Wednesday, 6 December 2023

পাগল ঠাকুরের মামাবাড়ি

 


পাগল ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মামাবাড়ি




হুগলি জেলার কামারপুকুর থেকে পূবে প্রায় ১৪ মাইল দূরে সারাটি গ্রাম। এখানেই ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মা চন্দ্রমণি দেবীর পৈতৃক বাস্তুভিটে অর্থাৎ ঠাকুরের মামাবাড়ি। এখনও এখানে রয়েছে পল্লীগ্রামের সেই শান্ত নির্জন পরিবেশ।  ১৯৯৫ সালে এই বাস্তুভিটার সাথেই স্থাপিত হয়েছে শ্রীরামকৃষ্ণ চন্দ্রমণি সেবাশ্রম।  কিছুটা জমি কিনে আর কিছুটা দানের মাধ্যমে সংগৃহীত এই সেবাশ্রমের আয়তন প্রায় ১০ বিঘার উপর। জমিতে রয়েছে দুটি বিরাট পুকুর। মন্দিরের পিছন দিয়ে বয়ে চলেছে এক খাল। সারা চত্বরটায় রয়েছে নানা রকম ফুল ও ফলের গাছ।  মন্দির বিল্ডিং এর পাশে এখনও তাঁর অর্থাৎ চন্দ্রমণি দেবীর মাটির ঘরটি সযত্নে রাখা আছে। মন্দির রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্য যাবতীয় খরচা চলছে স্থানীয় লোকের সহযোগিতায় ও তাদের দানের উপর। তবে বর্তমান পূজারি শ্রী সুব্রত চক্রবর্তী মহাশয় জানালেন যে সম্প্রতি বেলুড় মঠ কতৃপক্ষ সেবাশ্রমটি অধিগ্রহণের কথা জানিয়েছেন। 







শ্রীরামকৃষ্ণদেবের মাতুলালয়ের বংশের আদি পুরুষ ছিলেন শ্রী দাশরথি বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পুত্রের নাম ছিল নন্দকিশোর ও পুত্রবধুর নাম ছিল  হরবিলাসিনী। তাঁদের তিন সন্তান ছিল।  তাঁরা হলেন চন্দ্রমণি, রাইমণি ও কৃষ্ণমোহন। এর মধ্যে খুব ছোটবেলাতেই ওলা ওঠায় মারা গিয়েছিল রাইমণি। কন্যা চন্দ্রমণির সাথে ক্ষুদিরাম চট্টোপাধ্যায়ের বিয়ে দেন নন্দকিশোর।  চন্দ্রমণি-ক্ষুদিরামের পাঁচ সন্তানের অন্যতম গদাধর ওরফে শ্রীরামকৃষ্ণ।  শ্রীরামকৃষ্ণ ছোটবেলায় এই অঞ্চলে মামাবাড়িতে এসেছেন অনেকবার এবং অনেকটা সময়ও কাটিয়েছেন।  মামা কৃষ্ণমোহন ছিলেন সদব্রাহ্মন,  শাস্ত্রঞ্জ ও পরোপকারি পুরুষ।  ১৮৪০ সাল নাগাদ তিনি সারাটি গ্রাম ছেড়ে দেওঘরের কাছে কুন্ডায়   সপরিবারে চলে যান ও সেখানে যজমানির কাজ শুরু করেন। 





চন্দ্রমণি শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে " কেষ্ট " নামে ডাকতেন। শ্রীরামকৃষ্ণদেব সাধন জীবনের শুরু থেকেই জগন্মাতাকে দেখার ব্যপারে ব্যাকুল হয়েছিলেন।  বিয়ের পর দক্ষিণেশ্বরে ফিরে গিয়ে এই ব্যকুলতা বহুগুনে বৃদ্ধি পায়। সকলে ভাবতে লাগলেন তিনি উন্মাদ হয়ে গেছেন। এই খবর কামারপুকুরে গেলে চন্দ্রমণিদেবী স্থির থাকতে পারলেন না। কেষ্টর মঙ্গল কামনায় শিব মন্দিরে হত্যে দিয়েছেন। গৃহদেবতা রঘুবীর ও শীতলা মার কাছে মানত করেছেন। আবার অন্য দিকে মায়ের জন্য শ্রীরামকৃষ্ণদেবের চিন্তার অন্ত ছিল না। মায়ের কষ্ট লাঘবের জন্য মাকে দক্ষিণেশ্বরে নিজের কাছে নিয়ে এলেন। এখানে চন্দ্রমণিদেবী জীবনের শেষ বারো-তেরো বছর কাটিয়েছিলেন।  এখানে এসে চন্দ্রমণিদেবী প্রথমে শ্রীরামকৃষ্ণ ও রামকুমারের পুত্র অক্ষয়ের সাথে কূঠিবাড়ির উত্তর-পূর্ব দিকের একটি  ঘরে থাকতেন।  কিন্ত অক্ষয়ের অকাল মৃত্যুর পর তিনি গঙ্গা পারের নহবতের  দোতলায় বাস করতে থাকেন। ১৮৭১ সালে মথুরবাবুর দেহত্যাগের পরে মা সারদা এসে নহবতের একতলার ছোট ঘরে থাকতে আরম্ভ করলেন।  শ্রীরামকৃষ্ণ দেখতেন........ যে মা মন্দিরের গর্ভগৃহে আছেন, তিনিই যেন জননী ও সারদা রূপে নহবতে বাস করছেন।






"  আমার মা মূর্তিমতী সরলতাস্বরূপা ছিলেন। সংসারের কোনও বিষয় বুঝতেন না। টাকাপয়সা গুনতে জানতেন না। কারোকে কোনও বিষয় বলতে নেই, তা না জানাতে নিজের পেটের কথা সকলের কাছে বলে ফেলতেন, সেজন্য লোকে তাঁকে ‘হাউড়ো’ বলত এবং তিনি সকলকে খাওয়াতে বড় ভালবাসতেন”— নিজের গর্ভধারিণী মাকে এই ভাবেই ভক্ত-শিষ্যদের কাছে তুলে ধরেছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। শ্রীরামকৃষ্ণের অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে যখন দক্ষিণেশ্বরে ভক্তদের আগমন ঘটছে, তখন তাঁর জননী আর ইহলোকে ছিলেন না। কিন্তু বহু জনের মঙ্গলের জন্য রেখে গিয়েছিলেন পৃথিবীর এক অসীম আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন দার্শনিক এবং মানবপ্রেমী মহামানবকে।






১৮৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। রামকৃষ্ণদেব ক'দিন ধরে মা-র কাছে ঘন ঘন আসছেন। সন্ধ্যা থেকে  রাত অবধি মায়ের কাছে  ছোটবেলার গল্প করে চন্দ্রমণির মন ভরিয়ে রাখছেন। সেদিন সকালে  আটটা বেজে গেলেও চন্দ্রমণি দরজা খুলছেন না।  হৃদয়রাম  পরিচারিকার মুখে সব শুনে কৌশলে দরজা খুলে দেখলেন যে চন্দ্রমণি সংঞ্জাহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছেন। কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ আনা হ'ল। সেই ওষুধের সাথে দুধ আর গঙ্গাজল মিশিয়ে বিন্দু বিন্দু করে খাওয়ানো চলতে লাগলো। তিনদিন পর চন্দ্রমণির অন্তিমকাল উপস্থিত হলে তাঁকে কালীবাড়ীর বকুলতলাঘাটে অন্তর্জলি করা হলো। শ্রীরামকৃষ্ণ জননীর মুখে গঙ্গাজল দিয়ে কানে নাম শোনালেন।  পা ধুইয়ে দাদা চন্দন মাখিয়ে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন। মা এর চরনে মাথা রেখে ঠাকুর কাঁদতে কাঁদতে বললেন  " মা,  তুমি  কে গো । আমায় গর্ভে ধারণ করেছিলে , তুমিতো সাধারণ মা নও।  মা, তুমি যেমন আমায় আগে দেখাশোনা করতে, এখনও আমায় দেখো। "  পরেরদিন ব্রাহ্মমুহূর্তে স্নেহের পুত্রকে পাশে রেখে চন্দ্রমণি অমৃতলোকে চলে গেলেন। দেহত্যাগের মুহূর্তে শ্রীরামকৃষ্ণ  " মা, মা " বলে কেঁদে উঠেছিলেন।  ঘটনাচক্রে সেই দিনটিও ছিল ফাল্গুন মাসের শুক্লা দ্বিতীয়, শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মতিথি। আর সময়ও ছিল সেই উষাকাল। 






স্বামীজির কাছে শ্রীরামকৃষ্ণদেব ছিলেন    " স্পিরিচুয়াল জায়েন্ট  " , রোমাঁ রোলাঁরের কাছে শ্রীরামকৃষ্ণদেবের জীবন এক অমৃতভান্ড।  সেই আমৃতভান্ডকে যিনি গর্ভে ধারণ করেছিলেন,  তিনিও তাঁর বরেন্য পুত্রের মতোই  পূজনীয়। সেই শ্রীরামকৃষ্ণ জননী জন্মভিটে হুগলির সারাটি  গ্রাম , তারকেশ্বর থেকে প্রায় ২০ কি মি। তারকেশ্বর থেকে আরামবাগ রোড ধরে হরিণখোলায়  মুন্ডেশ্বরী নদীর ব্রীজ পেরিয়ে গেলে পাবেন কাবলে বাস ষ্টপ। সেখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে প্রায় দেড় কিমি এগুলে পাবেন  বাঁ দিকে সারাটি শনি ও কালী মন্দির।  সেখানেই আপনাকে ঢুকতে হবে বাঁ দিকে সারাটি গ্রামে যাবার জন্য। ঐ রাস্তা ধরে আর ৭০০ মিটার মতো এগোলেই দেখতে পাবেন শ্রীরামকৃষ্ণ চন্দ্রমণি সেবাশ্রম। শান্ত পরিবেশ আর নিস্তব্ধতা আপনার মনকে কতটা সতেজ করতে পারে , সেটাই বুঝতে একদিন চলে আসুন  পাগল ঠাকুরের মামাবাড়িতে। 



6 comments:

  1. শ্রী হরদাস চক্রবর্তী বলেছেন:::

    একদম সঠিক তথ্য উপস্থাপনা। হুগলী জেলার অধিবাসী হয়েও আমার জানা ছিল না সারোঠি গ্রামের কথা। জানা হল দেখা হল সার্থক হল জীবন। সৌজন্যে স্নেহাশীষ বাবু। তাকে অশেষ অশেষ ধন্যবাদ। শুভকামনা। রইল আরও আশা ভবিষ্যতের জন্য।

    ReplyDelete
  2. Comment of Smt Kalpana Majumder --------

    Khoob sundar 🙏🙏

    ReplyDelete
  3. শ্রী রনেণ চক্রবর্তী র মতামত এই রকম ********

    Thakur er ma Chandramoni Devi ke janai soto koti pronam.
    Opurbo apnar ei protibedon.
    Onek kichu jante parlum.
    Poroborti pritibedon er opekkha te roilum

    ReplyDelete
  4. শ্রী অরুপ দত্তের প্রতিবেদন =~~=

    দাদা আপনার লেখা ও ব্যাখ্যা গুলো যেন জীবন্ত হয়ে যায় মনে হয় সেই জায়গায় পৌঁছে গেছি অসাধারণ

    ReplyDelete
  5. অর্চনাদি এই রকম জানিয়েছেন ~~~

    অসাধারণ প্রতিবেদন। এই সম্বন্ধে কিছুই জানা ছিল না। অনেক কিছু জানতে পারলাম । খুব ভাল লাগল। জয় মা জয় ঠাকুর জয় স্বামিজি ।

    ReplyDelete
  6. শ্রীমতি পরিবৃতা বসু জানিয়েছেন*****

    নতুন কিছু জানলাম মামু। জয় ঠাকুর 🙏🙏

    ReplyDelete