আধ্যাত্মিক পুরুষেরা সাধারণত জগৎকে ঘৃণা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণ সকলকে মায়ের নামে ডাকছেন। আর নবদর্শন প্রতিষ্ঠা করছেন::" শিবঞ্জানে জীব সেবা"। জীব মাত্রই শিব---- এই ঞ্জানে নূতন পথের উদয় হলো ---- যার লখ্য সকলকে ঈশ্বর ঞ্জানে সেবা করা,যাতে ঈশ্বরতত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় জীবনে। এই পথের দিশারী শ্রীরামকৃষ্ণ। প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ সেই পথটির উদ্বোধন করেছিলেন ১৮৯৭ সালের ১ লা মে, কলকাতার বলরাম মন্দিরে।
সেবাযোগ ___ জীবের সেবা___ শিবত্বের সাথে যুক্ত হবার জন্য। এটিই "রামকৃষ্ণ ছাঁচ" বা ' Ramkrishna Mould' । এর পিছনে যে তত্ত্ববটিট আছে সেটি অদৈত্বববেদান্ত জাাত কিন্ত দ্বৈতভাব সমন্বিত। স্বামীজিও কট্টর অদ্বৈতী ছিলেন কিন্ত তাার অদ্বৈতবেদান্তের মধ্যে একমাত্র দ্ববৈত সংস্কার হলো শিবঞ্জানে জীব সেবা। এ ভাবটির সরল ব্যাখ্যা স্বামী তুুরিয়ানন্দজী তার শরীর ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে করছিলেন " ব্রহ্ম সত্য, জগত সত্য, সত্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত "।
এই সন্মিলিত দর্শনই সবরকম বাক-বিতন্ডার অবসান ঘটিয়ে ' রামকৃষ্ণ ছাঁচ ' কে জনজীবনে উপস্থিত করেছে। "তিনি নি:সন্দেহে অদ্বৈত" মা ঠাকরুনের কথা। কিন্ত অপূর্ব মহিমায় , মেধায়, প্রঞ্জায় তিনি অদ্বৈতকে ধরেই সব মত পথকে সত্য বলে শ্্র্রদ্ধা করেন এবং প্রকাশ করেন। এত Freedom বা স্বাধীনতা তিনি ছাাড়া আর কোনো অবতার বা ধর্মগুরু দেননি। গ্রহনশীলতা , সহনশীলতা এভাবেই আসে। তিিিনন যথার্থই Universal, সবার জন্য এসেছেেন। তিনি না এলে অদৈত্বববেদান্ত জনজীবন শুধু নয়, পঠন পাাাঠনঠও বন্ধ হয়ে যেত। বিদ্যাসাগর মশায় এবশ্রং ব্রাহ্মরা এ বিষয়ে অগ্রনী ভূূূূূমিকা নিয়েছিলেন। সবার আধ্যাত্মিক জীবন গতিশীল হয়েছে তারই জন্য। অথচ তিনি তো মা-কে নিয়ে সুখেই ছিলেন। সেই মা তাকে পাঠালেন অদৈত্ব সাধনের জন্য। তার ফলও আমরা পেলাম। তাঁর তিনটি প্রধান উপদেশই তো অদৈত্ব নির্ভর।
প্রথম :: ভাবমুখে থাক :: নির্দেশ পেলে অদৈত্ব সাধনের পর ভাবমুখে থাকার। সমস্ত ভাবের উৎসমুখে থাকতে। সব ভাব জানা হবে শুধু নয়, তাঁর উৎসমুখ তিনিই। প্রকাশ এবং অপ্রকাশের, ব্যক্ত এবং অব্যক্তের প্রান্তসীমায় (border) দাড়িয়ে সব জায়গার খবর নিচ্ছেন তিনি। বাইরে প্রকাশ নেই; প্রয়োজন হলে হবে। ভাবমুখে থাকার কথা আগে শোনা যায়নি। নূতন অবতার, নূতন ভাবনা। আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে ------ Spiritual plane -এ ভাবমুখে থাকা।
দ্বিতীয় :: ধর্মক্ষেত্রে " যত মত তত পথ " অনুসরন করতে হবে। এ যুগের সাধন তাই। সব মতকে সন্মান জানানো , সব মতের প্রচারের ব্যবস্থা করা। নিন্দা কারও নয়। এটি আজকাল সর্বত্র সম্মানিত এবং অনুসৃত ধর্মনীতি।
তৃতীয়া :: ' শিবঞ্জানে জীবসেবা ' শ্রীরামকৃষ্ণের ব্যবহারিক ভূমিতে থাকার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। এটিই আজকের সব ধর্মসম্প্রাদায়ের কাছে বহুমান্য নির্দেশিকা।
স্বামীজির কাছে এই তিনটি উপদেশই মহার্ঘ্য। শ্রীরামকৃষ্ণদেবের এই সাধনুই তো স্বামীজির বানী। আর শ্রীরামকৃষ্ণদেব অদৈত্ব সাধনা না করলে ঐ তিন ভাবনা থাকত না এবং স্বামীজির কাছে বিশ্ববাসীর জন্য আর কোনও বাণীও থাকত না।
যৌবনকালে স্বামীজিও ব্রাহ্মসমাজের দলে ভিড়ে বেদান্তকে, মায়াবাদকে নিয়ে উপহাস করতেন। সেই স্বামীজিকে বেদান্ত বুঝালন শ্রীরামকৃষ্ণদেবই। সে যুগে রামমোহন বলেছিলেন --- বেদান্ত জীবনবিমুখ (Life Negative)। বিদ্যাসাগর বলেছিলেন --- বেদান্ত ভ্রান্তিদর্শন (Vedanta us a false Philosophy)। উচ্চশিক্ষার পাঠ্যসূচী থেকে অদ্বৈতসিদ্ধি পাঠ নিষিদ্ধ করেছিলেন । জগৎ মিথ্যা বলে যে দর্শন, সে দর্শনকে নিয়ে আমরা কি করব? ____ এই ভাব ছিল তখন। এবার দেখাযাক শ্রীরামকৃষ্ণদেব কি বলেলেন। সব সাধনা শেষ করে তিনি গুরু তোতাপুরীজির অধীনে বেদান্ত সাধন করে নির্বিশেষ ব্রহ্মের ধ্যানে তিনদিন তিনরাত্রি মগ্ন ছিলেন। সত্যিই এ এক অসাধ্য সাধন করেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে এক বলিষ্ঠ ব্যাখ্যা দিলেন তিনি কলকাতার পন্ডিত এবং শিক্ষিত সমাজের কাছে।
স্বামীজি যে বৈদান্তিক সমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন যথা বৈদান্তিক স্বাধীনতা (Freedom) , বৈদান্তিক সাম্য (Equity) এবং বৈদান্তিক সৌভ্রাতৃত্ব (Frternity) তা তো এই অদৈত্বভাবনার কবিত্বময় উপস্থাপনা। সর্বভূতে তিনি আছেন জেনে সবাইকে ভালবাসা এবং সবার সুখের দু:খের ভাগী হওয়া। স্বার্থ ত্যাগের মাধ্যমে শিব সেবা -- ভালোবেসে সেবা। কর্মফলের কথা পরে ভাবা যাবে। এখন নিষ্কারন সেবা। শুধু কারন একটাই------ মানুষ সেবা পেতে চায়। কারণ তার প্রয়োজন আছে। সুতরাং শ্রীরামকৃষ্ণদেবর অদৈত্ব সাধনার ফল আমাদের সমাজে নানাভাবে চর্চিত, অর্পিত, ফলিত হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবর নির্মিত আচ্ছাদন তলে আমরা আজ নিশ্চিন্তে বসবাস করছি। তাঁকে সহস্রকোটি প্রনাম।
"সংসার অসার বলে বোধ হবে না। যে তাকে জেনেছে , সে দেখে যে জীবজগৎ সে তিনিই হয়েছে। ছেলেদের খাওয়াবে , যেন গোপালকে খাওয়াচ্ছ। পিতামাতাকে ঈশ্বর ঈশ্বরী রূপে দেখবে ও সেবা করবে। তাকে জেনে সংসার করলে বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে প্রায় ঐহিক সম্পর্ক থাকে না। দুজনেই ভক্ত, ঈশ্বরের কথা কয়, ভক্তের সেবা করে। সর্বভূতে তিনি আছেন, তার সেবা দুজনে করে।" সর্বভূতে তিনি আছেন ----- এ অদ্বৈতের কথা। সেজন্য সবকিছুই নিতে হবে, কিছু ছাড়া চলবে না। অন্যত্র বলছেন ____ বেল ওজন করার কথা। বেলের খোসা, বিচি, শাঁস সব নিয়ে বেলের ওজন হয়। শুধু শাস নিলে বেলের ওজন কম পরে। দেখে মনে হবে এটি বৈশিষ্টাদ্বৈতবাদের মত। কিন্ত আসলে তা নয়। অদৈত্বের একাত্ব ঞ্জান উপলব্ধির পর জগৎকে যেমন দেখা যায় ---- অর্থাৎ যেন চৈতন্যে জরে রয়েছে ---- সেই ঞ্জান। এর নাম তিনি দিয়েছেন ___ বিঞ্জান। ঞ্জানী আর বিঞ্জানী , ঞ্জানী একত্ব অনুভব করছেন; বিঞ্জানী আবার নেমে এসে জগৎকে চৈতন্যময় দেখছেন। অবঞ্জা করে অনিত্য অসার বলছেন না। সর্বোপরি , এই জগতের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ভালোমন্দের , সুখ দুঃখের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করছেন। উদ্দেশ্য -- জগতের কল্যাণ করা।
সাধক আত্মঞ্জান লাভ করার পর জগৎটাকে মিথ্যা বলে ঘোষনা করে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব শোনালেন নতুন বেদ ---- আত্মঞ্জান লাভ করলেই সংসারকেও সত্য বলে বোধ হবে। ভক্তদের কারনটিও বোঝালেন।
শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে কে " পরমহংস "বলা হয় কেন এবং নামটি কে দিয়েছিলো ??
পরমহংস হচ্ছে বৈদিক বা বৈদান্তিক অভিধা। চারপাশে যে চরটি মহাকাব্য আছে তা হল [১] প্রঞ্জানং ব্রহ্ম (ঋকবেদ) [২] তত্বমসি (সামবেদ) [৩] অহংকার ব্রহ্মাস্মি (যজুর্বেদ) [৪] অ্যালার্ম ব্রহ্ম (অথর্ব বেদ)। ঞ্জান মার্গে যাঁরা সাধনা করেন , তারা এই মন্ত্র গুলির যেকোনো একটি নিয়ে অনুশীলন করেন। এবার সাধনার স্তর অনুযায়ী সাধকদের চারটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথমে বহুদক -- যিনি তীর্থ তীর্থ ঘুরে বেড়িয়েছেন বা বহু জায়গায় উদক বা জল পান করেছেন।দ্বিতীয় কুটিচক -- যিনি সাধনকুটিরে একাকী সাধনা করছেন। তৃতীয় হংস -- যিনি "সোহহং" মন্ত্রের অর্থ সবিকল্প সমাধানের বোধ করছেন। আর চতুর্থ পরমহংস ---- যিনি নির্বিকল্প সমাধিতে ব্রহ্ম সাক্ষাৎ করেছেন এবং সেখান থেকে ফিরে এসে লোকশিক্ষার জন্য আচার্যের ভূমিকা পালন করে চলেছেন।রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব ছাড়াও আরও তিনজন পরমহংসের সঙ্গে বাঙালী হিন্দুর পরিচয় আছে। এনারা হলেন শ্রীমৎ দুর্গাপ্রসন্ন পরমহংস, শ্রীমৎ নিগমানন্দ পরমহংস ও শ্রীমৎ পরমহংস যোগানন্দ।
গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের রামকৃষ্ণ নাম দেন বা জনপ্রিয় করেন মথুরনাথ বিশ্বাস বা রাণী রাসমণির মেজ জামাই। আর পরমহংস উপাধি কে দিয়েছিলেন সঠিক তা জানা যায় না। তবে খুব সম্ভবত শ্রীমৎ তোতাপুরীর কইছে বৈদান্তিক মতে সাধনা করেই তিনি এই উপাধি লাভ করেন। মায়ের আড়ালে পঞ্চবটি বনে সাধনকুটিরে শাস্ত্রমতে সন্ন্যাস নিয়ে তিনি এই সাধনা করেছিলেন। আর সন্ন্যাস গ্রহনকালে নূতন নামকরন হয় ই। যেমন শ্রীমৎ কেশব ভারতী সন্ন্যাস দেওয়ার সময় শ্রী বিশ্বম্ভর মিশ্র ওরফে নিমাই এর নামকরন করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য। সুতরাং তোতাপুরীর ই এই নাম দেওয়ার সম্ভবনা বেশি।


No comments:
Post a Comment