বাঁকুড়া জেলার দামোদর নদীর তীরে অবস্থিত শান্ত, শান্তিপূর্ণ ও মার্জিত এক গ্রাম , নাম তার সোমসার। গ্রামের দেবতা সোমেশ্বর শিব। তাঁরই নাম অনুসারে গ্রামের নাম সোমসার। স্বামী ভূতেশানন্দজী মহারাজ এই সোমসার গ্রামেই ৮ই সেপ্টেম্বর ১৯০১ সালে (২৩শে ভাদ্র ১৩০৮) রবিবার সন্ধ্যা ৭টায় জন্ম গ্রহণ করেন। সেদিন ছিল কৃষ্ণা একাদশী তিথি। জ্যোতিষীরা এই শিশুর নিয়তি নির্ধারণে বললেন ......... ইনি একজন মহান আধ্যাত্মিক নেতা হবেন। পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষা, বিশাল হৃদয় এবং মহান আধ্যাত্মিক সম্পদের মাধ্যমেই লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয় ও আত্মাকে জয় করে জ্যোতিষীর ভবিষ্যত বাণী সঠিক প্রমানিত করে ছিলেন।
 |
| ঐ দূরে রামকৃষ্ণ মিশন, সোমসার |
 |
| আশ্রম মন্দিরের সামনের দিক |
 |
| ভূতেশানন্দজী মহারাজের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের সঙগ্রহশালা |
ভূতেশানন্দ মহারাজের পূর্ব নাম ছিল বিজয় চন্দ্র রায়। তাঁর পিতা ছিলেন পূর্ণ চন্দ্র রায় ও মাতা ছিলেন চারুবালা দেবী। যদিও এই রায় পরিবারের জন্ম এই গ্রামে বলা হয়, কিন্ত তা ঠিক নয়। উত্তরবঙ্গের গৌড়ের "গৌতম" বংশের একটি সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের বংশধর " রায় পরিবার "। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে গ্রামবাসীদের বিশেষ অনুরোধে ও আমন্ত্রণে এই রায় পরিবার সোমসার গ্রামে আসেন। সেইসময় গ্রামে কোনো ব্রাহ্মণ পরিবার ছিল না। তাই গ্রামবাসীরা চেয়েছিলেন একটি ব্রাহ্মণ পরিবার সেখানে বসতি স্থাপন করুক তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদা মেটানোর জন্য। প্রথম আসেন গদাধর রায়। পূর্ণ চন্দ্র রায় ছিলেন গদাধর রায়ের পঞ্চম প্রজন্ম। পূর্ণ চন্দ্র ছিলেন একজন ধার্মিক ও সৎ মানুষ। আর চারুবালা দেবী ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক।
 |
| মহারাজদের পারিবারিক " বুড়ো শিব " |
 |
| বুড়ো শিবের মন্দির |
 |
| দামোদর নদী |
 |
| দামোদর নদীর ওপর দিক |
 |
| সংগ্রহশালার ভিতরে |
 |
| সংগ্রহশালার ভিতরে ভূতেশানন্দজীর ফটৌ |
১৯৯৮ সালে স্বামী ভূতেশানন্দজীর উদ্যোগে কয়েকজন ভক্ত তাদের গুরুর জন্মস্থান সোমসারে যেতে শুরু করেন। তখন গ্রামে যাওয়ার একটি মাত্র কর্দমাক্ত রাস্তা ছিল। সত্যিই তখন গ্রামের পরিস্থিতি ভয়ঙ্কর ছিল। মহারাজদের পারিবারিক " বুড়ো শিবের " মন্দিরটি জরাজীর্ন অবস্থায় ছিল। তাঁরা এসে গ্রামের উন্নয়নের কাজে হাত দেন। তখন রায় পরিবারের সদস্যরা এগিয়ে এসে মন্দির ও আশ্রমের জন্য তাদের জমি দান করেন। গ্রামে ভক্তদের ঢল নামতে থাকে। কিন্ত যাতায়াতের ভালো রাস্তা বা পূজো করবার কোনো মন্দির বা ভক্তদের কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। এই রকম পরিস্থিতিকে সামাল দেওয়ার জন্য গ্রামের লোকেরা বা ভক্তরা একটি মন্দির গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। সেই চাহিদার ফল স্বরূপ ১৯৯৮ সালে স্নান যাত্রার শুভদিনে মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ঐ বছরের ৪ই ডিসেম্বর মন্দিরের উদ্বোধন করেন তৎকালীন সহাধক্ষ্য শ্রীমৎ স্বামী গহনানন্দ মহারাজ। পরবর্তীকালে আশ্রমের বর্তমান মন্দিরের ভিত্তিস্থাপন হয় এবং ২০১৫ সালে ১৫ই ডিসেম্বর সেই মন্দিরের দ্বারোদ্ঘাটন করেন তৎকালীন সহাধক্ষ্য শ্রীমৎ স্বামী স্মরনানন্দজী মহারাজ। ২০২১ সালের ১৮ই নভেম্বর এই কেন্দ্রটি বেলুড় মঠের শাখাকেন্দ্ররুপে স্বীকৃতি লাভ করে এবং তার নাম হয় " রামকৃষ্ণ মিশন, সোমসার "।
 |
| সোমেশ্বর শিব |
 |
| সোমেশ্বর শিব মন্দির |
সমগ্র রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলনের এটি ছিল একটি অতুলনীয় ঘটনা। এত ভিক্ষু, সন্ন্যাসী এবং ভক্তদের সমাবেশ---- সবকিছুই যেন এক নতুন উদাহরণ স্থাপন করেছিল। শুধুমাত্র ভূতেশানন্দজী মহারাজের আকর্ষণে এই সমস্ত জিনিসগুলো সফলভাবে সম্পাদিত হয়েছিল। এই শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা মন্দিরের উদ্বোধনের মাধ্যমে সোমসার গ্রাম আরও সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে ------ গ্রামের শুরুতেই স্বাগত তোরন স্থাপন, নতুন স্কুল ভবন, গেস্ট হাউস আর গ্রামে আসার নতুন বাধানো পথ দিয়ে। গ্রামের যুবক যুবতীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ শিবির এবং আত্ম-কর্মসংস্থান কর্মসূচি পরিচালনা করা হয় যাতে অনেকে তাদের পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। এই আশ্রমের পরিচালনায় রয়েছে একটি হোমিওপ্যাথি ডিসপেনসারি। এছাড়াও এখানে মাঝে মাঝে মেডিকেল ক্যাম্পের মাধ্যমে বিভিন্ন দূরারোগ্য ব্যাধি চিকিৎসা করা হয়। রয়েছে একটি ফ্রী কোচিং সেন্টার। প্রতিবছর দরিদ্রদের শাড়ি ও কম্বল বিতরণের মাধ্যমে কল্যাণ মূলক কাজ করা হয়। এছাড়া ধর্মীয় কার্যকলাপ সারা বছর ধরে লেগেই রয়েছে।
 |
| আশ্রমের ভিতরে বাগান |
সোমসার শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা মন্দিরকে কেন্দ্র করে গ্রামে এক নির্মল ও অত্যন্ত মনোরম পরিবেশ তৈরী হয়েছে। শ্রীরামকৃষ্ণদেবকে দেওয়া প্রতিদিনের পূজো ছাড়াও বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা দেবী ও স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম তিথিপূজা, হোম ও ভোগ দেওয়া পালিত হয় বেলুড় দ্বারা নির্ধারিত নির্দেশিকা অনুসারে। এছাড়াও দোলযাত্রা, দূর্গাপুজা, জন্মাষ্টমী, বাংলা নববর্ষ ইত্যাদি বিশেষ অনুষ্ঠানে ভক্তদের বিশাল সমাবেশ হয় এবং প্রসাদ গ্রহণের ব্যবস্থাও থাকে। ৪ই ডিসেম্বর সেবা মন্দিরের উদ্বোধন দিবস হওয়ায় সকালের শোভাযাত্রা, নৃত্যনাট্য এবং ধর্মীয় সমাবেশের সাথে বিশেষ পূজা এবং আনুষ্ঠানিক সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
 |
| আশ্রমের ভিতরে ফলক |
আজ সোমসার শ্রীরামকৃষ্ণ সেবা মন্দির হ'ল একটি আশ্রম কেন্দ্র _____ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন_____ বেলুড় পরিচালিত ভাব প্রচার পরিষদের সদস্য প্রতিষ্ঠান যা কিনা রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দের আদর্শের পথ অনুসরণ করে চলেছে।
 |
| আশ্রমে যাওয়ার পথ নির্দেশিকা |
 |
| দূরে দেখা যায় মন্দির |

ভক্তদের জন্য আশ্রম প্রাঙ্গণে একটি গেস্ট হাউস তৈরী করা হয়েছে। যাঁরা আধ্যাত্মিক বিশ্রাম উপভোগ করতে চান বা শান্ত পরিবেশে দু এক দিন কাটাতে চান, তাঁরা এখানে এসে থাকতে পারেন। তবে আগে থেকে চিঠি দিয়ে ঘর বুক করতে হবে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিন বা শীতকালে দু-তিন মাস আগে থেকে চিঠি লিখতে হবে। যোগাযোগের E-MAIL ADDRESS :: somsar@rkmm.org. এছাড়া দৈনিক দুপুরে ভোগ প্রসাদ পেতে পারেন। তবে অন্তত আসার একদিন আগে এই নাম্বার টেলিফোনে জানাতে হবে----- 7044536630 বা 9732077647 । এখানে আসতে হলে ----- (i) যদি ট্রেনে আসেন তবে বর্ধমানে আসুন। সেখান থেকে বাঁকুড়া যাবার বাসে চেপে খন্ডঘোষ চেকপোষ্ট বাস ষ্টপেজে নামুন। সেখানে আশ্রমের একটি তোড়ন আছে। সেই রাস্তায় দেড় কিলোমিটার এগোলেই রামকৃষ্ণ মিশন পেয়ে যাবেন। টোটো বা অটো আপনাকে নিয়ে যাবার জন্য দাড়িয়ে আছে। এছাড়া বর্ধমান ষ্টেশন থেকে গাড়ী ভাড়া করে সোজাসুজি এখানে আসতে পারেন। আর যারা ---- (ii) গাড়ি নিয়ে আসবেন, তারা দুর্গাপুর রোড দিয়ে এসে বর্ধমানে না ঢুকে বাঁ দিকের বাঁকুড়া-বর্ধমান রোড ধরুন। সেই রাস্তা ধরে বাঁকুড়ার দিকে খন্ডঘোষ চেকপোষ্টে এসে তোড়নের দিকের রাস্তা অর্থাৎ সোমসার রোড ধরে আশ্রমে চলে আসুন।
শ্রী হরদাস চক্রবর্তী মহাশয় মন্তব্য করেছেন এই রকম :
ReplyDeleteনতুন করে এই লেখার উপর কিছু বলার ধৃষ্টতা আমার নেই। সুন্দর বর্ননা দিয়ে, তথ্য দিয়ে উপস্হাপনার মুন্সীয়ানা আমরা আগেই পেয়েছি। এ বিষয়ে আর বলার অবকাশ রাখে না। লখ্ঙনীয় বিষ য় হল যে ভ্রমণ হোক বা ধর্মীয় বিষয় উভয় বিভাগেই হাই অনার্স নম্বর। চলুক লেখনী এটাই চাই।
শ্রী অরুপ দত্ত মহাশয়ের মতামত দেখুন ::~
ReplyDeleteখুব সুন্দর আপনার বিবরন, অসাধারণ, মন পড়ে রইল যাবার আগে আপনাকে ফোন করবো
Mr Rana Chakraborty has mentioned as follows***
ReplyDeleteKhub bhalo laglo.
শ্রীমতি মীনা দে লিখেছেন ~~~~
ReplyDeleteKhoob sundor describe korecho