Saturday, 2 August 2025

ষোড়শীপূজা - ফলহারিনী কালীপুজো

 

ষোড়শীপূজা, এক ঐষী জাগরণ,

ফলহারিণী   কালীপুজো *****



✿꧁✿꧂✿✿꧁✿꧂✿✿꧁✿꧂✿✿꧁✿꧂✿

শক্তির দুটি রূপ । একটি বিদ্যা মায়া আরেকটি অবিদ্যা মায়া।

ঠাকুর ষোড়শী পূজোর মাধ্যমে মায়ের অবিদ্যা মায়া সরিয়ে বিদ্যা মায়াকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

বিদ্যা মায়া যা আমাদের ঈশ্বরের পথে , মুক্তির পথে নিয়ে যায়‌। অবিদ্যা মায়া সংসার বন্ধনে আবদ্ধ করে।

যা কিছু পুড়িয়ে নষ্টভ্রষ্ট করে দিতে পারে


এই পুজোর তিথি অত্যন্ত শুভ। অতি পুণ্য অমাবস্যা। যে তিথিতে দেবীর চরণে সব কর্মফল সমর্পণ করতে হয়। আর, ভক্তের অর্জিত সমস্ত অশুভ কর্মফল হরণ করেন দেবী। সেই কারণে দেবীর নাম 'ফলহারিণী'। জ্যৈষ্ঠ মাসের অমাবস্যা তিথিতে ফলহারিণী কালীপুজো হয়। 

শ্রীরামকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে ফলহারিণী কালীপুজোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, ১২৮০ বঙ্গাব্দে এই বিশেষ রাতেই শ্রীরামকৃষ্ণ  সারদা দেবীকে দশমহাবিদ্যার অন্যতম দেবী ‘ষোড়শী’ রূপে পুজো করেছিলেন। সেই থেকে রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনে ফলহারিণী কালীপুজো বিশেষ গুরুত্ব পায়। রামকৃষ্ণের ভক্তদের কাছে এই পুজো ষোড়শী পুজো নামেও পরিচিত।


পূজোর আগে শ্রীশ্রীমাকে দেবীর আসনে বসিয়ে ঠাকুর আবাহন মন্ত্র উচ্চারণ করেন।

"হে বালে, হে সর্বশক্তির অধিশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরী,

সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইহার (শ্রীশ্রীমা) শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর।" 

এবং পূজা শেষে   নিজের জপের মালা, সাধনার সমগ্র ফল মার চরণে সমর্পণ করেন।

এই পূজোর মাধ্যমে  শ্রীরামকৃষ্ণদেব শ্রীশ্রীমায়ের মায়ের অন্তর্নিহিত দেবত্বকে জাগ্রত করেন।

১২৮০ সালের ১৩ই জ্যৈষ্ঠ ফলহারিণী কালী পূজার দিন ঠাকুর শ্রীশ্রীমাকে সাক্ষাৎ ৺ষোড়শী জ্ঞানে পূজা করেন। 

যেভাবে সমাধিস্থ হইয়া মা সেই মহাপুজো গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা হইতেই তিনি যে কত বড় মহাশক্তির আবার কিছুটা অনুমান করা যাইতে পারে। ঘটনা এইরূপ —

ঠাকুর অন্তরের এক অপূর্ব প্রেরণায় চালিত হইয়া নিজের ঘরে জগন্মাতার বিশেষ পূজা করিতে মনস্থ করিলেন। ভাগিনের হৃদয় ও দীনু-পূজারীর সাহায্যে দেবীর রহস্যপূজার সর্বাঙ্গসুন্দর আয়োজন করিতে রাত্রি নয়টা বাজিয়া গেল। 

শ্রীশ্রীমাকে পূজাকালে উপস্থিত থাকিতে ঠাকুর পর্বেই বলিয়া রাখিয়াছিলেন। এই সময়ে তিনি আসিয়া উপস্থিত হইলেন ও ঠাকুর পূজায় বসিলেন।

পূজার পূর্বকৃত্যসকল দর্শন করিতে করিতে মা অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইলেন এবং ঠাকুরের ইঙ্গিতে পূর্বমুখে উপবিষ্ট পূজকের দক্ষিণভাগে আলিম্পনভূষিত পীঠে উত্তরাস্যা হইয়া উপবেশন করিলেন।

“সম্মুখস্থ কলসের মন্ত্রপূত বারি দ্বারা ঠাকুর বারংবার শ্রীশ্রীমাকে যথাবিধানে অভিষিক্তা করিলেন । অনন্তর মন্ত্র শ্রবণ করাইয়া তিনি এখন প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করিলেন, 

❝হে বালে, হে সর্বশক্তির অধিশ্বরী মাতঃ ত্রিপুরাসুন্দরি, 

সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর, ইহার (শ্রীশ্রীমার) শরীর-মনকে পবিত্র করিয়া ইহাতে আবির্ভূতা হইয়া সর্ব কল্যাণ সাধন কর!❞

“অতঃপর শ্রীশ্রীমার অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধানে ন্যাসপূর্বক ঠাকুর সাক্ষাৎ ৺দেবীজ্ঞানে তাঁহাকে পূজা করিলেন এবং ভোগ নিবেদন করিয়া নিবেদিত বস্তুসকলের কিয়দংশ স্বহস্তে তাঁহার মুখে প্রদান করিলেন। 

বাহ্যজ্ঞান তিরোহিত হইয়া শ্রীশ্রীমা সমাধিস্থা হইলেন। ঠাকুরও অর্থ বাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে সম্পূর্ণ সমাধিমগ্ন হইলেন ৷

সমাধিস্থ পূজক সমাধিস্থা দেবীর সহিত আত্মস্বরূপে পূর্ণভাবে মিলিত ও একীভূত হইলেন।”

...এইভাবে বহুক্ষণ অতীত হইল। নিশার তৃতীয় প্রহরে অর্ধবাহ্যদশা প্রাপ্ত হইয়া ঠাকুর দেবীকে আত্মনিবেদন করিলেন। বিল্বপত্রে নিজের নাম লিখিয়া, সেই বিশ্বপত্রসহযোগে পূর্ব-পূর্ব সাধনকালে ব্যবহৃত বস্ত্র, আভরণ ও রুদ্রাক্ষের মালাদি সমুদয় দ্রব্য, সেই সকল সাধনার ফল এবং নিজেকে দেবী-পাদপদ্মে সমর্পণ করিলেন ।

এ পূজো পূজার ইতি,

আর দেবদেবী-মূর্তি,

কভু না পূজিলা পরমেশ।

যেন পূজো শ্রীশ্রীমার, 

পরম চরম সার,

পরিণাম সকলের শেষ। 

পূজা সম্পূর্ণ হইলে শ্রীশ্রীমার সমাধি ভঙ্গ হইল তিনি মনে মনে ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া নহবত ঘরে চলিয়া গেলেন।

ঠাকুর পূর্বমুখ হইয়া পশ্চিম দিকের দরজার কাছে বসিয়াছিলেন। মন্ত্রোচ্চারণ-সহকারে পূজাদ্রব্য সকল শোধনের পর তিনি যথাবিধি পূর্বকৃত্য শেষ করিলেন এবং শ্রীমাকে নির্দিষ্ট পীঠে উপবেশনের জন্য ইঙ্গিত করিলেন। ... তিনি [শ্রীশ্রীমা] মন্ত্রমুগ্ধার ন্যায় পশ্চিমাস্য হইয়া ঠাকুরের সম্মুখস্থ পীঠে উপবেশন করিলেন। তখন মন্ত্রপূত কলসের জল লইয়া ঠাকুর বারংবার শ্রীমায়ের অভিষেক করিলেন। তারপর তাঁহাকে মন্ত্র শ্রবণ করাইয়া প্রার্থনামন্ত্র উচ্চারণ করিলেন, “হে বালে, হে সর্বশক্তির অধীশ্বরি মাতঃ ত্রিপুরসুন্দরি, সিদ্ধিদ্বার উন্মুক্ত কর; ইঁহার (শ্রীমায়ের) শরীর মনকে পবিত্র করিয়া ইঁহাতে আবির্ভূত হইয়া সর্বকল্যাণ সাধন কর।” পরে তিনি মাতাঠাকুরানীর অঙ্গে মন্ত্রসকলের যথাবিধি বিন্যাস করিয়া সাক্ষাৎ দেবীজ্ঞানে তাঁহাকে ষোড়শোপচারে পূজা করিলেন। পূজান্তে ভোগ নিবেদিত হইল। অবশেষে পূজক নিবেদিত মিষ্টান্নাদির কিয়দংশ স্বহস্তে তুলিয়া লইয়া দেবীর শ্রীমুখে প্রদান করিলেন। দেখিতে দেখিতে বাহ্যজ্ঞানশূন্যা শ্রীমা সমাধিস্থ হইলেন; ঠাকুরও অর্ধ-বাহ্যদশায় মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে সমাধিরাজ্যে চলিয়া গেলেন।... তিনি দেবীকে আত্মনিবেদন করিলেন। অনন্তর আপনার সহিত নিজ সাধনার এবং জপের মালা প্রভৃতি সর্বস্ব দেবীর শ্রীচরণে চিরকালের জন্য বিসর্জন দিয়া মন্ত্রোচ্চারণ করিতে করিতে তাঁহাকে প্রণাম করিলেন, “হে সর্বমঙ্গলের মঙ্গলস্বরূপে, হে সর্বকর্মনিষ্পন্ন - কারিনী, হে শরণদায়িনী, ত্রিনয়নী, শিবগেহিনী গৌরি, হে নারায়ণি, তোমাকে প্রণাম করি।”

   ভক্তদের কাছে এই পুজো ষোড়শী পুজো নামেও পরিচিত

No comments:

Post a Comment