Sunday, 23 May 2021

অদ্বৈত বেদান্ত

 


অদ্বৈত অর্থ দুই না অর্থাৎ ব্রহ্ম ও জগৎ বা পরমাত্মা ও জীবাত্মা দুই নয়, এক ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে স্বজাতীয়, বিজাতীয় এবং স্বগত ভেদের কোন প্রকার ভেদই নেই।

জীবের সাথে ব্রহ্মের এবং জগতের সাথে ব্রহ্মের যদি কোন পার্থক্য বা ভেদ না থাকে তবে জীব-জগৎকে ব্রহ্ম হতে পৃথক মনে হচ্ছে কেন? প্রকৃতপক্ষে এই ভেদজ্ঞান অজ্ঞানতাবশত সৃষ্টি হয়। প্রকৃত জ্ঞানের উদয় হলে রাতের অন্ধকার যেমন দিনের আলোর সাথে মিলিয়ে যায় তেমন করে এই অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়। জগৎই ব্রহ্ম অর্থাৎ জগৎ ও ব্রহ্মে কোন ভেদ নেই, এরকম চিমত্মাই হল জ্ঞান আর জগৎ ও ব্রহ্মে ভেদ কল্পনা করাই হল অজ্ঞান বা অবিদ্যা।

অদ্বৈত বেদান্ত বা অদ্বৈতবাদ হল বৈদিক দর্শনের সর্বেশ্বরবাদী ধর্মচর্চার সাধন-পদ্ধতিগত একটি ধারা । সর্বেশ্বরবাদী এ মতে, মানুষের সত্যিকারের সত্ত্বা আত্মা হল শুদ্ধ চৈতন্য এবং পরম সত্য ব্রহ্মও শুদ্ধ চৈতন্য। ...

 অদ্বৈত বেদান্তের প্রধান ব্যাখ্যাকর্তা হলেন আদি শঙ্কর। তবে তিনি এই মতের প্রবর্তক নন।


হিন্দু বেদান্তশাস্ত্রকে কেন্দ্র করে তিনটি মতবাদের সৃষ্টি হয়েছে, যথা- দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ বা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ এবং অদ্বৈতবাদ। দ্বৈতবাদের প্রবর্তক মাধবাচার্য, দ্বৈতাদ্বৈতবাদের প্রবর্তক শ্রীরামানুজ  এবং অদ্বৈতবাদের প্রবর্তক জগদ্গুরু শংকর। নিচে এই তিন মতবাদ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হল।

দ্বৈতবাদ

দ্বৈত অর্থ দুই। ঈশ্বর ও জগত দুই অর্থাৎ এক নয়, এটাই দ্বৈতবাদের মুল কথা। মাধবাচার্যকে দ্বৈতবাদের জনক বলা হয়, তবে দ্বৈতজ্ঞান মূলত স্বভাবজাত বা জন্মগত জ্ঞান। দ্বৈতবাদীরা মনে করেন ঈশ্বর নিরাকার নয় অর্থাৎ ঈশ্বরের নির্দিষ্ট রূপ আছে। ঈশ্বরের কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। তিনি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছেন, এজন্য তিনি স্বয়ম্ভু। দ্বৈতবাদীরা মনে করে ঈশ্বর কোন নির্দিষ্ট লোকে বাস করেন। তাই তাঁরা বিষ্ণুলোক বা বৈকুণ্ঠলোক, শিবলোক, ব্রহ্মলোক প্রভৃতি লোকের অস্তিত্ব স্বীকার করেন। তারা মনে করেন ঈশ্বর ঐসব লোকে বাস করেন আবার সূক্ষ্ম-আত্মা রূপে জীবের হৃদয়াকাশেও বাস করেন। কুমার যেমন নিজ হাতে মাটি দিয়ে কলস, ঘট প্রভৃতি তৈরি করেন, ঈশ্বরও তেমনি পঞ্চভূত দ্বারা এই জড়-জগৎ ও জীবকুলকে সৃষ্টি করেন। ঈশ্বর একাধারে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা ও ধ্বংসকর্তা।

ভক্তিযোগই দ্বৈতবাদীদের প্রধান অবলম্বন। ঈশ্বরকে ভক্তি করলে তিনি সন্তুষ্ট হয়ে মুক্তি দেবেন-এটাই দ্বৈতবাদীদের সাধনার মূলকথা। দ্বৈতবাদীদের ঈশ্বর সচ্চিদানন্দময়। ঈশ্বর সৎ অর্থাৎ তাঁর সত্ত্বা আছে, চিৎ অর্থাৎ তিনি চৈতন্যময় আবার তিনি আনন্দময়ও বটে। ঈশ্বর-ভক্তির মাধ্যমে ভক্তের দুঃখ দূর হয় এবং ভক্ত আনন্দ লাভ করেন।দ্বৈতবাদীরা ঈশ্বরের অবতারে বিশ্বাসী। তাঁরা মনে করেন যখন ধর্মের পরিমান কমে যায় এবং অধর্ম বেড়ে যায়, তখন ঈশ্বর বিভিন্ন রূপে পৃথিবীতে এসে ধর্মকে রক্ষা করেন এবং অধর্মকে বিনাশ করেন।

দ্বৈতবাদীরা স্বর্গ-নরকে বিশ্বাসী। তাঁরা মনে করেন পাপকার্য করলে নরকে যেতে হবে এবং পুণ্যকর্ম করলে স্বর্গে যাওয়া যাবে। তবে স্বর্গে গেলেও পুণ্যফল ক্ষয় হওয়ার পর আবার নতুন দেহ ধারণ করে মর্ত্যে ফিরে আসতে হবে। কিন্তু উপাস্য-দেবতার লোকে (যেমন- ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক, শিবলোক প্রভৃতি স্থানে) গেলে আর মর্ত্যে ফিরে আসতে হয় না। এটাই দ্বৈতবাদীদের নিকট মুক্তি নামে কথিত। জগতে যা কিছু হচ্ছে, সব ঈশ্বরের ইচ্ছায় হচ্ছে। ঈশ্বর যাকে সংসার-বন্ধন হতে মুক্তি দেবে একমাত্র তিনিই মুক্তি পাবেন। বস্তুত দ্বৈতবাদ স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞান হলেও এ জ্ঞান চিরস্থায়ী নয়। জ্ঞানের পূর্ণতা আসলে দৈতজ্ঞান দূর হয়ে যায় তখন ঈশ্বরকে আর দূরে মনে হয় না।

বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ

বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ বা দ্বৈতাদ্বৈতবাদের প্রবক্তা হলেন শ্রী রামানুজ। রামানুজের পূর্বে যারা বিশিষ্টাদ্বৈতবাদী ছিলেন তাঁরা হলেন- নাথমুনি ও যমুনাচার্য। কিন্তু একমাত্র রামনুজই সুন্দরভাবে যুক্তি স্থাপন করে বিশিষ্টাদ্বৈতবাদকে প্রচার করেছেন এবং এই মতাদর্শী সম্প্রদায়ও তৈরী করে গেছেন বলে রামানুজকেই বৈশিষ্টাদ্বৈতবাদের জনক বলা হয়। রামানুজের দ্বৈতাদ্বৈতাবাদের ভিত্তি মূলত উপনিষদ, গীতা, মহাভারতের নারায়ণী অধ্যায় ও বিষ্ণু পুরাণ। দ্বৈতবাদ অনুসারে জগৎ ও ব্রহ্ম এক নয়, ভিন্ন। কিন্তু দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অনুসারে জগত ব্রহ্ম থেকে পৃথক নয় আবার জগৎ মিথ্যা বা অস্তিত্বহীন নয়। কারণ ব্রহ্মই জগতে পরিণত হয়েছে। তবে ব্রহ্ম জগতে পরিণত হলেও তা ব্রহ্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। ব্রহ্মের অপরিণামী ও পরিণামী এই দুইটি অংশ রয়েছে। পরিণাম অর্থ অবস্থান্তর বা বিকার। তাই যার অবস্থান্তর বা পরিবর্তন ঘটে অর্থাৎ যা বিকৃত হয়ে অন্য বস্তুতে পরিণত হয় তাই পরিণামী। ব্রহ্মের এই পরিণামী অংশের বিকার ঘটার কারণে জগতের উৎপত্তি হয়েছে। সোজা কথায় ব্রহ্ম রূপান্তরিত হয়ে জগতে পরিণত হয়েছে। তাই এই প্রাণিকুল ও উদ্ভিদকুলসহ দৃশ্যমান যা কিছু আছে তা ব্রহ্মের পরিবর্তিত রূপ।

দ্বৈতাদ্বৈতবাদীদের নিকট জগৎ ব্রহ্ম হতে অভিন্ন কিন্তু জগৎ ব্রহ্ম নয়, কারণ ব্রহ্মের অচিৎ অংশ জগতে পরিণত হয়েছে। ব্রহ্ম বলতে শুধু চিৎ বা নিত্য ও অপরিণামী অংশকেই বুঝতে হবে। 
                                                                                                                                    
মাকড়সা তার দেহে থেকে সুতা নির্গত করে জাল তৈরী করে। ঐ জাল মাকড়সার দেহ থেকে অভিন্ন নয়। জাল মূলত মাকড়সার দেহেরই একটি রূপান্তরিত অংশ। তাই জালকে মাকড়সা বলা যাবে না। তেমনি এই জীব-জগতও ব্রহ্মের একটি পরিবর্তিত রূপ। সেজন্য জীব-জগৎ ব্রহ্ম নয়। মাকড়সার জাল যেমন তার দেহ থেকে অভিন্ন তেমনি এই জীব-জগৎও ব্রহ্ম থেকে অভিন্ন।

দ্বৈতাদ্বৈতবাদীরা মনে করেন ঈশ্বর জগৎ সৃষ্টি করেননি, তিনি নিজেই জগৎ হয়েছেন। যেহেতু জগৎ হল তার পরিণাম সেহেতু তিনি জগৎ নন।  এরকম আপত্তি ওঠে, তার উত্তরে আমরা বলব, দুগ্ধ যেমন দধিতে পরিণত হয় ব্রহ্মও সে রকম জগতে পরিণত হয়ে থাকে’’। উপকরণ বা উপাদান ছাড়া কোন কিছু সৃষ্টি সম্ভব নয়। তবে ব্রহ্ম জগৎ সৃষ্টি করলেন কি উপাদান দিয়ে? সৃষ্টির আদিতে ব্রহ্ম ছাড়া কিছুই ছিল না তবে ব্রহ্ম জগৎ তৈরীর উপাদান কোথায় পেলেন? এর উত্তর ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে এক কার্য-কারণ ভাব আছে। প্রত্যেক কার্যের মূলে একটা কারণ থাকে অর্থাৎ কারণ বিনা কার্য হয় না। যেমন কুমার মাটি দিয়ে কলস তৈরি করল। এখানে মাটি কারণ আর কলস কার্য। কার্য-কারণ একে অন্যের পরিপূরক। কারণ না থাকলে কার্য হয় না আবার কার্য ছাড়া কারণের অস্তিত্ব কি? জগৎ কার্য হলে তার কারণ হবে ব্রহ্ম। ব্রহ্ম যেহেতু এক ও অদ্বিতীয় সেহেতু তিনি অন্য কোন উপাদান থেকে জগৎ সৃষ্টি করেননি। ব্রহ্ম নিজেই উপাদান কারণ অর্থাৎ ব্রহ্মের পরিণামী বা অচিৎ (জড়) অংশই জগতের উপাদান কারণ। দুধ দধিতে পরিণত হতে অন্য কোন উপাদানের প্রয়োজন হয় না। দুধের মধ্যেই যে উপাদান আছে তা দধিতে পরিণত হয়। তদ্রূপ ব্রহ্মের অচিৎ অংশে জগৎ সৃষ্টির উপাদান রয়েছে যা হতে জগৎ সৃষ্টি হয়। কিন্তু ব্রহ্মের চিৎ অংশ অপরিণামী অর্থাৎ তার বিকার নেই।

রামানুজের মতে জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ নাই কিন্তু স্বগত ভেদ আছে। স্বজাতীয় ভেদ বলতে একই জাতীয় দুটি জীবের মধ্যে ভেদ বা পার্থক্য বোঝায়। যেমন- দুইটি গরুর মধ্যে যে ভেদ। দুইটি ভিন্ন জাতীয় জীবের মধ্যে যে ভেদ, তাকে বিজাতীয় ভেদ বলে। যেমন- একটি ঘোড়া ও একটি সিংহের মধ্যে যে ভেদ। একই জীবের শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে যে ভেদ, তাকে স্বগত ভেদ হল । যেমন- মানুষের হাত ও পায়ের মধ্যে যে ভেদ। ও ব্রহ্মে কোন স্বজাতীয় ও বিজাতীয় ভেদ নেই। কিন্তু ব্রহ্মের অচিৎ অংশ সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে জড়-জগতে পরিণত হয়েছে। তাই জগতের পরিণাম বা বিকার আছে কিন্তু ব্রহ্মের চিৎ অংশের কোন পরিণাম বা বিকার নেই। জগৎ ও ব্রহ্ম একই দেহের দুটি অঙ্গ সরূপ। একই দেহের দুইটি অঙ্গের মধ্যে যেরকম ভেদ থাকে, সেরকম জগৎ ও ব্রহ্মের মধ্যে স্বগত ভেদ রয়েছে। তাই জগৎকে ব্রহ্মের দেহ বলা চলে।

এই জগৎ পরিবর্তনশীল এবং জগতের জীব-জড় সকল বস্তু পরিবর্তনশীল। এক জড় পদার্থ অন্য জড় পদার্থে রূপান্তরিত হয়। জীবের জন্ম হয়, বৃদ্ধি ঘটে আবার মৃত্যু হয়। জগৎ যদি ব্রহ্মের দেহ হয়ে থাকে এবং জগতের সব কিছু যদি নশ্বর ও পরিবর্তনশীল হয়ে থাকে তবে ব্রহ্মের কি পরিবর্তন হবে না? জগতের পরিবতর্নের সাথে ব্রহ্মেরও পরিবর্তন হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু রামানুজ বলছেন, ব্রহ্ম বিকারশূন্য, অবিনশ্বর ও অপরিণামী। তিনি আরও বলেছেন যে, জগৎ যদি দেহ হয় তবে ব্রহ্ম হবে আত্মা। দেহের জন্ম-মৃত্যু আছে কিন্তু আত্মার জন্ম-মৃত্যু নেই। যেহেতু দেহের পরিবর্তনে আত্মার পরিবর্তন হয় না সেহেতু জগতের পরিবর্তনে ব্রহ্মেরও পরিবর্তন হবে না।

দ্বৈতাদ্বৈতবাদ মতে ব্রহ্মের স্বরূপ সম্পর্কে আলোচনা করা যাক। দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অনুসারে ব্রহ্ম এক ও অদ্বিতীয়। কিন্তু তাঁর দুইটি ভাব, একটি ব্যক্ত এবং অপরটি অব্যক্ত ভাব। অব্যক্ত ভাবে তিনি নিরাকার, অনন্ত, অসীম ও নির্গুণ। ব্রহ্মের এ অব্যক্ত ভাবকে পরমাত্মা বলা হয়। জীবাত্মা হল পরমাত্মার অংশ। যেমন অগ্নির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ অগ্নির অংশ এবং ঐ স্ফুলিঙ্গের মধ্যে অগ্নির গুণ বিদ্যমান তেমনি জীবাত্মার মধ্যেও পরমাত্মার গুণ বিদ্যমান। পরমাত্মার মত জীবাত্মাও অবিনশ্বর অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুরহিত। যেহেতু জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ সেহেতু জীবাত্মা অসীম নয়, সসীম। জীবাত্মার আকার অতি সূক্ষ্ম বলেই তা জীবের সমস্ত শরীরব্যাপী রয়েছে। আত্মার আকৃতি অতি সূক্ষ্ম বলে তাঁকে নিরাকারই বলা চলে। জীবাত্মা সমীম কিন্তু পরমাত্মা বা ব্রহ্ম অসীম তাই জীবাত্মা ও ব্রহ্ম অভেদ হতে পারে না। আবার জীবাত্মা ব্রহ্মের চিৎ-সত্ত্বার ক্ষুদ্র অংশ, তাই জীবাত্মার সাথে ব্রহ্মের ভেদও থাকতে পারে না কারণ অংশকে অংশী হতে পৃথক করা যায় না। তাই রামানুজের মতে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মধ্যে ভেদ ও অভেদের সম্পর্ক বিদ্যমান অর্থাৎ জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক আবার দুই। এজন্য রামানুজের মতবাদকে দ্বৈতাদ্বৈত মতবাদ বলে।

 রামানুজের মতে অবিদ্যা বা অজ্ঞানতার জন্য আত্মার বন্ধন হয়। দেহে আত্মা বন্ধনপ্রাপ্ত হলে পুনর্জন্ম লাভ হয় এবং কর্মফল ভোগ করতে হয়। দেহ ও আত্মা ভিন্ন। দেহকে আত্মা মনে করাই হল অজ্ঞানতা। তাই আত্মাকে দেহ থেকে ভিন্ন মনে করে আত্মার মুক্তির জন্য সাধনা করাই দ্বৈতাদ্বৈতবাদেও মূল লক্ষ্য

আত্মার মুক্তির জন্য বেদ নির্দেশিত কর্ম যেমন- আশ্রমধর্ম পালন, যাগযজ্ঞ পভৃতি করতে হবে। এবং তত্ত্বজ্ঞান লাভ করতে হবে। তবে ঈশ্বরের কৃপা ছাড়া মুক্তি লাভ সম্ভব নয়। ঈশ্বরকে সাধনার দ্বারা তুষ্ট করলে ঈশ্বর মুক্তি দেবেন। তাই রামানুজের বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ দর্শনে জ্ঞান ও ভক্তিযোগের অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়।

অদ্বৈতবাদ


উপনিষদে অদ্বৈতবাদের বীজ থাকলেও জগদ্গুরু শঙ্করকেই অদ্বৈতবাদের জনক বলা হয়। অদ্বৈত অর্থ দুই না অর্থাৎ ব্রহ্ম ও জগৎ বা পরমাত্মা ও জীবাত্মা দুই নয়, এক। ব্রহ্ম ও জগতের মধ্যে স্বজাতীয়, বিজাতীয় এবং স্বগত ভেদের কোন প্রকার ভেদই নেই। ব্রহ্ম সংক্রান্ত এই বিদ্যাকে শাণ্ডিল্য বিদ্যা বলা হয়। অতএব একথা স্পষ্ট যে উপনিষদ বা বেদান্তই অদ্বৈতবাদ দর্শনের ভিত্তি।

জীবের সাথে ব্রহ্মের এবং জগতের সাথে ব্রহ্মের যদি কোন পার্থক্য বা ভেদ না থাকে তবে জীব-জগৎকে ব্রহ্ম হতে পৃথক মনে হচ্ছে কেন? প্রকৃতপক্ষে এই ভেদজ্ঞান অজ্ঞানতাবশত সৃষ্টি হয়। প্রকৃত জ্ঞানের উদয় হলে রাতের অন্ধকার যেমন দিনের আলোর সাথে মিলিয়ে যায় তেমন করে এই অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়। জগৎই ব্রহ্ম অর্থাৎ জগৎ ও ব্রহ্মে কোন ভেদ নেই, এরকম চিমত্মাই হল জ্ঞান আর জগৎ ও ব্রহ্মে ভেদ কল্পনা করাই হল অজ্ঞান বা অবিদ্যা।

প্রকৃতপক্ষে এই দৃশ্যমান জগৎ মিথ্যা এর অর্থ জগৎ অস্তিত্বহীন নয়। জগৎ মিথ্যা বলতে বোঝায় জগৎ আপেক্ষিক, পরিবর্তনশীল ও পরিণামী। স্থান-কাল-পাত্রভেদে জগতের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এক এক স্থানে জগৎ এক এক রকম, এক এক সময়ে জগৎ এক এক রকম এবং এক এক জনের কাছে জগৎ এক এক রকম। অর্থাৎ জগৎ সব সময়, সব স্থানে এবং সবার কাছে এক রকম মনে হয় না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে প্রাচ্য দেশে ও পাশ্চত্য দেশে জগতের রূপ এক রকম নয়। বসমত্ম ঋতুতে জগৎকে যেমন দেখা যায় বর্ষা ঋতুতে তেমন দেখা যায় না। একজন মানুষ জগৎকে যেমন দেখে একটি গরু বা অন্য প্রাণী কিন্তু তেমন দেখে না। তাই জগৎকে সৎ মনে হলেও অর্থাৎ স্থান-কাল-পাত্রভেদে পরিবর্তনশীল হওয়ায় জগৎকে মিথ্যা বলা হয়েছে। 

-‘ব্রহ্ম সত্য ও জগৎ মিথ্যা’ এই ধারণায় দৃঢ় প্রত্যয় হওয়াকেই নিত্য-অনিত্য-বস্তু-বিবেক বলে। জগৎকে সত্য বলে মনে করা মূলত ভ্রম ছাড়া অন্য কিছু নয়। রজ্জুতে যেমন সর্প ভ্রম হয় ব্রহ্মতে তেমনি জগৎ ভ্রম হয়। 
অর্থাৎ অজ্ঞানের জন্যে ভ্রান্তিবশত রজ্জুতে মহাসর্পের মিথ্যাজ্ঞান থেকে ভয়, হৃদকম্প ইত্যাদি যে সব দুঃখের উদ্ভব হয় সেসবের নাশ হয় রজ্জুকে রজ্জু বলে জানলে। ঠিক-ঠিক বিচারের দ্বারা জ্ঞানের উন্মেষ হলে সর্পের মিথ্যাজ্ঞান চলে গিয়ে রজ্জুর পরিচয়ই সত্য হয়। দড়িকে অনেক সময় সাপ বলে মনে হয়। অজ্ঞানতা বা ভ্রমের কারণে এমন মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে দড়ি দড়িই, সাপ নয়। তেমনি ব্রহ্মকেও অজ্ঞানতাবশত জগত মনে হয়। যখন অজ্ঞানতা দূর হয় তখন কিন্তু দড়িকে সাপ মনে হয় না। ভ্রম যতক্ষণ পর্যন্ত স্থায়ী হবে ঠিক ততক্ষণ পর্যমত্ম দড়িকে সাপ মনে হবে এবং ভ্রমের ক্রিয়া শেষ হয়ে গেলে সাপের আর অস্তিত্ব থাকবে না। সাপ যেমন মিথ্যা এবং দড়িই সত্য তেমনি এই জগৎ মিথ্যা এবং একমাত্র ব্রহ্মই সত্য। 

ব্রহ্ম অনাদি, অসীম, অনন্ত, নিরাকার ও অপরিণামী। ব্রহ্মের সৃষ্টি ও ধ্বংস নেই। ব্রহ্ম থেকে জগৎ সৃষ্টি হয়নি। ব্রহ্ম আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমন আছে এবং ভবিষ্যতেও তেমন থাকবে। বস্ত্তত জগৎ সৃষ্টির ধারণা ভ্রম মাত্র। কোন কিছু সৃষ্টি করতে হলে উপাদান বা উপকরণ প্রয়োজন। ব্রহ্ম যদি এক ও অদ্বিতীয় হয় তবে উপকরণ সৃষ্টি হবে কিভাবে? যদি উপকরণের অস্তিত্ব কল্পনা করা হয় তখন ব্রহ্ম দুই হয়ে যাবে। ব্রহ্ম থেকেও উপকরণের সৃষ্টি হতে পারে না। কারণ ব্রহ্ম চৈতন্যয় ও অপরিণামী। কিন্তু উপকরণ হল জড় ও পরিণামী। একই বস্ত্তর মধ্যে পরিণামী ও অপরিণামী এই দ্বৈত-সত্ত্বা থাকা অসম্ভব। তাই ব্রহ্মের কোন উপাদান বা উপকরণ নেই। যেহেতু উপাদান নেই সেহেতু সৃষ্টি অসম্ভব। সুতরাং কোন কিছুই সৃষ্টি হয়নি। যা কিছু  সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে হয় তা আসলে মায়া। মায়ার কারণেই ব্রহ্ম ও জীবে এবং ব্রহ্ম জগতে ভেদজ্ঞান হয়। মায়া কেটে গেলে দৃশ্যমান জগৎ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়বে। তাই যতক্ষণ মায়া থাকবে ঠিক ততক্ষণ জগৎকে সত্য বলে মনে হবে। এই মায়াকে ত্রিগুণাত্বিকা প্রকৃতিও বলা হয়।

কোন হ্রদের জলে সূর্যের যে প্রতিবিম্ব পড়ে সে প্রতিবিম্ব মিথ্যা। দর্পণে যে প্রতিবিম্ব দেখা যায় তাকে সত্য বলে মনে হলেও তা আসলে সত্য নয়। ঐ প্রতিবিম্ব যেমন মিথ্যা, জগৎও তেমনি মিথ্যা। জলে যে বুদবুদের সৃষ্টি হয় সে বুদবুদ জল থেকে পৃথক নয় অর্থাৎ জল ভিন্ন অন্য কিছু নয়। তদ্রূপ জগৎও ব্রহ্ম ছাড়া অন্য কিছু নয়। অদ্বৈতবাদ দর্শনে জীবাত্মা ও পরমাত্মার পৃথক অস্তিত্ব নেই।

অদ্বৈতবাদ কি শূণ্যবাদকে সমর্থন করে? শঙ্কর বলেছেন দড়িতে সর্প-ভ্রমের কথা কিন্তু তিনি শূন্যে অর্থাৎ যেখানে কোন কিছু নেই এমন স্থানে সর্প-ভ্রমের কথা বলেননি। দড়ি ছিল বলে সর্প-ভ্রম হয়েছে কিন্তু দড়ি না থাকলে সর্প-ভ্রম হত না। অজ্ঞানতাবশত শূন্যস্থানে জগৎ কল্পিত হয় না ব্রহ্মকেই জগত বলে মনে হয়। সুতরাং অদ্বেতবাদ শূণ্যবাদকে সমর্থন করে না। তাই অদ্বৈতবাদের মুলকথা হল মায়ার কারণেই ব্রহ্মকে জগৎ বলে মনে হয়। মায়াই মরুভূমিতে মরীচিকা সৃষ্টি করে। মরুভূমিতে মরীচিকার কারণে তপ্ত বালিকে জল বলে মনে হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কাছে না যাওয়া হয় ততক্ষণ পর্যন্ত জলের অসিত্মত্ব থাকে কাছে গেলে জলের অস্তিত্ব থাকে না তখন শুধু বালিই দেখা যায়। তাই মায়া দূর হলে অথাৎ জ্ঞানের উদয় হলে জগতের অস্তিত্বও দূর হয়ে যায়।

রামানুজের দ্বৈতাদ্বৈত দর্শন মতে জীবাত্মা পরমাত্মার অংশ। কিন্তু পরমাত্মা অখণ্ড ও পূর্ণ এবং তাঁকে কর্তন ও ছেদন করা যায় না। সুতরাং পরমাত্মার কোন অংশ হতে পারে না। জীবাত্মা ও পরমাত্মার ভেদজ্ঞান মূলত ভ্রম বা মায়া। এখন মায়া প্রসঙ্গে বিশেষ কিছু কথা বলা প্রয়োজন। মায়া আসলে কি? কোথা থেকে এর উৎপত্তি? মায়া কি ব্রহ্ম ? এসব প্রশ্নের উত্তরে শঙ্কর বলেছেন,‘‘মায়া ব্রহ্মের শক্তি। মায়াকে অব্যক্তও বলা হয়। এই মায়া অনাদি, সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ এই তিন গুণবিশিষ্ট, কারণসরূপা। বিজ্ঞ ব্যক্তি জগতের সৃষ্টিকার্য থেকে এর অস্তিত্ব অনুমান করেন। এই মায়া যে আছে তাও নয় আবার নেই এরকমও নয়। আছেও আবার নেইও এ দুই এর মিশ্রণও নয়। মায়া পরমাত্মা থেকে ভিন্ন নয় অভিন্নও নয় আবার ভিন্ন ও অভিন্ন উভয়রূপাও নয়। মায়া অঙ্গযুক্ত বা অঙ্গহীন নয় অথবা অঙ্গ আছে আবার নেই এই দুয়ের একত্র অবস্থাও নয়। মায়া অতি অদ্ভুতরূপা ও বাক্যের দ্বারা অবর্ণনীয়’’।

প্রকৃতপক্ষে মায়া অজ্ঞেয়। মানুষের চোখ তার নিজের বদনমণ্ডলকে দেখতে পায় না কিন্তু অন্য মানুষ তার বদন-মণ্ডল দেখতে পায়। চোখ বদনমণ্ডলে অবস্থিত, তাই চোখ নিজের বদনমণ্ডলকে দেখতে পায় না কিন্তু অন্যের বদনমণ্ডলকে দেখতে পায়। জীব মায়ার মধ্যে বাস করে তাই সে মায়া উপলব্ধি করতে পারে না। কারণ মায়াকে উপলব্ধি করতে হলে মায়া-সমুদ্রের ওপারে যেতে হবে যা জীবের পক্ষে সম্ভব নয়। অতএব মায়া অজ্ঞেয়। মায়া অজ্ঞেয় বলেই সৃষ্টিপ্রবাহ বেঁচে আছে। মায়াকে জানলে সৃষ্টির অস্তিত্ব থাকে না।

প্রকৃতপক্ষে এই জগৎ-প্রপঞ্চ মনের ভ্রম ছাড়া অন্য কিছু নয়। কিন্তু মন কি? মন কি দেহ থেকে পৃথক? আসলে মন-দেহ সবই মায়া। পঞ্চ-জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা কোন বস্তুর অস্তিত্ব উপলদ্ধি করা হয়। যতক্ষণ পঞ্চ-ইন্দ্রিয় ক্রিয়াশীল থাকে ততক্ষণ পর্যমত্ম জগতের অসিত্মত্ব থাকে। ঘুমের সময় পঞ্চ-ইন্দ্রিয় (চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহবা ও ত্বক) মনে লুপ্ত হয়। তাই স্বপ্ন দেখার সময় মনই জগৎকে বিভিন্ন রূপে দর্শন করায়। কিন্তু স্বপ্নহীন নিদ্রা বা সুসুপ্তির সময় পঞ্চ ইন্দ্রিয় মনে এবং মন আত্মাতে লীন হয়। তখন জগৎকে আর উপলব্ধি করা যায় না। তখন মনই জগৎকে উপলব্ধি করায়। এই মন আছে কি নেই তা বোঝা কষ্ট, তাই এই মনও মায়া। যদি জগৎ সত্য হত তবে সুসুপ্তির সময়ও জগৎকে উপলব্ধি করা যেত। যেহেতু সুসপ্তিতে জগৎকে উপলব্ধি করা যায় না সেহেতু জগৎ মিথ্যা।

এখন অদ্বৈতবাদ দর্শনের মুক্তি প্রসঙ্গে আসা যাক। যেহেতু আত্মা মুক্ত অর্থাৎ আত্মার কোন বন্ধন নেই সেহেতু মুক্তির প্রশ্নই আসে না। যদি জীবাত্মা ও পরমাত্মা একই হয় তাহলে আবার মুক্তি কিসের? অদ্বৈত দর্শনে মুক্তি অর্থ অজ্ঞানতা বা মায়া থেকে মুক্তি। কারণ মায়ার কারণেই আত্মার বন্ধন হয়েছে এমন মনে হয়। এ প্রসঙ্গে ভগবান শঙ্কর বলেছেন-

-ব্রহ্মের থেকে আমি অভিন্ন এই জ্ঞানই সংসার-বন্ধন থেকে মুক্তির কারণ স্বরূপ। আর এই জ্ঞানের দ্বারাই বিবেকী ব্যক্তিরা অদ্বিতীয় আনন্দরূপ ব্রহ্ম লাভ করেন ও ব্রহ্মই হয়ে যান। আবার তিনি বলেছেন- সকাম কার্য নাশ হলে বিষয়-চিন্তার নাশ হয় আর তার থেকে বাসনা ক্ষয় হয়ে যায়। বাসনার পুরোপুরি ক্ষয় হওয়াই হল মোক্ষ। এই অবস্থাকেই জীবন্মুক্তি বলে। মায়া দূর হলেই বিষয় চিমত্মা দূর হবে। তাই মায়া থেকে মুক্তি পেতে গেলে নিজেকে ব্রহ্ম থেকে অভেদ ভাবতে হবে এবং বেদবিহিত কর্ম করতে হবে। ভেতরের আমি-আমি ভাব বা অহংকার দূর করতে হবে কারণ এই অহং ভাবই ভেদজ্ঞান সৃষ্টি করে। শঙ্কারচার্যের মতে কর্ম হতে হবে নিষ্কাম। মুমুক্ষু জীব যখন বিষয়-তৃষ্ণা ত্যাগ করে, নিজেকে ব্রহ্ম থেকে অভিন্ন মনে করে উপাসনা করবে, তখন মায়া দূর হবে এবং মোক্ষ লাভ হবে।



দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও অদ্বৈতবাদ এই তিন মতবাদের সমন্বয়

পূর্বেই বলা হয়েছে যে, দ্বৈতজ্ঞান স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞান। একজন মানুষ দ্বৈতবাদী হয়েই জন্মগ্রহণ করে। দ্বৈতবাদে ঈশ্বরকে সব থেকে সহজে কল্পনা করা যায়। তাই অধিকাংশ মানুষই দ্বৈতবাদী। তবে দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও অদ্বৈতবাদ সাংঘর্ষিক নয়। এই তিন মতবাদ মূলত জ্ঞানের তিনটি স্তর বা সোপান। মানুষ প্রথমে ঈশ্বরকে দ্বৈত জ্ঞানেই পূজা করে। তারপর আর একটু জ্ঞানের বিকাশ ঘটলে তাঁর মনের দ্বৈতভাব কিছুটা দূর হয়। তখন সে মনে করে ঈশ্বর ও জগতে ভেদ নেই। অর্থাৎ ঈশ্বরই জগতে পরিণত হয়েছে এবং জীবাত্মা পরমাত্মারই অংশ। তারপর যখন জ্ঞানের পূর্ণতা আসে তখন সে উপলব্ধি করতে পারে যে জগৎ ও ঈশ্বর অভিন্ন এবং জীবাত্মা ও পরমাত্মার পৃথক অস্তিত্ব নেই। এভাবে একজন মানুষ জ্ঞানের বিকাশের সাথে সাথে দ্বৈতবাদ থেকে দ্বৈতাদ্বৈতবাদ এবং দ্বৈতাদ্বৈতবাদ থেকে অদ্বৈতবাদ স্তরে উপনীত হন।

Sunday, 16 May 2021

শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে স্বামীজি যে ভাবে দেখেছিলেন

 




শ্রীরামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্ক---- ইতিহাসের পাতায় যতগুলি শ্রেষ্ঠ  গুরু - শিষ্য সম্পর্ক আছে তাদের মধ্যে অন্যতম। 

তিনি ( শ্রীরামকৃষ্ণ ) যে কি, কত কত পূর্বগ-অবতারগনের জমাটবাঁধা ভাবরাজ্যের রাজা, তা জীবনপাতী তপস্যা করেও একচুল বুঝতে পারলুম না। তাঁর ভাবসমুদ্রের র্ঊচ্ছাসের এক বিন্দু ধারণা করতে পারলে মানুষ তখনি দেবতা হয়ে যায়। সর্বভাবের সমন্বয় জগতের ইতিহাসে আর কোথাও কি খুঁজে পাওয়া যায় ? এই থেকেই বোঝ ---- তিনি কে দেহ ধরে এসেছিলেন।  অবতার বললে তাকে ছোট করা হয়। 

শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে সাধনার মধ্য দিয়ে সর্বধর্মের সমন্বয় দেখে স্বামীজি ঘোষণা করেছিলেন,  তাঁর প্রভাবে আপাতবিচ্ছিন্ন ভারত আবার  এক হবে। এই  সমন্বয়ই হবে আধুনিক ভারতের জাতীয়তার মূল ভিত্তি। সর্বধর্ম সমন্বয় ও সকল মতসহিষ্ঞুতার প্রতিষ্ঠা না হলে আমাদের এই বিশাল বৈচিত্র্যপূর্ন দেশে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠত না। শ্রীরামকৃষ্ণকে স্বামীজি পূর্ব ধর্মাচার্যদের নব্যরুপ বলে গ্রহণ করে আরও দেখালেন যে তিনি কর্ম,  ধ্যান,  ভক্তি ও জ্ঞান---- সমস্ত যোগের সমন্বয় নিজের জীবনে করেছেন। এ-প্রসঙ্গে স্বামীজি বলেছেন  " এ নতুন  অবতারের এই  শিক্ষা যে এখন যোগ, ভক্তি, ঞ্জান ও কর্মের উৎকৃষ্ট ভাব এক করে এক নতুন  সমাজ তৈরি করতে হবে ।" ঞ্জানমার্গ পথ হিসাবে ভাল হলেও এতে শুষ্ক পান্ডিত্যে পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ভক্তিও খুব ভাল  কিন্ত বহুক্ষেত্রে নিরর্থক ভাবপ্রবনতায় আসল জিনিসই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এগুলির সুষ্ঠু সামঞ্জস্যের বড় দরকার।  শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন এই  সমন্বয়ে পূর্ণ ছিল।  তাই তাঁর জীবন ও উপদেশকে আদর্শ রুপে সামনে রেখে আমাদের এগুতে হবে।

১৮৮১-র নভেম্বরে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণকে আমন্ত্রণ করে একটি ছোট উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে গান গাইবার জন্য পাড়ার ছেলে নরেন্দ্রকে তিনি ডেকে এসেছিলেন।  নরেন্দ্র এর কিছুদিন আগেই কলেজের প্রিন্সিপাল হেস্টিসাহেবের মুখে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের নাম শোনেন।  কবিতা পড়াতে পড়াতে অধ্যাপক বুঝিয়েছিলেন  প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুধাবন করতে করতে কেমন করে মানুষের মন অতীন্দ্রিয় রাজ্যে চলে যায়। ছাত্ররা তা সঠিকভাবে ধারনা পারছিল না দেখে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন,  মনের পবিত্রতা ও একাগ্রতার  ফলে এমন অনুভূতি  হয়ে থাকে। আধুনিক কালে এ অনুভূতি দুর্লভ হলেও এ প্রসঙ্গে তিনি দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নাম করেছিলেন,  যার এমন হয়ে থাকে। বলেছিলেন  ইচ্ছা হলে তাকে ছেলেরা দেখে আসতে পারে। গান গাইতে এসে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শনের সেই দুর্লভ সুযোগ পান।  

শ্রীরামকৃষ্ণের সেদিনের বিশেষ অনুরোধে এর কয়েকদিন পর নরেন্দ্রনাথ দুই বন্ধুর সাথে দক্ষিণেশ্বরে যান।  ঠাকুর তাকে গান গাইতে বলাতে তিনি " মন চল  নিজ নিকেতনে " গানটি গাইলেন।  এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে পাশের বারান্দায় নিয়ে গিয়ে হাত ধরে পরম স্নেহে বলতে থাকেন " এতদিন পরে আসতে  হয় ? আমি তোমার জন্য কীভাবে অপেক্ষা করে রয়েছি তা একবার ভাবতে নেই? বিষয়ী লোকের বাজে প্রসঙ্গ শুনতে শুনতে আমার কান ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ........।" এমন কত কথা বলেন আর কাঁদেন। পরক্ষণেই আবার নরেন্দ্রর সামনে হাতজোড় করে বলে চলেন  " জানি আমি প্রভু, তুমি সেই পুরাতন ঋষি, নররূপী নারায়ণ।  জীবের দুর্গতি নিবারন করতে আবার শরীর ধারন করেছ ।" 

নরেন্দ্র তাঁর এমন আচরণে ও কথায় অবাক। পরবর্তী কালে সেদিনের কথা মনে করে তিনি  রলছেন " মনে মনে ভাবতে লাগলাম  এ কাকে দেখতে এসেছি ? ইনি তো একেবারে উন্মাদ.....। তার পরই তিনি মাখন,  মিছরি এবং  কতগুলি সন্দেশ এনে আমাকে খাইয়ে দিতে লাগলেন।  আমি যত বলি আমাকে দিন, আমি সঙ্গীদের সাথে ভাগ করে খাব----- তা কিছুতেই শুনলেন না। বললেন  ' ওরা খাবে এখন , তুমি খাও।' ...... পরে হাত ধরে বললেন  ' বল, তুমি শীঘ্র একদিন এখানে আমার কাছে একাকী আসবে।' তাঁর একান্ত অনুরোধ এড়াতে না পেরে অগত্যা আসব বলে বন্ধুদের কাছে চলে এলাম।"

আরম্ভ হল তাদের মধ্যে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক।  নরেন্দ্র প্রত্যেক পদে শ্রীরামকৃষ্ণেকে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন তাঁর প্রতি কথাই সত্য। বুঝেছিলেন ত্যাগ, ভক্তি ও জ্ঞানে শ্রীরামকৃষ্ণ অতুলনীয়। যতই তিনি তাঁর সঙ্গলাভ করলেন,  ততই তাঁর প্রতি ভক্তি , বিশ্বাস ও ভালবাসায় ভরপুর হয়ে উঠলেন।  অপরদিকে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্র সম্পর্কে বলেছিলেন  " কেশবচন্দ্র সেন যেমন একটি শক্তির বিশেষ উৎকর্ষে জগৎবিখ্যাত হয়েছেন, নরেন্দ্রর মধ্যে তেমন আঠারোটি শক্তি পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান।  নরেন্দ্র হল সহস্র দল পদ্ম।  অন্যরা কলসি, ঘটি হতে পারে, কিন্ত নরেন্দ্র জালা। ডোবা পুষ্করিণীর মধ্যে নরেন্দ্র বড় দিঘী। যেমন হালদার পুকুর।"এই  বিরাট শক্তির আধারকে শ্রীরামকৃষ্ণ এমন ভাবে গড়ে তুলেছিলেন যাতে তাঁর আধ্যাত্মিক সম্পদের অধিকারী হয়়ে তাঁরই   সঙ্কল্পিত যুগধর্ম প্রবর্ত্তন করতে  পারেন নরেন্দ্রনাথ।  প্রায় পাঁচ বছর নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গলাভে ধন্য হন, তাঁর কৃৃৃৃপায় নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন।তাঁর উপলব্ধি হয় ----- " শ্রীরামকৃষ্ণ অবতারের অনন্ত ঞ্জান,  অনন্ত প্রেম, অনন্ত কর্ম,  অনন্ত জীবে দয়া।"

এরপর নরেন্দ্র লক্ষ্য করলেন,  অন্যদের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের আচরণে ও কথাবার্তায় কোথাও কোনোও  অসংগতি নেই।  সহজ সরল ভাষায় কত উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাব তিনি বর্ণনা করছেন। তখন নরেন্দ্রর মনে হল তিনি সত্যিই উচ্চস্তরের সত্যদ্রষ্টা মহাপুরুষ। তিনি যে জিঞ্জাসা নিয়ে এতদিন অনেকের কাছে ঘুরেছেন, তাকেও সেই একই প্রশ্ন করলেন,  "অপনি কি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?" সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর পেলেন, "হ্যা, আমি ঈশ্বর দর্শন করেছি। ঠিক যেমন তোমাদের দেখছি। তবে এর চেয়েও আরও ঘনিষ্ট রূপে। ‐‐‐‐‐ ঈশ্বর দর্শন হয়, তাকে দেখা যায়।  তাঁর সঙ্গে কথা বলা চলে, ঠিক যেমন আমি তোমাদের সাথে কথা বলছি। কিন্ত কে তা চায় ? লোকে মাগছেলের শোকে   বিষয় আশয়ের দু:খে ঘটি ঘটি কাদে কিন্ত ভগবানের জন্য কে তা করে ? আন্তরিক ভাবে ভগবানের জন্য কাঁদলে তিনি নিশ্চয়ই দেখা দেন। "




দক্ষিণেশ্বরে একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ অর্ধবাহ্যদশায় বলেন " জীবে দয়া! দূর শালা! দয়া করবার তুই কে ? না, না জীবে দয়া নয়, ---- শিবঞ্জানে জীবসেবা।"  ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের কথা একঘর ভক্ত শুনলেও একমাত্র নরেন্দ্রনাথই কথাগুলির মধ্যে খুজে পেয়েছিলেন অদৈত্ব সাধনার সঙ্গে ভক্তি ও কর্মযোগের সমন্বয়, বনের বেদান্তকে ঘরে আনার উপায়। তাই গুরুভাইদের বলেছিলেন  " কী অদ্ভুত আলোকেই আজ দেখতে পেলাম  ঠাকুরের কথায়। ভগবান যদি কখনও দিন দেন তো এই সত্য সর্বত্র প্রচার করব  ‐- পন্ডিত,  মূর্খ,  ধনী, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, চন্ডাল  সবাই কে শুনিয়ে মহিত করব।" এইভাবেই ঠাকুর কর্মযোগকেও ঈশ্বর লাভের  এক  পথ করে দিয়েছেন।  স্বামীজি এই কথার ভিত্তিতেই তাঁর বিখ্যাত নববেদান্ত তথা নবতর কর্মযোগের তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন  এবং রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে সেবামূলক কাজের প্রবর্তন করেছেন। 

পরিণত বয়সে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী লেখার জন্য অনিরুদ্ধ হয়ে স্বামীজি অকপটে বলেছিলেন " ‐‐‐‐ আমাকে এই অনুরোধটি করবেন না। একাজ ছাড়া আর যা বলবেন আমি তাই করব। যদি পৃথিবী ওলট-পালট করতে বলেন তো সে পারব কিন্ত একাজটি পারব না। তিনি (শ্রীরামকৃষ্ণ) এত মহান ছিলেন,  এত বড় ছিলেন,  আমি তাকে কিছুই বুঝতে পারিনি। তাঁর জীবনের এক কণাও আমি জানতে পারিনি। শেষে শিব গড়তে গিয়ে কি বানর গড়ে ফেলব ? আমি তা পারব না।" এই একটি উক্তি থেকেই বোঝা যায় স্বামীজি কী দৃষ্টিতে শ্রীরামকৃষ্ণেকে দেখতেন। স্বামীজি বলতেন,  শ্রীরামকৃষ্ণ শুধু অবতার নন, "অবতারবরিষ্ঠ "। তিনি সনাতন ধর্মের প্রতীক।  তাঁর আবির্ভাবেই সনাতন ধর্ম সুদূঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। "খন্ডন ভববন্ধন জগবন্ধন বন্দি তোমায়"_____ স্বামীজি রচিত এই গানটি শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরে সন্ধারতির সময় গীত হয় তা শ্রীগুরুর প্রতি শিষ্যের অন্তরের গভীরতম ভক্তির প্রকাশ। 

স্বামী বিবেকানন্দের কথার মধ্য দিয়েই জগৎ তাঁর আচার্যের কথা শুনেছে ও শুনছে। মানব সংস্কৃতির সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও বানীর সম্পর্ক ক্রমে মানুষ বুঝতে পারছে। স্বামী বিবেকানন্দের ব্যাখ্যা ছাড়া শ্রীরামকৃষ্ণের এই বিশাল ভাব বোঝা যায় না  আবার শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন,  সাধনা ও অনুভূতি থেকে আলাদা করে দেখলে স্বামীজির বাণীর গভীরতাও বোঝা যায় না। শ্রীরামকৃষ্ণ সে-অর্থে শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন না করেই সাধনার মাধ্যমে ঈশ্বর দর্শন করেছিলেন।  নিরক্ষর ঠাকুরের শাস্ত্র নির্দিষ্ট উপলব্ধিগুলির যথাযথ অনুভূতি হওয়ায় শাস্ত্রের সত্যতা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয়েছে। স্বামীজি এ-সম্পর্কে বলছেন,  শাস্ত্র সত্য বলে প্রমাণ করার জন্যই ঠাকুরের নিরক্ষর হয়ে আগমন।  শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে বহু সাধকের বহু সাধনার ধারার মিলন ও সেই সবগুলির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের উপলব্ধি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অদৈত্ব ইত্যাদি আপতবিরোধী বহু ব্যাখ্যায় সকলে যখন বিভ্রান্ত তখন স্বামীজি বেদমূর্তি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনালোকে এগুলির সুষ্ঠ সমন্বয় করেছেন।  আরও বলেছেন  " বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, ভাগবতে যে কী আছে তা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে না পড়লে কিছুই বোঝা যাবে না।"

স্বামীজি বলেছিলেন ___ শ্রীরামকৃষ্ণ যেদিন জন্মগ্রহণ করেছেন সেদিন থেকেই সত্যযুগ এসেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনালোকে বেদান্তধর্মই নতুন দৃষ্টিতে , নতুন ভাবে ব্যাখ্যাত হয়ে নবযুগধর্মরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে--- যার দ্বারা সত্যযুগের সূচনা হয়েছে। এযুগে হিন্দু-মুসলমান বা খ্রিস্টান-হিন্দু ভেদ , সব চলে যাবে। এক বর্ণ,  এক বেদ, সমগ্র জগতে শান্তি ও সমন্বয় স্থপিত হবে। এ সত্যযুগে তাঁর  "প্রেমের বন্যায় সব একাকার " হবে। স্বামীজির মতে জগতে সর্বদাই একটি মাত্র ধর্ম রয়েছে। হিন্দু, খ্রিস্টান,  ইসলাম,  বৌদ্ধ  ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্ম এই এক অক্ষয় সনাতন ধর্মের বিভিন্ন রূপ মাত্র।  শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাবের সময় থেকে জড়বাদের শক্তি, ধর্মান্ধতার শক্তি আস্তে আস্তে খর্ব, চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যে স্বরূপত দেবতা --- এই কথায় পৃথিবী বিশ্বাসী হতে আরম্ভ করেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনসাধনা ও অনুভূতির আলোকে এই সত্যগুলি জগতে ধীরে ধীরে স্বীকৃত হচ্ছে। এই দৃষ্টি থেকেই সত্যযুগের সূচনা হয়েছে বলা যায়।

একদিন নরেন্দ্রনাথ তাঁর গুরুভাইদের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর থেকে কলকাতায় ফিরছেন ৷ ঢকথা উঠল ঠাকুরের সম্বন্ধে কার কি ধারণা ? ণকেউ বলছে—অপূর্ব জ্ঞান, কেউ বলছে—অসাধারণ ভক্তি ৷ মএরকম নানা জনের নানারকম মন্তব্য হচ্ছে ৷ নরেন্দ্রনাথ চুপ করে আছেন ৷ তখন অনেকে তাঁকে বললে—তুমি কি বল?স্বামীজী উত্তরে বললেন—L-O-V-E personified—প্রেমের মূর্তবিগ্রহ ৷ ঢঠাকুরকে তিনি এইভাবে দেখেছেন ৷ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ ছিল অদ্ভুত ৷ঠাকুরের কাছে তিনি যে আত্মসমর্পণ করেছেন তা একদিনে নয় ৷ 

ঠাকুরের সঙ্গে তিনি অনেক দ্বন্দ্ব করেছেন, বলেছেন—তাঁর সঙ্গে এমন লড়াই বোধহয় আর কেউ করেনি ! পদে পদে তিনি ঠাকুরের কথার প্রতিবাদ করেছেন, তর্ক করেছেন,  আর বলেছেন—প্রতিবারই হারতে হয়েছে ৷ যে-ঠাকুর লেখাপড়া জানতেন না, শিষ্ট সমাজে চলার উপযুক্ত কি না সন্দেহ—তাঁর কাছে স্বামীজী বারবার পরাভূত ৷ কেন ? কারণ, ঠাকুরের যে অপূর্ব শক্তি, তার কাছে কে না পরাস্ত হয় !



কাশীপুরে মহাসমাধির আগে তিনি নরেন্দ্রনাথকে তাঁর সমস্ত আধ্যাত্মিক শক্তি সমর্পণ করলেন  ।স্বামীজী অনুভব করেছিলেন ঠাকুরেরাদেহ থেকে তড়িৎকম্পনের মতো সূক্ষ্ম তেজোরশ্মি তাঁর দেহমধ্যে প্রবেশ করছে ৷ তিনি বাহ্যজ্ঞান হারালেন  ৷ চেতনা লাভ করে তিনি দেখলেন ঠাকুরের চক্ষে অশ্রুবর্ষন হচ্ছে ৷ তাতে অতীব চমৎকৃত হয়ে এরূপ করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ঠাকুর বললেন," আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম ৷ তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি ৷ কাজ শেষ হলে পরে ফিরে যাবি ৷"

    ঠাকুরের অশ্রুবর্ষন দুঃখে নয়— এ আনন্দাশ্রু ৷ তিনি এমন একজন উত্তরাধিকারীকে পেয়েছেন, যার ওপর তাঁর জগদুদ্ধারকার্যের যে আদর্শ, তাকে রূপায়িত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ৷ 

এই শক্তিমান ব্যক্তিই তাঁর পতাকা বহন করে চারদিকে নিয়ে যাবেন, বিশ্বজয় করবেন ৷ম স্বামীজী ধর্মজীবনকে নতুনভাবে আমাদের কাছে পরিবেশন করেছেন ৷ণতিনি ঠাকুরের কাছ থেকে তা পেয়েছে ৷ স্বামীজী না বললে আমরা কেউ ঠাকুরকে বুঝতে পারতাম না যে, তিনি এই তত্ত্ব প্রকাশ করতে দেহধারণ করে এসেছেন ৷ঠাকুরকে আমরা সাধারণভাবে একজন খুব উঁচুদরের ভক্ত বা উঁচুদরের জ্ঞানী, বড়জোর একজন মহাপুরুষ ভাবতে পারতাম ৷ 

          কিন্তু জগতে একটা পরিবর্তন এনে দিতে পারে, এমন বিপুল শক্তি যে তাঁর ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে—একথা স্বামীজীর সাহায্য ছাড়া আমরা কখনো বুঝতে পারতাম না ৷

স্বামীজি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ধর্মমত প্রসঙ্গে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছিলেন::

(১) শ্রীরামকৃষ্ণ ধর্ম সম্বন্ধে কোনও একটি বিশেষ মত ও পথের সমর্থনে কথা  বলেননি। বরং সকল প্রকার ধর্মমতের মধ্যে একটি মূল ঐক্যের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে সবগুলিরই সত্য প্রতিপাদন করেছেন নিজজীবনে তাদের বাস্তবায়িত করে।

(২) শ্রীরামকৃষ্ণ সংসার বা বস্তুজীবন ও ধর্মজীবনের মধ্যে কোনও বিশেষ ব্যবধান রচনা করেননি, যার ফলে একটি থেকে অন্যটিতে উত্তরণের পথ রুদ্ধ হয়নি। এখন জীবলোক থেকে শিবলোকে অনায়াসে যাওয়া যাবে। 

(৩) ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বাহুল্যের প্রতি জোর না দিয়ে , ঈশ্বরতত্ব বা অদ্বৈততত্ত্বের ধ্যান, স্মরণ মনণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন; ধর্মকে কোনও বিশেষ গন্ডিতে আবদ্ধ করে দেননি।

(৪) শ্রীরামকৃষ্ণদেব ধর্মচর্চায় একটি নতুন পথ সংযুক্ত করে দিয়েছেন,  তা হল সেবাকর্ম ও তার  অনন্ত বিস্তৃতি, যেখানে কর্মই হয়ে যায় ধর্ম,  মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেয়, ঈশ্বর ও জীবের সহজ স্বাভাবিক মেলবন্ধন ঘটে। এখানে তাঁর শিবঞ্জানে জীবসেবার নির্দেশটি মনে রাখতে হবে।

(৪) শ্রীরামকৃষ্ণদেবর কোনও কথাই সনাতন হিন্দুধর্মের বা ঐতিহ্যগত জীবনযাপনের বা ঔপনিষদিক ভাবধারার বিরোধী নয়, আশ্চর্যভাবে সেগুলির অনুকূলেই তিনি রায় দিয়েছেন।  

এইভাবে স্বামীজি দেখিয়ে দিয়েছেন,  শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব জগতে --- বিশেষত আধ্যাত্মিক জগতে নবযুগের সূচনা করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন,  শ্রীরামকৃষ্ণ প্রদর্শিত ভাবধারা এযুগে সর্বাপেক্ষা উপযোগী এবং বরণীয়ও বটে। শ্রীরামকৃষ্ণের নাম নয়, তাঁর ভাব প্রচারই আসল ==== এই ছিল স্বামীজির মত । তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন  " আমাদের জাতীয় কল্যাণের জন্য   আমাদের ধর্মের উন্নতির জন্য  কর্তব্যবুদ্ধিপ্রণোদিত হয়ে আমি এই মহান আধ্যাত্মিক আদর্শ তোমাদের সামনে স্থাপন করছি "। স্বামীজি যেভাবে শ্রীরামকৃষ্ণকে বুঝেছেন এবং তাঁর ভাবাদর্শ অনুসরণের পুথর্নির্দেশ করে গিয়েছেন,  সে পথে আমরা যত অগ্রসর হতে পারব ততই মঙ্গল। তাঁদের কৃপায় আমরা যেন এ আদর্শ পথে চলতে পারি