Sunday, 16 August 2020

ভারতবাসীর ভগিনী-সিস্টার নিবেদিতা

 

" মরন সাগর পাড়ে তোমরা অমর, তোমাদের নিখিলেশ রচিয়া গেলে আপনারি ঘর, তোমাদের স্মরি "।

মরনশীল এই পৃথিবীর চরম  সত্য হল মৃত্যু। মৃত্যু মানে জীবনের যবনিকা, অস্তিত্বের অবলুপ্তি। কিছুদিন এর অস্তিত্ব স্মৃতির পাতায়। ক্রমে সে স্মৃতিও হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অন্ধকারে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এর ব্যাতিক্রম ঘটে। আপন কীর্তিতে কিছু কিছু মানুষ এই মরনশীল জগতেও অমরত্বের জয়গান গেয়ে যান। মৃত্যু কখনই তাঁদের পরাজিত করতে পারে না। উল্টে মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে তাঁরা স্মরনীয় হয়ে থাকেন ইতিহাসের পাতায়। ভারতবর্ষের নারী জাগরণের পথিকৃৎ তথা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম বীর সেনানী ভগিনী নিবেদিতা সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের একজন। 


ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই অসঙখ্য ভারতমাতার বীর সন্তানের কথা, তবে এমন কিছু মানুষ ছিলেন যারা এই দেশের সন্তান না হয়েও এই দেশের স্বাধীনতার জন্য নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। সেইসব ব্যক্তিত্বের মধ্যে অন্যতম হলেন ভগিনী নিবেদিতা, যিনি নিজের দেশ ছেড়ে এসে শুধু এই দেশের জন্য কাজ করেননি, এই দেশের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। পাশাপাশি তিনিই সম্ভবত প্রথম খ্রীষ্টান মহিলা তিনি হিন্দু ধর্ম গ্রহন করেছিলেন। ১৮৬৭ খ্রীষ্টাব্দে ২৮ শে অক্টোবর আয়ারল্যান্ডের টাইরন প্রদেশের ডনগ্যানন শহরের এক বিপ্লবী পরিবারে মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল ওরফে ভগিনী নিবেদিতার জন্ম। 

মা, বাবা, ভাই ও ভগিনী নিবেদিতা



ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অন্য ধরনের মানুষ। মানুষের কাজ করার জন্য তিনি মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। তাঁর মধ্যেকার সম্ভবনার কথা বুঝতে পেরে ছিলেন তাঁর বাবা স্যামুয়েল রিচমন্ড। মৃত্যুর ঠিক আগে তিনি স্ত্রীকে ঠেকে বলেছিলেন ..." When the call come from Heaven, Let Margaret go. The little will reveal her talents and do great things." 



পড়াশোনা শেষ করার পর তিনি শিশুদের শিক্ষাদানের কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেন। বেশ কয়েক বছর এই পেশায় থাকেন তিনি। কিন্তু এই কাজে তিনি এক সময় আনন্দ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আসলে তাঁর মন সবসময় চাইত বড়ো কিছু করার জন্য। ঈশ্বর যেন তাঁর প্রাথনা শুনতে পান। ঠিক এই সময়, ১৮৯৫ এর নভেম্বরে লন্ডনে সাখ্যাৎ হয় স্বামী বিবেকানন্দের সাথে।এক পারিবারিক আসরে মার্গারেট স্বামী বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা শোনেন। 

লন্ডনে বিবেকানন্দের বেদান্ত দর্শনের ব্যাখ্যা


বিবেকানন্দের ধর্মব্যাখ্যা ও ব্যক্তিত্বে তিনি মুগ্ধ এবং অভিভূত হন। স্বামী বিবেকানন্দের সাথে এই সাক্ষাৎ তাঁর জীবনধারাকে সম্পূর্ণরূপে বদলে দেয়। স্বামীজিকে তিনি গুরু বলে মেনে নেন। স্বামীজির মুখে ভারতবর্ষের মহিলাদের দুর্দশার কথা শুনে তিনি স্থির করেন ভারতে এসে কাজ করবেন। 



নিবেদিতার  গহন  সত্তায় ছিল ঘুমন্ত এক অগ্নিশিখা। ঋষি অরবিন্দ সেই শিখাকে দেখেই  নিবেদিতার নাম দিয়েছিলেন  " শিখাময়ী"। ভিতরের ঘুমন্ত শিখার জ্্বলে ওঠার তৃষ্ঞা তাঁকে অস্থির করে তুলেছিল সুদূর আয়ারল্যান্ডে, কৈশর পেরিয়ে যৌবনে পা দেওয়ার মুখে। তখন তিনি মিস মার্গারেট এলিজাবেথ নোবেল। 

আসলে ভারতবর্ষ যে তার কর্মভূমি হবে সেরকম ইঙ্গিত তিনি ছোটবেলায় পেয়েছিলেন। একবার তাঁর বাবার এক যাজক বন্ধু ভারত থেকে ফিরে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন। বিদায় নেবার সময় তিনি তাঁকে বললেন ------ " India, my little one, is seeking her destiny. She called me once and will perhaps call you too someday. Always be ready for her call. "



ভারতবর্ষে কাজ করার এক সুপ্ত বাসনা সেদিন থেকেই বোধহয় তাঁর মনের মধ্যে তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বিবেকানন্দের সাথে সাক্ষাৎ, তাঁর সেই সুপ্ত বাসনায় যেন অগ্নিসংযোগ ঘটালো। তিনি ব্যাকুল হয়ে পরেন ভারতে আসার জন্য। এদিকে বিবেকানন্দেরও মার্গারেটকে‌ চিনতে ভুল হয়নি। তিনি বুঝেছিলেন মার্গারেটের মধ্যে যে শক্তি রয়েছে তাকে কাজে লাগিয়ে ভারতবর্ষের নারী প্রগতি সম্ভব। প্রাথমিক দ্বিধা দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি মার্গারেটকে আহ্বান জানালেন ভারতে। বহু প্রতীক্ষিত সেই ডাক পেয়ে নিজের সব কিছু ছেড়ে ১৮৯৮ এর ২৮শে জানুয়ারি তিনি কলকাতায় এলেন। এই সময় বিবেকানন্দের কাছে ভারতের ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য, জনজীবন, সমাজতত্ব, প্রাচীন ও আধুনিক মহাপুরুষ দের জীবন কথা শুনে, মার্গারেট ভারতকে চিনে নেন। ভারতে আসার কয়েকদিন পর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্ত্রী সারদা দেবীর সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।

মা সারদার সাথে ভগিনী নিবেদিতার সাক্ষাৎকার




ঐ বছরের ২৫শে মার্চ বিবেকানন্দ তাঁকে ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত   করলেন এবং তাঁর নাম দিলেন "নিবেদিতা"। বিবেকানন্দ নিবেদিতাকে সন্ন্যাসীনীর  দীক্ষা দেননি, হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন নিবেদিতার মধ্যে যে আগুন রয়েছে তাতে তাঁকে সন্ন্যাসীনীর মধ্যে আটকে রাখা সম্ভব নয়। তাই কেবল ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত করছিলেন তাঁকে।


দন্দ্বে দীর্ন মার্গারেটের অন্তরের ঘুমন্ত শিখায় অগ্নিসংযোগ করলেন  সূর্যের মত দীপ্তমান ও তেজোদীপ্ত সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দ।  নিবেদিতার অন্তরে সৃষ্টি হল মহা আলোড়ন। তিনি এই দহনদানে নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদন করলেন।  _____ তার নবজন্ম ঘটল।  গুরুর ডাকে পুরোনো জীবন ত্যাগ করে হয়ে উঠলেন  ভারতসেবিকা।

গুরুর সে ডাক ছিল আত্মার ডাক।  পাশ্চাত্যের আরাম নিলয় ছেড়ে তিনি বাস করতে লাগলেন উত্তর কলকাতার সরু গলির দারুণ গরম আবহাওয়ায়। পাশ্চাত্যে তখন তাঁর বেশ সন্মান ও প্রতিষ্ঠা ______ সবই  তিনি জীর্ণ বস্ত্রের মতো ত্যাগ করলেন। জীবন অনন্তের বেদিতে প্রতিষ্ঠিত  -------- এই নতুন বার্তা নিবেদিতা এমন একজনের কাছ থেকে পেলেন,  যার   চিন্তা-চেতনায়  সেই অনন্তের  আলোক বিচ্্ছুরন। এর পর আগের মতো থেকে যাওয়া  অসম্ভব। 

এই প্রসঙ্গে   1904 সালে নিবেদিতা লিখেছেন  " ভিতরে আমার আগুন জ্বলতো, কিন্ত প্রকাশের ভাষা ছিল না। এমন কতদিন হয়েছে কলম হাতে নিয়ে বসেছি অন্তরের দাহকে রুপ দেব বলে ---- কিন্ত কথা জোটেনি। আর আজ আমার কথা বলে শেষ করতে পারি না। দুনিয়ায় আমি যেন আমার ঠিক জায়গাটি খুজে পেয়েছি। ---এবার তীর এসে লেগেছে ধনুকের ছিলায়। "  নিবেদিতা ধীরে ধীরে রুপান্তরিত হলেন।  ভারত-সেবা রূপ অভিযানে ছুটে বেরালেন এদেশের সর্বত্র।  স্বামীজি 
এই ঘুমন্ত জাতিকে চাবুক মেরে জাগিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।  বীর সন্ন্যাসীর সেই অগ্নিকে অন্তরে বহন করে নিবেদিতা ভারতকল্যানে ঝাপ দিলেন।  অপূর্ব সেই অত্মসমার্পন, অপূর্ব সেই সেবা। স্বামীজির মহাপ্রয়ানের পর সারা ভারতে গুরুর আবির্ভাব দেখতে পেয়েছিলেন নিবেদিতা। তাই তো কর্মের মধ্যে নিজেকে  বিলিয়ে দিয়েছিলেন । গুরু ও তাঁর আদর্শের প্রতি নিবেদিতা ছিলেন এতোটাই খাটি যে , কোনো বাধাই তাঁর কাছে বাধা হয়ে দাড়াইনি ।  এই আত্মনিবেদনে তাঁর শরীর পর্যন্ত তুচ্ছ হয়েছিল।  ধূপ যেমন নিজেকে পুড়ে চারদিক সুগন্ধে পূর্ণ করে, তেমন করে তিলে তিলে নিজেকে দান করলেন ভারতের মাটিতে। নীরবে আড়াল থেকে ভারতীয় মানবসম্পদকে তিনি প্রেরনা দিয়েছেন।  সান্ত্বনা দিয়েছেন,  উজ্জীবিত করেছেন।  অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর,  জগদীশ চন্দ্র বসু, এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত এই ব্যতিক্রমী নারীর কাছে ঋণী। তিনি বাইরের জয়ঢাক বাজাননি। কেবল গোপনে গভীর সেবা করে গিয়েছেন। 

 

দীক্ষা লাভের পরে , মহিলাদের শিক্ষা দানের জন্য নিবেদিতা ১৮৯৮ এর ১৩ই নভেম্বর কলকাতার ১৭ নম্বর বোসপাড়া লেনে স্থাপন করেন " নিবেদিতা বালিকা বিদ্যালয় "। 




শিখ্যাদানের পাশাপাশি তিনি নানান সমাজসেবা মূলক কাজেও জড়িয়ে পড়েন। স্বামীজির মৃত্যুর পর নিবেদিতা পুরোপুরি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। এদিকে স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পরার কারণে, রাজনীতির অজুহাতে রামকৃষ্ণ    তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কেননা রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের নিয়মানুসারে, ধর্ম ও রাজনৈতির সংস্রব ঠেকাতে, সংঘের কেউ রাজনৈতিতে জড়াতে পারত না। কোনো মতে , তাঁর জন্য যাতে রামকৃষ্ণ মিশনের গায়ে কোনো আঁচর না লাগে, তাই তিনি নিজে থেকে সেখান থেকে সরে গিয়েছিলেন। যদিও সারদাদেবী ও রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীদের সঙ্গে তাঁর অমৃত্যু সুসম্পর্ক বজায় ছিল। 

1899 সাল। কলকাতায় প্লেগ মহামারি রূপে দেখা দিল।  শয়ে শয়ে মানুষ মৃত্যুমুখে। আতঙ্কে মানুষ শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। স্বামীজির নেতৃত্বে রামকৃষ্ণ মিশন থেকে প্লেগ রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য কমিটি গঠিত হল। নিবেদিতা হলেন তাঁর সম্পাদক।  সংবাদপত্রে প্রবন্ধ লিখে ও বক্তৃতার মাধ্যমে জনচেতনা জানানোর চেষ্টার সঙ্গে পরিবেশকে শুদ্ধ ও পরিষ্কার রাখতে নিজে কাজে হাত লাগাতেন। বাগবাজারের গলিতে ঝাটা হাতে জঞ্জাল পরিষ্কার করতে দেখা গেল এই  আইরিশ দুহিতাকে। লজ্জায় পাড়ার যুবকেরা সে কাজে এগিয়ে এলেন।  এই ভাবে নিবেদিতা সাধারণের মধ্যে সচেতনতা ও কর্তব্যবোধ জাগিয়ে তুললেন। ডাক্তার রাধাগোবিন্দ করের ( আর  জি কর ) পরামর্শে রোগাক্রান্ত 
মানুষের চিকিৎসা হত। তিনি নিবেদিতাকে সাবধান করেছিলেন,  শরীর দুর্বল।  তাই তিনি যেন মরণব্যাধির ছোয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলেন। একদিন  ডাক্তার কর বস্তিতে রোগ পরিদর্শন করতে গিয়ে অবাক !! স্যাতসেতে কুড়েঘরে প্লেগ রোগাক্রান্ত মা-হারা শিশুকে কোলে করে নিবেদিতা বসে আছেন।  ঘরটি শুদ্ধ করতে হবে বুঝে মহীয়সী নিজেই তা চুনকাম করলেন।  এত সেবা সত্ত্বেও শিশুটি বাচল না।  "মা" "মা" বলে শেষ সময়ে নিবেদিতাকেই নিজের মা ভেবে জড়িয়ে ধরল সেই মৃত্যুপথযাত্রী মানবসন্তান।  একেই তো বলে  শ্রীমদ্ভভগবত গীতায়  বর্ণিত  নিষ্কাম সেবা।

নিবেদিতা ভারতবর্ষেকেই মনে করতেন তাঁর নিজের দেশ। তিনি বুঝেছিলেন পরাধিনতা থেকে মুক্ত না হলে ভারতবর্ষের উন্নতি সম্ভব নয়। তাই স্বামীজির মৃত্যুর পর তিনি আধ্যাত্মিক ধারণা ছেড়ে বেরিয়ে এলেন বিদ্রহীনি রুপে। ব্রহ্মচারী থেকে হয়ে উঠলেন বিপ্লবী। নিজেকে তিনি স্বামীজির " মানস কন্যা " বলে ভাবতেন। স্বামীজির আদর্শ ছিল তাঁর আদর্শ। নিবেদিতা বুঝেছিলেন ----- স্বদেশপ্রেমী ও মানবপ্রেমী এই মানুষটি, যিনি তার গুরুদেব, তিনি সর্বত্যাগী সন্নাসী নন । তাঁর গৈরিক বহনের অন্তরালে লুকিয়ে রয়েছে এক বিপ্লবী সত্ত্বা, যার লখ্য ছিল কর্মযোগ ও অখন্ড ভারত। গুরুর সেই কাজে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন নিবেদিতা।


এছাড়া তাঁর রক্তে ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বীজ। ছোট বেলা থেকে তিনি বড়ো হয়ে উঠেছেন বিপ্লবী পরিমন্ডলের মধ্যে দিয়ে। তাঁর দুই দাদু, বাবার বাবা, রেভারেন্ড নোবেল এবং মায়ের বাবা, হ্যামিলটন, আইরিশ স্বাধীনতা সংগ্রামের সাথে যুক্ত ছিলেন। পরাধিন ভারতবর্ষের দূর্দশা দেখার পর তাঁর মধ্যেকার সেই বিপ্লবী সত্ত্বা জাগরিত হয়ে উঠে। ভারতবর্ষ ছিল তাঁর দেশ। ভারতের স্বাধীনতা ছিল তাঁর স্বপ্ন। ভারতবাসীর হিতসাধন ছিল তাঁর সাধনা। " ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে " ______ এই চাইতেন মনে প্রানে।

১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের সময় গোপনে বিপ্লবীদের সাহায্য করতে শুরু করেন নিবেদিতা। এই সময় অরবিন্দ ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমুখ বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।এদের মধ্যে বিঞ্জানী জগদীশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। তিনি দেখলেন পরাধীন ভারতে বিঞ্জান সাধনায় অনেক বাধা। 




সে বাঁধার সন্মুখীন হতে হয় জগদীশচন্দ্রকেও। তাঁকে সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন নিবেদিতা। ঠিক হয়েছিল জগদীশ চন্দ্র বসু সর্বপ্রথম প্রদশর্ন করবেন তার আবিষ্কার প্যারিসে। যা এতদিন সবার কাছে ছিল অচেতন পদার্থ, সে যে আসলে অতিশয় সংবেদনশীল এক চেতন সত্তা, তা যন্ত্রের সাহায্যে দেখাবেন বিঞ্জান মহলে। উচ্ছ্বাসিত বিবেকানন্দ লিখলেন নিবেদিতাকে। আজ পরাধীন দেশের এক নাগরিক বিশ্ববাসীর সামনে সগর্বে প্রমান করবেন তাঁর কৃতিত্ব।

প্রেসিডেন্সি কলেজের পদার্থ বিদ্যার জগৎ বিখ্যাত অধ্যাপক তিনি। কিন্তু তা হলে কি হবে ?? কালো চামড়ার অধিকারী বলে সমকখ্য ইউরোপীয়ান অধ্যাপকদের থেকে তাঁর বেতন কম। অপমানিত জগদীশ চন্দ্র একটি পয়সাও নিতেন না কলেজ থেকে। ভগিনী নিবেদিতা বিভিন্ন সংবাদ পত্রে লিখে যে আয় করতেন তার অংশবিশেষ দিতেন এই ঞ্জান তপস্বী সাধকে।



নিবেদিতা তখন শরীরে মনে রীতিমতো ভেঙ্গে পড়েছেন। ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়েই ছুটে গিয়েছিলেন আমেরিকার মিসেস সারা বুলের কাছে। স্বয়ঙ স্বামীজি তাঁকে "ধীরমাতা" বলে উল্লেখ করেছেন। দিনটা ছিল ১৫ই নভেম্বর ১৯১০। সেখানে ছিলেন দু মাসের উপর। ১৮ই জানুয়ারি শ্রীমতী বুল প্রয়াত হলেন। তিনি মৃত্যুর আগে সম্পাদিত দলিলে নিবেদিতার স্কুলকে এবং জগদীশ চন্দ্রকে কিছু টাকা দিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বিঞ্জান সাধনা চালিয়ে যাবার জন্য। ঠিক তখনই তিনি ভারতে আসার জন্য প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করেছেন তখনই এলো বজ্রাঘাতের মত সেই খবরটা। সারার মানুষিক বিকারগ্রস্ত মেয়ে ওলিয়া আদালতে নিবেদিতার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে যে তাঁর মা'কে শেষ সময়ে ঠকিয়ে নিবেদিতা তাঁর অর্থ আত্মসাত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি ভারত থেকে বিষফল এনে খাইয়ে তাঁর মৃত্যু ত্বরান্বিত করেছেন। মানসিক চাপে বিধ্বস্ত নিবেদিতা ভারতে ফিরে এসে চারমাস পরে সারা ফুলের চিঠি পেলেন। মামলায় ওলিয়ার হার হয়েছে এবং সে আত্মহত্যা করেছে।

রবীন্দ্রনাথও নিবেদিতার খোঁজখবর নিতেন। নিবেদিতা যে তারও অত্যন্ত আপনজন। রবীন্দ্রনাথ একবার সদলবলে নিবেদিতার দলে সামিল হয়েছিলেন। উদ্দেশ্যে বুদ্ধগয়া ভ্রমণ। স্বামীজির কঠোর ব্রহ্মচারী ব্রতের জন্য কত তর্ক বিতর্ক করেছেন কবি। আবার ভারতবর্ষের জন্য নিবেদিতার সুগভীর টান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই নিবেদিতার স্মৃতি সভায় সখেদে বলেছেন _______ আমরা দেশকে কেউ কেউ অর্থ দি, সময় দি, কিন্তু তথা সর্বস্ব উজাড় করে নিবেদিতার মত কাউকেই দিতে দেখি না।


নিবেদিতার অকালপ্রয়াণের (১৩ অক্টোবর,  ১৯১১) মাসখানেক পর প্রবাসী প্রত্রিকায় তাঁকে নিয়ে একটি শোকনিবন্ধ লেখেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।  কিছুপ্রসঙ্গে তিনি তিনি উপমার আশ্রয় নিয়েছেন,  কোথাও  একটি শব্দের মাধ্যমে অনেক তথ্য,  তত্ত্ব ও ভাবের সমাবেশ ঘটিয়েছেন। এই  প্রত্রিকার " ভগিনী নিবেদিতা " প্রবন্ধেই  রবীন্দ্রনাথ "  লোকমান " অভিধাটি ব্যবহার করেন। উপাধিটি তার পর থেকে  নিবেদিতার সাথে জুড়ে গিয়েছে। উপসংহারে তাঁকে এক দুর্লভ সন্মান দিয়ে বিশ্বকবি লিখেছেন " এই সতী নিবেদিতাও দিনের পর দিন যে তপস্যা করেছিলেন,  তাহার কঠোরতা অসহ্য ছিল। "  নিবেদিতাকে কেন সতী রুপে দেখেছেন  সে কথা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন  " মানুষের মধ্যে যে শিব আছেন, সেই শিবকেই এই সতী সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন। 

তাঁর প্রতিষ্ঠিত বালিকা বিদ্যালয়টি ছিল জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান। শুধু স্কুল নয়, তাঁর বাড়িও ছিল বিপ্লবীদের মিলিত হওয়া এবং আলাপ আলোচনা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তিনি তরুণ বিপ্লবীদের দেশের কাজে উৎসাহিত করতেন। তরূন বিপ্লবীদের ওপর তাঁর প্রভাব ও অনুপ্রেরণার কথা বলতে গিয়ে ডা: রাসবিহারী ঘোষ বলেছেন " If the dry bones are beginning to stir, it is because Sister Nivedita breathed the breath of life into them."  তাঁর অনুপ্ররনার রুপ ফুুুটে উঠেছে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষের গলাতেও ______ " বাংলায় আমার রাজনৈতিক কর্মপ্রচেষ্টায় যিনি সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছেন, তিনি স্বামী বিবেকানন্দের সুযোগ্য শিষ্যা---- মহিয়সী নিবেদিতা। "





ভারতবর্ষই তাঁর স্বদেশ, ভারতের লখ্যই তাঁর লখ্য। তাঁর মধ্যকার ভারতপ্রেম অনেক ভারতীয়কেও লজ্জা দেওয়ার মতো। একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। ১৯০২ সালে দশেরার ঠিক আগের দিন নাগপুর মরিস কলেজে একটি খেলার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন তিনি। খেলাটি ক্রিকেট জেনে, পুরষ্কার দেবার পর তিনি মরিস কলেজের ছাত্রদের তিরষ্কার করেন বিদেশি খেলার প্রতি গর্ববোধ দেখে। এমনও বলেন যে ..... আগে জানলে তিনি অনুষ্ঠানে আসতেন না।

আমাদের হৃদয়কে গভীরে স্পর্শ করে মানুষী দেবতার আবেগ ও সংগ্রাম।  তাঁকে সেবিকা,  বান্ধবী , মাতা হওয়ার আশীর্বাদ দিয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ।  কিন্ত তিনি গুরুর প্রত্যাশার পাত্র  উপচে হয়ে উঠলেন পৃথিবী বিখ্যাত লেখিকা, বাদামী, শিক্ষাতাত্ত্বিক,  ইতিহাসবিদ, ব্রাদার রাজনীতিক, ভারতীয় সংস্কৃতির এক ধারক। তাই আজ দশভূজা বলতে আমরা এমনই কোন সর্বতোমুখী প্রতিভাকে বুঝব। কেননা তার অসামান্য শ্রেষ্ঠ পরিচয়  পেয়েছি তাঁর ত্যাগধর্মে। তিনি খালি পায়ে তুষারনদী পেরিয়ে গিয়েছেন মনের বলে, চোখের জলে উত্তীর্ণ হয়েছেন স্বামী বিবেকানন্দের তাঁকে যাচাই করার অগ্নি পরীক্ষায়। উদারন্নের অংশে তাঁর গড়া বিদ্যালয়ের প্রতিপালন করেছেন, অনাহারে থেকেও রাত জেগে বই লিখেছেন,  ভগ্ন স্বাস্থ্যে ভারত ঘুরেছেন বক্তৃতা সফরে। বীরুপ জলবায়ুর কারনে ভুগছেন ব্রেন ফেডারেল, আর্তের ত্রানে গিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ম্যালেরিয়ায় ।  বুঝতে পেরেছেন সময় কমছে দ্রুত।  কাজ মিটিয়ে যেতে আরও অস্থির হয়েছেন।  স্বদেশবাসীর লাঞ্ছনা, ভারতীয়দের রুঢ়তা, অবহেলা সয়ে ,  বিরুদ্ধে পরিবেশর সাথে প্রান বাজি রেখে লড়ে তিনি নিজেকে যে ভাবে " নিবেদিত " করেছেন ভারত কল্যাণে, তাতে এক মৃত্যুশীল মানবশরীর ও মননের আশ্চর্য ক্ষমতার জয় দেখতে পাই আমরা।

তিনি তো মানবীই,  তিনি তো দেবী নন। কিন্ত এক রক্তমাংসের মানবী যদি এত অসাধ্য সাধন করেন তবে কোনও দেবীর ডাক পরে কেন ??  তিনিই তো তার প্রমাণ,  মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই,  সেবা করার জন্যও যেমন সবার উপরে মানুষ সত্য,  সেবক হিসেবেও তা-ই। মানুষ যদি নিজের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলার উপাসনায় আত্মসমর্পণ করে, অন্যের জন্য নিজের সর্বশক্তি উৎসর্গ করতে চায়, তবে তার পক্ষে কত কিছু করা সম্ভব,  নিজেকে কতখানি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব---------  স্বপ্ন জীবনের কঠোর সাধনায় সেই সহজ সত্য টুকু শিখিয়ে গিয়েছেন  ভগিনী নিবেদিতা। 


 ১৯০৪ সালে। ভারতবর্ষের জাতীয় পতাকা তৈরি করেছিলেন নিবেদিতা। এই পতাকাটি " ভগিনী নিবেদিতার পতাকা " নামে পরিচিত ছিল। লাল-হলুদ রঙের পতাকার মাঝে বাংলায় লেখা ছিল " বন্দেমাতরম্" । পতাকার মাঝে ছিল ইন্দদ্রের অস্ত্র "বর্্জ" এর ছবি আর‌‌‌‌ সাদা পদ্ম।লাল রং  স্বাধীনতার লড়াই এর প্রতীক। আর হলুুুুদ সাফল্যের প্রতীক।ব্রজ শক্তির আর সাদা ছিল পবিত্রতার প্রতীক। এই পতাকার গঠন ভাবনাই ভারত সম্পর্কে তার মনোভাব স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করে। 


ভগিনী নিবেদিতার পতাকা


জগদীশ চন্দ্রের ওপর নিবেদিতার অবদান প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন " In the day of his success , Jagadish Chandra gained an invaluable engineer and helper in Sister Nivedita and any records of his life's work her name must be given a place of honour." ১৯১৭ খ্রীষ্টাব্দে জগদীশ চন্দ্র তখন " বসু মন্দির" প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তার দ্বার প্রান্তে নিবেদিতার মূর্তি স্থাপন করেন।





শুধু বিঞ্জান নয়, ভারতের চিত্র কলা প্রসারে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, ও সি গাঙ্গুলী, আনন্দকুমারস্বামী প্রমুখ চিত্রশিল্পীদের তিনি অনুপ্রাণিত করেছিলেন ভারতবর্ষের চিত্রকলার ধারাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য। অজন্তা ইলোরার সমস্ত ছবিগুলোর স্কেচ আনতে , নিজেই যাবতীয় খরচ দিয়ে পাঠিয়েছিলেন নন্দলাল বসুর দলকে। ছয় মাস ব্যাপী তাদের থাকার বিপুল ব্যায়ভার নিজেই একা নির্বাহ করেছিলেন।

কলকাতায় তিনটি বক্তৃতার সূত্রে নিবেদিতা হয়ে উঠেন আলোচনার কেন্দ্র।  আলবার্ট হলে ও কালীঘাট মন্দিরে কালী নিয়ে,  আর ১১ই মার্চ স্টার থিয়েটারে পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে বললেন " ইংল্যান্ডে ভারতীয় আধ্যাত্মচিন্তার প্রভাব " নিয়ে। পরিচয় হল রবীন্দ্রনাথ,  অবনীন্দ্রনাথ,  সরলা দেবী,  জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমুখের সঙ্গে। 

কাজের জায়গা হিসেবে সাহেবপাড়া বেছে নেননি তিনি।  তাঁর গড়া স্কুলের ঠিকানা বাগবাজারের ১৬নং বোস পাড়া লেন। গলীর মধ্যে একটা বাড়ী।  সেটি কাছ থেকে দেখে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন  " তাহার এই কাছটিকে তিনি বাহিরে কোনোদিন ঘোষনা করেন নাই।  তিনি যে ইহার ব্যায় বহন করিয়াছেন তাহা চাদার টাকা হইতে নহে,  বা উদ্বৃত্ত অর্থ হইতে নহে, একেবারেই উদারন্নের অংশ হইতে।" পল্লিতে পল্লিতে ঘুরে, অবঞ্জা পরিহাস উপেক্ষা করে নিবেদিতা তাঁর স্কুলের ছাত্রী জোগার করেছিলেন।  আস্তে আস্তে এই স্কুল হয়ে উঠেছিল বাগবাজার অঞ্চলের বালিকা, কিশোরী,  তরুণী, সধবা বিধবাদের শিক্ষালয়।

নিবেদিতার মধ্যে বৈপ্লবিক সত্ত্বা আগে থেকে ছিল। ১৯০২ সালের অক্টোবরে তিনি বড়োদায় অরবিন্দ ঘোষের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের পন্থা ও পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন। পরবর্তী কালে অরবিন্দ কলকাতায় এসে তখন পাঁচ সদস্যের বিপ্লবী কমিটি গঠন করেন, তার মধ্যে নিবেদিতা অন্যতম একজন সদশ্যই ছিলেন না, ছিলেন এই কমিটির সম্পাদক।





অরবিন্দের সান্নিধ্যে আসার পর তিনি জড়িয়ে পরলেন চরমপন্থী আন্দোলনের সাথে। যোগ দিলেন গুপ্ত সমিতির সাথে। গান্ধীজীর অহিংস নীতি নয়, তিনি বিশ্বাসী ছিলেন চরমপন্থায়। তিনি মনে করতেন ভিখ্যা করে স্বাধীনতা পাওয়া যায় না। তাকে ছিনিয়ে নিতে হবে। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন যখন বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা করেন, তিনি দার্জিলিং থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং ইংরেজদের এই বর্বর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। ভারতীয়দের বিদেশি দ্রব্য বর্জন এবং স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার করতে আর্জি জানিয়েও তিনি প্রচার করেন। এমনকি স্বদেশী দ্রব্য হাতে তিনি কলকাতার রাজপথে ফেরিও করেন। চরমপন্থী বিপ্লবীদের অস্ত্র শিক্ষা দেওয়া কিংবা বোমা তৈরির কাজেও তিনি প্রত্যখ্য ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছেন। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে______ উল্লাসকর দত্তের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবী তখন বোম তৈরির চেষ্টায় রত। বোম তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁচ্ছে গেছে। কিন্তু কাজ করার জন্য একটা ভালো ল্যবোরেটারির দরকার। কোনো পথ না পেয়ে তাঁরা গেলেন নিবেদিতার কাছে। নিবেদিতা জগদীশ চন্দ্র বসু ও পি সি ঘোষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে প্রসিডেন্সি কলেজের কেমিস্ট্রি ল্যবোরেটারি তাদের জন্য ব্যবস্থা করে দেন এক রাতের জন্য।


আবার যুগান্তর পত্রিকার সাংবাদিক ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত গ্রেপ্তার হলে তিনি হাজির হয়েছিলেন জামানতের টাকা নিয়ে। এই ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের নাম যখন আলিপুর বোমার মামলায় উঠে আসে, তিনি তাঁকে পালাতে সাহায্য করেছিলেন। বিপ্লবীদের পাশে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণাদাত্রী ও স্নহময়ী জননীর মতো। যাইহোক এই সব কার্যকলাপ ব্রিটিশ সরকারের নজর এরাইনি। ইঙলিশম্যান পত্রিকায় তাঁকে দেশদ্রোহী বলে ঘোষনা করা হয়। ইঙরেজ সরকারও তাঁকে কারাদণ্ড কিঙবা নির্বাসনে পাঠানোর কথা ভাবতে শুরু করে। কিন্তু কোনো কিছুই দমন করে রাখতে পারেনি এই অকুতোভয় "সিংহী" কে।

১৯০২ সালের ৪ জুলাই বিবেকানন্দ প্রয়াত হলেন। গুরুপ্রয়ানের পর স্বামীজির সাধনধন ভারতবর্ষ,  তারও সাধনধন হল। সে সময় দেশে এমন কোনও বিপ্লবী ছিলেন না, যিনি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হননি।  অরবিন্দ ঘোষ,  হেমচন্দ্র ঘোষ, বারীন্দ্র ঘোষ, বাঘা যতীন,  সকলেই তাঁর দ্বারা প্রণীত হয়েছিলেন।  রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন " ভগিনী নিবেদিতা একান্ত ভালবাসিয়া সম্পূর্ণ শ্রদ্ধার সঙ্গে আপনাকে ভারতবর্ষে দান করিয়াছিলেন।  তিনি নিজেকে বিন্দুমাত্র হাতে রাখেন নাই। " ভারতবর্ষের শিক্ষা,  রাজনীতি, শিল্প, সমাজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর ছাপ রয়েছে। দার্জিলিং-এ তাঁর স্মৃতি স্তম্ভে লেখা রয়েছে  " এখানে শান্তিতে শায়িত ভগিনী নিবেদিতা,  যিনি ভারতবর্ষকে দান করছিলেন তাঁর সর্বস্ব। "

নিবেদিতা বুঝতে পারছিলেন তাঁর দিন ফুরিয়ে আসছে। তিনি ৭ই অক্টোবর, মৃত্যুর মাত্র সাত দিন আগে উকিল ঠেকে তাঁর উইল প্রস্তুত করালেন। সারা বুলের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ সমেত মোট তিনশো পাউন্ড দিয়ে একটি স্থায়ী ফান্ড তৈরি করালেন। জগদীশ চন্দ্র হলেন যার অন্যতম এগজিকিউটিভ। শুধু একটি মাত্র শর্ত আরোপ করলেন দাতা। ব্রিটিশদের সাথে এই বিদ্যালয়ের কোন সম্পর্ক রাখা যাবে না। এমনকি তাদের কাছ থেকে কোন অর্থ সাহায্যও নেওয়া যাবে না। 

কাজের চাপে তাঁর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। ১৯১১ সালে তিনি মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। জগদীশ চন্দ্র বসু ও তাঁর স্ত্রী তাঁকে দার্জিলিং-এ নিয়ে আসেন। আশঙ্কিত বসু দম্পতিকে নিবেদিতা বললেন ---- তোমরা আমাকে আটকে রেখে আমার যাওয়ার সময় পিছিয়ে দিও না। তাঁরা নিবেদিতার প্রিয় লেখা তাঁর শষ্যার পাশে বসে ভগিনীকে শোনাতে লাগলেন। একটি বৌদ্ধ প্রার্থনা নিবেদিতার খুব প্রিয় ছিল। যা তিনি ইঙরাজীতে অনুবাদ করে নিয়ে গিয়েছিলেন। _____ পূর্বে, পশ্চিমে, উত্তরে, দখিনে যাহারা রয়েছেন তাঁরা যেন সবাই শত্রুহীন, শোকহীন, বাঁধাহীন হয়ে, আনন্দ চিত্তে নিজ নিজ পথে অগ্রসর হতে পারেন। নিবেদিতাকে শোনানো হল উপনিষদের সেই বানী-------- অসতো মা সদগময়, তমসো মা জ্যোতির্গময়, মৃত্যোর্মামৃতঙ গময়, অবিরাবির্ম এধি রুদ্রর যত্তে দখিনাঙ মুখঙ তেন পাড়ি নিত্যম। ১৯১১ সালে ১৩ই অক্টোবর তিনি এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুর আগে অস্ফুষ্ট স্বরে উচ্চারণ করলেন ------ The boat is sinking, But I shall see the sunrise. না। তারপর আর কোন শব্দ উচ্চারণ করলেন না। ঔষধ নিলেন না। অক্সিজেনের নলটাও খুলে দিলেন। সেদিন বেলা দুটোর সময় আরম্ভ হয়েছিল শেষ যাত্রা। ক্রমে ক্রমে বিশাল, এত বড় বিশাল শবযাত্রা দার্জিলিং আগে কখনো দেখেনি। তাঁর পূত পবিত্র দেহ অগ্নিতে সমর্পিত করা হল ৪টে পনেরো মিনিটে। রাত  ৮টার সময়ে ফিরে এলো একমুঠো ছাই।স্বামীজির  অগ্নিসত্তার তেজ নিজের মধ্যে ধারণ করে নিজেকে ভারতের সেবায় সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়ে অকালে অনন্তে মিশে গেলেন  নিবেদিতা । শিখাময়ী হয়ে উঠলেন  সূর্যতনয়া। 

মৃত্যু হয়ত তাঁকে নিয়ে চলে গেছে পার্থিব জগত থেকে কিন্তু তাঁর তরী ডুবে যায়নি এখনও। মরন সাগরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর আজও তিনি ভাসমান রয়েছেন জীবনের স্রোতধারায়। প্রতিটি সূর্যোদয় মনে করিয়ে দেয় মরনশীল জগতেও অমরত্বের পদচারণা। জন্ম-মৃত্যু এখানে এসেই হয়তো একাকার হয়ে যায় জীবনের সার্থকতায়।

আজ শুধু স্মৃতি রয়ে গেছে ------ বিভিন্ন স্থানে তাঁর ছোট ছোট কতগুলি মূর্তি ----- গলায় রুদ্রাখ্যের মালা ----- এক সর্বস্বত্যাগিনী সন্নাসিনী।  এ এক বিদেশের মাটি থেকে তুলে আনা শ্রেষ্ঠতম নৈবেদ্য, যা বিবেকানন্দ উৎসর্গ করেছিলেন দেশমাতৃকার চরণে।




No comments:

Post a Comment