Sunday, 8 March 2020

মিশন কেন?

মিশন কেন?

রামকৃষ্ণ মিশন...... মানব-সার্থকতার এক অপূর্ব কারখানা। এই ভারতবর্ষ তথা পৃথিবীর মাটিতে মহাশক্তির উদ্বোধন অর্থাৎ জাগরনকে লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে চলেছে।

মিশন দিয়েছে...... ব্যক্তিজীবনের উৎস "চরিত্র" গঠনের এক অমোঘ সূত্র। আরও বলেছে --- দেবত্বের স্পর্শ ছাড়া অটুট চরিত্র অসম্ভব। মহাশক্তির প্রকাশ ঘটিয়ে সমগ্র সমাজের সমীহ, মর্যাদা, সন্মান আদায় করে নিয়েছে।

রামকৃষ্ণ মিশন...... " প্রতিটি জীবে অনন্তের তথা  ভগবানের অধিষ্ঠান আছে "--- এই তত্ত্বটি জাগতিক জীবনে প্রয়োগ করে সাধককে পূর্ন দেবত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে শেখায়।
 বেলুড় মঠ

মায়াবতী আশ্রম, উত্তরাখন্ড


রামকৃষ্ণ মিশনের কাছ থেকেই...... GLOBALIZATION বা বিশ্বায়নের প্রথম পাঠ পাওয়া যায়। মিশন বলে _ অস্পৃশ্যতা নেই, মিশন বলে _ জাতিভেদ নেই। মিশনে কায়স্ত, বেনে, মুচি, বাগ্দী প্রভৃতি সকল তপশালি জাতি , উপজাতি সন্ন্যাস নিয়ে থাকে। 
কাশীপুর উদ্যান বাটী, কাশীপুর
এই মিশন...... কুসংস্কার ছেঁটে ফেলে, যুক্তিবাদ বা বিজ্ঞানের আলোকে যাচাই করে, বেদান্তের পুরোনো ধারাটি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, শহর থেকে শহরান্তরে এক বিশাল আকার নিয়ে ছুটে চলেছে। কালাপানি পার করে মিশনের প্রান পুরুষ সাতসমুদ্র তেরো নদীর বিশ্বকে আমাদের শ্রেষ্ঠত্ব জানিয়েছিল। বিবেকানন্দের অনুসরণে আমরা আধুনিক হয়েছি। রামকৃষ্ণ মিশন এই আধুনিকতা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলে। মিশনের মহিলা ধারাটিতে মেয়েরা বেদ পড়ছে, সন্নাস নিচ্ছে, একই টেবিলে বসে স্লেচ্ছদের সঙ্গে খাওয়া দাওয়া করছে। মিশন প্রগতিশীল না হলে আমরা আজও অন্ধকার যুগে পড়ে থাকতাম।
গৌরহাটী রামকৃষ্ণ মিশন, হুগলী

এই মিশন...... প্রত্যেক ভারতবাসীকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখ থেকে উদ্ধার করে মহিমময় ও নিরাপদ স্থিতি দিয়েছে। প্রত্যেক ভারতবাসীর চিররীনি থাকা উচিত এই আন্দোলনের প্রতি। স্বামীজী রামকৃষ্ণ মিশনকে হাতিয়ার করে সমাজ ও সন্নাসকে একদা কেরে নেওয়া স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিলেন। এই ফিরিয়ে দেওয়া স্বাধীনতাকে বেদান্তের তত্ত্বে সঞ্জীবিত করলেন। 


কোয়ালাপাড়া রামকৃষ্ণ মিশন, হুগলি

রামকৃষ্ণ মিশনই...... " শিবঞ্জানে জীবসেবা " কে বাস্তবে রূপায়িত করছে। ভগবান বুদ্ধের সফল প্রগতিশীল মানবকল্যাণের মার্গ-রূপ বীজকে শঙ্করাচার্যের বেদান্ততত্ত্ব-রূপ জমিতে বপন করলেন। তাইতো লোকে বলে বিবেকানন্দ হলেন নব শঙ্করাচার্য। যে ভারতবর্ষ বির্টিশ চক্রান্তে এবং ইসলাম শাসনে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছিল----- সে আবার বেঁচে উঠলো। সমগ্র বিশ্বকে জয় করবার এক অপূর্ব আর্তি নিয়ে সে বিশ্বদরবারে উপস্থিত হ'ল। তবে ঝড়ের শক্তিতে নয়-- চৈতন্যের শক্তিতে। খৃষ্টান, মুসলমানও মিশনের সন্ন্যাসী হয়ে মর্যাদা পাচ্ছে। স্বামীজী যদি এটা না করতেন, তবে সমগ্র ভারতবর্ষ আজ খৃষ্টান হয়ে যেত। এই একটি ব্যক্তি তথা তাঁর প্রতিষ্ঠিত মিশন আমাদের মর্যাদার শিরোপা পরিয়েছে।
মালদা রামকৃষ্ণ মিশন

রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা...... সমাজে এবং নিজেদের জীবনে বিপ্লব এনেছেন। মানুষকে সফল করার জন্য অন্নদান, চিকিৎসা দান সব থেকে বড় দান নয় ___ শিক্ষা দান এর থেকে বড়, কারণ এটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে সাহায্য করে। এর থেকে বড় দান হ'ল আধ্যাত্মিক জ্ঞান দান। ঐ শিক্ষিত মানুষকে বাসনার জালে না জড়িয়ে তাকে সেবাঞ্জানে বলি দিতে পারলে, তার সমস্ত বাসনার বীজ ভাজা বা অকেজো হয়ে পড়ে। সে দেবতা হওয়ার পথে এগিয়ে যায়। আর রামকৃষ্ণ মিশন বিভিন্ন রকমের সেবার মাধ্যমে জীবভাব বর্জন করে শিবভাবের উদ্বোধন ঘটিয়ে চলেছে তাদের সন্নাসীদের মধ্যে, তাদের ভক্তদের মধ্যে। সবার সেবা ____ধনী-দরিদ্র, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য, বর্ন-জাতি নির্বিশেষে ______ আর একেই বলে মানবতা।


ময়ালবন্দি রামকৃষ্ণ মিশন, হুগলি


এই মানবতাবাদকে দোরে দোরে পৌঁছাতে রামকৃষ্ণ মিশন ত্যাগ ও সেবার আদর্শকে একমেবাদ্বিতীয়ম বলে ভেবেছে। বিরোধী শক্তিগুলি রামকৃষ্ণ মিশনের এই আন্দোলনকে আঘাত করেছে। কিন্তু গতি রোধ করতে পারেনি। স্বামীজি সকলকে ডেকেছিলেন। অনেকেই রামকৃষ্ণ মিশনের পতাকাতলে সমবেত হয়েছেন। ব্যক্তিগত ধর্মমত যাই হোক না কেন প্রত্যেকেরই ত্যাগের মানসিকতা আছে। সেই ত্যাগকে সেবার মধ্যে চালিত করলে ভেতরের সুপ্ত শক্তি জাগরিত হয়। তাই স্বামীজি বললেন___ একজন মুসলিম আরো ভালো মুসলিম হবে, একজন খৃষ্টান ভালো খৃষ্টান হবে_____ এককথায় নিজেদের ধর্মেই তিনি শিরোপার অধিকারী হবেন।
আন্দামান রামকৃষ্ণ মিশন
মিশন স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশ গঠনের সময় সব থেকে জোর দিয়েছিল ___ "being and becoming" -- এর উপর। দেশমাতৃকা তথা আদ্যাশক্তির কাছে প্রার্থনা জানিয়েছিল ' মা আমায় মানুষ কর'। আমরা ভারতবাসীরা আবার ভূল করলাম। " খালি পেটে ধর্ম হয় না" ---- শ্রী রামকৃষ্ণের বানীকে নিয়ে গিয়ে কেবল পেট ভরানোর ব্যবস্থা হ'ল। পেট ভড়লো, কিন্তু আমরা সৎ হলাম না, ধার্মিক হলাম না, আমাদের উত্তরন হলো না। ভারতীয় ঐতিহ্যের কদর করতে শিখলাম না। মনুষ্যত্ব বিকাশের পথটিকে রুদ্ধ করে দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটানো হলো দ্রুত লয়ে। যাঁরা মিথ্যাবাদী, ভন্ড, কপট এবং উপর চালাক তারাই কতৃর্ত্বের আসনে এসে গেল। সন্মানীয় ব্যক্তির অসম্মান হলো। মতলববাজ চোরেরা নেতা হলো অর্থাৎ নেতারাই চোরে পরিনত হলো।
আলমবাজার রামকৃষ্ণ মঠ
এর সব কিছুরই মূল ভার্ন্ত শিক্ষানীতি ____'মানুষ দেহধারী জীব মাত্র'_____'সম্পদ আহরনই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য' ---- আর কিছুই নয়। মানুষের আধ্যাত্মিক তথা দৈবী সত্তাকে অস্বীকার করাটাই আজ প্রগতিশীলতার প্রধান শর্ত হয়ে উঠেছে। মানবতাবাদী বুলি কপচে কপচে দুঃখ দূর করতে গিয়ে নিজে মহামানব না হয়ে , হয়ে উঠেছে মহাদানব। ক্রমাগত বাইরে থেকে বেড়ে ওঠার চেষ্টায় সে যুক্ত ‌। তাই যাচ্ছে ভোগের পথে, সঞ্চয়ের পথে। ভুলে গেছে যে বাড়তে হবে তাকে ভেতর থেকে।
পুরী রামকৃষ্ণ মিশন
শ্রীরামকৃষ্ণের স্বপ্নকে...... বাস্তব রুপ দিতে স্বামীজি তৈরি করলেন ---- রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ ভাবান্দোলন। যার মধ্যে মিশে গেল আমাদের ছোট ছোট আন্দোলন ---- ব্রাহ্ম সমাজ, আর্য সমাজ, Theosophical Society প্রভৃতি। এরা কেউ নিশ্চিহ্ন হলো না ----- কেবল বৃহত্তর আন্দোলনেকে পরিপুষ্ট সাধন করে স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে ফেলল। সব মত সব পথের এমন মিলনভূমি তৈরি হলো যা সমগ্র সমাজ ও ধর্ম সম্প্রদায়ের চোখ ধাঁধিয়ে দিল। সকল ধর্মমত, হিন্দু দর্শনের বৈচিত্র্য পূর্ণ সাধন অতি যত্ন সহকারে স্থান দিয়ে এক বিশাল মহীরুহ ‌ হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ মিশন।
শ্যামপুকুর মঠ, শ্যামপুকুর

রামকৃষ্ণ মিশনে.... সাধারনত যাঁরা ত্যাগের জীবন বেছে নেন, তাঁরা বেশির ভাগ জন্মসূত্রে হিন্দু। কিন্তু এছাড়াও, জন্মসূত্রে যাঁরা খৃষ্টান বা মুসলমান, তারাও এই সংগঠনের সন্ন্যাসী হওয়ার সুযোগ পান। হিন্দু, মুসলিম, খৃষ্টান নির্বিশেষে---- সকলে পাঁচ বছরের পরে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী ব্রতের দীক্ষিত হন। তারও চার বছর পরে ( অর্থাৎ দশম বছরে) ,‌‌‌‌ তাঁরা ব্রহ্মচর্য থেকে উত্তীর্ণ হন সন্ন্যাসে।

এই মিশনের প্রতিষ্ঠিতা ...... স্বামী বিবেকানন্দ যে সাম্যের কথা বলেছিলেন, সকল মানুষের মধ্যে যে দেবত্বের জয়গান গেয়েছিলেন_____ মিশন তাঁর স্থায়ী সদস্যদের এই ভাবে ধর্ম-জাতি-ভাষা নির্বিশেষে বরন করার মধ্য দিয়ে, সেটিকে রূপায়ণ করে চলেছে। বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভাজন সমাজে যখন প্রকট হয়, তখন স্বামীজী ও শ্রীরামকৃষ্ণদেবের চিন্তা অনুসরন করে ভারতের সমাজের বুকে এই নীরব বিপ্লব বিশেষ উল্লেখযোগ্য।


"" শুধু নিজেরই সমস্ত সম্ভবনার পূর্ণ বিকাশ--চূড়ান্ত স্বার্থপরতা। তুমি নিজে বুঝলে, অন্যকে বোঝাবে না? নিজে উঠলে, অন্যকে ওঠাবে না? ""
---- এই বিবেকানন্দের শিক্ষা, এই তাঁর ধর্ম। তাঁর তত্ত্বে তিনি ঠাঁই দিয়েছেন দুজনকে ____ ত্যাগ ও সেবা। কী ত্যাগ? আমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা কিছু তাকে ত্যাগ। তা দিয়ে সেবা। শক্তিমান যে, সে চাইলেই পিটিয়ে দিতে পারে দুর্বলকে। তাঁর বদলে সে শক্তিটুকু দিয়ে দুর্বলকে রক্ষা করবে। সেটাই সেবা। ধনবানের অতিরেক পৌচ্ছাক নির্ধনের কাছে। শিক্ষিতের ব্রত হোক অন্যকে শিক্ষিত করা।কর্ম এতদিন বিযুক্ত ছিল ধর্ম জীবন থেকে। বেদান্তের তত্ত্ব পরে ছিল বনে ,গিরিগুহায়। সেই স্বার্থপর নিভৃতি থেকে তার মুক্তি হ'ল লোককল্যানে।


চার রকম শোষন বন্ধ করার  দায় নিয়ে রামকৃষ্ণ মিশনের আবির্ভাব। সবল, ধনী , শিক্ষিত ও ধার্মিক। এদের privilege- এর অবসান করতে গেলে বেদান্তকে নীজ জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। সমাজে সাম্যও  থাকবে, আবার culture-ও থাকবে। ছোটকে বড় করে তোলবার কথা বেদান্ত বলে। বড়কে কখনই ছোট করে না। বেদান্ত শুধু বিঞ্জান ভিত্তিক নয়। এটি জগৎ রহস্যের সমাধানও বটে। বেদান্তে ভোগ নেই, সুবিধাবাদ নেই, স্বার্থপরতা নেই, এই অপূর্ব বিঞ্জানভিতিক আধ্যাত্মিক পরিমন্ডল রচনার স্বপ্নই হ'ল রামকৃষ্ণ মিশনের। আপনার সকল অভাব অভিযোগ ও সম্বল নিয়ে মানব-উত্তরনের পাশে দাঁড়ান। নিজে মুক্ত হন আর অপরকে মুক্ত করুন।

প্রশ্ন উত্তরে সহজে কিছু জানা ::

প্র:: আমি যে নাস্তিক, আমার কি হবে ?

উঃ:: যারা নাস্তিক তারা বেশি আস্তিক, নাস্তিকরাই সর্বখন ঈশ্বরকে খুঁজছে। যাদের মন ঈশ্বর অন্বেষনে ব্যাস্ত তারা কি নাস্তিক হতে পারে? ঈশ্বর নির্ণয় করতে গেলে নিবিষ্ট মনে বিশ্বস্রষ্টার অদ্ভুত সৃষ্টি কৌশল দর্শন করতে হয়। কার্য-কারন পরম্পরার দ্বারা ঈশ্বরের অস্তিত্ব অতিসহজেই অনুমিত হয়। কর্তা ব্যাতিত কর্ম হতে পারে না। তখন জগৎ রয়েছে তখন এর সৃষ্টি কর্তা অবশ্যই আছে, এতে ভুল নেই। 


প্র :: যুক্তি ও পান্ডিত্য খানিক দূর পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু তার পরে সব অন্ধকার ।

উঃ:: কে বললে অন্ধকার? তাঁকে ব্যকুল হয়ে খুঁজলে নিশ্চয়ই দেখা পাবে। সঙশয় গ্রন্থির পরপারেই অপরূপ জ্যোতি ও অপার আনন্দ । ভগবানের জন্য ব্যাকুল হয়ে অনেকে তাঁর দর্শন লাভে ধন্য হয়েছেন। জগতের সমস্ত ধর্ম ইতিহাস তার সাখ্য দেয়। বিষয়ী লোকেরা সবকথা শুনে যায়, কিন্তু বিশ্বাস করে না।

প্র :: এত অবিশ্বাস আসে কেন বলুন তো ? 

উঃ :: এই অবিশ্বাসই হলো বাধা। শুধু বাধা নয় , বিষম ব্যাধি। পূর্বজন্মের সংস্কার গুলো খয় করে ফেলতে হবে। যার বিশ্বাস এসে গেল সে ভাগ্যবান। তার আর কোনো অভাব রইল না। বিশ্বাস দূর্লভ ধন। আমাদের রোগ হচ্ছে বাসনা ---- প্রতিকার হচ্ছে বিবেক। এই বিবেকরুপী ভগবান আমাদের সঙ্গে সঙ্গে ফিরছেন, তাঁকে ভুললেই সব পশু। 

প্র :: তাঁকে আমরা দেখতে পাই না কেন?

উঃ :: ঠাকুর বলতেন " সমুদ্রে রত্ন আছে, যত্ন চাই, সংসারে ঈশ্বর আছেন , সাধনা চাই। " তিনি আরো বলেছেন ______ পানায় ঢাকা পুকুরের সামনে দাঁড়িয়ে বলছো পুকুরে জল নেই, যদি জল দেখতে চাও তবে পানা সরিয়ে ফেল। মায়ায় ঢাকা চোখ নিয়ে ঈশ্বর দেখা যায় না, যদি ঈশ্বর কে দেখতে চাও মায়াকে সরিয়ে ফেল।

প্র :: আচ্ছা গেরুয়া না পরেও সন্ন্যাসী হওয়া যায় কি ?

উঃ :: ধর্ম হচ্ছে মনের। গেরুয়া না পরেও মুক্ত হওয়া যায়, মানুষ মানেই বদ্ধ, মানেই মুক্ত। আগে চাই মন, পরে বাহিরের সাহায্য। মন ভাল হলে গেরুয়ায় যেমন বাহিরের কিছু সাহায্য করে, মন খারাপ হলে তেমনি গেরুয়ার দ্বারা ভন্ডামির সহায়তা হয়। গেরুয়া, তিলক- ফোঁটা কাটা , তীর্থযাত্রা , হজ, কীর্তন, জপ, তপ কিছুই ধর্ম নয়; ধর্মের বহিরাবরণ মাত্র। এগুলি মানুষের মনকে ভগবৎকৃপার অধিকারী হতে সাহায্য করে।

প্র :: তবে মুক্তি কিসে হয় ?

উঃ :: জীবাত্মা পরমাত্মার জন্য আত্মহারা না হলে মুক্তি পথের সন্ধান পাওয়া যায় না। 

প্র :: আপনাদের মঠের সন্ন্যাসী হবার নিয়ম কি ? 

উঃ :: মঠের সন্ন্যাসী হতে গেলে প্রথম তিন বৎসর শিক্ষানবিশ থাকতে হবে , তারপর তিন বৎসর ব্রহ্মচর্য ব্রতচারী থাকতে হয়।এই ছয় বৎসর (বর্তমানে ৯ বৎসর) পরে মঠাধ্যখ্খ তোমার সন্ন্যাস গ্রহণের উপযুক্ততা বিবেচনা করে তবে সন্ন্যাস দেবেন। মঠের সন্ন্যাসীদের আদর্শ ত্যাগী, অদর্শ সেবক , অদর্শ সংযমী ও আদর্শ ভক্ত হতে হবে।

প্র :: ঐ ছয় বৎসর কি শিক্ষা করতে হবে ?

উঃ:: মিশনের মূলমন্ত্র ----- RENUNCIATION AND SERVICE ( ত্যাগ ও সেবা ), সংসারাসক্তি ত্যাগ, সর্বভূতে ভগবান দর্শন ও জীবকে শিব ঞ্জানে সেবা। 

প্র :: সেবার কাজটি বাড়ীর মেয়েদের কাছে ভালো শিক্ষা হয়, হিন্দুর মেয়ে আপন স্বামী-পুত্রের মে ভাবে সেবা করে তার চেয়ে বড় আদর্শ কিছু হতে পারে কি ?

উঃ:: সতীর‌ পরিসেবার মধ্যেও একটু স্বার্থ গন্ধ থাকে; কিন্তু মঠের সাধু ব্রহ্মচারিগন অসহায় রোগীকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনে পীড়িত নারায়ন ঞ্জানে নি:স্বার্থভাবে সেবা করে। 

প্র :: মঠের বড় কঠিন নিয়ম; ছয় বৎসর (বর্তমান নয় বৎসর ) শিক্ষানবিশ। ছয় বৎসর মেডিক্যাল কলেজে পড়লে ডাক্তার হওয়া যায়।

উঃ:: ডাক্তার হলে দৈহিক রোগের চিকিৎসা হবে বটে ; কিন্তু সন্ন্যাসী হতে পারলে ভবরোগ থেকে অব্যাহতি পাবে। 

প্র :: প্রতিবার কুম্ভমেলায় লাখ লাখ সাধুর সমাগম হয়, ওঁরা সকলেই কি ভবরোগ থেকে নিষ্কৃতি পাবেন ?

উঃ :: ওঁদের মধ্যে পেটের জন্য, নাম-যশের জন্য , ঔষধাদি দিয়ে অর্থোপার্জনের জন্য, রাজ দন্ড এরাবার জন্য অনেকে সাধু সেজে থাকেন, কিন্তু ভগবান লাভের জন্য সর্বত্যাগী বিবেক-বৈরাগ্যবান সাধু খুবই কম। বহু জন্মার্জিত তপস্যার ফলে কাম-কাঞ্চনে অনাসক্ত হলে সর্বত্যাগী সন্নাসী হওয়া যায়। মুমুখ্খু না হলে সন্ন্যাসী হওয়া যায় না।

স্বামী রামকৃষ্নানন্দ মহারাজ।




প্র :: আপনি বহুদিন তো আপনাদের শ্রীরামকৃষ্নদেবকে ভজনা করেছেন, কিছু পেলেন কি ?

উঃ:: শ্রীরামকৃষ্নদেব শুধু আমাদের নন। তিনি জগতের কল্যানের জন্য এসেছিলেন। ভগবান তাঁর শ্রীমুখ নি:সৃত " সম্ভবামি যুগে যুগে"  ..... এই বানীটির সার্থ্কতার জন্য অধর্মের অভ্যুুথ্থান ধর্মের সংস্থাপন, সাধুদের ও পরিত্রাণ ও 
পাপী_তাপীদের উদ্ধারের পথ প্রদর্শনের জন্য  যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। তিনি  শ্রীকৃষ্ণ রুপে, খ্রিস্টরুপে, মহম্মদরুপে, বুদ্ধরুপে, শঙ্কর রুপে  ও গৌরাঙ্গরুপে অবতীর্ণ হয়ে অনেক লীলা করে গিয়েছেন। বর্তমান যুগে তিনিই সর্বধর্ম সমন্বয়কারী যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ন। গীতার বাণী তিনি জীবনে প্রতিফলিত করেছেন । তাঁর  কামিনী কাঞ্চন ত্যাগের অশ্রুতপূর্ব দৃষ্টান্ত, লোক শিক্ষার্থ দ্বাদশ বৎসর কঠোর সাধনা এবং " যত মত তত পথ " ঘোষণা,  ধর্ম জগতে যুগান্তর এনেেছিল। তার শ্রীমুখ নি:সৃত " কথামৃত বাণী  " সারা বিশ্ব বাসীর কাছে তৃষিত প্র্রানে শান্তির বারী সেচন করেছে। তিনি বলেছেন ____ জীব , জগত, চতুর্বিঙশতি তত্ত্ব-----এসব তিনি  আছেন বলে সব আছে। তাকে বাদ দিলে কিছুই থাকে না।  একের পিঠে অনেক শূন্য দিলে সঙক্ষা বেড়ে  যায়।  কিন্তু এককে মুছে ফেললে শূন্যের কোনো মূল্য থাকে না।  জন্ম,  মৃত্যু এসব ভেল্কির মত। এই আছে এই নেই। শুধু আহার , নিদ্রা, বাসনা  ও ভোগের সেবাতেই জীবন খয় করলে কি ধর্ম হয়? ঈশ্বর লাভই জীবনের উদ্দেশ্য।  

প্র : যদি  আমার কর্মফলজনিত অদৃষ্টে যা আছে তাই অনিবার্য হয়,তবে  ঈশ্বর আরাধনা বা ধর্মকর্মে প্রয়োজন কি?

উ: অদৃষ্টবাদে আমার প্রগাঢ় বিশ্বাস; কিন্তু অদৃষ্ট অখণ্ডনীয় এ কথায় আমার  বিশ্বাস নেই।  কর্মফলরুপে অদৃষ্ট প্রকষ্টে ভাল_মন্দ, পাপ_পূন্য, সুখ_দু:খ, যা কিছু সঞ্চিত হয়েছে,  তা একেবারে অচল, অটল,  অখণ্ড বা অপরিবর্তনীয় ___ একথা আমি বিশ্বাস করি না।  এক পরমাত্মা ভিন্ন এই বিশ্ব সংসারে অদাহ্য, অখণ্ড, অশোষ্য, অচ্ছেদ্য বা অপরিবর্তনীয় অবস্থান আর কিছু থাকতে পারে না।  যেখানেই রোগ--সেখানেই ঔষধ,  যেখানেই অন্ধকার--সেখানেই আলো, যেখানেই অত্যাচার--সেখানেই পরিত্রাণ,  যেখানেই ধর্মগ্লানি--সেখানেই  ধর্মস্থাপন _____ ইহাই  সংসারের নিয়ম। সকল বিষয়েই যদি নিয়ম হয়,তবে  অদৃষ্ট সম্বন্ধে বিপরীত হবে কেন? যদি দুঃখ লাঘব হবার উপায় না থাকে,  তা হলে লোকে এত পূন্য সঞ্চয় করে কেন  ? এত পরোপকার, এতো দান, এতো কঠোর তপস্যা,  এতো তীর্থদর্শন,এতো শাস্ত্র চর্চা ও উপাসনার প্রয়োজনীয়তা কোথায়  ? যদি দূরদৃষ্ট খন্ডনীয় বা পাপমোচনের কনো উপায় না থাকে তবে যুগে যুগে অবতারের প্রয়োজন কি? যিশু খ্রিস্টের পরিত্রাতা   Savior কিংবা মহম্মদের রশুল Prophet  অথবা  শ্রীরামকৃষ্ণদেবের কপাল-মোচন নামের  সার্থকতা কোথায়? ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন  " তুমি একমাত্র আমার ধারণাগত হও , আমি তোমাকে সকল পাপ থেকে মুক্ত করব।" যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলেছেন  "চোখের জলে পূর্ব জন্মের পাপ ধৌত হয়ে যায়।"  যুগাচার্য স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন  " ভগবানের আরেক নাম  'কপাল মোচন '। তাঁর কৃপা হলে এক মূহুর্তে মানুষের কপাল  (অদৃষ্ট লিখণ) মুছে যেতে পারে। ভগবানের কাছে এই বলে কেঁদে কেঁদে প্রার্থনা কর ----'হে দয়াময়,  আমি অসহায় দুর্বল; ইহ জন্মে বা  জন্ম জন্মান্তরে ঞ্জাত বা  অঞ্জাতসারে যে সকল পাপ সঞ্চয় করিয়াছি  , তুমি দয়া করে সেইগুলি ক্ষমা কর । আমার সমস্ত কর্মফল ক্ষয় করে দাও প্রভু।  ' অনুতপ্ত  হৃদয়ে এইভাবে প্রার্থনা করলে,  ব্যাকুল প্রানে কাঁদতে পারলে নিশ্চয় তাঁর দয়া হবে।  ছেলে কাদলেই মায়ের আসন টলে।"


!!মঠের মহারাজদের জ্যোতি রহস্য !!



অনেকের মনে প্রশ্ন আসে......... বেশিরভাগ রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজদের মুখমণ্ডল কেন এত জ্যোতির্ময় হয়?

 এ বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে এক মা এবং তার যুবক ছেলের গল্প.... যারা মনে করেন ফ্রিতে দুধ আর ফল পেলে মুখের গ্ল্যামার ধরে রাখা যায়।

ব্যাপারটা আপাতদৃষ্টিতে হাস্যাস্পদ শোনালেও প্রশ্নটা থেকেই যায়, মহারাজদের জ্যোতির রহস্য কি?

মহারাজদের কর্মব্যস্ততা দেখে কখনোই মনে হয়না যে কর্পোরেট লিডারদের চেয়ে কোন অংশে তারা কম কাজ করেন কিংবা তাদের কাজের চাপ কম। তাদের খাদ্যাভ্যাস অত্যন্ত সাধারণ এবং সীমিত।

তাহলে কি সংযত আহারই আমাদের শরীরে দীপ্তি আনে?

নাকি সাংসারিক টানাপোড়েন আমাদের আপাত বার্ধক্যের দিকে নিয়ে যায়? দুশ্চিন্তার ভাঁজ কি আমাদের কপালে বলিরেখা তৈরি করে?

এগুলোর কোন বাক্যই অস্বীকার করা যায় না, তথাপি জ্যোতি রহস্য নিরুত্তর থেকে যায়।

অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে আমরা যতই চেষ্টা করি, শারীরিক উজ্জ্বল্য পেতে অভ্যন্তরীণ বিকাশ অপরিহার্য। মানসিক বিকাশ, অবচেতনের সেই স্তর করায়ত্ব না হলে সেই জ্যোতির প্রকাশ ঘটে না।

অভ্যন্তরীণ বিকাশের যে দশটি গুণ  মহারাজের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায় , তা সংক্ষেপে লিপিবদ্ধ করা হ'ল।

১) এক কাজ থেকে অন্য কাজে যাওয়াই বিশ্রাম। নিজেকে ব্যস্ত রাখা এবং নিজের মন যা চায় সে নিয়ে আমৃত্যু কাজ করাই জীবনে সুখী হওয়ার মন্ত্র। মনে রাখবেন, অলস মস্তিষ্ক আসলে শয়তানের কারখানা।

২) সারল্য। কোন ছেলের সঙ্গে কেবলমাত্র স্নেহ বাৎসল্য নয়, শিশুদের মত সরলতা নিয়ে মিশে যাওয়া এক বিশাল বড় গুণ। মনে রাখবেন জটিলতা অনেক সময় সীমাবদ্ধতা তৈরি করে, যেটাকে অবচেতনের ভাষায় বলে মেন্টাল ব্লক, আর সারল্য ধারণ করে অনেক ক্ষমতা, অসীমকে জয় করার দুঃসাহস। জীবন হয়ে ওঠে আনন্দময়।

৩) অন্যের জন্য কাজ করাটাই সবচেয়ে বড় সুখ। আপনি যতই নিজের ব্যাপারে ভাববেন, ততই মায়া জালে জড়িয়ে যাবেন। অন্যের থেকে আশা আপনাকে কষ্ট দেয়, অন্যকে সাহায্য করা আপনাকে আনন্দ দেয়। আমরা বাস্তবে ঠিক উল্টোটি করি।

৪) জীবনের বেশিরভাগ সুখী হওয়ার উপাদান ফ্রি। মুক্ত মনে হাসা, অন্যকে ভালোবাসা, প্রকৃতির মধ্যে থাকা, অন্যকে ভাল রাখা, সবই বিনামূল্যে করা যায়। তাই আপনার সুখী হওয়ার জন্য অর্থ লাগেনা।

৫) নিরন্তর শিখে যাও। শিক্ষার চর্চা, আমাদের ব্রেনকে অবচেতনের নতুন স্তরে উন্নীত করে। প্রত্যেকটি মহারাজ দিনে কোন না কোন সময় পঠন পাঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।

৬) ধ্যান বা সূর্য প্রণাম। মনকে স্থির করতে, কিংবা নিজের অবচেতনকে সংযত রাখতে এর চেয়ে বড় শক্তি নেই। বেলুড় মঠে ঘন্টার পর ঘন্টা আরতি, প্রকারান্তরে একটা ধ্যানেরই রূপক।

৭) সর্বদা ইতিবাচক। এটি একটি বিশাল বড় গুন। এই পৃথিবীতে খুব কম লোকের মধ্যে এই গুনটি দেখা যায়। আমাদের চিন্তার শতকরা ৭৮ ভাগই নেতিবাচক। রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার রামকৃষ্ণ মিশনের ডোনেশন অনেকাংশে কম করেছে, অথচ হা-হুতাশ না করে, বিকল্প সমাধানের পথ খুঁজতে মহারাজরা বদ্ধপরিকর।

৮) অহেতুক পারস্পরিক তুলনা আমাদেরকে নেতিবাচক চিন্তায় নিয়ে যায়, এটা মহারাজদের কোনদিন করতে দেখিনি।

৯) কৃতজ্ঞতা। ওনারা যার যার প্রতি কৃতজ্ঞ, উন্মুক্তচিত্তে স্বীকার করেন। কৃতজ্ঞতার চেয়ে বড় থেরাপি এই মহাবিশ্বে দ্বিতীয়টি নেই। ধন্যবাদ জ্ঞাপনে কখনো পিছপা হতে দেখা যায় না  মহারাজদের। স্বয়ং শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন - "মন কে শান্ত করতে হলে, তোমার কাছে যা আছে তার জন্য ঈশ্বর কে মন থেকে ধন্যবাদ জানাও, তার সাথে প্রেমের বন্ধন তৈরি কর। দেখবে মনের অশান্তি কোথায় হারিয়ে গেছে।"

১০) আপনি আপনার চিন্তার মতন বড়। আপনি এই বিশ্বকে যত ভালো ভাবেন, আপনার মস্তিষ্ক ততখানি উন্নত । মুখমণ্ডল কেবল তার বহিঃপ্রকাশ। কারো প্রতি ঘৃণা নয়, কেবল ভালোবাসা, কারো কাছে ঠকে যাওয়ার ভয় নয়, তাকে অকৃত্রিমভাবে সাহায্য করা, অমলিন চিত্তে ঠাকুর আর স্বামীজীর প্রার্থনা করা, তাদের বাণী বারংবার উচ্চারিত করলে অবচেতন ঐশ্বরিক মন্ত্রে দীক্ষিত হয়, তার দীপ্তি মুখমণ্ডলে প্রকাশ পায়।

মহারাজদের জীবন প্রমাণ করে মানব জীবন কত আনন্দময়। নিরলস শ্রম, অকৃত্রিম জীবে প্রেম, অদ্বৈত রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ সাধনা, অকুণ্ঠ জ্ঞানপিপাসা, সর্বদাই পৃথিবীকে বাসযোগ্য ভাবা, হাস্যকৌতুক এবং আনন্দের মধ্যে দিয়ে জীবনের রসগুলোকে উপভোগ করা। আর যখন কঠিন পরিস্থিতি আসবে সুচিন্তার মাধ্যমে নেতিবাচক শক্তিদের পরাস্ত করে আপনিও জ্যোতির্ময় হবেন।


No comments:

Post a Comment