Thursday, 1 April 2021

আটপুর গ্রামে শ্রীরামকৃষ্ণ মঠ

 আঁটপুর (ইংরেজি:Antpur) ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের হুগলি জেলার একটি গ্রাম। এটি তারকেশ্বর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। 





ঐতিহাসিক গুরুত্ব  ::সম্পাদনা






শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণদেবে, শ্রীশ্রীমা ও স্বামীজি সহ ঠাকুরের অধিকাংশ ত্যাগী সন্তানের পাদপর্শধন্য আঁটপুর আজ নরেন্দ্রনাথ প্রমুখের গ্রহন করা জগৎকল্যানের সঙ্কল্প সার্থক করার কাজে এগিয়ে চলেছে।  ১৮ একর ১২ শতক জমির উপর বিস্তৃত  এই কেন্দ্রে নিত্যপূজা, নিয়মিত শাস্ত্রালোচনা ছাড়াও অনুষ্ঠিত হয় দুর্গাপূজা  এবং ঠাকুর,  মা, স্বামীজি ও স্বামী প্রেমানন্দের জন্মতিথি উৎসব।












১৮৫৪ সালে দুর্গাপুজোর সময় শ্রীরামকৃষ্ণ আঁটপুরের  এক জমিদার  রামপ্রসাদ মিত্রের বাড়িতে আসেন।  আবার পরবর্তী কালে ১৮৮৮ এবং  ১৮৯৪ সালে শ্রীশ্রীমা জমিদার তারাপদ ঘোষের বাড়িতে আসেন এবং দ্বিতীয় বার তাঁর উপস্থিততে সেখানে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়।  এসব ঘটনাগুলি পরবর্তী কালে আঁটপুরকে ইতিহাসে এক অতি মাহাত্ম্যপূর্ন স্থানে স্থাপন করে।











শ্রীশ্রীঠাকুরের মহাপ্রয়ানের পর তাঁর বিরহে শোকবিহ্বল নরেন্দ্রনাথ,  বাবুরাম প্রমুখ ঠাকুরের নয়জন ত্যাগী সন্তান বাবুরামের  (পরবর্তীকালে  স্বামী প্রেমানন্দ  ) জন্মস্থান আঁটপুর থেকে তাঁর মায়ের নিমন্ত্রণ পেয়ে ১৮৮৬  সালে ডিসেম্বর সেখানে পৌচ্ছান এবং বাবুরামের গৃহে কিছুদিন অবস্থান করে নিরবিচ্ছিন্ন ডগবৎ চিন্তা ও ঈশ্বরসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন।  বাবুরামের পিতা ছিলেন  আঁটপুরের জমিদার তারাপদ ঘোষ ও মাতা মাতঙ্গনী দেবী।  সেই সময় ২৪ শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ধুনি জ্বালিয়ে তার চারপাশে বসে তারা গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে পরেন  এবং ধ্যানান্তে যিশুখ্রিস্টের ত্যাগদীপ্ত পূত জীবনের কথা আলোচনা করতে করতে জগৎকল্যানে তারা সংসারত্যাগ ও একটি সঙ্ঘস্থাপনের সঙ্কল্প গ্রহন করেন।  এ  প্রসঙ্গে স্বামী শিবানন্দ পরবর্তিকালে বলেন  " আঁটপুরেই আমাদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার সঙ্কল্প দৃঢ় হলো। ঠাকুর তো আমাদের সন্ন্যাসী করে দিয়েছিলেন------ ঐ ভাব আরও পাকা হলো আঁটপুরে।" 

ধুনিমণ্ডপ।  এই স্থানে বিবেকানন্দ ও অন্যান্যরা সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। 





ধুনিমন্ডপের ভিতরে




নয়জন সন্ন্যাসীর আসল ও সন্ন্যাস নাম



ধুনিমণ্ডপ 



২৪ ডিসেম্বর, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দ। ১৩পৌষ,১২৯৩ বঙ্গাব্দ   । 

সন্ধে পেরিয়ে গেছে অনেক ক্ষণ। বেশ রাত। তারাভরা আকাশ। সামনে জ্বলছে ধুনি। ধ্যানে নিমগ্ন ন’টি যুবক। শ্রীরামকৃষ্ণের নয় ভক্ত। শেষ হল ধ্যান। শুরু হল ঈশ্বর নিয়ে আলোচনা। সেখানে মূল কথক অবশ্য একজনই। বাকিরা শ্রোতা। যিশু খ্রিস্টের জীবনকথা শোনালেন তিনি। অনেকের ত্যাগের মধ্য দিয়ে কী ভাবে খ্রিস্ট ধর্ম ও খ্রিস্ট সম্প্রদায় ব্যাপক ভাবে প্রসারিত হয়েছে তা শোনালেন। তিনি বোঝালেন, জগৎ কল্যাণে নিজেদের উৎসর্গ করতে হলে ত্যাগই বড় কথা। আর এর প্রথম ধাপ হল সংসারত্যাগ। ন’জন গুরুভ্রাতা উঠে দাঁড়ালেন, ধুনির অগ্নিশিখাকে সাক্ষী করে সংকল্প করলেন মানুষের স্বার্থে সংসার ত্যাগ করবেন। সন্ন্যাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন নরেন্দ্র (বিবেকানন্দ), বাবুরাম (প্রেমানন্দ), শরৎ (সারদানন্দ), শশী (রামকৃষ্ণানন্দ), তারক (শিবানন্দ), কালী (অভেদানন্দ), নিরঞ্জন (নিরঞ্জনানন্দ), গঙ্গাধর (অখণ্ডানন্দ) এবং সারদা (ত্রিগুণাতীতানন্দ)। বাবুরামদের বাড়িই সেই পুণ্যতীর্থ। আজ সেখানে হয়েছে ধুনিমণ্ডপ। মণ্ডপের গায়ে বিবেকানন্দ-সহ নয় সন্ন্যাসীর খোদাই করা মূর্তি। এর চার দিকে পোড়ামাটির কাজে শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনী ও তাঁর কথা বিধৃত।



স্বামীজি এই ঘরে থাকতেন


১৯৫০ সাল থেকে মিত্রবাড়ি ও ঘোষবাড়ির সকল শরিক ক্রমানুসারে তাদের নিজস্ব সম্পত্তি বেলুড় মঠকে দান করতে থাকেন। ১৯৬১ সালে স্বামী সম্বুদ্ধানন্দের নেতৃত্বে এখানে গঠিত হয়  " রামকৃষ্ণ প্রেমানন্দ ট্রাস্ট  "। এই ট্রাষ্টই  পরিবর্তিকালে এখানে শ্রীশ্রীঠাকুুরের মন্দির ও 'সারদা   ভবন '   নামে  গৃহটি  নির্মাণ 
করেন। 

আঁটপুর রামকৃষ্ণ মঠ




ঐ ১৯৬১ সালের  ১৬ই জুন রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের তৎকালীন সম্পাদক স্বামী বীরেশ্বরানন্দজী এখানে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং ১৯৬৫ সালের  ৩রা ডিসেম্বর স্বামী প্রেমানন্দের জন্মতিথির  দিন ঐ মন্দির উদ্বোধন করেন স্বামী নির্বাণানন্দজী মহারাজ।  এর আগে অবশ্য  ২৫শে অক্টোবর  " রামকৃষ্ণ প্রেমানন্দ আশ্রম " কমিটি গঠিত হয়। বোর্ড অফ ট্রাস্টি সকল সম্পত্তির মালিক হলেও এই আশ্রম কমিটিই সকল কাজ পরিচালনা করতে থাকে। ঐ বছরই  ৩রা মে রতনলাল মিত্র বর্তমান মন্দিরের নিকট ৩ শতক বাস্তু জমি দান করেন।  

রামকৃষ্ণ মঠ পরিচালিত অতিথি নিবাস


যে স্থানটিতে নরেন্দ্রনাথ প্রমুখ ঠাকুরের নয়জন শিষ্য  ধুনি জ্বালিয়ে জগৎকল্যানের ব্রত গ্রহন করেছিলেন,  সেই স্থানে এই মহান প্রবিত্র ঘটনার স্মৃতিরক্ষার্থে নির্মিত হয়একটি ধুনিমণ্ডপ।  ১৯৮১ সালে সেটির উদ্বোধন করেন স্বামী বিরেশ্বরানন্দজী মহারাজ।  সেই ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরন রেখে প্রতি বছর  ২৪ শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ধুনি প্রজ্বালন করে সারারাত জপধ্যানের মাধ্যমে এক অতি ভাবগম্ভীর পরিবেশে সন্ধ্যাটি পালিত হয়।


অবশেষে ১৯৮৬ সালের  ২৪ শে ডিসেম্বর ধুনি উৎসবের দিন  তৎকালীন সঙ্ঘাধ্যক্ষ স্বামী গম্ভীরানন্দের উপস্থিতিতে ' রামকৃষ্ণ প্রেমানন্দ আশ্রম ' তার স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বেলুড় মঠকে প্রদান করে এবং এই আশ্রম বেলুড় মঠের একটি শাখাকেন্দ্ররূপে স্বীকৃতিলাভ করে, নাম হয় ---- " রামকৃষ্ণ মঠ, আঁটপুর  "।

নরেন্দ্র সরোবর



পুকুরপাড়ে পাচ শিবমন্দির  ও দোলমঞ্চ 



এই আঁটপুরে রয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ মন্দির। পুকুরপাড়ে আছেন পাঁচ শিব – গঙ্গাধর, বানেশ্বর, ফুলেশ্বর, রামেশ্বর এবং জলেশ্বর। আর রয়েছে প্রায় ২৩০ বছরের পুরনো বিখ্যাত রাধাগোবিন্দ জিউ মন্দির। ১০০ ফুট উঁচু এই মন্দিরের পোড়ামাটির কাজ আজও প্রায় অটুট। কাঁঠাল কাঠে তৈরি ৩৩১ বছরের পুরনো আটচালা চণ্ডীমণ্ডপটিও দেখার মতো।  












আঁটপুর রাধাগোবিন্দজিউ মন্দিরের পোড়ামাটির কারুকার্যে মহিষাসুরমর্দিনী দুর্গা


আঁটপুরের সবথেকে বিখ্যাত মন্দির হল রাধাগোবিন্দজিউ মন্দির। এটি প্রায় ১০০ ফুট উঁচু । বর্ধমান রাজের দেওয়ান কৃষ্ণরাম মিত্র এই মন্দিরটি গঠন করান। মন্দিরটি নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে (১৭০৮ শকাব্দে)। মন্দিরটির গায়ে অসাধারণ টেরাকোটা বা পোড়ামাটির কারুকার্য আছে। মন্দিরের ভিতের ইঁটগুলি গঙ্গামাটি ও গঙ্গাজলে তৈরি। টেরাকোটার বিষয়গুলি নেওয়া হয়েছে ১৮টি পুরান, রামায়ণ, মহাভারত, ভারতের ইতিহাস এবং মন্দির গড়ার সমসাময়িক বিষয় থেকে। মন্দিরটির চণ্ডীমণ্ডপ এবং দোলমঞ্চে কাঠের কারুকার্য আছে।

রাধাগোবিন্দজিউ মন্দিরের সামনে ঐতিহাসিক বকুল গাছ। 


এই মন্দিরটি যে সময়ে নির্মিত হয়েছিল সে সময়ে মুসলমান রাজত্ব হ্রাস পাচ্ছিল এবং ইউরোপিয়ানদের শক্তি বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এরকম বলা হয়ে থাকে যে কৃষ্ণরাম মিত্র হিন্দুদের উৎসাহ বৃদ্ধির জন্য এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। এর আগে বিষ্ণুপুরেই টেরাকোটা মন্দিরের সবচেয়ে ভালো উদাহরনগুলি ছিল। কিন্তু এই মন্দির বিষ্ণুপুরের এই গুরুত্ব খর্ব করেছিল।

রাধাগোবিন্দজিউয়ের মূল মন্দিরের উত্তরদিকে রয়েছে খড়ের ছাউনির চণ্ডীমণ্ডপ।  এটি অসাধারণ কাঠের কাজের অন্যতম নিদর্শন। এটি প্রায় তিনশো বছরের পুরানো এবং এর গায়ে কাঁঠাল কাঠের অসাধারণ কারুকার্য আছে। কৃষ্ণরাম মিত্রের পিতামহ কন্দর্প মিত্র এই চণ্ডীমণ্ডপে তার গুরুদেবের সাথে মহামায়ার পুজো করেছিলেন।  এই পূজোবেদীতে এখনও শারদীয় পূজা ও শ্যামাপূজা হয়। এই মন্দিরটির ঠিক সামনেই প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো একটি বকুল গাছ আছে। গাছটি বহু ইতিহাসের সাক্ষী।




মন্দিরটির গায়ের টেরাকোটাগুলিতে ভারতের ইতিহাস পুরান এবং সর্বধর্ম সমন্বয়কে সার্থকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে রাধাকৃষ্ণ, দুর্গা ও চণ্ডী, বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া যুদ্ধের বিভিন্ন দৃশ্যও স্থান পেয়েছে। যুদ্ধের টেরাকোটা ভাস্কর্যগুলিতে অশ্বারোহী, গজারোহী এবং উটারোহী সৈন্যদের দেখা যায়। এছাড়া কামান এবং বন্দুক নিয়ে সৈন্যদের টেরাকোটাও দেখা যায়। হিন্দু পুরান ও ঐতিহাসিক চরিত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন মুসলমান বাদশা, এবং ইউরোপিয়ানদেরও তুলে ধরা হয়েছে টেরাকোটার মাধ্যমে। [১] মন্দিরটি সিল্ক রুটের উপর অবস্থিত হওয়ায় বহু সংস্কৃতির ছাপ এর উপর পড়েছে। 




রাধাগোবিন্দজিউয়ের মন্দিরটি কালের প্রভাবে বর্তমানে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্থ। তবুও বেশিরভাগ টেরাকোটাই এখনো ভাল অবস্থায় আছে। নিরাপত্তার কারণে বর্তমানে মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ বন্ধ রয়েছে । 




কলকাতা, তারকেশ্বর  বা হরিপাল থেকে সহজেই সড়ক পথে আঁটপুরে আসা যায়। সড়কপথে এলে প্রায় ৪৮ কি মি। হাওড়া থেকে তারকেশ্বরের ট্রেন ধরে  হরিপাল স্টেশনে নেমে সেখান থেকে ১০ নং বাসে বা অটোতে করেও আসা যায়। অতীতে হাওড়া-আমতা-চাপাডাঙ্গা-শিয়াখালা রুটের ন্যাড়োগেজ রেলপথের উপরে আঁটপুর একটা ষ্টেশন ছিল। এই রেলপথটি ছিল মার্টিন লাইট রেলওয়ে কোম্পানির।  ১৯৫০ -এর দশকে এই রেল কোম্পানিটি বন্ধ হয়ে যায় এবং স্বাভাবতই আঁটপুরে পর্যটকদের আসার সংখ্যাও কমে যায়। রোজদিন বেলা ১২টা থেকে ৩টে পর্যন্ত  মন্দির বন্ধ থাকে।



 

খড়ের  ছাউনির চণ্ডীমণ্ডপ    
 

No comments:

Post a Comment