্রত্যেকে এক-এক রকম রঙিন কাচ চোখে দিয়ে সেই একই সূর্যকে নানা রং-বিশিষ্ট বলে দেখছি। এটি ঠিক সেই ভাবের কেন্দ্রস্থান হবে। এখান থেকে যে মহাসমন্বয়ের উদ্ভিন্ন ছটা বেরবে তাতে জগৎ প্লাবিত হয়ে যাবে। ঠাকুরের ইচ্ছেয় আজ তাঁর ধর্মক্ষেত্র প্রতিষ্ঠা হল। বারো বছরের চিন্তা আমার মাথা থেকে নামল। আমার মনে এখন কী হচ্ছে জানিস? এই মঠ হবে বিদ্যা ও সাধনার কেন্দ্রস্থান। ... সময়ে সব হবে। আমি তো পত্তন-মাত্র করে দিচ্ছি। এর পর আরও কত কী হবে !"

জীবনের উপান্তে এসে স্বামীজি বলেছিলেন,

"আমি যে নিষ্কর্মা সাধু হয়ে থাকিনি, সে বিষয়ে অন্তর থেকে আমি নিঃসন্দেহ। প্রাণ ঢেলে খেটেছি। আমার কাজের মধ্যে সত্যের বীজ যদি কিছু থাকে, কালে তা অঙ্কুরিত হবেই।"

শ্রীশ্রীমাও এই মঠভূমি দেখতে এসেছিলেন। তাই পরে তিনি বলেছিলেন, অত্যন্ত শান্ত জায়গা বেলুড়ে তিনি খুব ভালো ছিলেন। তাঁর ধ্যান লেগেই থাকত। তাই ওখানে একটি ‘স্থান’ করতে নরেনের ইচ্ছে হয়েছিল।

শ্রীরামকৃষ্ণ নির্দেশিত পথে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ গঠন করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। ১৮৮৬ সালে। অর্থাৎ ঠাকুর যে-বছর দেহসংবরণ করলেন সে-বছরই। বরাহনগরের এক জীর্ণ বাড়িতে। যা ‘বরাহনগর মঠ’ নামে রামকৃষ্ণ-সাম্রাজ্যে সুপরিচিত। সুদীর্ঘ ৩৪ বছর এই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘকে লালিত ও পালিত করেছেন সঙ্ঘজননী সারদা দেবী। সেই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের বাস্তব রূপ দিলেন স্বামী বিবেকানন্দ বাগবাজারে বলরাম মন্দিরে ১৮৯৭ সালের ১ মে। নাম হল রামকৃষ্ণ মিশন। আর বরাহনগর মঠ রূপান্তরিত হল ‘রামকৃষ্ণ মঠ’-এ। এই বরানগরে থাকতেই বিবেকানন্দের মন ঠিক করে নিয়েছিল স্থায়ী মঠ ঠিক কোথায় হবে। বরাহনগর খেয়াঘাটে দাঁড়িয়ে তিনি একদিন গুরুভাইদের বলেছিলেন, আমার কেন যেন মনে হচ্ছে গঙ্গার ওপারে কাছেপিঠেই আমাদের স্থায়ী মঠটি হতে চলেছে।

বেলুড় মঠের জমি কেনার পর স্বামীজি সওয়া চার বছর জীবিত ছিলেন। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যেই তিনি মঠ প্রতিষ্ঠার মূল কাজগুলি সাঙ্গ করে গিয়েছিলেন। মিশন তৈরির পর তার কলকাতা কেন্দ্রের ভার দেওয়া হয়েছিল স্বামী ব্রহ্মানন্দকে। অন্যদিকে, ১৮৯৮ সালে বেলুড়ে নতুন মঠ নির্মাণের কাজ শুরু হলে তার দায়-দায়িত্বও ব্রহ্মানন্দের ওপর ন্যস্ত হল। পরের বছর আলমবাজার থেকে বেলুড়ে নতুন বাটিতে মঠ উঠে আসার পর বেলুড় মঠ পরিচালনার ভারও তাঁকে নিতে হল। অবশেষে ১৯০০ সালের আগস্টে দলিল তৈরি করে মঠের যাবতীয় বিষয়-সম্পত্তি স্বামীজি গুরুভাইদের হাতে তুলে দিলেন। আর ১৯০১ সালের গোড়ার দিকে মঠ ও মিশনের সাধারণ সভাপতির আসন ত্যাগ করলেন স্বামীজি। অতঃপর স্বামী বিবেকানন্দের স্থলাভিষিক্ত হলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দ। ঠাকুর বলেছিলেন,

‘রাখাল একটা সাম্রাজ্য চালাতে পারে।’

বিবেকানন্দ এবং তাঁর গুরুভাইরা রাখাল মহারাজের উপর ঠাকুরের এই অগাধ আস্থার কথা ভোলেননি। মঠ কী আকার নেবে স্বামীজি তা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন অপর গুরুভ্রাতা স্বামী বিজ্ঞানানন্দকে, পূর্বাশ্রমে যিনি ছিলেন একজন দক্ষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। মন্দিরের প্রতীক স্বামীজি তৈরি করার পর মন্দিরের নকশা স্বামীজির তত্ত্বাবধানে তৈরি করেছিলেন বিজ্ঞানানন্দজি।

স্বামীজি শুধু এক বাগ্মী হিন্দু সন্ন্যাসী ছিলেন না, একই সঙ্গে ছিল তাঁর শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান সমাজ রাজনীতি দর্শন প্রভৃতি সম্পর্কে অত্যন্ত আধুনিক চিন্তা চেতনা। ভারত এককালে ছিল শিল্পের দেশ। কিন্তু স্বামীজির জীবদ্দশায় ভারতের শিল্পচেতনা লুপ্তপ্রায় হয়ে এসেছিল। দেশের এই হতশ্রীদশা তাঁকে নিরন্তর আহত করত। তাই সঙ্কল্প করেছিলেন, বেলুড় মঠের ভেতর দিয়েই ভারতীয় শিল্পচেতনা বিকাশের পুনর্নবীকরণ করবেন। সাহেবদের শিল্পভাবনার হুবহু নকল করে বেলুড় মঠ নির্মিত হবে না—যা তৎকালীন ভারতের এক ব্যাধি হয়ে উঠেছিল। বেলুড় মঠের প্রতীক ও নকশায় আমরা স্বামীজির ওই দেশজ এবং মিশ্র শিল্পভাবনার সমন্বয়ের প্রতিফলনই প্রত্যক্ষ করি। বেলুড়ে বর্তমান মন্দিরটির উদ্বোধন হয় ১৯৩৮ সালের ১৪ জানুয়ারি পৌষ সংক্রান্তির দিন। মঠের তৎকালীন অধ্যক্ষ স্বামী বিজ্ঞানানন্দ নতুন মন্দিরে ঠাকুরকে স্থাপন করেন। মঠের পুরনো মন্দির থেকে বুকে করে আত্মারামকে নিয়ে এসে নবনির্মিত মন্দিরে ঠাকুরের মূর্তির সামনে রেখে প্রার্থনা করেন। সেইসময় তিনি প্রত্যক্ষ করেন স্বামীজিসহ তাঁর অন্য গুরুভাইরা সূক্ষ্ম শরীরে উদ্বোধন দেখতে মন্দিরে উপস্থিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য যে, ১৯২৯ সালের ১৩ মার্চ শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথিতে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের দ্বিতীয় অধ্যক্ষ স্বামী শিবানন্দ মন্দিরের ভিত্তিপ্রতিষ্ঠা করেন। তবে, পরে মন্দির গড়ে তুলতে গিয়ে তার স্থান সামান্য পরিবর্তন করার প্রয়োজন হয়। তাই ১৯৩৫ অব্দের গুরুপূর্ণিমাতে সেই তাম্রফলকটি সরিয়ে দ্বিতীয়বার স্থাপন করেন স্বামী বিজ্ঞানানন্দ। পরের বছর ১০ মার্চ থেকে মন্দিরের নির্মাণ কাজ আরম্ভ হয়। ঠিক ছিল যে ১৯৩৭ সালে জগদ্ধাত্রী পুজোর দিন মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ শেষ হবে। কিন্তু গর্ভমন্দিরের কাজ শেষ করতে কিছুটা দেরি হওয়ায় তিনি দুঃখ পেয়ে বলেছিলেন,

‘তোমরা বাপু বড় দেরি কর! স্বামীজি মন্দিরের প্ল্যান করেছিলেন, কিন্তু তাঁর সময়ে মন্দির হয়নি। রাজা মহারাজা চেষ্টা করেও পারেননি। মহাপুরুষ মহারাজ ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেও পারলেন না। সবাই একে একে চলে গেলেন। তাই বলছি, যত শীঘ্র পার তোমরা কাজ শেষ করে নাও, আর দেরি কোরো না।’

বিজ্ঞানানন্দজির কথার তাৎপর্য উপলব্ধি করলেন সকলে। তাই নাটমন্দিরের কাজ সমাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা না-করেই ১৯৩৮-এর ১৪ জানুয়ারি গর্ভমন্দিরে ঠাকুরের মর্মরবিগ্রহ স্থাপনসহ মন্দির প্রতিষ্ঠার কাজ সমাপনের সঙ্কল্প নেওয়া হল। সেদিন নতুন মন্দিরে আত্মারামের কৌটা স্থাপনের পর স্বামী বিজ্ঞানানন্দ নিজ কক্ষে ফিরে গিয়ে স্বামীজির উদ্দেশে বলেছিলেন,

‘স্বামীজি, আপনি ওপর থেকে দেখবেন বলেছিলেন। আজ দেখুন, আপনারই প্রতিষ্ঠিত ঠাকুর নতুন মন্দিরে বসেছেন।’

বিজ্ঞানানন্দ মহারাজ আরও ‘স্পষ্ট’ দেখতে পেয়েছিলেন যে, স্বামীজি, রাখাল মহারাজ, মহাপুরুষ মহারাজ, শরৎ মহারাজ, হরি মহারাজ, গঙ্গাধর মহারাজ প্রমুখ সকলেই দাঁড়িয়ে আছেন। এর কিছুক্ষণ পরে তিনি স্বস্তির ও তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন এই বলে যে,

‘এবার আমার কাজ শেষ হল। স্বামীজি আমার ওপর যে কাজের ভার দিয়েছিলেন, সে ভার আজ আমার মাথা থেকে নেমে গেল।’

নাটমন্দির সমেত সমগ্র মন্দিরটি দৈর্ঘ্যে ২৩৫ ফুট আর প্রস্থে ১৪০ ফুট। দ্বিতল গর্ভমন্দিরটি ১১২ ফুট উঁচু। ঠাকুরের দেহাবশেষ যে তাম্রপাত্রে রক্ষিত ছিল সেই আত্মারামের কৌটা এবং ঠাকুরের ধ্যানমূর্তি নতুন মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপন করা হয়। উচ্চ যোগাবস্থায় স্থিত ঠাকুরের ধ্যানস্থ মূর্তিটির ভাস্কর ছিলেন গোপেশ্বর পাল। ঠাকুরের মূর্তিটি যাতে দূর থেকেও সকলে ভালোভাবে দেখতে পান, সেইরকমভাবেই সেটি ডম্বরু আকৃতির বেদিতে উঁচু করে বসানো হয়েছে। ঠাকুরের জন্মস্থান কামারপুকুরে যুগীদের শিবমন্দিরের আদলে বেদিটি তৈরি। বেদির সামনে ব্রাহ্মীহংসটি উৎকীর্ণ করা হয়েছিল ভারত বিখ্যার শিল্পী নন্দলাল বসুর নির্দেশমতো। নাটমন্দিরের সামনে প্রধান প্রবেশপথের ওপরের দিকে মঠ ও মিশনের প্রতীক স্থাপন করা হয়েছে।

মন্দিরের পেছন দিকে নীচের তলাটি ব্যবহার করা হয় নিত্যপূজার ভাঁড়ার হিসেবে। পূজার সরঞ্জামগুলি রাখা হয় মন্দিরের ভেতরের দেওয়ালে কয়েকটি কুলুঙ্গিতে। এর মধ্যে একটিতে রাখা হয় বাণলিঙ্গ শিব এবং একটিতে থাকে শ্রীমায়ের পবিত্র পদধূলি। আর দোতলার ঘরটি ঠাকুরের শয়নকক্ষ নামে চিহ্নিত হয়েছে। এখানেই সারা বছর সযত্নে রক্ষিত থাকেন আত্মারাম, যা বছরে তিনবার মন্দিরে নামিয়ে এনে মহাস্নান করানো হয়—স্নানযাত্রা, ঠাকুরের জন্মতিথি ও দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর দিন। ঠাকুরের ব্যবহৃত স্মারক দ্রব্যগুলি সযত্নে রক্ষিত একতলার ঘরে।

এখানে গর্ভমন্দির ও নাটমন্দির একসঙ্গে যুক্ত, যা সাধারণভাবে হিন্দুমন্দিরে দেখা যায় না, বরং খ্রিস্টীয় রীতিসম্মত। মন্দিরের গম্বুজগুলিতে মসজিদের ছাপ পাওয়া যায়। ছত্রীগুলির ধারে কামারপুকুরে ঠাকুরের বাসগৃহের আদল স্পষ্ট হয়। গম্বুজের স্থাপত্যরীতির সঙ্গে ওড়িশা মন্দিরস্থাপত্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নাটমন্দিরের বাঁকানো ছাদ ও বারান্দায় বৌদ্ধ গুহাশিল্পের কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরে প্রবেশপথের গোপুরমটি তৈরি করা হয়েছে অজন্তা ও ইলোরার রীতির আদলে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ হলেন ‘যত মত তত পথ’ নামক সবচেয়ে উদার ধর্মমতটির প্রবক্তা। বেলুড় মঠের শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরটিতে সেটিই বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে।

আমরা জানি, আমেরিকা, ব্রিটেনসহ সমগ্র পাশ্চাত্যে স্বামীজির কী বিরাট প্রভাব ছিল। রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠার সময়েও তাঁদের অনেকে কুণ্ঠাহীনভাবে স্বামীজির পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দু’জন হলেন ইংরেজ কন্যা কুমারী হেনরিয়েটা এফ মিলার এবং আমেরিকান শিষ্যা ওল বুল। বেলুড় মঠের জমি কেনার সময় তাঁরা অকৃপণ হাতে অর্থ সাহায্য দিয়েছিলেন। আর ছিল দেশবাসীরও প্রসারিত হাত। এঁদের সকলের সহযোগিতা ছাড়া আজ রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ এই উচ্চতার পৌছঁতে পারত কি না সংশয় রয়ে যায়। অনটনের কারণে স্বয়ং স্বামীজিরও এক সময় অভরসা ধরে গিয়েছিল। কিন্তু শশী মহারাজকে (স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ) টলানো যেত না। কিছু অর্থের সংস্থান করার জন্য তিনি সাময়িকভাবে স্থানীয় এক স্কুলে মাস্টারিও করেছিলেন। মঠকে নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতেন সুরেশ মিত্র ও বলরাম বসু। তাঁদের মৃত্যুর পরই অনটনটা যেন বেশি টের পাওয়া গিয়েছিল। বিদেশে বক্তৃতা করেও টাকা সংগ্রহের চেষ্টা করতেন স্বামীজি। গুরুভাইদেরও কেউ কেউ তীর্থে তীর্থে বেরিয়ে পড়েছিলেন। রসিদ কেটে চাঁদা আদায়ও চলত। খেতড়ির রাজাও কিছু টাকা দিয়েছিলেন। অর্থ সাহায্য এসেছিল মিস সাউটার, মিস জোসেফিন, মিস্টার স্টার্ডিসহ কিছু পশ্চিমি বন্ধু বা ভক্তদের কাছ থেকে। তবে যেখান থেকে যত টাকাই আসুক না কেন, স্বামীজির নির্দেশ ছিল, নির্দিষ্ট খাতের টাকা অন্যখাতে ব্যয় করা চলবে না।
এইভাবে স্বামীজির নেতৃত্বে রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ যখন এগিয়ে চলেছে, তখনই বিনা মেঘে বজ্রাঘাত! ১৯০২ সালের ৪ জুলাই স্বামীজি দেহত্যাগ করলেন। এই ঘোর দুঃসময়েও টলমল তরী যে যথার্থই কূলে ভিড়তে পেরেছিল তার জন্য সবচেয়ে বেশি কৃতিত্ব দিতে হবে সঙ্ঘজননী শ্রীমা এবং তাঁর দুই ভক্ত স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী সারদানন্দকে।
আরও একটি কথা উল্লেখ করা দরকার। রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন গোড়াতেই ঘোষণা করেছিল যে, তারা রাজনীতির সংস্রব মুক্ত। তা সত্ত্বেও পরাধীন ভারতের ব্রিটিশ সরকার এই মঠ ও মিশনকে যথেষ্ট সন্দেহের চোখে দেখত। ভাবত, এটা সন্ত্রাসবাদীদের আখড়া। তাদের সম্পর্কে বিরাট এক বিরূপ রিপোর্টও তৈরি করেছিল পুলিস।

প্রখ্যাত বিবেকানন্দ-গবেষক শঙ্করীপ্রসাদ বসু মন্তব্য করেছেন......."স্বামীজির কল্পনায় এই মন্দির ভারতবর্ষে শিল্পের নবজাগরণের গর্ভগৃহ।’

১৪ই জানুয়ারী, মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি।
শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবানুরাগীদের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
আজকের দিনেই বেলুড় মঠে ১৯৩৮ সালে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণদেবের নয়নবিমোহন মর্মর মূর্তিখানির শুভ প্রতিষ্ঠা ও তাঁর সার্বজনীন মন্দিরের শুভ দ্বারোদঘাটন হয়েছিল। ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের অন্যতম ত্যাগী পার্ষদ স্বামী বিজ্ঞানানন্দজী এই মন্দিরের শুভ উদ্বোধন করেন এইদিনে।
সে ছিলো এক আনন্দময় দিন। ভক্তগণ গাইতে গাইতে চলেছেন “এসেছে নতুন মানুষ…” আর সঙ্গে সাধু-ব্রহ্মচারীদের স্তোত্রগীতি।

মন্দিরটি শ্রীরামকৃষ্ণ প্রদর্শিত “যত মত তত পথ” এর বার্তা বহন করে। স্বামী বিবেকানন্দের ঋষিদৃষ্টিতে হয়েছিলো উদ্ভাসিত এই মন্দিরের রূপ। মন্দিরটিতে গর্ভমন্দির ও নাটমন্দির একসঙ্গে থাকায় মন্দিরটি চার্চের মতো দেখায়। মন্দিরের প্রধান প্রবেশদ্বার ও নাটমন্দিরের অভ্যন্তরের শ্রেণীবদ্ধ থামগুলি বৌদ্ধ-সংস্কৃতি বহন করে।  মন্দিরের গম্বুজগুলি মসজিদের কথা মনে করিয়ে দেয়। মন্দিরের সম্মুখভাগের দক্ষিণদিক থেকে দেখলে সমগ্র মন্দিরটি ওঁ-কারের মত মনে হয়।

গর্ভমন্দিরের মধ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ-মূর্তিটি ভাস্কর গোপেশ্বর পাল নির্মিত। এটি তাঁর অনেক সাধনার ফসল। মূর্তি তৈরীর ক্ষেত্রে রামকৃষ্ণের সামনে দিকের ছবিটুকুই ছিল তাঁর সম্বল, তিনি রামকৃষ্ণের চর্মচক্ষে দর্শন পাননি, মানসলোকে শ্রীরামকৃষ্ণ বিচরণ করেছেন তাঁর। মূর্তিটি তাই এত নিখুঁত। শ্বেত পাথরের বেদীখানি ডম্বরু আকৃতির যা ত্যাগের প্রতীক। বেদীতে হংসের প্রতীক আছে যা পরমহংসের প্রতীক।

এই মন্দিরের নকশাটি স্বামী বিজ্ঞানানন্দজী মহারাজ তাঁর গাঢ় অধ্যাবসায় দিয়ে করেছিলেন এবং স্বামী বিবেকানন্দ স্বয়ং সেটি দেখে মুগ্ধ হয়ে সানন্দে অনুমোদন করেছিলেন। বলাবাহুল্য, বর্তমান মন্দিরের আগের সাতটি নকশা বিজ্ঞানানন্দ মহারাজ স্বামীজীকে দেখান এবং মনোনীত না হওয়ায় যেগুলি স্বামীজী নাকচ করে দিয়েছিলেন। স্বামী বিবেকানন্দের ইচ্ছে ছিল মন্দিরটির মধ্যে সব ধর্মের চিহ্ন থাকবে। শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মনিরপেক্ষ ধর্মসমন্বয় প্রতিফলিত হবে মন্দির গাত্রে। অবশেষে এই বর্তমান মূল মন্দিরের নকশা দেখে স্বামীজী সন্তুষ্ট হন ও আনন্দ মনে অনুমোদন করেন। তবে স্বামীজী চিহ্নিত স্থানে মন্দির তৈরী করা যায়নি। সামান্য সরে জমি নির্বাচন করা হয়। মন্দিরে ভারতীয় ও পাশ্চাত্য শিল্পকলার ছাপ আছে একইসঙ্গে।  মন্দির তৈরীর  কাজের দায়িত্ব নেয় কলকাতার মার্টিন বার্ণ কোম্পানি। ব্যয় হয় প্রায় আট লক্ষ টাকা। এই অর্থের অধিকাংশ বহন করেছিলেন দুজন ভক্ত। তাদের নাম - মিস্ হেলেন রুবেল ও মিসেস আন্না উরষ্টার।

জানা যায়, শ্রীশ্রীঠাকুরের মূর্তি প্রতিষ্ঠার দিনে বিজ্ঞানানন্দ মহারাজ মূর্তি প্রতিষ্ঠার পরে ওপরের দিকে হাত জোর করে বলেন, "স্বামীজী দেখুন, আপনার ইচ্ছা অনুসারে  ঠাকুর আজ এই মন্দিরে এসে বসেছেন।" পরে তিনি ভাবাবেগে সবাইকে জানান যে স্বামীজী, মহাপুরুষ মহারাজ ও ঠাকুরের অন্যান্য পার্ষদদের অনেকেই সেদিন সূক্ষ্মশরীরে সেই সময় গর্ভমন্দিরে মূর্তির প্রাণ প্রতিষ্ঠার সময় উপস্থিত ছিলেন।
মূর্তি প্রতিষ্ঠার সময় শুধু গর্ভমন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ মন্দির তৈরী হয়। শ্রীশ্রীঠাকুরের মূর্তিটি নির্মাণ করেছিলেন ভাস্কর গোপেশ্বর পাল।

কাশীপুরে একটি ভাড়া-করা বাড়িকে লক্ষ্য করে স্বামী বিবেকানন্দ ‘আমাদের প্রথম মঠ’ বলেছিলেন। যে বাড়িতে ঠাকুর তাঁর মর্তলীলা সংবরণ করেছিলেন। রামকৃষ্ণ ভাবান্দোলন এখানে ঠাকুরকে কেন্দ্র করেই দানা বেঁধেছিল। পরে বরাহনগর, আলমবাজার হয়ে তা বেলুড়ে পৌঁছায়। এই পর্বে আন্দোলনটি আবর্তিত হয়েছে বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরুভ্রাতাদের মাধ্যমে। ঠাকুরের গৃহীভক্ত সুরেশচন্দ্র মিত্রের আগ্রহে ও পরামর্শে বরাহনগর মঠ স্থাপিত হয়েছিল। অর্থাৎ দক্ষিণেশ্বর তপোবন যদি হয় রামকৃষ্ণ ভাবধারার গোমুখ, তবে বেলুড় হল তার গঙ্গোত্রী। শতাধিক বর্ষকালব্যাপী প্রবাহিত সেই অমৃতধারা বেলুড় মঠের মধ্য দিয়েই মানবমুক্তির পথে এগিয়ে চলেছে।

অকালমৃত্যু ও অকালবার্ধক্যের এই দেশে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কোন শক্তির বলে এমন কালজয়ী হল, তা একালের ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে রীতিমতো কৌতূহলের বিষয়। অন্যের অর্থ গ্রহণ ও পূর্ণ স্বচ্ছতা বজায় রেখে তা সুষ্ঠুভাবে ব্যয়। এমপাওয়ারমেন্ট বা ক্ষমতাপ্রদানের মাধ্যমে সংগঠনের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত রাখা। সংগঠনটি আরও দেখিয়ে চলেছে প্যাশন বা আবেগ, মোটিভেশন বা উৎসাহ, কঠোর পরিশ্রম, নির্মোহ হয়ে সবার জন্য উন্নয়ন চিন্তা কতখানি ফলপ্রসূ। বিবেকানন্দের হাতে-গড়া এই সংগঠন দেখিয়ে চলেছে—নিজের মোক্ষ, জগতের মঙ্গল এবং একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের শৃঙ্খলা—তিনটি আপাত বিপরীতধর্মী শক্তির সমন্বয় কীভাবে করা সম্ভব। সব মিলিয়ে সাহিত্যিক শংকরের মনে হয়েছে যে, রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন হল এক ম্যানেজমেন্ট-বিস্ময়।

ভারত এবং বহির্ভারত মিলিয়ে রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের মোট শাখা আজ ১৮০টি! বেলুড় যার প্রাণকেন্দ্র। ১৯৯৩ সালের ৮ অক্টোবর ইউনেস্কো বিল্ডিংয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও বিদ্বজ্জনদের এক সমাবেশ হয়। সেদিন ইউনেস্কোর ডিরেক্টর জেনারেল ডঃ ফ্রেডেরিকো মেয়রের একটি উক্তি এই প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য,

‘১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ যে রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপন করেছিলেন তার সংবিধানের সঙ্গে ১৯৪৫ সালে তৈরি ইউনেস্কোর সাদৃশ্য দেখে আমি খুবই বিস্মিত হই। উন্নতির লক্ষ্যে উভয়েরই যে কর্মপ্রচেষ্টা, তার কেন্দ্রে রয়েছে মানুষ।’

  (সংগৃহীত)

























পুরোনো বেলুড়মঠে ঠাকুর


Thursday, 6 June 2019

শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ ও শ্রী রামকৃষ্ণ মিশন, মালদা।

শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ ও শ্রী রামকৃষ্ণ মিশন, মালদা। মঠ আরম্ভ হয় ১৯২৪ সালে আর মিশন আরম্ভ হয় ১৯৪২ সালে। নিত্য পূজা,  ভজন, রামনাম সঙ্কী'তন ছাড়াও ‌দূরগাপূছা, কালী পূজা, শ্রী রামকৃষ্ণের , মা শ্রী সারদাদেবীর ও স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম দিন পালন করা হয়। উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, জুনিয়ার বেসিক স্কুল, লাইব্রেরী, ছাত্রাবাস, ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার, ডাক্তার খানা ও আরও নানা ধরনের সমাজসেবা মূলক কাজ পরিচালনা করা হয়। ২০১৯ সালে  উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্লাটিনাম জুবলি পালন করা হবে।







Tuesday, 14 May 2019

রামকৃষ্ণ মঠ, শ্যামপুকুর বাটী, শোভাবাজার, কলকাতা- ৪।

রামকৃষ্ণ মঠ, শ্যামপুকু্র বাটী, শ্যামপুকুর ষ্টীট, শোভাবাজার, কলকাতা - ৪।

সেকালের প্রাচীন সুতানটির প্রাণকেন্দ্র ছিল শ্যামপুকুর। বাঙালি সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের প্রাণকেন্দ্র। হুগলি নদীর কতগুলি ঐতিহ্যবাহী ঘাট এই অঞ্চলেই অবস্থিত। শ্যামপুকুর বাটী উত্তর কলকাতার এই শ্যামপুকুর অঞ্চলে অবস্থিত। এটি হল রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একটি শাখা কেন্দ্র। ক্যান্সার ধরা পড়ার পর কলকাতায় চিকিৎসা করানোর জন্য ১৮৮৫ সালের ২রা অক্টোবর ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে দখিনেশর থেকে ৫৫ নং শ্যামপুকুর ষ্টীটের এই বাড়িতে এনে রাখা হয়। ঠাকুরের সাথে সারদা দেবী, স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যান্য শিষ্যরাও এই বাড়িতে থাকতেন। প্রায় দুই মাস থাকার পর, ১১ই ডিসেম্বর তিনি এই বাড়ি ছেড়ে চলে যান কাশীপুর উদ্যান বাটীতে।

১৮৮৫ সালের ৬ই নভেম্বর ছিল কালীপুজো। ঠাকুর সেই দিন রাতে কালীপুজোর আয়োজন করতে বলেছিলেন। সমস্ত উপাচার জোগাড়ের পরেও তিনি কালীপুজো করছেন না দেখে গিরিশচন্দ্র ঘোষ প্রমুখ শিষ্যরা তাঁর শরীরেই কালীর পূজো করেন। এই সময় তিনি উঠে দাঁড়িয়ে কালীর মত বর ও অভয় মুদ্রা প্রদর্শন করেন। রামকৃষ্ণ ভক্ত মন্ডলীতে এই ঘটনা "বরাভয় লীলা" নামে পরিচিত।

বর্তমানে শ্যামপুকুর বাটী বেলুড় মঠের অধীনস্থ একটি মঠ কেন্দ্র ও রামকৃষ্ণ মন্দির। যে ঘরে রামকৃষ্ণদেব থাকতেন, সেই ঘরটি এখন ঠাকুর ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়। যে ঘরে সারদা মা থাকতেন, সেই ঘরটিকেও ঠাকুর ঘরে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এই বাড়িতে ঠাকুরের ব্যবহৃত কিছু জিনিস ও কয়েকটি ছবি রাখা আছে। অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে রয়েছে সেই ক্যামেরার কয়েকটি অংশ, যেটি দিয়ে প্রথম রামকৃষ্ণদেবের ছবি তোলা হয়েছিল।








Sunday, 12 May 2019

রামকৃষ্ণ মঠ, ময়ালবন্দি পুর, ইছাপুর, হুগলি।

রামকৃষ্ণ মঠ, ইছাপুর,  ময়াল বন্দিপুর, হুগলি।১৯৯৪ সালের ২১ আগষ্ট হুগলি জেলার প্রত্যন্ত ইছাপুর গ্রামে স্থানীয় অধিবাসীদের চেষ্টায় এই মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পাষ'দ শ্রী রামকৃষ্ণাননদের জন্মস্থান। যিনি শশী মহারাজ নামে পরিচিত। শ্রী রামকৃষ্ণাননদ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের সরাসরি শিষ‍্য। তার গুরুভক্তির জন্য তিনি বিশেষ পরিচিত। টানা ১২ বৎসর বরাহনগর মঠে সেবা করেন।
মঠের প্রথম প্রেসিডেন্ট স্বামী নি'লিপতাননদজী মহারাজের প্রচেষ্টায় এই মঠ আস্তে আস্তে উন্নতি সাধন করে। দৈনিক পূজা ও প্রার্থনা ছাড়াও শ্রী রামকৃষ্ণদেব, সারদা মা, স্বামী বিবেকানন্দ ও শ্রী রামকৃষ্ণাননদের জন্ম তিথি পালন করা হয়। ফলহারিনী কালী পূজা ও অন্নপূর্ণা পূজা প্রবল ‌উৎসাহে উদযাপিত হয়। আশ্রমের ডাক্তারি পরিসেবা, শিক্ষা বি‌ষয়ক পরিসেবা ও জনসেবামূলক পরিসেবা উল্লেখযোগ্য।
এটি আরামবাগ থেকে প্রায় ২০.৪ কি মি  ও  তারকেশ্বর থেকে ৪১ কি মি দূরে।







আলমবাজার মঠ, আলমবাজার, অশোকগড়, কলকাতা-৩৫।

আলমবাজার মঠ, আলমবাজার, অশোকগড়, কলকাতা - ৩৫.

শ্রী রামকৃষ্ণ ভাবধারায় অনুপ্রাণিত মঠগুলির মধ্যে এটি দ্বিতীয় মঠ। ১৮৯২ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ১৮৯৮ সাল পর্যন্ত এটিই প্রধান কার্যালয় ছিল। এরপর প্রধান কার্যালয় বেলুড়ে স্থানান্তরিত হয়।

শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের অসুস্থতার কারণে কাশীপুরের একটি উদ্যান সহ বাড়ি মাসিক ৮০ টাকায় নেওয়া হয়েছিল। এই বাড়িতে থাকাকালীন ১৮৮৬ সালের ১ লা জানুয়ারি অসুস্থ শ্রী রামকৃষ্ণ তাঁর গৃহী ভক্তদের জন্য ভক্তদের সামনে কল্পতরু হন। আর এই বাড়িতে ১৮৮৬ সালের ১৬ আগস্ট মৃত্যু হয় শ্রী রামকৃষ্ণদেবের। তার অল্প কিছু দিন পরেই শ্রী রামকৃষ্ণদেবের " পূতাসথি" নিয়ে শিষ্যরা চলে আসেন বরানগরের একটি বাড়িতে যা পরে বরানগর মঠ নামে পরিচিত হয়। এই বাড়ি থেকে বিবেকানন্দ ভারত ভ্রমনে বেরোন, পরে চলে যান শিকাগো।

এরই কিছুকাল পরে কলকাতায় থাকা শ্রী রামকৃষ্ণদেবের অন্যান্য শিষ্যরা বরাহনগরের ঐ বাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলমবাজার অঞ্চলে রামচন্দ্র বাগচি লেনে একটি " ভূতুড়ে বাড়ি"-তে উঠে আসেন সাধন ভজনের জন্য। আমেরিকা ও ইউরোপ ভ্রমণ শেষে ১৮৯৭-এর ১৯ শে ফেব্রুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দ কলকাতায় ফিরে আলমবাজারের ঐ বাড়িতে ওঠেন। সে বাড়িই আজ আলমবাজার মঠ নামে পরিচিত।পরে এই মঠ বিস্মিতির আড়ালে চলে যায়। ১৯৬৮তে স্বামী অভেদানন্দের শিষ্য স্বামী সত্যানন্দ বাড়িটির খানিকটা অংশ উদ্ধার করে শ্রী রামকৃষ্ণদেবের নিত্যসেবা, পূজা ও জনকল্যাণমূলক কাজ আরম্ভ করেন। বর্তমানে ভারত সরকার এটিকে জাতীয় স্মারক হিসেবে ঘোষণা করেছেন ও বাড়িটি সম্পূর্ণ ভাবে উদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে এবং এখানে সরকারি সাহায্যের মাধ্যমে VIVEKANANDA CENTER FOR SPIRITUAL CULTURE স্থাপন করা হবে বলে স্থির করা হয়েছে।