Sunday, 23 June 2019

শ্রী রামকৃষ্ণদেবের জীবনের শেষ দিন।

আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে সঙগৃহিত
লেখক :: শঙকর



বিশ্বসঙসারের মৃত্যুহীন প্রাণেরা তো দেহাবসানের পরেই নতুন ভাবে বেঁচে ওঠেন। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেবের বেলাতেও একই আইন,‌ তবুও কাশীপুর উদ্যানবাটীতে বহু যুগ আগে শ্রাবণের শেষ কয়েকটি দিনে ভক্তজনদের বিনিদ্র রজনীর বৃত্তান্ত জানবার জন্য নতুন যুগের মানুষদের আগ্রহ বেড়েই চলেছে। আগ্রহ বাড়ায় আরেকটি কারন হল কলকাতা কর্পোরেশন কতৃপক্ষ তাঁদের শ্মাশানঘাটের একটি ঐতিহাসিক রেজিস্ট্রার থেকে রামকৃষ্ণ দেহাবসানের নথিপত্রের ছবি বেলুড়ের সঙগ্রহশালায় দান করতে চলেছেন।

১৯০২ সালে স্বামী বিবেকানন্দের দেহাবসান হলেও কোনো ডেথ সার্টিফিকেট নেই। এই কারনে অন্তত ঠাকুরের ইতিহাসটা আরও একটু জোরদার হল। যে দিনটি এত বছর পরে আবার মানুষের কৌতূহল পূর্ণ হয়ে উঠতে চাইছে, শ্রী রামকৃষ্ণ মিশনের অনন্তলোক যাত্রার সেই তারিখটি কবে?  ১৫ ই আগষ্ট ? না পরের দিন? পরবর্তী সময়ে ১৫ই আগষ্ট মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে দুটি কারণে। এক, সাতচল্লিশের মধ্যরাতে " ফ্রিডম অ্যাট মিডনাইট " এবং দুই, তারও বেশি কিছু দিন আগে আজকের থিয়েটার রোড বা শেক্সপিয়ার সরণিতে শ্রী অরবিন্দের আবির্ভাব দিবস ( ১৫ই আগষ্ট, ১৮৭২ )।

শ্রী রামকৃষ্ণদেবের তিরোধানও ১৫ই আগষ্ট মধ্যরাতে, এ কথা প্রায় সকলেরই জানা আছে। যার থেকে "শ্রাবণের শেষ দিনে কাশীপুরে" এই কথাটা ভক্তদের মুখে মুখে ঘুরত। কিন্তু শশ্মানের খাতা তো ভুল করে না। সেখানে ৯৫০ এন্ট্রিতে লেখা ------ ১৫ই আগষ্ট ১৮৮৬। এখন সবাই বোঝে, মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা বারোটার ঘর পেরোলেই তারিখ পাল্টে যায়। যদিও বাংলা হিসাবে সূর্যোদয়ের আগে পর্যন্ত পুরোনো তারিখটাই থেকে যায়। এই গোলমাল কাশীপুরে সরকারি ভাবে সংরক্ষিত প্রায়ান নথিতে রয়ে গিয়েছে। স্বামী প্রভানন্দ তাঁর " শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা " বইয়ের দ্বিতীয় খন্ডে  সরকারি নথি থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন -------------

রাম কিষ্টো প্রমোহঙশ
৪৯ কাশিপুর রোড, বয়স ৫২
মৃত্যু তারিখ - ১৫ আগষ্ট ১৮৮৬
সেক্স - পুরুষ, গতি ব্রাহ্মন
পেশা - " প্রিচার "
মৃত্যুর কারণ - গলায় আলসার
কে রিপোর্ট করেছেন -
জি সি ঘোষ, বন্ধু।


এই জি সি ঘোষের পূর্ব নাম ছিল গোপালচন্দ্র ঘোষ (সুর)। জন্ম ১৮২৮। যৌবন কালে চিনা বাজারে বিখ্যাত বেনীমাধব পালের দোকানে সামান্য চাকরি করতেন। শ্রী রামকৃষ্ণদেবের সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ ১৮৭৫। বয়সে বড় বলে ঠাকুর এই ভক্তকে " বুড়োগোপাল " বলে ডাকতেন। ইনিই নরেন্দ্রনাথ প্রমুখকে ১২ খানি গেরুয়া ও রুদ্রাখের মালা বিতরণ করেন ---- এর মধ্যে শেষ উপহারটি রাখা হয়েছিল গিরিশ ঘোষের জন্য। গোপাল পরবর্তী কালে বরাহনগরে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন আর নাম হয় স্বামী অদ্বৈতানন্দ। মঠ মিশনের প্রথম মিটিংয়ে (১৯০১) তিনিই সভাপতিত্ব করেন এবং পরবর্তী কালে দুবার মঠের অস্থায়ী সভাপতি হন। ২৮শে ডিসেম্বর ১৯০৯ সালে বেলুড় মঠে তাঁর দেহাবসান হয়।



ঠাকুরের শেষ দিনগুলির কাশীপুর বৃত্তান্ত দুই ভুবনবিদিত জীবনীকার--- মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত ও স্বামী সারদানন্দ কেউই বিস্তারিত ভাবে লিখে যাননি। মহেন্দ্রনাথ শুধু লিখেছেন ---- ঠাকুর দশমাস ধরে ভুগেছিলেন, গলায় ঘা হয়েছিল, ভক্তরা সেবা করে পরিশ্রান্ত, " ডাক্তারের হাত ধরে কাঁদতেন, ভাল করে দাও বলে " এবং শেষকালে বলতেন " মা আমার শরীর রাখবেন না "। কথামৃত-য় শেষ বিবরণ ২৪শে এপ্রিল ১৮৮৬। লীলাপ্রসঙ্গ রচয়িতা স্বামী সারদানন্দও কাশীপুরের শেষ অসুখের দিনগুলির বিবরণ লেখেননি। এ বিষয়ে চেতনানন্দ খোঁজখবর করেও বিশেষ কোনও বিবরণ দেখেননি।

শ্রীম ও স্বামী সারদানন্দ যে ঠাকুরের দেহাবসানের পরে কাশীপুরে উপস্থিত ছিলেন, তার প্রমাণ বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্স - এর ১৬ই আগষ্ট ১৮৮৬ তারিখের তোলা ছবিতে রয়েছে। ছড়ানো ছিটানো  স্মৃতিকথা থেকে স্বামী প্রভানন্দ তাঁর "শ্রীরামকৃষ্ণের অন্ত্যলীলা" বইতে অনেক খবর পাঠকদের উপহার দিয়েছেন। অন্য একটি বইয়ে বর্নিত হয়েছে কথামৃত রচয়িতা শ্রীম-র জীবনের পরবর্তী কালের একটি ঘটনা। বহু বছর পরে (৩০শে মার্চ ১৯২৪) তিনি একবার কাশীপুর উদ্যানবাটী দর্শনে গিয়েছিলেন। তখন এক আর্মেনিয়ান খৃষ্টান ওই বাড়িতে বাস করতেন। ঘরের একটি অংশ দেখিয়ে শ্রীম বললেন " এই খানে ঠাকুরের বিছানা ছিল। দখিন দেওয়ালের দিকে ছিল ঠাকুরের শিয়রে"। সেদিন ডাঃ বকশি তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন " ঠাকুর কেন খাটে শুতেন না?" শ্রীম বললেন " মেঝেতে শোয়া সুবিধে ছিল। দুর্বল শরীর, মাদুরের উপর শতরঞ্চি। তার উপর বিছানা।"

আবার " শ্রাবণের শেষ দিনে কাশীপুর উদ্যানে " নামক প্রবন্ধ থেকে জানা যায় ---- দখিনেশ্বরে অনেক দিন শ্রীরামকৃষ্ণের শরীর-স্বাস্থ বেশ ভালই ছিল। সুস্থ অবস্থায় তিনি আধসের থেকে দশছটাক চালের ভাত খেতেন। ব্যাধি বলতে আমাশয়। আর ছিল বায়ু বৃদ্ধি রোগ। কবিরাজের পরামর্শ মতো ছিলিমের ভিতর ধানের চাল ও মৌরি দিয়ে তামাক খেতেন। তাঁর গলা থেকে প্রথম রক্তক্ষরণ হয় আগষ্ট ১৮৮৫ তে। ডাক্তারি ভাষায় এর নাম " ক্লাজরিম্যানস থ্রোট " । প্রখ্যাত ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার তাঁকে দেখেন ২রা সেপ্টেম্বর ১৮৮৫তে এবং পরের মাসে ( ১২ অক্টোবর ) নিয়মিত চিকিৎসা শুরু করেন। তাঁরই সিদ্ধান্ত, রোগটা ক্যান্সার, কবিরাজি ভাষায় রোগটা রোহিনী রোগ। বাড়িওয়ালার চাপে শ্যামপুকুর আশ্রম ছেড়ে ৯০ কাশীপুর রোডে মাসিক ৮০ টাকায়, ছ মাসের জন্য চুক্তি। এখান থেকেই নরেন্দ্রনাথ তাঁর বন্ধুদের নিয়ে মিনার্ভা থিয়েটারের কাছে পীরুর রোস্তোরায় ফাউল কালীর অর্ডার দিয়েছিলেন। সে রিপোর্ট ঠাকুরের কাছেও গিয়েছিল। খরচাপাতির টানাটানি ও সেবকের সংখ্যা কমানোর বিভিন্ন সমস্যার কথা শুনে বিরক্ত ঠাকুর প্রিয়জনদের বলেছিলেন " তোরা আমাকে অন্যত্র নিয়ে চল ...... তোরা আমার জন্য ভিখ্যা করতে পারবি? তোরা আমাকে যেখানে নিয়ে যাবি, সেখানেই যাব।"

২৫শে মার্চ ১৮৮৬ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ জে এম কোটস এসেছিলেন তাঁকে দেখতে। শোনা যায় , ভূপতিনাথ মুখোপাধ্যায় ডাক্তার কোটসকে বত্তিস টাকা দিয়েছিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন , ডাঃ কোটস ভিজিট নেননি।

বিখ্যাত ডাক্তার রাজেন্দ্র নাথ দত্ত এলেন ৬ই এপ্রিল ১৮৮৬। এঁকে ঠাকুর জানিয়েছিলেন , ছোটবেলায় তাঁর পিলের চিকিৎসা হয়েছিল। কাশীপুরে মাঝে মাঝে রাঁধুনির অনুপস্থিতিতে রাঁধতেন ভক্ত তারক  ( পরবর্তী কালে স্বামী শিবানন্দ ) । একদিন খাবারের গন্ধ পেয়ে ঠাকুর বললেন " আমার জন্য একটু চচ্চড়ি নিয়ে আয়।"

" শ্রীরামকৃষ্ণ লীলামৃত " বইতে ভক্ত বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন " আগষ্ট মাসে ঠাকুর বললেন , ইচ্ছে হয় ইজের পরে ডিসবাটিতে খাই। সেই মত ব্যবস্থা হওয়ায় প্রভু খুব আনন্দ করলেন। "

এই সময়েই আসন্ন দেহত্যাগের আশঙ্কা বুঝতে পেরে ঠাকুর তাঁর সহধর্মিণীকে বলেছিলেন " তুমি কামারপুকুরে থাকবে, শাক বুনবে। শাক ভাত খাবে আর হরিনাম করবে।...... কারো কাছে একটি পয়সার জন্য চিৎহাত কোরো না, তোমার মোটা ভাতকাপড়ের অভাব হবে না। "

শেষের সেই দিনে খিচুড়ি নিয়েও বিশেষ গোলযোগ। সেবকদের জন্য শ্রীমা যে খিচুড়ি রাধছিলেন তার নীচের অংশ ধরে গেল।

বিকেলের দিকে পরিস্থিতি পরিবর্তন হওয়ায় ভক্ত শশী ( স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ ) কয়েক মাইল দৌড়ে গিয়ে ডাঃ নবীন পালকে ধরে নিয়ে এলেন। ঠাকুর বললেন " আজ আমার বেশ কষ্ট হচ্ছে।" ডাক্তারকে জিঞ্জাসা করলেন " সারবে?" । ডাক্তার নিরুত্তর। এক সময় ঠাকুর ভক্তদের বললেন, " একেই নাভিশ্বাস বলে " । ভক্তরা বিশ্বাস করল না।তারা ভাতের মন্ড নিয়ে এলো।

তখন প্রায় রাত ন'টা। হঠাৎ ঠাকুরের সমাধি। নরেন সবাই কে ' হড়ি ওঁ তৎসৎ ' কীর্তন করতে বললেন। সমাধি ভঙ্গ হল রাত প্রায় এগারোটায়। সেবক শশীর ইঙরাজীতে রাখা নোট অনুযায়ী, "পুরো এক গ্লাস পায়েস পান করেন"। তার পর ঠাকুর নাকি বলেন " আ: শান্তি হল। এখন আর কোনোও রোগ নেই।"


স্বামী অভেদানন্দ ও স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ ঠাকুরের শেষ মুহূর্তের বিস্তারিত বিবরণ রেখে গিয়েছেন। --------- " একটা বাজিলে অকস্মাৎ তিনি একপাশে গড়াইয়া পড়েন। তাঁহার গলায় ঘড় ঘড় শব্দ হইতে থাকে। নরেন তাড়াতাড়ি তাঁহার পা লেপে ঢাকিয়া ছুটিয়া সিঁড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়ে যান। এ দৃশ্য তিনি সহ্য করিতে পালিয়েছিলেন না। নাড়ি বন্ধ হয়ে গিয়েছে, আমরা সকলে ভাবিলাম, উহা সমাধি।"

সেই রাত্রেই দখিনেশ্বরে ঠাকুরের ভাইপো রামলালকে খবর দেওয়া হল। রামলাল এসে বলল " ব্রহ্মতালু গরম আছে, তোমরা একবার কাপ্তেন উপাধ্যায় কে খবর দাও।" তিনি তাড়াতাড়ি এসে বললেন .... মেরুদণ্ডে গব্যঘৃত মালিশ করলে চৌতন্যোদয় হবে। তিন ঘন্টার বেশি মালিশ করেও কোনো ফল হল না।

বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল লিখেছেন ... পরদিন সকালে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার সর্বপ্রথম উদ্যানে উপস্থিত হন। অভেদানন্দের বর্ণনা অনুযায়ী , ডাঃ সরকার বেলা দশ ঘটিকায় এসে নাড়ি দেখে বলেন, " ঠাকুরের প্রান বায়ু নির্গত হয়েছে।" অনেক বিচার বিবেচনার পর স্বামী প্রভানন্দের মতামত .... ' ডাক্তার সরকার কাশীপুর পৌচ্ছান বেলা একটায়। ডাক্তার সরকারের দিনলিপি ...... " খাওয়া দাওয়ার পর প্রথমে ডাফ স্ট্রিটে যাই এক রোগী কে দেখতে, তার পর পরমহংসের কাছে। তিনি মৃত। গত রাত্রে একটার সময় তাঁর দেহাবসান হয়েছে । He was lying on the left side legs drawn up, eyes open, mouth partly open ....... এর পর লেখা ডাক্তার মহেন্দ্রলাল ছবি তোলার নির্দেশ দিলেন এবং নিজের চাঁদা হিসেবে দশ টাকা রেখে গেলেন।

বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্সের ছবি তোলা সম্বন্ধে অভেদানন্দের বর্ণনা ----- " রামবাবু নিজে খাটের সন্মুখে দাঁড়াইয়া নরেন্দ্রনাথ কে তাঁহার পার্শ্বে দাঁড়াইতে বলিলেন। আমরা সকলে নির্বাক হইয়া সিঁড়ির ওপরে দাঁড়াইলাম।  বেঙ্গল ফটোগ্রাফার দুইখানা গ্রুপ ফটো তুলিয়া লইলেন।" কাশীপুর মহাশ্মশানের উদ্দেশ্য তাঁর যাত্রা শুরু হয়েছিল বিকেল ছ'টার পর।

১৬ই আগষ্ট ১৮৮৬ তারিখে তোলা বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্সের দুটি গ্রুপ ফোটোগ্রাফের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। মঠ মিশনের কতৃপক্ষ স্বাভাবিক কারণেই এই ছবি প্রচারে কোনোও দিন উৎসাহিত হননি। বৈকুণ্ঠনাথের মন্তব্য :: " পরিতাপের বিষয় , অত্যধিক লম্বা বশত প্রাতকালের সে জ্যোতির্ময় ভাবটি তখন অস্তমিত হইয়াছিল।"

সহজলভ্য না হওয়ায় এক সময় গ্রুপ ছবিটি সাইক্লোস্টাইল অবস্থায় বিক্রি হত। এক সময়ে চিরনিদ্রায় শায়িত রামকৃষ্ণের দেহ বাদ দিয়ে এই ছবি প্রচারিত হত। পরবর্তী সময়ে মার্কিন গবেষকেরা এই ছবিটি নিয়ে নানা ভাবে গবেষণা করেছেন এবং সেইমতো বিস্তারিত ক্যাপশন লিখেছেন। ঐতিহাসিক এই ছবিটির সব নায়কে শনাক্ত করা যায়নি। কারা সেদিন উপস্থিত ছিলেন এবং কারা ছবিতে স্থান পাননি , তা বোঝা এতদিন পরে খুবই কঠিন হয়ে পড়েছে। খুঁটিয়ে দেখলে কয়েকটি বালকের মুখও নজরে আসে। মার্কিন সম্পাদকরা ছবির বাঁ দিকে কিছু তোশক বালিশের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষন করেছেন। তাঁদের ধারণা, এগুলি ঠাকুরের ব্যবহৃত।

আরও নানা খবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। স্বয়ং নরেন্দ্রনাথ নাকি ঠাকুরের মহাসমাধির পরে একবার গঙ্গায় ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন---- শোক সামলাতে পারছিলেন না। আরও অনেক কিছু ঘটেছিল সেদিন কাশীপুরে এবং মহাশ্মশানে। শিষ্যেরা দাসের পখ্যে ছিলেন না, তাঁরা চেয়েছিলেন সমাধি। বিবেকানন্দের এক চিঠিতে------ "ভগবান রামকৃষ্ণের শরীরে নানা কারণে অগ্নি সমর্পণ করা হয়েছিল। এই কার্য যে অতি গর্হিত তার আর সন্দেহ নাই। এখ্নে তাঁহার ভস্মাবশেষ অস্থি সঞ্চিত আছে। উহা গঙ্গা তীরে কোনো স্থানে সমাহিত করিয়া দিতে পারিলে উক্ত মহাপাপ হইতে কথাঞ্চিৎ বোধ হয় মুক্ত হইব।"

স্বামী অভেদানন্দ লিখছেন " নরেন্দ্রনাথ বলিল ' দ্যাখো , আমাদের শরীরই শ্রী শ্রী ঠাকুরের জীবন্ত সমাধিস্থল। এসো, আমরা সকলে তাঁহার পবিত্র দেহের ভস্ম একটু করে খাই আর প্রবিত্র হই।' নরেন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম কলসি হইতে অস্থির গুঁড়া ও ভস্ম গ্রহণ করিয়া ' জয় রামকৃষ্ণ' বলিয়া ভখ্ন করিল।"

১৬ই আগষ্টের বিকেল বেলার আরও অনেক বিবরণ পাওয়া যায় --------- সেদিন আকাশে "বর্ষা  মেঘের হাল্কা আবরন।….. মহাসমাধিস্ত মহাপুরুষের শরীর বাহিরে আনয়নপূর্বক এক বিস্তীর্ণ শয্যায় শয়ন করাইয়া আদ্র বস্ত্রে অঙ্গ পরিস্কার করিয়া দেওয়া হইল। অদ্য মনের সাধে জন্মের মত চন্দন পরা হইল।..... প্রভু আমার যেন ফুলশয্যায় শয়ন করিয়াছেন।" আর একজন রামকৃষ্ণ অনুরাগী " ট্রিবিউন " প্রত্রিকার সম্পাদক নগেন্দ্র নাথ গুপ্তের বিবরণ " তাঁর মাথার নীচে একখানি আর পা-দুখানির মাঝখানে আর একটি বালিশ ...... এক খন্ড মেঘ থেকে বড় বড় থানার বৃষ্টি ঝরে পড়ল। উপস্থিত সকলকে বলতে থাকলো এই ছচ্ছে পুরানকথিত স্বর্গ হতে ঝরে পড়া পুষ্প বৃষ্টি। সংবাদ প্রত্রের রিপোর্ট অনুযায়ী , কলকাতা হইতে একশত , দেড়শত লোক যাইয়া আন্তোষ্টিকৃয়ায় যোগদান করিয়াছিল।"

স্বামী প্রভানন্দ লিখেছেন " এক ঘন্টার মধ্যে চিতা স্বকার্য সাধন করিয়া করিল । যখন চিতানল পূর্ন প্রভাবে জ্বালিতেছিল, ঠিক সেই সময় চিতার উপর গুলি গুলি বৃষ্টি হইয়াছিল।"  ঠিক কখন মহাসমাধি লাভ হইয়াছিল, তা নিয়ে সামান্য মতভেদের উল্লেখ করেছেন স্বামী প্রভানন্দ। ১৬ই আগষ্ট প্রাত: ১টা ২০ মিনিট। অন্য মতে ১টা ৬ মিনিট। সরকারের কাছে রিপোর্ট সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয়নি, বুড়োগোপাল এই রিপোর্ট দাখিল করেন তিনি দিন পর।

শ্মাশানে আরও অনেক কিছু ঘটেছিল। বিশেষ ভক্ত 'বসুমতী' পত্রিকার সতীশ মুখোপাধ্যায় কে শ্মাশানে সাপে কামরেছিল। আরও শোনা যায় , কেউ কেউ শ্মাশান থেকে অস্থি সঙগ্রহ করেছিলেন। তার মধ্যে একজন ছিলেন বুটে। সেগুলো নাকি এক সময় পূজো করা হত। নরেন্দ্রনাথের খুড়তুতো ভাই হাবু দত্ত (অমৃতলাল) পরবর্তী কালে একটা মালা পরতেন, যা নাকি শ্রীরামকৃষ্ণের পূতাস্থাতিতে তৈরি। এসব থেকেই আশঙ্কা হয় যে ঠাকুরের কিছু অস্থি আজও কোথাও কোথাও লুকিয়ে আছে।


রামকৃষ্ণদেবের শেষ শয্যা




**************************************+++++++++++++++++++++++++++++++++




১৬ অগস্ট  শ্রীরামকৃষ্ণ  বিদায় নিয়েছিলেন। 
রাত একটার কয়েক মিনিট পর শ্রীরামকৃষ্ণদেব চলে গেলেন। সেদিন ১৬ অগাস্ট সোমবার।

সকাল হল। খবর ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে।অনেকে বিশ্বাস করতে পারছিল না শ্রীরামকৃষ্ণ দেব মারা গেছেন।অনেকে ভাবছিল সমাধি হয়েছে।

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের কাছে লোক গেল।
মহেন্দ্র ডাক্তার  এলেন বেলা একটা নাগাদ। 
শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে কিছুক্ষণ   অনিমেষ নয়নে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, শবদাহের ব্যবস্থা কর।

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার  চলে গেলেন।
 দুমুর্খ ডাক্তার আর কার সঙ্গে ঝগড়া করবেন?
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল!পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বার করে বললেন, এই নাও। একটা ফটো তোলার ব্যবস্থা কর।বুকের কোথায় যেন একটা যন্ত্রনা হচ্ছে।জীবনে কাউকে তো কোনদিন  ভালবাসেননি।
সবাই বাইরেটাই দেখল।শুধু একজন চিনেছিল।

ডাক্তার সরকার ভাবলেন,আজ আর চেম্বারে  যাবেন না। আজ মহেন্দ্র ডাক্তারের  ঘরবন্ধ করে প্রাণভরে কাঁদতে ইচ্ছে করছে।

আজ  আকাশ মেঘলা। তখন বিকেল পাঁচটা। 
দোতলা থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের দেহ নামিয়ে রাখা হল একটি পালংকে।অজস্র সাদা ফুলে দিয়ে সাজান সেই পালংকে শ্রীরামকৃষ্ণ দেবকে  শায়িত করা হল।
ভক্তরা শ্বেত চন্দন  মাখিয়ে দিল সেই শরীরে।
চারিদিকে সুগন্ধি ভেসে বেড়াতে লাগল।

শবযাত্রা এগিয়ে  চলল কাশীপুর মহাশ্মশানের দিকে।
বিবেকানন্দ ও তাঁর  গুরুভাইরা বিষাদমুখে এগিয়ে চলেছেন। আজ বিবেকানন্দ যেন রিক্ত হয়ে গেলেন।চোখ দিয়ে অশ্রু নামছে।সন্ন্যাসী বলে কি কাঁদতে নেই? ভক্ত ভৈরব গিরিশের চোখ কেঁদে কেঁদে লাল হয়ে গেছে।তাঁর বকলমা নেওয়ার মানুষটি চলে গেলেন।

অনেক মানুষ সেই শবযাত্রায় হেঁটে চলেছেন।
এমন সময় আকাশ থেকে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল। তবে কি আজ আকাশও কাঁদছে? 
কোন কোন ভক্ত বলতে লাগল,আকাশ থেকে পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে।তারা সেই বৃষ্টির জল সারা শরীরে মাখতে লাগল পরম ভালবাসায়।

স্টার থিয়েটারের সমস্ত নট-নটী কলাকুশলী সবাই হাঁটছেন।তাঁদের মনের মানুষ আজ চলে গেলেন। 
 কলকাতার কোন বড় মানুষ তো তাদের  থিয়েটার দেখতে এলেন না। একমাত্র তিনিই তো আমাদের বুকে টেনে নিলেন। দূর থেকে কি বিনোদিনীর গান ভেসে আসছে,
" আমি ভবে একা/ দাও হে দেখা/
প্রাণসখা রাখো পায়। "
পরম সম্পদ আজ  হারিয়ে গেল  বিনোদিনীর!
বিনোদিনীর গান কি তখন দূর থেকে ভেসে আসছিল? 
" হরি মন মজায়ে  লুকালে কোথায়।"

সেদিন সেই শবযাত্রার মিছিলে একটি আশ্চর্য জিনিস দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল!
মিছিলে শ্রীরামকৃষ্ণের সেই সর্বস্ব ত্যাগী  যুবক শিষ্যদের  এক একজনের হাতে রয়েছে হিন্দু ধর্মের ত্রিশূল ও ওঁকার, বৌদ্ধ ধর্মের খুন্তি, মোহম্মদীয় ধর্মের  অর্ধচন্দ্র এবং খ্রিষ্ট ধর্মের ক্রুশবাহিত পতাকা।
মৃত্যুর পরও তাঁরা ভোলেননি  
"যত মত তত পথ" -এর সেই কথা।

সর্বধর্মের প্রতীক নিয়ে  শবদেহের   এরকম মিছিল পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা হয়ে রইল।

এই শ্রীরামকৃষ্ণ - বিবেকানন্দ কি  কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আদর্শ হতে পারেন? 
এটা কি আমরা ভাববো না?

শেষে, শ্রীরামকৃষ্ণের প্রয়াণের পর   রবীন্দ্রনাথ যে কবিতা স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত  " উদ্বোধন " পত্রিকায় লিখেছিলেন,  সেই কবিতা  দিয়ে আজ তাঁর প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা জানালাম,
" বহু  সাধকের 
বহু সাধনার ধারা
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তাঁরা।"
...
দেশবিদেশের 
প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার 
প্রণতি দিলাম আনি।"

No comments:

Post a Comment