Saturday, 11 November 2023

বাগবাজারের কেল্লা $$ বলরাম মন্দির

 


বলরাম মন্দির ::-- রামকৃষ্ণ ভবন মঠ 


উত্তর কলকাতার বাগবাজার এলাকা। রামকৃষ্ণ এর পরমহংসদেব গৃহী ভক্তের মধ্যে বলরাম  বসু ঠাকুর রাম  দেবের সন্ন্যাসীর ভক্ত এমন অনেক ভক্ত ছিলেন যারা ছিলেন ওনার মত আজীবন ধর্মাচার করেছেন তার মধ্যে ছিলেন বলরাম বসু। প্রখ্যাত নাট্যকার গিরিশ ঘোষে র  প্রতিবেশী তিনি।

বলরাম বসুর পূর্ব পুরুষ হুগলি নিবাসী দেখতে পরে  কলকাতা ও পুরীতে  বসবাস শুরু। বলরাম বসু ছিলেন পরম বৈষ্ণব। কলকাতায় দেখতে আমার মেয়ের জন্য। পুলিভারী মহিলা পর জগন্নাথ দেবকে রোজ দেখতে পাওয়া বলোরাম বাবুকে দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু  রামকৃষ্ণ দেবকে খুঁজে বের করার জন্য তাঁর মধ্যে শঙ্খের আরাধ্য দেবকে  পান। তারপর আর কবি কলকাতা ও ঠাকুর রামকৃষ্ণকে ছেড়ে যান।

বলরাম বাবু ছিলেন জগন্নাথ দেবের পরম ভক্ত। তার কলকাতার বাড়িতেই জগন্নাথ দেব নিত্য পূজিত হন। এমনকি বাড়িতে রয়েছে রথও। স্বয়ং ঠাকুর রামকৃষ্ণ এই বাড়ির অন্ন গ্রহণ করেছেন,  এই বাড়ির অন্ন 'শুদ্ধ অন্ন', কারণ বলরামের বাড়িতে জগন্নাথের বাস।  শুধু জগন্নাথ নয়, সুভদ্রা-বলরাম স্বমহিমায়।




কলকাতায় বলরাম বোসের নামে একটি রাস্তা আছে, যার নাম বলরাম বোস ঘাট রোড। তাঁর পৈতৃক বাড়ি, যাকে আদর করে বলরাম মন্দির বলা হয়, এখন রামকৃষ্ণ মিশনের মালিকানাধীন । তার পৈতৃক বাড়িটির নাম এখন বলরাম মন্দির। এখানেই রামকৃষ্ণ মিশন অ্যাসোসিয়েশনের জন্ম হয়েছিল- স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর মাস্টারের নামে অ্যাসোসিয়েশন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার জন্য 1 মে 1897 তারিখে ঐতিহাসিক সভা করেছিলেন।  স্বামী বিবেকানন্দ , স্বামী ব্রহ্মানন্দ , স্বামী তুরিয়ানন্দ , স্বামী প্রেমানন্দ , স্বামী অখণ্ডানন্দ এবং স্বামী অদ্ভূতানন্দ সহ শ্রীরামকৃষ্ণের অনেক প্রত্যক্ষ শিষ্য বলরাম মন্দিরে থেকেছিলেন। পবিত্র মা শ্রী সারদা দেবীও বলরাম মন্দিরে অবস্থান করেছিলেন। মন্দিরের অভ্যন্তরে ভগবান জগন্নাথকে উৎসর্গ করা একটি ছোট মন্দির রয়েছে । এখানে ভগবান জগন্নাথের রথও রয়েছে যা শ্রী রামকৃষ্ণ রথযাত্রা (কার উৎসব) দিনে টেনে নিয়েছিলেন।  গদাধর আশ্রম , বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের অধীনে, কলকাতার ভবানীপুর এলাকায়, তার এক নাতির স্মরণে শুরু হয়েছিল। 




যে ঘরে রামকৃষ্ণ পরমহংস তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে দেখা করতেন, সেটি এখন ঠাকুরঘর। সারদা দেবী যে ঘরে বাস করতেন, সেই ঘরটিতে একটি সিংহাসনে সারদা দেবীর ফটোগ্রাফ রেখে পূজা করা হয়। বলরাম মন্দিরে আরও একটি ঠাকুরঘর আছে। এখানে বলরাম বসুদের পারিবারিক গৃহদেবতা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পূজা হয়। বলরাম মন্দিরের বারান্দায় একটি কাঠের ছোটো রথ রক্ষিত আছে। এই রথে বলরাম মন্দিরে রথযাত্রা উৎসবের আয়োজন করা হয়। উক্ত রথটি রামকৃষ্ণ পরমহংসও টেনেছিলেন বলে জানা যায়।

১৮৮৪ সালের ৪ জুলাই উল্টোরথের দিন এখানেই রথ টেনেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। পরের বছর ১৪ জুলাইও এখানেই রথ টানেন তিনি। তাঁর গৃহী ভক্তদের মধ্যে অন্যতম বলরাম বসু এখানেই রথযাত্রার আয়োজন করতেন। বারান্দায় রথ টানা হত। আজও তেমনই হয়। রথযাত্রা উপলক্ষে অসংখ্য মানুষ এখানে আসেন।

ভক্তদের নিয়ে বলরাম বসুর বাড়ির রথ টেনেছিলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ। পরের বছর রথের দিন আবার আসেন ঠাকুর। রথের রশিতে টান দিয়েছিলেন। কয়েকটি শতাব্দী চলে গেলেও ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের টানা সেই ছোট্ট রথটি আজও রথযাত্রার দিন আলাদা গুরুত্ব পায় অগনিত ভক্তদের হৃদয়ে। ঠাকুর দেহ রাখার পর বলরাম বসুর নির্দেশে ১৮৮৬-র ১৬ আগস্টের পর থেকে এই ছোট্ট রথে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার সঙ্গে পূজিত হন ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। এই বলরাম বসুর বাড়ির মধ্যেই ঘোরানো হত।


তবে  ঠাকুর দেহ রাখার পর বলরাম মন্দিরের জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রার মাসির বাড়ি হল রামকৃষ্ণদেব বাড়ি। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ঠাকুর তিনমাস বাগবাজারের যে বাড়িতে ছিলেন সেই বাড়িটি বর্তমানে একটি মন্দির। সেই মন্দিরটি বর্তমানে বলরাম মন্দিরের জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি বলে বিবেচিত হয়।


ঠাকুর রামকৃষ্ণদেব দেহ রাখার চার বছর পর ইহলোক ছেড়ে পরলোকে যান বলরাম বসু । কথিত আছে ১৮৯০ সালে ১৩ এপ্রিল স্বামীর মৃত্যুশয্যায় বলরাম বসুর স্ত্রী কৃষ্ণাভাবিনী দেবী অন্দরমহল থেকে দেখতে পান রামকৃষ্ণদেব একটি রথ নিয়ে তাদের বাড়ির ছাদে নামেন। তারপর সেই রথে শিষ্য বলরাম বসুকে সঙ্গে করে নিয়ে যান। এরপরই বলরাম ভবনের নাম বদলে নামকরণ করা হয় বলরাম মন্দির। 


ভারতীয় সাধনার মূলমন্ত্র সর্বজনে সেবা

 

সাধারণত: বই পড়া বা বিভিন্ন ডিগ্রি সংগ্রহ আমাদের তাত্ত্বিক ঞ্জান বৃদ্ধি করে। কিন্ত ধর্মের সঠিক মর্ম বুঝতে হলে চাই একাগ্রতা ও পবিত্রতা। ১৮৯৩ সালে বিশ্বধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববাসীকে শোনালেন  যে "সব ধর্মই মানুষকে নানা পথ দিয়ে এক ঈশ্বরের কাছেই নিয়ে যাচ্ছে।" ভারতীয় দর্শনের কথা প্রচার করলেন ভারতের বাইরে। কিন্ত এই ভারতীয় ঐতিহ্যের মূল শিকড় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে। স্বামীজি বলেছিলেন তিনি একজনের পদতলে শিক্ষালাভ করছেন,  যাঁর সারা জীবনটাই হয়ে উঠেছিল নানা ধর্মের সম্মেলন।  যৌবনের দোড়গোড়ায় কামারপুকুর থেকে এসে নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে ভবতারিণীর পূজোতে। রানী রাসমনি প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে তিনি তিরিশ বছরের থেকেও বেশী ছিলেন। ইংরেজ শাসিত ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। পাশ্চাত্যের ভাবধারার আগমনে নতুন চিন্তার জোয়ার বইছে সেখানে। কিন্ত আশ্চর্যের বিষয়, প্রাচীন পূজা অর্চনাকে কুসংস্কার ভেবে প্রায় বর্জন করতে চলেছে যে শহর , তারই অনতিদূরে নীরবে সাধনার ডুবে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণ।  প্রতিমাকে অবলম্বন করেই মানুষ ক্রমে অনন্ত ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে পারে , এই সত্যটা অনুভব করলেন তিনি । হিন্দুধর্মের সাধনার শেষে ইসলামি, সুফি মত ও খ্রিস্টান সাধনার সম্পন্ন করলেন তিনি। শ্রীরামকৃষ্ণ সেগুলিকেই অবলম্বন করেই, নানা ধর্মমতের সর্বোচ্চ সোপানে গিয়ে পৌচ্ছালেন। 


শ্রীরামকৃষ্ণ,  সারদাদেবী ও বিবেকানন্দকে পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তিন স্তম্ভ বলা যেতে পারে। সারা জীবন ধরে ধর্মজীবনের তত্ত্বগুলিকে নিজ জীবনে বাস্তব করে তুললেন শ্রীরামকৃষ্ণ,  সেই তত্ত্বগুলিকে আধুনিক ভাষায় ব্যাখ্যা করলেন স্বামী বিবেকানন্দ,  আর মা সারদা সংসারে বাস করেও, পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থতার বাস্তবায়ন দেখালেন। 




১৮৮২ থেকে শুরু করে ১৮৮৬ সাল অর্থাৎ তাঁর দেহান্তের বছর পর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন দিনের কথোপকথন সঙ্কলন করে রচিত হয়েছিল শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত।  প্রায়  দিনপঞ্জীর ঢঙে লেখা এই  বইটিতে শ্রীরামকৃষ্ণ যেন জীবন্ত হয়ে রয়েছেন। তার সাথে তদানীন্তন বঙ্গ বঙ্গসমাজের চিত্র প্রতিফলিত হয় এই বইটিতে। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সাধনার শেষে অস্থির হয়ে পরেছিলেন তাঁর কষ্টসাধ্য সাধনার নির্যাস অপরকে জানাতে। এ ব্যাপারে তিনি সকলকে আহ্বান জানিয়েছিলেন।  সেই আহ্বানে সারা দিয়ে সেই যুগে নানান মানুষ মিলিত হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে, আর অজান্তেই রচিত হয়েছিল এক ইতিহাস। সেই নিঃস্বার্থ আহ্বান প্রতিধ্বনি হয়েছিল বিশ্বজননীরও মনে। তাঁর কাছেও উপস্থিত হয়েছিল তদানীন্তন নব্যশিক্ষিত বাঙালিরা। এমনকি স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেষ্টি তাঁর ক্লাসে কবিতা পড়াতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের মনের কথা উল্লেখ করেছিলেন। 

তেজীয়ান যুবক নরেন্দ্রনাথ তখন যাতায়াত করতেন ব্রাহ্ম সমাজে। প্রায়ই যোগ দিতেন তাদের সমবেত উপাসনায়। তিনিও সঙ্গীত পরিবেশন করতেন সমাজের অধিবেশনে। আর ব্রাহ্ম সমাজের নেতারাও যাতায়াত করতেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। নরেন্দ্রনাথ পরিচিত ছিলেন এদের সকলের সঙ্গেই।  কিন্ত নিজের এক ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কারনে নরেন্দ্রনাথকে শ্রীরামকৃষ্ণের আরও কাছে নিয়ে আসে। আইনজীবী বাবার মৃত্যুতে সংসারের ভয়াবহ চেহারা তাঁর কাছে প্রকট হয়ে ওঠে। এর আগে তো নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে গিয়েছেন নানা ধরনের দার্শনিক প্রশ্নের সমাধানের জন্য।  কিন্ত এখন তিনি এক চাকরির সন্তানরা বিপন্ন যুবক। বেকারত্বের শৃঙ্খল তাঁর স্বপ্নকে চুরমার করে দিতে চলেছে। 

জীবনের এই কঠিন সময়েও নরেন্দ্রনাথ নিজের স্বার্থ চিন্তা করতে পারেনি। প্রচন্ড বিপদ মানুষের ভিতরের শক্তিকে প্রকাশ করে। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুপ্ররনায় জ্ঞান,  বিবেক ও বৈরাগ্যই কেবল চাইতে পারলেন ভবতারিণীর কাছে.......আর্থিক স্মৃতিচারণ পারলেন না । এমনকি যোগ যোগশাস্ত্রের সবচেয়ে বড়ো উপলব্ধি " নির্বিকল্প সমাধি " চাইতে গেলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে "স্বর্থপর" বলে তিরস্কার করলেন। আর বললেন  " তোকে তো বিশাল বটবৃক্ষের মতো হতে হবে, আর কত মানুষের প্রান জুড়াবে তাঁর ছায়ায় বসে।"



প্রচলিত বৈষ্ঞবধর্ম মানুষকে " জীবে দয়া " করতে শেখায়।  কিন্ত  শ্রীরামকৃষ্ণ "জীব"কে  দয়া করার চেয়ে , আরও উঁচু আদর্শের কথা শোনালেন...... " শিব ঞ্জানে জীব সেবা "।  বললেন যে, মন্দিরে মসজিদে যদি ভগবানের আরাধনা হয়, জীবন্ত মানুষে তা নিশ্চয়ই হতে পারবে। মথুরবাবুর সাথে বেনারস যাবার পথে তিনি নিজেও দেওঘরের দরিদ্র সাওতালদের মধ্যে অন্নবস্ত্র বিলিয়ে দিলেন। পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ এই শিক্ষাকে বাস্তবায়িত করতেই প্রতিষ্ঠা করেন  রামকৃষ্ণ মিশন।  শিব ঞ্জানে জীব সেবার এই আদর্শ  যেন হিমালয় থেকে  নেমে আসা ভাগীরথীর মতো প্রবাহিত হল, বহু তাপিত মানুষকে জাগিয়ে তুললো এক নতুন সেবাদর্শে।