~~ শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণদেবের স্নেহধন্যা ****রানী রাসমণি~~
দক্ষিণেশ্বর হ'ল অবতারবরিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণের লীলাভূমি। সেই ভবতারিণী মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা রানি রাসমণি যে সাধারণ আর সব "রানী " দের চেয়ে স্বতন্ত্র ছিলেন, সে কথা আমরা সকলেই জানি। " ঈশ্বরের শ্রেষ্ঠ প্রকাশ মানুষ " ______ এ কথা উপলব্ধি করে রানী নিজেকে নরনারায়ন পূজায় নিয়োজিত করেছিলেন। নিজের অন্তরমহল থেকেই শুরু হয়েছিল এই সেবাব্রত। শশুর, শাশুড়ি, স্বামীকে দিয়ে অন্দরমহল থেকে এই সেবারথ যাত্রা আরম্ভ করে এগিয়ে গিয়েছিল সকল প্রজা বা সাধারণ মানুষের কাছে। আপন করে নিলেন দাস দাসীদের। গুরুজনদের যথাযোগ্য আদার আপ্যায়ন করলেন। অতিথি সেবায় চরম আসক্তি দেখা দিল। দীনদু:খীদের অভাবমোচনই একমাত্র লক্ষ্য হয়ে দাড়ালো। এসব কিছুই তিনি করে নিলেন প্রাত্যহিক পূজার মতো। কর্মকে করে নিয়েছিলেন ধর্ম হিসেবে। আর ধর্মকে করে নিয়েছিলেন কর্ম হিসেবে। এ ছিল এক আসক্তিহীন কর্ম। ফলের প্রত্যাশা তিনি কখনই করতেন না। তাই হয়ত অন্দরমহলের গুরুজনরা বুঝতে পেরেছিলেন------ "এ৺র হাত ধরেই আসবে বংশের খ্যাতি। ধন্যি ধন্যি করবে লোকে। রানীর নামে দেওয়া হবে জয়ধ্বনি।"

কলকাতার উত্তরে গঙ্গার পূর্ব পাড়ে হালিশহর। তার কাছেই কোনাগ্রাম। সেখানে এক দারিদ্র মাহিষ্য পরিবারের কর্তা হরেকৃষ্ন দাস, তাঁর স্ত্রী রামপ্রিয়া দেবী। তাদের দুই ছেলে। রামচন্দ্র এবং গোবিন্দ। ১২০০ বঙ্গাব্দের ১১ই আশ্বিন ( ২৪শে সেপ্টেম্বর ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দ) হরেকৃষ্ন - রামপ্রিয়ার এক কন্যা সন্তান হয়। মেয়ের মুখ দেখে বাবা মায়ের আনন্দের সীমা নেই। তারা প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েদের ডেকে নবজাতিকার কল্যাণ কামনায় হরির লুট দিলেন। এ৺রা দুজনেই ছিলেন অত্যন্ত সেবাপরায়ন ও ধর্মনিষ্ঠ। বাইরের আরম্বরে সাজানোর সঙ্গতি তাদের ছিল না, কিন্ত অন্তরের ঐশ্বর্য কন্যার মধ্যে পূর্ণ করে দিতে তারা কার্পন্য করেননি। মেয়ের নাম রাখা হল রানী।

একদিন এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল রামপ্রিয়াদেবীর______ দেখলেন পূর্ণ চাঁদের জ্যোতস্নায় বৃন্দাবনে রাসলীলা চলছে। গোপীরা কৃষ্ণকে ঘিরে নৃত্যরতা। চিকনশ্যামের কালো রূপে দশ দিক আলোকিত। এমন সময়ে হঠাৎ কোথা থেকে এক ছোট্ট মেয়ে নাচতে নাচতে এসে মূরলীধারী কৃষ্ণের কোলে ঝাপিয়ে পড়ল। চমকে উঠে বসলেন তিনি। স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছেন তিনি। তাঁর চোখে পড়ল দেড় বছরের শিশুকন্যা রানীর দিকে। ঠিক যেন সেই স্বপ্নে দেখা সেই ছোট্ট মেয়েটিই। রাসলীলার সেই স্বপ্নটি দেখার পর 'রানী' নামের সঙ্গে "রাসমণি" শব্দটি যুক্ত করা হয়। বৈভবের অধিকারিনী হিসাবে নয় , তবে তাঁর জীবন পরিক্রমা করলে বলা যায়, তিনি সত্যিই সার্থকনামা।
তখন মেয়েরা স্কুলে যেত না। পিতা হরেকৃষ্ন দাস বাড়িতেই তাকে কিছু বাঙলা লেখাপড়া শিখিয়ে ছিলেন। শৈশব থেকে ভক্তির সঙ্গে তীক্ষ্ণ মেধাও ছিল রানীর। কোথাও শাস্ত্র পাঠ কিংবা ভগব্ৎ প্রসঙ্গ আলোচনা হলে রানী নিবিষ্ট মনে শুনত। শুনে বড়ো আনন্দ পেত ছোট্ট মেয়েটি। কখনও কখনও তার ডাগর চোখ দুটো জলে ডেসে যেত। মা-বাবাকে দেখে ছোটবেলা থেকেই রানী সন্ধ্যাবন্দনা করত, তুলসীতলায় দীপ দিত, গলবস্ত্রে প্রণাম করত। মা রামপ্রিয়া চোখ সরাতে পারতেন না গৌরবর্না, আয়তনয়না মেয়ের দিক থেকে। স্বামীকে বলতেন " এ আমাদের মেয়ে নয়, যেন স্বয়ং ভগবতী;তুমি দেখো এ মেয়ে একদিন রাজরানী হবে।"
মাতৃস্নেহ রানীর ভাগ্যে বেশিদিন ছিল না। রানীর মাত্র সাত বছর বয়সে , আট দিনের জ্বরে রামপ্রিয়া দেবী মারা গেলেন। কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়েছিলেন রানী। যাকে একদিন বৃহৎ লোকসংসারের মা হতে হবে, শৈশবেই তাঁর মাথার উপর থেকে মাতৃচ্ছায়া সরিয়ে নিলেন বিধাতা পুরুষ।
"রানীমা" অভিধায় রানী এবং মা এই দুটি শব্দই মিশে আছে। এবং এই দুটি শব্দই রানী রাসমণির জন্য সপ্রযুক্ত। জীবন এবং চরিত্র------- সব দিক দিয়েই এই শব্দ দুটির মর্যদা রক্ষা করেছেন তিনি। প্রজাদের সন্তানের মতো দেখেছেন তিনি এবং তাদের প্রতি কোনও অন্যায় অবিচারই বরদাস্ত করেননি, তা সে অন্যায়কারী যতই পরাক্রান্ত হোক না কেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আমলে ১৮৩৩ সালে আইন করে শ্বেতাঙ্গ ইংরেজেদর এদেশে জমিদারি কিনে নেওয়ার অধিকার হয়। রানীর জমিদারীর মধ্যে অন্যতম পরগনা ছিল মকিমপুর। সেখানে নীলকর সাহেবদের অত্যাচার চরমে ওঠে। তারা জোর করে রানীর প্রজাদের জমি নীলচাষের জন্য কেড়ে নেয়। তাদের নীলচায করতে বাধ্য করে। অতিষ্ট প্রজারা রানীর শরণাপন্ন হন। রানী নীলকরদের দমনের জন্য ৫০ জন লাঠিয়াল পাঠিয়ে দেন। নীলকরেরা অত্যাচার করলেই যেন তাদের শায়েস্তা করা হয় ------- এই ছিল রানীর হুকুম। রানীর ভয়ে নীলকরদের অত্যাচার বন্ধ হয়। মকিমপুর পরগনার কুখ্যাত নীলকর ডোনাল্ড সাহেব মামলা করেন। কিন্ত মামলা ডিসমিস হয়ে যায়। রানী নীলকর সাহেবদের এলাকা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য এই ঘটনা বাংলায় নীল বিদ্রোহ শুরু হওয়ার অনেক আগের কথা।
এবার তাঁর সাংসারিক জীবন সম্বন্ধে কিছু আলোকপাত করা যাক। হাওড়ার খোশালপুর থেকে অনাথ প্রীতিরাম দাস তাঁর দুই ভাইয়ের হাত ধরে এসে পৌচ্ছালেন কলকাতায়। সময়টা ছিল আঠেরো শতকের বর্গি হামলা। উঠলেন জানবাজারের বিশিষ্ট মান্নাবাবুদের বাড়িতে। সেখানে প্রীতিরাম, পিসি ইন্দুবালার কাছে প্রতিপালিত হতে লাগলেন। প্রথমে বেলেঘাটার ডানকিন সাহেবের নুনের কারখানার মুহুরীর চাকরিতে ঢোকেন প্রীতিরাম। নিজস্ব ক্ষমতায় আরও ব্যবসাবাণিজ্য চালিয়ে বিরাট সম্পত্তির মালিক হন। তিনি এই মান্না পরিবারেই বিবাহ করেন। বিয়েতে পাওয়া ১১বিঘা জমিতে আলাদা বাড়ি করে দুই ভাই এবং স্ত্রীকে নিয়ে তিনি আলাদা ভাবে থাকতে শুরু করেন। প্রীতিরামের দুই পুত্র ___ হরচন্দ্র এবং রাজচন্দ্র। হরচন্দ্র অল্পায়ু এবং অপুত্রক ছিলেন। ছোটছেলে রাজচন্দের দুই পত্নী খুব অল্প বয়সে পর পর মারা যান। রামচন্দ্রের আর বিয়ে করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্ত অদৃষ্টপুরুষের ইচ্ছা ছিল অন্য রকম।
রাজচন্দ্র দাস মাঝে মাঝে পূণ্য তিথি উপলক্ষ্যে নৌকা করে ত্রিবেণীতে স্নান করতে যেতেন। এমনই একদিন তাঁর সঙ্গীরা দেখতে পান, কোনাগ্রামের ঘাটে এক ভারী সুলক্ষণা মেয়ে জল তুলতে এসেছে।সকলে মিলে রাজচন্দ্রের জন্য মেয়েটিকে পছন্দ করেন। সেই ঘাটে নৌকা বেধে তারা পরিচয় নেন। তারপর রাজচন্দ্রকে বিবাহে রাজি করান। সেই মেয়েই রানী।১২১১ বঙ্গাব্দের ৮ই বৈশাখ রাজচন্দ্র দাসের সঙ্গে রানীর শুভ পরিনয় সুসম্পন্ন হয়। তখন রাজচন্দ্র বাবুর বয়স ২১ আর রানীর বয়স ১১।
| |
রাজচন্দ্রবাবুর সমস্ত দিকে উত্তরোত্তর শ্রী বৃদ্ধি শুরু হয়। রানী রাসমণি বরাবরই স্বামীকে দানধ্যানে ও পুন্যকর্মে অনুপ্রাণিত করতেন। স্নানার্থীদের সুবিধার জন্য বাবুঘাট এবং আহেরীটোলায় গঙ্গায় বাধানো ঘাট, নিমতলায় মুমূর্ষু গঙ্গাযাত্রীদের জন্য পাকা বাড়ি তৈরী করিয়ে সেখানে মৃত্যুপথযাত্রীদের সেবার জন্য চিকিৎসক এবং পরিচারক নিয়োগ রাজচন্দ্রবাবুর উল্লেখযোগ্য কীর্তি। |
রাজচন্দ্রবাবুর চার মেয়ে এবং এক ছেলে।
*পদ্মমনি ------>রামচন্দ্র আটা (দাস)
@গনেশ
€গোপাল কৃষ্ণা------>গিরিবালা
@বলরাম
€শ্যাম
€শিব
€যোগা
€অজিত
@সীতানাথ
€অমৃত
*কুমারী------>পিয়ারীমোহন চৌধুরী
@যদুনাথ
€চন্ডী
€প্রসন্ন
€দুলাল
€কিশোর
€নন্দ
*করুনাময়ী----->মথুরামোহন বিশ্বাস (সেজবাবু)
@ভূপাল
€শশী
€গিরিন্দ্র
€মণীন্দ্র
*মৃতপুত্র
*জগদম্বা----->মথুরানাথ বিশ্বাস
@দ্বারিক
€গুরুদাস
€কালিদাস
€দুর্গাদাস
@ত্রৈলক্য
€শ্রীগোপাল
€ব্রজ গোপাল
€নৃত্য গোপাল
€মোহন গোপাল
@ঠাকুরদাস
€শ্যামাচরণ
যথাসময়ে যথাযোগ্য পাত্রে চার কন্যার বিবাহও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্ত নিরবিচ্ছিন্ন দাম্পত্যসুখও রানীর ভাগ্যে সইল না।
রানীর তখন ৪৩ বছর বয়স। চলন্ত গাড়িতে ভ্রমনের সময়ে রাজচন্দ্রবাবু হঠাৎ সর্দি গর্মি হয়ে জ্ঞান হারান। তাকে বাড়িতে এনে শহরের নামী ডাক্তারদের ডেকে আনা হয়। সব চেষ্টা সত্ত্বেও ভবিতব্য খন্ডানো যায়নি ______ ৫৩ বছর বয়সে রাজচন্দ্রবাবু মারা যান। গভীর শোকে দুঃখে ভেঙে পরলেন রানী। দানসাগর শ্রদ্ধের আয়োজন করলেন তিনি। ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব, অনাথ, আতুর কেউ খালি হাতে ফেরেননি । দু'দিন, দু'রাত্রী দান করার তুলট করেন। এতে এক তুলাদন্ডের এক দিকে তিনি নিজে বসেন, অন্য দিকে রুপোর টাকা চাপিয়ে ওজন করা হয়। তিনি নিজের সমান ওজনের, মোট ৬০১৭ টাকা ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিতরন করেন। অতিথি ও ব্রাহ্মণ বিদায় ছাড়াও ছিল তিরিশ হাজার কাঙালি সমাবেশ।
স্বামীর পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করে রানী ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করলেন। ভোরবেলায় স্নানের পর পট্টবস্ত্র পরে তিনি কুলদেবতা রঘুনাথ জীউয়ের মন্দিরে গিয়ে প্রণাম করতেন। তার পর ঘরে এসে তিনি দুপুর পর্যন্ত জপ-আহ্নিক করতেন। মোটা তুলসীকাঠের ত্রিকন্ঠী মালা তাঁর গলায় শোভা পেত। নিয়মিত শাস্ত্র, ভগবৎ পাঠ ও আলোচনায় সময় দিতেন। সন্ধায় বিষয়কর্মের আলোচনাতেও তাঁর গাফিলতি ছিল না। ধর্মাচরণ, দানধ্যানে তাঁর যেমন কার্পন্য ছিল না, আবার প্রখর মেধা ও বিচক্ষণতা দ্বারা গৃহলক্ষীকে কখনও চঞ্চলা হতে দেননি। ব্যক্তিগত জীবনে রানী রাসমণি এক সাধারণ ধার্মিক বাঙালি হিন্দু বিধবার মতোই সরল জীবন যাপন করতেন। বাবু রাজচন্দ্র দাসের স্ত্রী ছিলেন বলে, রানী রাসমণিকে বলা হয় রাসমণি দাশী।
রানি রাসমণি রোড ও সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি রোডের সংযোগস্থলে অবস্থিত রানি রাসমণির বাসভবনটির আদি ঠিকানা ছিল ৭০ ও ৭১ ফ্রি স্কুল স্ট্রিট। রাসমণির শ্বশুর প্রীতিরাম দাস ১৮০৫ সালে এই বাড়িটি নির্মাণকাজ শুরু করেন। বাড়িটি সম্পূর্ণ হতে ৭-৮ বছর সময় লেগেছিল।
একসময় জানবাজারের এই বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরদালানে বসে দুর্গাপুজো করেছেন। বেশ কয়েকবারই এসেছিলেন এ বাড়ির দুর্গাপুজোয়। একবার ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ রমণীবেশে দেবীকে চামরব্যজন করেছিলেন। কেউই তাঁকে চিনতে পারেনি। তখন তিনি মথুরবাবুর সঙ্গে একই ঘরে থেকেও তাঁর চোখেও ধুলো দিয়েছিলেন। রানি রাসমণির আমলে বাড়ির প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার ছিল সারা কলকাতা জুড়েই। তাই পুজো উপলক্ষে বাড়িতে অনেক অতিথিই আসতেন। রাজা রামমোহন রায়, প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মধুসূদন দত্ত প্রমুখ অতিথি এসেছিলেন জানবাজারে রানি রাসমণির বাড়ির দুর্গাপুজোয়।
একসময় বিখ্যাত শিল্পীদের গানের আসর বসত এবং নাটক ও যাত্রারও আয়োজন হত। সময়ের পরিবর্তনে আড়ম্বর আর জাঁকজমকে ভাটা পড়েছে অনেকটাই। জানবাজারের বাড়িও হারিয়েছে তার জৌলুস। তবুও ঠাকুরদালানে প্রতি বছর মা আসছেন রানির বাড়ির পুজো নিতে।
একবার জানবাজারের দুর্গাপুজোয় ভোরবেলায় নানা বজনাবাদ্যিসহ নবপত্রিকা স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। বাবু রোডের পাশে বসবাসকারী এক সাহেবের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। তিনি চেচামেচি করে শোরগোল বন্ধ করার হুকুম দেন। কিন্ত তাতে কেউ আমল দেয় না। এতে সাহেবের সন্মানে লাগে। তিনি পুলিশের কাছে নালিশ করেন। অন্য দিকে সাহেবের হম্বিতম্বির কথা শুনে রানী আরও বেশি বাজনা নিয়ে বাবুঘাট থেকে স্নান, জল আনা ইত্যাদি কাজকর্ম করার নির্দেশ দেন। পষ্ট করে বলে দিলেন " আমরা হিন্দু ___ আমরা আমাদের ধর্মকর্মের অনুষ্ঠান করব। কোথাকার কে সাহেব , তার কথামত আমরা চলব কেন ? কিছুতেই নয়। জোরে জোরে বজনাবাদ্যি চালাও, সাহেবের যা খুশি হয় সে করুক। "
মোকদ্দমা এড়ানো গেল না, রানীর পঞ্চাশ টাকা জরিমানা হল। তিনি সেই টাকা কোর্টে জমা দিলেন বটে, কিন্ত হার মানলেন না। বললেন ' আমার রাস্তা, আমি যা ইচ্ছা করব। সরকার বাহাদুর বাধা দিলে আমি রাস্তা রাখবই না।' বলে কর্মচারীদের হুকুম দিলেন রাস্তা বন্ধ করে দেবার জন্য। বড় বড় গরান কাঠ দিয়ে জানবাজারের বাড়ি থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত রাস্তার দু'ধারে বেড়া দিয়ে তিনি যাতায়াতের পথ বন্ধ করে জানিয়ে দিলেন " আমার রাস্তা, সরকারের প্রয়োজন হলে তারা আমার থেকে জায়গাটা কিনে নিন। না হলে আমি রাস্তা খুলব না।"
সরকার পক্ষ পড়ল ঝামেলায়। রানীকে তাঁর জরিমানা ফেরত দিতে বাধ্য হল। রানীর প্রতিবাদের পিছনে শুধু অর্থ এবং আভিজাত্যই ছিল না , ছিল নিজের জাতি , সভ্যতা , সংস্কৃতি, ও ধর্মের প্রতি সুগভীর নিষ্ঠা। সে কারণেই তিনি উপযুক্ত ক্ষত্রিয়ানী রানীর মতোই রুখে দাড়াতে পেরেছিলেন।
একবার সরকার আইন করল, গঙ্গায় জেলেরা আর মাছ ধরতে পারবে না। তাতে জাহাজ চলাচলের অসুবিধে। বিপন্ন জেলেরা রানীর শরণাপন্ন হল। রানী ঘুসরী থেকে মেটিয়াবুরুজ পর্যন্ত গঙ্গা দশ হাজার টাকায় ইজারা নিলেন। এবং রানীর আদেশে সেই অংশের গঙ্গাটুকু মোটা দড়ি দিয়ে ঘিরে দেওয়া হল। ফলে ঐ জায়গা দিয়ে জাহাজ ও নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতা জুড়ে ব্যবসাবাণিজ্য অচল। সরকার রানীর কাছে কৈফিয়ত চাইলেন। রানী নির্দ্বিধায় জানালেন, তিনি গঙ্গার যে অংশ ইজারা নিয়েছেন, তা তিনি জেলেদের মধ্যে বিলি করবেন। জাহাজ যাতায়াত করলে সেখানে মাছ থাকে না। জেলেদের অসুবিধা হয়। কাজেই সরকারের অসুবিধার জন্য তিনি তাঁর জায়গার অধিকার ছেড়ে দেবেন না।
নিরুপায় সরকার গঙ্গায় জেলেদের বিনা শুল্কে মাছ ধরার অনুমতি দিতে বাধ্য হল। রানী গঙ্গার বেড়া তুলে নিলেন। সরকারও স্বস্তি পেল।
১২৫৪ বঙ্গাব্দ। রানী স্থির করলেন বিশ্বেশ্বর ও অন্নপূর্না দর্শন করার জন্য তিনি বারাণসী যাত্রা করবেন। তখন রেললাইন নেই। জলপথই ভরসা। রানীর তীর্থযাত্রা তো সাধারণ নয়, বহু আত্মীয়স্বজন, লোকজন এবং তাদের ছ'মাসের মত জিনিসপত্র নিয়ে পচিশটি বাজরা বোঝাই হল। কিন্ত যাত্রার আগের রাতেই এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখলেন রানী। জগজ্জননী মহামায়া স্বপ্নে তাকে বঋঋললেন " তোমার সন্তানসম প্রজারা অন্নকষ্টে কাতর, তাদের ফেলে রেখে কোথায় যাবে ? এদের সেবাই আমার সেবা। এখানে গঙ্গাতীরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করে সেবার ব্যবস্থা করো। আমি এখানেই তোমার পূজো গ্রহন করব "।
পরদিন সকালে উঠেই রানী তীর্থ যাত্রা স্থগিত করলেন। পঁচিশটি বজরায় যা কিছু পূর্ণ করা হয়েছিল, সব গরিব দু:খীদের মধ্যে বিলিয়ে দিলেন। স্বপ্নের কথা বললেন শুধু জামাই মথুরবাবুকে। কিন্ত শ্রেয়াংসি বহু বিঘ্নানি ---- ভাল কাজে আনেক বাধা। প্রথমে রানীর পিতৃভূমি কুুুুুুুমারহট্্ট হালিশহরে জমির খোজ করেছিলেন। সেখানকার ব্রাহ্মণবর্গ জানাল ------ জেলের মেয়ের মন্দির প্রতিষ্ঠার অধিকার নেই। টাকার জোরে মন্দির প্রতিষ্ঠা করলেও কোনও ব্রাহ্মণ সেখানে ঢুকবে না, পুজোও করবে না।
বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এলেন রানী। তার পর " গঙ্গার পশ্চিম কূল , বারানসী সমতুল " ---- এই বিশ্বাসে ভর করেই তিনি বালি , উত্তরপাড়ায় জমির সন্ধান করতে লাগলেন। শেষে গঙ্গার পূর্ব পারে দক্ষিণেশ্বর গ্রামে স্থান নির্ধারিত হল। ।স্থানটির এক অংশে ছিল সুুুপ্রিম কোর্টের অ্যাটর্নি হেস্টি সাহেবের কুঠি , অপর অংশে ছিল মুসলমানদের কবর স্থান
আর গাছি সাহেব পিরের আস্থানা। যেন তিন ধর্মের সমন্বয়ে তৈরি হতে শুরু করল আধুনিক ভারতের নতুন তীর্থ দক্ষিণেশ্বর। সাড়ে বিয়াল্লিশ হাজার টাকায় ৫৪ বিঘা জমি কেনা হল। শুরু হল মন্দির তৈরির কাজ ।
মন্দির তৈরীর সময়পর্বে কঠিন আচারনিষ্টা পালন করতেন রানী রাসমণি। তিনসন্ধা স্নান, হবিষ্যান্ন গ্রহন, মাটিতে শোয়া এবং সমস্ত রকম বিষয়চিন্তা দূরে সরিয়ে ব্রতচারিনীর জীবন কাটাতেন। ১২৫৪ থেকে ১২৬২ বঙ্গাব্দ, আট বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্মিত হয়____ শ্রেনীবদ্ধ দ্বাদশ শিবমন্দির, তার উল্টোদিকে পর পর রাধামাধব মন্দির, নবরত্ন চূড়াযুক্ত কালীমন্দির ও নাটমন্দির। ১২৬২ বঙ্গাব্দের ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ( ই ৩১শে মে, ১৮৫৫ ) শ্রীজগন্নাথদেবের স্ননযাত্রার দিন দক্ষিণেশ্বরের দেবালয় প্রতিষ্ঠার কাজ সম্পন্ন হয়। বিরাট সমারোহে মন্দির প্রতিষ্ঠা হলেও সমস্যা দেখা দেয় প্রতিষ্ঠতা দেবীকে অন্নভোগ দেওয়া নিয়ে । বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণরা রানীর নিচু জাতের কথা তুলে রানীকে অন্নভোগ দানের অযোগ্য হিসাবে রায় দেন। এ কষ্ট রানীকে বড় কাতর করে তুলেছিল। তিনি সাশ্ররু নয়নে বলতেন "মায়ের কাছে সন্তান কি কখনও অস্পৃশ্য হতে পারে ? জগজ্জননীর কাছে জাতিভেদ কী ! জাতপাতে তো মানুষের তৈরি। "
বহুবার তিনি বহু ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের দ্বারস্থ হলেন, কিন্ত কেউই সংস্কার মুক্ত মন নিয়ে রানীর মনবাঞ্ছা পুরন করতে এগিয়ে এলেন না। শেষে ঝামাপুকুর চতুষ্পাঠীর এক পন্ডিত বিধান দিলেন ------- রানীমা যদি মন্দির তাঁর গুরুদেবের নামে দান করে দেন, তা হলে অন্নভোগ দানে কোনও বাধা থাকে না। রানী হাপ ছেড়ে বাঁচলেন।
গোটা ব্রাহ্মণ সমাজ থমকে গেল। কিন্তু প্রতিবাদ করতে কারো সাহস হল না। কারন যিনি বিধান দিয়েছেন , তাঁর মতের বিরুদ্ধে যাওয়া বড় সহজ কথা নয়। আবার ব্রাহ্মনদের আন্দোলনের জন্য মন্দিরের পুরোহিত পাওয়া যখন দু:সাধ্য ছিল, তখনও রানীর সনির্বন্ধ অনুরোধে সেই পন্ডিতই দখ্খিনেশ্বরর মন্দিরের পুজোর ভার নিলেন। তিনি কামারপুকুর গ্রামের রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। তিনিই মন্দির প্রতিষ্ঠার পূজোয় হোমকার্য সম্পন্ন করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার দিন তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর তরুণ সহোদর ------ গদাধর চট্টোপাধ্যায়। সে দু'চোখ ভরে উপভোগ করেছিল সমস্ত উৎসব অনুষ্ঠান।
আর তার পর তার কী হল, ঝামাপুকুরে আর গদাধরের মন বসল না। সে বারবার চলে আসতে লাগল দক্ষিণেশ্বরে। তার পর একসময়ে সে দক্ষিণেশ্বরে এসে তার দাদা রামকুমারের কাছেই থাকতে শুরু করে দিল। সংসারের অভাব এবং নিজের অসুস্থতার কথা ভেবে রামকুমার মথুরবাবুকে গদাধরের একটি চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করলেন। গদাধর ডবতারিনী মায়ের বেশকারী হিসেবে নিযুক্ত হলেন। মন্দিরে তাঁর পরিচয় ছোট ভটচাজ্জি।তার পর ক্রমশ তিনি রাধামাাধবেের মন্দিরের পূজারী এবং রামকুমারেের দেহবসাানর পরে ভবতারিণী মায়ের পূজারীর পদ পেলেন। তার পরই হল মুশকিল।
কেমন ভাবে পুজো করেন গদাধর ? তার আচমন, অঙ্গন্যাস, করন্যাস ইত্যাদি শাস্ত্রোক্ত ক্রিয়াপদ্ধতির বালাই নেই। মায়ের সাক্ষাৎ পাওয়ার জন্য তিনি আকুল হয়ে কাদেন , মায়ের পুজোর ফুল নিজের মাথায় দেন, নৈবেদ্যর ফল মিষ্টি মায়ের মুখে তুলে দিয়ে খেতে বলেন, কখনও ছোট্ট মেয়ের মতো মায়ের চিবুক ধরে আদর করে দেন। শুরু হল সমালোচনা। শাস্ত্র নিষ্ঠার অভিযোগ তুলে সেই অভিযোগ পৌচ্ছাল রানীর কানে। তিনি মথুরবাবুকে সমস্ত ঘটনা স্বচক্ষে দেখে তাকে জানাতে বললেন। মথুরবাবুর কাছে সব শোনার পরে গদাধরের দিব্যোন্মাদ ভাব বুঝতে তাঁর একটুও সময় লাগল না। তিনিও যে শক্তিময়ী জননী-স্বরূপা। সন্তানের লীলা বুঝে তিনি আদেশ দিলেন ----- ছোট ভটচাজের যেমন ইচ্ছে, তিনি তেমন ভাবেই ভবতারিণীর পূজো করবেন। তাঁর কাজে কেউ যেন বাধা না দেয়।
গদাধরকে রানী গভীর স্নহ করতেন। মাঝে মাঝেই আসতেন তাঁর পূজো দেখতে। তিনি ভক্তিমূলক সঙ্গীত ভালবাসতেন। গদাধরের কন্ঠে মায়ের গান শুনে তিনি জগৎ সংসার ভুলে যেতেন। সর্বত্র যেন তখন মা-কে দেখা যেত। কিন্ত গদাধর অর্থাৎ পরর্বতী কালে যিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস হয়ে উঠেছিলেন, তাঁর পক্ষে মাত্র তিন বছরের বেশি ভবতারিণীর পুজো চলানো সম্ভব হয়নি। কারন মন্দিরে প্রবেশ করলেই তিনি দিব্য ভাবে আবিষ্ট হয়ে পরতেন। রানীমার সঙ্গে পরামর্শ করে মথুরবাবুর শ্রীরামকৃষ্ণের খুড়তোত ভাই রামতারককে মায়ের পূজক হিসেবে নিযুক্ত করলেন। তবে মন্দিরে রামকৃষ্ণদেবের অবাধ যাতায়াতে কেউ বাধা দিলেন না।
সময় এগোয়। মনুষ্যদেহ চিরস্থায়ী নয়। তাতে রোগ ধরে, ক্ষয় বাসা বাধে। রানী রাসমণি একদিন পিত্তাশয়ঘটিত রোগে পড়লেন। কারও মতে তার রোগটি উদারাময়। চিকিৎসকেরা বায়ু পরিবর্তনের বিধান দিলে রানী-মাকে তাঁর কালীঘাটের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। দক্ষিণেশ্বর মন্দির নির্মাণের আগে তিনি কালীঘাটে একটি বাগানেবাড়ী তৈরি করেছিলেন। কিন্ত সেখানে গিয়েও তাঁর রোগের কোনো উপশম হল না। তাকে চিরবিদায় দিতে হবে , এই আশঙ্কায় সকলের মন আকুল, কিন্ত তখনও রানীর ধ্যানঞ্জান শুধুই দক্ষিণেশ্বরের মন্দিরের জন্য আকুল। তিনি না থাকলেও যাতে মন্দিরের ব্যায়নির্বাহে অসুবিধা না হয়, তাই তিনি রংপুর এবং দিনাজপুরে অবস্থিত ভূসম্পত্তি দানপত্র করে দেবত্তর পত্রে রেজিস্ট্রি করতে ব্যাস্ত হয়ে পরলেন। রানীমার চার মেয়ের মধ্যে তখন বড় পদ্মমণি এবং ছোট জগদম্বা জীবিত । রানীমা নিজেকে সেবায়েত এবং তাঁর অবর্তমানে ওই দুই মেয়ে এবং নাতিদের বংশানুক্রমে সেবার অধিকার দিয়ে ১৮৬১ সালের ১৮ই ফেব্রুয়ারি দলিলে স্বাক্ষর করেন। তার পরদিন , ১৯শে ফেব্রুয়ারি (৯ই ফাল্গুন, ১২৬৭ বঙ্গাব্দ) রাত্রি দ্বিপ্রহরে রানীরই ইচ্ছেতে তাকে গঙ্গাতটে নিয়ে আসা হয়। তখন চারদিকে অনেক আলো জ্বলছে দেখে তিনি বলে উঠেছিলেন " সরিয়ে দে, ওসব রোসনাই আর ভালো লাগছে না_____ এখন আমার মা আসছেন। তাঁর অঙ্গের প্রভায় চারদিক আলো হয়ে উঠছে ।" এর একটু পরে তিনি বলেন " মা এলে ? সত্যি এলে মা ?"
সেই তাঁর শেষ কথা। তার পরই মহাসমাধি। রাত দুই প্রহরের একটু পরেই তিনি নশ্বর দেহ ত্যাগ করে অমৃতলোক যাত্রা করলেন মৃত্যুর পরে তার মৃতদেহ কেওড়াতলা মহাশ্মাশানে চন্দনকাঠে দাহ করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বৎসর । রানীমার সাধারণ মানুষের প্রতি দয়া মায়া থাকার জন্য তিনি "লোকমাতা" সন্মান লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ভারত সরকার তার স্মৃতি রক্ষার্থে ডাক টিকিট প্রকাশ করেন।
ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলেন " রানী রাসমণি শ্রীশ্রীজগদম্বার অষ্টনায়িকার একজন ____ ধরাধামে তাহার পূজাপ্রচারের জন্য আসিয়াছিলেন। " সেই দেবী কি চলে যেতে পারেন ? যিনি গৃহকর্মে লক্ষ্মী , গরীব দু:খীর সেবায় অন্নপূর্না, শরণাগতের দুর্গতি হরণে দুর্গা , পতিপ্রেমে সাবিত্রি, দৈতদলনে চন্ডী এবং সর্বজনের জনণী, তিনি লোকমাতা রুপে সর্বকালে চিরস্মরণীয়া , প্রণম্যা। দক্ষিণেশ্বর তীর্থভূমি যেমন চিরকালীন, মানুষের ইতিহাসে এই মহীয়সী নারীও অম্লান থেকে যাবেন অনন্তকাল।
No comments:
Post a Comment