Monday, 6 May 2024

দীক্ষা ও জপ

 

দীক্ষা নেওয়া ও জপ করা প্রসঙ্গে 




শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন  :  ঝিনুক হাঁ করে বসে থাকে । কখন স্বস্তি নক্ষত্রের জল মুখে এসে পরবে। যেই পরল অমনি সে অতল জলে ডুবে যায়। কেন ? কেন???? না, মুক্তা হবে যে ঐ এক বিন্দু জলে। গুরু মন্ত্র তেমনিই।  গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে খুব নির্জনে চলে যেতে হয় কিছুদিন।  দীক্ষার পর ক্রাইষ্ট চল্লিশদিন নির্জনবাস করেছিলেন বনে। জন  দি  বেপটিষ্ট দীক্ষা দিয়েছিলেন।  কী খাবেন, কোথায় শোনেন এসব কিছুই চিন্তা ছিল না। কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন এই চল্লিশ দিন কেউ তা জানতেও পারলো না। 

ঠাকুর বলতেন.... লোক সব কেমন জানো?? একজন একটা কুয়া খুঁড়ছে। খানিকটা নীচে পাথর বের হয়ে গেল। অমনি ওটা ছেড়ে দিল। আর একস্থানে খুঁরছে। ওখানে বেরোনোর বালি। ওটাও ছেড়ে দিল। আর এক স্থানে পেল একটা গাছের গুড়ি। ওটাও ছেড়ে দিল। সে ব্যাক্তির আর কূয়া খুঁড়ে হল না। জলতৃষ্নাও গেল না। তেমনিই হয়ে পড়েছে দীক্ষা নেওয়া। যেন এক ফ্যাসান। রোখ চাই রোখ, চাই বিশ্বাস। 

স্বামী ব্রহ্মানন্দ,  শ্রী শ্রী ঠাকুরের মানস পুত্র রাখাল মহারাজ,  দীক্ষিতের জপ ও ধ্যানের সাধনপদ্ধতি সম্বন্ধে বলেছেন  .......... আসনে বসেই অমনি জপ ধ্যান আরম্ভ করতে নেই।  প্রথমে বিচার করে মনকে বাইরে থেকে গুটিয়ে এনে, তারপর ধ্যান জপ আরম্ভ করতে হয়। কিছুদিন এইরকম অভ্যাস করতে করতে মন ক্রমশ স্থির হয়ে আসে। বেশ সোজা হয়ে পা মুড়ে বসে , দুটি হাত বুকের কাছে কিংবা উপর-পেটের উপর রেখে ধ্যান করতে হয়। জপের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি চিন্তা করতে হয়, নইলে জপ ভাল হয় না। পূর্ণ মূর্তির ধ্যান না হলেও যেটুকু সামনে আসে তা-ই নিয়ে ধ্যান আরম্ভ  করতে হয়।  প্রথমে প্রথম থেকে আরম্ভ করতে হয়। না পারলেও struggle করতে হয়। না এলে ছাড়বি কেন? করতেই হবে। ধ্যান কি আর সহজেই হয় ?

ধ্যান  জপ অভ্যাস করা প্রথম প্রথম বিশেষ দরকার। যদি ভালো নাও লাগে তবুও অভ্যাস করতে হবে। শুধুমাত্র অভ্যাসে অনেক কাজ হয়।  রোজ অন্তত দু ঘন্টা জপ করা দরকার।  কোনও নির্জন বাগানে, নদীতীরে, বড় মাঠের ধারে অথবা নিজের ঘরে একলা বসে থাকলেও অনেক সময় কাজ হয়। প্রথম প্রথম একটা routine করে কাজ আরম্ভ করতে হয়। এমন কোনও কাজের ভার নেওয়া উচিত নয়, যাতে routine টা ভেঙ্গে যায়। 

তিনি খ্যাদাভাস সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন......... সাধারণত প্রথম অবস্থায় খাওয়া দাওয়া সম্বন্ধেও বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।  শরীরের সঙ্গে মনের খুবই নিকট সম্পর্ক।  খাওয়ার দোষে শরীর  অসুস্থ হলে  ধ্যান জপ করা অসম্ভব।  সেই জন্যই খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে অত বিধি ব্যবস্থা রয়েছে। এমন খাবার খেতে হবে যা সহজে হজম হয় অথচ পুষ্টিকর, উত্তেজিত নয়। আবার বেশি খাবারও ভালো নয়, তাতে তমোগুন বৃদ্ধি পায়। খাদ্যদ্রব্য আধপেটা খাবে , জল এক-চতুর্থাংশ খাবে, বাকী এক-চতুর্থাংশ বায়ু চলাচলের জন্য খালি রাখবে।

জপ সম্বন্ধে শ্রীসারদা মা এক শিষ্যকে লিখেছিলেন...... জপ কমের মধ্যে ১০৮ বার, আর অতিরিক্ত যত পার ততই ভাল।  যদি আমার ধ্যান করতে তোমার বেশী ইচ্ছা হয়, তবে তাই করবে। কারন আমি আর ঠাকুরে কোন পার্থক্য নেই।  শুধু রূপের পার্থক্য।  যিনি ঠাকুর,  তিনিই এই দেহে আছেন।


আধ্যাত্মিক সাধনের একটি অন্যতম সহজ এবং দ্রুত ফলপ্রদ পন্থা হল জপ। দীক্ষিত ব্যাক্তি গুরুপ্রদত্ত ইষ্ট  মন্ত্র জপ করেন। যিনি ইষ্টমন্ত্র লাভ করেননি তিনিও ঈশ্বরের  কোনোও প্রিয় নাম পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করতে পারেন। মন্ত্র বা ঈশ্বরীয়  নাম পুন: পুন: উচ্চারণই  জপ।  ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন....... যার দাঁতে ব্যথা হয় , সে সব কাজ করে ঠিকই,  কিন্ত মনের একটা বড় অংশ ওই ব্যাপারের দিকে পড়ে থাকে। ঠিক তেমনিই সমস্ত কাজের মধ্যেও জপ করা যায়। এতে সর্বাবস্থায় মনের একটা অংশ ঈশ্বরে নিযুক্ত থাকে যা আমাদেরকে ক্রমশ:শুদ্ধ করে আধ্যাত্মিক অনুভবে নিমজ্জিত করে। 

জপ তিন প্রকার **** অর্থাত  জপের তিনটি বিভাগ রয়েছে: মানসিক (মনে), উপাংশু (খুব মৃদুভাবে জপ করা), এবং ভ্যাচিক (শ্রবণযোগ্য)।

শাস্ত্রে যে অবস্থাগুলির বর্ণনা আছে , নিজ জীবনে সেই অবস্থাগুলির বাস্তব আস্বাদন হল আধ্যাত্মিকতা। আর এর জন্য দরকার সঠিক অনুশীলন  এবং প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক শক্তি , যে আধ্যাত্মিক শক্তি আসে গুরু-শিষ্য পরম্পরা মাধ্যমে ইষ্টের নিকট হতে মন্ত্রবীজের আকারে। ট্যাঙ্ক জল যেমন নলের মাধ্যমে আসে, ঠিক তেমনই এই আধ্যাত্মিক শক্তি আসে ইষ্টের কাছ থেকে গুরুর মাধ্যমে।তাই যে শক্তিতে আমরা দীক্ষিত হয় তা ঈশ্বরের শক্তি। যেমন মাটির প্রতিমায় ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটে, তেমনি প্রকৃত দীক্ষার সময় মানুষ-গুরুর মাধ্যে  ঈশ্বরীয় শক্তির স্ফূরণ ঘটে। তাই  গুরু আর ইষ্টকে অভিন্ন ভাবতে বলা হয়।

         ^^** জপের   পদ্ধতি  **^^

বিভিন্ন ভাবে জপ করা যেতে পারে, তার মধ্যে একটি হ'ল মালার সাহায্যে জপ। মালাও বিভিন্ন প্রকারের হয়। যাঁরা শক্তিমন্ত্র জপ করেন তাঁরা সাধারণত রুদ্রাক্ষ মালা ব্যবহার করেন।

রুদ্রাক্ষ মালায় জপেরও বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। তার মধ্যে একটি হ'ল ডান হাতের মধ্যমার উপর মালাটি রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে জপ।

এক্ষেত্রে ১০৮ বার জপের উপযোগী রুদ্রাক্ষের মালা ডান হাতের মধ্যমার ১০ ও ১১ নম্বর করের (আঙুলের খাঁজ, যেখানে সংখ্যা গননা করা হয়) মাঝখানে রেখে বুড়ো আঙুলের অগ্রভাগের সাহায্যে এক একটি দানা জাপক নিজের দিকে টেনে আনবেন এবং এক...বার করে নাম স্মরণ করবেন।

মালার একটি অংশে সুতোর গুচ্ছ থাকে এবং ঠিক সেখানে অন্য দানাগুলির থেকে একটু অন্য অবস্থানে একটি অতিরিক্ত দানা থাকে, এটিকে 'সাক্ষী' বলা হয়। অনেকে একে গুরুর প্রতীক বলে গণ্য করেন।


জপের সময় সাক্ষী-দানায় গণনা করা যাবে না এবং সাক্ষীকে অতিক্রমও করা যাবে না। সাক্ষীতে পৌঁছে মালাটি ঘুরিয়ে নিয়ে আবার আগের মতো জপ করতে হবে। অর্থাৎ সাক্ষীর পরের দানা থেকে জপ শুরু হয়ে সাক্ষীর আগের দানায় পৌঁছালে ১০৮টি দানায় ১০৮ বার জপ হবে। এরপর মালা ঘুরিয়ে পুনরায় একই ভাবে ১০৮ বার জপ করতে হবে এবং এভাবে চলতে থাকবে।

*মালা কখনও নাভিদেশের নীচে যেন না পৌঁছায়* এবং জপের সময় মালা যেন অন্যরা না দেখে - মূলতঃ এই দুটি উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট থলির মধ্যে মালা রেখে জপ করতে হয়। 

মালা *তর্জনীদ্বারা স্পর্শ করতে নেই।* তাই জপের সময় তর্জনীকে একটু দূরে রাখতে হয়। 


জপের সময় জাপক নিজের হৃদয়কেন্দ্রে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের রূপ চিন্তা করবেন। প্রথমে ইষ্টের পদযুগল থেকে শুরু করে ক্রমে সমগ্র রূপটি চিন্তা করতে হয়। হৃদয়কেন্দ্রে পদ্মের আসনে তিনি বসে আছেন। জাপকের শরীর যেদিকে মুখ করে আছে সেই একই দিকে ইষ্টও তাকিয়ে রয়েছেন -- এ'  ভাবতে হয়। 

সহাস্য ও জ্যোতির্ময় সেই রূপ যেন রক্ত-মাংসের নয়, চৈতন্য জমাট বেঁধে তৈরি হয়েছে। এ'ভাবে ইষ্টের রূপচিন্তন ও নাম-স্মরণ একই সাথে চলবে। 

জপ যত গভীর হবে তত নতুন নতুন অনুভূতি হবে এবং জপের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকবে। 

জপ শেষ হ'লে মনে মনে ইষ্টের হাতে ওই জপের ফল সমর্পণ করতে হয়  মন্ত্র উচ্চারণ করে।

দীক্ষিত সাধকরা এসব জানেন। তাঁরা নিজের গুরুর নির্দেশিত পথেই চলবেন। কিন্তু যাঁরা দীক্ষিত নন তাঁরা  ঈশ্বরের কোনোও প্রিয় নাম  পুন: পুন:  জপ করতে পারেন। অথবা ব্রহ্মচারী জ্ঞানমহারাজ যেমন বলেছিলেন,

'ॐ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়'  

এই মন্ত্রও জপ করতে পারেন।  তাতেও সাধনার ফল লাভ হবে।

<×><×><×><×><×><×><×

***জপের উপকারিতা***


মা সারদা জপের উপরে খুব জোর দিয়েছেন। জপ করলে কিভাবে উপকার হয়? 

  #প্রথমত , ধরুন কোনো কারণে আপনার মনে দুশ্চিন্তা চলছে। এই অবস্থায় মনে এক বিশেষ ঢেউ (wave) উঠছে যার জন্য আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। এখন জপ করার অর্থ আপনি অন্য এক ঢেউ তুলছেন। জোর করে জপ করে গেলে এই নতুন ঢেউটি জোরালো হয়ে উঠে আগের ঢেউকে চেপে দেবে। কারণ দুটি তরঙ্গ একসাথে থাকতে পারেনা। এভাবে দুশ্চিন্তা-ঢেউ দূর হবে।••এভাবে মন থেকে অন্যান্য নেগেটিভ চিন্তা ও ভাব আপনি ইচ্ছামতো দূর করে মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পরেন।

 #দ্বিতীয়ত , মনে সবসময় কোনো-না-কোনো চিন্তা চলছেই আপনার অজান্তে। আর এই চিন্তা বা ভাবই আপনাকে প্রভাবিত করছে বা চালাচ্ছে। একে তো আপনার অবচেতন মন থেকে পুরনো স্মৃতি/সংস্কার উঠে আসছে, তার উপর বাইরের পরিস্থিতির প্রভাবও কাজ করছে মনের উপরে। ফলে আপনার চেতন মন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পরেনা সবসময়। 

     কিন্তু সচেতনভাবে জপ করে আপনি নিজেই এক বিশেষ ঢেউ ওঠাচ্ছেন মনে। এটা বাধা দিচ্ছে অবচেতনের চিন্তা ও বাইরের প্রভাবকে। অর্থাত আপনি সচেতনভাবে ঐ দুই ঢেউকে চেপে দিয়ে নিজের ঢেউকে কাজ করাচ্ছেন। এভাবে মনকে আপনিই চালাচ্ছেন। আপনি মালিক, মন ভৃত্য।

 #তৃতীয়ত , জপের মাধ্যমে আপনি অবচেতন মনে শুভ তরঙ্গ পাঠিয়ে দিব্য সংস্কার তৈরি করছেন। কিভাবে? 

পতঞ্জলি মুনি বলেছেন, জপের সময় মন্ত্রের অর্থ ভাবতে। যেমন মায়ের অর্থ করুণা, শিবের অর্থ শান্ত ভাব, কৃষ্ণ পালন কর্তা, ইত্যাদি। জপ করার সময় ঐ বিশেষ ভাব ওঠানোয় ঐ তরঙ্গ বা ঢেউ চলে যাচ্ছে মনের অবচেতন স্তরে। বারবার এভাবে করলে ঐ ভাবটি শক্তিশালী হতে থাকে। এবং আপনার মন দিব্য সংস্কারে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।

 #চতুর্থত , মন্ত্রের দুটি ভাগ -- বীজ ও নাম। বারবার জপ করলে ঐ বীজ কোনো বিশেষ চক্রে (মূলাধার ইত্যদি) গিয়ে ক্রমাগত ধাক্কা দিতে থাকে। ফলে চ্ক্র-সংযুক্ত নাড়ীগুলিতে কম্পন (vivration) ওঠে। এভাবে ঐ নাড়ীগুলি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ঐগুলির মাধ্যমে মনের গতি বা কর্মশক্তি বেড়ে যায়। আপনার মনের শক্তি বাড়ে।

     মন যেহেতু কাজ করে নাড়ীগুলির মাধ্যমে সেহেতু ঐগুলি যতো পরিস্কার বা smooth হয়, মন ততবেশি flow করতে পারে ঐ নাড়ীগুলি দিয়ে। মন এভাবে বেশি active হয় বীজ মন্ত্রের উচ্চারণে।


 #পঞ্চমত , প্রার্থনার ভাব নিয়ে জপ করলে আপনি এগিয়ে যান বিশ্বচেতনার দিকে। জপের মাধ্যমে যে দিব্য ঢেউ তুলছেন সেটা অবচেতন স্তর অতিক্রম করে অতিচেতনের দিকে যায়। একান্ত মনে তীব্র জপ করলে এটা ধ্যানে পরিণত হয়। আর তখন এটি বিশ্বচেতনার দিকে যাওয়ার শক্তি পায়।

     রূপকের মাধ্যমে বলতে হয়, বিশ্বচেতনা যেন TV আর ধ্যান-তরঙ্গের মাধ্যমে আপনি যেন remote টিপছেন বিশেষ চ্যানেলের জন্য। TV-তে যেমন সব চ্যানেল আছে, বিশ্বচেতনায় তেমনি সব সম্ভবনা রয়েছে। জপের মাধ্যমে আপনি যে বিশেষ ভাবটি তুলছিলেন, সেই ভাবটি গিয়ে বিশ্বচেতনা থেকে সমধর্মী ভাবের সাথে যুক্ত হয়। এবং যেহেতু ধ্যান অবস্থায় "জাগতিক আমি" মুছে যায় সেহেতু আপনার অহংকার কোনো বাধার সৃষ্টি করেনা। অর্থাত, মাতৃমন্ত্রের জপে যে করুণার ভাব ওঠাচ্ছিলেন সেটা বিশ্বচেতনার অসীম করুণা সম্ভবনার কাছাকাছি আসে। এভাবে গভীর দিব্যচেতনাকে অনুভব করেন আপনি।

এই পাঁচটির অনুভব যে একই সময়ে হবে আপনার তা নয়। কোনটি হবে তা নির্ভর করে আপনার ইচ্ছা ও সামর্থের উপর।

রামকৃষ্ণ ও সারদার এর অর্থ

 

রামকৃষ্ণ শব্দের অর্থ কি ??


যে নামকে অবলম্বন করে  জীবনযাপন করতে হবে, সে নামের অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা বিশেষ প্রয়োজন। কারণ এতে ঘনিষ্ঠতা বেশি হয়। কর্ম , উপাসনা, ,জপ ও ধ্যানের দ্বারা আমরা যার সাথে মিলিত হতে চাই, তিনি কে, কিবা তাঁর স্বরূপ --- এ ব্যাপারে  সম্পূর্ণ পরিষ্কার ধারনা থাকলে জীবনে রসানুভূতি হয়।

শব্দের বা নামের সাথে অর্থের এক সম্বন্ধ রয়েছে। যে কোনো শব্দের অর্থ সাধারণত দুই প্রকার----- শব্দার্থ ও মর্মার্থ।  " রামকৃষ্ণ " শব্দের শব্দার্থ ...... রাম কৃষ্ণরূপ দেহধারী মানুষবিশেষ। ইনি_____ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণির পুত্র। ইনি এক কালে  মা ভবতারিণীর পূজারী ছিলেন। এই " রামকৃষ্ণ   " শব্দের মর্মার্থ হল ...... ইনি সচ্চিদানন্দ, স্বতন্ত্র ঈশ্বর, বাতার্বরিষ্ঠও বলা যেতে পারে। নাম জপের সময় অর্থের বোধ হলে বৈধতা বিশেষভাবে উপলব্ধি করা হয় এবং ভিতরে আনন্দ হয়। 

কাশীর এক বিখ্যাত পন্ডিত -সন্ন্যাসী, স্বামী ভগতান্দ গিরি, রামকৃষ্ণ শতাব্দী উপলক্ষে " রামকৃষ্ণ " নামের   গূঢ়ার্থ উল্লেখ করেন ______এই রামকৃষ্ণ নাম সাধারণ দৃষ্টিতে দেখিতে  শুনিতে ছোট বলিয়া মনে হয়, কিন্ত বিচার দৃষ্টি দ্বারা দেখিলে ইহাতে বড়ই রহস্য ভরা রহিয়াছে দেখা যায়। যোগিজন যাঁহাতে রমণ করেন তিনিই রাম এবং যিনি ভক্তগনের দুঃখ বা পাপ আকর্ষণ করিয়া  নষ্ট করিয়া দেন , অথবা  স্বীয় ভক্তগণের মন নিজের দিকে আকৃষ্ট করিয়া  স্বীয় ভক্তিতে তল্লীন করিয়া দেন, তিনিই  শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ ভূ-ভার দূর করার জন্য সেই যুগে অবতীর্ণ হতে পেরেছিলেন। তাঁহাদের একত্র সমাবেশ এই রামকৃষ্ণ নাম হয়েছে। 

রাম নামে  বহু রহস্য আছে। যখন রাজা দশরথের গৃহে রাম অবতার রূপ ধারন করিলেন, তখন রাজা কুলগুরু মহর্ষ বশিষ্ঠকে ডাকাইয়া আনিয়া কহিলেন.... "হে গুরো, এই বালকের নামকরন করুন।" বশিষ্টজী " রাম " এইরূপ ছোট একটি নাম রাখিয়া দিলেন । তখন দশমরথ ও মন্ত্রিগন বলিলেন যে এ তো অতি ক্ষুদ্র নাম। কোনও "দুগুন" নামকরণ চাই, যে নাম রাজচক্রবর্তী পুত্রের যোগ্যতানুযায়ী হতে পারে। ইহাতে বলিলেন , " হে রাজন  "আপনি রাম নামের মহিমা জানেন না।  ' রাম ' শব্দে যে "রা" অক্ষর আছে তাহা হইল  "নমো  নারায়ণয় " -----ুইহা একটি সুপ্রসিদ্ধ  বৈষ্ঞবমন্ত্রের প্রাণ।  ইহা হইতে 'রা' অক্ষর পৃথক করিলে  " নমো নয়নায় " এইরূপ হইয়া যায়। তখন ইহার অর্থ হয় _______ " রূপরসাদি বিষয়কে নমস্কার "। এই রকম অনর্থ "রা" অক্ষর পৃথক করিলে হয়।




আবার কৃষ্ণ পদের আধ্যাত্মিক অর্থ ^^^^^ 
----কৃষ্ঞ ধাতুর অর্থ ত্রিকালারাধ্য-স্বরুপ ব্রহ্ম।  সৎ এবং আনন্দের যে অভেদ সদানন্দস্বরূপ ব্রহ্ম,  তাহাই হুইল কৃষ্ণ শব্দের অর্থ। যে সদ্-রূপ ব্রহ্মকে বাদ দিলে কোনোও বস্তুকে 'অস্তি' (আছে) এরূপ বলাই চলে না, যে আনন্দের বাদ দিলে আমরা কোনও বস্তুকে চাইতেই পারি না, -----সেই সৎ ও আনন্দ (সুখ) ই হইতেছে "কৃষ্ণ " শব্দের অর্থ। ঐ "কৃষ্ণ " যে " রামকৃষ্ণ " নামে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে তাহার মহত্ব বর্ণনাতীত।


এই ধরনের "রাম" শব্দের ম-কার " নম: শিবায়' এর মন্ত্রের জীবন। " নম: শিবায়" মন্ত্রের অর্থ হল _____ কল্যাণস্বরুপ শিবের জন্য প্রনাম। কিন্ত ম- কার বাদ দিলে হয়  " ন শিবায়" ----- এর অর্থ হল কল্যাণের জন্য নহে অর্থাত দু:খের জন্য >>>>>> এই প্রকারে বশিষ্টজী " রাম " নামের রহস্য বুঝাইয়া দিলেন, তখন  দশরথ  অত্যন্ত   প্রসন্ন হইলেন। ঐ "রাম" নাম শ্রীরামকৃষ্ণের নামের মধ্যে রহিয়াছে।

শরীর  ত্যাগের দু দিন আগে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বামীজিকে বলেছিলেন  " সত্যি সত্যিই ______ যে রাম,  যে কৃষ্ণ,  সে-ই ইদানীং রামকৃষ্ণ।   তবে তোর বেদান্তের দিক দিয়ে নয়। স্বামী তুরিয়ানন্দ ঠাকুরের এই বিখ্যাত উক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন   ' এর অর্থ এই যে , বেদান্তের অদ্বৈতমতে বলিয়া থাকে যে .....  জীব- ব্রহ্ম এক।ইহার অর্থ কেহ কেহ করে থাকেন যে, সকলেই রাম--- কৃষ্ণ  ইত্যাদি । তাঁহাদের বিশেষত্ব নাই। 

অদৈত্বমতে জীব সাধন, ভজন, সমাধি প্রভৃতির দ্বারা অঞ্জান দূর করিয়া ব্রহ্মভাব লাভ করিয়া ব্রহ্মের সহিত অভিন্ন হইতে পারে ; কিন্ত সহস্র চেষ্টা করিয়াও জীব ঈশ্বর হইতে পারে না।  ঈশ্বর যিনি তিনি চিরদিন ঈশ্বর। তিনি মনুষ্যত্ব ধারন করিয়া জীবের ন্যায় প্রতীয়মান হইলেও ঈশ্বর থাকেন,  কখনো জীব হন না।


সারদা নামের রহস্য l


 সা--সামীপ্যে l 

স অর্থাৎ সাধনা, সহিষ্ণুতা, সেবা, সমদৃষ্টি, সদাচার, সরলতা।এইসব দৈবী গুনাবলীর প্রতীক যিনি এবং যাঁর ধ্যানে সালোক্য, সামীপ্য, সারুপ্য ও সাযুজ্য  মুক্তি হয় l 

র--রক্ষণে l 

কমক্রোধাদি ষড়রিপু, বিপদ-আপদ, আধি-ব্যাধি, রোগ-শোক-জরা-মৃত্যু থেকে যিনি রক্ষা করেন l 

দা-দানে l 

জ্ঞান-ভক্তি- বিবেক- বৈরাগ্য, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ, সুখ-সম্পদ, আনন্দ যিনি দান করেন l 
_______যিনি জীবের ভরণ, পোষণ ও রক্ষা করেন l 
তিনিই সারদা।



শ্রীরামকৃষ্ণের  দেহ  গঠনের   বৈশিষ্ট্য   <<××>>

★শ্রীরামকৃষ্ণের  প্রতিকৃতিটি ভালো করে লক্ষ্য করলেই যেকোনো ভক্তের চোখে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য নজরে পড়বে ।

➪ডানদিকের ভ্রু এবং চোখ বামদিকের ভ্রু  চোখের থেকে লম্বা।

➪ ডানদিকের এবং বামদিকের কান ― দুটি দুইরকমের আকৃতি।

➪দুটি কানই চোখের সমতলের চেয়ে নীচে এবং দুটি ভিন্নতলে অবস্থিত।

➪ডানদিকের কাঁধ বামদিকের কাঁধের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া।

➪ডানহাতের ওপরের দিকের বেড় বামহাতের বেড়ের চেয়ে বড়।কনুই থেকে হাতের পাতা পর্যন্ত ডানদিকের অংশ বামদিকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় বলে মনে হয়।ডানহাতের গঠন পুরুষালি, কিন্তু বামহাতের গঠন স্ত্রী অঙ্গসুলভ।

➪ডানদিকের স্তন পুরুষদের মত কিন্তু বামদিকের স্তন স্পষ্টতই নারীসুলভ।

➪ডানহাঁটু বামহাঁটুর চেয়ে বেশি চওড়া, এবং হাঁটু থেকে ডানপায়ের পাতা পর্যন্ত গঠন পুরুষালি। কিন্তু বামপায়ের গঠন স্ত্রী অঙ্গসুলভ।

★উপরিক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি থেকে লক্ষ্য করা যায় ঠাকুরের এই মূর্তিটি স্পষ্টতই অর্ধনারীশ্বর মূর্তি।

★ঠাকুর নিজে তাঁর এই প্রতিকৃতি দেখে বলেছিলেন― এ মোহযোগীর মূর্তি।
🙏💐🌻🌼🌺🌸💐🌼🌻🏵️🌺🌸💐🙏