ঠাকুরের জন্ম, অজ ( অর্থ:- ঈশ্বর/ ব্রহ্মা/শিব/বিষ্ণু ) হলেও, মাতৃগর্ভে চন্দ্রমণির পুত্ররুপে ১৮৩৬ সালে ১৮ই ফেব্রুয়ারি। আর পিতা ক্ষুদিরাম। সকলের নয়নের মণি। ১৮৫৩ সালে দাদা রামকুমারের সঙ্গে (তখন বয়স ১৭ বছর ) কলকাতায় এলেন। ১৮৫৫ সালে দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়ীর প্রতিষ্ঠা। প্রথম পূজক রামকুমার, পরে গদাধর। ১৮৫৫ -- ১৮৮৫ আগষ্ট পর্যন্ত, অর্থাৎ ৩০ বছর দক্ষিণেশ্বরে থাকা। ১৮৮৫ এর সেপ্টেম্বরে শ্যামপুকুরে , ১৮৮৫ এর ডিসেম্বরে কাশীপুরে আর ১৮৮৬ এর ১৬ই আগষ্ট মহাপ্রয়ান।
নরেন্দ্রের সাথে প্রথম দেখা ১৮৮১ নভেম্বর, তখন তার বয়স ১৮ বছর। একসঙ্গে থাকা ১৬ই আগষ্ট, ১৮৮৬ পর্যন্ত.... মাত্র ৪ বছর ৯ মাস। গুরু শিষ্যের সম্মিলিত জীবনধারার ব্যাপ্তি মাত্র ২৩ বছর, অর্থাৎ এঁরা পৃথিবীতে একসময়ে ছিলেন ১৮৮৬ পর্যন্ত [১৮৬৩ -- ১৮৮৬]। নরেন্দ্রনাথ একা ছিলেন ১৮৮৬ থেকে ১৯০২, মাত্র ১৬ বছর। এই ১৬ বছরই ঠাকুরের দেওয়া কাজে নিজেকে নিযুক্ত রেখেছিলেন।
দেহত্যাগের কয়েকদিন আগে থেকেই শ্রীরামকৃষ্ণ প্রতি সন্ধ্যায় নরেন্দ্রনাথকে নিজের কাছে ডেকে দরজা বন্ধ করে দুই-তিন ঘন্টা ধরে ভবিষ্যতে তাঁকে কী কী করতে হবে, সে সম্বন্ধে নানা উপদেশ দিতেন। তারপর মহাসমাধির আর মাত্র তিন-চার দিন বাকি আছে, তখন তিনি নরেন্দ্রনাথকে ডেকে তাঁর মধ্যে শক্তিসঞ্চার করলেন। নরেন্দ্রনাথ বাহ্যসংঞ্জা হারালেন। বোধহয় সমাধিস্হ হয়ে পরেছিলেন। তারপর যখন বাহ্যসংঞ্জা ফিরল, তখন ঠাকুর তাঁকে বললেন :: " আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম। তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি। কাজ শেষ হলে ফিরে যাবি।" দেহত্যাগের যখন দুদিন মাত্র বাকি, ঠাকুর আবার ডাকলেন নরেন্দ্রনাথকে। তাঁর ভাবী সন্ন্যাসী শিষ্যদের সামনেই ঠাকুর স্পষ্টভাবে নরেন্দ্রনাথকে বললেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁদের দায়িত্ব নিতে। বললেন : " দেখ নরেন, তোর হাতে এদের সকলকে দিয়ে যাচ্ছি। কারণ তুই সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী। এদের খুব ভালবেসে , যাতে আর ঘরে ফিরে না গিয়ে একস্থানে থেকে খুব সাধনভজনে মন দেয়, তার ব্যবস্থা করবি। " এইভাবে ষ্পষ্টভাবে ঠাকুর সঙ্ঘ গড়ে দিয়ে গেলেন, সঙ্ঘনেতাকেও নির্দিষ্ট করে দিয়ে গেলেন এবং তা তিনি করলেন সঙ্ঘনেতা ও তাঁর রত্ন-সদৃশ সহকারীদের সামনে। তাই বলা যেতে পারে স্বামী বিবেকানন্দকে তিনি স্বয়ং আমাদের দিয়েছেন। এতবড় দানের তুলনা নেই। এ দান না পেলে সব নিয়েও আমরা নি:স্ব থাকতাম। আর বিবেকানন্দ দিলেন আমাদের এক নতুন পৃথিবী -- যা কিনা রামকৃষ্ণের ছাঁচে গড়া পৃথিবী।
ঠাকুরের সাধন পর্বগুলো ছিল এইরকম ::
প্রথম পর্ব $$ ১৮৫৫ - ১৮৫৯ :: দক্ষিণেশ্বরে ১২ বছর : ১৮৫৫ থেকে ১৮৬৭______ সাধনার প্রকৃতি ছিল--- রাগানুরাগভক্তি এবং দিব্যোন্মাদভাব। এই সাধনা শাস্ত্রনির্দেশ মেনে হয়নি। মনই ছিল তাঁর গুরু ; অষ্টপাশ ক্রম --- ঘৃণা, লজ্জা, ভয়, মান, কুল, শীল, জাতি, অভিমান ---- এসব থেকে মুক্ত হওয়া। এভাবে একমাত্র ব্যাকুলতা সহায়ক সব দর্শনার্থীদের হয় এবং তাঁর বাহ্যপূজাও ত্যাগ হয়।
দ্বিতীয় পর্ব $$ ১৮৫৯ -- ১৮৬২ : এই সময়ে শেষ দু-বছরে গুরু ভৈরবী ব্রাহ্মণীর নির্দেশে গোকুলব্রত থেকে আরম্ভ করে ৬৪ প্রকার তন্ত্র সাধনার অনুষ্ঠান।
ভৈরবী ব্রাহ্মণী যখন এলেন তখন দিব্যোন্মাদ অবস্থা। তিনি বুঝলেন , এসব মহাভাবের লক্ষণ, রাধারানী বা চৈতন্যদেবের হয়েছিল। গুরু তাকে পরম্পরা শাস্ত্রনির্দিষ্ট পথে গেলেন। তন্ত্রসাধানার স্থান হয়েছিল বেলতলায়। পঞ্চমুন্ডির আসন হলো। বিষ্ঞুক্রান্তায় প্রচলিত ৬৪টি কলা তন্ত্রে যত সাধন আছে সব কটি করেছেন। কী কঠিন এবং রোমাঞ্চকর সে সব আচার। সুন্দরী যুবতীর পূজা, তার কোলে বসে সমাধিস্হ, মড়ার খুলিতে মাছ রেঁধে ভোগ দিয়ে তা খাওয়া, কাচা নরমাংস চন্ডিকামূর্তি ধরে খাওয়া, আনন্দাসনে নর-নারীর সম্ভ্রান্ত দর্শন করে সমাধিস্হ হওয়া। শিব-শক্তির বিলাস দেখা এবং সিদ্ধ হওয়া। বীরভাবের পূজা, সবেতেই সিদ্ধি, সর্বত্র মাতৃভাবের উদয় এবং সমাধিস্হ হওয়া।
তৃতীয় পর্ব $$ ১৮৬৩ --১৮৬৬ ( চার বছর ) : [১] রামায়েত সাধুর থেকে রামমন্ত্র নিয়ে ভারতে বৈষ্নসন্মত তন্ত্রোক্ত সাধনার ( ৬৪ প্রকার ) সিদ্ধ হন। [২] আচার্য তোতাপুরীর কাছ থেকে সন্ন্যাস নিয়ে তিনদিন নির্বিকল্প সমাধিমগ্ন হন। [৩] সুফি গোবিন্দ রায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে ইসলাম ধর্মের সাধনা করেন। হজরত মোহম্মদজীর দর্শন লাভ করেন। [৪] শ্রীশ্রী মাকে ফলহারিনী কালীপুজোর দিন দেবীঞ্জানে ষোড়শী পূজা করেন। এখানেই সাধন-যঞ্জ পূর্ণ হয়।
এমনটি যে একজনক কারুর জীবনে হতে পারে তা অবিশ্বাস্য। তিনি হাজার হাজার বছরের বহু সাধকের, সিদ্ধের এবং অবতারের সাধনা এই ১২ বছরে শেষ করেন।
@ বাৎসল্য, মধুরভাবের সাধনা @ জটাধারীর (১৮৬৩-৬৪) রামলালা রয়ে গেলেন তাঁর কাছে, দাস্যভাব -- -- হনুমানজীর সাধনা। দিনরাত 'রঘুবীর ' বলে হাঁক দিবেন। পিছনে কাপড়ের জড়িয়ে বাঁশ ঘাড়ে করে বেড়াচ্ছেন লম্বা লম্বা পা ফেলে। কারোর দিকে দৃষ্টি নেই । মেরুদণ্ডের শেষ ভাগ বেড়ে গেল। ঠিক ল্যাজের মতন। দু:খানি সীতারাম দর্শন পেলেন। পায়ের কাছে হনুমান এসে বসল এবং জানিয়ে দিল। বলছেন, প্রথমেই সীতাকে দেখেছিলাম। তাই দু:খের জীবন কাটল।
@ মধুরভাব সাধনের সময় মেয়ের বেশ পরে থাকতেন, ঘেরা, কাকল, বারাণসী শাড়ি। কৃষ্ণবিরহে শরীরের লোমকূপ দিয়ে বিন্দু বিন্দু রক্ত বের হতো। শ্রীমতী রাধারানী কৃপা করে দেখা দিয়ে দেহে বিলীন হন। সব আশ্চর্য সাধনা, সিদ্ধি তাঁর।
@ ইসলাম সাধন :: গোবিন্দ রায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে আল্লা মন্ত্র জপ করতেন ত্রিসন্ধ্যা। নামাজ পড়তেন। তিনদিনই মোহাম্মদের দেখা পান। হিন্দু সংস্কার মুছে গিয়েছিলো মন থেকে।
@ খ্রিষ্টধর্ম সাধন :: দক্ষিণেশ্বর কাছেই যদি মল্লিকের বাগানবাড়িতে বৈঠকখানায় মা মেরীর কোলে যিশুকে দেখে অভিভূত হন। খ্রিস্টের অঙ্গ থেকে জ্যোতি এসে তাঁর শরীরে প্রবেশ করে। তিনদিন এভাবেই মুগ্ধ ছিলেন। মাকে মন্দিরে দেখতে যাননি। তিনদিন পর পঞ্চবটীতে বেড়াতে গিয়ে দেখলেন এক সুন্দর দেবমানব তাঁর কাছে এসে আলিঙ্গন করে শরীরে লীন হয়ে গেলেন। ঠাকুর বুঝলেন, ইনিই ঈশামসি যিশু।
@ বেদান্ত সাধন :: মন্দিরে মায়ের আদেশ নিয়ে এসে গুরু তোতাপুরীজীর নির্দেশে সাধন হলো। সন্ন্যাস নিতে হবে। গুরুপদে তোতাপুরীজিকে বরণ করলেন। বিরাজ হোম হলো। আহুতি শেষ হলো। কৌপিন পরিধান। সম্ভবত নাম হয় এসমই শ্রীরামকৃষ্ণ। মায়ের রূপ এল মনে। বারংবার তাই হচ্ছে, ঞ্জানখড়্গ দিয়ে কেটে দিলেন মাকে, গুরুর নির্দেশ। সমাধিস্হ হলেন______ তিনদিন তালাবন্ধ হয়ে থাকলেন। শেষে ওঁকার ধ্বনিতে জাগ্রত হন। এবার ষোড়শীপূজাতে নিজ স্ত্রীকে শাস্ত্রমতে ফলহারিণী কালীরূপে পূজো এবং জপমালাসহ ফল সমার্থক করলেন। এরপর থেকে আর সাধনা নেই।
জগৎ সমস্যার সমাধানের একমাত্র দিশারী তিনি। তাঁকে যত জানা যাবে ততই মঙ্গল। শিবঞ্জানে জীব সেবা প্রচলন করলেন তিনি। ভবিষ্যতের মানুষের জন্য দেশকালোত্তীর্ণ ধর্মীয় তত্ত্বের আলোক বিকিরণ করলেন। সব ধর্মের সাধন করে তাদের ধর্মের বৈধতা সম্পাদনও করলেন। উপদেশ দিলেন যে সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। সবাইকে সন্মান দিতে হবে। কেউ বড় নয়, কেউ আবার ছোট নয়।
যত মত তত পথ প্রচারে তিনি সবাইকে বললেন......... {১} যে ধর্মীয় পরিবেশে যে জন্মেছে, সেই পরিবেশের সে অনায়াসে ঈশ্বর লাভ করবে। শুধু দরকার ব্যাকুলতা, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা। তাহলেই নিজ নিজ ধর্ম ঠিক ধর্ম। {২} দ্বৈত-বিশিষ্টাদ্বৈত-অদ্বৈত পরস্পর বিরোধী নয়। {৩} অদ্বৈতই শেষ কথা। {৪} মন-বুদ্ধি সহায়ে বিশিষ্টদৈত পর্যন্ত বলা যায়। তখন নিত্য আর লীলা দুই-ই সত্য। {৫} বিষয়বস্তু মানুষের জন্য দ্বৈতভাব।....... তাই আজ রামকৃষ্ণ মিশনই যত মত ততপথ প্রচারের জন্য একটি সম্প্রদায়-বর্জিত সম্প্রদায় হয়ে উঠেছে। যেটা কিনা খুব একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। অসংখ্য মানুষ এই দলে আসবে ধর্ম লাভ করতে। ঠাকুরের যোগাবস্থার মূর্তি সবাই পূজা করবেন------- ঘরে ঘরে , প্রতি ঘরেই তিনি পূজ্য হবেন। সে ব্যবস্থাও তিনি করে গেছেন, আমরা সবাই উপলক্ষ্য মাত্র।
ধর্মরাজ্যে সব মতকে সন্মান দেওয়া প্রয়োজন। কেননা সব ধর্মের সত্যান্বেষনে রত। চরম সত্যেরই বিভিন্ন প্রকাশ।তাই তাদের সকলেরই মূল্য অপরিসীম। আর ব্যবহারিক ক্ষেত্রে , দৈনন্দিন জীবনে শিবঞ্জানে জীব সেবার মাধ্যমে সর্বজনীন ধর্মের রূপটি পরিষ্কার হয়। সব ধর্মকে সত্য বলা হলো , আবার প্রতিটি ধর্মের অনুগামীদের শিবরূপে সেবা করলে বিশ্বে শান্তি, কল্যাণ, সৌন্দর্য সহজেই প্রতিষ্ঠিত হয়।
স্বামী বিবেকানন্দ পূর্বাভাস করে গিয়েছিলেন যে, অচিরেই ভারতবর্ষ শ্রীরামকৃষ্ণদেবর হয়ে উঠছে। এদেশ জেগে উঠছে। পৃথিবীর কোনো শক্তিই একে থামাতে পারবে না। ভারতবর্ষ থেকে শ্রীরামকৃষ্ণরূপ যে শক্তি বেলুড় মঠকে কেন্দ্র করে উত্থিত -------- তা সমগ্র পৃথিবী প্লাবিত করে সকল মানুষের জীবনে শান্তি ও ঐক্যসাধন করবে। শ্রীরামকৃষ্ণ প্রদর্শিত মানুষের মাঝে ভগবানের সেবা করার যে শিক্ষা ____ তার প্রতি নিজেদের সঁপে দিতে বহু শত যুবমানুষ ...... কী মহিলা, কী পুরুষ, কী গৃহী, কী সংসারত্যাগী ....... সবাইকেই ভারতবর্ষে দেখা যায়। বেশ প্রতিভাশীল, অবস্থাসম্পন্ন, যুব, নারী ও পুরুষ ঈশ্বরঞ্জানে মানুষকে সেবা করতেও দেখা যায়।
২১শে সেপ্টেম্বর। সেই বিশেষ দিন, যেদিন ঠাকুরের প্রথম ছবিটি তোলা হয়েছিল। আজও যে ছবি অনেকের বাড়িতেই পুজো হয়।এমনিতে ঠাকুর নিজের ছবি তোলা একদমই পছন্দ করতেন না। সেই দিনটা ছিল ২১শে সেপ্টেম্বর, ১৮৭৯। ঠাকুরের অন্যতম ভক্ত ব্রাহ্মনেতা কেশব সেনের গৃহ "কমল কুটির" (বর্তমান ভিক্টোরিয়া ইন্সটিটিউশন, ৭২, আপার সারকুলার রোড, কলকাতা)-এ কীর্তনের আসরে ঠাকুর ভাবাবিষ্ট হন। ঠাকুর সমাধিস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে তাঁকে পেছন থেকে ধরে রাখেন ভাগ্নে হৃদয়রাম মুখোপাধ্যায়, যেন তিনি পড়ে না যান। এরূপ অবস্থায় ব্রাহ্মভক্ত বেষ্টিত সমাধিস্থ ঠাকুরের এই ফটোটি তোলা হয়। দি বেঙ্গল ফটোগ্রাফারস্, ১৯/৮, বৌ বাজার স্ট্রিট, কলকাতা— এই ফটো সংস্থাই ঠাকুরের উক্ত ছবিটি তোলেন।কিন্তু এই ছবির রহস্য কি! আসলে ঠাকুর দাঁড়িয়ে রয়েছেন মৃগ মুদ্রা তে। ছবিটিতে দেখাযায় ঠাকুরের দুই হাতের এক অনন্য ভঙ্গী। পরে তাঁর শিষ্য স্বামী প্রেমানন্দ এরপর লেখা থেকে জানা যায়, ঠাকুর এর উর্ধমুখী ডান হাত আসলে বোঝাই পরমাত্মা কে এবং বাম হাত টি বোঝাই এ বিশ্ব সংসার কে। এর অর্থ এ জগতের সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী, সবাই পর, সবাইকেই অবশেষে মিলতে হবে পরমাত্মা তে, কেউ এ ব্রহ্মান্ডের কিছুই নিয়ে যেতে পারবেনা ।
শ্রী রামকৃষ্ণ ও বামাক্ষ্যাপার মহামিলন -‐-------‐--------------------------------------
বামাক্ষ্যাপা একবার কলকাতায় এসেছিলেন। সেবার তিনি কালীঘাটে যান মা কালীকে দর্শন করতে। মন্দিরে যাওয়ার আগে শ্মশানঘাটে পাশের আখড়ায় গাঁজা খেয়ে বামাক্ষ্যাপা আদিগঙ্গায় স্নান করতে গেলেন৷
আদিগঙ্গায় স্নান করে তিনি এসে দাঁড়ালেন মায়ের মূর্তির সামনে। বললেন, 'চল মা, তোকে আমি তারামার কাছে নিয়ে যাব।' একথা বলে যেই তিনি মূর্তি স্পর্শ করতে যাবেন, তখনই উপস্থিত ব্রাহ্মণরা বাধা দিয়ে উঠলেন। বললেন, বাইরের কাউকে তাঁরা দেবীমূর্তি স্পর্শ করতে দেবেন না। এতে বামাক্ষ্যাপার খুব কষ্ট হল। শিশুর মতো অভিমান করে বলে উঠলেন, চাই না আমি মা কালীকে। অমন রাক্ষুসে রূপ। এর থেকে আমার তারামা ভালো। আহা, আমার তারা মায়ের রূপের কী বাহার। একথা বলে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এর পরে অন্যান্যরা যখন ভুল বুঝতে পেরে তাঁর কাছে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে বললে, ঠাকুর আপনি ফিরে চলুন। আমাদের ভুল হয়েছে। আপনি মূর্তি স্পর্শ করতে পারবেন। কিন্তু তিনি আর স্পর্শ করলেন না মায়ের পাষাণ বিগ্রহ। ধীর স্থির শান্ত অচঞ্চল পদক্ষেপে বেরিয়ে এলেন মন্দির থেকে।
ক্ষোভে দুঃখে তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসার সময় দেখা হয় যুগাবতার ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের সঙ্গে। তিনি মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছেন এদিকে রামকৃষ্ণ দেব মন্দিরে ঢুকছেন৷ দুই মহামানবের আলিঙ্গন হয়৷
রামকৃষ্ণ দেব বামাক্ষ্যাপার অমন ক্রুদ্ধ মুখ দেখে বললেন, 'চলো শ্যাম নগরে আমার আরেক মা আছে তার সঙ্গে দেখা করে আসি।' বামাক্ষ্যাপা কোন আপত্তি না করে চললেন রামকৃষ্ণ দেবের সঙ্গে শ্যামনগরে মা কালীকে দেখতে। রামকৃষ্ণ দেব বামাক্ষ্যাপাকে নিয়ে আদিগঙ্গা দিয়ে নৌকায় চাপিয়ে বামাক্ষ্যাপাকে নিয়ে গিয়েছিলেন শ্যামনগর ''মূলিজোড় কালী মা '' দর্শন করতে৷
যে মা একসময় গঙ্গায় নৌকায় বেয়ে যাওয়া রামপ্রসাদ সেনের গান শুনতে চেয়েছিলেন৷ রামপ্রসাদ মাকে বলেছিলেন, "তোর যদি গান শুনবার ইচ্ছা হয় তো তুই ঘুরে শোন — আমার আজ কাজ আছে, দাঁড়িয়ে (থেমে) তোকে গান শোনাতে পারব না৷" ভক্তের গান শোনার জন্য মা — মন্দির সমেত দক্ষিন থেকে পশ্চিম দিকে ঘুরে গিয়েছিলেন৷ আজও সেই মন্দির বর্তমান৷ মন্দিরে কৃষ্ণকালী মূর্তি আছে৷ পৌষ মাসে জোড়া মূলা দিয়ে পূজা দিতে হয় সেই জন্য "মূলাজোড় কালী বাড়ী" নামে খ্যাত৷
মাকে দেখে বামাক্ষ্যাপা পরম শান্তি লাভ করেছিলেন৷ মায়ের অমন দিব্য সৌম্য রূপ দেখে বামাক্ষ্যাপা শান্ত হয়ে গেলেন। শ্যামনগরে গঙ্গায় স্নান করে বামাক্ষ্যাপা ওই রাত্রে নিজে মায়ের পূজাও করেছিলেন৷
শ্যামনগরের কালীবাড়িতে পূজা করে তারপর সেখান থেকে আবার রামকৃষ্ণ দেব ও বামাক্ষ্যাপা নৌকায় করে এসে বামাক্ষ্যাপাকে হাওড়া ষ্টেশনে ছেড়ে যান এবং নৌকায় রামকৃষ্ণদেব দক্ষিণেশ্বরে চলে যান৷ বামাক্ষ্যাপা ফিরে যান তার তারা মায়ের কোলে তারাপীঠে।
*ইতিহাসের ছাত্রের চোখে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস দেব*
----------------------------------------‐----------------------
ধার্মিকের চোখে শ্রীরামকৃষ্ণ অবতার। তিনি মুক্তির পথ। কিন্তু ইতিহাসের ছাত্রের কাছে তিনি বহুরূপে অবস্থান করবেন। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর এক আশ্চর্য মানুষ। হ্যাঁ, মানুষ। এমন একজন মানুষ, যাঁকে অনুসরণ করলে মানব সভ্যতার উত্তরণ হয়। বিদ্যাসাগর ছিলেন চরম নাস্তিক। তাই তিনি সে যুগে দাঁড়িয়েও বলতে পেরেছিলেন, "আমি লোকাচারের দাস নই"। বিদ্যাসাগর কোনোদিন মন্দির মসজিদ গীর্জায় যাননি। ঈশ্বর সম্পর্কে তাঁর মনের ভাব জিজ্ঞেস করায় বিদ্যাসাগর স্পষ্ট বলেছিলেন, তাঁকে জানার মতন সময় আমার হাতে নেই।বিদ্যাসাগর প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, মানুষের সেবা করে, মানুষকে ভালোবেসেই স্বয়ং 'ঈশ্বর' হয়ে ওঠা যায়।
শ্রীরামকৃষ্ণ আবার প্রবল ধার্মিক। জমিদার বাড়ির পুরোহিত তিনি। নিয়মিত মায়ের পুজো করেন। এমন একজন মানুষ কিনা ইতিহাসের ছাত্রের চোখে এক মহান বিপ্লবী, সমাজ সংস্কারক রূপে ধরা দেন। তাঁর কাছে ধর্ম তো কোনোদিন আচারসর্বস্ব ছিল না। মন্দিরে বসেই কিনা তিনি পরম মমতায় ভেঙে দিয়েছিলেন ধর্মে ধর্মে বিভেদের খড়ির গণ্ডি। সকল সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তাই তিনিই বলতে পেরেছিলেন ‘যত মত তত পথ’। সেই যুগে এর মতন অত্যাশ্চর্য ঘটনা আর কী হতে পারে! শুধু তাই নয়, প্রচলিত হিন্দু ধর্মের ভেতরে থেকেই তিনি তাঁর মতন করে মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছেন। পাঁচওয়াক্ত নমাজ রাখছেন। শুধু মুসলিম ধর্ম নয়, খ্রীস্ট ধর্ম সহ আরো অনেক ধর্মেই উপাসনা করছেন। অতএব, সে অর্থে তিনি বিপ্লবী। হিন্দু ধর্মের মধ্যে থেকেই এ এক ভয়ঙ্কর নিঃশব্দ বিপ্লব। শুধু তাই নয়, অন্য ধর্মে উপাসনা করতে গিয়ে তিনি আরো যেসব কান্ড করছেন, তাতে সমকালীন সমাজ শিউরে উঠছে। অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে তিনি হয়ে উঠছেন সংস্কারক।
যাঁর হৃদয়ে অফুরান মানবপ্রেম, তিনি মানুষের হিতে নিজের সর্বস্ব ত্যাগ করতেও তৈরি ছিলেন।
ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে একটি ঘটনার কথা শুনিয়ে এই 'সর্বস্ব ত্যাগ'এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে চাই।
সেটা ছিলো ১৮৬৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাস। জমিদার মথুরামোহনের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণও চলেছেন রাণাঘাটের কলাইঘাটায়। নদী পথে চলেছে তাঁদের বজরা। মথুরামোহন শুনেছেন, কলাইঘাটায় তাঁর জমিদারি'র প্রজারা খাজনা দিচ্ছে না। প্রজাদের বক্তব্য, দুর্ভিক্ষের কারণে তাঁদের অবস্থা এতোটাই খারাপ যে, খাজনা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তাই প্রজারা খাজনা মকুব করার জন্য জমিদারের কাছে এসেছেন দরবার করতে। মথুরবাবু দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী জমিদার। তিনি তো খাজনা মকুব করবেনই না। উপরন্তু প্রজাদের উপর বেশ হম্বিতম্বিও শুরু করেছেন।
ঠাকুর আপনজগতেই ছিলেন। গুনগুন করে গান গাইছেন। প্রকৃতির শোভা দেখছেন। হঠাৎ তাঁর কানে এলো মথুরামোহনের সঙ্গে প্রজাদের কথোপকথন। এবার ভালো করে প্রজাদের দেখলেন তিনি। ওদের কঙ্কালসার চেহারা জানান দিচ্ছে বড় অসহায় ওরা। তিনি মথুরবাবু কে প্রশ্ন করলেন- "ওরা কারা?"
মথুরবাবু উত্তর দিলেন," ওরাই আমার প্রজা।"
ঠাকুরের ঘোর যেন কেটে গেল। মথুরবাবুকে বেশ জোরের সঙ্গে বললেন," যারা নিজেরা খেতে পারেনা, তাদের কাছ থেকে তুমি এভাবে খাজনা আদায় করবে!"
মথুরবাবু যথারীতি কঠোর," এসব তুমি বুঝবে না ঠাকুর। অবস্থা যেমনই হোক, জমিদারকে খাজনা তো দিতেই হবে।"
এরপর ঠাকুর যা বললেন, তার জন্য মথুরামোহন প্রস্তুত ছিলেন না। ঠাকুর বললেন," এই ক্ষুধার্ত মানুষের পয়সা দিয়ে তুমি মা ভবতারিণী'র পুজো করবে! সে পুজোয় আমি থাকবো না। আমি আর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাবোনা।"
এ এক অদ্ভুত সত্যাগ্রহ। অচেনা অজানা মানুষের জন্য দক্ষিণেশ্বরের প্রধান পুরোহিত বলছেন, মন্দিরে আর মায়ের পুজো করবেনই না!
সেদিন মথুরামোহন অনেক অনুনয় বিনয় করে ঠাকুর কে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। এভাবে প্রজাদের খাজনা মকুব করা যায় না। ঠাকুর গোঁ ধরলেন, শুধু খাজনা মকুব করা নয়, এই দুর্দিনে প্রজাদের অর্থ সাহায্যও করতে হবে। এর অন্যথা হলে, তিনি আর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাবেন না। সেদিন, শ্রীরামকৃষ্ণ'র জেদের কাছে হার মেনেছিলেন জমিদার মথুরামোহন। কলাইঘাটার প্রজাদের খাজনা মকুব তো করলেনই, উপরন্তু তাদের জন্য অর্থ সাহায্যও করলেন।
ইতিহাস জানে, এমন ঘটনা একবার নয়, একাধিকবার ঘটেছে। বারবার ঘটেছে। মথুরামোহনের সঙ্গে কাশী বৃন্দাবন দর্শন করতে গিয়ে সেবার দেওঘরে দরিদ্র সাঁওতাল পল্লীতে গিয়ে ঠাকুর দেখলেন অন্নাভাবে দিন কাটছে তাদের। এই মানুষদের পাশে দাঁড়িয়ে ঠাকুর বলেছিলেন, ও সব তীর্থযাত্রা আমার জন্য নয়। আমি কোনো মন্দিরেই যাবো না। আমি রইলাম এখানে বসে।
মথুরবাবু বোঝান, এদের অন্নকষ্ট দূর করার মতন অর্থ তো তাঁর কাছে নেই। ঠাকুর বলেন, তাহলে তিনিও আর তীর্থে যাবেন না। অতঃপর মথুরামোহন কলকাতায় লোক পাঠিয়ে দেওঘরের সেই অঞ্চলের মানুষের জন্য ভাত কাপড়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। ওরা যখন পাত পেড়ে খাচ্ছে, ঠাকুর তখন আনন্দে নৃত্য করছেন আর বলছেন, এই হল আমার আসল তীর্থ।
ইতিহাসের ছাত্রের কাছে এই মানুষ তাই সাধারণ ধর্ম প্রচারক নন, দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের পুরোহিত নন। মানব সভ্যতার উজ্জ্বল এক নক্ষত্র। যাঁর সাধনক্ষেত্রের মূলেই ছিলো মানুষ। মানবপ্রেমেই মানুষের উত্তরণ ঘটে।
তাই তিনি মহামানব।
আধুনিক মানব সভ্যতার মুক্তির দূত, শ্রীরামকৃষ্ণ।
&****&****&****&****&****&****&****
“চৈতন্যদেবের কৃষ্ণনামে অশ্রু পড়ত। ঈশ্বরই বস্তু, আর সব অবস্তু। মানুষ মনে করলে ঈশ্বরলাভ করতে পারে। কিন্তু কামিনী-কাঞ্চন ভোগ করতেই মত্ত। মাথায় মাণিক রয়েছে তবু সাপ ব্যাঙ খেয়ে মরে।
“ভক্তিই সার। ঈশ্বরকে বিচার করে কে জানতে পারবে। আমার দরকার ভক্তি। তাঁর অনন্ত ঐশ্বর্য অত জানবার আমার কি দরকার? এক বোতল মদে যদি মাতাল হই শুঁড়ির দোকানে কত মন মদ আছে, সে খবরে আমার কি দরকার? একঘটি জলে আমার তৃষ্ণার শান্তি হতে পারে; পৃথিবীতে কত জল আছে, সে খবরে আমার প্রয়োজন নাই।”






























