Saturday, 24 September 2022

স্বামীজির কথা

 


#ব্রজেশ্বরীর_লীলা_ধন্য_স্বামীজী_


১৮৮২ খ্রীষ্টাব্দ ১২ ই আগস্ট স্বামী আসেন বৃন্দাবনে। বৃন্দাবনের দর্শনীয় স্থান দর্শন করার পরে গিরিগোবর্ধন পরিক্রমা  করে  স্বামী উপস্থিত হোন  রাধাকুন্ডের তীরে। রাধারানীর জন্য চিকন করা কুন্ড তন্ময়ত্ত দর্শন করেন বেশ কিছুক্ষণ, তারপর কুন্ডকে প্রণাম শুধুমাত্র কৌপিন পড়ে কুন্ডে নামেন।  বহির্বাস কুন্ডের তীরে রাখা উচিত। কুন্ডের জলে স্নান সেরে যখন বহির্বাস পরিধান  হবে সেই সময়ে স্বামীজী বুঝলেন এ বান্দরের কাজ, তিনি যখন স্নান করছিলেন সেই সুযোগে বান্দরের দল তাঁর বহির্বাস নিয়ে গেছে। শুধুমাত্র কৌপিন পড়ে কুন্ডেরে আছেন। এই বন্ধ কুন্ডের তীরের হাতে তুলে ধরেছেন, সহসা তাঁর কাছে এসেছেন এক ব্রজবধু।    ব্রজবধুর হাতে থালা, পাত্রটিতে    আছে কিছু ফল আর গৈরিক বস্ত্র।আশেপাশে কেউ নেই, নির্জন স্থান। স্বামীজীর খুব অভিমান হল রাধারানীর উপর। স্বামীজী মনে মনে ঠিক আছে, বাঁদরে যখন বহির্বাস নিয়ে গেছে তখন এই কৌপিন পড়ে তিনি এগোবেন।ব্রজবধু ঘোমটার আড়াল থেকে খুব মিস্টিভাবে বললেন, "সাধু,  বাড়িতে আজ সাধু সেবা ।  বাবা , আমরা অনেক সাধুকে বস্ত্র, ফলদান করেছি, তাই বেচে ছিল ।  রাস্তায়  যদি কোনো সাধুকে পাই সব দিয়ে দেবো । এই জিনিসটা আমরা ব্যবহার করতে পারি না,তাই আপনি নিন"। এই ব্রজবধু স্বামীজীকে ফল বস্ত্র দিয়েছিল । স্বামীজীর    উত্তর কুন্ডে মোহাবিষ্টের ন্যায়। । জনমানবহীন এই জায়গায় কোথা থেকে এলেন এই ব্রজবধু ?কিছুক্ষণ পর চাক ভাঙ্গলে তিনি দেখতে যেতে চান চারিদিক জনমানবহীন এই স্থানে  কোথা থেকে  এলেন এই ব্রজবধু? 

কৃপাময় কৃপার কথা তাঁর দুই ভাবীর মনে জলে ভরে এল, গড়াগড়ি দিতে লাগলেন কুন্ডের ধারে।

জয় রাধা রাধা 🙏🙏


*"স্বামীজীর বাঘা"*


     বাঘাজী স্বামীর পোষা। একবার বেলুড়মঠে স্বামীজীর পোষা একটি হরিণকে কামড়ে তাড়া করে। সেই অপরাধে বাঘা তার মনিবের নির্দেশে মঠের সাধু গণের দ্বারা গঙ্গার পরপারে বরাহনগরে নির্বাসিত হয়। কিন্তু সেই দিনই রাত্রিতে সে গঙ্গা  দিয়ে ফিরে আসে এবং আরও পরে প্রত্যূষে স্বামীজী শয্যা উল্টা করে আসা মাত্রই তাঁর মাথা ঘষে । মনে হয়, স্বামীজী তার অপরাধ ক্ষমা করে বললেন --- "যা বেটা, তোর সাত খুন মাপ।"

      বাঘার কর্মকলাপ,  মঠের অনুমান, পূর্ব জন্মদান করতে সে সতর্কতা ঠাকুরের ভক্ত ছিল এবং বিশেষভাবে অপরাধে এই জন্মে সে সন্ত্রাস জন্মেছে। বেলুড়  এর উপর মিউনিসিপ্যাল ​​ট্যাক্সট মাঠে মূল আলোচনার সূত্রপাত হয়, সেই সময়েই  স্বয়ং ইনস্পেক্টার  সক্রিয়তা সত্যবাঘা তার মাঠ থেকে পথ দেখিয়ে স্বামীজীর কাছে আসে। ম্যাজিস্ট্রেট নোট দেন "কুকুরটি আমাকে পথ দেখিয়েছে তাই এটি একটি মঠ হতে হবে।" বলাবাহুল্য এর ফলে টেক্সটা মুকুব যায়।

     স্বামীজীর দেহ রাখার  পর বাঘা প্রায় পাগল হয়ে যায় এবং ফলে অসুখে মারা যায়।  তাকে গঙ্গায় দেওয়া হয়। পরের দিন স্বামী সারদানন্দজী কলকাতা থেকে নৌকোয় মঠে আসবার সময়  বাঘার মৃতদেহ ভাঁসতে দেখেন। ভেসে আসা মঠের ঘাটে আটকে আছে। তখন তাঁর ওকে মঠের প্রাঙ্গণে কথার নির্দেশে , বর্তমান চন্দন গাছের সমাহিত করা হয়।

 এই স্বামী   সারদানন্দজী  সাধুদের বললেন, "স্বামীজী   বলেছেন,    বাঘা চিরকালই মঠে থাকবে। ওকে গঙ্গায় কে দিয়েছ?"

     

***********************


খ্রীস্টানদের_চার্চে_বিবেকনন্দ


শিরোনাম বই মনে হচ্ছে খুব তাই না। হ্যাঁ, শ্রদ্ধা তোমাই কথা। খ্রীষ্টানদের ধর্মীয় উপাসনালয়ে হিন্দুধর্মের বীর সন্ন্যসী স্বামী বিবেকান্দের ছবি!!! 

আমেরিকার অ্যানিসকুয়াম চার্চ, ওয়াশিংটন এ গত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ এ স্বামীরজী জীবনদর্শনের উপরে আলোকপাত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেদান্ত সোসাইটি অফ প্রভিডেন্স, অ্যাঞ্জেল সেন্ট ইউএসএ এর পুজনীয় মহারাজজি। 
















$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$$


জয়তু স্বামী। 

       "ভগবদ্গীতাকার বলিয়াছেন, "অযত মনই আমাদের দল। যে মন - সংযত, তা আমাদের বন্ধুর মতো কাজ করে থাকে"।

    তাই , সে সম্পর্কে , আমাদের আবিস্কৃত অবস্থা চাই। আমরা কি মনকে করে গড়িয়া তুলিতে পারি, যাহাতে সে আমাদের বশে থাকে এবং আমাদের সহিত এমন করে?  

আমাদের ব্যক্তিত্ব বিকাশের সহিত মনকে নিয়ন্ত্রণ করার সম্পর্ক কি?  


   মানবমনের চারটি প্রধান কর্ম- 

১] স্মৃতি   

২ ] বিচার ও ভাবনা 

৩] মান ও সিদ্ধান্ত - এবং গ্রহণ 

 ৪ ] "আমি" -র চেতনা। 


                 ১]ঃ স্মৃতি যেখানে আমাদের চিন্তিত অভিজ্ঞতাগুলি সুক্ষ্ম উচ্চারণে সঞ্চয় হয় সেই স্মৃতি ভান্ডারে "উত্তর" বলা হয়। ভাল, মন্দ চিন্তা বা কাজ আমরা দৃশ্য, সেসব কিছুরই ছাপ (ইমপ্রেশন) সেখানে মজুত থাকে। এই ইম্প্রেশনগুলি সমষ্টিই আমাদের চরিত্রের চরিত্রের হয়। এই যে "চিত্ত উল্টো", তাকে আবার অবচেতন মনও বলা হয়।      

              

                  ২ ] বিচার ও ভাবনাঃ অনিশ্চিত মনে পছন্দে পছন্দ- অপছন্দের বিকল্প উপস্থিতি এবং মন বিচারের বিচারের বিচার। মনের এই যে বিচার ক্ষমতা ,তাহাকে "মনস্"বলা হয়। কল্পনা ও গান শক্তি - সেও এই "মনস্"-এর কাজ।  

               

       ৩ ) মান ও সিদ্ধান্ত - গ্রহণঃ - জ্ঞান নিশ্চয়তা । বুদ্ধি করলে মনের সেই শক্তি যাহার দ্বারা করা হয়। মানসিক বিষয়ের খুঁটিনাটি বিচার করিবার পর " বুদ্ধি " বলিয়া দেয় কোনটি আরও কাম্য । বুদ্ধি হইল সেই শক্তি, যাহার দ্বারা সে সত্যও মনে করে, নিত্য ও অনিত্য, কোণ্টি করণীয় এবং কোন বর্জনীয়, কোনটি নৈতিক বিচার দূরিয়া ঠিক এবং কোন টি ভূল ,তা করিবার শক্তি দেয়। এইটি আমাদের ইচ্ছাশক্তিরও আধার, যে-ইচ্ছাশক্তি ব্যক্তিত্ব গঠনের জন্য একান্ত প্রয়োজন। সেই কারণেই আমাদের মনে হয়

"আমি" - আমরা বলিয়া   চেচায়। 

" আমি খাচ্ছি " , " আমি দেখছি " , " আমি দু'জন " , 

"আমি শুনছি", "আমি ভাবছি", "আমি বিভ্রান্ত" ;

এই যে দিনরাত "আমি" "আমি" , বাধা সবই ।

দৈহিক ও মানবিক কর্ম  নিজের উপর আরোপ করা , এইটির নাম "অহংকার" অথবা "আমিত্ববোধ"। যতক্ষণ এই "আমি" নিজেকে  অসংযত দেহর সহিত অভিন্ন মনে হয় এবং মনে হয়, অবিলম্বে জাগতিকও পরিস্থিতির দাস; তাদের দ্বারাই সে নিয়ন্ত্রিত হয়।


আনন্দদায়ক ঘটিলে তখন আমরা সুখী, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি আসিলেই    দুঃখে সুখিয়া পড়ি। মন যতই সুক্ষ্ম ও সংযত হয়, কাছেই আমরা করতে পারি আমি বুঝতে পারি উৎসটি কি। সেই অনুপাতে আমরা আমাদের সৌন্দর্য আরও বেশি সুরুংখল ও নিরুদ্বিগ্ন হতে পারি। এমন একজন ব্যক্তি হন না এবং অবস্থার দ্বারা না হন৷ 

               মনস্, বুদ্ধি, চিত্ত ও অহংকার, মনের এই যে চারিটি পাশে বা পর্যায় ,এগুলি কিন্তু পৃথক পৃথক নয় ; একই মন, শুধু আলাদা আলাদা আলাদা আলাদা প্রকাশক ডাকা হয় , এই যা" । 

%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%$%


স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, যতক্ষণ না তুমি ঈশ্বরকে অনুভব করছ, ততক্ষণ ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করো না। অর্থাৎ, ঈশ্বর বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব যদি থাকে, তবে আমাকে তাঁকে অনুভব করতে হবে। শুধুমাত্র অপরের কথায় চোখ বন্ধ করে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করা অনুচিত। বিজ্ঞান যেমন প্রমাণ সাপেক্ষ, আধ‍্যাত্মিকতাও তেমনই প্রমাণ সাপেক্ষ। স্বামী বিবেকানন্দ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি ঈশ্বরকে দেখেছেন? ঠাকুরও তৎক্ষণাৎ তাকে উত্তর দিয়েছিলেন, দেখেছি কি রে? তোকেও দেখাতে পারি।' নানক, কবীর, তুকারাম, মীরা, গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু এরা সকলেই ভগবানের দর্শন লাভ করেছিলেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমি তো ঈশ্বরকে দেখি নি। তাহলে আমি কিভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস করবো? বেদান্ত এর উত্তর দিয়েছে, বলেছে, তুমি নিজেকে খোঁজ। আমি কে? এর উত্তর যেদিন তুমি পাবে, তুমি বুঝবে, তৎত্বমসি। তুমিই সে।' বুঝবে, অহম্ ব্রহ্মাস্মি। আমিই সেই পরাৎপর ব্রহ্ম। উত্তরাখণ্ডের এক সাধু আমায় বলেছিলেন, ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ খুব সহজ। আমার অস্তিত্বই ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ।

■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤■♤

ভারতবাসীর উন্নতিসাধনে স্বামীজীর আধ্যাত্মিক চিন্তা   :☆☆☆☆

" আত্মানো মোখ্যার্থং জগদ্ধাত্রী চ " --- ভোগবাদী জীবন নয়, হাজারো ওঠাপড়ার মাঝে এই  আলোকময় অমৃতবানীই হবে ভারতের শিরদাঁড়া আর বৈদান্তিক অদ্বৈতঞ্জান হবে তার সুষূম্না ----------- স্বামী বিবেকানন্দের এই ছিল অনুভব। এ কথা আজ সর্বজনবিদিত যে ভারতবাসীদের তিনি উদ্বুদ্ধও করেছিলেন আত্মশ্রদ্ধার এই মন্ত্রেই। কিন্ত আত্মশ্রদ্ধার পাশাপাশি আর একটি স্তম্ভ রয়েছে____ সেটি হল বিবেকান্দের ডারতচেতনার সার " আত্মসমীক্ষা "। সময় ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির বিচারের নিজের নিয়মিত মূল্যায়ন করে ঔচিত্যবোধে কর্মক্ষম হওয়ার শিক্ষা এই দেশকে দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন তিনি।

তাঁর শাশ্বত ধর্মদর্শন ও আধ্যাত্মিকতার কথা যখন দেশবাসীর কাছে প্রচার করলেন,  তখন ভারতবাসী পরাভূত,  হীনম্মন্যতাগ্রস্ত। তাদের কাছে আধ্যাত্মিকতায় বলিয়ান হয়ে জগতের হিতসাধন ছিল দূর অস্ত। ভারত তখন দূর্বল,  পরমূখাপেক্ষী, নিজের উন্নতি থেকেই লক্ষ কোটি যোজন দূরে। কিন্ত বিবেকানন্দ নিজে তখন " হিন্দুধর্ম " এর স্বীকৃত প্রতিনিধি।এককথায় বলা যায় ভারতের সবেধন   নীলমণি " যুগ পুরুষ  "। সেইসময়ে চাইলে, আত্মশ্রদ্ধার মোড়োকে,  আচারসর্বস্ব ধর্মের নামে জনগনকে তাকিয়ে, আবেগ জর্জরিত এই দেশে সনাতন ঐতিহ্যের  ধ্বজাধারি  " গুরু " হয়ে থাকার সহজ পথেই বেছে নিতে পারত।




♦কর্মযোগের চরম গতি, উদ্দেশ্য, পূর্ণতা বা সিদ্ধ▼ 

যে ব্যক্তি নিজেকে বশীভূত করিয়াছে, বাহিরের কোন বস্তু তহার উপর ক্রিয়া করিতে পারে না, তাহাকে আর কাহারও দাসত্ব করিতে হয় না। তাহার মন মুক্ত। এরূপ ব্যক্তিই জগতে সুখে-স্বচ্ছন্দে বাস করিবার যোগ্য। আমরা সচরাচর দুই মতের মানুষ দেখিতে পাই। কেহ কেহ দুঃখবাদী-তাঁহারা বলেন, এ পৃথিবী কি ভয়ানক, কি অসৎ! অপর কতগুলি ব্যক্তি সুখবাদী-তাঁহারা বলেন, এই জগৎ কি সুন্দর, কি অপূর্ব! যাঁহারা নিজেদের মন জয় করেন নাই, তাঁহাদের পক্ষে এই জগৎ দুঃখে পূর্ণ, অথবা সুখদুঃখমিশ্রিত বলিয়া প্রতিভাত হয়। আমরা যখন আমাদের মনকে বশীভূত করিতে পারিব, তখন এই সংসার আবার সুখের বলিয়া মনে হইবে। তখন কোন কিছুই আমাদের মনে ভাল বা মন্দ ভাব উৎপন্ন করিতে পারিবে না। আমরা সবই বেশ যথাস্থানে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেখিতে পাইব। যাহারা প্রথমে সংসারকে নরককুন্ড বলিয়া মনে করে, তাহারাই আত্মসংযমে সমর্থ হইলে এই জগৎকে স্বর্গ বলিবে। আমরা যদি প্রকৃত কর্মযোগী হই এবং নিজদিগকে এই অবস্থায় লইয়া যাইবার জন্য শিক্ষিত করিতে ইচ্ছা করি, তবে আমরা যেখানেই আরম্ভ করি না কেন, পরিশেষে পূর্ণ আত্মত্যাগের অবস্থায় উপনীত হইবই; যখনই এই কল্পিত ‘অহং’ চলিয়া যায়, তখনই যে-জগৎ প্রথমে অমঙ্গলপূর্ণ বলিয়া মনে হয়, তাহা পরমানন্দে পূর্ণ এবং স্বর্গ বলিয়া বোধ হইবে। ইহার হাওয়া পর্যন্ত শান্তিতে পূর্ণ হইয়া যাইবে, প্রত্যেক মানুষের মুখচ্ছবি ভাল বলিয়া বোধ হইবে। ইহাই কর্মযোগের চরম গতি ও উদ্দেশ্য, এবং ইহাই কর্মজীবনে পূর্ণতা বা সিদ্ধ।


●□■♤♡◇♧●□■♤♡◇♧●□■♤♡◇♧●□■♤♡◇♧●□■♤♡


  #খাদ্যরসিক_বিবেকানন্দ#

তখন তিনি স্বামী বিবেকানন্দ হননি, শুধুই নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পড়াশোনা করছেন। পেটুক এবং খাদ্যরসিক বন্ধুদের নিয়ে পাড়ায় তৈরি করেছিলেন ‘পেটুক সঙ্ঘ’। বন্ধুদের কাছে স্বামীজি বলতেন, দেখবি একটা সময় আসবে যখন কলকাতার প্রত্যেক গলির মোড়ে মোড়ে পানের দোকানের মতো চপ-কাটলেটের দোকান হবে। স্বামীজির এই ভবিষ্যৎবাণী যে কতটা সত্যি হয়েছে, তা এখন আমাদের চারপাশ দেখলেই বোঝা যায়। চপ-কাটলেট-সিঙাড়া তাঁর খুব পছন্দের ছিল।


খাবার পাশাপাশি রান্না করতেও বেশ ভালোবাসতেন তিনি। মাংসের নানা পদ তিনি রান্না করতে পারতেন। শিকাগো যাত্রার আগে তৎকালীন বোম্বাইতে স্বামীজি ১৪ টাকা খরচ করে এক হাঁড়ি পোলাও রান্না করে শিষ্যদের খাইয়েছিলেন। নিজে হাতে রেঁধে নিবেদিতাকেও খাইয়েছিলেন। কলকাতার বিভিন্ন দোকানের চপ ও ফুলুরি তাঁর বিকেলের খাবার ছিল। স্বামীজি চপ ও কাটলেট খুব সুন্দর বানাতে পারতেন এবং তা বানিয়ে একাধিকবার তাঁর শিষ্যদেরও খাইয়েছেন। বেলুড় মঠে একবার স্বামীজি নাকি পেশাদার চপওয়ালাদের মতো চপ ও ফুলুরি বিক্রিও করেছিলেন। বিকেলবেলায় আলুর চপ, ফুলুরি আর মুড়ি না হলে স্বামীজির বিকেলের ভোজনটাই হত না। কড়া ঝালের চানাচুর তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল। তাঁর কাছে বেশিরভাগ সময়ই চানাচুরের প্যাকেট থাকত। তিনি যখনই একা থাকতেন শালপাতার ঠোঙা থেকে চানাচুর বার করে খেতেন এবং বালকের মতো আনন্দ পেতেন।


কাঁচালঙ্কা ছিল স্বামীজির পরম প্রিয়। একবার এক অবাঙালি সাধুর কাছে স্বামীজি সেই কথা স্বীকারও করে নিয়েছিলেন। সেই সাধুর সঙ্গে তিনি লঙ্কা খাওয়ার কম্পিটিশন করেছিলেন। স্বামীজি কম্পিটিশনে টপাটপ করে বেশ কয়েকটি লঙ্কা খেয়ে ফেললেন, অপর দিকে সেই সাধু মাত্র দু’টি লঙ্কা খেয়েই কাঁদো কাঁদো। বিদেশি সাহেবদের লঙ্কা খাওয়া শেখাতেন স্বামীজি। একবার লন্ডনে থাকাকালীন স্বামীজির লঙ্কা খেতে ইচ্ছা হয়। তখন বিলেতে লঙ্কা পাওয়া খুবই কঠিন। স্বামীজি অনেক খুঁজে এক দোকানদারের কাছ থেকে তিন শিলিংয়ের বিনিময়ে তিনটি কাঁচালঙ্কা কিনেছিলেন। ঝাল খাওয়া প্রসঙ্গে তাঁর ছোট ভাই মহেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, স্বামীজির অত্যন্ত প্রিয় ছিল তীব্র ঝাল। রামকৃষ্ণর মৃত্যুর পরে বরানগরে সাধনভজনের সময় প্রবল অনটন। দারিদ্র্য এমনই যে মুষ্টিভিক্ষা করে এনে তাই ফুটিয়ে একটা কাপড়ের ওপর ঢেলে দেওয়া হত। একটা বাটিতে থাকত নুন আর লঙ্কার জল। একটু ঝালজল মুখে দিয়ে এক এক গ্রাস ভাত উদরস্থ করা হত।

বিদেশে তিনি যেখানেই যেতেন নিজের কাছে রাখতেন ভারতীয় গুঁড়ো মশলা। একাধিকবার তিনি নানা বিদেশি অনুরাগীদের রান্না করে ভারতীয় খাবার খাওয়াতেন। বলাই বাহুল্য, তাঁর রান্নায় ঝালের আধিক্য ছিল খুবই বেশি। তাঁর রান্না খেয়ে ঝালের চোটে চোখে জল এসে যেত। স্বামীজির আমেরিকায় থাকাকালীন প্রাতঃরাশের তালিকা ছিল বেশ লম্বা। প্রথমেই খেতেন কমলালেবু এবং আঙুর। তার পর ডবল ডিমের পোচ সহযোগে দু’পিস টোস্ট। সব শেষে ক্রিম ও চিনি দিয়ে দু’কাপ কফি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে স্যুপ এবং মাংস বা মাছের সঙ্গে রাতের আহার সারতেন। ডেসার্ট হিসেবে মিষ্টি আর আইসক্রিম তো আবশ্যিক ছিল। খাওয়ার পর আবার জমিয়ে ধূমপানও করতেন।


স্বামীজির আমেরিকান শিষ্য এলিজাবেথ ডাচার তাঁকে একবার তাঁদের কটেজে আমন্ত্রণ জানান। নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় ৫৩০ কিলোমিটার দূরে সেন্ট লরেন্স নদীর তীরে ওয়েলেসলি দ্বীপে ছিল সেই কটেজ। ১৮৯৫ সালের ১৮ জুন দশজন শিষ্যকে নিয়ে কটেজে আসেন স্বামীজি। সেখানে প্রথমে দেন বক্তৃতা। তার পর শিষ্যদের জন্য রান্না করলেন বাঙালি খাবার। নিজেও খেলেন, খাওয়ালেন সকলকে।


               



মা চন্দ্রমণি দেবী --- রামকৃষ্ণ গর্ভধারিনী


হুগলি জেলার আরামবাগ থানা হইতে চারি ক্রোশ পশ্চিমে বর্ধমান হইতে প্রায় ষােলাে ক্রোশ দক্ষিণে কামারপুকুর গ্রাম অবস্থিত। তাহার পশ্চিমে দেড় ক্রোশ দূরে ‘দেরে’ নামক গ্রামে সত্যনিষ্ঠ ঋষিকল্প ও পরম ভক্ত ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় বাস করিতেন। তাঁহার পূতস্বভাবা পত্নী চন্দ্রমণি দেবী সরলতা ও করুণার প্রতিমূর্তি ছিলেন। সেই গ্রামের জমিদারের পক্ষে মােকদ্দমায় সাক্ষ্য দিতে অসম্মত হওয়ায় জমিদার তাহার উপর বিষম অত্যাচার করেন; পরিশেষে, সন ১২২০ সালে (১৮১৪ খ্রিঃ) স্বজন লইয়া ক্ষুদিরাম কামারপুকুরে আসিয়া বাস করেন। তখন তাঁহার বয়স ৩৯ বৎসর।

সন ১২৪১ সালে (১৮৩৫ খ্রিঃ) ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের ৺গয়াধামে অবস্থিতিকালে একদিন রাত্রিতে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন, যেন তাঁহাকে ৺গদাধর বলিলেন যে, তিনি তাঁহার পুত্ররূপে অবতীর্ণ হইবেন। ১২৪২ সালের বৈশাখে ক্ষুদিরাম কামারপুকুর বাটিতে প্রত্যাগমন করিয়া চন্দ্রমণি দেবীর মুখে শুনিলেন যে, একদিন তিনি বাটির সন্নিকটস্থ শিবমন্দিরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছেন, এমন সময় দেখিতে পাইলেন, ৺মহাদেবের শ্রীঅঙ্গ হইতে দিব্যজ্যোতিঃ বাহির হইয়া বায়ুর আকারে তাঁহার শরীরের ভিতর প্রবেশ করিল। ক্রমে ক্রমে চন্দ্রমণি দেবীর গর্ভলক্ষণসকল প্রকাশ পাইতে লাগিল। ১২৪২ সালের ৬ ফাণ্ডন, (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৬ খ্রিঃ) বুধবার, শুক্লা দ্বিতীয়ায় ব্রাহ্মমুহূর্তে চন্দ্রমনি দেবী এক পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন। ক্ষুদিরাম ৺গদাধরের নামানুসারে পুত্রের নাম ‘গদাধর’ রাখিলেন। রামকৃষ্ণ ঠাকুরের বংশানুক্রমিক নাম।



স্বামীজির কাছে যিনি " স্পিরিচুয়াল জায়েন্ট " , রোমাঁ রোলাঁর কাছে তারই জীবন এক অমৃতভান্ড। সেই অমৃতযোগ যিনি গর্ভে ধারণ করেছিলেন,  তিনিও তাঁর ব্রাত্ পুত্রের মতোই পূজনীয়া। তিনিই হলেন শ্রীরামকৃষ্ণজননী চন্দ্রমণি দেবী। শ্রীরামকৃষ্ণের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে যখন দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের আগমন ঘটছে, তখন তার জননী আর ইহলোকে ছিলেন না। কিন্ত বহু জনের মঙ্গলের জন্য রেখে গিয়েছিলেন পৃথিবীর এক অসীম আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন দার্শনিক এবং মানবপ্রেমী মহামানবকে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজের গর্ভধারিণী মাকে ভক্ত শিষ্যদের কাছে এই ভাবে তুলে ধরতেন ........ আমার মা মূর্তিমতি সরলতাস্বরুপা ছিলেন।  সংসারের কোনও বিষয় বুঝতেন না। টাকাপয়সা গুনতে জানতেন না। কারোকে কোনও বিষয় বলতে নেই,  তা না জানাতে নিজের পেটের কথা সকলের কাছে বলে ফেললন, সেজন্য লোকে তাকে "হাউরো" বলত এবং তিনি সকলকে খাওয়াতে বড় ভালবাসতেন। 

সরল,  মিষ্টভাষী,ভক্তিমতী চন্দ্রমণি ছিলেন সকলের প্রিয়, গৃহকর্মে নিপুণ এবং রান্নার সিদ্ধহস্ত। সে যুগে কামারপুকুরের পাশ দিয়ে ছিল পুরী যাওয়ার রাস্তা। গ্রামের পান্থশালায় আশ্রয় নেওয়া শ্রীক্ষেত্রযাত্রী সাধু, ভক্তদের রেঁধে খাইয়ে চন্দ্রমণি বড় আনন্দ পেতেন।ইংরেজি ১৭৯১ সালে হুগলির সরাটি-মায়াপুর গ্রামে চন্দ্রমণি দেবীর জন্ম। পিতা পন্ডিত নন্দকিশোর বন্দ্যোপাধ্যায় ও  মাতা হরবিলাসিনী দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড়। ডাকনাম ছিল চন্দ্রা। তিনি ছিলেন সুশ্রী,  স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘাঙ্গী। চন্দ্রমণির পিতৃকুলে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চর্চা ছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনিও তা পেয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র ভাই সুনামধন্য আয়ুর্বেদ চিকিৎসক কৃষ্ণমোহন। চন্দ্রমণিও অনেক রকম কবিরাজ ওষুধ ও পথ্য জানতেন। তাঁর ভিক্ষাপুত্র কবিয়াল রান্নার চট্টোপাধ্যায়কে ম্যালেরিয়া থেকে এবং নামজাদা চিকিৎসককে বিস্মিত করে জনৈক জমিদারের নাস্তিকের টাইফয়েড থেকে বাঁচিয়ে তোলেন চন্দ্রমণি। কামারপুকুরের পাইন বংশ যখন ছোঁয়াচে মরনব্যাধিতে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, ভয়ে গ্রামবাসীরা ছায়া মাড়াচ্ছে না, তখন চন্দ্রমণি কারো নিষেধ না মেনে ফাইনালে গিয়ে সেবাশুশ্রুষা করে পরিবারটিকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। 


ন্দ্রাদেবীর বিয়ে হয় দেরেপুর গ্রামের পঁচিশ বছরের যুবক ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তখন তাঁর বয়স আট বছর। ক্ষুদিরামের এটি দ্বিতীয় বিবাহ।  কেননা তার প্রথম পত্নী অল্পবয়সে মারা যান। ক্ষুদিরাম ছিলেন অত্যন্ত সৎ, সত্যনিষ্ঠ  ও ধার্মিক ব্রাহ্মণ। গ্রামবাসীরা তাঁকে দেবতার চোখে দেখতেন।  দেরেপুরের দুষ্ট জমিদার রামচন্দ্র রায়ের পক্ষ নিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে রাজী হননি সত্যনিষ্ঠ ক্ষুদিরাম।  তাই জমিদারের রোডে পড়ে তাঁকে সপরিবারে দেরেপুর ছেড়ে কামারপুকুরে চলে আসতে হয়। চন্দ্রমণির প্রথম দুই সন্তান রাজকুমার ও কার্যালয়ের দেরেগ্রামে ভুমিকা হন। আর কামারপুকুরে জন্মগ্রহণ করেন রামচন্দ্র, গদাধর ও সর্বমঙ্গলি। শোনা যায়, গয়াতীর্থে ক্ষুদিরাম স্বপ্নাদেশ পান স্বয়ং ঈশ্বর পুত্ররুপে তাঁর ঘরে আসছেন। অন্যদিকে কামারপুকুরের যুগীদের শিবমন্দিরের শিবলিঙ্গ থেকে এক আশ্চর্য জ্যোতি প্রকাশিত হয়ে চন্দ্রাদেবীর দেহে  প্রবেশ করে। ব্রাহ্মণ দম্পতি নিশ্চিত হন, এ সবই কোনও মহাপুরুষের আগমন বার্তা। শ্রীরামকৃষ্ণ যখন তার গর্ভে , তখন দেবদেবীর সাক্ষাৎ পেতেন চন্দ্রমণি। জানা যায়, হাঁসের পিঠে চড়া রক্তবর্ন ব্রহ্মাকে দেখেছিলেন চিনতে না পেরে চন্দ্রমণি ভাবেন, রোদে পুড়ে দেবতাটি লাল হয়ে গিয়েছে। পান্তাভাত খেয়ে ব্রহ্মাকে জিনিসকে নিতে অনুরোধ করেছিলেন চন্দ্রমণি। ১৮৩৬ সালে ১৮ই ফেব্রুয়ারি , ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বিতীয় তিথিতে বাড়ির ঢেঁকিশালে ভূমিষ্ঠ হন চন্দ্রমণির কনিষ্ঠ পুত্র গদাধর। 

শৈশবকাল থেকেই  চন্দ্রমণির প্রানাধিক প্রিয় গদাইয়ের দেবস্বভাবের পরিচয় নানা ভাবে প্রকাশিত হত। চন্দ্রমণি তার সরল, ভাবুক, খেয়ালি ছেলেকে নিয়ে সর্বক্ষণ  উদ্বিগ্ন  থাকতেন। গ্রামের সকলে বালক গদাধরের অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি ও অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে বিস্মিত , উল্লাসিত। দেবদেবীর মূর্তি দেখে তন্ময় ভাব, ঈশ্বরের নাম-গুনগান শুনে গদাধরের অচৈতন্য অবস্থা পীড়া দিত চন্দ্রমণিকে। তখন ভূলে যেতেন তাঁর সন্তানের প্রকৃত স্বরূপ। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল চিরকাল। শ্রীক্ষেত্রগামী সাধুর একবার গদাধরকে ভক্ত মাখিয়ে, কৌপীন পরিয়ে সাধু সাজায়। গদাইয়ের এই বেশ দেখে চন্দ্রমণি ভয় পান। গদাইকে হারানোর ভয়ে সর্বদা তটস্থ  থাকতেন।  পরবর্তীকালে এই ঘটনা স্মরণ রেখে অদ্বৈতসাধনের সময় শ্রীরামকৃষ্ণ গুরু তোতাপুরীর কাছে গোপনে সন্ন্যাস গ্রহন করেন। মায়ের কষ্টের কথা ভেবে তিনি মস্তক মুন্ডন করেননি, গেরুয়া ধারণ করেননি। মায়ের পাশে বসে খেয়েছেন। মাতৃশক্তির উপাসক শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তাঁর জননীর ছিলেন জগজ্জননী।

১৮৪৩ সালে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হয়। সতেরো বছর বয়সে গদাধর দাদা রামকুমারের সঙ্গে কলকাতায় আসেন।  শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনযাপন শুরু হয় ১৮৫৫ সালে দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর। জগন্মাতাকে দেখার বাসয় ব্যাকুল হচ্ছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। সকলে ভাবছেন তিনি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন।  কামারপুকুরে এই সংবাদ গেলে চন্দ্রমণি স্থির থাকতে পারলেন না। ভাবলেন বিয়ে দিলেই গদাই শান্ত হবে। সংসারেও মন বসবে। শ্রীরামকৃষ্ণ অপত্তি করলেন না। বরং নিজেই জয়রামবাটিতে সুপাত্রীর খোজ দিলেন। পাঁচ বছরের বালিকা সারদামণির সাথে চব্বিশ বছরের গদাধরের বিয়ে হল। চন্দ্রমণি দরিদ্র।  প্রতিবেশী লাহাবাবুদের গয়না ধার করে এনে নববধূ সারদাকে সাজানো হয়েছিল।  বৌভাতের পরেরদিন লাহাবাবুদের গয়না ফিরিয়ে দিতে হবে। মা হয়ে মেয়ের  গা  থেকে গহনা খুলতে হবে ভেবেই  কষ্টে চন্দ্রমণির বুক ফেটে গেল। শ্রীরামকৃষ্ণ ঘুমন্ত অবস্থায় সারদার গা থেকে নি:সাড়ে গয়নাগুলো খুলে নিলেন। ঘুম ভাঙলে নিজের গয়না ও না দেখে সারদা কাঁদতে লাগলেন। চন্দ্রমণি নববধূকে কোলে বসিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন .........মা গদাই তোমাকে এর চেয়েও ভাল ভাল গয়না পরে কত দেবে।শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর কথা মিথ্যে হতে দননি। সাধনার সময় সীতাদেবীর দু'হাতে যেমন সোনার বালা দেখেছিলেন ঠিক তেমন বালা সারদা মা-কে গড়িয়ে দিয়েছিলেন। 

পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণকে চন্দ্রমণি ডাকতেন " কেষ্ট " বলে। বিবাহের পর দক্ষিনেশ্বরে ফিরে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কালীদর্শনের ব্যাকুলতা আরও বৃদ্ধি পেল। সে খবর শুনে কষ্টের মঙ্গল কামনায়  চন্দ্রমণি শিবমন্দিরে হত্যে দিয়েছেন, গৃহদেবতা রঘুবীর ও শীতলার কাছে মানত  করেছেন। অন্য দিকে মায়ের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবনার অন্ত ছিল না। ভক্তদের বলতেন .... মা-বাবা প্রসন্ন না হলে ধর্ম টর্ম কিছুই  হয় না। তাই মায়ের কষ্ট লাগবে জন্য তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে নিজের কাছে রাখতে চাইলেন। কামারপুকুর ছেড়ে চিরকালের জন্য দক্ষিণেশ্বরে চলে এলেন চন্দ্রমণি। জীবনের শেষ বারো তেরো বছর তিনি দক্ষিণেশ্বরে কটিয়েছেন। দক্ষিণেশ্বরে এসে চন্দ্রমণি প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণ ও রামকুমারের পুত্র অক্ষয়ের সঙ্গে কুঠিবাড়ির উত্তর পূর্ব দিকের একটি ঘরে থাকতেন। অল্পবয়সি অক্ষয়ের প্রয়ানের পর চন্দ্রমণি গঙ্গাতীরে নহবতের দোতলার ঘরেবাস করতে থাকেন। ১৮৬৩ সালে রানী রাসমণির সেজো জামাই মথুরনাথের সদ্ব্যবহার শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে চন্দ্রমণি তীর্থ দর্শনে যান। বৈদনাথ ও কাশীধাম দর্শন করে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে  গেলেন, তখন তার সাথে দেখা হল বৃদ্ধা সাধিকা  গঙ্গামায়ীর। গঙ্গামায়ীর মাতৃসুলভ আচরনে , স্নেহের আকর্ষনে শ্রীরামকৃষ্ণ স্থির করেন বরাবরের জন্য বৃন্দাবনে থেকে যাবেন। গঙ্গামায়ীও তাঁকে কিছুতেই ফিরতে দেবেন না। এমন সময় শ্রীরামকৃষ্ণের মাকে মনে পড়ল। মা সেই  একলা দক্ষিণেশ্বরের নহবতে। আর থাকা হল না। তখন বললেন..... আমায় যেতে হবে।

১৮৭১ সালে মথুরের দেহত্যাগের পরের বছর দক্ষিণেশ্বরে এলেন মা সারদা। শ্রীরামকৃষ্ণ নহবতের একতলার ছোট ঘরটিতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের নির্দেশিত পথে ধ্যান,  জপ, ভবনের সঙ্গে সঙ্গে সারদা দেবী বৃদ্ধা শাশুড়ি ও শ্রীরামকৃষ্ণের  সেবাভার গ্রহন করলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ দেখতেন..... যে মা মন্দিরের গর্ভগৃহে আছেন,  তিনিই যেন জননী ও সারদা রূপে নহবতে বাস করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা ........ যতক্ষন মা আছে, মাকে দেখতে হবে। আমি মাকে ফুল চন্দন দিয়ে পূজা করতাম। সেই জগতের মা-ই মা হয়ে এসেছেন। যতক্ষণ নিজের শরীরের খবর আছে , মার খবর নিতে হবে। প্রতিদিন নহবতে গিয়ে চন্দ্রমণির খোজ খবর নিতেন তিনি। পেট রোগা ঠাকুর কালীবাড়ীর ঘি-মশলাপূর্ণ ভোগ খেয়ে প্রায়ই আমায় ভুগতেন। তাই মাঝে মাঝে জননীকে বলতেন " তুমি মা, সেই দেশের মতন করে, বেশ ফোরন-টোরন দিয়ে দুটো একটা তরকারি করো না। খেতে বড় মন যায়। আর এদের তরকারি রুচেনি।"  রান্নার পাচঁফোরনের প্রতি ঠাকুরের এক বালকসুলভ প্রীতি ছিল। ঠাকুরের পেট খারাপ হলে চন্দ্রমণি খোঁজখবর নিতেন এবং কালীঘরের ভোগ খেতে বারন করে শ্রীমাকে ঠাকুরের জন্য মাছের ঝোল আর কাঠের জ্বালে ভাত রেঁধে দিতে বলতেন।


১৮৭৩ সালে যখন শ্রীরামকৃষ্ণের মেজদাদা রামেশ্বর মারা যান, সে দু:সংবাদ  শুনে চন্দ্রমণি দু:খপ্রকাশ করে বলেছিলেন  " সংসার যে অনিত্য,  সকলেরই মৃত্যু নিশ্চিত। অতএব শোক করা বৃথা।" শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝেছিলেন তানপুরার কান টিপে সুর চাড়ানোর মতো মা জগদম্বা তাঁর জননীর মনকে এমন উচুতে তুলে রেখেছেন যে মরজগতের শোক দু:খ তাঁকে স্পর্শ করতে পারছে না।১৮৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। শ্রীরামকৃষ্ণ কদিন ধরে পর পর জননীর কাছে আসছেন। সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি মায়ের সঙ্গে নিজের ছেলেবেলার গল্প করে চন্দ্রমণির মন খুশিতে ভরিয়ে রাখছেন। সেদিন  সকাল আটটা বাজলেও চন্দ্রমণি দরজা খুললেন না। পরিচারিকার  মুখে জানতে পেরে ঠাকুরের ভাগ্নে হৃদয়রাম কৌশলে দরজা খুলে দেখলেন, চন্দ্রমণি সংঞ্জাহীন হয়ে পড়ে রয়েছেন।  কবিরাজ ওষুধ এনে তার মুখ দিয়ে মধ্যে মধ্যে দুধ আর  গঙ্গাজল বিন্দু বিন্দু করে খাওয়ানো হল। তিন দিন পর চন্দ্রমণির অন্তিমকাল উপস্থিত হলে তাঁকে কালীবাড়ীর বকুল ঘাটে অন্তর্জলি করা হল। শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর মুখে গঙ্গাজল দিয়ে কানে নাম শোনালেন। পা ধুইয়ে সাদা চন্দন মাখিয়ে  পুষ্পাঞ্জলি  দিলেন। তারপর জননীর চরণে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললেন....... মা, তুমি কে গো, আমায় গর্ভে ধারণ করেছিলে!! তুমিও সাধারণ মা নও ! মা, যেমন আমায় আগে দেখাশোনা করতে , এখনো আমায় দেখো। পরদিন সূর্যোদয়ের আগে, ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নেহের পুত্রকে পাশে রেখে চন্দ্রমণি অমৃতলোকে চলে গেলেন। দেহত্যাগের মুহূর্তে শ্রীরামকৃষ্ণ "মা, মা" বলে কেঁদে উঠলে হৃদয় তিরস্কার করে বললেন " মামা, তুমি না সাধু হয়েছ ?"  শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন  " ওরে শালা, সাধু হয়েছি বলে কি জানোয়ার হয়েছি ?" ঘটনাচক্রে সেই দিনটি ছিল  ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বিতীয়, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি। সেই উষাকাল।

সন্ন্যাসী শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর সৎকার করতে পারেননি। করেছিলেন রামেশ্বরর পুত্র রামলাল। কিন্ত গর্ভধারিনী মাকে কোনও দিন ভুলতে পারেননি শ্রীরামকৃষ্ণ।  চন্দ্রমণির দেহরক্ষার বহুদিন পরে একদিন  মায়ের মন্দিরে প্রসাদ পেতে যাওয়ার সময় শ্রীরামকৃষ্ণ হঠাৎ পিছন ফিরে উল্টো দিকে হাটতে শুরু করলেন। বিস্মিত হয়ে সঙ্গীরা তাঁকে ডাকল, " এখন কোথায় চললে?" পঞ্চবটীর দিকে যেতে যেতে সজল নয়নে শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন  ...... " দাড়াও, আগে মার জন্য  একটু কেঁদে আসি"। 

Tuesday, 13 September 2022

বিশে বিশ ( ২০২০)

 

বিশে বিষ ( ২০২০ )

================

কথাটা উঠেছিলো 2020 সাল পড়তেই বিশে বিষ,--------কথাটা কতখানি আমাদের রামকৃষ্ণ ভাবধারায় যারা আছি তাদের কাছে সত্যি তা ভাবলেই আপনারাও চমকিত হয়ে যাবেন।
হয়তো বা  কাকতলীয় ....এবার আসি আসল কথায় ....

মা সারদা দেবী....যিনি হলেন স্বয়ং আদ্যাশক্তি মহামায়া...যা স্বয়ং অবতার শ্রীরামকৃষ্ণ দেব স্বমুখে বলে গেছেন ।
বছর টি ছিল ১৯২০ অর্থাৎ 1920 সাল .....যে বছর শ্রীশ্রীমা তাঁর স্থূল শরীর পরিত্যাগ করলেন  ......সেই বছর শ্রীশ্রীমায়ের জন্মতিথি পালন হয় নি।
ঠিক 100 বছর পর আজ 2020 .....
আপনারা একটু খেয়াল করে দেখুন ....এই বছর বাংলা ক্যালেন্ডারে শ্রীশ্রীমায়ের জন্ম তিথি পড়েনি ।
2021 এ গিয়ে শ্রীশ্রীমায়ের জন্মতিথি পড়েছে ।
একি আশ্চর্য ঘটনা নয়!!! ঈশ্বরের লীলা বোঝা দায়......
যুগে যুগে শক্তি ধরায় অবতীর্ণ হন....মায়ের কথা বলে শেষ করা যায় না।

কয়েকটি প্রসঙ্গ বলি.....

এ প্রসঙ্গে বলি ঠাকুর বলতেন হৃদয় কে, .....ও যে আমার শক্তি, ওকে কিছু বলিস না, ওঁর ভিতরে যে আছে সে ফোঁস করলে ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরও কিছু করতে পারবে না ।

স্বামীজী বলতেন জ্যান্ত দুর্গা।

মা নিজে নিজেকে কালী, সীতা, রাধা, দুর্গা সব বলেছেন।

শিবানন্দ মহারাজ মায়ের শরীর যাবার পর বলেছেন , সতীর দেহ 51 পীঠে পড়েছে, এখানে মানে বেলুড় মঠ এ মায়ের সমগ্র দেহ...ভাবা যায় কি মহাশক্তি আছে এই মঠ এ।kakali

"এ প্রসঙ্গে মহারাজ তাঁর ক্লাস এ একটি কথা বলেছিলেন  খুব প্রাসঙ্গিক---ভুতেশানন্দজীকে একজন প্রশ্ন করেছিলেন.... মহারাজ   বৃন্দাবনে আধ্যাত্মিক ভাবের flow চলে মধ্য রাতে, কাশীতে ভোরে, কিন্তু এখানে কখন....মহারাজ হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, এখানে সর্বদা আধ্যাত্মিক কারেন্ট বয়ে চলে।"

 ঠাকুর মা স্বামীজী যে স্বয়ং এখানে আছেন এ কথা ভুলে গেলে সবই গেল যে।( বিশেষ করে যারা মঠ মিশন নিয়ে মন্দ কথা বলে সন্ন্যাসী দের সম্পর্কে আঙ্গুল তোলে...কারণ তাঁরা ওখানে থাকছেন মায়ের কাছে...এ কথা সাধারণ মানুষের ভুলে গেলে চলবে না)




জয় মা মহামায়ী।।।
২০২০ সত্যিই বিষের বৎসর:

২০২০ এ মা সারদামণির আবির্ভাব তিথির পূজা নেই। শ্রীশ্রী মায়ের আবির্ভাব তিথির পূজা হয়েছে ২০১৯ এর ১৮ ডিসেম্বর, ০১ পৌষ ১৪২৬। আর পরের আবির্ভাব তিথির পূজানুষ্ঠান হবে ৫ জানুয়ারি ২০২১, ২০ পৌষ ১৪২৭। অর্থাৎ ২০২০ এ আমরা মায়ের আবির্ভাব তিথির পূজানুষ্ঠান করতে পারছিনা। এই ২০২০ অভাগা। আর এজন্যই কি এত বিষ এই ২০২০ এ  ??? অন্যান্য কারণের মত এটাও কি একটা কারণ  ??? 

এটা আমার সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অভিমত। আমার মতামত প্রদানে আমি স্বাধীন ও মুক্ত। কাউকে বিশ্বাস করারও জন্য এই মতামত দেইনি।