Saturday, 2 August 2025

ষোড়শীপূজা - ফলহারিনী কালীপুজো

 

ষোড়শীপূজা, এক ঐষী জাগরণ,

ফলহারিণী   কালীপুজো *****



✿꧁✿꧂✿✿꧁✿꧂✿✿꧁✿꧂✿✿꧁✿꧂✿

শক্তির দুটি রূপ । একটি বিদ্যা মায়া আরেকটি অবিদ্যা মায়া।

ঠাকুর ষোড়শী পূজোর মাধ্যমে মায়ের অবিদ্যা মায়া সরিয়ে বিদ্যা মায়াকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

বিদ্যা মায়া যা আমাদের ঈশ্বরের পথে , মুক্তির পথে নিয়ে যায়‌। অবিদ্যা মায়া সংসার বন্ধনে আবদ্ধ করে।

যা কিছু পুড়িয়ে নষ্টভ্রষ্ট করে দিতে পারে


এই পুজোর তিথি অত্যন্ত শুভ। অতি পুণ্য অমাবস্যা। যে তিথিতে দেবীর চরণে সব কর্মফল সমর্পণ করতে হয়। আর, ভক্তের অর্জিত সমস্ত অশুভ কর্মফল হরণ করেন দেবী। সেই কারণে দেবীর নাম 'ফলহারিণী'। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে ফলহারিণী কালীপুজো হয়। 

শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে ফলহারিণী কালীপুজোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ১২৮০ বঙ্গাব্দে এই বিশেষ রাতেই শ্রীরামকৃষ্ণ  সারদা দেবীকে দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী ‘ষোড়শী’ রূপে পুজো করেছিলেন। সেই থেকে রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনে ফলহারিণী কালীপুজো বিশেষ গুরুত্ব পায়। রামকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে এই পুজো ষোড়শী পুজো নামেও পরিচিত।


পূজোর আগে শ্রীশ্রীমাকে দেবীর আসনে বসিয়ে ঠাকুর আবাহন মন্ত্র উচ্চারণ করেন।

"হে বালে, হে সর্বশক্তির অধিশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরী,

সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইহার (শ্রীশ্রীমা) শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর।" 

এবং পূজা শেষে   নিজের জপের মালা, সাধনার সমগ্র ফল মার চরণে সমর্পণ করেন।

এই পূজোর মাধ্যমে  শ্রীরামকৃষ্ণদেব শ্রীশ্রীমায়ের মায়ের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে জাগ্রত করেন।

১২৮০ সালের ১৩ই জ্যৈষ্ঠ ফলহারিণী কালী পূজার দিন ঠাকুর শ্রীশ্রীমাকে সাক্ষাৎ ৺ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করেন। 

যেভাবে সমাধিস্থ হইয়া মা সেই মহাপুজো গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা হইতেই তিনি যে কত বড় মহাশক্তির আবার কিছুটা অনুমান করা যাইতে পারে। ঘটনা এইরূপ —

ঠাকুর অন্তরের এক অপূর্ব প্রেরণায় চালিত হইয়া নিজের ঘরে জগন্মাতার বিশেষ পূজা করিতে মনস্থ করিলেন। ভাগিনের হৃদয় ও দীনু-পূজারীর সাহায্যে দেবীর রহস্যপূজার সর্বাঙ্গসুন্দর আয়োজন করিতে রাত্রি নয়টা বাজিয়া গেল। 

শ্রীশ্রীমাকে পূজাকালে উপস্থিত থাকিতে ঠাকুর পর্বেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও ঠাকুর পূজায় বসিলেন।

পূজার পূর্বকৃত্যসকল দর্শন করিতে করিতে মা অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইলেন এবং ঠাকুরের ইঙ্গিতে পূর্বমুখে উপবিষ্ট পূজকের দক্ষিণভাগে আলিম্পনভূষিত পীঠে উত্তরাস্যা হইয়া উপবেশন করিলেন।

“সম্মুখস্থ কলসের মন্ত্রপূত বারি দ্বারা ঠাকুর বারংবার শ্রীশ্রীমাকে যথাবিধানে অভিষিক্তা করিলেন । অনন্তর মন্ত্র শ্রবণ করাইয়া তিনি এখন প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করিলেন, 

❝হে বালে, হে সর্বশক্তির অধিশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরি, 

সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইহার (শ্রীশ্রীমার) শরীর-মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্ব কল্যাণ সাধন কর!❞

“অতঃপর শ্রীশ্রীমার অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধানে ন্যাসপূর্বক ঠাকুর সাক্ষাৎ ৺দেবীজ্ঞানে তাঁহাকে পূজা করিলেন এবং ভোগ নিবেদন করিয়া নিবেদিত বস্তুসকলের কিয়দংশ স্বহস্তে তাঁহার মুখে প্রদান করিলেন। 

বাহ্যজ্ঞান তিরোহিত হইয়া শ্রীশ্রীমা সমাধিস্থা হইলেন। ঠাকুরও অর্থ বাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে সম্পূর্ণ সমাধিমগ্ন হইলেন ৷

সমাধিস্থ পূজক সমাধিস্থা দেবীর সহিত আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে মিলিত ও একীভূত হইলেন।”

...এইভাবে বহুক্ষণ অতীত হইল। নিশার তৃতীয় প্রহরে অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া ঠাকুর দেবীকে আত্মনিবেদন করিলেন। বিল্বপত্রে নিজের নাম লিখিয়া, সেই বিশ্বপত্রসহযোগে পূর্ব-পূর্ব সাধনকালে ব্যবহৃত বস্ত্র, আভরণ ও রুদ্রাক্ষের মালাদি সমুদয় দ্রব্য, সেই সকল সাধনার ফল এবং নিজেকে দেবী-পাদপদ্মে সমর্পণ করিলেন ।

এ পূজো পূজার ইতি,

আর দেবদেবী-মূর্তি,

কভু না পূজিলা পরমেশ।

যেন পূজো শ্রীশ্রীমার, 

পরম চরম সার,

পরিণাম সকলের শেষ। 

পূজা সম্পূর্ণ হইলে শ্রীশ্রীমার সমাধি ভঙ্গ হইল তিনি মনে মনে ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া নহবত ঘরে চলিয়া গেলেন।

ঠাকুর পূর্বমুখ হইয়া পশ্চিম দিকের দরজার কাছে বসিয়াছিলেন। মন্ত্রোচ্চারণ-সহকারে পূজাদ্রব্য সকল শোধনের পর তিনি যথাবিধি পূর্বকৃত্য শেষ করিলেন এবং শ্রীমাকে নির্দিষ্ট পীঠে উপবেশনের জন্য ইঙ্গিত করিলেন। ... তিনি [শ্রীশ্রীমা] মন্ত্রমুগ্ধার ন্যায় পশ্চিমাস্য হইয়া ঠাকুরের সম্মুখস্থ পীঠে উপবেশন করিলেন। তখন মন্ত্রপূত কলসের জল লইয়া ঠাকুর বারংবার শ্রীমায়ের অভিষেক করিলেন। তারপর তাঁহাকে মন্ত্র শ্রবণ করাইয়া প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করিলেন, “হে বালে, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরি মাতঃ ত্রিপুরসুন্দরি, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর; ইঁহার (শ্রীমায়ের) শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইঁহাতে আবির্ভূত হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর।” পরে তিনি মাতাঠাকুরানীর অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধি বিন্যাস করিয়া সাক্ষাৎ দেবীজ্ঞানে তাঁহাকে ষোড়শোপচারে পূজা করিলেন। পূজান্তে ভোগ নিবেদিত হইল। অবশেষে পূজক নিবেদিত মিষ্টান্নাদির কিয়দংশ স্বহস্তে তুলিয়া লইয়া দেবীর শ্রীমুখে প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে বাহ্যজ্ঞানশূন্যা শ্রীমা সমাধিস্থ হইলেন; ঠাকুরও অর্ধ-বাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে সমাধিরাজ্যে চলিয়া গেলেন।... তিনি দেবীকে আত্মনিবেদন করিলেন। অনন্তর আপনার সহিত নিজ সাধনার এবং জপের মালা প্রভৃতি সর্বস্ব দেবীর শ্রীচরণে চিরকালের জন্য বিসর্জন দিয়া মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে তাঁহাকে প্রণাম করিলেন, “হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্ন - কারিনী, হে শরণদায়িনী, ত্রিনয়নী, শিবগেহিনী গৌরি, হে নারায়ণি, তোমাকে প্রণাম করি।”

   ভক্তদের কাছে এই পুজো ষোড়শী পুজো নামেও পরিচিত

Friday, 19 July 2024

পুতুন্ডা শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম

 

সম্ভবত: সময়টা ছিল ১৯০১ সালের শেষ বা ১৯০২ সালের জানুয়ারি মাস। ফরেস্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন শ্রীহরিপদ মিত্র।  তিনি তখন থাকতেন মহারাষ্ট্রের বেলগাও শহরে। কিন্ত তাঁর পৈতৃক বাড়ী ছিল শক্তিগড় ষ্টেশন থেকে ৩-৪ কিমি দূরে ভৈটা গ্রামে। এর পাশের গ্রামটিই হল পুতূন্ডা গ্রাম। মিত্র মহাশয় বেলগাওতে থাকাকালীন পরিব্রাজক  স্বামী বিবেকানন্দ বেশ কয়েকদিন তাঁর বাড়িতে কাটিয়েছিলেন।  এবং এই সময় থেকে হরিপদবাবুর সাথে স্বামীজির ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। হরিপদ মিত্র এবং তার স্ত্রী ইন্দুমতী মিত্র ছিলেন স্বামীজির প্রথম গৃহী ভক্ত। বেলগাওতেই স্বামীজি এই দম্পতিকে দীক্ষা দেন।  পরবর্তীকালে এই পরিব্রাজক যখন বিশ্ববরেণ্য হয়ে দেশে ফিরে আসেন তখনও হরিপদবাবু বেলুড়ে গিয়ে কয়েকবার তার সাথে দেখা করে আসেন এবং তার পৈতৃক ভিটা ভৈটা গ্রামে আসার আমন্ত্রণ জানান। এসব কথা মিত্র মহাশয়ের স্মৃতিকথা এবং স্বামীজির অন্য এক গৃহী ভক্ত শ্রী নরেন্দ্র ঘোষ মহাশয়ের স্মৃতিকথা থেকে যানা যায়। কিন্ত বেলগাও-এর পর  স্বামীজি অনেকবার সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও নানা ঘটনাক্রমে তাদের সাক্ষাৎকার হয়ে উঠেনি। তাই একবার মিত্র মহাশয়ের নিমন্ত্রণ রক্ষায় স্বামীজি এখানে এসেছিলেন ।  কিন্ত তখন ভৈটা গ্রামের নিকটবর্তী ষ্টেশন ছিল শক্তিগড়। যদিও এখনকার নিকটবর্তী ষ্টেশন হল পালশিট। তাই  তখন রেল ষ্টেশন থেকে প্রথমে পুতুন্ডা গ্ৰাম হয়ে ভৈটা গ্ৰামে এসেছিলেন।  পুতুন্ডায় সেই সময় সম্ভ্রান্ত চৌধুরীদের বাস ছিল। চৌধুরীর ঠাকুরদালানের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন স্বামীজি। ঐ পরিবারের ছোটরা  তখন উঠানে খেলাধূলা করছিলেন।  বৈঠকখানার সিড়ির কাছে এসে তাদের কাছে ভৈটা গ্রামে যাওয়ার রাস্তার খোজ করেন।ছোটোরা অচেনা মানুষ দেখে বাড়ি থেকে বড়দের ডেকে আনেন । তৎকালীন চৌধুরী পরিবারের কর্তা স্বামীজির পরিচয় জানতে পেরে চৌধুরী বাড়িতেই বিশ্রামের ব্যবস্থা করেন এবং পরে পাল্কিতে ভৈটা পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। এই চৌধুরী বাড়িটিই বর্তমানে পুতুন্ডা রামকৃষ্ণ মিশনে পরিনত হয়েছে। ভৈটা থাকাকালীন স্বামীজি মাঝে মাঝে প্রাতভ্রমনে বেড়িয়ে এই চৌধুরী বাড়ীতে চলে আসতেন এবং কিছুটা সময় থেকে ফিরে যেতেন । ভৈটাই স্বামীজির স্মৃতি বিজরিত হরিপদবাবুর বাড়িটির নাম মিত্র মহাশয় গুরুর স্মৃতিতে রেখেছিলেন  " বিবেক কুটির  " । এই  গ্রামেই রয়েছে শ্যামাদাস আচার্য প্রতিষ্ঠিত  মদনমোহন জীউ এর এতদ অঞ্চলের প্রসিদ্ধ মন্দির। শোনাযায় এই সময় স্বামীজি মদনগোপাল মন্দির পরিদর্শনে গিয়েছিলেন  এবং মন্দিরে বসেই একদিন বিভোর হয়ে গানও গেয়েছিলেন। এই গ্রামের প্রান্তে একটি অশ্বথ্থ  গাছে নাকি তিনি রোপন করেছিলেন বলে শোনা যায়। এছাড়াও গ্রামের এক পুকুরের সাথে এই মহামানবের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ভৈটাতে কয়েকদিন অবস্থানের পর স্বামীজি একই পথে শক্তিগড় ষ্টেশন থেকে রেলে করে বেলুড় মঠের ফিরে যান।




পুতুন্ডা শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে। এটি সকলের জন্য উন্মুক্ত একটি তীর্থস্থান।  শ্রীরামকৃষ্ণের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া মুখ্য উদ্দেশ্য হলেও, গ্ৰামের ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের অভাবী দ্রারিদ্র লোকেদের কল্যাণ সাধন করা ইনাদের উদ্দেশ্য।  কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে............. 




সারদা কোচিং সেন্টার  --  এই কোচিং সেন্টারটি পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে কোচিং প্রদান করে। রয়েছে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য কোচিংও। 

সারদা বিদ্যামন্দির ---  স্থানীয় বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি কিন্ডারগার্ডেন স্কুল।  রয়েছে সারদা আর্ট  স্কুল।  আর আছে বিবেকানন্দ কম্পিউটার সেন্টার ও ক্যারাটে সেন্টার। 



চিকিৎসা ক্ষেত্রে রয়েছে ...... বিবেকানন্দ চ্যারিটেবল ক্লিনিক।  এখানে রোগ নির্ণয় ও ওষুধ বিতরন, বিনামূল্যে করা হয়। গ্রামের মহিলাদের জন্য স্ত্রীরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র ও  ইসিজি করা হয় সম্পূর্ন বিনামূল্য। 

বছরে দুবার  চক্ষু শিবির হয় যেখানে চক্ষু চিকিৎসা ও মাইক্রো আপারেশন করা হয়  এবং পরে রোগীদের দরকার অনুযায়ী গগল্স্  ও চশমা দেওয়ার হয় বিনামূল্যে।  আবার এসব সেবা ক্লিনিকে রয়েছে  সব ধরনের প্যাথলজিকাল টেস্টের ব্যবস্থা, এক্স রে ও ইসিজি- র ব্যবস্থা। 

গদাধর অভ্যুদয় প্রকল্প........  স্বামী বিবেকানন্দের ১৫০ তম জন্মবার্ষিকিতে বেলুড়মঠের আর্থিক সহায়তায় এই প্রকল্পের সূচনা হয়।  স্বামীজির আদর্শে শিব ঞ্জানে জীব সেবার যে আদর্শ পাথেয় করে পুতুন্ডা শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমের উদ্যোগে এবং বেলুড় মঠের সহযোগিতায় বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে স্থানীয় তিনটি গ্রামের পিছিয়ে  পড়া ও দরিদ্র পরিবারের শিশুদের সামগ্রিক উন্নয়নের চেষ্টা চলছে এই  প্রকল্পের মাধ্যমে। বর্তমানে ৮২ জন ছোট  বাচ্চাকে মানুষ করা চলছে। শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানসিক উন্নতির চেষ্টার পাশাপাশি তাদের পুষ্টিকর খাদ্যও দেওয়া হয়। এছাড়া যোগ ব্যায়াম , ব্রতচারী,  লাঠি নাচ  অঙ্কন, নৃত্য,  গান বাজনা, নাটক ইত্যাদি শেখানো হয়। বর্তমানে বেলুড় মঠ এই প্রকল্পের আর্থিক ব্যায়ভার বহন করতে আর সমর্থ নয়। তাই এখন এই প্রকল্পের অর্থের যোগান জনসাধারণের দানের উপর সম্পূর্ন   নির্ভরশীল হয়ে পরেছে।



আশ্রমের  সারদা মিল্ক ফিল্ডিং সেন্টার ডায়েরি থেকে দরিদ্র শিশু ও মায়েদের বিনামূল্য দুধ দেওয়া হয়ে থাকে।  

ছাড়া আশ্রমে নিত্য পূজা, স্বামীজির জন্মদিন পালন,    বাৎসরিক উৎসব, সরস্বতী পুজো, কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পূজো ও বস্ত্র বিতরণ হয়ে থাকে। 




এখন সেই বিবেক কুটির  জীর্ণ  দশায় পরিণত হয়েছে।  শুধু স্বামীজি যে আরামকেদারা ব্যবহার করতেন সেটি সংরক্ষিত হয়েছে পুতুন্ডা রামকৃষ্ণ মিশনে কিন্ত তাঁর ব্যবহৃত খাটটি  অবহেলায় রয়ে রয়েছে ঐ ভগ্নপ্রায়  বাড়িতেই। এলাকার বাসিন্দাদের ইচ্ছা এই বাড়ি সংস্কার করুক রাজ্য সরকার এবং এই ঘরেই সংরক্ষণ করা হউক স্বামীজির ব্যবহৃত খাট। আর যদি তা সম্ভব না হয় তবে যে কোনও রামকৃষ্ণ মিশন সংরক্ষণ করুক এই খাট....... বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন এলাকার বাসিন্দারা। কেননা মিত্ররা ছিলেন  নিঃসন্তান। তাই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন তাদের এক জ্ঞাতি পুত্র নির্মল চন্দ্র সরকার।  তার পুত্র দেব রঞ্জন সরকার বর্তমানে জীবিত। কিন্ত তারা ভৈটা গ্রামে বসবাস করেন না। তাই এখন বিবেক কুটিরের দেখভাল করেন স্থানীয় ঘোষ বংশীয়রা। সঠিক পরিচর্যার অভাবে আজ বিবেক কুটিরের বেহাল দশা। বাড়িটির পরিচর্যার ব্যাপারে ঘোষ পরিবারের লোকজন খুবই উদাসীন এবং তীর্থে পরিনত হওয়া এই  বাড়িকে জনসাধারণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিপ্রায়ও তাদের মধ্যে  দেখা যায়। কেননা বাড়ির ব্যাপারে জানতে চাওয়া মানুষের প্রতি  তাদের ব্যবহার  সেই কথাই প্রমান হয়। হরিপদ মিত্র ফরেস্ট অফিসার ছিলেন।  তাই তিনি অনেক বিচিত্র আবার অনেক সাধারণের  অপরিচিত গাছ দিয়ে নিজের বাড়ির বাগান সাজিয়েছিলেন।  কিন্ত আজ সেসব কিছু জঙ্গলে পরিনত হয়েছে। আজ বিবেক কুটির সত্যিই অবহেলিত তবুও তা বিবেকতীর্থে পরিনত হয়েছে।

Monday, 6 May 2024

দীক্ষা ও জপ

 

দীক্ষা নেওয়া ও জপ করা প্রসঙ্গে 




শ্রীরামকৃষ্ণদেব বলতেন  :  ঝিনুক হাঁ করে বসে থাকে । কখন স্বস্তি নক্ষত্রের জল মুখে এসে পরবে। যেই পরল অমনি সে অতল জলে ডুবে যায়। কেন ? কেন???? না, মুক্তা হবে যে ঐ এক বিন্দু জলে। গুরু মন্ত্র তেমনিই।  গুরুর কাছে দীক্ষা নিয়ে খুব নির্জনে চলে যেতে হয় কিছুদিন।  দীক্ষার পর ক্রাইষ্ট চল্লিশদিন নির্জনবাস করেছিলেন বনে। জন  দি  বেপটিষ্ট দীক্ষা দিয়েছিলেন।  কী খাবেন, কোথায় শোনেন এসব কিছুই চিন্তা ছিল না। কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন এই চল্লিশ দিন কেউ তা জানতেও পারলো না। 

ঠাকুর বলতেন.... লোক সব কেমন জানো?? একজন একটা কুয়া খুঁড়ছে। খানিকটা নীচে পাথর বের হয়ে গেল। অমনি ওটা ছেড়ে দিল। আর একস্থানে খুঁরছে। ওখানে বেরোনোর বালি। ওটাও ছেড়ে দিল। আর এক স্থানে পেল একটা গাছের গুড়ি। ওটাও ছেড়ে দিল। সে ব্যাক্তির আর কূয়া খুঁড়ে হল না। জলতৃষ্নাও গেল না। তেমনিই হয়ে পড়েছে দীক্ষা নেওয়া। যেন এক ফ্যাসান। রোখ চাই রোখ, চাই বিশ্বাস। 

স্বামী ব্রহ্মানন্দ,  শ্রী শ্রী ঠাকুরের মানস পুত্র রাখাল মহারাজ,  দীক্ষিতের জপ ও ধ্যানের সাধনপদ্ধতি সম্বন্ধে বলেছেন  .......... আসনে বসেই অমনি জপ ধ্যান আরম্ভ করতে নেই।  প্রথমে বিচার করে মনকে বাইরে থেকে গুটিয়ে এনে, তারপর ধ্যান জপ আরম্ভ করতে হয়। কিছুদিন এইরকম অভ্যাস করতে করতে মন ক্রমশ স্থির হয়ে আসে। বেশ সোজা হয়ে পা মুড়ে বসে , দুটি হাত বুকের কাছে কিংবা উপর-পেটের উপর রেখে ধ্যান করতে হয়। জপের সঙ্গে সঙ্গে মূর্তি চিন্তা করতে হয়, নইলে জপ ভাল হয় না। পূর্ণ মূর্তির ধ্যান না হলেও যেটুকু সামনে আসে তা-ই নিয়ে ধ্যান আরম্ভ  করতে হয়।  প্রথমে প্রথম থেকে আরম্ভ করতে হয়। না পারলেও struggle করতে হয়। না এলে ছাড়বি কেন? করতেই হবে। ধ্যান কি আর সহজেই হয় ?

ধ্যান  জপ অভ্যাস করা প্রথম প্রথম বিশেষ দরকার। যদি ভালো নাও লাগে তবুও অভ্যাস করতে হবে। শুধুমাত্র অভ্যাসে অনেক কাজ হয়।  রোজ অন্তত দু ঘন্টা জপ করা দরকার।  কোনও নির্জন বাগানে, নদীতীরে, বড় মাঠের ধারে অথবা নিজের ঘরে একলা বসে থাকলেও অনেক সময় কাজ হয়। প্রথম প্রথম একটা routine করে কাজ আরম্ভ করতে হয়। এমন কোনও কাজের ভার নেওয়া উচিত নয়, যাতে routine টা ভেঙ্গে যায়। 

তিনি খ্যাদাভাস সম্পর্কে উপদেশ দিয়েছেন......... সাধারণত প্রথম অবস্থায় খাওয়া দাওয়া সম্বন্ধেও বিশেষ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।  শরীরের সঙ্গে মনের খুবই নিকট সম্পর্ক।  খাওয়ার দোষে শরীর  অসুস্থ হলে  ধ্যান জপ করা অসম্ভব।  সেই জন্যই খাওয়া-দাওয়া সম্বন্ধে অত বিধি ব্যবস্থা রয়েছে। এমন খাবার খেতে হবে যা সহজে হজম হয় অথচ পুষ্টিকর, উত্তেজিত নয়। আবার বেশি খাবারও ভালো নয়, তাতে তমোগুন বৃদ্ধি পায়। খাদ্যদ্রব্য আধপেটা খাবে , জল এক-চতুর্থাংশ খাবে, বাকী এক-চতুর্থাংশ বায়ু চলাচলের জন্য খালি রাখবে।

জপ সম্বন্ধে শ্রীসারদা মা এক শিষ্যকে লিখেছিলেন...... জপ কমের মধ্যে ১০৮ বার, আর অতিরিক্ত যত পার ততই ভাল।  যদি আমার ধ্যান করতে তোমার বেশী ইচ্ছা হয়, তবে তাই করবে। কারন আমি আর ঠাকুরে কোন পার্থক্য নেই।  শুধু রূপের পার্থক্য।  যিনি ঠাকুর,  তিনিই এই দেহে আছেন।


আধ্যাত্মিক সাধনের একটি অন্যতম সহজ এবং দ্রুত ফলপ্রদ পন্থা হল জপ। দীক্ষিত ব্যাক্তি গুরুপ্রদত্ত ইষ্ট  মন্ত্র জপ করেন। যিনি ইষ্টমন্ত্র লাভ করেননি তিনিও ঈশ্বরের  কোনোও প্রিয় নাম পুনঃ পুনঃ উচ্চারণ করতে পারেন। মন্ত্র বা ঈশ্বরীয়  নাম পুন: পুন: উচ্চারণই  জপ।  ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছেন....... যার দাঁতে ব্যথা হয় , সে সব কাজ করে ঠিকই,  কিন্ত মনের একটা বড় অংশ ওই ব্যাপারের দিকে পড়ে থাকে। ঠিক তেমনিই সমস্ত কাজের মধ্যেও জপ করা যায়। এতে সর্বাবস্থায় মনের একটা অংশ ঈশ্বরে নিযুক্ত থাকে যা আমাদেরকে ক্রমশ:শুদ্ধ করে আধ্যাত্মিক অনুভবে নিমজ্জিত করে। 

জপ তিন প্রকার **** অর্থাত  জপের তিনটি বিভাগ রয়েছে: মানসিক (মনে), উপাংশু (খুব মৃদুভাবে জপ করা), এবং ভ্যাচিক (শ্রবণযোগ্য)।

শাস্ত্রে যে অবস্থাগুলির বর্ণনা আছে , নিজ জীবনে সেই অবস্থাগুলির বাস্তব আস্বাদন হল আধ্যাত্মিকতা। আর এর জন্য দরকার সঠিক অনুশীলন  এবং প্রয়োজনীয় আধ্যাত্মিক শক্তি , যে আধ্যাত্মিক শক্তি আসে গুরু-শিষ্য পরম্পরা মাধ্যমে ইষ্টের নিকট হতে মন্ত্রবীজের আকারে। ট্যাঙ্ক জল যেমন নলের মাধ্যমে আসে, ঠিক তেমনই এই আধ্যাত্মিক শক্তি আসে ইষ্টের কাছ থেকে গুরুর মাধ্যমে।তাই যে শক্তিতে আমরা দীক্ষিত হয় তা ঈশ্বরের শক্তি। যেমন মাটির প্রতিমায় ঈশ্বরের আবির্ভাব ঘটে, তেমনি প্রকৃত দীক্ষার সময় মানুষ-গুরুর মাধ্যে  ঈশ্বরীয় শক্তির স্ফূরণ ঘটে। তাই  গুরু আর ইষ্টকে অভিন্ন ভাবতে বলা হয়।

         ^^** জপের   পদ্ধতি  **^^

বিভিন্ন ভাবে জপ করা যেতে পারে, তার মধ্যে একটি হ'ল মালার সাহায্যে জপ। মালাও বিভিন্ন প্রকারের হয়। যাঁরা শক্তিমন্ত্র জপ করেন তাঁরা সাধারণত রুদ্রাক্ষ মালা ব্যবহার করেন।

রুদ্রাক্ষ মালায় জপেরও বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। তার মধ্যে একটি হ'ল ডান হাতের মধ্যমার উপর মালাটি রেখে বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে জপ।

এক্ষেত্রে ১০৮ বার জপের উপযোগী রুদ্রাক্ষের মালা ডান হাতের মধ্যমার ১০ ও ১১ নম্বর করের (আঙুলের খাঁজ, যেখানে সংখ্যা গননা করা হয়) মাঝখানে রেখে বুড়ো আঙুলের অগ্রভাগের সাহায্যে এক একটি দানা জাপক নিজের দিকে টেনে আনবেন এবং এক...বার করে নাম স্মরণ করবেন।

মালার একটি অংশে সুতোর গুচ্ছ থাকে এবং ঠিক সেখানে অন্য দানাগুলির থেকে একটু অন্য অবস্থানে একটি অতিরিক্ত দানা থাকে, এটিকে 'সাক্ষী' বলা হয়। অনেকে একে গুরুর প্রতীক বলে গণ্য করেন।


জপের সময় সাক্ষী-দানায় গণনা করা যাবে না এবং সাক্ষীকে অতিক্রমও করা যাবে না। সাক্ষীতে পৌঁছে মালাটি ঘুরিয়ে নিয়ে আবার আগের মতো জপ করতে হবে। অর্থাৎ সাক্ষীর পরের দানা থেকে জপ শুরু হয়ে সাক্ষীর আগের দানায় পৌঁছালে ১০৮টি দানায় ১০৮ বার জপ হবে। এরপর মালা ঘুরিয়ে পুনরায় একই ভাবে ১০৮ বার জপ করতে হবে এবং এভাবে চলতে থাকবে।

*মালা কখনও নাভিদেশের নীচে যেন না পৌঁছায়* এবং জপের সময় মালা যেন অন্যরা না দেখে - মূলতঃ এই দুটি উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট থলির মধ্যে মালা রেখে জপ করতে হয়। 

মালা *তর্জনীদ্বারা স্পর্শ করতে নেই।* তাই জপের সময় তর্জনীকে একটু দূরে রাখতে হয়। 


জপের সময় জাপক নিজের হৃদয়কেন্দ্রে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের রূপ চিন্তা করবেন। প্রথমে ইষ্টের পদযুগল থেকে শুরু করে ক্রমে সমগ্র রূপটি চিন্তা করতে হয়। হৃদয়কেন্দ্রে পদ্মের আসনে তিনি বসে আছেন। জাপকের শরীর যেদিকে মুখ করে আছে সেই একই দিকে ইষ্টও তাকিয়ে রয়েছেন -- এ'  ভাবতে হয়। 

সহাস্য ও জ্যোতির্ময় সেই রূপ যেন রক্ত-মাংসের নয়, চৈতন্য জমাট বেঁধে তৈরি হয়েছে। এ'ভাবে ইষ্টের রূপচিন্তন ও নাম-স্মরণ একই সাথে চলবে। 

জপ যত গভীর হবে তত নতুন নতুন অনুভূতি হবে এবং জপের প্রতি আসক্তি বাড়তে থাকবে। 

জপ শেষ হ'লে মনে মনে ইষ্টের হাতে ওই জপের ফল সমর্পণ করতে হয়  মন্ত্র উচ্চারণ করে।

দীক্ষিত সাধকরা এসব জানেন। তাঁরা নিজের গুরুর নির্দেশিত পথেই চলবেন। কিন্তু যাঁরা দীক্ষিত নন তাঁরা  ঈশ্বরের কোনোও প্রিয় নাম  পুন: পুন:  জপ করতে পারেন। অথবা ব্রহ্মচারী জ্ঞানমহারাজ যেমন বলেছিলেন,

'ॐ নমো ভগবতে রামকৃষ্ণায়'  

এই মন্ত্রও জপ করতে পারেন।  তাতেও সাধনার ফল লাভ হবে।

<×><×><×><×><×><×><×

***জপের উপকারিতা***


মা সারদা জপের উপরে খুব জোর দিয়েছেন। জপ করলে কিভাবে উপকার হয়? 

  #প্রথমত , ধরুন কোনো কারণে আপনার মনে দুশ্চিন্তা চলছে। এই অবস্থায় মনে এক বিশেষ ঢেউ (wave) উঠছে যার জন্য আপনার অস্বস্তি হচ্ছে। এখন জপ করার অর্থ আপনি অন্য এক ঢেউ তুলছেন। জোর করে জপ করে গেলে এই নতুন ঢেউটি জোরালো হয়ে উঠে আগের ঢেউকে চেপে দেবে। কারণ দুটি তরঙ্গ একসাথে থাকতে পারেনা। এভাবে দুশ্চিন্তা-ঢেউ দূর হবে।••এভাবে মন থেকে অন্যান্য নেগেটিভ চিন্তা ও ভাব আপনি ইচ্ছামতো দূর করে মনকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে পরেন।

 #দ্বিতীয়ত , মনে সবসময় কোনো-না-কোনো চিন্তা চলছেই আপনার অজান্তে। আর এই চিন্তা বা ভাবই আপনাকে প্রভাবিত করছে বা চালাচ্ছে। একে তো আপনার অবচেতন মন থেকে পুরনো স্মৃতি/সংস্কার উঠে আসছে, তার উপর বাইরের পরিস্থিতির প্রভাবও কাজ করছে মনের উপরে। ফলে আপনার চেতন মন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পরেনা সবসময়। 

     কিন্তু সচেতনভাবে জপ করে আপনি নিজেই এক বিশেষ ঢেউ ওঠাচ্ছেন মনে। এটা বাধা দিচ্ছে অবচেতনের চিন্তা ও বাইরের প্রভাবকে। অর্থাত আপনি সচেতনভাবে ঐ দুই ঢেউকে চেপে দিয়ে নিজের ঢেউকে কাজ করাচ্ছেন। এভাবে মনকে আপনিই চালাচ্ছেন। আপনি মালিক, মন ভৃত্য।

 #তৃতীয়ত , জপের মাধ্যমে আপনি অবচেতন মনে শুভ তরঙ্গ পাঠিয়ে দিব্য সংস্কার তৈরি করছেন। কিভাবে? 

পতঞ্জলি মুনি বলেছেন, জপের সময় মন্ত্রের অর্থ ভাবতে। যেমন মায়ের অর্থ করুণা, শিবের অর্থ শান্ত ভাব, কৃষ্ণ পালন কর্তা, ইত্যাদি। জপ করার সময় ঐ বিশেষ ভাব ওঠানোয় ঐ তরঙ্গ বা ঢেউ চলে যাচ্ছে মনের অবচেতন স্তরে। বারবার এভাবে করলে ঐ ভাবটি শক্তিশালী হতে থাকে। এবং আপনার মন দিব্য সংস্কারে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে।

 #চতুর্থত , মন্ত্রের দুটি ভাগ -- বীজ ও নাম। বারবার জপ করলে ঐ বীজ কোনো বিশেষ চক্রে (মূলাধার ইত্যদি) গিয়ে ক্রমাগত ধাক্কা দিতে থাকে। ফলে চ্ক্র-সংযুক্ত নাড়ীগুলিতে কম্পন (vivration) ওঠে। এভাবে ঐ নাড়ীগুলি বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ঐগুলির মাধ্যমে মনের গতি বা কর্মশক্তি বেড়ে যায়। আপনার মনের শক্তি বাড়ে।

     মন যেহেতু কাজ করে নাড়ীগুলির মাধ্যমে সেহেতু ঐগুলি যতো পরিস্কার বা smooth হয়, মন ততবেশি flow করতে পারে ঐ নাড়ীগুলি দিয়ে। মন এভাবে বেশি active হয় বীজ মন্ত্রের উচ্চারণে।


 #পঞ্চমত , প্রার্থনার ভাব নিয়ে জপ করলে আপনি এগিয়ে যান বিশ্বচেতনার দিকে। জপের মাধ্যমে যে দিব্য ঢেউ তুলছেন সেটা অবচেতন স্তর অতিক্রম করে অতিচেতনের দিকে যায়। একান্ত মনে তীব্র জপ করলে এটা ধ্যানে পরিণত হয়। আর তখন এটি বিশ্বচেতনার দিকে যাওয়ার শক্তি পায়।

     রূপকের মাধ্যমে বলতে হয়, বিশ্বচেতনা যেন TV আর ধ্যান-তরঙ্গের মাধ্যমে আপনি যেন remote টিপছেন বিশেষ চ্যানেলের জন্য। TV-তে যেমন সব চ্যানেল আছে, বিশ্বচেতনায় তেমনি সব সম্ভবনা রয়েছে। জপের মাধ্যমে আপনি যে বিশেষ ভাবটি তুলছিলেন, সেই ভাবটি গিয়ে বিশ্বচেতনা থেকে সমধর্মী ভাবের সাথে যুক্ত হয়। এবং যেহেতু ধ্যান অবস্থায় "জাগতিক আমি" মুছে যায় সেহেতু আপনার অহংকার কোনো বাধার সৃষ্টি করেনা। অর্থাত, মাতৃমন্ত্রের জপে যে করুণার ভাব ওঠাচ্ছিলেন সেটা বিশ্বচেতনার অসীম করুণা সম্ভবনার কাছাকাছি আসে। এভাবে গভীর দিব্যচেতনাকে অনুভব করেন আপনি।

এই পাঁচটির অনুভব যে একই সময়ে হবে আপনার তা নয়। কোনটি হবে তা নির্ভর করে আপনার ইচ্ছা ও সামর্থের উপর।

রামকৃষ্ণ ও সারদার এর অর্থ

 

রামকৃষ্ণ শব্দের অর্থ কি ??


যে নামকে অবলম্বন করে  জীবনযাপন করতে হবে, সে নামের অর্থ ও ব্যাখ্যা জানা বিশেষ প্রয়োজন। কারণ এতে ঘনিষ্ঠতা বেশি হয়। কর্ম , উপাসনা, ,জপ ও ধ্যানের দ্বারা আমরা যার সাথে মিলিত হতে চাই, তিনি কে, কিবা তাঁর স্বরূপ --- এ ব্যাপারে  সম্পূর্ণ পরিষ্কার ধারনা থাকলে জীবনে রসানুভূতি হয়।

শব্দের বা নামের সাথে অর্থের এক সম্বন্ধ রয়েছে। যে কোনো শব্দের অর্থ সাধারণত দুই প্রকার----- শব্দার্থ ও মর্মার্থ।  " রামকৃষ্ণ " শব্দের শব্দার্থ ...... রাম কৃষ্ণরূপ দেহধারী মানুষবিশেষ। ইনি_____ক্ষুদিরাম ও চন্দ্রমণির পুত্র। ইনি এক কালে  মা ভবতারিণীর পূজারী ছিলেন। এই " রামকৃষ্ণ   " শব্দের মর্মার্থ হল ...... ইনি সচ্চিদানন্দ, স্বতন্ত্র ঈশ্বর, বাতার্বরিষ্ঠও বলা যেতে পারে। নাম জপের সময় অর্থের বোধ হলে বৈধতা বিশেষভাবে উপলব্ধি করা হয় এবং ভিতরে আনন্দ হয়। 

কাশীর এক বিখ্যাত পন্ডিত -সন্ন্যাসী, স্বামী ভগতান্দ গিরি, রামকৃষ্ণ শতাব্দী উপলক্ষে " রামকৃষ্ণ " নামের   গূঢ়ার্থ উল্লেখ করেন ______এই রামকৃষ্ণ নাম সাধারণ দৃষ্টিতে দেখিতে  শুনিতে ছোট বলিয়া মনে হয়, কিন্ত বিচার দৃষ্টি দ্বারা দেখিলে ইহাতে বড়ই রহস্য ভরা রহিয়াছে দেখা যায়। যোগিজন যাঁহাতে রমণ করেন তিনিই রাম এবং যিনি ভক্তগনের দুঃখ বা পাপ আকর্ষণ করিয়া  নষ্ট করিয়া দেন , অথবা  স্বীয় ভক্তগণের মন নিজের দিকে আকৃষ্ট করিয়া  স্বীয় ভক্তিতে তল্লীন করিয়া দেন, তিনিই  শ্রীকৃষ্ণ। শ্রীরাম ও শ্রীকৃষ্ণ ভূ-ভার দূর করার জন্য সেই যুগে অবতীর্ণ হতে পেরেছিলেন। তাঁহাদের একত্র সমাবেশ এই রামকৃষ্ণ নাম হয়েছে। 

রাম নামে  বহু রহস্য আছে। যখন রাজা দশরথের গৃহে রাম অবতার রূপ ধারন করিলেন, তখন রাজা কুলগুরু মহর্ষ বশিষ্ঠকে ডাকাইয়া আনিয়া কহিলেন.... "হে গুরো, এই বালকের নামকরন করুন।" বশিষ্টজী " রাম " এইরূপ ছোট একটি নাম রাখিয়া দিলেন । তখন দশমরথ ও মন্ত্রিগন বলিলেন যে এ তো অতি ক্ষুদ্র নাম। কোনও "দুগুন" নামকরণ চাই, যে নাম রাজচক্রবর্তী পুত্রের যোগ্যতানুযায়ী হতে পারে। ইহাতে বলিলেন , " হে রাজন  "আপনি রাম নামের মহিমা জানেন না।  ' রাম ' শব্দে যে "রা" অক্ষর আছে তাহা হইল  "নমো  নারায়ণয় " -----ুইহা একটি সুপ্রসিদ্ধ  বৈষ্ঞবমন্ত্রের প্রাণ।  ইহা হইতে 'রা' অক্ষর পৃথক করিলে  " নমো নয়নায় " এইরূপ হইয়া যায়। তখন ইহার অর্থ হয় _______ " রূপরসাদি বিষয়কে নমস্কার "। এই রকম অনর্থ "রা" অক্ষর পৃথক করিলে হয়।




আবার কৃষ্ণ পদের আধ্যাত্মিক অর্থ ^^^^^ 
----কৃষ্ঞ ধাতুর অর্থ ত্রিকালারাধ্য-স্বরুপ ব্রহ্ম।  সৎ এবং আনন্দের যে অভেদ সদানন্দস্বরূপ ব্রহ্ম,  তাহাই হুইল কৃষ্ণ শব্দের অর্থ। যে সদ্-রূপ ব্রহ্মকে বাদ দিলে কোনোও বস্তুকে 'অস্তি' (আছে) এরূপ বলাই চলে না, যে আনন্দের বাদ দিলে আমরা কোনও বস্তুকে চাইতেই পারি না, -----সেই সৎ ও আনন্দ (সুখ) ই হইতেছে "কৃষ্ণ " শব্দের অর্থ। ঐ "কৃষ্ণ " যে " রামকৃষ্ণ " নামে প্রতিষ্ঠিত রহিয়াছে তাহার মহত্ব বর্ণনাতীত।


এই ধরনের "রাম" শব্দের ম-কার " নম: শিবায়' এর মন্ত্রের জীবন। " নম: শিবায়" মন্ত্রের অর্থ হল _____ কল্যাণস্বরুপ শিবের জন্য প্রনাম। কিন্ত ম- কার বাদ দিলে হয়  " ন শিবায়" ----- এর অর্থ হল কল্যাণের জন্য নহে অর্থাত দু:খের জন্য >>>>>> এই প্রকারে বশিষ্টজী " রাম " নামের রহস্য বুঝাইয়া দিলেন, তখন  দশরথ  অত্যন্ত   প্রসন্ন হইলেন। ঐ "রাম" নাম শ্রীরামকৃষ্ণের নামের মধ্যে রহিয়াছে।

শরীর  ত্যাগের দু দিন আগে শ্রীরামকৃষ্ণ স্বামীজিকে বলেছিলেন  " সত্যি সত্যিই ______ যে রাম,  যে কৃষ্ণ,  সে-ই ইদানীং রামকৃষ্ণ।   তবে তোর বেদান্তের দিক দিয়ে নয়। স্বামী তুরিয়ানন্দ ঠাকুরের এই বিখ্যাত উক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন   ' এর অর্থ এই যে , বেদান্তের অদ্বৈতমতে বলিয়া থাকে যে .....  জীব- ব্রহ্ম এক।ইহার অর্থ কেহ কেহ করে থাকেন যে, সকলেই রাম--- কৃষ্ণ  ইত্যাদি । তাঁহাদের বিশেষত্ব নাই। 

অদৈত্বমতে জীব সাধন, ভজন, সমাধি প্রভৃতির দ্বারা অঞ্জান দূর করিয়া ব্রহ্মভাব লাভ করিয়া ব্রহ্মের সহিত অভিন্ন হইতে পারে ; কিন্ত সহস্র চেষ্টা করিয়াও জীব ঈশ্বর হইতে পারে না।  ঈশ্বর যিনি তিনি চিরদিন ঈশ্বর। তিনি মনুষ্যত্ব ধারন করিয়া জীবের ন্যায় প্রতীয়মান হইলেও ঈশ্বর থাকেন,  কখনো জীব হন না।


সারদা নামের রহস্য l


 সা--সামীপ্যে l 

স অর্থাৎ সাধনা, সহিষ্ণুতা, সেবা, সমদৃষ্টি, সদাচার, সরলতা।এইসব দৈবী গুনাবলীর প্রতীক যিনি এবং যাঁর ধ্যানে সালোক্য, সামীপ্য, সারুপ্য ও সাযুজ্য  মুক্তি হয় l 

র--রক্ষণে l 

কমক্রোধাদি ষড়রিপু, বিপদ-আপদ, আধি-ব্যাধি, রোগ-শোক-জরা-মৃত্যু থেকে যিনি রক্ষা করেন l 

দা-দানে l 

জ্ঞান-ভক্তি- বিবেক- বৈরাগ্য, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ, সুখ-সম্পদ, আনন্দ যিনি দান করেন l 
_______যিনি জীবের ভরণ, পোষণ ও রক্ষা করেন l 
তিনিই সারদা।



শ্রীরামকৃষ্ণের  দেহ  গঠনের   বৈশিষ্ট্য   <<××>>

★শ্রীরামকৃষ্ণের  প্রতিকৃতিটি ভালো করে লক্ষ্য করলেই যেকোনো ভক্তের চোখে কতকগুলি বৈশিষ্ট্য নজরে পড়বে ।

➪ডানদিকের ভ্রু এবং চোখ বামদিকের ভ্রু  চোখের থেকে লম্বা।

➪ ডানদিকের এবং বামদিকের কান ― দুটি দুইরকমের আকৃতি।

➪দুটি কানই চোখের সমতলের চেয়ে নীচে এবং দুটি ভিন্নতলে অবস্থিত।

➪ডানদিকের কাঁধ বামদিকের কাঁধের চেয়ে অনেক বেশি চওড়া।

➪ডানহাতের ওপরের দিকের বেড় বামহাতের বেড়ের চেয়ে বড়।কনুই থেকে হাতের পাতা পর্যন্ত ডানদিকের অংশ বামদিকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বড় বলে মনে হয়।ডানহাতের গঠন পুরুষালি, কিন্তু বামহাতের গঠন স্ত্রী অঙ্গসুলভ।

➪ডানদিকের স্তন পুরুষদের মত কিন্তু বামদিকের স্তন স্পষ্টতই নারীসুলভ।

➪ডানহাঁটু বামহাঁটুর চেয়ে বেশি চওড়া, এবং হাঁটু থেকে ডানপায়ের পাতা পর্যন্ত গঠন পুরুষালি। কিন্তু বামপায়ের গঠন স্ত্রী অঙ্গসুলভ।

★উপরিক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি থেকে লক্ষ্য করা যায় ঠাকুরের এই মূর্তিটি স্পষ্টতই অর্ধনারীশ্বর মূর্তি।

★ঠাকুর নিজে তাঁর এই প্রতিকৃতি দেখে বলেছিলেন― এ মোহযোগীর মূর্তি।
🙏💐🌻🌼🌺🌸💐🌼🌻🏵️🌺🌸💐🙏



Friday, 23 February 2024

স্বামীজির পৈতৃক ভিটে

 



স্বামীজির আদি পৈতৃক ভিটে ***  দত্ত দ্বারিয়াটোন গ্রাম,অম্বিকা কালনা





গ্রামের নাম দত্ত দ্বারিয়াটোন।  পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার এক প্রান্তিয় গ্রাম।অনেকের কাছে এই গ্রামের নাম অজানা। তবে এর পরিচয় জানতে পারলে অবশ্যই আপনার মন আনন্দে ভরে উঠবে। এই গ্রামেই বাস করতেন স্বামী বিবেকানন্দের পূর্ব পুরুষেরা।




নথি ঘাটলে জানা যায় যে দত্ত পরিবারের বংশধর হিসাবে সেখানে শেষ বসবাস করেছিলেন সুধাংশ শেখর ঘোষ। তিনি সম্পর্কে ছিলেন স্বামীজীর ভাগ্নে। তিনি চলে যাওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে জরাজীর্ণ হয়ে পরে তাঁদের ঐতিহাসিক বাড়ি। অবশ্য স্বামীজী নিজে কখনও আসেননি এই পৈতৃক ভিটায়। তবে স্বামীজির ভাই শ্রী ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর  " প্রফেট  অ্যান্ড প্যাট্রিয়ট " গ্রন্থে তাঁদের আদি বাড়ির কথা উল্লেখ করেছেন।  এই গ্রামে এসে তাঁদের পৈতৃক ভিটের সীমানা চিহ্নিত করে যান। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ীই ভিটে সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠে দত্ত দ্বারিয়াটোন স্বামী বিবেকানন্দ  উচ্চ বিদ্যালয়।





আরও জানা যায় যে রাজা বল্লাল সেন দক্ষিণ রাঢ়ীয় নয়টি কায়স্থ বংশকে সম্মানিত করেছিলেন।  দত্ত বংশ এদের মধ্যে একটি। মোগল সম্রাটের সময় থেকে দীর্ঘকাল ধরে দত্তরা এই গ্রামে সুখে সাচ্ছন্দে বসবাস করতেন।  তারই ছিলেন গ্রামের জমিদার। দত্ত পরিবারের কর্তা ছিলেন নবাব বাহাদুরের দেওয়ান। দত্ত মহাশয়ের মানুষের প্রতি উদারতা ও ভালোবাসায় প্রীত নবাব এই গ্রামের নাম রাখেন "দত্ত দ্বারিয়াটোন"। দত্ত মহাশয় তাঁর নয় পুত্রের নামে নয়টি পুকুর কাটান। "তালপুকুর " ছাড়া আর সবকটিই এখন ভরাট হয়ে গেছে। আর ইনাদের বাড়ীর পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে "বেহুলা" নদী। ব্রিটিশ শাসনের শুরুতেই বিবেকানন্দের পূর্বপুরুষ রামনীধি দত্ত  গ্রাম ছেড়ে তাঁর পুত্র রামজীবন দত্ত ও পৌত্র রামসুন্দর দত্ত সহ সকলে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের কাছে বসতি স্থাপন করেন। তখন কলকাতা ছিল এক গন্ড গ্রাম।  পরে ব্রিটিশরা ফোর্ট উইলিয়াম তৈরি করলে তাঁরা সেখান থেকে উঠে এসে কলকাতার সিমলায়  নতুন বাড়ী তৈরী করেন। রামনিধি ও রামজীবন উচ্চ পদে চাকরি করতেন। তারপর রামসুন্দর দত্ত ছিলেন স্থানীয় জমিদারের দেওয়ান ।তাঁর পাঁচ পুত্রের মধ্যে জোষ্ঠপুত্র রামমোহন দত্ত সুপ্রীম কোর্টের এক ইংরেজ অ্যাটর্নির ম্যানেজিং  ক্লার্কের কাজ করতেন।  ফলে তাঁর  মাসিক উপার্জন প্রচুর ছিল। তিনি কলকাতার গৌরমোহন ষ্ট্রীটে বিরাট বাড়ী তৈরী করেন। রামমোহন দত্তের দুই পুত্র ও সাত কন্যা। পুত্ররা হলেন দুর্গাপ্রসাদ ও কালীপ্রসাদ।  দুর্গাপ্রসাদের এক পুত্র ও এক কন্যা। পুত্র হলেন বিশ্বনাথ দত্ত যিনি কিনা বিবেকানন্দের পিতা। দত্ত দ্বারিয়াটোন গ্রামে তাদের ঘর দালান কিছু না থাকলেও বাস্তুভিটার ৪৪ শতক জমি পরেছিল।  বর্তমান বেলুড়ের বাসিন্দা গৌতম ঘোষ ও সুকান্ত ঘোষ দত্ত পরিবারের আত্মীয ও ঐ জমির মালিক।২০২৩ সালে স্বামী বিবেকানন্দের ১৬১ তম জন্মদিনে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর পৈতৃক বাসভূমির জমি হস্তান্তর করা হয় বেলুড় মঠকে। এখানে রয়েছে স্বামীজির একটি অবয়ব মূর্তি। বর্তমানে সেই ভিটের রক্ষনাবেক্ষন করে মঠ কর্তৃপক্ষ। 





গত ৪০-৪৫ বছর আগেও সেখানে একটি দোতলা বাড়ীর  ভগ্নাবশেষ ছিল।  সেই বাড়ীর একটি প্রাচীরও ছিল।  শোনা যায় পরবর্তী সময়ে নটী বিনোদিনী যাত্রা পালার জন্য দত্ত পরিবারের বাড়ীর ঐ অংশের পাঁচিল ভেঙ্গে সমতল করা হয়েছিল।  তারপর থেকে বিবেকানন্দের পৈতৃক ভিটে একবারেই ফাকা। বর্তমানে ওখানে একটি ঘর তৈরি করা হয়েছে। আর সেখানেই রাখা হয়েছে  স্বামীজির মূর্তি। 












কালনা রেল স্টেশন থেকে এই গ্রামের দূরত্ব প্রায় ৪ কি মি।টোটো বা অটো পাওয়া যায়। এছাড়া যদি কেউ  সড়ক পথে যেতে চান, তবে কালনা-বৈঞ্চী রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে হবে। ঝাড়ুবাটি গ্রাম পেরিয়ে একটু এগোলেই রাস্তার বাঁ পাশে দেখতে পাবেন স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তি। তার পাশ দিয়ে যে রাস্তা বাঁ দিকে চলে গিয়েছে তা সোজা দত্ত দ্বারিয়াটোন গ্রামে গিয়েছে। কিছুদূর এগিয়েই বাঁ পাশে দেখতে পাবেন স্বামীজির আদি পৈতৃক ভিটে।





গ্রামের বাসিন্দাদের দাবী স্বামীজির স্মৃতি বিজড়িত এই স্থানকে সুন্দরভাবে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে পরিচিত করা হউক।  সেজন্য সেখানে গ্রন্থাগার,  সংগ্রহশালা তৈরী করা যেতে পারে। পর্যটন মানচিত্রে এই ঐতিহাসিক স্থানকে  পাকাপাকিভাবে স্থান দিতে প্রশাসনকে বারবার অনুরোধ করছেন।  এখানে আসার জন্য প্রাধান রাস্তার বাসস্টপেজের নাম স্বামীজির নামে নামকরন করা হউক। কালনা শহর থেকে সহজেই যাতে এখানে আসা যায় তার ব্যবস্থা করা উচিত।  স্বামীজির এই ভিটে সংরক্ষণের দাবিতে সরব হয়েছেন কালনা মহকুমা ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বচর্চা কেন্দ্রও। তবে আশার কথা এই যে এ ব্যাপারে মহকুমা প্রশাসন উদ্যোগী হয়েছেন।  স্বামী বিবেকানন্দের আদি পৈতৃক ভিটের যথাযথ মর্যাদা পাবার আশায় দিন গুনছে দ্বারিয়াটোনের গ্রামবাসীরা। এহেনো বীরকে নিয়ে গর্বের শেষ নেই এই গ্রামের বাসিন্দাদের। 







Wednesday, 6 December 2023

পাগল ঠাকুরের মামাবাড়ি

 


পাগল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মামাবাড়ি




হুগলি জেলার কামারপুকুর থেকে পূবে প্রায় ১৪ মাইল দূরে সারাটি গ্রাম। এখানেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মা চন্দ্রমণি দেবীর পৈতৃক বাস্তুভিটে অর্থাৎ ঠাকুরের মামাবাড়ি। এখনও এখানে রয়েছে পল্লীগ্রামের সেই শান্ত নির্জন পরিবেশ।  ১৯৯৫ সালে এই বাস্তুভিটার সাথেই স্থাপিত হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ চন্দ্রমণি সেবাশ্রম।  কিছুটা জমি কিনে আর কিছুটা দানের মাধ্যমে সংগৃহীত এই সেবাশ্রমের আয়তন প্রায় ১০ বিঘার উপর। জমিতে রয়েছে দুটি বিরাট পুকুর। মন্দিরের পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে এক খাল। সারা চত্বরটায় রয়েছে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ।  মন্দির বিল্ডিং এর পাশে এখনও তাঁর অর্থাৎ চন্দ্রমণি দেবীর মাটির ঘরটি সযত্নে রাখা আছে। মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্য যাবতীয় খরচা চলছে স্থানীয় লোকের সহযোগিতায় ও তাদের দানের উপর। তবে বর্তমান পূজারি শ্রী সুব্রত চক্রবর্তী মহাশয় জানালেন যে সম্প্রতি বেলুড় মঠ কতৃপক্ষ সেবাশ্রমটি অধিগ্রহণের কথা জানিয়েছেন। 







শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মাতুলালয়ের বংশের আদি পুরুষ ছিলেন শ্রী দাশরথি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পুত্রের নাম ছিল নন্দকিশোর ও পুত্রবধুর নাম ছিল  হরবিলাসিনী। তাঁদের তিন সন্তান ছিল।  তাঁরা হলেন চন্দ্রমণি, রাইমণি ও কৃষ্ণমোহন। এর মধ্যে খুব ছোটবেলাতেই ওলা ওঠায় মারা গিয়েছিল রাইমণি। কন্যা চন্দ্রমণির সাথে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ে দেন নন্দকিশোর।  চন্দ্রমণি-ক্ষুদিরামের পাঁচ সন্তানের অন্যতম গদাধর ওরফে শ্রীরামকৃষ্ণ।  শ্রীরামকৃষ্ণ ছোটবেলায় এই অঞ্চলে মামাবাড়িতে এসেছেন অনেকবার এবং অনেকটা সময়ও কাটিয়েছেন।  মামা কৃষ্ণমোহন ছিলেন সদব্রাহ্মন,  শাস্ত্রঞ্জ ও পরোপকারি পুরুষ।  ১৮৪০ সাল নাগাদ তিনি সারাটি গ্রাম ছেড়ে দেওঘরের কাছে কুন্ডায়   সপরিবারে চলে যান ও সেখানে যজমানির কাজ শুরু করেন। 





চন্দ্রমণি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে " কেষ্ট " নামে ডাকতেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেব সাধন জীবনের শুরু থেকেই জগন্মাতাকে দেখার ব্যপারে ব্যাকুল হয়েছিলেন।  বিয়ের পর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে গিয়ে এই ব্যকুলতা বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। সকলে ভাবতে লাগলেন তিনি উন্মাদ হয়ে গেছেন। এই খবর কামারপুকুরে গেলে চন্দ্রমণিদেবী স্থির থাকতে পারলেন না। কেষ্টর মঙ্গল কামনায় শিব মন্দিরে হত্যে দিয়েছেন। গৃহদেবতা রঘুবীর ও শীতলা মার কাছে মানত করেছেন। আবার অন্য দিকে মায়ের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণদেবের চিন্তার অন্ত ছিল না। মায়ের কষ্ট লাঘবের জন্য মাকে দক্ষিণেশ্বরে নিজের কাছে নিয়ে এলেন। এখানে চন্দ্রমণিদেবী জীবনের শেষ বারো-তেরো বছর কাটিয়েছিলেন।  এখানে এসে চন্দ্রমণিদেবী প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণ ও রামকুমারের পুত্র অক্ষয়ের সাথে কূঠিবাড়ির উত্তর-পূর্ব দিকের একটি  ঘরে থাকতেন।  কিন্ত অক্ষয়ের অকাল মৃত্যুর পর তিনি গঙ্গা পারের নহবতের  দোতলায় বাস করতে থাকেন। ১৮৭১ সালে মথুরবাবুর দেহত্যাগের পরে মা সারদা এসে নহবতের একতলার ছোট ঘরে থাকতে আরম্ভ করলেন।  শ্রীরামকৃষ্ণ দেখতেন........ যে মা মন্দিরের গর্ভগৃহে আছেন, তিনিই যেন জননী ও সারদা রূপে নহবতে বাস করছেন।






"  আমার মা মূর্তিমতী সরলতাস্বরূপা ছিলেন। সংসারের কোনও বিষয় বুঝতেন না। টাকাপয়সা গুনতে জানতেন না। কারোকে কোনও বিষয় বলতে নেই, তা না জানাতে নিজের পেটের কথা সকলের কাছে বলে ফেলতেন, সেজন্য লোকে তাঁকে ‘হাউড়ো’ বলত এবং তিনি সকলকে খাওয়াতে বড় ভালবাসতেন”— নিজের গর্ভধারিণী মাকে এই ভাবেই ভক্ত-শিষ্যদের কাছে তুলে ধরেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে যখন দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের আগমন ঘটছে, তখন তাঁর জননী আর ইহলোকে ছিলেন না। কিন্তু বহু জনের মঙ্গলের জন্য রেখে গিয়েছিলেন পৃথিবীর এক অসীম আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন দার্শনিক এবং মানবপ্রেমী মহামানবকে।






১৮৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। রামকৃষ্ণদেব ক'দিন ধরে মা-র কাছে ঘন ঘন আসছেন। সন্ধ্যা থেকে  রাত অবধি মায়ের কাছে  ছোটবেলার গল্প করে চন্দ্রমণির মন ভরিয়ে রাখছেন। সেদিন সকালে  আটটা বেজে গেলেও চন্দ্রমণি দরজা খুলছেন না।  হৃদয়রাম  পরিচারিকার মুখে সব শুনে কৌশলে দরজা খুলে দেখলেন যে চন্দ্রমণি সংঞ্জাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ আনা হ'ল। সেই ওষুধের সাথে দুধ আর গঙ্গাজল মিশিয়ে বিন্দু বিন্দু করে খাওয়ানো চলতে লাগলো। তিনদিন পর চন্দ্রমণির অন্তিমকাল উপস্থিত হলে তাঁকে কালীবাড়ীর বকুলতলাঘাটে অন্তর্জলি করা হলো। শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর মুখে গঙ্গাজল দিয়ে কানে নাম শোনালেন।  পা ধুইয়ে দাদা চন্দন মাখিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন। মা এর চরনে মাথা রেখে ঠাকুর কাঁদতে কাঁদতে বললেন  " মা,  তুমি  কে গো । আমায় গর্ভে ধারণ করেছিলে , তুমিতো সাধারণ মা নও।  মা, তুমি যেমন আমায় আগে দেখাশোনা করতে, এখনও আমায় দেখো। "  পরেরদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নেহের পুত্রকে পাশে রেখে চন্দ্রমণি অমৃতলোকে চলে গেলেন। দেহত্যাগের মুহূর্তে শ্রীরামকৃষ্ণ  " মা, মা " বলে কেঁদে উঠেছিলেন।  ঘটনাচক্রে সেই দিনটিও ছিল ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বিতীয়, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি। আর সময়ও ছিল সেই উষাকাল। 






স্বামীজির কাছে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ছিলেন    " স্পিরিচুয়াল জায়েন্ট  " , রোমাঁ রোলাঁরের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবন এক অমৃতভান্ড।  সেই আমৃতভান্ডকে যিনি গর্ভে ধারণ করেছিলেন,  তিনিও তাঁর বরেন্য পুত্রের মতোই  পূজনীয়। সেই শ্রীরামকৃষ্ণ জননী জন্মভিটে হুগলির সারাটি  গ্রাম , তারকেশ্বর থেকে প্রায় ২০ কি মি। তারকেশ্বর থেকে আরামবাগ রোড ধরে হরিণখোলায়  মুন্ডেশ্বরী নদীর ব্রীজ পেরিয়ে গেলে পাবেন কাবলে বাস ষ্টপ। সেখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে প্রায় দেড় কিমি এগুলে পাবেন  বাঁ দিকে সারাটি শনি ও কালী মন্দির।  সেখানেই আপনাকে ঢুকতে হবে বাঁ দিকে সারাটি গ্রামে যাবার জন্য। ঐ রাস্তা ধরে আর ৭০০ মিটার মতো এগোলেই দেখতে পাবেন শ্রীরামকৃষ্ণ চন্দ্রমণি সেবাশ্রম। শান্ত পরিবেশ আর নিস্তব্ধতা আপনার মনকে কতটা সতেজ করতে পারে , সেটাই বুঝতে একদিন চলে আসুন  পাগল ঠাকুরের মামাবাড়িতে।