Sunday, 20 June 2021

শ্রীরামকৃষ্ঞের সাথে বিদ্যাসাগরের সাক্ষাৎকার

 

শ্রী রামকৃষ্ণের জীবনী থেকে নেওয়া ::

বিদ্যাসাগর ও ঠাকুরের প্রথম সাক্ষাত্‍কার ::


শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মভূমি হুগলি জেলার কামারপুকুর গ্রাম আর ঈশ্বরচন্দ্রের বীরসিংহ গ্রাম। কামারপুকুর থেকে বীরসিংহ খুব দূরের পথ না। সেই জন্য বোধ হয় শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর মহাশয়কে কাছের মানুষ বলে মনে করতেন। তবে সেই মনে হওয়া শুধুই মনে মনে । ঠাকুরের ইচ্ছা বীরসিংহ গ্রামের সিংহটির সাথে একবার অন্তত দেখা করার। তো সেই সুযোগও এলো। যখন ঠাকুরের পরম ভক্ত শ্রীম ওরফে মহেন্দ্রনাথ গুপ্ত বিদ্যাসাগরের স্কুলে মাস্টারি করা শুরু করলেন। ঠাকুরই একদিন মাস্টারকে বললেন, "আমাকে বিদ্যাসাগর এর কাছে নিয়ে যাবে? আহা! দক্ষিণেশ্বর কালিবাড়িতে থাকতে থাকতে বিদ্যে আর দয়ার কত কথা শুনেছি! তিনি বিদ্যারও সাগর আবার দয়ারও সাগর।"

মহেন্দ্রগুপ্ত বিদ্যাসাগর কে বললেন," দক্ষিণেশ্বরের শ্রীরামকৃষ্ণ আপনার সাথে দেখা করতে চান।ভারি ইচ্ছা তার আপনার সাথে আলাপ করার।"

ঈশ্বরচন্দ্র হেসে বললেন, "তুমি তো জানো মাস্টার, আমি নাস্তিক মানুষ। ঈশ্বর সত্যি আছেন কিনা সেই বিষয়ে আমার গভীর সন্দেহ। সত্যি বলতে কি ভগবানের ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহই নেই। সুতরাং সাধু সন্ন্যাসী দের কাছ থেকেও আমি দূরে থাকি।"

মাস্টার বিদ্যাসাগরের কথা শুনে নীরব রইলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বুঝলেন তিনি মহেন্দ্রকে আঘাত করেছেন। জিজ্ঞাসা করলেন, "বলত মাস্টার, তিনি কি রকম পরমহংস? তিনি কি গেরুয়া পড়া সন্ন্যাসী?"

মাস্টার এবার ঈশ্বরচন্দ্রর চোখে চোখ রেখে কিঞ্চিৎ দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, "আজ্ঞে না! লাল পেরে কাপড় পড়েন,জামা পড়েন, বার্নিশ করা চটি জুতো পড়েন। রাসমনির কালিবাড়িতে একটি ঘরের ভিতরে বাস করেন। সেই ঘরে তক্তাপোষ পাতা আছে, বিছানা, মশারিও আছে।সেই বিছানায় তিনি শয়ন করেন। তিনি যে সন্ন্যাসী তার কোনো বাহ্যিক চিহ্ন নেই। তবে ঈশ্বর বৈ আর কিছু জানেন না, অহর্নিশি তারই চিন্তা করেন।"

বিদ্যাসাগর মহেন্দ্রনাথ এর কথায় হেসে ফেললেন, বললেন,"বেশ বেশ তাকে নিয়ে এসো একদিন।"

মহেন্দ্রনাথ রামকৃষ্ণকে বললেন,"বিদ্যাসাগর আপনার সাথে দেখা করতে চান।"

শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের মধ্যে ডুব দিলেন। চোখে মুখে ফুটে উঠলো দৈব উদ্ভাস। শ্রী ঠাকুর মধুর কণ্ঠে বললেন,"এই শনি বার ,সেদিন শ্রাবনের কৃষ্ণাষষ্ঠী, সাগর দর্শনের লগ্ন বিকাল ৪টে। "

(তখন বিদ্যাসাগরের বয়স ঠিক ৬২, রামকৃষ্ণ তার থেকে ১৬ বছরের ছোট, তার বয়স ৪৬। বিদ্যাসাগর এর প্রতি তার ভাব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা ভরা। )

বিকাল ঠিক ৪ টা। ঠিকা গাড়ি এসে দাঁড়াল। ঠাকুর ভাবে তন্ময় হয়ে আছেন। মহেন্দ্র বললেন,"এবার নামতে হবে, আমরা এসে গেছি।" ঠাকুর ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন। মাস্টার পথ দেখিয়ে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। উঠোনে ফুল গাছ, ঠাকুর মুগ্ধ হয়ে বাড়ি টি দেখছেন, কি সুন্দর বাড়ি! শান্তির নীড়। সমস্ত বাড়িটি যেন ধ্যানের মন্দির- মনে হল ঠাকুরের। তিনি শুনেছেন, ঈশ্বরচন্দ্র নাকি ভগবান-টগবানে বিশ্বাস করেন না। মৃদু হাসছেন ঠাকুর।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সাক্ষাত্‍কার

ঈশ্বর-অবিশ্বাসী ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে সাক্ষাত্‍ হয়েছিল ঠাকুর শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের । কেমন ছিল দুই কিংবদন্তির সাক্ষাত্‍ ? জানতে ফিরে যেতে হবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণে ।

বিদ্যাসাগর মহাপণ্ডিত।
তিনি ষড়দর্শন পাঠ করেছেন ।
জানতে চেয়েছেন ঈশ্বরকে। আর এইটুকু বুঝতে পেরেছেন যে, ঈশ্বরের বিষয়ে কিছুই জানা যায় না ।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাকালেন বিদ্যাসাগরের দিকে ।যেন বুঝতে পারলেন বিদ্যাসাগরের মনের কথা । বললেন, ব্রহ্মবিদ্যা ও অবিদ্যার পার | তিনি মায়াতীত।
মহাপণ্ডিত বিদ্যাসাগর শুনছেন মুগ্ধ বিস্ময়ে ।

বলে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ -

এই জগতে বিদ্যামায়া-অবিদ্যামায়া দুই আছে ।জ্ঞান-ভক্তি আছে ।আবার কামিনীকাঞ্চনও আছে ।সত্‍-ও আছে ,আবার অসত্‍-ও আছে । ভাল আছে ,আবার মন্দও আছে । কিন্তু ব্রহ্ম নির্লিপ্ত ।ভাল-মন্দ জীবের পক্ষে । সত্‍-অসত্‍ জীবের পক্ষে । ব্রহ্মের ওতে কিছু হয় না ।

বিদ্যাসাগর বললেন, একটু ব্যাখ্যা করে, আরও সহজ করে বুঝিয়ে দিন ।

শ্রীরামকৃষ্ণ সহজ সরল হাসি হেসে বললেন, প্রদীপ যেমন নির্লিপ্ত, ব্রহ্মও সেইরকম । প্রদীপের সামনে কেউ ভাগবত পড়ছে আর কেউ বা জাল করছে । প্রদীপের তাতে কিছু যায় আসে না । কোনও কাজটির সঙ্গেই প্রদীপ যুক্ত হচ্ছে না ।সে নির্লিপ্তভাবে শুধু জ্বলছে ।যদি বলো দুঃখ, পাপ, অশান্তি এ সকল তবে কী ?

তার উত্তর এই যে ওসব জীবের পক্ষে ।ব্রহ্ম নির্লিপ্ত ।যেমন ধরো সাপের মধ্যে বিষ আছে ।অন্যকে কামড়ালে মরে যায় ।সাপের কিন্তু কিছু হয় না ।

বিদ্যাসাগরের মুখে রা নেই । তিনি ক্রমে বুঝতে পারছেন, এক নিরক্ষর ব্রাহ্মণের মুখে বেদান্ত কী সহজ সরল ভাষায় উচ্চারিত হচ্ছে !
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ব্রহ্ম যে কী মুখে বলা যায় না |
সব জিনিস উচ্ছিষ্ট হয়ে গেছে।
বেদ,পুরাণ, তন্ত্র, ষড়দর্শন, সব এঁটো |
(থামলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। তাকালেন বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে।)

বিস্মিত বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন, এঁটো কেন ?
শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে উত্তর দিলেন, মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে, তাই এঁটো হয়ে গেছে ।
কিন্তু একটি জিনিস কেবল উচ্ছিষ্ট হয়নি গো !
সেই জিনিসটি ব্রহ্ম ।ব্রহ্ম যে কী, আজ পর্যন্ত কেউ মুখে বলতে পারেনি ।বিদ্যাসাগরের বুকের ভেতরটা তোলপাড় করে উঠল।আবেগে কাঁপছে তাঁর শরীর ।শ্রীরামকৃষ্ণ বয়েসে অনেক ছোট, তবু বিদ্যাসাগরের ইচ্ছে হল তাঁর কাছে নতজানু হওয়ার ।তিনি শুধু কম্পিত কণ্ঠে বললেন, আজ একটি নতুন কথা শিখলাম। ব্রহ্ম উচ্ছিষ্ট হননি !

ঘরে তখন অনেক মানুষের ভিড় হয়ে গেছে।সবাই শুনছে ঠাকুরের কথা ।কী সহজ, কী প্রাণস্পর্শী, কী গভীর।ঠাকুর কী অনায়াসে আড়াল সরিয়ে দিচ্ছেন!
ফুটে উঠছে নতুন আলো।জাগ্রত হচ্ছে নব চেতনা ।
উদ্ঘাটিত হচ্ছে সত্যের মুখ।শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, এবার একটা গল্প বলছি, শোনো…

"এক বাপের দুটি ছেলে।ব্রহ্মবিদ্যা শেখবার জন্যে ছেলে দুটোকে বাপ আচার্যের হাতে দিলেন ।কয়েক বছর পরে তারা গুরুগৃহ থেকে ফিরে এলো। এসে বাপকে প্রণাম করলে।বাপের এবার ইচ্ছে হল, এদের ব্রহ্মজ্ঞান কেমন হয়েছে একটু বাজিয়ে দেখবার।বড় ছেলেকে জিগ্যেস করলেন, বাপ ! তুমি তো সব পড়েছো | ব্রহ্ম কীরূপ বলো দেখি ।
বড় ছেলেটি বেদ থেকে নানা শ্লোক বলে বলে ব্রহ্মের স্বরূপ বোঝাতে লাগল।বাপ শুনলেন | কোনও কথা বললেন না | বড় ছেলে বাপের মনের ভাব বুঝতে পারল না।এবার ছোট ছেলেকে বললেন, তুমি বলো দেখি ব্রহ্মের কী রূপ ?
ছোট ছেলের মুখে কোনও কথা নেই ।
সে হেঁট মুখে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকল ।বাপ প্রসন্ন হয়ে ছোট ছেলেকে বললেন, বাপু, তুমি একটু বুঝেছো। ব্রহ্ম যে কী তা মুখে বলা যায় না ।"

শ্রীরামকৃষ্ণ কিছুক্ষণ থামলেন। তিনি জানেন, সাধারণ মানুষকে তাঁর কথার মর্ম বুঝতে একটু সময় দিতে হয় ।তারপর তাঁর গল্পের সূত্রটি ধরেই বললেন, মানুষ মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি ।কিন্তু সত্যি কি জানা যায় ?জানা গেলেও কতটুকুই বা জানা যায় তাঁকে ?বিদ্যাসাগর নিবিষ্ট হয়ে শুনছেন। আর অপলক তাকিয়ে আছেন শ্রীরামকৃষ্ণের দিকে । আর কারও কথা শুনে কখনও এমন ঘোর লাগেনি তাঁর।শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরের মুখের দিকে তাকিয়েই বললেন, আর একটা গল্প বলছি শোনো…

"একটা পিঁপড়ে চিনির পাহাড়ে গিছলো।
এক দানা খেয়ে পেট ভরে গেল | আর এক দানা মুখে করে সে বাসার পথে চলেছে।যাবার সময় ভাবল, এবার এসে সব পাহাড়টা নিয়ে যাব।
ক্ষুদ্র জীবেরা এইসব মনে করে ।জানে না ব্রহ্ম বাক্যমনের অতীত !যে যতই বড় হোক না কেন, তাঁকে জানা যায় না।বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ বলে ফেললেন, কেন শুকদেব ? তিনি তো .শ্রীরামকৃষ্ণ হেসে বললেন, শুকদেবাদি না হয় ডেঁও পিঁপড়ে।চিনির আট-নটা দানা না হয় মুখে করেছে । তার বেশি নয়।

ঘরে এত মানুষ | তবু পিন পড়লে শব্দ পাওয়া যাবে।রোজ কত পণ্ডিত মানুষের আসা-যাওয়া বিদ্যাসাগরের বাড়িতে ।কিন্তু এমন জীবন্ত বেদান্ত কখনও দেখিনি ! শ্রীরামকৃষ্ণের কথা শুনছেন আর ভাবছেন বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতে লাগলেন, তবে বেদে পুরাণে যা বলেছে, সে কী রকম বলা জানো ?বিদ্যাসাগর বুঝলেন, ঘরের মধ্যে আর কেউ না বুঝুক তিনি অন্তত ধারণা করতে পারলেন, শ্রীরামকৃষ্ণের কণ্ঠে নতুনভাবে ব্যাখ্যাত হতে চলেছে বেদ ও পুরাণ !তিনি উদগ্রীব হয়ে শুনছেন।ঠাকুর বললেন, একজন সাগর দেখে এলে কেউ যদি জিগ্যেস করে, কেমন দেখলে, সে লোক মুখ হাঁ করে বলে, - ওহ ! কী দেখলুম ! কী হিল্লোল, কল্লোল।ব্রহ্মের কথাও সেই রকম । বেদে আছে তিনি আনন্দস্বরূপ।সচ্চিদানন্দ।বিস্মিত বিদ্যাসাগর। শ্রীরামকৃষ্ণ বেদ পড়েছেন!তিনি তো নিরক্ষর।বিদ্যাসাগর কী ভাবছেন, শ্রীরামকৃষ্ণ যেন বুঝতে পারলেন।বললেন, শুকদেবাদি এই ব্রহ্মসাগর-তটে দাঁড়িয়ে দর্শন স্পর্শন করেছিলেন মাত্র।তাঁরা কিন্তু ব্রহ্মসাগরে নামেননি । এ সাগরে নামলে আর ফেরবার জো নেই গো ।ঠাকুরের কথায় চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর । এতো একেবারে নতুন কথা।অথচ কী অবলীলায় কথাটি বললেন পরমহংস !বিদ্যাসাগর প্রশ্ন করলেন তাহলে ব্রহ্মাণ্ডজ্ঞান হওয়ার উপায় ? ঠাকুর উত্তর দিলেন, সমাধিস্থ হলে ব্রহ্মজ্ঞান হয় ।সেই অবস্থায় বিচার একেবারে বন্ধ হয়ে যায় ।মানুষ চুপ হয়ে যায় ।ব্রহ্ম কী বস্তু, মুখে বলবার শক্তি থাকে না ।

শ্রীরামকৃষ্ণ আর একটা গল্প বললেন--


নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিছলো। কত গভীর জল সেই খবরটা সে দিয়ে চেয়েছিল। কিন্তু খবর দেওয়া আর হল না। যেই নামল জলে অমনি গেল গলে ।কে আর খবর দেবে ? একজন প্রশ্ন করলেন, সমাধিস্থ ব্যক্তি যাঁর ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছে তিনি কী আর কথা কন না ?
বিদ্যাসাগরকে চমকে দিল ঠাকুরের বিদ্যুতের মতো উত্তরশঙ্করাচার্য লোকশিক্ষার জন্য বিদ্যার 'আমি' রেখেছিলেন ।বিদ্যাসাগর এই কথার গভীর অর্থটুকু বুঝতে পারলেন। আপাত অশিক্ষিত একটি মানুষের জ্ঞানের ব্যাপ্তি ও গভীরতা দেখে তিনি স্তম্ভিত !শ্রীরামকৃষ্ণ এবার আরও সহজ করে তাঁর বক্তব্যের সারাত্‍সার তুলে ধরলেন--ব্রহ্মদর্শন হলে মানুষ চুপ হয়ে যায় ।যতক্ষণ দর্শন না হয়, ততক্ষণই বিচার তেমনি সমাধিত পুরুষ--লোকশিক্ষা দেবার জন্য আবার নেমে আসে আবার কথা কয় ।বিদ্যাসাগরের চোখে একইসঙ্গে ফুটে ওঠে মুগ্ধতা আর শ্রদ্ধা ।তাঁর মন বলে ওঠে , শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস সেই পুরুষ তো তুমি নিজে । সমাধিস্থ হয়েও লোকশিক্ষার জন্য নেমে এসেছো, কথা বলছো !শ্রীরামকৃষ্ণ এবার ব্রহ্মজ্ঞানীর স্বরূপ অন্যভাবে ফুটিয়ে তোলেন্-যতক্ষণ মৌমাছি ফুলে না বসে ততক্ষণ ভনভন করে, ফুলে বসে মধুপান করতে আরম্ভ করলে চুপ হয়ে যায়। মধুপান করে মাতাল হবার পরে আবার কখনও-কখনও গুনগুন করে।পুকুরে কলসিতে জল ভরার সময় ভকভক শব্দ হয়। পূর্ণ হয়ে গেলে আর শব্দ নেই | তবে আর এক কলসিতে যদি ঢালাঢালি হয় তাহলে আবার শব্দ হয়।


একজন হঠাত্‍ বললেন,
ঋষিদের কি ব্রহ্মজ্ঞান হয়েছিল ?
শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন, হ্যাঁ হয়েছিল ।বিষয়বুদ্ধির লেশমাত্র থাকলে এই ব্রহ্মজ্ঞান হয় না ।ঋষিরা দেখা-শোনা-ছোঁয়া এসবের বিষয় থেকে মনকে আলাদা রাখত । সমস্ত দিন ধ্যান করে কাটত । তবে ব্রহ্মকে বোধে বোধ করত ।এবার সরাসরি বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন ঠাকুর । বললেন, "কলিতে অন্নগত প্রাণ ।দেহ বৃদ্ধি যায় না।যারা বিষয় ত্যাগ করতে পারে না, তাদের 'আমি' কোনওভাবে যায় না।
তাদের বরং 'আমি ব্রহ্ম' না বলে বলা উচিত আমি ভক্ত, আমি দাস।
এ অভিমান ভাল।
ভক্তিপথে থাকলেও তাঁকে পাওয়া যায়।" বিদ্যাসাগরকে যেন সরাসরি বলছেন ঠাকুর--জ্ঞানীর পথও পথ ।আবার জ্ঞান-ভক্তির পথও পথ ।আবার ভক্তির পথও পথ।
জ্ঞানযোগও সত্য। ভক্তির পথও সত্য । সব পথ দিয়েই তাঁর কাছে যাওয়া যায়।
কিন্তু যতক্ষণ তিনি 'আমি' রেখেছেন আমাদের মধ্যে ততক্ষণ ভক্তিপথই সোজা।

শ্রীরামকৃষ্ণ এবার যেন শুধু বিদ্যাসাগরকেই দেখছেন ।তিনি এই মহাপণ্ডিতকে বললেন, বিজ্ঞানী কী বলে ? বিজ্ঞানী বলে, যিনি ব্রহ্ম, তিনিই ভগবান।
অর্থ বুঝিয়ে দিচ্ছি।
ব্রহ্ম নির্গুণ ।তিনি গুণাতীত ।ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
এই জীবজগত্‍, মন বুদ্ধি, বৈরাগ্য, জ্ঞান, এসব তাঁর ঐশ্বর্য ।
দেখো না এই জগত্‍ কী চমত্‍কার । কত রকম জিনিস, চন্দ্র, সূর্য, নক্ষত্র ।কত রকম জীব ।বড় ছোট ভালমন্দ কারু বেশি শক্তি, কারু কম শক্তি । ব্রহ্মই ভগবান হয়েছেন । যিনি নিরাকার, তিনিই সাকার।যিনি নির্গুণ তিনিই ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।

বিদ্যাসাগর হঠাত্‍ প্রশ্ন করলেন তিনিই কি কাউকে বেশি শক্তি, কাউকে কম শক্তি দিয়েছেন ?
উত্তর দিলেন পরমহংস-তিনি বিভুরূপে সর্ব ভূতে আছেন ।বিভু মানেই তো পরমেশ্বর। আবার বিভু মানে সর্বব্যাপী ।
পিঁপড়ের মধ্যেও তিনি আছেন। আবার বিরাট পাহাড়ও তারই প্রকাশ ।সর্বত্র তিনি ।কিন্তু শক্তির তারতম্য তো আছেই ।ঠাকুর এবার বিদ্যাসাগরকেই বললেন--এই যেমন তুমি।
তোমাকেই বা সবাই মানে কেন ?
তোমার কি শিং বেরিয়েছে দুটো ?
তোমাকে মানে তার কারণ তোমার দয়া, তোমার বিদ্যে আছে অন্যের চেয়ে অনেক বেশি।
তুমি একথা মানো কি না ?
বিদ্যাসাগর লজ্জা পেলেন ।তিনি মৃদু মৃদু হাসছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরকে বললেন--একঘর লোকের সামনে বিদ্যাসাগরকে একথা বলার সাহস কারও হত না-- ঠাকুর বললেন শুধু পাণ্ডিত্যে কিছু হয় না ।মনে রেখো, তাঁকে জানবার জন্যেই বই পড়া ।তাঁকে জানাই একমাত্র জানা ।তাঁকে জানাই সব জানা আর সব অবিদ্যা।


এবার প্রশ্ন করলেন বিদ্যাসাগরকে, গীতার অর্থ কী ?
কী বলবেন বিদ্যাসাগর ? গীতার অর্থ এককথায় বলা যায়? চুপ করে থাকলেন বিদ্যাসাগর ।
বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ, গীতার অর্থ দশবার 'গীতা' বলতে যা হয় তাই। দশবার 'গীতা' বলতে গেলে ত্যাগী হয়ে যায়।
গীতার শিক্ষা হল, হে জীব সব ত্যাগ করে ভগবানকে লাভ করার চেষ্টা করো।
সাধুই হও, আর সংসারী হও, মন থেকে সব আসক্তি ত্যাগ করতে হবে।
এবার বিদ্যাসাগরের দিকে তাকালেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।ঘরে যেন আর কেউ নেই ।বললেন, অনেক পড়লেই কিছু হয় না গো ।অন্তরের কথাটি বুঝতে হবে ।শুধু পাণ্ডিত্য নয় ।ভক্তি চাই ।তাঁকে ভালবাসতে হবে ।তোমাকে একটা গপ্পো বলছি ।গল্পটা বুঝতে পারলে সব হবে।

চৈতন্যদেব তখন দক্ষিণে তীর্থভ্রমণ করছিলেন । দেখলেন একজন গীতা পড়ছে আর একজন একটু দূরে বসে শুনছে আর কাঁদছে। কেঁদে চোখ ভেসে যাচ্ছে । চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন, তুমি এসব বুঝতে পারছো ? সে বললে, ঠাকুর, আমি এসব শ্লোক কিছুই বুঝতে পারছি না।
চৈতন্যদেব জিগ্যেস করলেন তবে কাঁদছো কেন ?

ভক্তটি তখন বললে, আমি দেখেছি অর্জুনের রথ । আর তাঁর সামনে কৃষ্ণ ।আর অর্জুন কথা কচ্চেন।
তাই দেখে আমি কাঁদছি ।বিদ্যাসাগরের বুকের শিরায় টান ধরল ।তাঁর চোখ ভরে এল জলে ।মন ভরে গেল গভীর কৃতজ্ঞতায় ।নতুন চেতনায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি !

বিদ্যাসাগরকে বলতে লাগলেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।মনে মনে বিদ্যাসাগর নতজানু, করজোড় । শুনছেন তিনি ।নিষ্কম্প শিখার মতো ।ঠাকুর বলতে লাগলেন- তাঁকে কি শুকনো পাণ্ডিত্য দিয়ে বিচার করে জানা যায় গো ? তাঁর দাস হয়ে তাঁর শরণাগত হয়ে তাঁকে ডাকো |
মনে রেখো, 'আমি' ও 'আমার',এই দুটি অজ্ঞান ।
আমার বাড়ি, আমার টাকা,আমার বিদ্যা,আমার এইসব ঐশ্বর্য,এই যে ভাব, এটি অজ্ঞান থেকে হয় ।আর যদি ভাবো,হে ঈশ্বর,তুমিই কর্তা,এসব জিনিস তোমার,টাকাকড়ি, আমার বিদ্যা,আমার ঐশ্বর্য,আমার পরিবার,সব কিছুই তোমার,আমার বলতে কিছুই নেই--এই ভাব জ্ঞান থেকে হয় ।
বিদ্যাসাগর,তোমার কোন ভাব গো ? হঠাত্‍ জানতে চাইলেন ঠাকুর ।বিদ্যাসাগর কিছুটা অপ্রস্তুত ।খুব মৃদু স্বরে বললেন, আপনাকে সেকথা একলা একদিন বলব ।ঠাকুর বিদ্যাসাগরকে এবার তাঁর অন্তরকথা,তাঁর নিজস্ব ভাবটি বলার জন্য গান ধরলেন--

কে জানে কালী কেমন?
ষড়দর্শনে না পায় দরশন ।
মূলাধারে সহস্রারে সদা যোগী করে মনন।
কালী পদ্মবনে হংস সনে,হংসী রূপে করে রমণ ।।
আত্মরাগের আত্মাকালী প্রমাণ প্রণবের মতন ।
তিনি ঘটে ঘটে বিরাজ করেন ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন ।।
মায়ের উদরে ব্রক্ষাণ্ডভাণ্ড প্রকাণ্ড তা জান কেমন ।
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম অন্য কে বা জানে তেমন ।
প্রসাদ ভাসে লোকে হাসে,সন্তরণে সিন্ধু তরন ।
আমার মন বুঝেছে প্রাণ বুঝে না ধরবে শশী হয়ে বামন ।

গান শেষ করে শুধু একটি কথা বললেন শ্রীরামকৃষ্ণ,ষড়দর্শনে না পায় দর্শন,পাণ্ডিত্যে তাঁকে পাওয়া যায় না গো । এরপর ঠাকুর কিছুক্ষণ সমাধিস্থ ।চেতনায় ফিরে এসে জিগ্যেস করলেন,কটা বাজে গো ? বিদ্যাসাগর বললেন, রাত ৯টা। এবার যে উঠতে হবে ।ফিরতে হবে সেই দক্ষিণেশ্বরে। শ্রীরামকৃষ্ণকে বিদায় দিতে মন চাইছে না বিদ্যাসাগরের ।কেন তাঁর এমন হল ? ঠাকুর লাবণ্যময় কণ্ঠে বিদ্যাসাগরকে বললেন,একবার বাগান দেখতে যেও ।রাসমণির বাগান । ভারী চমত্‍কার জায়গা ।

বিদ্যাসাগর-যাবো বৈ কি ! আপনি এলেন আর আমি যাব না ?
শ্রীরামকৃষ্ণ -আমার কাছে ! ছি.ছি !
বিদ্যাসাগর- সে কী ! এমন কথা বললেন কেন ? আমার বুঝিয়ে দিন।
শ্রীরামকৃষ্ণ(সহাস্যে)-আমরা জেলেডিঙ্গি ।খালবিল, আবার বড় নদীতেও যেতে পারি ।কিন্তু তুমি তো জাহাজ গো ।কী জানি যেতে গিয়ে চড়ায় পাছে লেগে যায় । বিদ্যাসাগর চুপ ।উত্তর খুঁজে পাচ্ছেন না । শ্রীরামকৃষ্ণই এগিয়ে এলেন বিদ্যাসাগরকে উদ্ধার করতে ।বললেন,তবে এই সময়ে জাহাজও যেতে পারে । বিদ্যাসাগর ইঙ্গিতটি ধরতে পারলেন ।হেসে বললেন,হ্যাঁ,এটা বর্ষাকাল বটে ।মহেন্দ্রগুপ্ত টিপ্পনি কাটলেন,এতো নবানুরাগের বর্ষা । নবানুরাগের সময় মান-অপমান বোধ থাকে না বটে ।

শ্রীরামকৃষ্ণ ইতিমধ্যে উঠে পড়েছেন ।তিনি সিঁড়ি দিয়ে নামছেন ।একজন ভক্তের হাত ধরে আছেন ।বিদ্যাসাগর আগে আগে চলেছেন ।বাতি হাতে পথ দেখাচ্ছেন তিনি ।
শ্রাবণকৃষ্ণাষষ্ঠী । এখনও চাঁদ ওঠেনি ।দূরে কোথাও বৃষ্টি হয়েছে। বাতাস ভিজে ভিজে,মিঠে। বাতাসে ভেজা ঘাস-পাতা-মাটির সুবাস ।তমসাবৃত উদ্যানভূমির মধ্যে দিয়ে চলেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ ।বাতির ক্ষীণালোক বহন করে ফটকের সামনে বিদ্যাসাগর | শ্রীরামকৃষ্ণ ফটকে পৌঁছতেই সামনে এসে দাঁড়াল এক গৌরবর্ণ,শ্মশ্রুধারী,বাঙালি পোশাক-পরা যুবক । যুবক শ্রীরামকৃষ্ণের পায়ে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করল ।
শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন,বলরাম ! তুমি এখানে এত রাতে ?
বলরাম-আমি অনেক্ষণ এসেছি । এখানেই দাঁড়িয়েছিলাম ।
শ্রীরামকৃষ্ণ- ভেতরে যাওনি কেন ?
বলরাম-আজ্ঞে,সকলে আপনার কথাবার্তা শুনছেন,সেখানে গিয়ে বিরক্ত করিনি ।



শ্রীরামকৃষ্ণ এবার তার ভাড়া করা ঘোড়ার গাড়িতে উঠে পড়লেন ।বিদ্যাসাগর প্রায় চুপি চুপি মহেন্দ্রকে জিগ্যেস করলেন,ভাড়া কি দেব ?
মহেন্দ্র বললেন ,আজ্ঞে না ।ও হয়ে গেছে । বিদ্যাসাগর ঘোড়ার গাড়ির দরজায় এগিয়ে গেলেন ।তাঁর হাতে বাতিটি ধরা ।বাতির ক্ষীণালোকে ঠাকুরের মুখটি দেখলেন ।তাঁর সমস্ত অন্তর লুটিয়ে পড়ল শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীচরণে এক দীর্ঘায়িত প্রণামে ।
শ্রীরামকৃষ্ণের গাড়ি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল বিদ্যাসাগরের দৃষ্টি থেকে ।তিনি একা ঠাকুরের প্রস্থানের পথের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন।
তাঁর মনে হল, ভগবান এসেছিলেন ।এক ঝলক দেখা দিয়ে চলে গেলেন ।তারই আশীর্বাদ হয়ে যেন স্বর্গ থেকে নেমে এল ঝিরঝিরে বৃষ্টি ! বৃষ্টির জলে নিভে গেল বিদ্যাসাগরের হাতের বাতিটি।অন্ধকারে একা বিদ্যাসাগর ।
রামকৃষ্ণ-ধারায় কতদিন পরে এমনভাবে প্রাণ জুড়াচ্ছে তাঁর।


শ্রীরামকৃষ্ণের অদ্বৈত বেদান্ত

 




 আধ্যাত্মিক পুরুষেরা সাধারণত জগৎকে ঘৃণা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সকলকে মায়ের নামে ডাকছেন।  আর নবদর্শন প্রতিষ্ঠা করছেন::" শিবঞ্জানে জীব সেবা"। জীব মাত্রই শিব---- এই ঞ্জানে নূতন পথের উদয়   হলো ---- যার লখ্য সকলকে ঈশ্বর ঞ্জানে সেবা করা,যাতে ঈশ্বরতত্ব প্রতিষ্ঠিত  হয় জীবনে। এই পথের দিশারী শ্রীরামকৃষ্ণ।   প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ সেই পথটির উদ্বোধন করেছিলেন    ১৮৯৭ সালের  ১ লা মে, কলকাতার বলরাম   মন্দিরে।

সেবাযোগ ___ জীবের সেবা___ শিবত্বের সাথে যুক্ত হবার জন্য। এটিই  "রামকৃষ্ণ ছাঁচ" বা ' Ramkrishna Mould' । এর  পিছনে যে তত্ত্ববটিট আছে সেটি অদৈত্বববেদান্ত জাাত  কিন্ত  দ্বৈতভাব সমন্বিত। স্বামীজিও কট্টর অদ্বৈতী ছিলেন কিন্ত তাার অদ্বৈতবেদান্তের মধ্যে একমাত্র দ্ববৈত সংস্কার হলো শিবঞ্জানে জীব সেবা। এ ভাবটির সরল ব্যাখ্যা স্বামী তুুরিয়ানন্দজী তার শরীর ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে করছিলেন " ব্রহ্ম সত্য, জগত সত্য, সত্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত "।

এই  সন্মিলিত  দর্শনই সবরকম বাক-বিতন্ডার অবসান ঘটিয়ে  ' রামকৃষ্ণ ছাঁচ ' কে জনজীবনে উপস্থিত করেছে। "তিনি নি:সন্দেহে অদ্বৈত" মা ঠাকরুনের কথা। কিন্ত অপূর্ব মহিমায় , মেধায়,  প্রঞ্জায় তিনি অদ্বৈতকে ধরেই সব মত পথকে সত্য বলে শ্্র্রদ্ধা   করেন এবং প্রকাশ করেন।  এত Freedom  বা স্বাধীনতা তিনি ছাাড়া আর কোনো অবতার বা ধর্মগুরু দেননি।  গ্রহনশীলতা , সহনশীলতা এভাবেই আসে। তিিিনন যথার্থই Universal, সবার জন্য এসেছেেন। তিনি না এলে অদৈত্বববেদান্ত জনজীবন শুধু নয়, পঠন পাাাঠনঠও বন্ধ হয়ে যেত। বিদ্যাসাগর মশায়   এবশ্রং ব্রাহ্মরা এ বিষয়ে অগ্রনী ভূূূূূমিকা নিয়েছিলেন।  সবার আধ্যাত্মিক জীবন গতিশীল হয়েছে তারই জন্য।  অথচ তিনি তো মা-কে নিয়ে সুখেই  ছিলেন।  সেই মা তাকে পাঠালেন অদৈত্ব সাধনের জন্য।  তার ফলও আমরা পেলাম।  তাঁর তিনটি প্রধান উপদেশই তো অদৈত্ব   নির্ভর।

প্রথম  :: ভাবমুখে থাক :: নির্দেশ পেলে অদৈত্ব সাধনের পর ভাবমুখে থাকার।  সমস্ত ভাবের উৎসমুখে থাকতে। সব ভাব জানা হবে শুধু নয়, তাঁর উৎসমুখ তিনিই।  প্রকাশ এবং অপ্রকাশের, ব্যক্ত এবং অব্যক্তের প্রান্তসীমায় (border) দাড়িয়ে সব জায়গার খবর নিচ্ছেন তিনি। বাইরে প্রকাশ নেই; প্রয়োজন হলে হবে। ভাবমুখে থাকার কথা আগে শোনা যায়নি। নূতন অবতার,  নূতন ভাবনা। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ------ Spiritual plane -এ ভাবমুখে থাকা।

দ্বিতীয় :: ধর্মক্ষেত্রে " যত মত তত পথ " অনুসরন করতে হবে। এ যুগের সাধন তাই। সব মতকে সন্মান জানানো , সব মতের প্রচারের ব্যবস্থা করা। নিন্দা কারও নয়। এটি আজকাল সর্বত্র সম্মানিত এবং অনুসৃত ধর্মনীতি। 

তৃতীয়া  ::  ' শিবঞ্জানে জীবসেবা ' শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যবহারিক ভূমিতে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এটিই আজকের সব ধর্মসম্প্রাদায়ের কাছে বহুমান্য নির্দেশিকা। 

স্বামীজির কাছে এই তিনটি উপদেশই মহার্ঘ্য। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের  এই সাধনুই তো স্বামীজির বানী। আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব অদৈত্ব সাধনা না করলে ঐ তিন ভাবনা থাকত না এবং স্বামীজির কাছে বিশ্ববাসীর জন্য আর কোনও বাণীও থাকত না। 



যৌবনকালে স্বামীজিও ব্রাহ্মসমাজের দলে ভিড়ে বেদান্তকে, মায়াবাদকে নিয়ে উপহাস করতেন।  সেই স্বামীজিকে বেদান্ত বুঝালন শ্রীরামকৃষ্ণদেবই। সে যুগে রামমোহন বলেছিলেন --- বেদান্ত জীবনবিমুখ (Life Negative)। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন --- বেদান্ত ভ্রান্তিদর্শন (Vedanta us a false Philosophy)। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচী থেকে অদ্বৈতসিদ্ধি পাঠ নিষিদ্ধ করেছিলেন । জগৎ মিথ্যা বলে যে দর্শন,  সে দর্শনকে নিয়ে আমরা কি করব? ____ এই ভাব ছিল তখন। এবার দেখাযাক শ্রীরামকৃষ্ণদেব কি বলেলেন। সব সাধনা শেষ করে তিনি গুরু তোতাপুরীজির অধীনে বেদান্ত সাধন করে নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যানে তিনদিন তিনরাত্রি মগ্ন  ছিলেন।  সত্যিই এ এক অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে এক বলিষ্ঠ ব্যাখ্যা দিলেন তিনি কলকাতার পন্ডিত এবং শিক্ষিত সমাজের কাছে। 

সেদিন অর্থাৎ ২৮শে নভেম্বর ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭টার পর,ভক্তদের নিয়ে মাথাঘষা গলিতে শ্রী জয়গোপাল সেনের বাড়িতে গেলেন। জয়গোপাল প্রাচীন ব্রাহ্ম এবং ঠাকুরের একজন বিশিষ্ট ব্রাহ্মভক্ত। সেখানে শিক্ষিত ভক্তদের মেলা। জয়গোপালের ভাই  বৈকুণ্ঠ আরম্ভ করলেন --- আমরা সংসারী লোক, আমাদের কিছু বলুন।  শ্রীরামকৃষ্ণদেব বললেন --- তাকে জেনে, একহাত ঈশ্বরের পাদপদ্মে রেখে আর এক হাতে সংসারের কাজকর্ম কর। ব্রাহ্মসংস্কারে আঘাত লেগেছে বৈকুণ্ঠের। তিনি প্রতিপ্রশ্ন করলেন --- মাহাশয়, সংসার কি মিথ্যা ? এ প্রশ্নটাই তো বেদান্ত তত্ত্বে প্রবেশের ছাড়পত্র।  শ্রীরামকৃষ্ণদেব মাত্র একটি ছোট কথায় এর এক অপূর্ব উত্তর দিলেন --- যতক্ষণ তাকে না জানা যায়, ততক্ষণ মিথ্যা।  এমন উত্তর শুনে পন্ডিতরাও হতভম্ব হয়ে যাবেন।  " সংসার মিথ্যা " ____ একথা প্রমাণের জন্যই তো এসেছে মায়াবাদ। শ্রীরামকৃষ্ণদেব বোঝালেন এইভাবে--- যতক্ষণ ঈশ্বর কে জানা হয়নি ততক্ষণ এই সংসার মিথ্যা ; জানা হলে এ সংসারও সত্য।  আরও বললেন __ 'তাকে ভূলে মানুষ  "আমার আমার করে"। এটাই তো মায়া।  আমার তো কোনটাই নয়। বাড়ি বাবা করে দিয়ে গেছেন , এই শরীরটাও তাঁর দেওয়া। "আমি" চলে গেলে দেহটাও পড়ে থাকে। এরপর আরও সহজ ভাবে বোঝালেন।  "তোমরা তো নিজে নিজে দেখছ সংসার অনিত্য   এই দেখ না কেন? কত লোক এল কত লোক গেল। কত জন্মালো, কত দেহত্যাগ করলে ! সংসার এই আছে, এই নেই।  অনিত্য! যাদের এত "আমার আমার " করছ, চোখ বুজলেই নাই।  কেউ নাই।  তবু নাতির জন্য কাশী যাওয়া  হয় না। আমার হারুর কি হবে? এরূপ সংসার মিথ্যা , অনিত্য।  "  মায়াতত্ত্ব এভাবেই কি সহজ হয়ে গেল।


স্বামীজি যে বৈদান্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন যথা বৈদান্তিক স্বাধীনতা (Freedom) , বৈদান্তিক সাম্য (Equity) এবং বৈদান্তিক সৌভ্রাতৃত্ব (Frternity)  তা তো এই  অদৈত্বভাবনার কবিত্বময় উপস্থাপনা। সর্বভূতে তিনি আছেন জেনে সবাইকে ভালবাসা এবং সবার সুখের দু:খের ভাগী হওয়া।  স্বার্থ ত্যাগের মাধ্যমে শিব সেবা -- ভালোবেসে সেবা। কর্মফলের কথা পরে ভাবা যাবে। এখন নিষ্কারন সেবা।  শুধু কারন একটাই------ মানুষ সেবা পেতে চায়। কারণ তার প্রয়োজন আছে। সুতরাং শ্রীরামকৃষ্ণদেবর অদৈত্ব সাধনার ফল আমাদের সমাজে নানাভাবে চর্চিত, অর্পিত, ফলিত হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবর  নির্মিত আচ্ছাদন তলে আমরা আজ নিশ্চিন্তে বসবাস করছি। তাঁকে সহস্রকোটি প্রনাম। 

 "সংসার অসার বলে বোধ হবে না। যে তাকে জেনেছে , সে দেখে যে জীবজগৎ সে তিনিই হয়েছে। ছেলেদের খাওয়াবে , যেন গোপালকে খাওয়াচ্ছ। পিতামাতাকে ঈশ্বর ঈশ্বরী রূপে দেখবে ও সেবা করবে। তাকে জেনে সংসার করলে বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ঐহিক সম্পর্ক থাকে না। দুজনেই ভক্ত,  ঈশ্বরের কথা কয়, ভক্তের সেবা করে। সর্বভূতে তিনি আছেন,  তার সেবা দুজনে করে।" সর্বভূতে তিনি আছেন  ----- এ অদ্বৈতের কথা। সেজন্য সবকিছুই নিতে হবে, কিছু ছাড়া চলবে না। অন্যত্র বলছেন ____ বেল ওজন করার কথা। বেলের খোসা, বিচি, শাঁস সব নিয়ে বেলের ওজন হয়। শুধু শাস নিলে বেলের ওজন কম পরে। দেখে মনে হবে এটি বৈশিষ্টাদ্বৈতবাদের মত। কিন্ত আসলে তা নয়। অদৈত্বের একাত্ব ঞ্জান উপলব্ধির পর জগৎকে যেমন দেখা যায় ---- অর্থাৎ যেন চৈতন্যে জরে রয়েছে ---- সেই ঞ্জান।  এর নাম তিনি দিয়েছেন  ___ বিঞ্জান।  ঞ্জানী আর  বিঞ্জানী , ঞ্জানী একত্ব অনুভব করছেন; বিঞ্জানী আবার নেমে এসে জগৎকে চৈতন্যময় দেখছেন।  অবঞ্জা করে অনিত্য অসার বলছেন না। সর্বোপরি , এই জগতের ক্ষুধা, তৃষ্ণা,  ভালোমন্দের , সুখ দুঃখের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করছেন।  উদ্দেশ্য -- জগতের কল্যাণ করা। 


সাধক আত্মঞ্জান লাভ করার পর জগৎটাকে মিথ্যা বলে ঘোষনা করে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব শোনালেন নতুন বেদ ---- আত্মঞ্জান লাভ করলেই সংসারকেও সত্য বলে বোধ হবে। ভক্তদের কারনটিও বোঝালেন। 


শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে কে " পরমহংস "বলা হয় কেন এবং নামটি কে দিয়েছিলো  ??

পরমহংস হচ্ছে বৈদিক বা বৈদান্তিক অভিধা। চারপাশে যে চরটি মহাকাব্য আছে তা হল [১] প্রঞ্জানং ব্রহ্ম  (ঋকবেদ) [২] তত্বমসি (সামবেদ) [৩] অহংকার ব্রহ্মাস্মি (যজুর্বেদ) [৪] অ্যালার্ম ব্রহ্ম  (অথর্ব বেদ)। ঞ্জান মার্গে যাঁরা  সাধনা করেন , তারা এই  মন্ত্র গুলির যেকোনো একটি নিয়ে অনুশীলন করেন। এবার সাধনার স্তর অনুযায়ী সাধকদের চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমে বহুদক -- যিনি তীর্থ তীর্থ ঘুরে বেড়িয়েছেন বা বহু জায়গায় উদক বা জল পান করেছেন।দ্বিতীয় কুটিচক  -- যিনি সাধনকুটিরে একাকী সাধনা করছেন। তৃতীয় হংস -- যিনি "সোহহং" মন্ত্রের অর্থ সবিকল্প সমাধানের বোধ করছেন। আর চতুর্থ পরমহংস ---- যিনি নির্বিকল্প সমাধিতে ব্রহ্ম সাক্ষাৎ করেছেন এবং সেখান থেকে ফিরে এসে লোকশিক্ষার জন্য  আচার্যের ভূমিকা পালন করে চলেছেন।রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব  ছাড়াও আরও তিনজন পরমহংসের সঙ্গে বাঙালী হিন্দুর পরিচয় আছে। এনারা হলেন শ্রীমৎ  দুর্গাপ্রসন্ন  পরমহংস, শ্রীমৎ নিগমানন্দ পরমহংস ও শ্রীমৎ  পরমহংস যোগানন্দ।

গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের রামকৃষ্ণ নাম দেন বা জনপ্রিয় করেন মথুরনাথ বিশ্বাস বা রাণী রাসমণির মেজ জামাই। আর পরমহংস উপাধি কে দিয়েছিলেন সঠিক তা জানা যায় না। তবে খুব সম্ভবত শ্রীমৎ তোতাপুরীর কইছে বৈদান্তিক মতে সাধনা করেই তিনি এই উপাধি লাভ করেন।  মায়ের আড়ালে পঞ্চবটি বনে সাধনকুটিরে শাস্ত্রমতে সন্ন্যাস নিয়ে তিনি এই সাধনা করেছিলেন। আর সন্ন্যাস গ্রহনকালে নূতন নামকরন হয় ই। যেমন শ্রীমৎ কেশব ভারতী সন্ন্যাস দেওয়ার সময় শ্রী বিশ্বম্ভর মিশ্র ওরফে নিমাই এর নামকরন করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য।  সুতরাং তোতাপুরীর ই এই  নাম দেওয়ার সম্ভবনা বেশি।