শ্রীরামকৃষ্ণদেব ও স্বামী বিবেকানন্দের সম্পর্ক---- ইতিহাসের পাতায় যতগুলি শ্রেষ্ঠ গুরু - শিষ্য সম্পর্ক আছে তাদের মধ্যে অন্যতম।
তিনি ( শ্রীরামকৃষ্ণ ) যে কি, কত কত পূর্বগ-অবতারগনের জমাটবাঁধা ভাবরাজ্যের রাজা, তা জীবনপাতী তপস্যা করেও একচুল বুঝতে পারলুম না। তাঁর ভাবসমুদ্রের র্ঊচ্ছাসের এক বিন্দু ধারণা করতে পারলে মানুষ তখনি দেবতা হয়ে যায়। সর্বভাবের সমন্বয় জগতের ইতিহাসে আর কোথাও কি খুঁজে পাওয়া যায় ? এই থেকেই বোঝ ---- তিনি কে দেহ ধরে এসেছিলেন। অবতার বললে তাকে ছোট করা হয়।
শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনে সাধনার মধ্য দিয়ে সর্বধর্মের সমন্বয় দেখে স্বামীজি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর প্রভাবে আপাতবিচ্ছিন্ন ভারত আবার এক হবে। এই সমন্বয়ই হবে আধুনিক ভারতের জাতীয়তার মূল ভিত্তি। সর্বধর্ম সমন্বয় ও সকল মতসহিষ্ঞুতার প্রতিষ্ঠা না হলে আমাদের এই বিশাল বৈচিত্র্যপূর্ন দেশে জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠত না। শ্রীরামকৃষ্ণকে স্বামীজি পূর্ব ধর্মাচার্যদের নব্যরুপ বলে গ্রহণ করে আরও দেখালেন যে তিনি কর্ম, ধ্যান, ভক্তি ও জ্ঞান---- সমস্ত যোগের সমন্বয় নিজের জীবনে করেছেন। এ-প্রসঙ্গে স্বামীজি বলেছেন " এ নতুন অবতারের এই শিক্ষা যে এখন যোগ, ভক্তি, ঞ্জান ও কর্মের উৎকৃষ্ট ভাব এক করে এক নতুন সমাজ তৈরি করতে হবে ।" ঞ্জানমার্গ পথ হিসাবে ভাল হলেও এতে শুষ্ক পান্ডিত্যে পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। ভক্তিও খুব ভাল কিন্ত বহুক্ষেত্রে নিরর্থক ভাবপ্রবনতায় আসল জিনিসই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এগুলির সুষ্ঠু সামঞ্জস্যের বড় দরকার। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন এই সমন্বয়ে পূর্ণ ছিল। তাই তাঁর জীবন ও উপদেশকে আদর্শ রুপে সামনে রেখে আমাদের এগুতে হবে।
১৮৮১-র নভেম্বরে কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণকে আমন্ত্রণ করে একটি ছোট উৎসবের আয়োজন করেছিলেন। সেখানে গান গাইবার জন্য পাড়ার ছেলে নরেন্দ্রকে তিনি ডেকে এসেছিলেন। নরেন্দ্র এর কিছুদিন আগেই কলেজের প্রিন্সিপাল হেস্টিসাহেবের মুখে প্রথম শ্রীরামকৃষ্ণের নাম শোনেন। কবিতা পড়াতে পড়াতে অধ্যাপক বুঝিয়েছিলেন প্রকৃতির সৌন্দর্য অনুধাবন করতে করতে কেমন করে মানুষের মন অতীন্দ্রিয় রাজ্যে চলে যায়। ছাত্ররা তা সঠিকভাবে ধারনা পারছিল না দেখে তিনি ব্যাখ্যা করেছিলেন, মনের পবিত্রতা ও একাগ্রতার ফলে এমন অনুভূতি হয়ে থাকে। আধুনিক কালে এ অনুভূতি দুর্লভ হলেও এ প্রসঙ্গে তিনি দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের নাম করেছিলেন, যার এমন হয়ে থাকে। বলেছিলেন ইচ্ছা হলে তাকে ছেলেরা দেখে আসতে পারে। গান গাইতে এসে নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণকে দর্শনের সেই দুর্লভ সুযোগ পান।
শ্রীরামকৃষ্ণের সেদিনের বিশেষ অনুরোধে এর কয়েকদিন পর নরেন্দ্রনাথ দুই বন্ধুর সাথে দক্ষিণেশ্বরে যান। ঠাকুর তাকে গান গাইতে বলাতে তিনি " মন চল নিজ নিকেতনে " গানটি গাইলেন। এরপর শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে পাশের বারান্দায় নিয়ে গিয়ে হাত ধরে পরম স্নেহে বলতে থাকেন " এতদিন পরে আসতে হয় ? আমি তোমার জন্য কীভাবে অপেক্ষা করে রয়েছি তা একবার ভাবতে নেই? বিষয়ী লোকের বাজে প্রসঙ্গ শুনতে শুনতে আমার কান ঝলসে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে ........।" এমন কত কথা বলেন আর কাঁদেন। পরক্ষণেই আবার নরেন্দ্রর সামনে হাতজোড় করে বলে চলেন " জানি আমি প্রভু, তুমি সেই পুরাতন ঋষি, নররূপী নারায়ণ। জীবের দুর্গতি নিবারন করতে আবার শরীর ধারন করেছ ।"
নরেন্দ্র তাঁর এমন আচরণে ও কথায় অবাক। পরবর্তী কালে সেদিনের কথা মনে করে তিনি রলছেন " মনে মনে ভাবতে লাগলাম এ কাকে দেখতে এসেছি ? ইনি তো একেবারে উন্মাদ.....। তার পরই তিনি মাখন, মিছরি এবং কতগুলি সন্দেশ এনে আমাকে খাইয়ে দিতে লাগলেন। আমি যত বলি আমাকে দিন, আমি সঙ্গীদের সাথে ভাগ করে খাব----- তা কিছুতেই শুনলেন না। বললেন ' ওরা খাবে এখন , তুমি খাও।' ...... পরে হাত ধরে বললেন ' বল, তুমি শীঘ্র একদিন এখানে আমার কাছে একাকী আসবে।' তাঁর একান্ত অনুরোধ এড়াতে না পেরে অগত্যা আসব বলে বন্ধুদের কাছে চলে এলাম।"
আরম্ভ হল তাদের মধ্যে গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক। নরেন্দ্র প্রত্যেক পদে শ্রীরামকৃষ্ণেকে পরীক্ষা করে দেখেছিলেন তাঁর প্রতি কথাই সত্য। বুঝেছিলেন ত্যাগ, ভক্তি ও জ্ঞানে শ্রীরামকৃষ্ণ অতুলনীয়। যতই তিনি তাঁর সঙ্গলাভ করলেন, ততই তাঁর প্রতি ভক্তি , বিশ্বাস ও ভালবাসায় ভরপুর হয়ে উঠলেন। অপরদিকে শ্রীরামকৃষ্ণ নরেন্দ্র সম্পর্কে বলেছিলেন " কেশবচন্দ্র সেন যেমন একটি শক্তির বিশেষ উৎকর্ষে জগৎবিখ্যাত হয়েছেন, নরেন্দ্রর মধ্যে তেমন আঠারোটি শক্তি পূর্ণ মাত্রায় বিদ্যমান। নরেন্দ্র হল সহস্র দল পদ্ম। অন্যরা কলসি, ঘটি হতে পারে, কিন্ত নরেন্দ্র জালা। ডোবা পুষ্করিণীর মধ্যে নরেন্দ্র বড় দিঘী। যেমন হালদার পুকুর।"এই বিরাট শক্তির আধারকে শ্রীরামকৃষ্ণ এমন ভাবে গড়ে তুলেছিলেন যাতে তাঁর আধ্যাত্মিক সম্পদের অধিকারী হয়়ে তাঁরই সঙ্কল্পিত যুগধর্ম প্রবর্ত্তন করতে পারেন নরেন্দ্রনাথ। প্রায় পাঁচ বছর নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গলাভে ধন্য হন, তাঁর কৃৃৃৃপায় নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন।তাঁর উপলব্ধি হয় ----- " শ্রীরামকৃষ্ণ অবতারের অনন্ত ঞ্জান, অনন্ত প্রেম, অনন্ত কর্ম, অনন্ত জীবে দয়া।"
এরপর নরেন্দ্র লক্ষ্য করলেন, অন্যদের সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের আচরণে ও কথাবার্তায় কোথাও কোনোও অসংগতি নেই। সহজ সরল ভাষায় কত উচ্চ আধ্যাত্মিক ভাব তিনি বর্ণনা করছেন। তখন নরেন্দ্রর মনে হল তিনি সত্যিই উচ্চস্তরের সত্যদ্রষ্টা মহাপুরুষ। তিনি যে জিঞ্জাসা নিয়ে এতদিন অনেকের কাছে ঘুরেছেন, তাকেও সেই একই প্রশ্ন করলেন, "অপনি কি ঈশ্বর দর্শন করেছেন?" সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর পেলেন, "হ্যা, আমি ঈশ্বর দর্শন করেছি। ঠিক যেমন তোমাদের দেখছি। তবে এর চেয়েও আরও ঘনিষ্ট রূপে। ‐‐‐‐‐ ঈশ্বর দর্শন হয়, তাকে দেখা যায়। তাঁর সঙ্গে কথা বলা চলে, ঠিক যেমন আমি তোমাদের সাথে কথা বলছি। কিন্ত কে তা চায় ? লোকে মাগছেলের শোকে বিষয় আশয়ের দু:খে ঘটি ঘটি কাদে কিন্ত ভগবানের জন্য কে তা করে ? আন্তরিক ভাবে ভগবানের জন্য কাঁদলে তিনি নিশ্চয়ই দেখা দেন। "
দক্ষিণেশ্বরে একদিন শ্রীরামকৃষ্ণ অর্ধবাহ্যদশায় বলেন " জীবে দয়া! দূর শালা! দয়া করবার তুই কে ? না, না জীবে দয়া নয়, ---- শিবঞ্জানে জীবসেবা।" ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের কথা একঘর ভক্ত শুনলেও একমাত্র নরেন্দ্রনাথই কথাগুলির মধ্যে খুজে পেয়েছিলেন অদৈত্ব সাধনার সঙ্গে ভক্তি ও কর্মযোগের সমন্বয়, বনের বেদান্তকে ঘরে আনার উপায়। তাই গুরুভাইদের বলেছিলেন " কী অদ্ভুত আলোকেই আজ দেখতে পেলাম ঠাকুরের কথায়। ভগবান যদি কখনও দিন দেন তো এই সত্য সর্বত্র প্রচার করব ‐- পন্ডিত, মূর্খ, ধনী, দরিদ্র, ব্রাহ্মণ, চন্ডাল সবাই কে শুনিয়ে মহিত করব।" এইভাবেই ঠাকুর কর্মযোগকেও ঈশ্বর লাভের এক পথ করে দিয়েছেন। স্বামীজি এই কথার ভিত্তিতেই তাঁর বিখ্যাত নববেদান্ত তথা নবতর কর্মযোগের তত্ত্ব গড়ে তুলেছেন এবং রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে সেবামূলক কাজের প্রবর্তন করেছেন।
পরিণত বয়সে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী লেখার জন্য অনিরুদ্ধ হয়ে স্বামীজি অকপটে বলেছিলেন " ‐‐‐‐ আমাকে এই অনুরোধটি করবেন না। একাজ ছাড়া আর যা বলবেন আমি তাই করব। যদি পৃথিবী ওলট-পালট করতে বলেন তো সে পারব কিন্ত একাজটি পারব না। তিনি (শ্রীরামকৃষ্ণ) এত মহান ছিলেন, এত বড় ছিলেন, আমি তাকে কিছুই বুঝতে পারিনি। তাঁর জীবনের এক কণাও আমি জানতে পারিনি। শেষে শিব গড়তে গিয়ে কি বানর গড়ে ফেলব ? আমি তা পারব না।" এই একটি উক্তি থেকেই বোঝা যায় স্বামীজি কী দৃষ্টিতে শ্রীরামকৃষ্ণেকে দেখতেন। স্বামীজি বলতেন, শ্রীরামকৃষ্ণ শুধু অবতার নন, "অবতারবরিষ্ঠ "। তিনি সনাতন ধর্মের প্রতীক। তাঁর আবির্ভাবেই সনাতন ধর্ম সুদূঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। "খন্ডন ভববন্ধন জগবন্ধন বন্দি তোমায়"_____ স্বামীজি রচিত এই গানটি শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরে সন্ধারতির সময় গীত হয় তা শ্রীগুরুর প্রতি শিষ্যের অন্তরের গভীরতম ভক্তির প্রকাশ।
স্বামী বিবেকানন্দের কথার মধ্য দিয়েই জগৎ তাঁর আচার্যের কথা শুনেছে ও শুনছে। মানব সংস্কৃতির সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও বানীর সম্পর্ক ক্রমে মানুষ বুঝতে পারছে। স্বামী বিবেকানন্দের ব্যাখ্যা ছাড়া শ্রীরামকৃষ্ণের এই বিশাল ভাব বোঝা যায় না আবার শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন, সাধনা ও অনুভূতি থেকে আলাদা করে দেখলে স্বামীজির বাণীর গভীরতাও বোঝা যায় না। শ্রীরামকৃষ্ণ সে-অর্থে শাস্ত্রাদি অধ্যয়ন না করেই সাধনার মাধ্যমে ঈশ্বর দর্শন করেছিলেন। নিরক্ষর ঠাকুরের শাস্ত্র নির্দিষ্ট উপলব্ধিগুলির যথাযথ অনুভূতি হওয়ায় শাস্ত্রের সত্যতা বিশেষভাবে প্রমাণিত হয়েছে। স্বামীজি এ-সম্পর্কে বলছেন, শাস্ত্র সত্য বলে প্রমাণ করার জন্যই ঠাকুরের নিরক্ষর হয়ে আগমন। শ্রীরামকৃষ্ণের মধ্যে বহু সাধকের বহু সাধনার ধারার মিলন ও সেই সবগুলির মধ্য দিয়ে ঈশ্বরের উপলব্ধি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দ্বৈত, বিশিষ্টাদ্বৈত, অদৈত্ব ইত্যাদি আপতবিরোধী বহু ব্যাখ্যায় সকলে যখন বিভ্রান্ত তখন স্বামীজি বেদমূর্তি শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনালোকে এগুলির সুষ্ঠ সমন্বয় করেছেন। আরও বলেছেন " বেদ, বেদান্ত, পুরাণ, ভাগবতে যে কী আছে তা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবকে না পড়লে কিছুই বোঝা যাবে না।"
স্বামীজি বলেছিলেন ___ শ্রীরামকৃষ্ণ যেদিন জন্মগ্রহণ করেছেন সেদিন থেকেই সত্যযুগ এসেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনালোকে বেদান্তধর্মই নতুন দৃষ্টিতে , নতুন ভাবে ব্যাখ্যাত হয়ে নবযুগধর্মরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে--- যার দ্বারা সত্যযুগের সূচনা হয়েছে। এযুগে হিন্দু-মুসলমান বা খ্রিস্টান-হিন্দু ভেদ , সব চলে যাবে। এক বর্ণ, এক বেদ, সমগ্র জগতে শান্তি ও সমন্বয় স্থপিত হবে। এ সত্যযুগে তাঁর "প্রেমের বন্যায় সব একাকার " হবে। স্বামীজির মতে জগতে সর্বদাই একটি মাত্র ধর্ম রয়েছে। হিন্দু, খ্রিস্টান, ইসলাম, বৌদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন ধর্ম এই এক অক্ষয় সনাতন ধর্মের বিভিন্ন রূপ মাত্র। শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাবের সময় থেকে জড়বাদের শক্তি, ধর্মান্ধতার শক্তি আস্তে আস্তে খর্ব, চূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ যে স্বরূপত দেবতা --- এই কথায় পৃথিবী বিশ্বাসী হতে আরম্ভ করেছে। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনসাধনা ও অনুভূতির আলোকে এই সত্যগুলি জগতে ধীরে ধীরে স্বীকৃত হচ্ছে। এই দৃষ্টি থেকেই সত্যযুগের সূচনা হয়েছে বলা যায়।
একদিন নরেন্দ্রনাথ তাঁর গুরুভাইদের সঙ্গে দক্ষিণেশ্বর থেকে কলকাতায় ফিরছেন ৷ ঢকথা উঠল ঠাকুরের সম্বন্ধে কার কি ধারণা ? ণকেউ বলছে—অপূর্ব জ্ঞান, কেউ বলছে—অসাধারণ ভক্তি ৷ মএরকম নানা জনের নানারকম মন্তব্য হচ্ছে ৷ নরেন্দ্রনাথ চুপ করে আছেন ৷ তখন অনেকে তাঁকে বললে—তুমি কি বল?স্বামীজী উত্তরে বললেন—L-O-V-E personified—প্রেমের মূর্তবিগ্রহ ৷ ঢঠাকুরকে তিনি এইভাবে দেখেছেন ৷ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সম্বন্ধ ছিল অদ্ভুত ৷ঠাকুরের কাছে তিনি যে আত্মসমর্পণ করেছেন তা একদিনে নয় ৷
ঠাকুরের সঙ্গে তিনি অনেক দ্বন্দ্ব করেছেন, বলেছেন—তাঁর সঙ্গে এমন লড়াই বোধহয় আর কেউ করেনি ! পদে পদে তিনি ঠাকুরের কথার প্রতিবাদ করেছেন, তর্ক করেছেন, আর বলেছেন—প্রতিবারই হারতে হয়েছে ৷ যে-ঠাকুর লেখাপড়া জানতেন না, শিষ্ট সমাজে চলার উপযুক্ত কি না সন্দেহ—তাঁর কাছে স্বামীজী বারবার পরাভূত ৷ কেন ? কারণ, ঠাকুরের যে অপূর্ব শক্তি, তার কাছে কে না পরাস্ত হয় !
কাশীপুরে মহাসমাধির আগে তিনি নরেন্দ্রনাথকে তাঁর সমস্ত আধ্যাত্মিক শক্তি সমর্পণ করলেন ।স্বামীজী অনুভব করেছিলেন ঠাকুরেরাদেহ থেকে তড়িৎকম্পনের মতো সূক্ষ্ম তেজোরশ্মি তাঁর দেহমধ্যে প্রবেশ করছে ৷ তিনি বাহ্যজ্ঞান হারালেন ৷ চেতনা লাভ করে তিনি দেখলেন ঠাকুরের চক্ষে অশ্রুবর্ষন হচ্ছে ৷ তাতে অতীব চমৎকৃত হয়ে এরূপ করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে ঠাকুর বললেন," আজ যথাসর্বস্ব তোকে দিয়ে ফকির হলুম ৷ তুই এই শক্তিতে জগতের কাজ করবি ৷ কাজ শেষ হলে পরে ফিরে যাবি ৷"
ঠাকুরের অশ্রুবর্ষন দুঃখে নয়— এ আনন্দাশ্রু ৷ তিনি এমন একজন উত্তরাধিকারীকে পেয়েছেন, যার ওপর তাঁর জগদুদ্ধারকার্যের যে আদর্শ, তাকে রূপায়িত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ৷
এই শক্তিমান ব্যক্তিই তাঁর পতাকা বহন করে চারদিকে নিয়ে যাবেন, বিশ্বজয় করবেন ৷ম স্বামীজী ধর্মজীবনকে নতুনভাবে আমাদের কাছে পরিবেশন করেছেন ৷ণতিনি ঠাকুরের কাছ থেকে তা পেয়েছে ৷ স্বামীজী না বললে আমরা কেউ ঠাকুরকে বুঝতে পারতাম না যে, তিনি এই তত্ত্ব প্রকাশ করতে দেহধারণ করে এসেছেন ৷ঠাকুরকে আমরা সাধারণভাবে একজন খুব উঁচুদরের ভক্ত বা উঁচুদরের জ্ঞানী, বড়জোর একজন মহাপুরুষ ভাবতে পারতাম ৷
কিন্তু জগতে একটা পরিবর্তন এনে দিতে পারে, এমন বিপুল শক্তি যে তাঁর ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হচ্ছে—একথা স্বামীজীর সাহায্য ছাড়া আমরা কখনো বুঝতে পারতাম না ৷
স্বামীজি শ্রীরামকৃষ্ণদেবের ধর্মমত প্রসঙ্গে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য লক্ষ করেছিলেন::
(১) শ্রীরামকৃষ্ণ ধর্ম সম্বন্ধে কোনও একটি বিশেষ মত ও পথের সমর্থনে কথা বলেননি। বরং সকল প্রকার ধর্মমতের মধ্যে একটি মূল ঐক্যের প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ করে সবগুলিরই সত্য প্রতিপাদন করেছেন নিজজীবনে তাদের বাস্তবায়িত করে।
(২) শ্রীরামকৃষ্ণ সংসার বা বস্তুজীবন ও ধর্মজীবনের মধ্যে কোনও বিশেষ ব্যবধান রচনা করেননি, যার ফলে একটি থেকে অন্যটিতে উত্তরণের পথ রুদ্ধ হয়নি। এখন জীবলোক থেকে শিবলোকে অনায়াসে যাওয়া যাবে।
(৩) ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের বাহুল্যের প্রতি জোর না দিয়ে , ঈশ্বরতত্ব বা অদ্বৈততত্ত্বের ধ্যান, স্মরণ মনণের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেছেন; ধর্মকে কোনও বিশেষ গন্ডিতে আবদ্ধ করে দেননি।
(৪) শ্রীরামকৃষ্ণদেব ধর্মচর্চায় একটি নতুন পথ সংযুক্ত করে দিয়েছেন, তা হল সেবাকর্ম ও তার অনন্ত বিস্তৃতি, যেখানে কর্মই হয়ে যায় ধর্ম, মুক্তির পথ উন্মুক্ত করে দেয়, ঈশ্বর ও জীবের সহজ স্বাভাবিক মেলবন্ধন ঘটে। এখানে তাঁর শিবঞ্জানে জীবসেবার নির্দেশটি মনে রাখতে হবে।
(৪) শ্রীরামকৃষ্ণদেবর কোনও কথাই সনাতন হিন্দুধর্মের বা ঐতিহ্যগত জীবনযাপনের বা ঔপনিষদিক ভাবধারার বিরোধী নয়, আশ্চর্যভাবে সেগুলির অনুকূলেই তিনি রায় দিয়েছেন।
এইভাবে স্বামীজি দেখিয়ে দিয়েছেন, শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব জগতে --- বিশেষত আধ্যাত্মিক জগতে নবযুগের সূচনা করেছে। তিনি বিশ্বাস করতেন, শ্রীরামকৃষ্ণ প্রদর্শিত ভাবধারা এযুগে সর্বাপেক্ষা উপযোগী এবং বরণীয়ও বটে। শ্রীরামকৃষ্ণের নাম নয়, তাঁর ভাব প্রচারই আসল ==== এই ছিল স্বামীজির মত । তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন " আমাদের জাতীয় কল্যাণের জন্য আমাদের ধর্মের উন্নতির জন্য কর্তব্যবুদ্ধিপ্রণোদিত হয়ে আমি এই মহান আধ্যাত্মিক আদর্শ তোমাদের সামনে স্থাপন করছি "। স্বামীজি যেভাবে শ্রীরামকৃষ্ণকে বুঝেছেন এবং তাঁর ভাবাদর্শ অনুসরণের পুথর্নির্দেশ করে গিয়েছেন, সে পথে আমরা যত অগ্রসর হতে পারব ততই মঙ্গল। তাঁদের কৃপায় আমরা যেন এ আদর্শ পথে চলতে পারি




No comments:
Post a Comment