হুগলি জেলার আরামবাগ থানা হইতে চারি ক্রোশ পশ্চিমে বর্ধমান হইতে প্রায় ষােলাে ক্রোশ দক্ষিণে কামারপুকুর গ্রাম অবস্থিত। তাহার পশ্চিমে দেড় ক্রোশ দূরে ‘দেরে’ নামক গ্রামে সত্যনিষ্ঠ ঋষিকল্প ও পরম ভক্ত ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায় বাস করিতেন। তাঁহার পূতস্বভাবা পত্নী চন্দ্রমণি দেবী সরলতা ও করুণার প্রতিমূর্তি ছিলেন। সেই গ্রামের জমিদারের পক্ষে মােকদ্দমায় সাক্ষ্য দিতে অসম্মত হওয়ায় জমিদার তাহার উপর বিষম অত্যাচার করেন; পরিশেষে, সন ১২২০ সালে (১৮১৪ খ্রিঃ) স্বজন লইয়া ক্ষুদিরাম কামারপুকুরে আসিয়া বাস করেন। তখন তাঁহার বয়স ৩৯ বৎসর।
সন ১২৪১ সালে (১৮৩৫ খ্রিঃ) ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের ৺গয়াধামে অবস্থিতিকালে একদিন রাত্রিতে তিনি স্বপ্নে দেখিলেন, যেন তাঁহাকে ৺গদাধর বলিলেন যে, তিনি তাঁহার পুত্ররূপে অবতীর্ণ হইবেন। ১২৪২ সালের বৈশাখে ক্ষুদিরাম কামারপুকুর বাটিতে প্রত্যাগমন করিয়া চন্দ্রমণি দেবীর মুখে শুনিলেন যে, একদিন তিনি বাটির সন্নিকটস্থ শিবমন্দিরের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আছেন, এমন সময় দেখিতে পাইলেন, ৺মহাদেবের শ্রীঅঙ্গ হইতে দিব্যজ্যোতিঃ বাহির হইয়া বায়ুর আকারে তাঁহার শরীরের ভিতর প্রবেশ করিল। ক্রমে ক্রমে চন্দ্রমণি দেবীর গর্ভলক্ষণসকল প্রকাশ পাইতে লাগিল। ১২৪২ সালের ৬ ফাণ্ডন, (১৮ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৬ খ্রিঃ) বুধবার, শুক্লা দ্বিতীয়ায় ব্রাহ্মমুহূর্তে চন্দ্রমনি দেবী এক পুত্রসন্তান প্রসব করিলেন। ক্ষুদিরাম ৺গদাধরের নামানুসারে পুত্রের নাম ‘গদাধর’ রাখিলেন। রামকৃষ্ণ ঠাকুরের বংশানুক্রমিক নাম।
স্বামীজির কাছে যিনি " স্পিরিচুয়াল জায়েন্ট " , রোমাঁ রোলাঁর কাছে তারই জীবন এক অমৃতভান্ড। সেই অমৃতযোগ যিনি গর্ভে ধারণ করেছিলেন, তিনিও তাঁর ব্রাত্ পুত্রের মতোই পূজনীয়া। তিনিই হলেন শ্রীরামকৃষ্ণজননী চন্দ্রমণি দেবী। শ্রীরামকৃষ্ণের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে যখন দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের আগমন ঘটছে, তখন তার জননী আর ইহলোকে ছিলেন না। কিন্ত বহু জনের মঙ্গলের জন্য রেখে গিয়েছিলেন পৃথিবীর এক অসীম আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন দার্শনিক এবং মানবপ্রেমী মহামানবকে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব নিজের গর্ভধারিণী মাকে ভক্ত শিষ্যদের কাছে এই ভাবে তুলে ধরতেন ........ আমার মা মূর্তিমতি সরলতাস্বরুপা ছিলেন। সংসারের কোনও বিষয় বুঝতেন না। টাকাপয়সা গুনতে জানতেন না। কারোকে কোনও বিষয় বলতে নেই, তা না জানাতে নিজের পেটের কথা সকলের কাছে বলে ফেললন, সেজন্য লোকে তাকে "হাউরো" বলত এবং তিনি সকলকে খাওয়াতে বড় ভালবাসতেন।
সরল, মিষ্টভাষী,ভক্তিমতী চন্দ্রমণি ছিলেন সকলের প্রিয়, গৃহকর্মে নিপুণ এবং রান্নার সিদ্ধহস্ত। সে যুগে কামারপুকুরের পাশ দিয়ে ছিল পুরী যাওয়ার রাস্তা। গ্রামের পান্থশালায় আশ্রয় নেওয়া শ্রীক্ষেত্রযাত্রী সাধু, ভক্তদের রেঁধে খাইয়ে চন্দ্রমণি বড় আনন্দ পেতেন।ইংরেজি ১৭৯১ সালে হুগলির সরাটি-মায়াপুর গ্রামে চন্দ্রমণি দেবীর জন্ম। পিতা পন্ডিত নন্দকিশোর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতা হরবিলাসিনী দেবী। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড়। ডাকনাম ছিল চন্দ্রা। তিনি ছিলেন সুশ্রী, স্বাস্থ্য এবং দীর্ঘাঙ্গী। চন্দ্রমণির পিতৃকুলে আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের চর্চা ছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে তিনিও তা পেয়েছিলেন। তাঁর একমাত্র ভাই সুনামধন্য আয়ুর্বেদ চিকিৎসক কৃষ্ণমোহন। চন্দ্রমণিও অনেক রকম কবিরাজ ওষুধ ও পথ্য জানতেন। তাঁর ভিক্ষাপুত্র কবিয়াল রান্নার চট্টোপাধ্যায়কে ম্যালেরিয়া থেকে এবং নামজাদা চিকিৎসককে বিস্মিত করে জনৈক জমিদারের নাস্তিকের টাইফয়েড থেকে বাঁচিয়ে তোলেন চন্দ্রমণি। কামারপুকুরের পাইন বংশ যখন ছোঁয়াচে মরনব্যাধিতে লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, ভয়ে গ্রামবাসীরা ছায়া মাড়াচ্ছে না, তখন চন্দ্রমণি কারো নিষেধ না মেনে ফাইনালে গিয়ে সেবাশুশ্রুষা করে পরিবারটিকে সুস্থ করে তুলেছিলেন।
চন্দ্রাদেবীর বিয়ে হয় দেরেপুর গ্রামের পঁচিশ বছরের যুবক ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তখন তাঁর বয়স আট বছর। ক্ষুদিরামের এটি দ্বিতীয় বিবাহ। কেননা তার প্রথম পত্নী অল্পবয়সে মারা যান। ক্ষুদিরাম ছিলেন অত্যন্ত সৎ, সত্যনিষ্ঠ ও ধার্মিক ব্রাহ্মণ। গ্রামবাসীরা তাঁকে দেবতার চোখে দেখতেন। দেরেপুরের দুষ্ট জমিদার রামচন্দ্র রায়ের পক্ষ নিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দিতে রাজী হননি সত্যনিষ্ঠ ক্ষুদিরাম। তাই জমিদারের রোডে পড়ে তাঁকে সপরিবারে দেরেপুর ছেড়ে কামারপুকুরে চলে আসতে হয়। চন্দ্রমণির প্রথম দুই সন্তান রাজকুমার ও কার্যালয়ের দেরেগ্রামে ভুমিকা হন। আর কামারপুকুরে জন্মগ্রহণ করেন রামচন্দ্র, গদাধর ও সর্বমঙ্গলি। শোনা যায়, গয়াতীর্থে ক্ষুদিরাম স্বপ্নাদেশ পান স্বয়ং ঈশ্বর পুত্ররুপে তাঁর ঘরে আসছেন। অন্যদিকে কামারপুকুরের যুগীদের শিবমন্দিরের শিবলিঙ্গ থেকে এক আশ্চর্য জ্যোতি প্রকাশিত হয়ে চন্দ্রাদেবীর দেহে প্রবেশ করে। ব্রাহ্মণ দম্পতি নিশ্চিত হন, এ সবই কোনও মহাপুরুষের আগমন বার্তা। শ্রীরামকৃষ্ণ যখন তার গর্ভে , তখন দেবদেবীর সাক্ষাৎ পেতেন চন্দ্রমণি। জানা যায়, হাঁসের পিঠে চড়া রক্তবর্ন ব্রহ্মাকে দেখেছিলেন চিনতে না পেরে চন্দ্রমণি ভাবেন, রোদে পুড়ে দেবতাটি লাল হয়ে গিয়েছে। পান্তাভাত খেয়ে ব্রহ্মাকে জিনিসকে নিতে অনুরোধ করেছিলেন চন্দ্রমণি। ১৮৩৬ সালে ১৮ই ফেব্রুয়ারি , ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বিতীয় তিথিতে বাড়ির ঢেঁকিশালে ভূমিষ্ঠ হন চন্দ্রমণির কনিষ্ঠ পুত্র গদাধর।
শৈশবকাল থেকেই চন্দ্রমণির প্রানাধিক প্রিয় গদাইয়ের দেবস্বভাবের পরিচয় নানা ভাবে প্রকাশিত হত। চন্দ্রমণি তার সরল, ভাবুক, খেয়ালি ছেলেকে নিয়ে সর্বক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকতেন। গ্রামের সকলে বালক গদাধরের অদ্ভুত আকর্ষণী শক্তি ও অলৌকিক ক্ষমতার পরিচয় পেয়ে বিস্মিত , উল্লাসিত। দেবদেবীর মূর্তি দেখে তন্ময় ভাব, ঈশ্বরের নাম-গুনগান শুনে গদাধরের অচৈতন্য অবস্থা পীড়া দিত চন্দ্রমণিকে। তখন ভূলে যেতেন তাঁর সন্তানের প্রকৃত স্বরূপ। প্রিয় সন্তানকে নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল চিরকাল। শ্রীক্ষেত্রগামী সাধুর একবার গদাধরকে ভক্ত মাখিয়ে, কৌপীন পরিয়ে সাধু সাজায়। গদাইয়ের এই বেশ দেখে চন্দ্রমণি ভয় পান। গদাইকে হারানোর ভয়ে সর্বদা তটস্থ থাকতেন। পরবর্তীকালে এই ঘটনা স্মরণ রেখে অদ্বৈতসাধনের সময় শ্রীরামকৃষ্ণ গুরু তোতাপুরীর কাছে গোপনে সন্ন্যাস গ্রহন করেন। মায়ের কষ্টের কথা ভেবে তিনি মস্তক মুন্ডন করেননি, গেরুয়া ধারণ করেননি। মায়ের পাশে বসে খেয়েছেন। মাতৃশক্তির উপাসক শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে তাঁর জননীর ছিলেন জগজ্জননী।
১৮৪৩ সালে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের জীবনাবসান হয়। সতেরো বছর বয়সে গদাধর দাদা রামকুমারের সঙ্গে কলকাতায় আসেন। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবনযাপন শুরু হয় ১৮৫৫ সালে দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর। জগন্মাতাকে দেখার বাসয় ব্যাকুল হচ্ছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। সকলে ভাবছেন তিনি উন্মাদ হয়ে গিয়েছেন। কামারপুকুরে এই সংবাদ গেলে চন্দ্রমণি স্থির থাকতে পারলেন না। ভাবলেন বিয়ে দিলেই গদাই শান্ত হবে। সংসারেও মন বসবে। শ্রীরামকৃষ্ণ অপত্তি করলেন না। বরং নিজেই জয়রামবাটিতে সুপাত্রীর খোজ দিলেন। পাঁচ বছরের বালিকা সারদামণির সাথে চব্বিশ বছরের গদাধরের বিয়ে হল। চন্দ্রমণি দরিদ্র। প্রতিবেশী লাহাবাবুদের গয়না ধার করে এনে নববধূ সারদাকে সাজানো হয়েছিল। বৌভাতের পরেরদিন লাহাবাবুদের গয়না ফিরিয়ে দিতে হবে। মা হয়ে মেয়ের গা থেকে গহনা খুলতে হবে ভেবেই কষ্টে চন্দ্রমণির বুক ফেটে গেল। শ্রীরামকৃষ্ণ ঘুমন্ত অবস্থায় সারদার গা থেকে নি:সাড়ে গয়নাগুলো খুলে নিলেন। ঘুম ভাঙলে নিজের গয়না ও না দেখে সারদা কাঁদতে লাগলেন। চন্দ্রমণি নববধূকে কোলে বসিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন .........মা গদাই তোমাকে এর চেয়েও ভাল ভাল গয়না পরে কত দেবে।শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর কথা মিথ্যে হতে দননি। সাধনার সময় সীতাদেবীর দু'হাতে যেমন সোনার বালা দেখেছিলেন ঠিক তেমন বালা সারদা মা-কে গড়িয়ে দিয়েছিলেন।
পরবর্তীকালে শ্রীরামকৃষ্ণকে চন্দ্রমণি ডাকতেন " কেষ্ট " বলে। বিবাহের পর দক্ষিনেশ্বরে ফিরে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের কালীদর্শনের ব্যাকুলতা আরও বৃদ্ধি পেল। সে খবর শুনে কষ্টের মঙ্গল কামনায় চন্দ্রমণি শিবমন্দিরে হত্যে দিয়েছেন, গৃহদেবতা রঘুবীর ও শীতলার কাছে মানত করেছেন। অন্য দিকে মায়ের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবনার অন্ত ছিল না। ভক্তদের বলতেন .... মা-বাবা প্রসন্ন না হলে ধর্ম টর্ম কিছুই হয় না। তাই মায়ের কষ্ট লাগবে জন্য তাঁকে দক্ষিণেশ্বরে নিজের কাছে রাখতে চাইলেন। কামারপুকুর ছেড়ে চিরকালের জন্য দক্ষিণেশ্বরে চলে এলেন চন্দ্রমণি। জীবনের শেষ বারো তেরো বছর তিনি দক্ষিণেশ্বরে কটিয়েছেন। দক্ষিণেশ্বরে এসে চন্দ্রমণি প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণ ও রামকুমারের পুত্র অক্ষয়ের সঙ্গে কুঠিবাড়ির উত্তর পূর্ব দিকের একটি ঘরে থাকতেন। অল্পবয়সি অক্ষয়ের প্রয়ানের পর চন্দ্রমণি গঙ্গাতীরে নহবতের দোতলার ঘরেবাস করতে থাকেন। ১৮৬৩ সালে রানী রাসমণির সেজো জামাই মথুরনাথের সদ্ব্যবহার শ্রীরামকৃষ্ণের সঙ্গে চন্দ্রমণি তীর্থ দর্শনে যান। বৈদনাথ ও কাশীধাম দর্শন করে শ্রীরামকৃষ্ণ যখন বৃন্দাবনে গেলেন, তখন তার সাথে দেখা হল বৃদ্ধা সাধিকা গঙ্গামায়ীর। গঙ্গামায়ীর মাতৃসুলভ আচরনে , স্নেহের আকর্ষনে শ্রীরামকৃষ্ণ স্থির করেন বরাবরের জন্য বৃন্দাবনে থেকে যাবেন। গঙ্গামায়ীও তাঁকে কিছুতেই ফিরতে দেবেন না। এমন সময় শ্রীরামকৃষ্ণের মাকে মনে পড়ল। মা সেই একলা দক্ষিণেশ্বরের নহবতে। আর থাকা হল না। তখন বললেন..... আমায় যেতে হবে।
১৮৭১ সালে মথুরের দেহত্যাগের পরের বছর দক্ষিণেশ্বরে এলেন মা সারদা। শ্রীরামকৃষ্ণ নহবতের একতলার ছোট ঘরটিতে তাঁর থাকার ব্যবস্থা করেন। শ্রীরামকৃষ্ণের নির্দেশিত পথে ধ্যান, জপ, ভবনের সঙ্গে সঙ্গে সারদা দেবী বৃদ্ধা শাশুড়ি ও শ্রীরামকৃষ্ণের সেবাভার গ্রহন করলেন। শ্রীরামকৃষ্ণ দেখতেন..... যে মা মন্দিরের গর্ভগৃহে আছেন, তিনিই যেন জননী ও সারদা রূপে নহবতে বাস করছেন। শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা ........ যতক্ষন মা আছে, মাকে দেখতে হবে। আমি মাকে ফুল চন্দন দিয়ে পূজা করতাম। সেই জগতের মা-ই মা হয়ে এসেছেন। যতক্ষণ নিজের শরীরের খবর আছে , মার খবর নিতে হবে। প্রতিদিন নহবতে গিয়ে চন্দ্রমণির খোজ খবর নিতেন তিনি। পেট রোগা ঠাকুর কালীবাড়ীর ঘি-মশলাপূর্ণ ভোগ খেয়ে প্রায়ই আমায় ভুগতেন। তাই মাঝে মাঝে জননীকে বলতেন " তুমি মা, সেই দেশের মতন করে, বেশ ফোরন-টোরন দিয়ে দুটো একটা তরকারি করো না। খেতে বড় মন যায়। আর এদের তরকারি রুচেনি।" রান্নার পাচঁফোরনের প্রতি ঠাকুরের এক বালকসুলভ প্রীতি ছিল। ঠাকুরের পেট খারাপ হলে চন্দ্রমণি খোঁজখবর নিতেন এবং কালীঘরের ভোগ খেতে বারন করে শ্রীমাকে ঠাকুরের জন্য মাছের ঝোল আর কাঠের জ্বালে ভাত রেঁধে দিতে বলতেন।
১৮৭৩ সালে যখন শ্রীরামকৃষ্ণের মেজদাদা রামেশ্বর মারা যান, সে দু:সংবাদ শুনে চন্দ্রমণি দু:খপ্রকাশ করে বলেছিলেন " সংসার যে অনিত্য, সকলেরই মৃত্যু নিশ্চিত। অতএব শোক করা বৃথা।" শ্রীরামকৃষ্ণ বুঝেছিলেন তানপুরার কান টিপে সুর চাড়ানোর মতো মা জগদম্বা তাঁর জননীর মনকে এমন উচুতে তুলে রেখেছেন যে মরজগতের শোক দু:খ তাঁকে স্পর্শ করতে পারছে না।১৮৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। শ্রীরামকৃষ্ণ কদিন ধরে পর পর জননীর কাছে আসছেন। সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি মায়ের সঙ্গে নিজের ছেলেবেলার গল্প করে চন্দ্রমণির মন খুশিতে ভরিয়ে রাখছেন। সেদিন সকাল আটটা বাজলেও চন্দ্রমণি দরজা খুললেন না। পরিচারিকার মুখে জানতে পেরে ঠাকুরের ভাগ্নে হৃদয়রাম কৌশলে দরজা খুলে দেখলেন, চন্দ্রমণি সংঞ্জাহীন হয়ে পড়ে রয়েছেন। কবিরাজ ওষুধ এনে তার মুখ দিয়ে মধ্যে মধ্যে দুধ আর গঙ্গাজল বিন্দু বিন্দু করে খাওয়ানো হল। তিন দিন পর চন্দ্রমণির অন্তিমকাল উপস্থিত হলে তাঁকে কালীবাড়ীর বকুল ঘাটে অন্তর্জলি করা হল। শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর মুখে গঙ্গাজল দিয়ে কানে নাম শোনালেন। পা ধুইয়ে সাদা চন্দন মাখিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন। তারপর জননীর চরণে মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললেন....... মা, তুমি কে গো, আমায় গর্ভে ধারণ করেছিলে!! তুমিও সাধারণ মা নও ! মা, যেমন আমায় আগে দেখাশোনা করতে , এখনো আমায় দেখো। পরদিন সূর্যোদয়ের আগে, ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নেহের পুত্রকে পাশে রেখে চন্দ্রমণি অমৃতলোকে চলে গেলেন। দেহত্যাগের মুহূর্তে শ্রীরামকৃষ্ণ "মা, মা" বলে কেঁদে উঠলে হৃদয় তিরস্কার করে বললেন " মামা, তুমি না সাধু হয়েছ ?" শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন " ওরে শালা, সাধু হয়েছি বলে কি জানোয়ার হয়েছি ?" ঘটনাচক্রে সেই দিনটি ছিল ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বিতীয়, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি। সেই উষাকাল।
সন্ন্যাসী শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর সৎকার করতে পারেননি। করেছিলেন রামেশ্বরর পুত্র রামলাল। কিন্ত গর্ভধারিনী মাকে কোনও দিন ভুলতে পারেননি শ্রীরামকৃষ্ণ। চন্দ্রমণির দেহরক্ষার বহুদিন পরে একদিন মায়ের মন্দিরে প্রসাদ পেতে যাওয়ার সময় শ্রীরামকৃষ্ণ হঠাৎ পিছন ফিরে উল্টো দিকে হাটতে শুরু করলেন। বিস্মিত হয়ে সঙ্গীরা তাঁকে ডাকল, " এখন কোথায় চললে?" পঞ্চবটীর দিকে যেতে যেতে সজল নয়নে শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর দিলেন ...... " দাড়াও, আগে মার জন্য একটু কেঁদে আসি"।
No comments:
Post a Comment