সাধারণত: বই পড়া বা বিভিন্ন ডিগ্রি সংগ্রহ আমাদের তাত্ত্বিক ঞ্জান বৃদ্ধি করে। কিন্ত ধর্মের সঠিক মর্ম বুঝতে হলে চাই একাগ্রতা ও পবিত্রতা। ১৮৯৩ সালে বিশ্বধর্ম সম্মেলনে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্ববাসীকে শোনালেন যে "সব ধর্মই মানুষকে নানা পথ দিয়ে এক ঈশ্বরের কাছেই নিয়ে যাচ্ছে।" ভারতীয় দর্শনের কথা প্রচার করলেন ভারতের বাইরে। কিন্ত এই ভারতীয় ঐতিহ্যের মূল শিকড় তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে। স্বামীজি বলেছিলেন তিনি একজনের পদতলে শিক্ষালাভ করছেন, যাঁর সারা জীবনটাই হয়ে উঠেছিল নানা ধর্মের সম্মেলন। যৌবনের দোড়গোড়ায় কামারপুকুর থেকে এসে নতুন ভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেন দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরে ভবতারিণীর পূজোতে। রানী রাসমনি প্রতিষ্ঠিত মন্দিরে তিনি তিরিশ বছরের থেকেও বেশী ছিলেন। ইংরেজ শাসিত ভারতের রাজধানী তখন কলকাতা। পাশ্চাত্যের ভাবধারার আগমনে নতুন চিন্তার জোয়ার বইছে সেখানে। কিন্ত আশ্চর্যের বিষয়, প্রাচীন পূজা অর্চনাকে কুসংস্কার ভেবে প্রায় বর্জন করতে চলেছে যে শহর , তারই অনতিদূরে নীরবে সাধনার ডুবে গেলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। প্রতিমাকে অবলম্বন করেই মানুষ ক্রমে অনন্ত ঈশ্বরকে উপলব্ধি করতে পারে , এই সত্যটা অনুভব করলেন তিনি । হিন্দুধর্মের সাধনার শেষে ইসলামি, সুফি মত ও খ্রিস্টান সাধনার সম্পন্ন করলেন তিনি। শ্রীরামকৃষ্ণ সেগুলিকেই অবলম্বন করেই, নানা ধর্মমতের সর্বোচ্চ সোপানে গিয়ে পৌচ্ছালেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ, সারদাদেবী ও বিবেকানন্দকে পরবর্তীকালে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের তিন স্তম্ভ বলা যেতে পারে। সারা জীবন ধরে ধর্মজীবনের তত্ত্বগুলিকে নিজ জীবনে বাস্তব করে তুললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, সেই তত্ত্বগুলিকে আধুনিক ভাষায় ব্যাখ্যা করলেন স্বামী বিবেকানন্দ, আর মা সারদা সংসারে বাস করেও, পবিত্রতা ও নিঃস্বার্থতার বাস্তবায়ন দেখালেন।
১৮৮২ থেকে শুরু করে ১৮৮৬ সাল অর্থাৎ তাঁর দেহান্তের বছর পর্যন্ত শ্রীরামকৃষ্ণের বিভিন্ন দিনের কথোপকথন সঙ্কলন করে রচিত হয়েছিল শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত। প্রায় দিনপঞ্জীর ঢঙে লেখা এই বইটিতে শ্রীরামকৃষ্ণ যেন জীবন্ত হয়ে রয়েছেন। তার সাথে তদানীন্তন বঙ্গ বঙ্গসমাজের চিত্র প্রতিফলিত হয় এই বইটিতে। শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁর সাধনার শেষে অস্থির হয়ে পরেছিলেন তাঁর কষ্টসাধ্য সাধনার নির্যাস অপরকে জানাতে। এ ব্যাপারে তিনি সকলকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই আহ্বানে সারা দিয়ে সেই যুগে নানান মানুষ মিলিত হয়েছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে, আর অজান্তেই রচিত হয়েছিল এক ইতিহাস। সেই নিঃস্বার্থ আহ্বান প্রতিধ্বনি হয়েছিল বিশ্বজননীরও মনে। তাঁর কাছেও উপস্থিত হয়েছিল তদানীন্তন নব্যশিক্ষিত বাঙালিরা। এমনকি স্কটিশ চার্চ কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেষ্টি তাঁর ক্লাসে কবিতা পড়াতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের মনের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
তেজীয়ান যুবক নরেন্দ্রনাথ তখন যাতায়াত করতেন ব্রাহ্ম সমাজে। প্রায়ই যোগ দিতেন তাদের সমবেত উপাসনায়। তিনিও সঙ্গীত পরিবেশন করতেন সমাজের অধিবেশনে। আর ব্রাহ্ম সমাজের নেতারাও যাতায়াত করতেন শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে। নরেন্দ্রনাথ পরিচিত ছিলেন এদের সকলের সঙ্গেই। কিন্ত নিজের এক ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের কারনে নরেন্দ্রনাথকে শ্রীরামকৃষ্ণের আরও কাছে নিয়ে আসে। আইনজীবী বাবার মৃত্যুতে সংসারের ভয়াবহ চেহারা তাঁর কাছে প্রকট হয়ে ওঠে। এর আগে তো নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে গিয়েছেন নানা ধরনের দার্শনিক প্রশ্নের সমাধানের জন্য। কিন্ত এখন তিনি এক চাকরির সন্তানরা বিপন্ন যুবক। বেকারত্বের শৃঙ্খল তাঁর স্বপ্নকে চুরমার করে দিতে চলেছে।
জীবনের এই কঠিন সময়েও নরেন্দ্রনাথ নিজের স্বার্থ চিন্তা করতে পারেনি। প্রচন্ড বিপদ মানুষের ভিতরের শক্তিকে প্রকাশ করে। শ্রীরামকৃষ্ণের অনুপ্ররনায় জ্ঞান, বিবেক ও বৈরাগ্যই কেবল চাইতে পারলেন ভবতারিণীর কাছে.......আর্থিক স্মৃতিচারণ পারলেন না । এমনকি যোগ যোগশাস্ত্রের সবচেয়ে বড়ো উপলব্ধি " নির্বিকল্প সমাধি " চাইতে গেলে শ্রীরামকৃষ্ণ তাকে "স্বর্থপর" বলে তিরস্কার করলেন। আর বললেন " তোকে তো বিশাল বটবৃক্ষের মতো হতে হবে, আর কত মানুষের প্রান জুড়াবে তাঁর ছায়ায় বসে।"
প্রচলিত বৈষ্ঞবধর্ম মানুষকে " জীবে দয়া " করতে শেখায়। কিন্ত শ্রীরামকৃষ্ণ "জীব"কে দয়া করার চেয়ে , আরও উঁচু আদর্শের কথা শোনালেন...... " শিব ঞ্জানে জীব সেবা "। বললেন যে, মন্দিরে মসজিদে যদি ভগবানের আরাধনা হয়, জীবন্ত মানুষে তা নিশ্চয়ই হতে পারবে। মথুরবাবুর সাথে বেনারস যাবার পথে তিনি নিজেও দেওঘরের দরিদ্র সাওতালদের মধ্যে অন্নবস্ত্র বিলিয়ে দিলেন। পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ এই শিক্ষাকে বাস্তবায়িত করতেই প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মিশন। শিব ঞ্জানে জীব সেবার এই আদর্শ যেন হিমালয় থেকে নেমে আসা ভাগীরথীর মতো প্রবাহিত হল, বহু তাপিত মানুষকে জাগিয়ে তুললো এক নতুন সেবাদর্শে।



No comments:
Post a Comment