মা ভবতারিণী
দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের মা ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করেছিল কাটোয়ার দাঁইহাটের ভূমিপুত্র নবীন ভাস্কর। ১৮৫৫ সালে রানী রাসমণির ইচ্ছায় দাঁইহাটের বিখ্যাত ভাস্কর নবীন মা ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করেছিলেন। মাসাধিকাল ধরে কলকাতায় রাণি রাসমণির আশ্রয়ে হবিষ্যান্ন খেয়ে আচার মেনে মা ভবতারিণীর মূর্তির নির্মাণের কাজ নবীন ভাস্কর যখন সাঙ্গ করেছিলেন তখন দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের মাপে 'মা'এর মূর্তি বেমানান হচ্ছিল। রাণি রাসমণি ফের নবীন ভাস্করকে মা ভবতারিণীর দ্বিতীয় মূর্তির নির্মাণের বরাত দেন। তবে এবার আগের মূর্তির থেকে সামান্য বড় আকারের তৈরি করতে বলেন। নবীন ভাস্কর মা ভবতারিণীর মূর্তি তৈরি করতে গিয়ে মোট তিনটি (আকারে ছোট বড়) মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। একটা দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে আছে অন্যটি উত্তর কলকাতার হাতি বাগানের শিবচরণ গুহের বসত ভিটের মন্দিরে "মা নিস্তারিণী" নামে ১২৫৭ বঙ্গাব্দে প্রতিষ্ঠা করা হয়। অপর মূর্তিটি বরানগরের দে প্রামাণিকদের বাড়িতে ১২৫৯ বঙ্গাব্দে "মা ব্রহ্মময়ী" নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর ধরে তরুণ শিল্পী নবীন ভাস্কর রাণি রাসমণির নির্দেশে দক্ষিনেশ্বরের মা কালীর মূর্তি নির্মাণ করতে গিয়ে তিনটি অনন্য মূর্তি সৃষ্টি করেছিলেন। বড় মূর্তিটি রাণি রাসমণির মনোমত হওয়ায় দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরে ১২৬২ বঙ্গাব্দে ( ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে) ১৮ জ্যৈষ্ঠ "মা ভবতারিণী"নামে প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবীন ভাস্করের নিজস্ব শিল্প কর্মের দলিল থেকে জানা যায় দক্ষিনেশ্বরের মূর্তির নামকরণ নবীন নিজেই করেছিলেন।যদিও দক্ষিনেশ্বরের মূর্তির নাম নিয়ে ভিন্নমত পাওয়া যায়।শোনা যায় ঠাকুর রামকৃষ্ণ দক্ষিনেশ্বরের ভবতারিণীকে তাঁর "মা" বলতেন আর বরানগরের ব্রহ্মময়ী দেবীকে তাঁর "মাসিমা" বলে সম্বোধন করতেন। ভাস্কর পরিবারের সদস্যদের দাবি রানি রাসমণি নাকি দ্বিতীয় মূর্তিটি তাঁর নিকটজনকে দান করেছিলেন। নবীন ভাস্করের ভাস্কর্যে সে সময় বাংলা তথা অখণ্ড ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের রাজারাও আকৃষ্ট হয়ে দাঁইহাট এসেছিলেন । জানা যায় নবীন ভাস্কর কাঁচামাল বিহার থেকে নিয়ে আসতো । কষ্টি পাথর সংগ্রহের জন্য বিহারের জামালপুরে কাছে পারশ নগরের একটা আস্ত পাহাড় কিনেছিলেন নবীন ভাস্কর। নবীনের সুখ্যাতির জন্য বর্ধমান রাজবংশ ছাড়াও কাশিমবাজার, নাটোর, পুঁটিয়া, রংপুর, দিনাজপুর, জেমো, মুক্তগাছা, ময়মনসিং, মণিপুর, লালগড়, রাজপরিবারের কাছ থেকে তিনি গৃহদেবতা নির্মানের বরাত পেয়েছিলেন। অজস্র নান্দনিক শিল্পকর্মের সৃষ্টি করে ভারতের মধ্যে অন্যতম ভাস্কর শিল্পী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। কথিত আছে দিনাজপুরের মহারানী নবীনের শিল্পনৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে 'সোনার বাটালি' উপহার দিয়েছিলেন। দক্ষিনেশ্বরের মন্দিরের মূর্তির রূপকার হয়ে নবীন ভাস্কর্য শিল্পকে এক উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন।নবীনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি ক্ষীরগ্রামের যোগাদ্যা মূর্তি।দেবী যোগাদ্যার মূর্তি নির্মাণের সময় যুবক নবীন দীর্ঘ কয়েকমাস হবিষ্যান্ন খাওয়া ছাড়াও শুদ্ধ ছালের কাপড় পরতেন। নবীন রাজপরিবারের প্রতিনিধিদের রাত বাসের জন্য অতিথিনিবাস তৈরি করেছিলেন। বাড়ির একপাশে নাচমহল ছিল। বাংলার বিভিন্ন রাজপরিবারের মন্দিরের গর্ভগৃহে বা মন্দিরে নবীনের শিল্পকর্ম শোভা পাচ্ছে। নবীনের অনন্য সৃষ্টির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বীরভূম জেলার সিউড়ির কালীবাড়ির 'মা ভবতারিণী, 'বক্রেশ্বরের কালী মূর্তি, বাজিতপুর গ্রামের 'মা ভবতারিণী' মূর্তি, শেওড়াফুলির দেবী নিস্তারিণীর মূর্তি, উদ্ধারণপুরের কাথাগ্নি রুদ্র মূর্তি,বাঁশবেড়িয়ার বাসুদেব মন্দিরের "বিষ্ণুমূর্তি' ও কাটোয়ার হর-গৌরির মূর্তি। এখনও নবীনের ঘরে কয়েকটা ভাঙা মূর্তি দেখা গেল । যেগুলো চরম অবহেলায় পড়ে নষ্ট হচ্ছে। তবে অনন্য সুন্দর একটি ১০ ইঞ্চির কষ্টি পাথরের মাকালীর মূর্তি নবীন ভাস্করের উত্তরসূরী নিমাই ভাস্কর বুকে আগলে রেখেছে। কালী মূর্তির সঙ্গে শ্বেত পাথরের নজর কাড়া মূর্তিটিকে বাক্সে রেখে দিয়েছেন । এটাই নবীনের শেষ সৃষ্টি বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। বর্তমানে নবীনের শিল্প কর্মের ঘর ভেঙে আগাছায় ভর্তি হয়ে গিয়েছে, নাচমহল ভেঙে পড়েছে। আছে বসতবাড়ির একটা ঘর তাও আবার শরিকি দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে আছে নবীনের ঘর। এত বড় ভাস্করকে এই প্রজন্ম মনে রাখে নি। দক্ষিণেশ্বরের মা ভবতারিণীর মূর্তির স্রষ্টা নবীন ভাস্করের বাড়ি কালের গ্রাসে অবহেলায় নষ্ট হচ্ছে। ভাস্কর্যে যাদের জুড়ি মেলা ভার ছিল সেই বংশের আর কেউ শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে নেই। স্রষ্টা নেই তাঁর পড়ে থাকা সৃষ্টিগুলোও নষ্ট হচ্ছে সম্পূর্ণ অযত্নে ।দেখবার কেউ না থাকায় নবীন ভাস্করের সৃষ্টি এখন দাঁইহাটের বাগটিকরায় ভাস্কর পরিবারের ঘরের আবর্জনার মধ্যে স্থান পেয়েছে। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে বর্ধমান দেওয়ান পরিবারের (রাজপরিবার) পৃষ্ঠপোষকতায় দাঁইহাটের সূত্রধর পরিবারের কর্তা কৃপারাম ভাস্কর শিল্পের চর্চা শুরু করেছিলেন।অনেকে গবেষক দাবি তোলেন বর্ধমানের রাজারা কৃপারাম সূত্রধরদের নিজেদের কাজের জন্য পাঞ্জাব থেকে এই রাজ্যে এনেছিলেন। এই মতের কোন প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়না। পরবর্তী সময়ে পরিবারের সকল সদস্যই এই অনন্য সৃজন শিল্পে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছিলেন। সভারাম ভাস্কর, খেলারাম ভাস্কর,গোলকরাম ভাস্কর, কেনারাম ভাস্কর, রামধন ভাস্কর, সুনন্দ ভাস্কর , পঞ্চানন ভাস্কর। ভাস্কর পরিবারদের ইতিহাস থেকে জানা যায় শুরুতে পাথরের তৈজসপত্রের ফেরি করতেন পরিবারের প্রধান কৃপারাম সূত্রধর। নিজের শিল্পকর্মের গুণে রাজার দেওয়া "ভাস্কর" উপাধি পাওয়ার পর শিল্পকর্মের চর্চা শুরু করেন। কেনারামের ছেলে রামধন রাজানুগ্রহের অর্থে কলকাতায় ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কলকাতার আপার চিৎপুর রোডে ওরিয়েন্টাল স্টোন ওয়ার্কস নামে একটি পাথর খোদাইয়ের দোকান পত্তন করেছিলেন। দোকান লাগোয়া পিছন দিকের ঘরে ছিল কারখানা।রামধনের ভাস্করের পুত্র নবীন ভাস্কর কিশোর বেলায় চিৎপুরের দোকানে গিয়ে উৎকৃষ্ট মানের শিল্পকর্ম তৈরি শুরু করেন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে দাঁইহাটের বাগটিকরা এলাকায় নবীন ভাস্করের জন্ম হয়। কুড়ি বছর বয়সেই শিল্পী হিসেবে কলকাতায় খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে অখণ্ড ভারতের যশস্বী শিল্পী নবীন ভাস্করের মৃত্যুর পর তাঁর তিন পুত্র যোগেন্দ্রনাথ, আনন্দগোপাল ও বিজয়গোপাল ভাস্কর দাঁইহাটের বাগটিকরার ভাস্কর পরিবারের শিল্পের ধারা বজায় রেখেছিলেন। যোগেন্দ্রনাথের পৌত্র শৈলেন্দ্র ভাস্কর পর্যন্ত দাঁইহাটের ভাস্কর শিল্পটি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল বলে জানা যায়। বর্তমানে এই শিল্পের ধারা অস্তমিত হয়েছে। দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মূর্তির স্রষ্টার বাড়ি বেহাল, অবহেলায় পড়ে আছে অনেক দামি শিল্পকর্ম।তবে দাঁইহাট পুরসভা ২০১৮ খ্রিস্টাব্দে বাগটিকরায় ভাস্কর্যের অনন্য শিল্পী নবীন ভাস্করের একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করে শিল্পীকে বিশেষ সম্মান জানিয়েছেন।
No comments:
Post a Comment