Monday, 30 March 2020

শিব ঠাকুরের আপন দেশে

জয় বাবা ভোলানাথের জয়।

" শিব " শব্দের অর্থ ঞ্জান। আর ঞ্জান থেকেই মুক্তি। আমাদের ভারতবর্ষে রয়েছে বারটি বিখ্যাত শিব লিঙ্গ , যা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ হিসেবে পরিচিত। মুক্তি সন্ধানী মানুষ পরিক্রমা করে ফেরে সেই বারোটি তীর্থ। 


শিব লিঙ্গের উৎপত্তি সম্পর্কে শিবপুরান, স্কন্দপুরান, বামণপুরাণ, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ, কালিকাপুরাণ, পদ্মপুরাণ, নারদপঞ্চরাত্র, মহানির্বাণতন্ত এবং অন্যান্য পুরাণ ও উপপুরাণে অনেক বিবরন দেওয়া আছে। বিভিন্ন বর্ননার মধ্যে ঐক্য স্থাপন করে যা পাওয়া যায় ...........

মহাপ্রলয়ের মহাসমুদ্রে ব্রহ্মা উভয়েই ___ আমি সৃষ্টি, স্থিতি এবং সঙহার কর্তা এবং দেবতাদের মধ্যে প্রধান___ এই তর্কবিতর্ক থেকে ঘোরতর যুদ্ধে লিপ্ত হন। এ সময় ভগবান শশাঙ্কশেখর ভীষনাকার অনল স্তম্ভরূপে উভয় যোদ্ধা তথা ব্রহ্মা ও বিষ্নুর মধ্যস্তলে প্রলয় পয়োধিজলে আবির্ভূত হন। এই অতীন্দ্রিয় অগ্নিময় লিঙ্গ কোথা থেকে এল , তা নির্ণয় করার জন্য যুদ্ধ বন্ধ করে ব্রহ্মা ও বিষ্নু সচেষ্ট হলেন। ব্রহ্মা হঙ্সরূপ ধারন করে ওই লিঙ্গেস্তম্ভের উপর ক্রমশ উঠতে থাকেন। বহুকাল চেষ্টা করেও ওই স্তম্ভের শেষ কোথায় তা দেখতে পেলেন না।  আর ভগবান বিষ্ণু বরাহমূর্তী ধারন করে আরো অধোদেশে গিয়েও খুঁজে পেলেন না স্তম্ভের মূল কোথায়। বিষ্ণু স্বয়ং জ্যোতির্ময় লিঙ্গের সন্ধান করেছিলেন বলে এই কল্পের নাম হয় শ্বেতবরাহকল্প।




পুরাণ মতে , শ্বেতবরাহকল্পে ভূ-সৃষ্টির পর অতীত হয়েছে ১৯৫৫৮৮৯০৭৮ বছর। সুতরাং জ্যোতির্ময় লিঙ্গের এটাই আবির্ভাব সময় ধরা যেতে পারে। আর যে রাত্রিতে প্রথম প্রকাশ হয় ঐ জ্যোতির্লিঙ্গের, ভগবান সদাশিব সেই রাত্রিকে আখ্যা দিয়েছেন শিবরাত্রি। লিঙ্গরুপী মহাদেবই ব্রহ্ম, শিবলিঙ্গ ব্রহ্মেরই প্রতীক। গৌরীপট্টে শিব লিঙ্গ স্থাপন করে শিবপূজার বিধি। শিব ও শক্তির মিলিত শক্তি নিহিত আছে বাণলিঙ্গে। শক্তির প্রতিক যোনি যথা ত্রিকোণ চিহ্ন। 




শিব লিঙ্গ দু প্রকার --- অকৃত্রিম ও কৃত্রিম। স্বয়ম্ভূলিঙ্গ, বাণলিঙ্গ প্রভৃতি অকৃত্রিম লিঙ্গ। ধাতু মাটি পাথর দিয়ে গড়া লিঙ্গকে বলে কৃত্রিম লিঙ্গ। মে লিঙ্গের মূল পাওয়া যায় না বা স্থানান্তরিত করা যায় না তাঁকে বলে অনাদি লিঙ্গ। এছাড়া আর এক জাতীয় লিঙ্গ কে বলা হয় জ্যোতির্লিঙ্গ। 

ভারতবর্ষে জ্যোতির্লিঙ্গ আছে মোট বারোটি। মহাকালেশ্বর, সোমনাথ, ওঙ্কারেশ্বর, বৈজনাথ ( বৈদ্যনাথ) , নাগনাথ, রামেশ্বর, বিশ্বনাথ, ঘৃষ্ঞেশ্বর,‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌কেদারনাথ, ভীমাশঙ্কর, তর্্যম্বকেশ্বর ও মল্লিকার্জুন ---- শিবপুরাণে উল্লিখিত এই জ্যোতির্লিঙ্গগুলি সমাধিক আদৃত ও প্রসিদ্ধ।


উক্ত শিব লিঙ্গ গুলি স্বয়ম্ভূ ও জ্যোতিরলিঙ্গ। অকৃত্রিম লিঙ্গও বটে। তবে জ্যোতির্লিঙ্গ ঠিক কি বস্তু তা বলা শক্ত। প্রলয় পয়োধিজলে যে লিঙ্গের আবির্ভাব হয় তা জ্যোতির্লিঙ্গ। ওই লিঙ্গের শক্তি যে যে অনাদি লিঙ্গে সন্নিবীষ্ট আছে সেগুলিই জ্যোতির্লিঙ্গ।

সংসারীদের পুজোয় নিষিদ্ধ যে শিবলিঙ্গ 

সাদা শিবলিঙ্গ বা সাদা শিব এবং সাদা গনেশ গৃহীদের উপাস্য নয়। গৃহীরা এই বিগ্রহ পূজো করলে সংসার জীবনে নেমে আসে অশেষ দুর্গতি। 





শিবের প্রিয় খাবার 

বিস্ময়করভাবে শিবের অত্যন্ত প্রিয়  খাবার গুলি হল পুলিপিঠের, লাড্ডু, দই আর চিনি দিয়ে দুধ। তাঁর পছন্দের মেনুতে গাঁজা, ভাঙ, চরস, সিদ্ধি কোনোটাই নেই।

শিবের অতিপ্রিয় ফুল

শিবের অতিপ্রিয় ফুল আকন্দ ও ধুতরা। ভালবাসেন পদ্ম, দুর্বা, বেলপাতা ও কুমকুম। কুন্দ (কুদফুল) , যূথী, নবমল্লিকা, কেতকী, রক্তজবা, মালতী, শিউলি, বকুল জাতীয় ফুল শিব মোটেও পছন্দ করেন না। এই ফুল দিয়ে পূজো করলে শিব পূদকের উপর যারপরনাই অপ্রসন্ন হন।

হর হর মহাদেব
শিবের সাতটি জিনিসের মহাত্ব্য :: 



১) সাপঃ সর্প হচ্ছে সদা জাগ্রত থাকার প্রতীক। যদি আপনার গলায় একটি সাপ প্যাঁচানো থাকে, তাহলে আপনি কিছুতেই
ঘুমাতে পারবেন না।
২) ভষ্মঃ এটা জীবনের অনিত্যতাকে স্মরন করিয়ে দেয়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদেরও একদিন ভষ্মে পরিণত হতে হবে।
৩) চন্দ্রঃ চন্দ্র সর্বদাই মনের সাথে সম্পর্কিত। এটি জীবনের সকল পরিস্থিতিতে সুখী থাকা এবং মনের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রতীক।
৪) ডমরুঃ এটা দেখতে ইনফিনিটি চিহ্নের মত। যা শিবের অসীম তথা উন্মুক্ত চিন্তাচেতনার প্রতীক।
৫) ত্রিশুলঃ শিব প্রকৃতির তিনগুন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন, এটি তারই প্রতীক। তিনি এটির মাধ্যমে সকলকে নিজ নিজ ধর্ম
পালনে উৎসাহিত করে থাকেন।
৬) নীলাভ শরীরঃ আকাশ অন্তহীন, শিবও তেমনি অন্তহীন। নীলাভ শরীর অন্তহীন আকাশের মতই শিবের অন্তহীনতা
তথা অসীমতার প্রতীক।
৭) গঙ্গাঃ গঙ্গা নিষ্কলুষ জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে। যখন শিবের মতই আমাদের হৃদয় স্থির হয়, তখনই তাতে নিষ্কলুষ জ্ঞান প্রবাহিত হয়।
💥💥💥💥💥💥💥

🕉️ হর হর মহাদেব 🕉️








 দ্বাদশ জ্যোতিরলিঙ্গের মহাত্ম্যকথা ::


মহাকালেশ্বর দর্শনে …. আয়ুবৃদ্ধি হয়। মহাকালই একমাত্র ভারতের দক্ষিণামুখী জ্যোর্তীলির্ঙ্গ শিবের বিগ্রহ।  শিবপুরাণেই উল্লিখিত হয়েছে, ' মহাকালেশ্বর দর্শন করলে স্বপ্নেও আর দুঃখ হয় না। যে যা কামনা করে সেবা করে মহাকালেশ্বর তাকে সেই ফল দান করে থাকেন। যে পুরুষ বা নারী শিপ্রা নদীতে স্নান করে মহাকালেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শন করে, তার মৃত্যু ভয় থাকে না। মৃত্যুর পর তার সদগতি বা মুক্তি লাভ হয়। শিব রাত্রিতে এখানে মহাশৃঙ্গার আয়োজন করা হয়। মহাকালের পূজা ও দর্শন করলে আত্মীয় স্বজনদের অকাল মৃত্যু থেকে রক্ষা পাওয়া যায় এবং সংসারের সার্বিক কল্যাণ হয়। 



কেদারনাথ দর্শনে ...... সমস্ত পাপস্খলন হয়। কেদারনাথ শিবসত্ত্ব ও রজোগুণে অধিস্ঠিত থাকেন সর্বদা। এই তীর্থে অবস্থান করে মানুষের রাজসিক প্রার্থনা পূর্ণ করেন। কেদারে শিব জীবের সমস্ত পাপস্খলন করে।


ঘৃস্নেশ্বর দর্শনে ...... মুক্তিলাভ, বঙশবৃদ্ধি, সুখ ও সমৃদ্ধিলাভ হয়। শিবপুরানে উল্লিখিত দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এবং সমাধিক আদৃত ও প্রসিদ্ধ। প্রতি বছর শিবরাত্রে মহারাষ্ট্রের হাজার হাজার তীর্থযাত্রীর সমাগম ঘটে এই পবিত্র মন্দিরে।

রামেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করলে..... মৃত্যুর পর শিবলোক প্রাপ্ত হয়। রামেশ্বরে গঙ্গাজল ঢেলে নিষ্কাম হয়ে ভক্তি প্রর্থনা করলে মানুষ মুক্তি লাভ করে। রামেশ্বরে মহাদেবের অভিষেক হয় গঙ্গোত্রীর জলে। দ্বাদশ অনাদি জ্যোতির লিঙ্গের অন্যতম রামেশ্বর মহাদেব। লৌকিক উচ্চতায় রামেশ্বর এক ফুট হবে।



তর্ম্বেকেশ্বর দর্শনে.….. বিবাহ সমস্যার সমাধান হয়। ভারতের দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম শৈবতীর্থ তর্ম্বেকেশ্বর। মহাদেবের একটি পঞ্চমুখবিশিষ্ট সোনার মুকুট আছৈ।  কতকালের প্রাচীন তা আজও অঞ্জাত।



সোমনাথ দর্শনে ...... সংসারে সুখ সমৃদ্ধি আসে।
ভারতের পশ্চিমে আরব সাগরের উপকূলেই সোমনাথ মন্দির। স্থান গুজরাট। সোমনাথ সয়ম্ভূ লিঙ্গ। মহাভারতে প্রভাসতীর্থ ও সোমদেবের সোমনাথ উপাসনার উল্লেখ আছে।

ওঙ্কারেশ্বর দর্শনে.…... পুণ্যলাভ হয়। স্কন্দপুরানের বর্ণনা এই রকম " বিশ্বেশ্বর বলিলেন, হে দেবী--- ওঙ্কারেশ্বর দর্শনে সকল পুণ্য লাভ হয়। " জ্যোতির্লিঙ্গ স্বয়ম্ভূ। তাই এই লিঙ্গের কোনও গৌরিপট্ট নেই। মন্দিরটি পাঁচ তলা। ওঙ্কারেশ্বরে  কোনোও মানুষ অন্নদান করলে সে মৃত্যুর পর শিবলোকবাসী হন।




বিশ্বনাথ দর্শনে ..... জাগতিক কামনা বাসনা পূর্ন হয়। কাশী বিশ্বনাথখেত্র। কাশীতে গঙ্গায় স্নান করা মাত্র মানুষের পূর্ব জন্মের পাপ খয় হয়। এখানে শিব রজো ও তমো গুনে বিরাজ করে মানুষের জাগতিক সমস্ত কামনা বাসনার পূর্ন করে থাকেন। মোখ্য বা মুক্তিদাত্রি এখানে দেবী অন্নপূর্ণা। তিনি নারায়নী শক্তি নিয়ে অধিষ্ঠান করছেন এখানে। কাশীতে জাগতিক ও পারমার্থিক সমস্ত বাসনা পূরণ করেন দেবী অন্নপূর্ণা। সত্ত্ব, রজো ও তমো গুনে বিরাজ করেন তিনি।




বৈদ্যনাথ দর্শনে...... রোগভোগ থেকে মুক্তি হয়। বৈদ্যনাথ ধামের সরকারি নাম দেওঘর। লঙ্কেশ্বর রাবণ শিবকে নিয়ে লঙ্কায় রাবার সময় শিব এখানে অবস্থান করেন এবং ক্রমশ মাটি ভেদ করে নিচে বসে যান। তখন রাবন‌ চেষ্টা করে শিবকে তুলতে না পেরে কর্ধোবশত মাথায় চাপ দিয়ে মাটিতে বসিয়ে দেন। তখন রাবনের হাতের আঙ্গুলের ছাপ পড়ে যায় মাথায়। দেওঘর তথা বৈদনাথ ধামে শিব তমোগুনে বিরাজ করেন। শিব "বৈদ্যনাথ " নামে মানুষের রোগ যন্তনার উপশম ও ব্যাধি মোচন করেন। দেওঘরে রোগ ব্যাধি মুক্তির প্রার্থনায় দ্রুত বললাম হয়।



মল্লিকার্জুন দর্শনে ....... দাম্পত্যজীবনে সুখলাভ হয়। অন্ধ্র প্রদেশে কৃষ্না নদীর দক্ষিণ তীরে জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম তৃতীয় লিঙ্গ মল্লিকার্জুন স্বামীর অবস্থান। শিবরাত্রি উৎসব এখানে প্রতিপালিত হয় মহাসমারোহে।





ভীমাশঙ্কর দর্শনে ...... শোক দুঃখ দূর হয়। বিল উপজাতির আদিপুরুষ বিলের আবিষ্কার দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গে অন্যতম এই সয়ম্ভূ লিঙ্গ। দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের এটি চতুর্থ লিঙ্গ। এখানকার বরণীয় উৎসব শিবরাত্রি। এই তীর্থ দর্শন করলে জাগতিক বিষয়ে যা কিছু দোষ, দুঃখ, শোক ও পাপ নাশ হয়।




নাগেশ্বর দর্শনে ...... মৃত্যুর পর আত্মা মুক্তি লাভ করে। দ্বারকখ থেকে ওঠার পথে দ্বাদশ শিবলিঙ্গের অন্যতম নাগনাথ শিবের অবস্থান। দ্বিমতে সর্পবেষ্টিত হওয়ায় নাগনাথ পরিচিত হন নাগেশ্বর নামে। নাগেশ্বর দর্শন করলে সর্পভয় থাকে না। মৃত্যুর পর সদগতি বা মুক্তি লাভ হয়।




শিব ঠাকুর বিশ্বজুড়ে..... সে সিন্ধু সভ্যতাই বা ডেনমার্ক বা জাপান।

জাপানে শিব **:** জাপানের সাত সৌভাগ্যের দেবতার মধ্যে দাইকোকুটেনের উৎস শিব বলেই মনে করেন অনেকে। ভাগ্য ও সম্পদের দেবতা রুপে পূজিত হন তিনি। মহাকাল শব্দের জাপানি প্রতিরূপ এই নাম। মহাকাল আবার শিবের বৌদ্ধ নাম। বুদ্ধতন্ততেও শিবের উল্লেখ রয়েছে। তাঁকে সেখানে উপায় বলা হয়েছে। শক্তি অভিহিত হয়েছে প্রঞ্জা নামে। বৌদ্ধতন্তে শিবকে নিষ্ক্রিয় এবং শক্তিকে সক্রিয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। দাইকোকুটেনের সঙ্গে " ভাগ্যচুরি "র পুরোনো রীতি রয়েছে। বলা হয়, যদি কেউ এই মূর্তি চুরি করেন এবং কাজটি করার সময় যদি ধরা না পড়েন তবে তিনি সৌভাগ্যের অধিকারী হবেন। দাইকোকুটেনের স্ত্রী হিসেবে রয়েছেন দাইকোকুনিয়ো, আঁধারের দেবী, মহাকালীর প্রতিরূপ। 





সেই পশুপতিনাথ ....... নেপালের পশুপতিনাথ মন্দির এশিয়ার পবিত্র স্থানগুলির অন্যতম। বাগমতীর নদীর তীরে অবস্থিত এই মন্দিরটি কাঠমান্ডু থেকে ৫ কিমি উত্তর-পূর্বে। ১৯৭৯ সালে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় এই মন্দিরটি। বিশাল এই মন্দির চত্বরে শুধু পশুপতিনাথেরই মন্দির নেই, তার সঙ্গে রয়েছে নানা মন্দির, আশ্রম আর ছবি। ২৭৫টি তামিল পাদল পেত্রা স্থলম তথা শিবস্থানের একটি হল এই মন্দির। শিব পুরাণ বলে এখানকার শিবলিঙ্গটি ভক্তদের যাবতীয় মনোবাসনা পূরন করে। পঞ্চচম শতকে লিচ্ছবি রাজ প্রচন্ড দেব এই মন্দিরটি তৈরি করেন বলে যানা যায়। কিন্তু তার আগেও মন্দির ছিল, কিন্তু সেটি উইপোকায় নষ্ট হয়ে যায়। তার পরেই এই মন্দিরটি গড়ে তোলেন প্রচন্ড দেব।



বুদ্ধের বড়দা ....... জাভা বা জম্বূদীপে ইসলাম ধর্ম আসার আগে শৈবধর্ম এবং বৌদ্ধধর্ম পরস্পরের ঘনিষ্ঠ ও মিত্রভাবাপন্ন ছিল। মধ্যযূগের ইন্দোনেশিয় সাহিত্যে বুদ্ধকে শিব ও জনার্দন তথা বীষ্ঞূর সঙ্গে সমার্থক করে দেখা হয়েছে। হিন্দু জনজাতি অধ্যুষিত বালিতে, বুদ্ধকে শিবের ছোট ভাই বলে বিশ্বাস করা হয়। হিন্দু ধর্মের আধিক্যের কারণে অনেক ধরনের মন্দির দেখতে পাওয়া যায় সেখানে। মন্দিরকে বলে পুর। পুর কাহিয়াঙ্গান দেশ, পুর কিহিয়াঙ্গান জগৎ ----এই দুই ধরনের মন্দিরে পূজো পান শিব, ব্রহ্মা ও বীষ্নুর সাথে। পুর দেশ হল ব্রহ্মার মন্দির, পুর পুসেহ বিষ্ঞুর মন্দির এবং পুর দালেম শিবের মন্দির।



ডেনমার্কেও যে! 
গুন্ডেস্টোর্প কলডর্ন ডেনমার্কে পাওয়া যায় বটে কিন্তু আসলে তৈরি থ্রেসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, শৃঙ্গ বিশিষ্ট এই ভগবানের রূপটি আসলে পশুপতিনাথেরই একটি রূপ। মানে শিবেরই একটি রূপ। মহেঞ্জোদড়োতে একটি সিলেট ঠিক এই রকমই একটি চিত্র পাওয়া গিয়েছে। কলড্রনের সঙ্গে তার আশ্চর্য সাদৃশ্য। পশুপতিনাথ ভগবান শিবেরই একটি রূপ। আখ্যরিক অর্থে ' পশুদের ভগবান' । হিন্দুরা সর্বত্র পশুপতিনাথকে ভক্তি করে।


ইন্দোনেশিয়ায় গুরু
বাতারা গুরু আর্থাৎ আমাদের শিব ঠাকুর। নামটা এসেছে সঙ্স্কৃত ভত্তারক থেকে। যার অর্থ, মহৎ প্রভু। এই বাতারা গুরু পূজিত হন ইন্দোনেশিয়ায়। সেখানকার হিন্দু সাহিত্যে যে গুরুদের কথা বলা হয়েছে , তাঁদের মধ্যে আদি এই বাতারা গুরু। ভারতীয় উপমহাদেশে দখিনমূর্তি শিবের মতো। তবে এই শিব তথা গুরু বাতারা ভারতীয় উপমহাদেশে শিব ঠাকুরের তাৎপর্যকে অনেকাংশেই ছাড়িয়ে গেছেন। তিনি শুধু শিবঠাকুর নন, তাঁর সঙ্গে মিশেছে ইন্দোনেশিয় বিভিন্ন আধ্যাত্মিক চেতনা, আধ্যত্মিকতার নানা দিক। সবই মিলিত হয়েছে বাতারা গুরুর তাৎপর্যে। তবে তাঁর স্ত্রী সেই প্রাচীন দেবী দুর্গাই। কখনও তিনি উমা, কখনও তিনি কালী। তেমন শিবও। সদাশিব, পরমশিব আবার মহাদেব।  তাঁর করুণাময় রূপ, সংহার রূপ কালভৈরব মহাকাল।



সিন্ধুপারে মে পশুপতিনাথ দেখা দেন 
সিন্ধু সভ্যতায় যে সিলমোহর গুলি পাওয়া গিয়েছিল, সেগুলির অন্যতম পশুপতি সিলমোহর। সিলমোহর গুলিতে পশুদের চিত্রের আধিক্য দেখা যায়। তবে এই সিলমোহরটি অন্যগুলির থেকে আয়তনে বড়। পদ্মাসনের ভঙ্গিতে বসে আছে একটি অবয়ব। পশু পরিবৃত। ঐতিহাসিকদের মতে এই মূর্তিই আদি শিবের প্রতীক। তাঁর তিনটি মুখ। যেন যোগাসনে বসে আছেন। মাথার উপরের দুইটি অর্ধবৃত্ত যেন দুটি শিঙ। এটি তেমন এক দিকে তার মধ্যে পশু ভাবকে প্রকট করেছে, তেমনই তাঁকে পশুদের রাজা তথা অধিপতি হিসেবেও চিহ্নিত করেছে। এছাড়া শিবের ত্রিশুলের সঙ্গেও পশুপতি চিত্রের মাথার তিনটি শিং-এর মিল আছে। আর শিবকে যে রূপে প্রথম থেকে এখনও অবধি কল্পনা করা হয়, সেই রোগী রূপেই তিনি এখানে প্রকাশিত------ মহাযোগী। ঐতিহাসিকদের মত , বাস্তবতই এই মূর্তি শিবের আদি রূপ  " পশুপতি"  র হতে পারে। কিন্তু এই মূর্তির বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে রুদ্র মূর্তির বৈশিষ্ট্যের ফারাক আছে বলে অনেকে মনে করেন। তাঁদের মতে, বেদের রুদ্র কিন্তু পশুদের রখ্খক বলে চিহ্নিত ছিলেন না। ফলে এই মূর্তির সাথে শিবের মূর্তির সম্পর্ক নেই। আবার অনেকের মতে, সিলেট থাকা মূর্তিটি মনুষ্যমূর্তি বা যোগীর নাও হতে পারে, বসা ষাড়ের ছবিও হতে পারে। বিতর্ক যায় থাকুক না কেন, বেশির ভাগেরই বিশ্বাস , এই মূর্তি আদতে শিবেরই আদিরূপ, পশুপতি তিনিই।






ব্রতরাজ দিব্য শিবরাত্রি মহিমা

শিবরাত্রি ব্রতকে ব্রতরাজ বলে এবং এই ব্রতের দ্বারা সদা ভোগ ও মোখ্য প্রাপ্তি হয়। শিবরাত্রি ব্রতটি হিন্দুদের কাছে অতি প্রবিত্ত ও মহান ব্রত। এই ব্রতটি শঙ্কর ভগবানেরও সবচেয়ে প্রিয় ও তৃপ্তিকারী। 

ঐকান্তিক নিষ্ঠা ও ভক্তিসহ শিবরাত্রিতে উপবাস, রাত্রিতে মহাদেবের পূজো এবং জাগরন ____ এই তিন কার্য করতে হয়। রাত্রিতে চারটি প্রহরে চারবার পূজো করতে হয়। এরপর ধ্যান, জপ, শিবপূজো, স্তবপাঠ করে রাত্রি জাগতে হয়। বিভিন্ন উপকরণ দ্বারা পূজো করলেও অধিক উত্তম ফল পাওয়া যায়। 

১) ধুতরা ফুল ও অখন্ড বেলপাতা দিয়ে পূজা করলে মহাদেব অতিব প্রসন্ন হন। তিনি পূজা করেন তিনি লাখ গো-দানের ফল পান এবং সব পাপ থেকে মুক্তি হয়ে শিবলোকে পূজিত হন।

২) মহাদেব স্বয়ঙ বলেছেন যে----- গন্ধ, পুষ্প, প্রণাম ও মুখবাদ্যের দ্বারা তাঁর পূজো করলে তিনি পূজকের প্রতি সদা অতি সন্তুষ্ট থাকেন।

৩) কেউ ঘি-এর প্রদীপ শঙ্করকে প্রদান করলে তিনি বিশেষ ফল পান।

৪) নিজের সব থেকে প্রিয় বস্তু দিয়ে শিব পূজো করলে মহাদেব অতীব প্রসন্ন হন ও তাকে বিশেষ ফল প্রদান করেন।

৫) পাকা আম ও কলা ফল হিসাবে শিবকে প্রদান করলে তিনি তুষ্ট হন ও মোখ্য দান করেন।

এই বিশেষ দিনটিতে নিষ্কাম বা সকাম মনোভাব নিয়ে যে ভক্ত এই মহান ব্রতটি পালন করেন সে তার ইচ্ছানুসারে ভোগ ও মুক্তি অবশ্যই লাভ করে। সকলের শরীরেই এই ব্রত পালন পরম মঙ্গলজনক।





কোন ধরনের শিবলিঙ্গ পুজো করলে কী ফল হয় 

মহানির্বানতন্তে স্বয়ঙ শিব পার্বতীকে বলেছেন, দেবী , যে ব্যাক্তি আগে আমার লিঙ্গের অর্চনা না করে অন্য দেবতার পূজো করে, তার পূজো কোনো দেবতারা গ্রহণ করেন না। 

পাথরে নির্মিত লিঙ্গ পূজো করলে মোখ্যলাভ ও আনুষঙ্গিক ভোগলাভ হয়। 
পার্থিব লিঙ্গ পূজো করলেও ভোগলাভ ও আনুষঙ্গিক মুক্তি লাভ হতে পারে। 
দারুময় লিঙ্গ ও বিল্ব-নির্মিত লিঙ্গ পূজো করলেও ওই একই ফল হয়।
পারদের শিবলিঙ্গ পুজোয় অতুল ঐশ্বর্য,
মুক্তার লিঙ্গ পূজো করলে সৌভাগ্য,
চন্দ্রকান্তমণি ( Moon Stone ) দিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে দীর্ঘায়ু লাভ হয়।
সুবর্ণময় লিঙ্গ পূজো করলে সমস্ত কাম্য বস্তু লাভ করতে পারা যায়।
হীরে, স্ফটিক, গুর বা অন্ন প্রভৃতি দিয়ে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করে পূজো করলে, জাগতিক সমস্ত কামনা পূর্ণ হয়।
গন্ধলিঙ্গ পূজো করলে মানুষের সৌভাগ্য বৃদ্ধি হয়।
( গরুড় পুরানের কথায়, দু ভাগ কস্তুরী, চার ভাগ চন্দন, তিনভাগ কুমকুম (জাফরান), চারভাগ কর্পূর---- এগুলো সব একত্র করে শিবলিঙ্গ নির্মাণ করলে তাঁকে গন্ধলিঙ্গ বলে।)
পূষ্পময় লিঙ্গ পূজো করলে মুক্তিলাভ হয়ে থাকে।
পলিমাটি দিয়ে নির্মিত শিবলিঙ্গে বিবিধ কামনা সিদ্ধ হয়।
লবণের লিঙ্গে পূজো করলে সুখ ও সৌভাগ্য লাভ হয়।
পাশ-নির্মিত (রজ্জু বা দড়ি) লিঙ্গ পূজো করলে উচাটন কার্য হয়ে থাকে। 
মূল দিয়ে  (বৃক্ষাদির গোড়ার নিচের অংশ বিশেষ, শিকড় ) তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে শত্রুখয় হয়।
ধূলো দিয়ে নির্মিত শিবলিঙ্গ ভক্তিপূর্বক কেউ পূজো করলে তিনি বিদ্যাধর পদ ( স্বর্গের গায়করূপে দেবযোনিবিশেষ) প্রাপ্ত হয়ে পরে শিবসদৃশ হন।
গোময় (গোবর) দিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে মানুষ লক্ষী লাভ করতে পারে।
যব, গোধূম (গম), ধান দিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজোয় লক্ষী লাভ, পূষ্টি  ও বঙশবৃদ্ধি হয়।
সিতাখন্ড (মধুজাত শর্করা) নির্মিত লিঙ্গ পূজো করলে আরোগ্য লাভ হয়।
লবণ হরিতাল (পারদযুক্ত পীতবর্ণ বিষাক্ত ধাতব পদার্থ বিশেষ) শুন্ঠী পিপ্পলী ও মরিচ মিশিয়ে তৈরি লিঙ্গ পূজো করলে বশীকরণ সিদ্ধ হয়। 
গব্যঘৃত নির্মিত লিঙ্গ পূজো করলে বুদ্ধির তীক্ষ্মতা হয়।
লবণ নির্মিত লিঙ্গ পূজো করলে সৌভাগ্য বৃদ্ধি হয়।
তিল পিষে তৈরি শিবলিঙ্গ পূজোয় সমস্ত কামনা সিদ্ধ হয়।
তুষের লিঙ্গে মরণ কার্য।
ভস্ম দিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে যাবতীয় অভিপ্রেত সিদ্ধ হয়।
গুড়ের শিবলিঙ্গ পুজো করলে প্রীতি বৃদ্ধি হয়।
গন্ধদর্ব্য ( চন্দনাদি ) দ্বারা নির্মিত লিঙ্গ পূজো করলে প্রভূত পরিমাণে গুনশালী হতে পারা যায়।
শর্করায় তৈরি শিবলিঙ্গ পূজোয় শত্রু সঙহার হয়ে থাকে।
কাঠের তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে দারিদ্র্য আসে।
দই দিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে পূজোয় কীর্তি লখ্মী ও সুখ সৌভাগ্য বৃদ্ধি হয়। 
ধানের তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে ধানলাভ হয়।
ফলের তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে বললাম হয়।
ফুলের তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে দিব্যভোগ ও পরমায়ু লাভ হয়।
ধাত্রীফলে নির্মিত শিবলিঙ্গ পূজো করলে মুক্তি লাভ হয়।
ননী দিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে কীর্তী ও সৌভাগ্য বৃদ্ধি হয়।
দূর্বাকান্ড দিয়ে প্রস্তত শিবলিঙ্গ পুজো করলে নিবারণ হয় অপমৃত্যু।
কপূর্রের তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে ভোগ ও মোখ্যলাভ হয়।
মুক্তা নির্মিত লিঙ্গ পূজোয় সৌভাগ্য উদয় হয়।
স্ফটিক লিঙ্গে সর্বকামনা সিদ্ধি হয়।
সোনার তৈরি লিঙ্গ পূজো করলে অতুল ঐশ্বর্যভোগ হয়। 
কাঁসা ও পিতল মিশ্রিত শিবলিঙ্গ পূজো করলে শত্রু বিনাশ হয়।
শুধু কাঁসার তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে কীর্তিলাভ হয়।
শুধু পিতলের তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে ভোগ ও মোখ্যলাভ হয়।
রাঙ্ বা সিসা কিঙবা লোহার লিঙ্গে পূজো করলে শত্রু নাশ  হয়।
অষ্টধাতুর লিঙ্গ পূজো করলে কুষ্ঠরোগ নিবারণ হয়। এই লিঙ্গ পূজো করলে সমস্ত কামনাসিদ্ধি হয়।
সোনা, রূপা ও তামা মিশিয়ে তৈরি শিবলিঙ্গ পুজো করলে বিঞ্জান বিষয়ে সিদ্ধিলাভ হয়।




সঙ্সার ক্লেশদগ্ধম্য ব্রতনানের শঙ্কর ।
প্রসীদ সুমুখো নাথ জ্ঞানদৃষ্টিপ্রদ ভব।।


Sunday, 8 March 2020

মিশন কেন?

মিশন কেন?

রামকৃষ্ণ মিশন...... মানব-সার্থকতার এক অপূর্ব কারখানা। এই ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর মাটিতে মহাশক্তির উদ্বোধন অর্থাৎ জাগরনকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে চলেছে।

মিশন দিয়েছে...... ব্যক্তিজীবনের উৎস "চরিত্র" গঠনের এক অমোঘ সূত্র। আরও বলেছে --- দেবত্বের স্পর্শ ছাড়া অটুট চরিত্র অসম্ভব। মহাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে সমগ্র সমাজের সমীহ, মর্যাদা, সন্মান আদায় করে নিয়েছে।

রামকৃষ্ণ মিশন...... " প্রতিটি জীবে অনন্তের তথা  ভগবানের অধিষ্ঠান আছে "--- এই তত্ত্বটি জাগতিক জীবনে প্রয়োগ করে সাধককে পূর্ন দেবত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে শেখায়।
 বেলুড় মঠ

মায়াবতী আশ্রম, উত্তরাখন্ড


রামকৃষ্ণ মিশনের কাছ থেকেই...... GLOBALIZATION বা বিশ্বায়নের প্রথম পাঠ পাওয়া যায়। মিশন বলে _ অস্পৃশ্যতা নেই, মিশন বলে _ জাতিভেদ নেই। মিশনে কায়স্ত, বেনে, মুচি, বাগ্দী প্রভৃতি সকল তপশালি জাতি , উপজাতি সন্ন্যাস নিয়ে থাকে। 
কাশীপুর উদ্যান বাটী, কাশীপুর
এই মিশন...... কুসংস্কার ছেঁটে ফেলে, যুক্তিবাদ বা বিজ্ঞানের আলোকে যাচাই করে, বেদান্তের পুরোনো ধারাটি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, শহর থেকে শহরান্তরে এক বিশাল আকার নিয়ে ছুটে চলেছে। কালাপানি পার করে মিশনের প্রান পুরুষ সাতসমুদ্র তেরো নদীর বিশ্বকে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব জানিয়েছিল। বিবেকানন্দের অনুসরণে আমরা আধুনিক হয়েছি। রামকৃষ্ণ মিশন এই আধুনিকতা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। মিশনের মহিলা ধারাটিতে মেয়েরা বেদ পড়ছে, সন্নাস নিচ্ছে, একই টেবিলে বসে স্লেচ্ছদের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করছে। মিশন প্রগতিশীল না হলে আমরা আজও অন্ধকার যুগে পড়ে থাকতাম।
গৌরহাটী রামকৃষ্ণ মিশন, হুগলী

এই মিশন...... প্রত্যেক ভারতবাসীকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে উদ্ধার করে মহিমময় ও নিরাপদ স্থিতি দিয়েছে। প্রত্যেক ভারতবাসীর চিররীনি থাকা উচিত এই আন্দোলনের প্রতি। স্বামীজী রামকৃষ্ণ মিশনকে হাতিয়ার করে সমাজ ও সন্নাসকে একদা কেরে নেওয়া স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেন। এই ফিরিয়ে দেওয়া স্বাধীনতাকে বেদান্তের তত্ত্বে সঞ্জীবিত করলেন। 


কোয়ালাপাড়া রামকৃষ্ণ মিশন, হুগলি

রামকৃষ্ণ মিশনই...... " শিবঞ্জানে জীবসেবা " কে বাস্তবে রূপায়িত করছে। ভগবান বুদ্ধের সফল প্রগতিশীল মানবকল্যাণের মার্গ-রূপ বীজকে শঙ্করাচার্যের বেদান্ততত্ত্ব-রূপ জমিতে বপন করলেন। তাইতো লোকে বলে বিবেকানন্দ হলেন নব শঙ্করাচার্য। যে ভারতবর্ষ বির্টিশ চক্রান্তে এবং ইসলাম শাসনে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছিল----- সে আবার বেঁচে উঠলো। সমগ্র বিশ্বকে জয় করবার এক অপূর্ব আর্তি নিয়ে সে বিশ্বদরবারে উপস্থিত হ'ল। তবে ঝড়ের শক্তিতে নয়-- চৈতন্যের শক্তিতে। খৃষ্টান, মুসলমানও মিশনের সন্ন্যাসী হয়ে মর্যাদা পাচ্ছে। স্বামীজী যদি এটা না করতেন, তবে সমগ্র ভারতবর্ষ আজ খৃষ্টান হয়ে যেত। এই একটি ব্যক্তি তথা তাঁর প্রতিষ্ঠিত মিশন আমাদের মর্যাদার শিরোপা পরিয়েছে।
মালদা রামকৃষ্ণ মিশন

রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা...... সমাজে এবং নিজেদের জীবনে বিপ্লব এনেছেন। মানুষকে সফল করার জন্য অন্নদান, চিকিৎসা দান সব থেকে বড় দান নয় ___ শিক্ষা দান এর থেকে বড়, কারণ এটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে। এর থেকে বড় দান হ'ল আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান। ঐ শিক্ষিত মানুষকে বাসনার জালে না জড়িয়ে তাকে সেবাঞ্জানে বলি দিতে পারলে, তার সমস্ত বাসনার বীজ ভাজা বা অকেজো হয়ে পড়ে। সে দেবতা হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। আর রামকৃষ্ণ মিশন বিভিন্ন রকমের সেবার মাধ্যমে জীবভাব বর্জন করে শিবভাবের উদ্বোধন ঘটিয়ে চলেছে তাদের সন্নাসীদের মধ্যে, তাদের ভক্তদের মধ্যে। সবার সেবা ____ধনী-দরিদ্র, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য, বর্ন-জাতি নির্বিশেষে ______ আর একেই বলে মানবতা।


ময়ালবন্দি রামকৃষ্ণ মিশন, হুগলি


এই মানবতাবাদকে দোরে দোরে পৌঁছাতে রামকৃষ্ণ মিশন ত্যাগ ও সেবার আদর্শকে একমেবাদ্বিতীয়ম বলে ভেবেছে। বিরোধী শক্তিগুলি রামকৃষ্ণ মিশনের এই আন্দোলনকে আঘাত করেছে। কিন্তু গতি রোধ করতে পারেনি। স্বামীজি সকলকে ডেকেছিলেন। অনেকেই রামকৃষ্ণ মিশনের পতাকাতলে সমবেত হয়েছেন। ব্যক্তিগত ধর্মমত যাই হোক না কেন প্রত্যেকেরই ত্যাগের মানসিকতা আছে। সেই ত্যাগকে সেবার মধ্যে চালিত করলে ভেতরের সুপ্ত শক্তি জাগরিত হয়। তাই স্বামীজি বললেন___ একজন মুসলিম আরো ভালো মুসলিম হবে, একজন খৃষ্টান ভালো খৃষ্টান হবে_____ এককথায় নিজেদের ধর্মেই তিনি শিরোপার অধিকারী হবেন।
আন্দামান রামকৃষ্ণ মিশন
মিশন স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশ গঠনের সময় সব থেকে জোর দিয়েছিল ___ "being and becoming" -- এর উপর। দেশমাতৃকা তথা আদ্যাশক্তির কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিল ' মা আমায় মানুষ কর'। আমরা ভারতবাসীরা আবার ভূল করলাম। " খালি পেটে ধর্ম হয় না" ---- শ্রী রামকৃষ্ণের বানীকে নিয়ে গিয়ে কেবল পেট ভরানোর ব্যবস্থা হ'ল। পেট ভড়লো, কিন্তু আমরা সৎ হলাম না, ধার্মিক হলাম না, আমাদের উত্তরন হলো না। ভারতীয় ঐতিহ্যের কদর করতে শিখলাম না। মনুষ্যত্ব বিকাশের পথটিকে রুদ্ধ করে দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো হলো দ্রুত লয়ে। যাঁরা মিথ্যাবাদী, ভন্ড, কপট এবং উপর চালাক তারাই কতৃর্ত্বের আসনে এসে গেল। সন্মানীয় ব্যক্তির অসম্মান হলো। মতলববাজ চোরেরা নেতা হলো অর্থাৎ নেতারাই চোরে পরিনত হলো।
আলমবাজার রামকৃষ্ণ মঠ
এর সব কিছুরই মূল ভার্ন্ত শিক্ষানীতি ____'মানুষ দেহধারী জীব মাত্র'_____'সম্পদ আহরনই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য' ---- আর কিছুই নয়। মানুষের আধ্যাত্মিক তথা দৈবী সত্তাকে অস্বীকার করাটাই আজ প্রগতিশীলতার প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে। মানবতাবাদী বুলি কপচে কপচে দুঃখ দূর করতে গিয়ে নিজে মহামানব না হয়ে , হয়ে উঠেছে মহাদানব। ক্রমাগত বাইরে থেকে বেড়ে ওঠার চেষ্টায় সে যুক্ত ‌। তাই যাচ্ছে ভোগের পথে, সঞ্চয়ের পথে। ভুলে গেছে যে বাড়তে হবে তাকে ভেতর থেকে।
পুরী রামকৃষ্ণ মিশন
শ্রীরামকৃষ্ণের স্বপ্নকে...... বাস্তব রুপ দিতে স্বামীজি তৈরি করলেন ---- রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ ভাবান্দোলন। যার মধ্যে মিশে গেল আমাদের ছোট ছোট আন্দোলন ---- ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ, Theosophical Society প্রভৃতি। এরা কেউ নিশ্চিহ্ন হলো না ----- কেবল বৃহত্তর আন্দোলনেকে পরিপুষ্ট সাধন করে স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলল। সব মত সব পথের এমন মিলনভূমি তৈরি হলো যা সমগ্র সমাজ ও ধর্ম সম্প্রদায়ের চোখ ধাঁধিয়ে দিল। সকল ধর্মমত, হিন্দু দর্শনের বৈচিত্র্য পূর্ণ সাধন অতি যত্ন সহকারে স্থান দিয়ে এক বিশাল মহীরুহ ‌ হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ মিশন।
শ্যামপুকুর মঠ, শ্যামপুকুর

রামকৃষ্ণ মিশনে.... সাধারনত যাঁরা ত্যাগের জীবন বেছে নেন, তাঁরা বেশির ভাগ জন্মসূত্রে হিন্দু। কিন্তু এছাড়াও, জন্মসূত্রে যাঁরা খৃষ্টান বা মুসলমান, তারাও এই সংগঠনের সন্ন্যাসী হওয়ার সুযোগ পান। হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান নির্বিশেষে---- সকলে পাঁচ বছরের পরে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী ব্রতের দীক্ষিত হন। তারও চার বছর পরে ( অর্থাৎ দশম বছরে) ,‌‌‌‌ তাঁরা ব্রহ্মচর্য থেকে উত্তীর্ণ হন সন্ন্যাসে।

এই মিশনের প্রতিষ্ঠিতা ...... স্বামী বিবেকানন্দ যে সাম্যের কথা বলেছিলেন, সকল মানুষের মধ্যে যে দেবত্বের জয়গান গেয়েছিলেন_____ মিশন তাঁর স্থায়ী সদস্যদের এই ভাবে ধর্ম-জাতি-ভাষা নির্বিশেষে বরন করার মধ্য দিয়ে, সেটিকে রূপায়ণ করে চলেছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভাজন সমাজে যখন প্রকট হয়, তখন স্বামীজী ও শ্রীরামকৃষ্ণদেবের চিন্তা অনুসরন করে ভারতের সমাজের বুকে এই নীরব বিপ্লব বিশেষ উল্লেখযোগ্য।


"" শুধু নিজেরই সমস্ত সম্ভবনার পূর্ণ বিকাশ--চূড়ান্ত স্বার্থপরতা। তুমি নিজে বুঝলে, অন্যকে বোঝাবে না? নিজে উঠলে, অন্যকে ওঠাবে না? ""
---- এই বিবেকানন্দের শিক্ষা, এই তাঁর ধর্ম। তাঁর তত্ত্বে তিনি ঠাঁই দিয়েছেন দুজনকে ____ ত্যাগ ও সেবা। কী ত্যাগ? আমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা কিছু তাকে ত্যাগ। তা দিয়ে সেবা। শক্তিমান যে, সে চাইলেই পিটিয়ে দিতে পারে দুর্বলকে। তাঁর বদলে সে শক্তিটুকু দিয়ে দুর্বলকে রক্ষা করবে। সেটাই সেবা। ধনবানের অতিরেক পৌচ্ছাক নির্ধনের কাছে। শিক্ষিতের ব্রত হোক অন্যকে শিক্ষিত করা।কর্ম এতদিন বিযুক্ত ছিল ধর্ম জীবন থেকে। বেদান্তের তত্ত্ব পরে ছিল বনে ,গিরিগুহায়। সেই স্বার্থপর নিভৃতি থেকে তার মুক্তি হ'ল লোককল্যানে।


চার রকম শোষন বন্ধ করার  দায় নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের আবির্ভাব। সবল, ধনী , শিক্ষিত ও ধার্মিক। এদের privilege- এর অবসান করতে গেলে বেদান্তকে নীজ জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। সমাজে সাম্যও  থাকবে, আবার culture-ও থাকবে। ছোটকে বড় করে তোলবার কথা বেদান্ত বলে। বড়কে কখনই ছোট করে না। বেদান্ত শুধু বিঞ্জান ভিত্তিক নয়। এটি জগৎ রহস্যের সমাধানও বটে। বেদান্তে ভোগ নেই, সুবিধাবাদ নেই, স্বার্থপরতা নেই, এই অপূর্ব বিঞ্জানভিতিক আধ্যাত্মিক পরিমন্ডল রচনার স্বপ্নই হ'ল রামকৃষ্ণ মিশনের। আপনার সকল অভাব অভিযোগ ও সম্বল নিয়ে মানব-উত্তরনের পাশে দাঁড়ান। নিজে মুক্ত হন আর অপরকে মুক্ত করুন।

প্রশ্ন উত্তরে সহজে কিছু জানা ::

প্র:: আমি যে নাস্তিক, আমার কি হবে ?

উঃ:: যারা নাস্তিক তারা বেশি আস্তিক, নাস্তিকরাই সর্বখন ঈশ্বরকে খুঁজছে। যাদের মন ঈশ্বর অন্বেষনে ব্যাস্ত তারা কি নাস্তিক হতে পারে? ঈশ্বর নির্ণয় করতে গেলে নিবিষ্ট মনে বিশ্বস্রষ্টার অদ্ভুত সৃষ্টি কৌশল দর্শন করতে হয়। কার্য-কারন পরম্পরার দ্বারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব অতিসহজেই অনুমিত হয়। কর্তা ব্যাতিত কর্ম হতে পারে না। তখন জগৎ রয়েছে তখন এর সৃষ্টি কর্তা অবশ্যই আছে, এতে ভুল নেই। 


প্র :: যুক্তি ও পান্ডিত্য খানিক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু তার পরে সব অন্ধকার ।

উঃ:: কে বললে অন্ধকার? তাঁকে ব্যকুল হয়ে খুঁজলে নিশ্চয়ই দেখা পাবে। সঙশয় গ্রন্থির পরপারেই অপরূপ জ্যোতি ও অপার আনন্দ । ভগবানের জন্য ব্যাকুল হয়ে অনেকে তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হয়েছেন। জগতের সমস্ত ধর্ম ইতিহাস তার সাখ্য দেয়। বিষয়ী লোকেরা সবকথা শুনে যায়, কিন্তু বিশ্বাস করে না।

প্র :: এত অবিশ্বাস আসে কেন বলুন তো ? 

উঃ :: এই অবিশ্বাসই হলো বাধা। শুধু বাধা নয় , বিষম ব্যাধি। পূর্বজন্মের সংস্কার গুলো খয় করে ফেলতে হবে। যার বিশ্বাস এসে গেল সে ভাগ্যবান। তার আর কোনো অভাব রইল না। বিশ্বাস দূর্লভ ধন। আমাদের রোগ হচ্ছে বাসনা ---- প্রতিকার হচ্ছে বিবেক। এই বিবেকরুপী ভগবান আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ফিরছেন, তাঁকে ভুললেই সব পশু। 

প্র :: তাঁকে আমরা দেখতে পাই না কেন?

উঃ :: ঠাকুর বলতেন " সমুদ্রে রত্ন আছে, যত্ন চাই, সংসারে ঈশ্বর আছেন , সাধনা চাই। " তিনি আরো বলেছেন ______ পানায় ঢাকা পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে বলছো পুকুরে জল নেই, যদি জল দেখতে চাও তবে পানা সরিয়ে ফেল। মায়ায় ঢাকা চোখ নিয়ে ঈশ্বর দেখা যায় না, যদি ঈশ্বর কে দেখতে চাও মায়াকে সরিয়ে ফেল।

প্র :: আচ্ছা গেরুয়া না পরেও সন্ন্যাসী হওয়া যায় কি ?

উঃ :: ধর্ম হচ্ছে মনের। গেরুয়া না পরেও মুক্ত হওয়া যায়, মানুষ মানেই বদ্ধ, মানেই মুক্ত। আগে চাই মন, পরে বাহিরের সাহায্য। মন ভাল হলে গেরুয়ায় যেমন বাহিরের কিছু সাহায্য করে, মন খারাপ হলে তেমনি গেরুয়ার দ্বারা ভন্ডামির সহায়তা হয়। গেরুয়া, তিলক- ফোঁটা কাটা , তীর্থযাত্রা , হজ, কীর্তন, জপ, তপ কিছুই ধর্ম নয়; ধর্মের বহিরাবরণ মাত্র। এগুলি মানুষের মনকে ভগবৎকৃপার অধিকারী হতে সাহায্য করে।

প্র :: তবে মুক্তি কিসে হয় ?

উঃ :: জীবাত্মা পরমাত্মার জন্য আত্মহারা না হলে মুক্তি পথের সন্ধান পাওয়া যায় না। 

প্র :: আপনাদের মঠের সন্ন্যাসী হবার নিয়ম কি ? 

উঃ :: মঠের সন্ন্যাসী হতে গেলে প্রথম তিন বৎসর শিক্ষানবিশ থাকতে হবে , তারপর তিন বৎসর ব্রহ্মচর্য ব্রতচারী থাকতে হয়।এই ছয় বৎসর (বর্তমানে ৯ বৎসর) পরে মঠাধ্যখ্খ তোমার সন্ন্যাস গ্রহণের উপযুক্ততা বিবেচনা করে তবে সন্ন্যাস দেবেন। মঠের সন্ন্যাসীদের আদর্শ ত্যাগী, অদর্শ সেবক , অদর্শ সংযমী ও আদর্শ ভক্ত হতে হবে।

প্র :: ঐ ছয় বৎসর কি শিক্ষা করতে হবে ?

উঃ:: মিশনের মূলমন্ত্র ----- RENUNCIATION AND SERVICE ( ত্যাগ ও সেবা ), সংসারাসক্তি ত্যাগ, সর্বভূতে ভগবান দর্শন ও জীবকে শিব ঞ্জানে সেবা। 

প্র :: সেবার কাজটি বাড়ীর মেয়েদের কাছে ভালো শিক্ষা হয়, হিন্দুর মেয়ে আপন স্বামী-পুত্রের মে ভাবে সেবা করে তার চেয়ে বড় আদর্শ কিছু হতে পারে কি ?

উঃ:: সতীর‌ পরিসেবার মধ্যেও একটু স্বার্থ গন্ধ থাকে; কিন্তু মঠের সাধু ব্রহ্মচারিগন অসহায় রোগীকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনে পীড়িত নারায়ন ঞ্জানে নি:স্বার্থভাবে সেবা করে। 

প্র :: মঠের বড় কঠিন নিয়ম; ছয় বৎসর (বর্তমান নয় বৎসর ) শিক্ষানবিশ। ছয় বৎসর মেডিক্যাল কলেজে পড়লে ডাক্তার হওয়া যায়।

উঃ:: ডাক্তার হলে দৈহিক রোগের চিকিৎসা হবে বটে ; কিন্তু সন্ন্যাসী হতে পারলে ভবরোগ থেকে অব্যাহতি পাবে। 

প্র :: প্রতিবার কুম্ভমেলায় লাখ লাখ সাধুর সমাগম হয়, ওঁরা সকলেই কি ভবরোগ থেকে নিষ্কৃতি পাবেন ?

উঃ :: ওঁদের মধ্যে পেটের জন্য, নাম-যশের জন্য , ঔষধাদি দিয়ে অর্থোপার্জনের জন্য, রাজ দন্ড এরাবার জন্য অনেকে সাধু সেজে থাকেন, কিন্তু ভগবান লাভের জন্য সর্বত্যাগী বিবেক-বৈরাগ্যবান সাধু খুবই কম। বহু জন্মার্জিত তপস্যার ফলে কাম-কাঞ্চনে অনাসক্ত হলে সর্বত্যাগী সন্নাসী হওয়া যায়। মুমুখ্খু না হলে সন্ন্যাসী হওয়া যায় না।

স্বামী রামকৃষ্নানন্দ মহারাজ।




প্র :: আপনি বহুদিন তো আপনাদের শ্রীরামকৃষ্নদেবকে ভজনা করেছেন, কিছু পেলেন কি ?

উঃ:: শ্রীরামকৃষ্নদেব শুধু আমাদের নন। তিনি জগতের কল্যানের জন্য এসেছিলেন। ভগবান তাঁর শ্রীমুখ নি:সৃত " সম্ভবামি যুগে যুগে"  ..... এই বানীটির সার্থ্কতার জন্য অধর্মের অভ্যুুথ্থান ধর্মের সংস্থাপন, সাধুদের ও পরিত্রাণ ও 
পাপী_তাপীদের উদ্ধারের পথ প্রদর্শনের জন্য  যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। তিনি  শ্রীকৃষ্ণ রুপে, খ্রিস্টরুপে, মহম্মদরুপে, বুদ্ধরুপে, শঙ্কর রুপে  ও গৌরাঙ্গরুপে অবতীর্ণ হয়ে অনেক লীলা করে গিয়েছেন। বর্তমান যুগে তিনিই সর্বধর্ম সমন্বয়কারী যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ন। গীতার বাণী তিনি জীবনে প্রতিফলিত করেছেন । তাঁর  কামিনী কাঞ্চন ত্যাগের অশ্রুতপূর্ব দৃষ্টান্ত, লোক শিক্ষার্থ দ্বাদশ বৎসর কঠোর সাধনা এবং " যত মত তত পথ " ঘোষণা,  ধর্ম জগতে যুগান্তর এনেেছিল। তার শ্রীমুখ নি:সৃত " কথামৃত বাণী  " সারা বিশ্ব বাসীর কাছে তৃষিত প্র্রানে শান্তির বারী সেচন করেছে। তিনি বলেছেন ____ জীব , জগত, চতুর্বিঙশতি তত্ত্ব-----এসব তিনি  আছেন বলে সব আছে। তাকে বাদ দিলে কিছুই থাকে না।  একের পিঠে অনেক শূন্য দিলে সঙক্ষা বেড়ে  যায়।  কিন্তু এককে মুছে ফেললে শূন্যের কোনো মূল্য থাকে না।  জন্ম,  মৃত্যু এসব ভেল্কির মত। এই আছে এই নেই। শুধু আহার , নিদ্রা, বাসনা  ও ভোগের সেবাতেই জীবন খয় করলে কি ধর্ম হয়? ঈশ্বর লাভই জীবনের উদ্দেশ্য।  

প্র : যদি  আমার কর্মফলজনিত অদৃষ্টে যা আছে তাই অনিবার্য হয়,তবে  ঈশ্বর আরাধনা বা ধর্মকর্মে প্রয়োজন কি?

উ: অদৃষ্টবাদে আমার প্রগাঢ় বিশ্বাস; কিন্তু অদৃষ্ট অখণ্ডনীয় এ কথায় আমার  বিশ্বাস নেই।  কর্মফলরুপে অদৃষ্ট প্রকষ্টে ভাল_মন্দ, পাপ_পূন্য, সুখ_দু:খ, যা কিছু সঞ্চিত হয়েছে,  তা একেবারে অচল, অটল,  অখণ্ড বা অপরিবর্তনীয় ___ একথা আমি বিশ্বাস করি না।  এক পরমাত্মা ভিন্ন এই বিশ্ব সংসারে অদাহ্য, অখণ্ড, অশোষ্য, অচ্ছেদ্য বা অপরিবর্তনীয় অবস্থান আর কিছু থাকতে পারে না।  যেখানেই রোগ--সেখানেই ঔষধ,  যেখানেই অন্ধকার--সেখানেই আলো, যেখানেই অত্যাচার--সেখানেই পরিত্রাণ,  যেখানেই ধর্মগ্লানি--সেখানেই  ধর্মস্থাপন _____ ইহাই  সংসারের নিয়ম। সকল বিষয়েই যদি নিয়ম হয়,তবে  অদৃষ্ট সম্বন্ধে বিপরীত হবে কেন? যদি দুঃখ লাঘব হবার উপায় না থাকে,  তা হলে লোকে এত পূন্য সঞ্চয় করে কেন  ? এত পরোপকার, এতো দান, এতো কঠোর তপস্যা,  এতো তীর্থদর্শন,এতো শাস্ত্র চর্চা ও উপাসনার প্রয়োজনীয়তা কোথায়  ? যদি দূরদৃষ্ট খন্ডনীয় বা পাপমোচনের কনো উপায় না থাকে তবে যুগে যুগে অবতারের প্রয়োজন কি? যিশু খ্রিস্টের পরিত্রাতা   Savior কিংবা মহম্মদের রশুল Prophet  অথবা  শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কপাল-মোচন নামের  সার্থকতা কোথায়? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন  " তুমি একমাত্র আমার ধারণাগত হও , আমি তোমাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করব।" যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন  "চোখের জলে পূর্ব জন্মের পাপ ধৌত হয়ে যায়।"  যুগাচার্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন  " ভগবানের আরেক নাম  'কপাল মোচন '। তাঁর কৃপা হলে এক মূহুর্তে মানুষের কপাল  (অদৃষ্ট লিখণ) মুছে যেতে পারে। ভগবানের কাছে এই বলে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা কর ----'হে দয়াময়,  আমি অসহায় দুর্বল; ইহ জন্মে বা  জন্ম জন্মান্তরে ঞ্জাত বা  অঞ্জাতসারে যে সকল পাপ সঞ্চয় করিয়াছি  , তুমি দয়া করে সেইগুলি ক্ষমা কর । আমার সমস্ত কর্মফল ক্ষয় করে দাও প্রভু।  ' অনুতপ্ত  হৃদয়ে এইভাবে প্রার্থনা করলে,  ব্যাকুল প্রানে কাঁদতে পারলে নিশ্চয় তাঁর দয়া হবে।  ছেলে কাদলেই মায়ের আসন টলে।"


!!মঠের মহারাজদের জ্যোতি রহস্য !!



অনেকের মনে প্রশ্ন আসে......... বেশিরভাগ রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজদের মুখমণ্ডল কেন এত জ্যোতির্ময় হয়?

 এ বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এক মা এবং তার যুবক ছেলের গল্প.... যারা মনে করেন ফ্রিতে দুধ আর ফল পেলে মুখের গ্ল্যামার ধরে রাখা যায়।

ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে হাস্যাস্পদ শোনালেও প্রশ্নটা থেকেই যায়, মহারাজদের জ্যোতির রহস্য কি?

মহারাজদের কর্মব্যস্ততা দেখে কখনোই মনে হয়না যে কর্পোরেট লিডারদের চেয়ে কোন অংশে তারা কম কাজ করেন কিংবা তাদের কাজের চাপ কম। তাদের খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত।

তাহলে কি সংযত আহারই আমাদের শরীরে দীপ্তি আনে?

নাকি সাংসারিক টানাপোড়েন আমাদের আপাত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়? দুশ্চিন্তার ভাঁজ কি আমাদের কপালে বলিরেখা তৈরি করে?

এগুলোর কোন বাক্যই অস্বীকার করা যায় না, তথাপি জ্যোতি রহস্য নিরুত্তর থেকে যায়।

অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে আমরা যতই চেষ্টা করি, শারীরিক উজ্জ্বল্য পেতে অভ্যন্তরীণ বিকাশ অপরিহার্য। মানসিক বিকাশ, অবচেতনের সেই স্তর করায়ত্ব না হলে সেই জ্যোতির প্রকাশ ঘটে না।

অভ্যন্তরীণ বিকাশের যে দশটি গুণ  মহারাজের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায় , তা সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করা হ'ল।

১) এক কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়াই বিশ্রাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখা এবং নিজের মন যা চায় সে নিয়ে আমৃত্যু কাজ করাই জীবনে সুখী হওয়ার মন্ত্র। মনে রাখবেন, অলস মস্তিষ্ক আসলে শয়তানের কারখানা।

২) সারল্য। কোন ছেলের সঙ্গে কেবলমাত্র স্নেহ বাৎসল্য নয়, শিশুদের মত সরলতা নিয়ে মিশে যাওয়া এক বিশাল বড় গুণ। মনে রাখবেন জটিলতা অনেক সময় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে, যেটাকে অবচেতনের ভাষায় বলে মেন্টাল ব্লক, আর সারল্য ধারণ করে অনেক ক্ষমতা, অসীমকে জয় করার দুঃসাহস। জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়।

৩) অন্যের জন্য কাজ করাটাই সবচেয়ে বড় সুখ। আপনি যতই নিজের ব্যাপারে ভাববেন, ততই মায়া জালে জড়িয়ে যাবেন। অন্যের থেকে আশা আপনাকে কষ্ট দেয়, অন্যকে সাহায্য করা আপনাকে আনন্দ দেয়। আমরা বাস্তবে ঠিক উল্টোটি করি।

৪) জীবনের বেশিরভাগ সুখী হওয়ার উপাদান ফ্রি। মুক্ত মনে হাসা, অন্যকে ভালোবাসা, প্রকৃতির মধ্যে থাকা, অন্যকে ভাল রাখা, সবই বিনামূল্যে করা যায়। তাই আপনার সুখী হওয়ার জন্য অর্থ লাগেনা।

৫) নিরন্তর শিখে যাও। শিক্ষার চর্চা, আমাদের ব্রেনকে অবচেতনের নতুন স্তরে উন্নীত করে। প্রত্যেকটি মহারাজ দিনে কোন না কোন সময় পঠন পাঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

৬) ধ্যান বা সূর্য প্রণাম। মনকে স্থির করতে, কিংবা নিজের অবচেতনকে সংযত রাখতে এর চেয়ে বড় শক্তি নেই। বেলুড় মঠে ঘন্টার পর ঘন্টা আরতি, প্রকারান্তরে একটা ধ্যানেরই রূপক।

৭) সর্বদা ইতিবাচক। এটি একটি বিশাল বড় গুন। এই পৃথিবীতে খুব কম লোকের মধ্যে এই গুনটি দেখা যায়। আমাদের চিন্তার শতকরা ৭৮ ভাগই নেতিবাচক। রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার রামকৃষ্ণ মিশনের ডোনেশন অনেকাংশে কম করেছে, অথচ হা-হুতাশ না করে, বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজতে মহারাজরা বদ্ধপরিকর।

৮) অহেতুক পারস্পরিক তুলনা আমাদেরকে নেতিবাচক চিন্তায় নিয়ে যায়, এটা মহারাজদের কোনদিন করতে দেখিনি।

৯) কৃতজ্ঞতা। ওনারা যার যার প্রতি কৃতজ্ঞ, উন্মুক্তচিত্তে স্বীকার করেন। কৃতজ্ঞতার চেয়ে বড় থেরাপি এই মহাবিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। ধন্যবাদ জ্ঞাপনে কখনো পিছপা হতে দেখা যায় না  মহারাজদের। স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন - "মন কে শান্ত করতে হলে, তোমার কাছে যা আছে তার জন্য ঈশ্বর কে মন থেকে ধন্যবাদ জানাও, তার সাথে প্রেমের বন্ধন তৈরি কর। দেখবে মনের অশান্তি কোথায় হারিয়ে গেছে।"

১০) আপনি আপনার চিন্তার মতন বড়। আপনি এই বিশ্বকে যত ভালো ভাবেন, আপনার মস্তিষ্ক ততখানি উন্নত । মুখমণ্ডল কেবল তার বহিঃপ্রকাশ। কারো প্রতি ঘৃণা নয়, কেবল ভালোবাসা, কারো কাছে ঠকে যাওয়ার ভয় নয়, তাকে অকৃত্রিমভাবে সাহায্য করা, অমলিন চিত্তে ঠাকুর আর স্বামীজীর প্রার্থনা করা, তাদের বাণী বারংবার উচ্চারিত করলে অবচেতন ঐশ্বরিক মন্ত্রে দীক্ষিত হয়, তার দীপ্তি মুখমণ্ডলে প্রকাশ পায়।

মহারাজদের জীবন প্রমাণ করে মানব জীবন কত আনন্দময়। নিরলস শ্রম, অকৃত্রিম জীবে প্রেম, অদ্বৈত রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সাধনা, অকুণ্ঠ জ্ঞানপিপাসা, সর্বদাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ভাবা, হাস্যকৌতুক এবং আনন্দের মধ্যে দিয়ে জীবনের রসগুলোকে উপভোগ করা। আর যখন কঠিন পরিস্থিতি আসবে সুচিন্তার মাধ্যমে নেতিবাচক শক্তিদের পরাস্ত করে আপনিও জ্যোতির্ময় হবেন।