Wednesday, 5 August 2020

স্বামীজির শেষ দিন নিয়ে দু-চার কথা



আমেরিকা ও ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ৪ঠা জুলাই ও ১৫ই আগষ্ট, এই দুটি দিন যেমন কোটি কোটি মানুষের কাছে সমাদৃত, তেমনই অনেক ভক্তজনের কাছে দুঃখের দিনও। কারণ, স্বামী বিবেকানন্দ ও ঠাকুর শ্রী শ্রীমকৃষ্ণদেব ওই দু'দিনে অমৃতলোকের যাত্রী হয়েছিলেন।

১৮৮৬ সালের ১৫ই আগষ্ট রাতে কাশীপুর উদ্যানবাটীতে ক্যানসারে জর্জরিত শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু সেই রাতে তাঁর সেবকবৃন্দ বিশ্বাস করতে পারেননি যে তাঁদের হৃদয়শ্বর মৃত। তাই তাঁরা সারা রাত ধরে তাঁর বুকে মালিশ করে গিয়েছিলেন, যাতে তিনি সমাধি থেকে ফিরে আসতে পারেন।  তারপর ডা: মহেন্দ্রলালকে খবর পাঠানো হয় এবং এই কিংবদন্তি মহাপুরুষ মহানগরীর সব দূরত্ব অগ্রাহ্য করে ১৬ই আগষ্ট সকালবেলায় কাশীপুরে হাজির হয়ে ভক্ত জনের হৃদয়ে আঘাত করে জানিয়ে দিলেন যে ...... ঠাকুরের প্রানবায়ু নির্গত হয়েছে , আর কিছু করার নেই। ডা: সরকার শুধু হৃদয়বান ও প্রতিভাবান চিকিৎসক নন, এ দেশের বিঞ্জান চর্চায় তিনি অগ্রদূত এবং সেই সঙ্গে ইতিহাসের প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল। আমরা তাঁর ডায়রি থেকে জানতে পারি, সেদিন সকালে ঠিক কি হয়েছিল এবং কী ভাবে তাঁর দেওয়া দশ টাকায় তখনকার বিখ্যাত বেঙ্গল ফটোগ্রাফারকে ডেকে দু'খানা ছবি তোলা হয়েছিল, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বেজায়। এই ছবি দুটিতে অমৃতপথযাত্রী শ্রীরামকৃষ্ন ছাড়াও আদি ভক্তজনের কে নেই ? তবে সকলের বিশেষ  আকর্ষণ ধুতি পরা নরেন্দ্রনাথ দত্ত।




নরেন্দ্রনাথের ছাত্রজীবনের কোনো ছবি আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং তাঁর প্রথম ছবি বলে যেটি পরিচিত , সেটিও নাকি তোলা হয়েছিল উদ্যানবাটীতেই। সন্ন্যাস ও সাধনার দুর্গম পথের যাত্রীর এটিই প্রথম আলোকচিত্র এবং তার পরেই চিরনিদ্রায় শায়িত শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণকে কেন্দ্র করে গ্রুপ ফটো।  সেদিনের তোলা ছবি নিয়ে যা কিছু অস্বস্তি, তা হলো ঠাকুরের রোগাক্লিষ্ট দেহাবশেষ ঘিরে ‌। আমাদের ঠাকুর ফটোগ্রাফিতে কৌতুহলী ছিলেন, বিভিন্ন সময়ে সাগ্রহে স্টুডিয়োয় গিয়েছেন, ছবি তুলেছেন এবং কয়েকটি ছবি পছন্দ না হওয়ায় মুখ ফুটে বলেছেন। সেই সব ছবি সমকালের ভক্তরা নেগেটিভ সহ গঙ্গার জলে বিসর্জনও দিয়েছিলেন। একদিন যে তাঁরই ছবি বিশ্বজনের সাদর সংগ্রহে স্থান পাবে , তা ভবিষ্যতবানী করার মতো সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিও  শ্রীরামকৃষ্নের ছিল। যদিও বিশ্ববিজয়নী সহধর্মিণীর সঙ্গে তাঁর কোনো ছবি নেই এবং সারদামণির যে সামান্য ক'টি ছবি আমরা দেখেছি, সেগুলো সবই বৈধব্য অবস্থার এবং তা বিদেশিনীদের প্রবল আগ্রহে বিদেশি ফোটোগ্রাফারদের দিয়ে তোলা। আর কয়েকটি তোলা ভক্তপ্রান অ্যামেচার ফোটোগ্রাফারদের উৎসাহে। 




সৌভাগ্যক্রমে ঠাকুরের মর্মর মূর্তি তৈরি হয়েছে তাঁর দেহাবসানের অনেক পরে। তাঁকে যারা দেখেছেন, তাদের মতামত ও সমর্থন নিয়ে। তবে তার চেয়ে শতগুণ বেশি মূর্তি নগরে নগরে শোভিত হয়েছে তাঁর প্রিয় শিষ্যের , যিনি বেশ কয়েক বার সন্ন্যাস নাম পরিবর্তন করে সাগর পাড়ি দেওয়ার শেষ মুহূর্তে " বিবেকানন্দ " নাম গ্রহণ করেছিলেন। 
স্বামী ব্রহ্মানন্দের ডায়রিতে লেখা ________ মহাপ্রস্থানের কয়েক সপ্তাহ আগে স্বামীজি বেরিয়েছিলেন তাঁর কর্মব্যস্ত জীবনের শেষ ছুটিতে, তাঁর মৃনিলিনী মায়ের সঙ্গে দেখা করতে। বড় জাগুলিয়া অবস্থিতি নদিয়া জেলায়, সেখানে যাওয়াও সহজ নয়। প্রথমে ট্রেনে কাঁচরাপাড়া ( ৩৪ মাইল ), তারপর গরুর গাড়িতে বড় জাগুলিয়া (৭ মাইল) । এই যাত্রার উল্লেখ পাওয়া যায় স্বামীজির চিঠিতে। বেলুড়ে ফিরে এসে মহাপ্রয়ানের কুড়ি দিন আগে মিষ্টার ক্রিশ্চানকে লম্বা এক চিঠি লিখে ছিলেন মায়াবতীতে। শেষ প্যারাগ্রাফে বড় জাগুলিয়ার উল্লেখ করে বললেন " আমি আগের তুলনায় অনেক শক্তিমান। সাত মাইল গরুর গাড়িতে নড়বড়ে রাস্তায় যাত্রা এবং সেই সঙ্গে ট্রেনে ৩৪ মাইল যাত্রার পরেও আমার পা ফুলল না। আমার নির্ঘাত বিশ্বাস, আমার ঐ রোগ আর ফিরছে না। যাই হোক এই মুহূর্তে সবই আমার শ্রেষ্ঠ স্থান। " 




জুলাইয়ের এই চতুর্থ দিনে দেহাবসানের কয়েক বছর আগে সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ কাশ্মীরে বসে আমেরিকান ভক্তদের সামনে বসে পাঠ করছিলেন ৪ই জুলাইয়ের উদ্দেশ্যে তাঁর বিখ্যাত ইঙরাজী কবিতা। তখন কে জানতো যে  ৪ই জুলাইয়েই তাঁর দেহাবসান ঘটবে। মৃত্যু পথযাত্রী সিংহের এক প্রানস্পর্শী বিবরন দিয়েছেন স্বামী গম্ভীরানন্দ তাঁর বিখ্যাত ' যুগনায়ক ' বইয়ে। স্বাস্থ ভালো না থাকায় তিনি প্রায়ই শুয়ে থাকতেন , অসুখ কমলে নীচে নেমে আসতেন এবং কৌপিন পরিহিত অবস্থায় বেলুড় মঠের চতুর্দিকে ভ্রমন করতেন। কখনও রান্নাঘরে ঢুকে দু-একটা পদ প্রস্তুত করতেন। সেই সময় তিনি কখনও খালি গায়ে, কখনও গেরুয়া পরে, চটি পায়ে। হাতে কখনও লাঠি, কখনও হুকো। শেষ দিকে মানুষের সঙস্রব প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন। শেষর দিকে প্রিয় শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী একবার তাঁকে নদীর ওপারে আহেড়িটোলা ঘাটে দেখেছিলেন। স্বামীজির বাঁ হাতে শালপাতার ঠোঙায় চানাচুর ভাজা রয়েছে। শিষ্যকে ডেকে তিনি বললেন --- চারটি চানাচুর ভাজা খান, বেশ নুন ঝাল আছে। কিছু কিছু লেখায় পাওয়া যায় ----- ঝাল ঝোল ভাজা অম্বল ইত্যাদি যথেষ্ট খেয়ে পরমানন্দে বিবেকানন্দ বলেছিলেন, খিদেটা খুব বেড়েছে, ঘটিবাটিগুলো ছেড়েছি অনেক কষ্টে। তাই আগেকার সময়ে একটা গুজব ছিল, বেশি খেয়েই অঘটন। কিন্তু এর কোনও নির্ভরযোগ্য সমর্থন নেই। 

প্রমথনাথ বসু তাঁর " স্বামী বিবেকানন্দ " বইতে লিখেছেন ______ রাত্রি ৯টার পর পার্শ্ব পরিবর্তন করিয়া শয়ন করিয়াছিলেন এবং খুদ্র বালক যেমন কাঁদিয়া ওঠে সেইরূপ এক অস্ফুষ্ট ধ্বনি করিলেন। তাহার একমিনিট কি দুই মিনিট পর পূর্ববৎ আর একটি গভীর নিঃশ্বাস ফেলিলেন। তার পর যেন সব স্থির হইয়া গেল ............. ক্লান্ত শিশু যেন মার কোলে ঘুমাইতে লাগিলেন। দেখিয়া বোধ হইতেছে, যেন তিনি মহাধ্যানে মগ্ন। তখন ৯টা বাজিয়া মিনিট দশেক মাত্র হইয়াছে। সব সময়ের সঙ্গী ব্রহ্মচারীটি অল্পবয়স্ক ----- কিছু না বুঝতে পারিয়া বয়স্ক সন্ন্যাসী (বোধ হয় স্বামী নিশ্চয়ানন্দ) কে ডাকিলেন। নাড়িত গতি অনুভূত না হওয়ায় তিনি আরেকজন কে ডাকিলেন (বোধহয় স্বামী প্রেমানন্দ) । দুজনই দেখিলেন নাড়ী নাই।......... প্রেমানন্দ কহিলেন , বোধহয় সমাধি হইয়াছে। ..... উচ্চো:স্বরে শ্রীরামকৃষ্নদেবের নামকীর্তন হইল, কিন্তু কিছুতেই সমাধিভঙ্গ হইল না। হায় হায় এ যে মহাসমাধি। স্বামী অদ্বৈতানন্দ এ বার বোধানন্দ স্বামী কে ভালো করিয়া নাড়ি পরীক্ষা করিতে বলিলেন। তিনি কিছুক্ষণ নাড়ী ধরিয়া দাঁড়াইয়া, চিৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিলেন। " 

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মহেন্দ্র ডাক্তার ঠেকে আনার কথা উঠল। আর একজন ছুটলেন কলকাতায় স্বামী ব্রহ্মানন্দ ও স্বামী সারদানন্দকে ডেকে আনতে। রাত সাড়ে দশটায় তাঁরা এসে উপস্থিত হলেন। কৃত্রিম উপায়ে চৈতন্য সন্ধানের নানা প্রচেষ্টা হল। তার পর রাত বারোটায় ডাক্তার বললেন " প্রানবায়ু নির্গত হয়েছে"। পরেরদিন ডাক্তার বিপিন ঘোষ দেহ পরীক্ষা করে বললেন " সন্ন্যাস রোগে মৃত্যু হয়েছে।" 

এর আগে মহেন্দ্রবাবু বলে গিয়েছে, ৪ই জুলাই ১৯০২,---- স্বামীজির বয়স ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন। তিনি প্রায়ই বলিতেন " আমি চল্লিশ পেরুচ্ছি না।"

পরের দিন মানসকন্যা নিবেদিতা এলেন সকাল সাতটায় ‌। স্বামীজির মা খবর পেলেন সকালবেলা। ছোট ভাই ভুপেন্দ্রনাথ চলে এলেন দ্রুত, সঙ্গে তার ভগ্নিপতি। তার পর কাঁদতে কাঁদতে ঢুকলেন জননী ভুবনেশ্বরী, সঙ্গে নাতী ব্রজমোহন ঘোষ। গিরিশচন্দ্র এলেন চিতায় আগুন দেওয়ার সময়। মঠপ্রাঙ্গনে দাহকার্য সম্পন্ন হল সন্ধ্যা ছ'টায়। শেষকৃত্যে একটু দেরি হল এই জন্য যে, বালি মিউনিসিপ্যালিটি শ্মশানের বদলে মঠপ্রঙ্গনে দাহের অনুমতি দিতে প্রথমে বোধহয় আপত্তি জানিয়েছিল। স্বামী সারদানন্দের যে পত্রবিনিময় হয়েছিল তা এখন কোথায়, কেউ তা জানে না।

সকাল ন'টার একটু আগে চন্দ্রশেখরবাবু বাড়ী ফিরে এসে মায়ের কাছে শুনলেন, মঠের স্বামীজি আর নেই, দেহ রেখেছেন। তিনি লিখেছেন ______ সে দিন শনিবার, অফিসে না গিয়ে ভাই দুলালশশীকে নিয়ে বেলা দশটায় বেলুড় মঠে পৌঁছিলাম। বৃষ্টি হচ্ছিল। দেখিলাম স্বামী ব্রহ্মানন্দ প্রমুখ কয়েকজন সন্ন্যাসী একখানি সুন্দর খাটে পূষ্পশয্যায় রত। স্বামীজির ঘরে গিয়ে দেখা গেল, একখানি সুন্দর গালিচার উপরে শায়িত বিভূতি-বিভূষিত দেহ। স্বামীজির বাম দিকে ভগ্নী নিবেদিতা অশ্রুপূর্ন নয়নে হাত পাখার দ্বারা স্বামীজির মাথায় অনবরত বাতাস করিতেছেন। .... স্বামীজির দখ্খিন করের অঙ্গুলিতে রুদ্রাখের মালাগুলিতে আমি গুরুদত্ত মন্ত্র জপ করিয়া দিলাম। জপ শেষ হইলে ভগ্নী নিবেদিতা চুপিচুপি বলিলেন " Can you sing my friend? " তখন বন্ধু নিবারনচন্দ্র সুমধুর কন্ঠে কয়েকটি গান গাইলেন।

বেলা একটার সময়ে স্বামী সারদানন্দ তরুনদের বললেন " আমরা ভেঙ্গে পড়েছি। তোরা সকলে ধরাধরি করে স্বামীজির দেহখানি নীচে নামিয়ে আনতে পারবি ? " নীচে নামার পর ফটো তোলার কথা উঠেছিল, কিন্তু রাখাল মহারাজ ( স্বামী ব্রহ্মানন্দ ) বারন করলেন। এর পর স্বামীজির চরনতল আলতায় রঞ্জিত করে তাঁর পায়ের ছাপ নেওয়া হল। ভগিনী নিবেদিতাও একটি রুমালে স্বামীজির চরণের ছাপ তুলে নিলেন। বৃষ্টিভেজা পিচ্ছিল পথে ছিল চোরকাটায় ভরা, তারই মধ্যে পালঙ্কখানি চন্দনকাঠের চিতার উপরে স্থাপন করা হল। এই সময়ে স্বামীজির কাকিমা ও ঞ্জাতিভাই হাবু দত্ত উপস্থিত হয়ে ক্রন্দন ও বিলাপ করতে লাগলেন। 


এক সময়ে " চিতাবহ্নি ক্রমে ক্রমে লেহিহ্যমান ঊর্ধ্বমুখী জিহ্বা বিস্তার সহ ধূ-ধূ করিয়া জ্বলিতে লাগিল।" এই সময় অন্য অনেকের সঙ্গে উপস্থিত মহাকবি গিরিশচন্দ্র, বসুমতীর উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, শ্রীম, জলধর সেন প্রমুখ। ঠাকুরের দাহকার্যেও এই উপেন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন এবং বৃষ্টি ভেজা শ্মশানেই সাপের কামড়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। শোকোচ্ছাস চাপতে না পেরে নিবেদিতা জ্বলন্ত চিতার চারপাশে পরিক্রমন করতে লাগলেন। পাছে তাঁর গাউনে আগুন ধরে যায়, এই ভয়ে কানাই মহারাজ স্বামী ব্রহ্মানন্দের নির্দেশে তাঁর হাত ধরে গঙ্গার ধারে নিয়ে বসালেন। সন্ধ্যার সময় জানা গেল , গত রাত থেকে সন্ন্যাসীরা অভূক্ত রয়েছেন। একজন ভক্ত বেড়িয়ে গেলেন শোকার্তদের মুখে দেওয়ার জন্য কিছু মিষ্টি কিনতে। 



 স্বামী অভেদানন্দের লেখা স্বামী সারদানন্দের চিঠির তারিখ ৭ই আগষ্ট ১৯০২। এর অনেক আগে তাকে টেলিগ্রাম পাঠানো হয়েছিল। " স্বামীজির মৃত্যু বড়ই অদ্ভুত। প্রায় দুই পূর্বে তিনি কাশীধামে যান । সেখান হইতে শরীর খুব খারাপ লইয়া আসেন। মঠে ফিরিয়া আসিয়া কবিরাজি চিকিৎসা করান....... এক মাস ঔষধ ব্যবহারে হাত পা ফোলা সারিয়া গেল, পেটেও জল রহিল না।" ্

এর পরেই এক সপ্তাহের জন্য বড় জাগুলিয়া যাওয়ার বর্ণনা। ৬ই জুন তিনি শিষ্যা মৃনালিনী বসুর বাড়ি যান এবং মঠে ফেরেন ১২ই জুন। " রাত্রি ৪টার সময় সকলকে লইয়া জপ-ধ্যান করিতেন এবং সর্বদায় বলিতেন ' আমার কার্য হইয়া গিয়াছে , এখন তোরা সব দ্যাখ শোন, আমায় ছুটি দে'।" এর পরেই ৪ই জুলাই এর বর্ণনা। " সেদিন ঠাকুরের ঘরে বসিয়া একেলা ধ্যান করিলেন...... নীচে নামিয়া সকলের সহিত ইলিশ মাছের ঝোল ভাজা দিয়া ভাত খাইলেন। খাবার পরে এক ঘন্টা বিশ্রাম করিয়া সকলকে ডাকিয়া ব্যাকারন ও যোগ শিক্ষা দেন। পরে ৪টা-৫টা পর্যন্ত বাবুরামের সঙ্গে মাঠের বাইরে দু মাইল বেড়াইয়া আসিলেন। …..... ফিরিয়া আসিয়া বলিলেন " আজ শরীর তেমন সুস্থ, এমন অনেকদিন বোধ করি নাই।"

এর পর শনিবারের কথা :: " পরদিন অপরাহ্ন ৪টার সময় শরীর অগ্নিসাৎ করা হইল ____ গঙ্গার পশ্চিম পারে মঠের ভিতরে তাঁহার অগ্নিসাৎ করা হয়। ইহার ঠিক অপর পারেই গুরুমহারাজের শরীর অগ্নিসাৎ করা হইয়াছিল।" স্বামী প্রেমানন্দের চিঠিটি আরও হৃদয়গ্রাহী --- " তাঁর শরীর বেশ সেরে উঠেছিল। বিশেষ কোনো অসুখী ছিল না। ঠিক ইচ্ছা করে শরীর ছেড়ে দিলেন। ..…. কার্যগতিকে শরৎ, রাখাল দু চার দিন কলকাতায় ছিল। পুরাতন লোকের মধ্যে গোপাল দাদা ও আমি সেদিন মঠে ছিলাম।...... গঙ্গার একটি ইলিশ মাছ এ বৎসরে এই প্রথম কেনা হলো, তারপর তার দাম নিয়ে কত রহস্য হতে লাগলো। একজন বাংলি ছেলে ছিল , তাকে বললেন _____ " তোরা নতুন ইলিশ পেলে নাকি পূজা করিস, কি দিয়ে পূজো করতে হয় কর।" .... আহারের সময় অতি তৃপ্তির সহিত সেই ইলিশ মাছের ঝোল, অম্বল, ভাজা দিয়ে ভোজন করলেন। আহারের পর নানা কথা কয়ে কিছু বিশ্রাম করিলেন।"

স্বামী গম্ভীরানন্দ গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার শেষ পর্বে বিবেকানন্দ থেকেই উদ্ধৃতি দিয়েছেন _____ " এমনও হইতে পারে যে, আমি হয়ত বুঝিব -- এই দেহের বাহির চলিয়া যাওয়া , এই দেহকে জীর্ন পোশাকের মতো ফেলিয়া দেওয়াই আমার পখ্খে হিতকর। কিন্তু আমি কোনদিন কর্ম হইতে খান্ত হইব না ।" এর পরেই রয়েছে স্বামীজির '৪ই জুলাই' কবিতার বঙ্গানুবাদ ::--

" চল  প্রভু চল তব বাঁধাহীন পথে ততদিন ---
যতদিন এ তব মাধ্যান্দিন প্রখর প্রভায়
প্লাবিত না হয় বিশ্ব, যতদিন নরনারী----
তুলি ঊধ্বর্শির --- নাহি দেখে ছুটেছে শৃংখলাভার
না জানে শিহরানন্দে তাহাদের জীবন নূতন।"

ভগ্নী নিবেদিতাকে একবার প্রশ্ন করা হয়েছিল, রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের মধ্যে তফাৎ কি ? নিবেদিতার স্মরনীয় উত্তর , " অতীত পাঁচ হাজার বছরে ভারতবর্ষ যা কিছু ভেবেছে , তাঁরই প্রতীক শ্রীরামকৃষ্ন। আর আগামী দেড় হাজার বছর ভারত যা কিছু ভাববে , তাঁরই অগ্রীম প্রতিনিধি স্বামী বিবেকানন্দ। " 

সিস্টার নিবেদিতার সঙ্গে স্বামীজির শেষ সাক্ষাৎ দেহাবসানের দু দিন আগে। এ বিষয়ে জোসেফিন ম্যাকলাউড লিখে গিয়েছেন ----- তাঁর স্কুলে একটি বিশেষ বিঞ্জান পড়ানো উচিত হবে কিনা, সেই ব্যাপারে স্বামীজির মতামত নিতে মঠে গিয়েছিলেন। স্বামীজি উত্তর দিয়েছিলেন "তুমি মা করতে চাইছ হয়তো সেটাই ঠিক। তবে কি জান, জাগতিক কোনো কিছুতেই আর মন দিতে পারছি না। আমি এখান মৃত্যুর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি "।





No comments:

Post a Comment